(১০) গোল্ডেন ফেদার অফ দ্য ফিনিক্স
ইন্দ্র উত্তর দিল না। তার কেমন যেন মনে হল, উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশায় প্রশ্নটা করেননি লিওনার্দো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিওনার্দো আবার বলতে শুরু করলেন, “আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ খারাপ বলে কিছু হয় না। আমরা প্রত্যেকটা জিনিসকে নিজের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে এবং বিচার করতে ভালোবাসি। যেমন ধরুন, কোনও একটা ঘটনা নিজে থেকে ভালো ঘটনা বা দুর্ঘটনা হয় না। ঘটনা ঘটনাই। কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি বলে সেই ঘটনার মধ্যে আমাদের নিজের স্বার্থের পক্ষে বা বিপক্ষে ঘটা ভালো বা খারাপ এলিমেন্টগুলো দিয়ে ঘটনাটাকে ভালো ঘটনা বা দুর্ঘটনা বলে দাগিয়ে দিই। ঠিক সেইরকমই পৃথিবীর কোনও মানুষই আদপে ভালো বা খারাপ হয় না। বা হয়তো হয়, কিন্তু সেইরকম আদর্শ পৃথিবী আজকের যুগে দাঁড়িয়ে কল্পনা করা অক্সিমোরন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমন একাধিক ধূসর পর্দা রয়েছে, যেগুলোকে আমরা বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে সযত্নে ঢেকে রাখি। যেমন এখন এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আপনি মনে করছেন যে, আমি মানুষটা ভীষণ খারাপ একজন মানুষ। সেই সুদূর দিল্লি থেকে এভাবে আপনাকে কিডন্যাপ করে এনে এইরকম একটা পাণ্ডববর্জিত জায়গায় বন্দি করে রেখেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি যা যা করছি, আমার নিজের কাছে সেগুলোর প্রত্যেকটার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা রয়েছে। আমার করা প্রত্যেকটা কাজের পিছনে আমার বিবেকের সায় রয়েছে। আমি জানি, আমার সঙ্গে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি মিলবে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ফর দ্য গ্রেটার গুড, আমাদের এমন অনেক কিছু করতে হয়, যা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে অমার্জনীয়।”
“একটা কী ব্যাপার জানেন স্যার, এভরিওয়ান ইজ হিরো ইন দেয়ার ওন স্টোরি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রত্যেকে যা করছে বা যা ভাবছে, সেটাই ঠিক।”. ইন্দ্ৰ স্মিত হেসে জবাব দেয়।
“নিশ্চয়ই। সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক হয় না, সেটা তো আমি বললামই। তবে যদি আমি আপনাকে বলি যে, আমি আর দশজন মানুষের থেকে দুনিয়াটা একটু অন্যরকমভাবে দেখতে পাই? আসলে জানেন, কোনও আপাত অদ্ভুত বা অলৌকিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে যে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তা আমাদের বেশির ভাগেরই নেই।”
কথা শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন লিওনার্দো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। ইন্দ্রর চোখে চোখ রেখে বললেন, “চোখ বন্ধ করুন তো একটু।” এরকম অদ্ভুত আবদারে ইন্দ্র সামান্য হতভম্ব হয়ে গেল। কিন্তু লোকটার গলার স্বরে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। ইন্দ্র কিছুটা নিজের অজান্তেই চোখ বুজে ফেলল। হঠাৎ তার মনে হল, চারপাশটা ভীষণরকম শান্ত হয়ে গেল। পাখির কলকাকলি নেই, উঁচু উঁচু গাছের সরু কাণ্ডের মধ্যে দিয়ে হাওয়া চলাচলের শোঁ শোঁ শব্দ নেই, মাথার ওপরের ঘন সবুজ পাতা থেকে শিশিরবিন্দু নীচে কালো পাথরের ওপর টুপটাপ ঝরে পড়ার মৃদু একঘেয়ে শব্দ নেই। হঠাৎ যেন এই পৃথিবীটা এক লহমায় আবর্তনের গতি। কমিয়ে দিয়েছে বেমালুম। এক অদ্ভুত মায়াবী তন্দ্রা ইন্দ্রকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরছে একটু একটু করে। নিজের চেতনা ক্রমশ অজানা বিন্দুতে সমাহিত। হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, গভীর ঘুমের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে সে, হঠাৎ পায়ের নীচে একটা অদ্ভুত কম্পন অনুভূত হওয়ায় এক ঝটকায় তন্দ্রা ছুটে যায় তার। মনে হয় যেন তার পায়ের নীচের সেই চ্যাপটা কালো পাথর জীবন্ত হয়ে নড়েচড়ে উঠছে। আতঙ্কে চোখ খুলে ফেলল ইন্দ্ৰ। কিন্তু চোখ খুলতেই সামনে যা দেখল তা তাকে মুহূর্তে বিস্ময়ে অভিভূত করে দিল। ইদ হতবাক হয়ে দেখে, তার সামনের সেই পরিচিত জঙ্গল যেন হঠাৎ এক লহমায় সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। তার সামনে বিশাল বিশাল আকাশছোঁয়া অচেনা গাছ, তাদের লম্বা লম্বা ঝুরি নেমে মাটিতে এসে মিশেছে। অকস্মাৎ মাথার ঠিক ওপর থেকে একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণ কিন্তু হিংস্র আওয়াজে চমকে উঠে সে মাথা তোলে। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে সে দ্যাখে, তার মাথার ওপর দিয়ে তীব্র শিসের মতো শব্দ করে উড়ে যাচ্ছে একটা বিশালকায় পাখি। এরকম বা এত বড় পাখি সে আগে কখনও দেখেনি। দু-চোখে বিস্ময়ের ছাপ রেখে সে সেই পাখিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। বিশালকায় পাখিটার হিংস্র ছায়া এসে পড়ে ইন্দ্রর ওপর। ওর বুকের মধ্যে তখন যেন দামামা বাজছে। ঠিক সেই সময় তার পায়ের নীচের মাটি আবার দুলে উঠল। সে চমকে উঠে নীচের দিকে তাকায়, আর তাকাতেই যা দেখে, তা তাকে তীব্র আতঙ্কে স্তব্ধ করে দেয়। ইন্দ্ররা যার ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটা মোটেও সেই গোল কালো চ্যাপটা পাথর নয়। সেটা একটা বিশালকায় ধূসর অচেনা প্রাণী। সেই প্রাণীর পিঠের ওপরেই ইন্দ্র এবং লিওনার্দো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কী বিশাল সেই প্রাণী! ইন্দ্ৰ বা লিওনার্দো তার কাছে একটা মশার সমান। প্রাণীটা স্থির হয়ে এক জায়গায় গভীর ঘুমে মগ্ন। তার বিশাল শরীরটা নিঃশ্বাস নেওয়ার তালে তালে ফুলে ফুলে উঠছে। ইন্দ্ৰ ভয়ে আতঙ্কে কাঠ হয়ে যায়। দূরে দেখা যাচ্ছে, একদল বিশালকায় পোকার মতো আট পা-ওয়ালা প্রাণী জঙ্গলের বড় বড় গাছপালা উথালপাতাল করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে দূরের সেই পাহাড়টার দিকে। ইন্দ্র উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে। মাথা ঘুরিয়ে সে লিওনার্দোর দিকে তাকায়। কিন্তু লিওনার্দো যেন অদ্ভুতরকম শান্ত। তার চোখের তারায় একটা অবাধ্য দুষ্টুমি খেলা করে বেড়াচ্ছে। ইন্দ্রর মাথা গুলিয়ে যেতে থাকে। মনে হয়, সে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার জ্ঞান হারাতেও ভয় করছে। হঠাৎ তাদের মাথার ঠিক পিছনে একটা ভোঁতা ধুপধাপ আওয়াজ শুনে ইন্দ্ৰ চকিতে পিছন ফিরে তাকায়। আর তাকাতেই তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে যায়। তাদের ঠিক পিছনে এক বিশালকায় প্রাণীর মুখ। দেহের গড়ন দেখে স্পিলবার্গের ফিল্মে দেখা ডাইনোসরের কথা মনে পড়ে যায় ইন্দ্রর। প্রাণীটা খুব সম্ভবত তাদেরকে খেয়াল করেনি। বা করলেও তাদের বিন্দুমাত্র আমল দিতে রাজি নয়। একটা লম্বা আকাশচুম্বী গাছের কাণ্ড থেকে পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে সে। প্রাগৈতিহাসিক গুহার মতো বিশাল নাক দিয়ে নিশ্বাসের ফোঁসফোঁস শব্দে যেন তাদের চারপাশে একটা ছোটখাটো ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। নাসারন্ধ্র থেকে বেরিয়ে আসা গরম আর্দ্র হাওয়া তাদের সারা শরীরকে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। লিওনার্দো ইন্দ্রর কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশ করে বললেন, “চিন্তা নেই। এই প্রাণীটা ওই ফিল্মের টি-রেক্সের মতো দেখতে হলেও আদপেই মাংসাশী নয়। একদম নিরীহ নির্বিবাদী ভেজিটেরিয়ান।” লিওনার্দোর স্বরে কৌতুকের ছাপ স্পষ্ট। ইন্দ্র কোনওরকমে জিজ্ঞেস করে, “এসব কী হচ্ছে?”
ইন্দ্র বুঝতে পারে, তার প্রশ্নের শেষ শব্দটা গলার ভিতরেই দলা পাকিয়ে গেল।
“আপনি যা দেখছেন, তা আমাদের এই পৃথিবীরই কয়েক লক্ষ বছর পরের দৃশ্য। এই পৃথিবীতে মানুষ নেই, ট্রাফিক নেই, উঁচু উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার নেই, গাড়ির হর্ন নেই, খুন নেই, ধর্ষণ নেই। এই জায়গাটা আমার সানসেট বুলেভার্ড বলতে পারেন। যখন কোনও কারণে মনটা খুব ভারী হয়ে যায়, জাগতিক সবকিছুর ওপর তীব্র বিতৃষ্ণা এসে যায়, তখন আমি এই জায়গায়, বা বলা ভালো, এই সময়ে এসে একা একা চুপচাপ বসে থাকি। এগিয়ে যাই আমাদের এই চেনাজানা নোংরা পৃথিবী থেকে কয়েক লক্ষ পঞ্চ ভবিষ্যতে। কী অদ্ভুত একটা শান্তি আছে না এই জায়গাটায়? এই ধরুন, আমরা যে প্রাণীটার ওপর দাঁড়িয়ে আছি, সেটা আমাদের মানুষের হিসাবে কত দিন, কত মাস বা হয়তো কত বছর ধরে এভাবেই একই জায়গায় ঘুমিয়ে আছে তা আমিও জানি না।”
ইন্দ্রর চোখ তখনও তাদের পিছনের সেই বিশাল প্রাণীটার দিকে। অবশ্য সেই প্রাণীটা তাদের বিশেষ গ্রাহ্য করছে না। একমনে বিশাল বিশাল গাছের শক্ত মজবুত ডালপালা সবুজ পাতাসুদ্ধ আস্ত মুখের মধ্যে চালান করে দিয়ে এক ঝটকায় বিকট শব্দ করে ভেঙে নিচ্ছে। ইন্দ্ৰ সেদিক থেকে চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞেস করে, “কিন্তু এসব কী হচ্ছে? এগুলো কি জাদু?’
“জাদু বলে পৃথিবীতে কিছু হয় বলে আমার জানা নেই, ডঃ ইন্দ্র। তবে প্রকৃতিতে যা ভীষণ স্বাভাবিক, তা-ও আমাদের কাছে অনেক সময় অলৌকিক লাগে। এর প্রধান কারণ আমাদের অজ্ঞতা। আজ থেকে বছর কুড়ি আগে একজন আম বাঙালিকে যদি আধুনিক মোবাইল ফোন দেখানো হত, তার কাছে সেটা জাদু বা অলৌকিক বস্তু বলেই মনে হত। বা ধরুন, উনিশশো দুই খ্রিস্টাব্দে কেউ যদি রাস্তাঘাটে বলত যে মানুষ পাখির মতো শূন্যে উড়বে, সে নির্ঘাত পচা ডিম বা ইট-পাটকেল খেত। কিন্তু ঠিক তার পরের বছরই রাইট ব্রাদার্স আধুনিক প্লেনের প্রথম প্রোটোটাইপ বানিয়ে শূন্যে আরামসে দু-পাক ঘুরে এলেন। আর আপনি শিক্ষিত মানুষ। থিয়োরিটিক্যালি টাইম ট্রাভেল যে অসম্ভব না, তা তো আইনস্টাইন সেই কবেই স্পেশাল রিলেটিভিটির থিয়োরিতে দেখিয়ে গিয়েছেন। কোনওভাবে একটা ওয়ার্মহোলের অ্যাকসেস পেয়ে গেলেই স্পেস-টাইম ইচ্ছেমতো বেন্ড করা যায়। আরে মশাই, ঢাহম তো একটা এ-ফোর পেপার। কায়দা জানা থাকলে ইচ্ছেমতো ভাঁজ করতে কতক্ষণ!”
“বেশ। সবটা না হলেও কিছুটা বুঝলাম। কিন্তু চারপাশে এত ভয়ংকর, এত বিশাল সব অজানা প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে, আপনার ভয় লাগছে না? এদের মধ্যে যেমন নিরামিষাশী প্রাণী রয়েছে, তেমন তো কোনও হিংস্র শ্বাপদও লুকিয়ে থাকতে পারে! যে-কোনও সময় আক্রমণ করতে পারে আমাদের ওপর।”
ইন্দ্রর এই কথাটায় লিওনার্দো মিটিমিটি হাসতে থাকেন। তারপর কতকটা স্বগতোক্তির স্বরে বলেন, “আপনি ঘণ্টা বুঝেছেন, স্যার। আমি যখনই এখানে আসি, তখনই বারবার এই একই জায়গায় একই পার্টিকুলার টাইমে ফিরে আসি। আমি যতবার ফিরে এসেছি, ততবার ঠিক এই একই মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছি এই বিশালাকার ঘুমন্ত প্রাণীর পিঠে। প্রত্যেকবার আমি দেখেছি আমার সামনে দিয়ে আট পা-ওয়ালা পতঙ্গের মতো বিশাল প্রাণীগুলোকে গাছপালা ভেঙেচুরে পাহাড়ের দিকে হেঁটে যেতে। প্রতিবার আমি দেখেছি আমার মাথার পিছনে ওই প্রাণীটাকে বিশাল বিশাল গাছের কাণ্ডকে অবলীলায় ভেঙে মুখে চালান করতে। আমি আপনাকে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বলে দিতে পারি, এখন থেকে ঠিক পাঁচ সেকেন্ড পর ওই দূরে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে সব থেকে উঁচু গাছটার মাথায় একটা সোনালি পালকওয়ালা পাখি এসে বসবে। তারপর সে তার দুটো বিশাল ডানা দু-দিকে প্রসারিত করে পরক্ষণেই উড়ে যাবে। তখন তার বিশাল ডানায় ওই দূরের সূর্যও ঢাকা পড়ে যাবে। উজ্জ্বল সোনালি পালকে বিচ্ছুরিত হবে অস্তগামী সূর্যের লালচে আলো।”
লিওনার্দোর কথা শেষ না হতেই বাস্তবিকই এক বিশাল সোনালি পাখি ডানা ঝাপটে সামনের ঘন জঙ্গলের সব থেকে উঁচু গাছটার চূড়ায় এসে শান্ত হয়ে বসল। তার বিশাল ডানা ঝাপটানোর শব্দ ইন্দ্র এত দূর থেকেও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ছোটবেলায় পড়েছিল ফিনিক্স পাখির কথা। কেন জানে না এই অপূর্ব সুন্দর পাখিটাকে দেখে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল সেই ফিনিক্স পাখির কথা নিজের মৃত্যুর পর তার ছাই থেকে আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে সে। ওই দূরের বিশালকায় রাজকীয় পাখিটাকে দেখে ইন্দ্রর মনে হচ্ছিল যে এই মায়াবী পাখি এই গহিন জঙ্গলের অতন্দ্র প্রহরী। এর কোনও শুরু নেই, কোনও শেষ নেই। এই প্রাণীটা পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে এই অরণ্যের রক্ষাকর্তা এবং আজ থেকে কয়েকশো কোটি বছর পরেও একইভাবে পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করে বেড়াবে। ওই দূরের গাছটা কালের নিয়মে একদিন মরে যাবে, তার জায়গায় হয়তো অন্য কোনও গাছ জন্ম নেবে। কিন্তু সেদিনও এই পাখিটা এভাবেই জঙ্গলের সব থেকে উঁচু গাছের চূড়ায় তার সোনালি ডানা ঝাপটে এসে বসবে।
ইন্দ্রর ভাবনার মাঝে ব্যাঘাত ঘটিয়ে পাখিটা নিজের ডানা দু-দিকে প্রসারিত করল। চকিতে মনে হল যেন এই বিশাল অরণ্যে হঠাৎ অকাল সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ইন্দ্রর মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। সে আর সহ্য করতে পারছে না। মাথা নীচু করে দুই হাতের তালুর মাঝে মুখ গুঁজে সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। হঠাৎ মনে হল, তার সম্পূর্ণ শরীরটা যেন মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল। যেন সে হাজার হাজার মাইল উচ্চতা থেকে ভারশূন্য অবস্থায় একটা পালকের মতো নীচে পড়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে হল, শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু গলা থেকে স্বর বেরোল না। অজানা আতঙ্কে সে নিজের দু-চোখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। হঠাৎ কাঁধে একটা হাতের স্পর্শে সংবিৎ ফেরে ইন্দ্রর। সে আস্তে আস্তে নিজের দুই চোখ খোলে। চারপাশ আবার আগের মতোই স্বাভাবিক। তারা আবার দাঁড়িয়ে আছে সেই কালো চ্যাপটা পাথরের ওপর। ইন্দ্র ভারসাম্য না রাখতে পেরে পাথরের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। মাথা তুলে লিওনার্দোকে প্রশ্ন করে, “আপনি কি হিপ্পোটিস্ট? এতক্ষণ আমি যা দেখলাম, সেগুলো নিশ্চয়ই একটা ইলিউশন।”
এইবার হা হা করে উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন মিস্টার লিওনার্দো। তারপর একটা হাত সামনে বাড়িয়ে দেন। ইন্দ্র অবাক দৃষ্টিতে তাঁর সেই প্রসারিত হাতে রাখা জিনিসটির দিকে তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক। লিওনার্দো হাতে ধরে আছেন একটা প্রায় ইঞ্চি সাতেক লম্বা ঝকঝকে সোনালি রঙের পালক। অস্তগামী সূর্যের আলো সেই পালকের গায়ে পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে। বিহ্বল দৃষ্টিতে লিওনার্দোর মুখের দিকে তাকায় ইন্দ্র। তার ঠোঁটের কোণে খেলা করছে একটা শিশুসুলভ দুষ্টু দুষ্টু হাসি। ইন্দ্রর বিহ্বলতা অনুমান করে যেন ভারী আমোদ পেয়েছেন তিনি। ইন্দ্র কোনও কথা বলতে পারে না, শুধু বাক্রদ্ধ হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেই মায়াবী পালকটার দিকে।
