(৮) কুছ তো লোগ কহেঙ্গে

(৮) কুছ তো লোগ কহেঙ্গে

“কিছু মনে করবেন না। আপনাকে আমাদের অর্গানাইজেশন এবং আমাদের নেক্সট কোর্স অফ অ্যাকশন, মানে আমাদের প্ল্যান সম্পর্কে অনেক সেনসিটিভ ইনফর্মেশন প্রোভাইড করা হবে। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড অবশ্য রিসার্চ করা হয়েছে আগেই। তার পরেও আমাদের সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে হয় যে, আপনি কোনওভাবে পুলিশ অথবা শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুক্ত কি না। তাই ওটা আপনার জব ইন্টারভিউ হিসাবে ধরতে পারেন। আর হাতের ব্যান্ডেজটা আজ বিকেলেই খুলে দেওয়া হবে। আপনার হাতের চামড়ার নীচে একটা ছোট্ট মাইক্রোচিপ বসানো হয়েছে। ক্ষতস্থান শুকিয়ে গেলে ওখানে একটা ট্যাটু করিয়ে দাগটা ঢেকে দেওয়া হবে। আমাদের সবার ক্ষেত্রেই এটা ম্যান্ডেটরি বলতে পারেন।”

কথা শেষ করে জামার হাতা গুটিয়ে একটা ট্যাটু দেখাল লোকটা; বারকোড। ইন্দ্রর মনে পড়ল, কাল সেই মেয়েটার হাতেও ঠিক এইরকমই একটা ট্যাটু দেখেছিল। হাতা নামিয়ে নিয়ে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলেন মিস্টার আলফা। একটু আগে এই নামেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। উচ্চতা নিদেনপক্ষে ছ-ফুট। পেটানো চেহারা। বয়স চল্লিশের ঘরে। লম্বা ঘাড় ছাপানো চুল, চোখে রিমলেস চশমা। পরনে চারকোল রঙের সামারসুট। নিখুঁতভাবে ট্রিম করা দাড়ি, চেহারায় একটা অদ্ভুত আভিজাত্য বর্তমান। ইন্দ্ৰ শুয়ে রয়েছে তিনতলায় তার সেই ঘরে। বাম হাতে কবজি থেকে কনুই অব্দি ব্যান্ডেজ। এখনও শরীরে দুর্বলতা আর মুখের ভিতর তেতো স্বাদটা থেকে গিয়েছে। পিঠের নীচে একটা বালিশ। পাশের টেবিলে এক পাতা প্যারাসিটামল আর ঢাকা-দেওয়া কাচের গ্লাসে জল। জ্বর এসেছিল রাতে। এটা নাকি স্কোপলামাইনের কমন সাইড এফেক্ট।

পুলিশ অথবা শত্রুপক্ষ? মানে পুলিশ শত্রুপক্ষ নয়?” মুচকি হেসে বলল ইন্দ্ৰ।

হো হো করে হেসে উঠলেন মিস্টার আলফা। ইন্দ্রর ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে-থাকা শ্লেষ তার দৃষ্টি এড়ায়নি।

“পুলিশ আমাদের শত্রু বা বন্ধু কোনওটাই নয়। কারণ পুলিশের কাছে আমাদের কোনও অস্তিত্বই নেই। তাই তারা আমাদের অপারেশনে বাধা দিতে আসে না। আমরাও তাদের নিয়ে মাথা ঘামাই না। এক অদৃশ্য শান্তিচুক্তি বলতে পারেন।” কথা শেষ করে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনীর আলতো টোকায় সেটাকে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে টেবিলের পাশ থেকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে ইন্দ্রর বিছানার পাশে এসে বসলেন। তারপর ইন্দ্রর চোখে চোখ রেখে বললেন, “আজ সারাদিন রেস্ট নিন। ঠিক বিকেল পাঁচটায় কনফারেন্স রুমে চলে আসুন।” তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বললেন, “ওহ হ্যাঁ, ওয়েলকাম টু আওয়ার টিম।”

কনফারেন্স রুমে একটাই মাত্র বড় জানালা, তাতে ভারী পর্দা টাঙানো। ঘর সবসময়ই প্রায় অন্ধকার হয়ে থাকে। আজ প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল ইন্দ্ৰ এখানে এসেছে। টিমের সকলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ইতিমধ্যেই। লম্বা টেবিলের একপ্রান্তে বসে আলফা। ঘরে ইন্দ্রকে ছেড়ে আরও চারজন। প্রথমজন আলফা, এই টিমের লিডার বা মাথা। এখানে কেউ কারও নাম ধরে ডাকে না। তার প্রাথমিক কারণ হল, কখনও ফোন ট্যাপ হলে যাতে আসল নাম শত্রুপক্ষের কাছে না পৌঁছোয়। কোনও অপারেশনের প্ল্যানিং-এর পিছনে মস্তিষ্ক থাকে আলফার। অসম্ভব ক্ষুরধার এই লোকটার ব্যাপারে টিমের কেউ কিচ্ছু জানে না। কোথায় জন্ম, আসল নাম, আগের পেশা – কিচ্ছু না। তবে অনেক রটনা শুনতে পাওয়া যায় ওঁকে নিয়ে। কেউ বলে, উনি নাকি ‘র’-এর একজন সর্বকালের সেরা এজেন্ট ছিলেন। হঠাৎ কোনও এক অজানা কারণে খুব গোপনীয় কোনও মিশনের মাঝেই বেপাত্তা হয়ে যান। আবার কেউ কেউ। বলে উনি নাকি ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও রাশিয়ায় বাস করতেন। পেশায়। ছিলেন সাধারণ স্কুলশিক্ষক। একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় দুর্ভাগ্যবশত ইউক্রেনিয়ান গ্যাং-ওয়ারের মাঝে পড়ে প্রাণ হারায় ওঁর স্ত্রী। পরের এক মাসের মধ্যে সেই গ্যাং-এর তেত্রিশজনকে হত্যা করে অবশেষে ভারতে ফিরে আসেন আলফা। দুনিয়ার প্রায় সব অস্ত্র হাতে সমান সাবলীল এবং যে কোনওরকম বন্দুক বা বিস্ফোরকের ব্যাপারে অগাধ জ্ঞানের মালিক এই লোকটার সম্বন্ধে কথা বলার সময় এক বিকেলে মিস্টার পাই বলেছিলেন, ‘তুমি প্যান্ডোরার বক্সের নাম শুনেছেন তো ইন্দ্র? আলফার অতীত হল সেই নিষিদ্ধ বাক্স। যতক্ষণ না খুলছ, ততক্ষণই তুমি নিরাপদ।’ তবে ইন্দ্র এই কয়েকদিনে যা বুঝেছে তা হল লোকটা আপাতভাবে অসম্ভব ধীর, স্থির, বিনয়ী হলেও টিমের বাকি সবাই তাঁকে সাক্ষাৎ ইবলিশের মতো সমঝে চলে।

আলফার ঠিক ডানদিকে বসে যে মেয়েটা মোবাইল ঘাঁটছে, সে বিটা। এই মেয়েটাকেই সেদিন দেখেছিল ইন্দ্র। মিকি মাউসের মুখ-আঁকা কালো টপ, নীচে ঢোলা পায়জামা। গলায় আজও একটা লাল আর সাদা স্ট্রাইপড সিল্কের কলার, গলার সামনে এসে একটা বাটারফ্লাই নট। একটা পা ভাঁজ করে চেয়ারের ওপর তোলা, ঘাড় ছোঁয়া কোঁচকানো চুল, কানে হেডফোন। আগের দিন যেটা খেয়াল করেনি, সেটা হল মেয়েটার বাম হাতের অনামিকা অর্ধেক কাটা। মাত্র তেরো বছর বয়সে বিশ্বের অন্যতম বড় ই-কমার্স সাইট হ্যাক করেছিল। হ্যাকিং-এর দুনিয়ার ফ্রিদা পিন্টো। মাত্র বাইশ বছর বয়সি এই মেয়েটার আঙুল যখন কিবোর্ডের উপর খেলা করে বেড়ায়, হ্যাকিং-এর অ-আ-ক-খ না-জানা ইন্দ্রও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। যেন চোখের সামনে একটা অপূর্ব সুন্দর পেন্টিং একটু একটু করে আঁকা হচ্ছে। যেমন মেয়েটার আঙুল চলে তেমনই মুখ। শুধু খাওয়া আর ঘুমোনোর সময়টুকু ছাড়া সর্বক্ষণ বকেই চলেছে।

টেবিলের একদম শেষ কোণে যে লোকটা একমনে দাঁত দিয়ে নখ কাটছেন, তার কোডনেম গামা। এই লোকটাই ইন্দ্ৰকে ইনজেকশন দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। লোকটার ব্যাপারে ইন্দ্র যতটুকু শুনেছে, ইনি একসময় আর্মির সার্জেন ছিলেন। জব্বলপুরে পোস্টেড থাকার সময় আশপাশের গ্রামবাসীরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসায় এক্সপেরিমেন্টাল ননঅ্যাপ্রুভ্স ড্রাগ ব্যবহার করতেন তিনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা বেঁচে গেলেও একসময় ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। এবং তার লাইসেন্সও বাতিল করা হয়। অসম্ভবরকম শান্ত চুপচাপ লোকটার সংস্পর্শে এলেই কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হয় ইন্দ্রর। চোখের চাহনি যেমন নির্লিপ্ত, তেমনই স্থির চোখের মণি। খুব বদমেজাজি মানুষকেও ইন্দ্রর ততটা ভয় লাগে না, যতটা এইরকম মিতভাষী নির্লিপ্ত দৃষ্টির মানুষদের লাগে।

ইন্দ্র এবং বিটার মাঝে বসে মিস্টার পাই। এখানে আসার পর মিস্টার পাইয়ের সম্বন্ধে যেটুকু জানতে পেরেছে তা অনুযায়ী আলফার অনুপস্থিতিতে টিমের ইন-চার্জ ইনিই। অসম্ভব বুদ্ধিমান এবং আশ্চর্যরকম উপস্থিতবুদ্ধির অধিকারী এই মানুষটা যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে টিমের সদস্যদের অক্ষত উদ্ধার করে নিয়ে আসতে সক্ষম। তুখোড় ছদ্মবেশধারণের ক্ষমতা, ফ্রি হ্যান্ড কমব্যাটে অসম্ভব দক্ষতার অধিকারী এই লোকটা টিমকে বিপদের সময় একাই আগলে রাখার ক্ষমতা রাখে।

ঘরের পঞ্চম এবং শেষ ব্যক্তি হল ডেল্টা, ওরফে ইন্দ্র নিজে। ইন্দ্রর ডক্টরেট এবং পোস্ট ডক্টরেটের বিষয় ছিল ওয়েস্টার্ন হিস্টোরিক্যাল আর্টিফ্যাক্ট। সেই বিষয়ে তার প্রজ্ঞাও রয়েছে যথেষ্ট। আগামী অপারেশনে তার সেই প্ৰজ্ঞা নাকি বিশেষ প্রয়োজনীয়। অবশ্য কী সেই অপারেশন তা এখনও খোলসা করেননি আলফা। এই কয়েকদিন রোজ তার ট্রেনিং চলছে। জিম, সেল্ফ ডিফেন্স, বন্দুকচালনা। আলফা নিজে টিম মেম্বারদের ট্রেনিং দেন।

তবে এই সাত দিনে একটা ব্যাপার একেবারেই খোলসা করেননি টিমের কেউই। সেটা হল এদের কাজের ধরন। ইন্দ্র বারবার জিজ্ঞাসা করেও উত্তর পায়নি। তবে অনায়াসেই অনুমান করতে পারছে যে পুরো ব্যাপারটাই অত্যন্ত গোপনীয়। বাড়ির চারদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা, সমস্ত ঘরের প্রত্যেকটা জানালা ভারী পর্দা দিয়ে ঢাকা। টিমের মধ্যে কেউ-না-কেউ পালা করে ওই সিসিটিভি-র লাইফ ফুটেজে চোখ রাখে। ঘর থেকে বেরোনো বা ঢোকার সময় পনেরো মিনিট আগেপিছে ভালো করে ফুটেজ চেক করা হয়। এমনকি বাইরে থেকে কেউ ঢুকলে, এমনকি আলফা নিজে ঢুকলেও তাকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

*

“লেদার জ্যাকেট লিজিয়ে, লেদার জ্যাকেট। বড়িয়া কোয়ালিটি কা লেদার জ্যাকেট।” দিল্লিতে এর আগে একবার এলেও পালিকা বাজারে আসা হয়ে ওঠেনি ইন্দ্রর। মাটির তলায় এত বড় একটা বাজার দেখে সে বেশ অবাকই হয়েছিল। মিস্টার পাই তাকে আজ এখানে নিয়ে এসেছেন। আজ শেষ বিকেলে নিজের ঘরে চুপচাপ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল ইন্দ্র। দূরে উঁচু উঁচু বিল্ডিং-এর পিছনে লাল থালার মতো বড় সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সারা আকাশটা যেন একটা বিশাল সোনালি ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসে সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ যেন কেউ এঁকে দিয়েছে নিপুণ হাতে। অস্তগামী সূর্যের সোনালি আলোর প্রতিফলন এসে পড়েছিল ইন্দ্রর সামনের জানালার রঙিন কাচে। ইন্দ্রর ঘরের দু-দিকে দুটো জানালা থাকলেও এই জানালাটা ইন্দ্রর বেশি পছন্দ, কারণ জানালার পরেই একটা বিশাল মাঠ। সেই মাঠের শেষে উঁচু হাইরাইজ বিল্ডিং দেখা যায়। এই জানালাটার সামনে মাঠ থাকায় সেদিক থেকে একটা ফুরফুরে হাওয়া ঢোকে মাঝে মাঝে। আর উলটোদিকের অন্য জানালাটা জুড়ে শুধু সংলগ্ন বাড়ির দেওয়াল ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। তাই ওই জানালাটা দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধই রাখে ইন্দ্র। এইদিকের জানালার সামনের মাঠে বিকেল হলেই একদল বাচ্চা আসে ক্রিকেট খেলতে। ইট দিয়ে বানানো উইকেট, প্লাস্টিকের হালকা বল, চটি দিয়ে বানানো বোলিং স্টাম্প। দীর্ঘদিন ওদের খেলা দেখতে দেখতে তাদের খেলার নিয়মকানুন ও বেশ বুঝে গেছে ইন্দ্র। ওই যে দূরে কমলা রঙের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে, ওই বাড়ির পাঁচিলে এক ড্রপে বল লাগলে আউট। কিন্তু ডানদিকের সাদা বাড়িটার পাঁচিলে বল লাগলে বা পাঁচিলের ওপারে বল পড়লেও ছয়। ইন্দ্ৰ মনে মনে হাসে। সম্ভবত ওই কমলা রঙের বাড়িটার মালিক বাড়িতে বল গেলে আর দিতে চান না। সেই কারণেই এমন অদ্ভুত নিয়ম। সেদিনও একমনে বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলা দেখছিল ইন্দ্ৰ। কোনও একটা সামান্য বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেছে। খুব সম্ভবত রান আউট হয়েছে কেউ, কিন্তু অ্যাম্পায়ার সাহেব তা মানতে চাননি। এখন সেই অ্যাম্পায়ার ব্যাটিং সাইডের মেম্বার হওয়ায় তাঁকে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্ত করছে বিপক্ষ দল, সেই নিয়েই গন্ডগোল।

ওই দূরে মাঠ ছাড়িয়ে যে দিক্‌চক্রবাল দেখা যাচ্ছে, সেদিক থেকে একটা মন ভালো করা হাওয়া বইছে। তাতে তিরতির করে কাঁপছে জানালার পাশের সুপারি গাছের পাতাগুলো। সেই অবাধ্য দামাল হাওয়া ওই জানালা দিয়ে অনধিকার প্রবেশ করে ইন্দ্রর চুল ঘেঁটে দিয়ে যাচ্ছে। ইন্দ্র চোখ বুজে মাথাটা সামান্য উঁচু করে জানালার পাল্লায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। শীতল হাওয়া তার মুখের প্রত্যেকটা লোমকূপকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সেই স্পর্শে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছিল ইন্দ্র, ওই ঝোড়ো হাওয়াটায় যেন একটা অচেনা ভালো-লাগার আবেশ লুকিয়ে আছে। দূরে বাচ্চাদের কলকাকলি শোনা যাচ্ছে। ঠিক এমন সময় দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল। ইন্দ্র চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে দেখে, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার পাই। তার চোখে চোখ পড়তেই তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর হালকা চালে বললেন, “ব্যাপার কী? কবি হয়ে গেলে নাকি হে? জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে প্রকৃতি অনুভব করছ নাকি?”

ইন্দ্র সে কথার উত্তর না দিয়ে মৃদু হেসে তাঁকে চোখের ইশারায় বিছানার পাশের সেই চেয়ারটা দেখিয়ে দেয়। তারপর এগিয়ে এসে নিজে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে। মিস্টার পাই ঘরে ঢুকে চেয়ারটায় বসে ইন্দ্রর উদ্দেশে বলেন, “তোমাকে কিন্তু কেউ এখানে বন্দি করে রাখেনি। ইচ্ছা হলে মাঝে মাঝে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে পারো। সারাদিন এমন বন্ধ ঘরে নিজেকে বন্দি বানিয়ে রেখেছ কেন?”

ইন্দ্র মৃদু হাসে। তারপর বলে, “কোথায় আর যাব?”

“কোথায় যাব মানে? এত বড় শহরে কি যাওয়ার জায়গার অভাব? চলো, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। আমরা বেরোব।”

ইন্দ্র আপত্তি করতে গিয়েও করে না। সামনের আলমারিটা খুলে একটা শার্ট বের করে চেঞ্জ করে নেয়। দিল্লির আবহাওয়া বড় অদ্ভুত। দুপুরবেলা মারাত্মক গরম। কিন্তু যেই সূর্য অস্ত যায়, একটা হালকা ফিনফিনে ঠান্ডা যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে পুরো শহরটাকে। তখন গায়ে একটা কিছু না চাপালে হওয়া বইলে সারা শরীর শিরশির করে ওঠে। একটা হালকা জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে নিয়ে মিস্টার পাইয়ের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ইন্দ্র। মিস্টার পাই আগে কনট্রোল রুমে যান, সেখানে তখন সিসিটিভি-র ফুটেজ মনিটরিং-এর দায়িত্বে রয়েছে বিটা। মিস্টার পাই চোখের ইশারায় তার থেকে বেরোনোর ক্লিয়ারেন্স চান। বিটা একমনে মোবাইলে গেম খেলতে খেলতে মনিটরে নজর রাখছিল, আর একটা চুয়িং গাম চিবোচ্ছিল। তাদের বেরোতে দেখে মিস্টার পাইয়ের দিকে তাকিয়ে চুয়িং গামটা ফুলিয়ে আদুরে স্বরে বলে  ওঠে, “এই, তোমরা কোথায় ঘুরতে যাচ্ছ? আমিও যাব।”

মিস্টার পাই মুচকি হেসে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে ইঙ্গিত করেন। বিটা হতাশভাবে মাথা নেড়ে ঠোঁট ওলটায়। এখনও প্রায় ঘণ্টা দেড়েক দেরি তার শিট শেষ হতে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে সরু গলি ধরে খানিকটা এগিয়ে এসে একটা মোড় ঘুরেই বড়রাস্তা। বড়রাস্তার মুখে একটা মাঝারি সাইজের মুদির দোকান। সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে উবের বুক করলেন মিস্টার পাই।

শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে মাটির তলায় যে এত বড় একটা বাজার রয়েছে, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। বেল্ট, ব্যাগ, জুতো থেকে শুরু করে লেদারের জ্যাকেট বা ইলেকট্রনিক্স জিনিস, কী নেই! ঘুরে ঘুরে দোকানগুলোতে সাজানো জিনিস দেখছিল ইন্দ্র। একটা দোকানের সামনে ঝোলানো লেদার জ্যাকেটের গায়ে হাত বোলাচ্ছিল, এমন সময় ইশারায় তাকে ডাকলেন মিস্টার পাই। মিস্টার পাইকে অনুসরণ করে আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। দোকানদার তাদেরকে দেখেই কেজো সেলসম্যানের সুরে বলে উঠল, “লেদার জ্যাকেট… লেদার জ্যাকেট… বড়িয়া কোয়ালিটি মিলেগা ভাই।”

মিস্টার পাই নির্বিকার ঠান্ডা গলায় বললেন, “হাঁ, ওহ্ ওয়ালা দিজিয়ে তো। জো পিছলে দিন দেখকে গয়ে থে।”

লোকটা মিস্টার পাইয়ের চোখে চোখ রেখে মাথাটা একটু উপরে-নীচে নাড়িয়ে একটা ইঙ্গিত করল। তারপর ধীরপায়ে চলে গেল দোকানের ভিতর। প্রায় মিনিটখানেক বাদে যখন বেরিয়ে এল তখন তার হাতে ধরা একটা লাল রঙের প্লাস্টিকের প্যাকেট। সেটা মিস্টার পাই হাত বাড়িয়ে নিজের হাতে নিয়ে ইন্দ্রকে ধরতে দিলেন। বেশ ভারী। প্যাকেটটা সামান্য ফাঁক করে ইন্দ্র ভিতরে দেখল। ভিতরে গাঢ় নীল রঙের বেশ কয়েকটা পোশাক। কিন্তু সেগুলো লেদারের জ্যাকেট মোটেও নয়। বরং কেমন যেন রবারের পোশাক গোছের কিছু। ইন্দ্র মিস্টার পাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় প্যাকেটটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতেই মিস্টার পাই ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন, “তিষ্ঠ ক্ষণকাল।”

পালিকা বাজারের উপরে ঘাসে ঢাকা বেশ অনেকটা জায়গা। অনেকে সেই ঘাসের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে। ইন্দ্ররাও সেইরকমই একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসে ছিল। দূরে চওড়া রাস্তা, দোকানপাট। ঝলমলে রাজধানী যেন নিজের খেয়ালে অকাল উৎসবে মেতেছে। মিস্টার পাই অনেকক্ষণ ধরে ঠোঁটের কোণে একটা সিগারেট ঝুলিয়ে হাতের তালু দিয়ে সেটাকে সযত্নে আড়াল করে তাতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছিলেন। দূরে রাস্তার দিক থেকে আসা দমকা বাতাস তার সেই প্রচেষ্টায় বাদ সাধছে। বারবার হাওয়ার দাপটে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি নিবে যাওয়ায় তিনি মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে উঠে গেলেন একটু দূরে।

ওরা এতক্ষণ যেটা খেয়াল করেনি, সেটা হল, ওদের থেকে একটু দূরে বসে একজন ওদের দিকে খুব সন্তর্পণে নজর রাখছিল। অন্য সময় হলে হয়তো মিস্টার পাইয়ের নজর এড়াত না, কিন্তু আজ সামান্য অন্যমনস্ক থাকা তিনিও ব্যাপারটা লক্ষ করেননি। লোকটার হাতে একটা বাদামের ঠোঙা। সেটা থেকে একটা একটা করে বাদাম নিয়ে মুখে ফেলছে সে। রোগা লম্বাটে চেহারা, পরনে একটা অতি সাধারণ ছিটের কাপড়ের জামা, তার উপর হাফহাতা সোয়েটার। মিস্টার পাই উঠে যেতেই লোকটাও নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে পড়ল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইন্দ্রকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, ইন্দ্রর দিকে ফিরেও তাকাল না। অবশ্য ইন্দ্রর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিজের হাতে থাকা বাদামের ঠোঙা থেকে একটা ছোট্ট কাগজের পুরিয়া নীচে ঘাসের উপর ফেলে দিল। ঠিক যেমন ভাজা বাদামের সঙ্গে লবণের পুরিয়া থাকে, কতকটা সেইরকম। ইন্দ্রর যেন মনে হল যে, পুরিয়াটা অসাবধানতাবশত লোকটার হাত থেকে পড়ে যায়নি। ইচ্ছে করেই ইন্দ্রর সামনে এসে পুরিয়াটা মাটিতে ফেলা হয়েছে। ওদিকে সিগারেট জ্বালিয়ে নিয়ে পায়ে পায়ে এদিকেই আসছিলেন মিস্টার পাই। ইন্দ্র দ্রুতবেগে মাটি থেকে পুরিয়াটা কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে পুরে নিল। মিস্টার পাই ইন্দ্রর পাশে এসে বসলেন। তারপর সিগারেটে একটা টান দিয়ে মাথাটা ওপরের দিকে তুলে একরাশ ধূসর ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “বাই দ্য ওয়ে, তুমি সাঁতার কাটতে পারো তো?”

“ওই ছোটবেলায় হেদুয়ায় শিখেছিলাম বছরখানেক। কাজ চালিয়ে নিতে পারি। কেন? আমাদের নেক্সট মিশনে কাজে লাগবে নাকি?”

“সত্যি বলতে, আমাদের নেক্সট মিশনের ডিটেল আমি এখনও জানি না। আলফা ব্রিফ করার পর আমরা জানতে পারব। তবে তোমার পাশে-রাখা ওই প্যাকেটে আমাদের পাঁচজনের পাঁচটা ডাইভিং স্যুট আছে। সেইজন্যই প্রশ্নটা করলাম।”

ইন্দ্র কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে যায়, কিন্তু ওর মুখমণ্ডল জুড়ে নেমে-আসা কালো ছায়া মিস্টার পাইয়ের দৃষ্টি এড়ায় না। ইন্দ্রর পিঠে একটা আলতো চাপড় মেরে বললেন, “আরে, এত চাপ খাচ্ছ কেন? চিল।”

“একজন সামান্য ইতিহাসের প্রফেসর যদি হঠাৎ একদিন বাড়ি ফিরে দেখে, নিজের পরিবার খুন হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে, আর তাদের খুনি সন্দেহে তাকেই গ্রেফতার করা হয়, আর তারপর তাকে লকআপ থেকে বের করে নিয়ে আসে এমন একটা মিস্টিরিয়াস অর্গানাইজেশন, যাদের ব্যাপারে সে বিন্দুমাত্র জানে না। তারা খুনি নাকি টেররিস্ট, সেটাই বুঝতে পারছে না। ছাপোষা ইতিহাসের প্রফেসর থেকে জেল পালানো খুনের আসামি, হয়তো বা সম্ভাব্য টেররিস্ট। সে কী করে চাপ না নিয়ে চিল করবে, সেটা একটু বলবেন স্যার?” একনিশ্বাসে ঝড়ের গতিতে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগল ইন্দ্ৰ।

ইন্দ্রর কথায় যেন ভয়ানক আমোদ পেয়েছেন, এমনভাবে হা হা করে উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করলেন মিস্টার পাই। তারপর হাসি থামিয়ে হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমরা টেররিস্ট বা ভাড়াটে খুনি নই, স্যার। আমাদের কাজ হল, যখন যে ক্লায়েন্ট আমাদের হায়ার করে, তার হয়ে কোনও জিনিস তাকে খুঁজে দেওয়া। শুধু সেই কাজে আইনকানুনের বাধানিষেধ আমরা খুব একটা পরোয়া করি না। আমাদের ডিগ্লোরিফায়েড ট্রেজার হান্টার বলতে পারো।” “আর সেই জিনিসটা তার না হলেও তাকে আমরা সেটা পাইয়ে দিই। দরকার পড়লে সেটা চুরি করেও, তা-ই তো?”

“হুম।”

“তাহলে আমাদের গ্লোরিফায়েড ডাকাতও বলা যায়।”

ইন্দ্র অনুমান করেছিল, এই কথায় মিস্টার পাই অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু ইন্দ্ৰকে অবাক করে দিয়ে তিনি মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। তারপর ঠোঁটে ঝোলানো সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে সেটাকে আঙুলের টোকায় দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে সুর করে বলে উঠলেন, “আরে, কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগোঁকা কাম হ্যায় কহেনা…”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *