(২০) দ্য ডান্স অফ দ্য ডেভিল
নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে ডেকের ছাদে শুয়ে ছিল লিও। একরাশ উৎকণ্ঠা তাকে গ্রাস করছে আষ্টেপৃষ্ঠে। নীচের দিকের খোলা অংশে জাহাজি মাল্লারা স্থানীয় ভাষায় গান ধরেছে। তাদের মধ্যে একজন পশুর চামড়ায় তৈরি কোনও এক অজানা বাদ্যযন্ত্র একটানা একঘেয়ে সুরে বাজিয়ে চলেছে। দীর্ঘক্ষণ সেই সুর শুনতে শুনতে লিও যেন সেই সুরের বাঁধনে জড়িয়ে পড়ছে। তার চোখ বন্ধ। অচেনা ভাষা আর অজানা সুরের মৌতাত তাকে নেশাতুর করে তুলছে। লিও নিজের মনেই গুনগুন করে সেই সুর ধরেছে। তার সমস্ত উদবেগ যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে সেই সুরের মূর্ছনায়। মাথার ওপরের নিকষকালো আকাশে টিমটিমিয়ে জ্বলতে-থাকা তারারাও সেই সুরের তালে তালে নেচে নেচে উঠছে। লিওর মস্তিষ্কে হাজারো চিন্তার ঝড়। সে জানে না তারা কোথায় যাবে, কী করবে। অবশ্য এই মুহূর্তে মাঝসমুদ্রে কলার ভেলার মতো ভেসে-চলা ছোট্ট মালবাহী জাহাজের ডেকের ছাদে শুয়ে নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে সেইসব চিন্তা তার কাছে ভীষণ অযৌক্তিক মনে হচ্ছিল। লিও ধীরে ধীরে উঠে বসে। তারপর সরু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নীচে ডেকের খোলা অংশে। সেখানে তখন গানবাজনা চলেছে পূর্ণ উদ্যমে। লিও কৈশোরজীবনে খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারত, তারা শীতের সন্ধেবেলা মাঠের ধারে আগুন জ্বালিয়ে গোল করে বসত। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় মজলিশের দিকে। একটা মেয়ে গলা খুলে গাইছে। যেমন মিঠে গলা, তেমনি মিষ্টি দেখতে। মেয়েটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে লিও। গানের একটা বর্ণও লিওর বোধগম্য হয় না, তবে সেটা তার অসাধারণ সংগীতের রসাস্বাদনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। লিও একটা কাঠের থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনতে থাকে মোহিত হয়ে। গানের তালে তালে মাথা দোলাতে থাকে। একটা ছোট্ট টিমটিমে আলো জ্বলছে মাঝখানে। আর তারা পাঁচ-ছয়জন সংগীতশিল্পী সেটাকে গোল করে ঘিরে। মাঝে মাঝে পাশে কাঠের পাত্রে রাখা তরলে চুমুক দিচ্ছে। এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ। লিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর গান শেষ হয়। লিও সেই খোলা ডেকে একটা উঁচু কাঠের পিপের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। সেই মেয়েটা তখন পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে ডেকের ধারে। কাঠের রেলিং-এ কনুইয়ের ভর দিয়ে উত্তাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। লিও সেদিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসল, মেয়েটাও হাসল। লিও জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাড়ি কোথায়?”
মেয়েটা সম্ভবত লিওর কথা বুঝতে পারল না। তার দামাল চুল ঘেঁটে দিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের তুফানি হাওয়া। দু-হাতে সেই অবাধ্য চুলকে সামলাতে সামলাতে মেয়েটা অজানা ভাষায় কিছু একটা বলল লিওকে। লিও অবশ্য তার বিন্দুবিসর্গও বুঝল না। ভারী মিষ্টি গলার স্বর মেয়েটার! লিওর ইচ্ছে করছিল, তার সঙ্গে এই ডেকে দাঁড়িয়ে সারারাত গল্প করে। না-ই বা বুঝল তার ভাষা। সব সময় ভাববিনিময়ের জন্য ভাষা বোধগম্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। লিও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আবার বলল, “আমার নাম লিওনার্দো।”
মেয়েটা লিওর ভাষা না বুঝলেও এটা বুঝল যে লিওনার্দো সম্ভবত নিজের পরিচয় দিচ্ছে। সে-ও মিষ্টি হেসে নিজের বুকের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বলল “সাবা… সাবা”। লিও হাসল, সাবাও হাসতে হাসতেই আরও কিছু একটা বলল। এবারেও অবশ্য লিও কিছুই বুঝল না। সাবা দূরের ঘন কালো আকাশের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে কিছু একটা বোঝাতে চাইছিল। কিন্তু সেসবে বিন্দুমাত্র মনোযোগ ছিল না লিওর। সে একদৃষ্টে সাবার দুই চোখের জাদুতে মজে ছিল। হালকা বাদামি রঙের চোখ দুটো যেন এক অজানা মায়াকে বন্দি করে রেখেছে। তার পোশাক জরাজীর্ণ, শরীর থেকে দীর্ঘদিন মাঝসমুদ্রে বদ্ধ জাহাজের খোলে কাজ করার কারণে হালকা নোনা পূতিগন্ধ বেরোচ্ছে। দেখতেও তেমন কিছু আহামরি নয়। তবু ওই দুটো চোখ… ওই দুটো চোখে যেন পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করতে পারে। দূরের ওই উত্তাল সমুদ্রকে এক লহমায় শাস্ত করার ক্ষমতা রাখে ওই দুটো চোখ। নিলয় অলিন্দে তিরতির করে বয়ে চলা লহুস্রোতে তুফান তোলার ক্ষমতা রাখে ওই দুটো চোখ। লিও এবং সাবা নিজেদের মধ্যে কত কথাই না বলে চলে। তারা প্রাণ খুলে হাসে, কখনও উদাস হয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনও অবাস্তব অপার্থিব আলোচনায় মজে, কখনও আবার সমস্ত কথা হারিয়ে দু-জনেই চুপচাপ নিজেদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে।
রাতের বয়স বাড়ছে। আস্তে আস্তে সমস্ত জাহাজ যেন ঢলে পড়ছে মায়াবী এক নিদ্রার কবলে। লিওর কেবিনের গোল কাচের জানালাটা দিয়ে ডেকের ধারে জ্বলতে-থাকা ম্লান হলুদ এক ফালি আলো এসে পড়েছে তার বিছানায়। লিও বিছানায় আধশোয়া হয়ে পিছনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে সাবাকে তার ছোটবেলার গল্প শোনাচ্ছিল। তার পুরোনো বাড়ির গল্প, বাবা-মায়ের গল্প, ফেলে-আসা জীবনের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের গল্প। লিও জানে তার আর কোনওদিন বাড়ি ফেরা হবে না। রাজদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী সে। রাজার গোপন ষড়যন্ত্র নাইটস টেম্পলারদের কাছে ফাঁস করে দিয়েছে। এমতাবস্থায় বাড়ি ফিরলেই তার মৃত্যুদণ্ড অবধারিত। অবশ্য তার ফেলে-আসা জীবনে পিছুটান বলতে তেমন কিছু নেই। বাবা মারা গিয়েছেন বহু বছর, মা-ও দেহ রেখেছেন সম্প্রতি। শুধু তার মন খারাপ করবে বাড়ির উঠোনে একটা ছোট্ট জংলি পাইন গাছের চারাটার জন্য। গত শীতে প্রায় মুমূর্ষু চারাগাছটাকে রাস্তার পাশ থেকে তুলে এনে অতি যত্নে লালন করেছিল সে। চোখের সামনে একটু একটু করে শুকনো ক্ষয়াটে কাণ্ড চিরে সবুজ পাতা বেরোতে দেখেছিল। অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল মনটা। এইসব হাবিজাবি ঘটনাই সাবাকে শোনাচ্ছিল লিও। সাবা লিওর বুকে থুতনি রেখে তার বাদামি দু-চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল লিওর চোখের দিকে। লিওর চোখের মণি আবেগে তিরতির করে কাঁপছিল। অন্যমনস্কভাবে সাবার মাথায় হাত বোলাচ্ছিল সে। সাবার অবিন্যস্ত সোনালি চুল সমুদ্রের অশান্ত ঢেউয়ের মতো বয়ে যাচ্ছিল। তার বুক জুড়ে, ঠিক সেই সময় দরজায় ধাক্কাটা পড়ল।
উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই উদ্ভ্রান্তের মতো ঘরে ঢুকে আসে জর্জ। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “জলদি বাইরে এসো।”
লিওর উত্তরের অপেক্ষা না করেই এক ঝটকায় ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায় সে। লিও হাত বাড়িয়ে নিজের রাতপোশাকটা টেনে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসে ডেকের বারান্দায়। আর চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখে, তাতে আতঙ্কে তার সারা শরীর শীতল হয়ে যায়।
তাদের জাহাজের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অতিকায় কালো জাহাজ। জাহাজের ডেকে একদল মানুষ প্রাণভয়ে চিৎকার করতে করতে ছোটাছুটি করছে। আর হিংস্র জলদস্যুরা চওড়া শানিত তরোয়াল হাতে নির্মমভাবে একের পর এক তাদের হত্যা করে চলেছে। লিও দেখল, জর্জ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে ডেকের সিঁড়ির দিকে চলেছে। তার হাতে রক্তাক্ত তলোয়ার। একজন জলদস্যু এগিয়ে এসে অতর্কিতে জর্জকে আক্রমণ করল। জর্জ নিজের শরীরটাকে অদ্ভুত কায়দায় ডানদিকে সরিয়ে নিয়ে তার আক্রমণ প্রতিহত করল। তারপর মুহূর্তের ব্যবধানে অসামান্য গতিতে সেই জলদস্যুর পিছনে চলে এসে তরোয়ালের এক আকস্মিক আঘাতে তার ধড় থেকে মুণ্ড আলাদা করে দিল। লিও দ্রুত পায়ে জর্জকে অনুসরণ করতে থাকেন। ডেকের শেষ প্রান্ত থেকে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচে বেসমেন্টে। জর্জকে অনুসরণ করে লিও দ্রুতপায়ে নেমে আসে সেই বেসমেন্টে। পায়ের তলায় ঠান্ডা জল। অন্ধকার বেসমেন্টে তারা দু-জনে পায়ের পাতা ডোবা জলে ছলাৎছল শব্দ তুলে এগিয়ে যেতে থাকে। সিঁড়ি বেয়ে নামলে একটা লম্বা করিডর। তার দু-পাশে ছোট ছোট মালপত্র রাখার গুদামঘর। সেইরকমই একটা ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় জর্জ। লিও পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় জর্জের পাশে। সম্পূর্ণ ঘরটা একটা আবছা নীল আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। আর সেই নীল আলোয় ঘর জুড়ে-থাকা ঘন কুয়াশাও যেন নীলবর্ণ ধারণ করেছে। সেই ঘন কুয়াশায় লিওর চোখ সইতে কিছুটা সময় লাগে। আস্তে আস্তে তাঁর চোখের সামনে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করে এবং তারপরেই বিস্ময়ে আতঙ্কে লিও হতবাক হয়ে যায়। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ তার গলার কাছে এসেও দলা পাকিয়ে যায়। লিও উদ্ভ্রান্তের মতো মাথা ফিরিয়ে জর্জের দিকে তাকায়, কিন্তু জর্জের চোখে উৎকণ্ঠা বা আতঙ্ক নেই। বরং তার দু-চোখের মণিতে দৃঢ়তার ছাপ। মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে হতচকিত দৃষ্টিতে তাকায় লিও। জর্জ ঠান্ডা শান্ত গলায় বলে, “যেটা হচ্ছে তা অনিবার্য। এক অপার শক্তি নিহিত আছে এই বইয়ে। এটা ওই রক্তলোলুপ জলদস্যুদের হাতে পড়লে পৃথিবীর কী অবস্থা হতে চলেছে তা তুমি কল্পনাও করতে পারছ না। তাই এই শক্তিকে আন্দ্রে নিজের মধ্যে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
“না! এ হতে পারে না।”, লিও চিৎকার করে ওঠে, “গ্র্যান্ডমাস্টার আমাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন শুধু এই শক্তিকে রক্ষা করার, সেটাকে ব্যবহার করার নয়। আমরা এই শক্তির বাহক, ধারক নই। এ আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না।”
ততক্ষণে আস্তে আস্তে আন্দ্রের দীর্ঘ শরীরটা দুমড়ে-মুচড়ে যেতে শুরু করেছে। তাঁর পিঠের শিরদাঁড়া মড়মড় শব্দ করে ভেঙেচুরে শরীরী কাঠামোকে আবার নিজের মতো করে গড়ে নিচ্ছে। দাঁতগুলো হয়ে উঠছে অসম্ভব তীক্ষ্ণ। হাতের নখগুলো ধারালো। একটা বিকটদর্শন পশুতে যেন ধীরে ধীরে পর্যবসিত হয়ে যাচ্ছে আন্দ্রের সম্পূর্ণ শরীরটা। লিও উন্মাদের মতো চিৎকার করতে থাকে, “এ আমি কিছুতেই হতে দিতে পারি না। এই অনর্থ আমাকে ঠেকাতেই হবে।”
কিন্তু সেই ভয়ংকর প্রাণীর দিকে এগিয়ে যেতেই তার পথ রুখে দাঁড়ায় জর্জ। তার হাতে শানিত রক্তাক্ত তলোয়ার। ঘরের আবছা নীল আলোয় সেই তলোয়ারের ফলা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। দৃঢ়কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে জর্জ বলে, “ক্ষমতা থাকলে একটা পা সামনে এগিয়ে দেখাও। যা হচ্ছে তা অবশ্যম্ভাবী। নাইটস টেম্পলারদের ওপর যে অন্যায়-অবিচার চলে আসছে, তার প্রতিশোধ নেব আমরা। এতদিন পৃথিবী নাইটসদের শৌর্য, বীরত্ব এবং ধৈর্য দেখেছে। কিন্তু প্রতিহিংসা দেখেনি। যে অত্যাচারী শাসক আমাদের মাননীয় গ্র্যান্ডমাস্টারকে প্রকাশ্য দিবালোকে পশুর মতো জীবন্ত জ্বালিয়ে হত্যা করেছে, তারও ভাগ্যে সেই একই পরিণতি লেখা আছে। আমাদের এই সমূহ বিপদে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি। যারা কাপুরুষের মতো পিছন থেকে ছুরি চালিয়েছে, তারা সবাই নিজেদের অসহনীয় ভবিতব্যের জন্য তৈরি হয়ে যাক।”
লিও নিরস্ত্র। যদি বা তার হাতে তলোয়ার থাকতও, তবুও জর্জের সঙ্গে সম্মুখসমরে জয়লাভ করা তার কাছে অলীক কল্পনা। সে উদ্ভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আস্তে আস্তে সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা আন্দ্রের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। তাঁর ঝুঁকে-পড়া পিঠের দু-পাশ থেকে চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে দুটো বিশাল ডানা। আর মাথার দু-পাশ থেকে বেরিয়ে আসে বিশাল দুটো শিং। যন্ত্রণায় আন্দ্রে আর্তনাদ করতে থাকেন। তারপর একসময় ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ান। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত শয়তানি হাসি। এরপর মাথাটা ওপরের দিকে তুলে ডানা দুটোকে দু-পাশে মেলে ধরেন আন্দ্রে। সেই বিশাল ডানা ঘরের দুই প্রান্তের দেওয়াল ছুঁয়ে যায়। এইবার সেই বিশাল ডানা ঝাপটে এক ঝটকায় ভেসে ওঠেন শূন্যে। তারপর বিশাল শব্দ করে চোখের পলকে বিশাল প্রাণীটা মাথার ওপরের কাঠের ছাদ ফুঁড়ে ওপরে উঠে যায়। কাঠের ছাদ সশব্দে ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে নীচে ঝরে পড়ে জমা জলে। ভারী কাঠের টুকরো পড়ে জল ছিটকে উঠে ভিজিয়ে দেয় ওদের পোশাক। সম্পূর্ণ জাহাজটা ভারসাম্য হারিয়ে ভীষণভাবে দুলতে থাকে।
লিও শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ে ঘরের কোণে। জর্জ কিন্তু নির্বিকার। সে ধীর পায়ে বেরিয়ে যায় খোলা দরজা দিয়ে। মুহূর্তকাল পরেই তার পদশব্দ মিলিয়ে যায় দূরের সিঁড়িতে। লিও দ্যাখে তার ঠিক সামনে খোলা ট্রাঙ্কের ভিতর খোলা সেই অভিশপ্ত পুথি, আর তার পাশে লাল কাপড়ে মোড়া ছোট্ট কিছু একটা।
লিও কয়েকমুহূর্ত হতচকিত হয়ে বসে থাকে সেখানে। তারপর উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়োতে থাকে সিঁড়ির দিকে। দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে ডেকের খোলা অংশে এসে দাঁড়ায়। সেখানে তখন চলছে এক অমানবিক নাটকীয় হত্যালীলা। সেই ভয়ালদর্শন প্রাণীটা নিজের বিশাল দুটো ডানা মেলে শূন্যে ভাসছে। তার প্রকাণ্ড ছায়া পুরো জাহাজ ঢেকে দিয়েছে। নীচের ডেকে সবাই দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করছে। নীচ থেকে নিক্ষেপিত তিরের ইস্পাতের ফলা তার বিশাল ডানায় লেগে খড়কুটোর মতো ছিটকে যাচ্ছে। তারপরই চোখের পলক ফেলার আগেই তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে প্রাণবন্ত শরীর। ঘন চ্যাটচেটে রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে ডেকের কাঠের মেঝে। জলদস্যু, জাহাজি মাল্লা, স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে সেই হিংস্র শয়তানের আক্রোশে। লিওর পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। তারা যেন অকস্মাৎ তার শরীরের ওজন বহন করতে অস্বীকার করছে। লিও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেই ধ্বংসলীলা দেখতে থাকে অসহায়ভাবে। মাথার ওপরের পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ এখন ঢেকে গেছে ঘন কালো মেঘে। সেই মেঘ চিরে সরু ফালির মতো বিদ্যুতের ঝলক বারবার জাহাজের সেই অভিশপ্ত ডেকটাকে আলোকিত করে দিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র হয়ে উঠেছে অশান্ত। প্রবল জলোচ্ছ্বাস এলোমেলো করে দিচ্ছে জাহাজের মাস্তুল। লিওর কানে তখন শুধুই নিরস্ত্র নিরুপায় মানুষদের আকুতি। সেই ভয়াবহ হত্যালীলায় যোগ দিয়েছে জর্জও। সে তার ধারালো অস্ত্রের আঘাতে যন্ত্রচালিত বিভীষিকার মতো নিয়ে চলেছে একের পর এক প্রাণ। হঠাৎ লিওর নজর পড়ল সাবার দিকে। সে লিওর কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে লিওর দিকে তাকিয়ে। সেদিকে চোখ পড়তেই লিও চিৎকার করে সাবাকে সাবধান করতে গেল, কিন্তু লিওর গলা থেকে কোনও আওয়াজ ফুটে বেরোনোর আগেই জর্জের উদ্যত অস্ত্রের আচমকা আক্রমণে সাবার শরীর থেকে মুহূর্তে আলাদা হয়ে গেল মাথাটা। রক্তাক্ত কাঠের ডেকের মেঝেতে গড়াতে গড়াতে সেটা এসে থামল লিওর পায়ের সামনে। তখনও সাবার দু-চোখ খোলা। মোহময়ী সেই দৃষ্টি নিয়ে তার খণ্ডিত মুণ্ড একদৃষ্টে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে লিওর দিকে। লিও চিৎকার করে হাঁটু মুড়ে অসহায়ের মতো মেঝেতে বসে পড়ে। তার দিকে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখে জর্জ। বলে, “যুদ্ধের সময় বৃহত্তর ছবির দিকে তাকাতে হবে, লিও। বিশ্ব জুড়ে আরও একটা ক্রুসেড আসছে। ধরে নাও সেই মহান উদ্দেশ্যেই এই মানুষগুলো নিজেদের প্রাণ বলিদান দিয়ে শহিদ হয়েছে। তুমি ভাবতেও পারছ না আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। পৃথিবীতে আর কোনও চার্চ থাকবে না, কোনও রাজসিংহাসন থাকবে না। দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই হবে না, কারণ পৃথিবীতে দুটো ভিন্ন দেশই থাকবে না। আমরা নাইটস টেম্পলাররা সারা পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলব। পৃথিবীতে দলাদলি, যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসা সবকিছু শেষ হয়ে আবার অমোঘ শান্তি নেমে আসবে। কোনও কিছুকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে গেলে প্রথমে তার ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়াটাই রেওয়াজ। আমরা এই ভাঙাচোরা পৃথিবীকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে এক অনন্যসুন্দর আদর্শ সাম্রাজ্য স্থাপন করব।”
সেই বিকটদর্শন প্রাণী ততক্ষণে রক্তাক্ত মাটিতে নেমে এসেছে। সমগ্র জাহাজে তারা তিনজন ছাড়া আর কোনও প্রাণের স্পন্দন নেই। লিও জর্জের চোখে চোখ রেখে বলে, “সেরকম আদর্শ পৃথিবী দেখার জন্য আমি বাঁচতে চাই না। আমায় মেরে ফেলো।”
ততক্ষণে সাক্ষাৎ শয়তানরূপী আন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছেন লিওর সামনে। লিও তখনও দুই হাঁটু ভাঁজ করে মেঝেতে বসে। মাথা ঝুঁকে আছে বুকের ওপর। মেঝেতে তখনও লাল চটচটে রক্তের পরত। কিছু জায়গায় সে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে-বাদামি বর্ণ ধারণ করেছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে লিওর সামনে দাঁড়ায় সেই করালদর্শন যমদূত। তারপর তার তীক্ষ্ণ বাঁকানো নখযুক্ত আঙুলগুলো আস্তে আস্তে বোলাতে থাকে লিওর গলার কাছে। লিও নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে অন্তিম আঘাতের। ঠিক সেই মুহূর্তে দুটো বিশাল ডানার ছায়া ওদের মাথার ওপরে গর্জে-ওঠা বিদ্যুতের আলোকে ঢেকে দেয়। অবাক দৃষ্টিতে মাথা তুলে সেদিকে তাকানয় লিও। তাঁর দু-চোখ ঝলসে যায় উজ্জ্বল সোনালি আভায়।
