(১৯) মৃত্যুসৈকতে
একটানা শোঁ শোঁ হাওয়ার শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেল ইন্দ্রর। শরীরের নীচে নরম বালি রোদের তাপে উষ্ণ হয়ে আছে। সেই বালির ওপর শুয়ে থাকতে অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে, বালিগুলো সরে সরে গিয়ে ক্ষুধার্ত অজগরের মতো তার গোটা শরীরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে একটু একটু করে গ্রাস করছে। সেই বালির নরম বিছানায় সে যেন ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে। নিজের চৈতন্য ফিরে পেয়ে ইন্দ্ৰ চমকে উঠে বসে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে। সে অনেকক্ষণ একইভাবে চুপচাপ বসে থেকেও মনে করতে পারে না কীভাবে এখানে এল, এই জায়গাটাই বা কোথায়! মাথার মধ্যে যেন ফাঁকা লাগছে। মস্তিষ্কের ভিতর চিন্তার স্রোত জট পাকিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে যেন হাজার বছর ঘুমিয়ে সবে ঘুম থেকে উঠল। হাত-পা ভারী মনে হচ্ছে, চোয়ালে অসহ্য ব্যথা। মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে চোখ বোলায় সে। ধু ধু বালি, আর মাঝে মাঝে সেই বালির মধ্যে থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে-থাকা চ্যাপটা, খাটো, লালচে পাথরের টিলা। এ ছাড়া আর কোথাও কিচ্ছু নেই। অদ্ভুত এক শূন্যতার মাঝে সম্পূর্ণ একা বসে আছে সে। এটা কি কোনও দ্বীপ, নাকি মরুভূমি? দূরদূরান্ত অব্দি জনবসতির চিহ্নমাত্র নেই। মনে হচ্ছে, এই বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে বিগত সহস্র বছরে আর কোনও জীবিত মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি। কিন্তু সে এখানে কীভাবে পৌঁছোল?
গত রাতের স্মৃতিটুকু অব্দি ফিকে হয়ে গিয়েছে তার মস্তিষ্ক থেকে। তাহলে কি লিওনার্দো তাকে এখানে এনে ফেললেন! সে একটু শঙ্কিত গলায় লিওনার্দোর নাম ধরে ডাকতে থাকে। কিন্তু কোনও সাড়া নেই। ইন্দ্রর হঠাৎ নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগতে শুরু করে। গলা শুকিয়ে আসে। নিজের হৃৎস্পন্দন নিজেই শুনতে পাচ্ছে সে। মাথা ঘেঁটে গিয়েছে। কী করা উচিত, কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। এরপর ধীরে ধীরে টলোমলো পদক্ষেপে সামনের দিকে পা বাড়ায় সে। কিছুটা আসতেই দূর থেকে কানে আসে ঢেউয়ের অস্পষ্ট মৃদু শব্দ। সেই শব্দ শুনে ইন্দ্র বুঝতে পারে যে, কাছাকাছি কোথাও সমুদ্র রয়েছে। ছুটে যায় সেদিকে। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা পায় সেই উত্তাল সমুদ্রের। সে সমুদ্রের না-আছে কোনও শুরু, না আছে কোনও শেষ। যত দূর চোখ যায় আকাশচুম্বী বিশাল বিশাল ঢেউ। সাদা ফেনিল জলরাশি দূরের দিগন্তে নীল আকাশের সঙ্গে বিলীন হয়ে গিয়েছে। আর সেই দিগন্ত থেকে ছুটে-আসা ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসছে একটা সোঁদা গন্ধ। সেই কটু গন্ধে চারদিকের পরিবেশ অদ্ভুত থমথমে হয়ে রয়েছে। ইন্দ্র এগিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রের জল এগিয়ে এসে তার পা ধুয়ে দিয়ে যায়। ঠান্ডা জলের স্পর্শে একটা অদ্ভুত ঝিম-ধরানো অনুভূতি আসছে। মনের মধ্যে জমে-ওঠা শঙ্কার বালির দুর্গটা এই শীতল ঢেউয়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়ছে। মনটা পালকের মতো ফুরফুরে লাগছে। মনে হচ্ছে এটাই গন্তব্য। এটাই পরম শান্তি। জাগতিক সব লোভ, আকাঙ্ক্ষা সব তুচ্ছ এই দিগন্তব্যাপী সমুদ্রের সামনে।
ইন্দ্ৰ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করে। সূর্যের প্রখর রোদে ঝলসে যাচ্ছে সাদা বালিয়াড়ি। তার পোশাক ঘামে ভিজে উঠেছে। কয়েকটা মাছি ভনভনিয়ে তার পিছু নিয়েছে। সে যতই এগিয়ে যাচ্ছে, তারাও অক্লান্তভাবে তার পাশে পাশে উড়ছে বৃত্তের মতো। যেন অপেক্ষা করছে, কখন ইন্দ্র ক্লান্তির কাছে হার স্বীকার করে সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে পায়ের নীচের গরম বালিতে। তারপর তার চামড়া, অস্থি, মজ্জা সব পচে-গলে মিশে যাবে এই অভিশপ্ত সমুদ্রতটে। তারপর তার শরীরী কাঠামোর ধ্বংসাবশেষে নিজেদের নতুন রাজত্ব গড়ে তুলবে ওই মাছিগুলো। এভাবে কতটা পথ সে পেরিয়ে এসেছে, তা সে নিজেও জানে না। শুধু মাঝে মাঝে জাহাজের ভাঙা টুকরো, মৃত সামুদ্রিক প্রাণীদের কঙ্কাল আর বিস্তীর্ণ বাদাভূমি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। খানিকটা দূরে দূরে ঘোলা কাদাজল জমে আছে বালির খাঁজে খাঁজে। মনে হচ্ছে, সেই ঘন কালো তরল যেন টগবগ করে ফুটছে। মাটির নীচ থেকে হাওয়ার বুদ ভেসে উঠছে ওপরের দিকে, তারপর পৃষ্ঠতলে পৌঁছে একটা অদ্ভুত শব্দ করে ফেটে যাচ্ছে। চারপাশের সেই চরম নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই একটানা একঘেয়ে বুদ্বুদ ফাটার শব্দ যেন অভিশপ্ত শোনাচ্ছে।
দূরে একটা বিশাল ঝাঁকড়া গাছের অবয়ব দেখতে পেয়ে সেদিকে ছুটে যায় ইন্দ্র। গাছের পাতা সব ঝরে পড়ছে। কালচে-বাদামি গাছের কঙ্কালটা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একা। সমুদ্রের দামাল হাওয়া বারবার তাকে সমূলে ছিটকে ফেলতে চাইছে। মড়মড় ধ্বনি উঠছে বাতাসে। সে দ্যাখে গাছের গায়ে অবিকল একজন মানুষের অবয়ব খোদাই করা। তবে তা মানুষের হাতের কাজ নয়। যেন প্রকৃতি নিজের খেয়ালে গাছের এবড়োখেবড়ো কাণ্ডের খাঁজে খাঁজে একটা মানুষের কাঠামো গড়ে নিয়েছে যত্নে। নিখুঁত চোখ-নাক-ঠোঁট। দুটো হাত মাথার ওপর থেকে অজস্র ডালপালায় বিলীন হয়ে গেছে। শুধু মানুষটার পেটের কাছে একটা গভীর কোটর। শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ সেই গর্তের গভীরে পৌঁছোচ্ছে না। ইন্দ্র পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সেই গাছের সামনে। কী মনে হতে আস্তে আস্তে তার ডান হাতটা বাড়িয়ে ধরে সামনে। কোটরের দিকে একটু একটু করে আঙুলগুলো এগিয়ে নিয়ে যায়। হঠাৎ সেই অন্ধকার কোটর থেকে একটা হাত বাড়িয়ে আসে চোখের পলকে। ইন্দ্রর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটা তার দিকে হাত বাড়ায়। সে চিৎকার করে পিছিয়ে আসে কয়েক পা। ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ে দূরে।
আর ঠিক তখনই ঘুমটা ভেঙে যায় ইন্দ্রর। অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠে বসে বিছানায়। ঘামে বিছানা ভিজে গেছে। গলা শুকিয়ে আসছে। হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে-রাখা টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিতে যায়, ঠিক তখনই চোখ পড়ে জিনিসটার ওপর। লিওনার্দোর দেওয়া সেই সোনালি পালকটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল। ইন্দ্র দেখল, সেটা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। সে হাত বাড়িয়ে পালকটা হাতে তুলে নেয়। সামান্য উষ্ণ পালকটা উজ্জ্বল সোনালি দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ইন্দ্রর মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। চোখের সামনে সবকিছু কেমন দুলে দুলে ওঠে। চোখের সামনে ছেঁড়া-ছেঁড়া দৃশ্য ভেসে ওঠে। যেন টুকরো টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্বপ্নের কোলাজ। বিশাল উঁচু একটা পাহাড়ের চূড়ায় সে দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর নীল আকাশ জুড়ে একটা বিশাল ছায়া নেমে আসছে। ইন্দ্র মাথা তুলে তাকায়। মাথার উপর গনগনে সূর্য ঢাকা পড়েছে অতিকায় দুটো ডানার আড়ালে। সেই ডানার সোনালি পালকে সূর্যরশ্মি পড়ে পিছলে যাচ্ছে চারদিকে। একটা তীক্ষ্ণ অথচ গম্ভীর ডাকে সংবিৎ ফেরে ইন্দ্রর। তার চোখের সামনের সেই দৃশ্য মুছে গিয়ে এখন শুধু জমাট-বাঁধা অন্ধকার। বাইরে একটানা ঝিঁঝির ডাক। ইন্দ্রর হাতে ধরা সোনালি পালক আস্তে আস্তে নিজের ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে। এরপর সেটা ফ্যাকাশে কালো হয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো ধুলোর মতো ইন্দ্রর হাতের তালুতে ঝরে পড়ে। পিছনের জানালা দিয়ে বয়ে-আসা দমকা বাতাস সেই ধুলোকে নিমেষে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
