(১২) হেইল দ্য ডেভিল
“তোমাদের মধ্যে বিটা এবং পাই এর আগেও বেশ কয়েকটা মিশনে আমার সঙ্গে ছিলে, তাই আমাদের কাজ করার পদ্ধতি বা ধরন তোমাদের অজানা নয়। কিন্তু গামা এবং ডেল্টা আমাদের টিমে নতুন, তাই আমি আমাদের কাজ করার পদ্ধতিটা আরও একবার ঝালিয়ে নিচ্ছি। আমাদের মূলত ফ্রিল্যান্সার ফিক্সার বলা যেতে পারে। আমাদের ক্লায়েন্টরা যখন কোনও সমস্যায় পড়েন, এবং কোনও নির্দিষ্ট কারণে পুলিশের কাছে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না, দেন হি অর শি হায়াস আস। আমরা আমাদের রিসোর্স এবং এক্সপার্টিজ দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করি। আমরা কোনও ক্লায়েন্টকেই পার্সোনালি চিনি না। তাঁরাও আমাদের নাম বা পরিচয় জানেন না। এমনকী কোনও ক্লায়েন্টের সঙ্গে আমরা মুখোমুখি দেখাও করি না। আমরা শুধু কাজের ডেসক্রিপশন নিই এবং কাজের শেষে পেমেন্ট।”
“কিন্তু তাহলে আমাদের ক্লায়েন্টের সোর্স কী? মানে যোগাযোগটা হয় কী করে?” কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করেন গামা।
“আপনি ডার্ক ওয়েবের কথা শুনেছেন? আমাদের চেনাজানা গুগল, ফেসবুক বা ইউটিউবের বাইরেও ইন্টারনেটের আরও একটা বিশাল জগৎ আছে। বরং সাধারণ লেম্যান যে ইনটারনেটটা ব্যবহার করে, সেটা জাস্ট দ্য টিপ অফ অ্যান আইসবার্গ। এই সারফেসের নীচেও একটা বড় অংশ সবার জন্য অ্যাক্সেসেল নয়। সেটাই হল ডার্ক ওয়েব। গুগলে সার্চ করে আপনি সেই সব ওয়েবসাইট খুঁজে পাবেন না। সেখানে খুনের সুপারি দেওয়া থেকে শুরু করে ড্রাগ কেনাবেচা, এমনকী চাইল্ড পর্নোগ্রাফি অব্দি ইজিলি অ্যাভেলেল।” কথা শেষ করে বিটা টেবিলের ওপর দু-পা তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে কানে হেডফোন গোঁজে।
“যা-ই হোক, টিমে কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে আমি প্রত্যেকবার নতুন করে টিম সেটআপ করি। প্রত্যেকবার মিশনের শুরুতে টিমের মেম্বারদের নতুন করে নামকরণ করা হয়। যেমন এই মিশনের জন্য আমি আলফা, এবং বাকিরা যথাক্রমে বিটা, গামা, ডেল্টা এবং পাই। আমার মনে হয়েছে, আমাদের সামনের মিশনে এমন দু-জনকে লাগবে, যার একজনার ইতিহাস এবং হিস্টোরিক্যাল আর্টিফ্যাক্টস-এর ওপর সম্যক ধারণা আছে। তা ছাড়া আরও একটা বিশেষ কারণে আমি ডেল্টাকে আমাদের টিমে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কী সেই কারণ, সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই জানতে পারবে। আর এই অভিযান হয়তো খুব একটা সহজ হবে না আমাদের জন্য, পদে পদে বিপদ আসতে পারে। তাই আমাদের সঙ্গে একজন ডক্টর থাকা উচিত বলে আমার মনে হয়েছে। সেই কারণেই ডক্টর গামাকে রিক্রুট করা হয়েছে।”
“কিন্তু আমাদের মিশনটা কী?” অধৈর্য গলায় প্রশ্নটা করে ইন্দ্র। “আপনি কোডেক্স গিগাস-এর নাম শুনেছেন তো?”
এবার ইন্দ্র হেসে ফেলে, “কেন শুনব না! শয়তানের বাইবেল। ওটার ওপর তো আমার একটা পেপারও আছে। টানা তিন বছর তো ওই নিয়েই পড়ে থেকেছি। কিন্তু সে তো এখন সুইডেনের স্টকহোমে। কেন বলুন তো?”
.
কলকাতা, জানুয়ারি, ২০২০ :
ঠোঁটের কোণে শেষ সিগারেটটা ঝুলিয়ে আঙুলের আলতো টোকায় টেবিলের ওপর রাখা খালি প্যাকেটটা দূরের ডাস্টবিনের দিকে নিক্ষেপ করল সম্বুদ্ধ। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। পিছন থেকে হাততালির শব্দ শুনে মাথা ঝুঁকিয়ে হাতের ইশারায় কুর্নিশ করতে করতে পিছনে তাকিয়ে দ্যাখে চিফ স্যার। সুমন্ত্র মুস্তাফি, কলকাতা মিউজিয়ামের চিফ কিউরেটর। কেস খেয়েছে! কবজি উলটে হাতঘড়িটার দিকে তাকায় সম্বুদ্ধ। ঘড়িতে এখন পাঁচটা পঁয়ত্রিশ। অর্থাৎ ওর যাওয়ার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। আজও না মুস্তাফি বুড়ো ওকে উলটোপালটা কাজে আটকে দেয়। মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে সম্বুদ্ধ রিভলভিং চেয়ারটাকে পিছনে ঘুরিয়ে মুস্তাফির দিকে ফেরে। তারপর চোখ কুঁচকে বসের দিকে তাকায়। মুস্তাফির সঙ্গে সম্বুদ্ধর দ্বৈরথ সারা মিউজিয়ামে সর্বজনবিদিত। অন্য সবাই রাগি দুর্মুখ মুস্তাফির সামনে সন্ত্রস্ত থাকলেও বস হিসাবে ন্যূনতম সম্মানটুকুও সম্বুদ্ধর কাছ থেকে পান না মুস্তাফি। অবশ্য তিনিও প্রাণ খুলে গালমন্দ করতে ছাড়েন না নিজের অধস্তনটিকে। তবুও সম্বুদ্ধকে ছাড়া একবেলা চলে না তাঁর। পড়াশোনায় তুখোড় এই ছেলেটা মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সেই কলকাতা মিউজিয়ামের প্রিজার্ভেশন ডিপার্টমেন্টের চিফ কনজার্ভেশন অফিসার।
মুস্তাফি ভ্রূ নাচিয়ে প্রশ্ন করেন, “সরকার এইজন্য মাইনে দিচ্ছে বুঝি?” “উঁহুঁ। সরকার বিকেল সাড়ে পাঁচটা অবধি মাইনে দেয়। সাড়ে পাঁচটা বাজলেই খেল খতম, পয়সা হজম।”
“এহহ্! মামার বাড়ি! শোনো, তোমাকে একটা কাজ দিচ্ছি। খুব ইম্পর্ট্যান্ট কাজ। দয়া করে ধেড়িও না। বাড়ি ফেরার পথে একবার টুক করে সিঁথি থানায় চলে যাও। ওখানে কিছু ডকুমেন্ট সাইন করতে হবে।”
“সর্বনাশ! আমি জানতাম, এইদিন আসবে।” চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে কোনার টেবিল থেকে নিজের ব্যাগপ্যাকটা তুলে নিয়ে পিঠে চাপাতে চাপাতে বলে সম্বুদ্ধ।
“মানে?”
“মানে আপনার মতো বস থাকলে জেলে যাওয়া আটকায় কে! যেদিন থেকে আপনার পাল্লায় পড়েছি, সেদিন থেকেই আমি জানি, এই দিন দেখা শুধু সময়ের অপেক্ষা।” মুচকি হেসে বলে সম্বুদ্ধ।
সম্বুদ্ধর কথা শুনে মুস্তাফি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। প্রায় চিৎকার করে বলেন, “ফাজলামিটা কম মারো। কলেজে পড়ো না আর। দমদমের ভিতরদিকে কোনও এক জায়গায় রেইড করার সময় একটা মধ্যযুগীয় আর্টিফ্যাক্ট পাওয়া যায়। এতদিন কেস ওপেন ছিল বলে সেটা পুলিশের এভিডেন্স রুমে ছিল। কেস ক্লোজড হয়েছে। তাই সেটা আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই কাগজপত্রেই তুমি গিয়ে সই করে ফর্মালিটিজ কমপ্লিট করে এসো। কালকে সকালবেলা তুমি আর আমি গিয়ে আর্টিফ্যাক্টটা নিয়ে আসব।”
“ওহ! বুঝলুম। তা কী আর্টিফ্যাক্ট?”
“ওইটাই তো মজা। যাও, গিয়ে দেখে এসো। ইতিহাসে যদি টুকে পাস না করে থাকো তাহলে দেখলেই চিনতে পারবে। কেস চলাকালীন আমি একবারই জিনিসটাকে দেখতে গিয়েছিলাম। একঝলক দেখেই চিনেছিলাম। নেহাত পুলিশগুলো অকর্মার ঢেঁকি আর গাড়ল বলেই এখনও খবরটা প্রেস অবধি পৌঁছোয়নি। তাতে অবশ্য আমাদের পক্ষে ভালোই হয়েছে। নয়তো প্রেস সামলাতে সামলাতেই জীবন যেত।”
হাড়বজ্জাত মুস্তাফিটা অবলীলায় বলে দিল বটে যে বাড়ি ফেরার পথে সিঁথি থানা হয়ে ফিরতে। কিন্তু সিঁথি থানা মোটেও সম্বুদ্ধর বাড়ির রাস্তায় পড়ে না। সম্বুদ্ধর বাড়ি সোদপুর। পার্ক স্ট্রিট থেকে মেট্রোয় উঠে দমদমে সে নামে ঠিকই, তবে দমদম স্টেশন থেকেই আবার ট্রেন ধরে সোদপুর যায়। আজকে সে দমদম নেমে বেরিয়ে এল প্ল্যাটফর্মের বাইরে। এখান থেকে সিঁথির মোড়ের অটো ছাড়ে, কিন্তু এই অটোগুলো থানা হয়ে ঘুরে যায় না। সম্বুদ্ধ আরেকটু এগিয়ে এসে একটা রিকশাকে জিজ্ঞেস করল। রিকশাওয়ালা থানার কথা শুনেই মুখ বাঁকিয়ে জানিয়ে দিল, থানার সামনে নাকি মাটি খোঁড়া হয়েছে। অত অবধি রিকশা যাবে না। ভাঙামটর নেমে হেঁটে যেতে হবে। অগত্যা! ভাঙামটরে নেমে মুস্তাফিকে বাপ-মা তুলে শাপ-শাপান্ত করতে করতে সম্বুদ্ধ পা বাড়াল থানার দিকে।
ভাঙামটর থেকে যে রাস্তাটা সোজা গিয়ে মোড় ঘুরে সাউথ সিঁথির দিকে চলে গেছে, সেই মোড়েই থানা। বড় গ্রিল দরজা, দরজার পাশে পুরোনো ভাঙাচোরা কয়েকটি বাজেয়াপ্ত করা মোটরসাইকেল পড়ে রয়েছে। গায়ে পুরু ধুলোর পরত। ঢুকেই বাঁদিকে একটা ছোট ঘর। ভিতরে চৌকি পাতা। একজন কনস্টেবল স্যান্ডো গেঞ্জি আর পুলিশি প্যান্ট পরে চৌকিতে বসে খইনি ডলছে। মুখোমুখি মূল বিল্ডিং-এর দরজা দিয়ে ঢুকে টানা করিডর, দু-পাশে কয়েকটা ঘর। এরকমই একটা ঘরে এসে ঢুকল সম্বুদ্ধ। দরজার ডানদিকে একটা বড় টেবিল, তাতে একজন অফিসার বসে আছেন। পাশের একটা ছোট টেবিলে অন্য একজন চেয়ারে পা তুলে বসে কাচের গ্লাসে চা খাচ্ছে। পাশে দুটো লোহার আলমারি। একটার দরজা সামান্য ফাঁক করা, সম্ভবত ভাঙা। ভিতরে অনেকগুলো অবিন্যস্ত ফাইলপত্র উঁকি মারছে। অফিসারের টেবিল ঘিরে পাঁচ-ছ-জন লোক দাঁড়িয়ে। বাঁদিকে লকআপ। ভিতরে গারদ ধরে বসে আছে দুটি লোক। প্রকৃতিস্থ মনে হল না। ভীষণ দুর্গন্ধ। সম্বুদ্ধ নাকে রুমাল চাপা দিল।
“কী ব্যাপার! এখন ডায়েরি লেখা হবে না। মেজবাবু ভিজিটে। কাল সকালে আসুন।” দেশলাই কাঠি দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন অফিসারটি। তারপর বোধহয় বেখেয়ালে কানে খোঁচা খেয়ে মাথাটা ঝাঁকিয়ে কাঠিটা ছুড়ে ফেলে দিলেন। অফিসারের নাম প্রমোদকুমার মাল, ব্যাচে লেখা। উর্দির দুটো বোতাম খোলা, একটা পা ভাঁজ করে চেয়ারের ওপর তুলে বসেছেন। মাথায় কদমছাঁট চুলের সঙ্গে হাতে একটা লাল রঙের মিকি মাউসের স্টিকারওয়ালা ফোনের কভার ভীষণ বেমানান। মুখে পান অথবা গুটখাজাতীয় কিছু রয়েছে। থু থু করে মাঝে মাঝেই জানালা দিয়ে পিক ফেলছেন, বেশির ভাগই জানালার গ্রিলে লেগে থাকছে।
“না না! আমি ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম থেকে আসছি।”
“ও আচ্ছা আচ্ছা। ওই বোতলটা নিয়ে যেতে এসেছেন তো?”
“বোতল!” হকচকিয়ে গিয়ে অফিসারের দিকে মুখ তুলে তাকায় সম্বুদ্ধ।
“আরে হ্যাঁ হ্যাঁ। ওই যে বোতলের মধ্যে পুরোনো মালপত্তর গোঁজা। শালা, বোতলটা খুলে দেখার পারমিশন অব্দি দিল না কোর্ট থেকে। আছে তো ভিতরে কী সব ছালবাকল।” কথা বলতে বলতেই নিজের অধস্তন একজন অফিসারকে চোখের ইশারায় কিছু একটা নির্দেশ করতেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সম্বুদ্ধ টেবিলে রেখে-যাওয়া চায়ের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়েই মুখটা কুঁচকে গ্লাসটা সরিয়ে রাখল। সেটা দেখে ফিক করে হেসে উঠলেন মিস্টার মাল। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “তাহলেই ভাবুন মশায়! ঠিকঠাক চা-ও খেতে পাই না, শালা! কার মুখ দেখে যে পুলিশের চাকরির ফর্ম ভরেছিলাম, ভগাদাই জানে।”
ঠং করে একটা আওয়াজ পেয়ে পিছনে তাকিয়ে সম্বুদ্ধ দেখল, সেই অধস্তন অফিসারটি একটা বিকট বড় সাইজের মোটা কাচের বোতল এনে নামিয়েছে পিছনে টেবিলের ওপর। এত বড় বোতল সম্বুদ্ধ বাপের জন্মে দেখেনি। কতকটা অক্সিজেনের সিলিন্ডারের মতো বড়। একটা চওড়া সেলোফেন পেপার মুড়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে তার ওপর গালা দিয়ে সিল মারা। জিনিসটা টেবিলের ওপর রাখতেই মালবাবু এক ঝটকায় হেঁ হেঁ করতে করতে চেয়ার ছেড়ে প্রায় ছুটে গেলেন সেদিকে। অধস্তন অফিসারটি থতোমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মালবাবু নিজেই জিনিসটাকে টেবিলের ওপর থেকে নীচে মাটিতে নামিয়ে রাখলেন। তারপর টেবিলের ওপর মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করে। হাত ধুয়ে রুমালে হাত মুছতে মুছতে নিজের চেয়ারে এসে বসে বললেন, “কিছু মনে করবেন না দাদা। ওর মধ্যে নাকি কী সব চামড়া-টামড়া রয়েছে। টেবিলের ওপর ডায়েরি, পেন, ফাইল, এসব বিদ্যার জিনিস থাকে। এসব ম্লেচ্ছ জিনিস কেউ টেবিলের ওপর রাখে!” কথা শেষ করে ভ্রূ কুঁচকে একটা ভর্ৎসনা দৃষ্টি হানলেন নিজের অধস্তনের প্রতি। সম্বুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে সিল-মারা গালার চাকতিটা খুলতে যাবে, অফিসার আবার সেইভাবেই হেঁ হেঁ করে উঠে বললেন, “খালি হাতে ধরবেন না মশাই! ওর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া নাকি জার্ম, কী আছে জানি না, কিন্তু আমাদের দু-জন কনস্টেবল ওটাকে খালি হাতে ধরে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে ওটাকে ওভাবেই সেলোফেন পেপার দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছি।” সম্বৃদ্ধ কথার উত্তর না দিয়ে সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়।
কাগজপত্র সইসাবুদ হয়ে যাওয়ার পর সম্বুদ্ধ কাঁধে নিজের ব্যাগটা ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘর থেকে বেরোতে যাবে, এমন সময় পিছু ডাকলেন অফিসার, “মালটা নিয়ে গেলেন না যে!”
“না না! এখন নয়। কাল সকালে আমাদের মিউজিয়ামের চিফ কিউরেটর
ডঃ মুস্তাফি আর আমি একসঙ্গে এসে ওটা নিয়ে যাব।”
“উহুঁ সেটি হবে না। আপনি এখানে সই করে দেওয়া মানে আপনার জিনিস আপনি বুঝে নিয়েছেন। আমরা আমাদের জিম্মায় আর ওটাকে রাখতে পারব না।”
“এত বড় জিনিস নিয়ে আমি এখন আর ফেরত যেতে পারব না। তা ছাড়া মিউজিয়ামও বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি আজকের রাতটা রেখে দিন। কাল সকালেই…”
“না না। আমাদের এভিডেন্স লকার রুমে হিসাবের বাইরের কোনও জিনিস রাখার এক্তিয়ার নেই আমার। আপনি মালটাকে আপনার সঙ্গে করে নিয়ে যান। কালকে অফিস যাওয়ার সময় আবার বগলদাবা করে অফিস নিয়ে চলে যাবেন-খন।”
পুরো জিনিসটাকে ভালো করে খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ে উবের বুক করে পিছনের সিটে নিজের পাশে সেটাকে বসাল সম্বুদ্ধ। ড্রাইভার সাহেব একটু কিন্তু-কিন্তু করে বলেছিলেন সেটাকে পিছনের ডিকিতে পাচার করতে, কিন্তু ঝাঁকুনিতে কোনওরকমে কাচ ভেঙে গেলে পিঠের একটা হাড়ও মুস্তাফি আস্ত রাখবে না। এভাবে একটা মধ্যযুগীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বগলদাবা করে নিজের বাড়ি নিয়ে যাওয়াটা কী ভয়ংকর রকমের রিস্কি এবং বেআইনি তা সম্বুদ্ধর অজানা নয়। কিন্তু এক্ষুনি মুস্তাফিকে বললেই এই রাত্রিবেলায় ওকে মিউজিয়াম অবধি দৌড় করাবে। তাই চুপচাপ জিনিসটা আজকে রাত্রে নিজের কাছে রেখে কাল সকালে মিউজিয়ামে নিয়ে যাবে। মুস্তাফি যে তুমুল খিস্তি দেবে, সেটা সে জানে, তবু এত রাত্রে আবার পার্ক স্ট্রিট দৌড়োনোর থেকে খিস্তি হজম করে নেওয়াটা ঢের সহজ।
বোতলটা বেশ ভারী। সম্বুদ্ধর ফ্ল্যাটে লিফট নেই। সিঁড়ি বেয়ে অতটা ভারী একটা বোতল তিনতলায় নিয়ে ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ, তার ওপর যদি সেটা মহামূল্যবান কোনও প্রত্নতত্ত্ব হয়। চাবি ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে কোনওরকমে বগলদাবা করে আনা বোতলটাকে নিজের স্টাডিরুমে টেবিলের ওপর রাখল সম্বুদ্ধ। ঘরের টিউব জ্বালিয়ে খবরের কাগজের মোড়ক সরিয়ে নিয়ে সেলোফেন পেপারের ভিতর দিয়েই বোতলটার ভিতরে দেখার চেষ্টা করল। গোল করে পাকানো কয়েকটা পৃষ্ঠা। তবে সেগুলো কাগজ বা পার্চমেন্ট নয়, সম্ভবত ছাগল অথবা গাধার চামড়া। সেলোফেন পেপারটা খুব একটা স্বচ্ছ নয়, তাই ভিতরে লেখাগুলো পড়া সম্ভব হচ্ছিল না। সামান্য ইতস্তত করে সাবধানে গালার সিলটা খুলে ফেলল সম্বুদ্ধ। আস্তে আস্তে সেলোফেন পেপারের মোড়কটা সরিয়ে ফেলতেই ভিতরের পৃষ্ঠাগুলো সামান্য পরিষ্কার হল। বোতলটার বাইরে পুরু ধুলোর পরত জমে আছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বোতলের আসল স্বচ্ছ রংকেও ধূসর বাদামি করে দিয়েছে। ফলত ভেতরের লেখাগুলো ভীষণই অস্পষ্ট। কিন্তু বোতলের মুখ কাচ গলিয়ে এমনভাবে সিল করা যে সেটা বোতলটাকে না ভেঙে খোলা অসম্ভব। ভিতরের লেখাগুলো প্রাচীন ল্যাটিন। এ ভাষা সম্বুদ্ধর সুপরিচিত। এটা আধুনিক ল্যাটিন বা যেটাকে স্ল্যাং ল্যাটিন বলা হয়, তা নয়। বারোশো কি তেরোশো খ্রিস্টাব্দে যে শুদ্ধ ল্যাটিন ভাষা চলত, সেই ভাষা। বোতলটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লেখাগুলো পড়তে চেষ্টা করে সম্বুদ্ধ। সব কথা পরিষ্কারভাবে না বুঝলেও সে যেটুকু বুঝতে পারে, তাতে মনে হয়, এখানে কোনও একটা হোলি সিটির কথা বলা হয়েছে। জেরুসালেম কি? আরও কিছু কিছু কথা, যেগুলো সে স্পষ্ট বুঝতে পারে না। শুধু টুকরো টুকরো কিছু শব্দ, যেমন আনুগত্য, ডেভিল…..
বেশ কিছুক্ষণ এভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতেই হঠাৎ সম্বুদ্ধর মাথায় বিদ্যুৎচমকের মতো দুটো শব্দ খেলে যায়। কোডেক্স গিগাস! হ্যাঁ। পৃষ্ঠার সেই মাপ, সেই স্ক্রিপ্ট, সেই টাইম পিরিয়ড। উত্তেজনায় মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে সম্বুদ্ধ। বোহেমিয়ার অর্থাৎ অধুনা চেক রিপাবলিকের বেনেডিক্টাইন মনাস্ট্রিতে তেরোশো খ্রিস্টাব্দের প্রথম অর্ধে লেখা সেই বিশ্বখ্যাত অভিশপ্ত বই। যা সারা বিশ্বে শয়তানের বাইবেল বলে কুখ্যাত। তারই সেই ইতিহাসের কোনও অজানা স্রোতে হারিয়ে-যাওয়া অভিশপ্ত বারোটা পৃষ্ঠা, যা চোদ্দোশো বা পনেরোশো শতাব্দীর মধ্যে কোনও এক অজানা সময়ে এক অজানা কারণে হারিয়ে গিয়েছিল কালগর্ভে। লোককথা অনুযায়ী এই বারোটা পৃষ্ঠাতেই নাকি লিপিবদ্ধ ছিল স্বয়ং শয়তানকে পৃথিবীতে আনার উপাচার। এই বারোটা পৃষ্ঠা যার হাতে পড়বে, সেই নাকি পরিণত হবে পৃথিবীর সর্বশক্তিমান মানুষে। শয়তানকে ধরাধামে আমন্ত্রণ করে তাকে বশীভূত করার পদ্ধতি লিপিবদ্ধ আছে এই পৃষ্ঠাগুলোয়। সারা পৃথিবীর হাজার হাজার ইতিহাসবিদ থিসিসের পর থিসিস কলম পিষেছেন এই পৃষ্ঠাগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান এবং পরিণতিকে অনুমান করে। কত মানুষ নিজের সারাজীবন উৎসর্গ করেছে এই পৃষ্ঠাগুলোকে খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে। স্বয়ং শয়তানের বাইবেলের কালের স্রোতে হারিয়ে-যাওয়া সেই বারোটা পৃষ্ঠা এই মুহূর্তে সম্বুদ্ধর স্টাডিরুমে একটা ছোট্ট টেবিলের ওপর। তার সঙ্গে সেই পৃষ্ঠাগুলোর ব্যবধান শুধু একটা পুরু ধূসর কাচ।
উত্তেজনায় বহুক্ষণ ঘুম আসছিল না সম্বুদ্ধর। হঠাৎ মনে পড়ল, তার একজন কলেজের বন্ধু ছিল, ইন্দ্রজিৎ। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও সে শুনেছিল, ইন্দ্ৰজিৎ নাকি এই কোডেক্স গিগাস-এর ওপরেই থিসিস লিখছে। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ইন্দ্রজিৎকে একটা ফোন করে সম্বুদ্ধ।
“কে, ইন্দ্র? আমি সম্বুদ্ধ বলছি রে।”
“কী রে শালা! এতদিন পর মনে পড়ল! বল কেমন আছিস?”
“ভালোই আছি, ভাই। তুই কি ফ্রি আছিস?”
“ফ্রি ঠিক নেই। বাড়ি ফিরছিলাম। এই একটু দাঁড়ালাম ফুল কিনব বলে, তুই কল করলি।”
“আরে বাহ্! ছেলে এখনও রোমান্টিক!”
“আরে ধুস! আজ আমাদের অ্যানিভার্সারি রে। পরমা বোধহয় একটা সারপ্রাইজ পার্টি অ্যারেঞ্জ করেছে, যেটা নট সো সারপ্রাইজিং ফর মি। তাই ভাবলাম, ফেরার সময় একটু অর্কিড নিয়ে যাই। পরমার ফেভারিট, “ কথা শেষ করে হাসতে থাকে ইন্দ্ৰ।
“ঠিক আছে, বস। তুই বাড়ি ফিরে ফ্রি হলে আমায় একটা কল কর। একটু আর্জেন্ট আছে।”
“কী কেস? বল এখনই। আমি ড্রাইভ করতে করতেই শুনছি। ব্লুটুথ স্পিকারে কানেক্ট করে দিচ্ছি বরং।”
“না না, এভাবে হবে না। ঠান্ডা মাথার আলোচনা আছে। তুই ফিরে কল কর।”
“ও. কে. গুরু। যথা আজ্ঞা।”
ইন্দ্র আর রাতে ফোন করে না। শালা এনজয় করছে বউ-বাচ্চার সঙ্গে। থাক গে। কাল সকালে একটা ফোন করে নেবে সম্বুদ্ধ। বিছানায় শুয়ে প্রায় সারারাত উশখুশ করতে করতে ভোররাতের দিকে সম্বুদ্ধর দু-চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে। কিন্তু হঠাৎই সে ঘুম ভেঙে যায় জলের ছলাৎছল শব্দে। চমকে বিছানায় উঠে বসে সম্বুদ্ধ। শোয়ার ঘরে জল কী করে এল! আজকাল মানুষ আর আগের মতো মাথার কাছে টর্চ নিয়ে শোয় না। মাঝরাতে আলো-টালো জ্বালার দরকার পড়লে সে কাজ মোবাইলেই হয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে বালিশের আশপাশে মোবাইল ফোনটা খুঁজতে গিয়ে সম্বুদ্ধর মনে পড়ে যে, ইন্দ্রর সঙ্গে কথা বলার পর সে ফোনটা ভুল করে স্টাডিরুমেই ফেলে এসেছে। হঠাৎ আবার জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে সংবিৎ ফেরে সম্বুদ্ধর। অন্ধকারেই আন্দাজে খাটের কোনায় সরে এসে নীচে মেঝের দিকে পা বাড়িয়ে দেয় সে। আর সঙ্গে সঙ্গে চমকে ওঠে। তার পায়ের পাতায় ঠান্ডা জল ঠেকছে। সম্বুদ্ধ হতবুদ্ধি হয়ে পা দুটোকে গুটিয়ে ওপরে তুলে নেয়। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থাকে। তার মাথাটা যেন ঘেঁটে গিয়েছে। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর আবার আস্তে আস্তে পা নামায়। ঘরের মেঝেতে প্রায় হাঁটুসমান জল। তবে আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল জলটা স্থির নয়। যেন স্রোতস্বিনীর মতো কুলকুল করে বয়ে চলেছে। হঠাৎ মাথাটা ভীষণ হালকা হয়ে আসে। চোখের সামনে ঘন কালো অন্ধকার ছাপিয়ে একটা আবছা নীল আলো যেন দূর থেকে কাঁপতে কাঁপতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো জল ভেঙে পায়ে পায়ে সেই আলোর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎই সম্বুদ্ধ বুঝতে পারে যে তার পায়ের তলার মেঝে মার্বেলের নয়, কাঠের। পায়ের চাপে সেই কাঠের মেঝেতে ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ হচ্ছে। জলের ঝাপটায় ভারসাম্য হারিয়ে দেওয়ালে হাত দিতেই সে আবারও চমকে ওঠে। এই দেওয়ালও ইট-চুন-সুরকির দেওয়াল নয়। কাঠের পাটাতনের তৈরি মসৃণ দেওয়াল। আস্তে আস্তে দেওয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে অজানা আলোর উদ্দেশে এগিয়ে চলে সম্বুদ্ধ। এটা তো তার চিরপরিচিত ফ্ল্যাট নয়! এই বাড়ির নকশা সে চেনে না। কিন্তু… এটাকে বাড়িই বা বলে কী করে! কারণ সম্পূর্ণ বাড়িটাই যেন স্থির নয়। স্রোতের তালে তালে দুলে দুলে উঠছে। বেশ কিছুক্ষণ পর সম্বুদ্ধ বুঝতে পারে যে এটা আদপে একটা জাহাজ। সেই জাহাজের সবার নীচের বেসমেন্টে সে রয়েছে। মাথার ওপরের ডেক থেকে শোনা যাচ্ছে সমবেত মানুষের চিৎকার, তরোয়ালের সংঘর্ষের আওয়াজ, মানুষের প্রাণভেদি আর্তনাদ, জীবনরক্ষার তাগিদে ডেকের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যাওয়ার পায়ের আওয়াজ। কিন্তু এসব কিছুই আর সম্বুদ্ধকে অবাক করছে না। সম্বুদ্ধ যেন সেই নীল আবছা আলোর দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সম্মোহিত হয়ে গিয়েছে। পায়ে পায়ে সে এসে দাঁড়ায় একটা ঘরের দরজার কাছে। দরজাটা অর্ধেক খোলা। ভিতর থেকে সেই নীল উজ্জ্বল আলো দেখা যাচ্ছে। সম্বুদ্ধ সামনে হাত বাড়িয়ে দরজার পাল্লা ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসে। দেখে একটা বড় লোহার ট্রাঙ্কের ওপর একটা বিশাল বই খুলে রাখা। একঝলকেই বইটা চিনতে পারে সম্বুদ্ধ। কোডেক্স গিগাস! শয়তানের বাইবেল….
কিন্তু চিনতে পারে না বইয়ের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে-থাকা সেই ব্যক্তিটাকে, যে একমনে বইটা থেকে কয়েকটা লাইন মন্ত্রের মতো মৃদুস্বরে একটানা উচ্চারণ করে চলেছে। হঠাৎ সম্বুদ্ধর মনে হয় যেন ওর চারপাশে একটা ঘন নীল কুয়াশার বলয় গোল করে ঘুরতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে সেই ঘন কুয়াশা সম্পূর্ণ ঘরকে ঝাপসা করে তুলছে। সম্বুদ্ধ দেখে, তার সামনে বসে-থাকা লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার সামনে খোলা বিশাল বইটা থেকে একটা আবছা নীল আভা বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকটাকে আলোকিত করে তুলেছে। এইবার লোকটা দু-হাত দু-পাশে প্রসারিত করে এবং সম্বুদ্ধ বাক্রদ্ধ হয়ে দেখতে থাকে এক অদ্ভুত দৃশ্য। বইয়ের পাতাগুলো যেন একটু একটু করে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে সামনে দাঁড়ানো লোকটাও আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে। তার শরীরটা দুমড়েমুচড়ে উঠছে। যেন একসঙ্গে দেহের প্রত্যেকটা হাড় বেঁকেচুরে যাচ্ছে। হাড় ভাঙার অস্বস্তিকর আওয়াজে সম্বুদ্ধর সারা দেহ শিউরে ওঠে। যন্ত্রণায় দু-হাতে মুখ ঢেকে আস্তে আস্তে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে লোকটা। গলা ভারী হতে শুরু করেছে। একসময় তার কাতর আর্তনাদ পরিবর্তিত হয় হিংস্র গর্জনে। ক্রমশ সম্পূর্ণ শরীরটা শূন্যে ভাসতে থাকে। মাথার দু-পাশের চামড়া চিরে বেরিয়ে আসে দুটো ধারালো শিং। দাঁতগুলো সরু, তীক্ষ্ণ। এই নীলচে অন্ধকারেও ইস্পাতের ছুরির শানিত ফলার মতো ঝকঝক করছে দাঁতগুলো। দু-হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিকরকম বড়। ধারালো নখগুলো বেঁকে রয়েছে। এইবার তার প্রবল গর্জনে মনে হল চারপাশ তছনছ করে ঘূর্ণিঝড় উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ডেকের ওপরের সমস্ত আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে গেল। সম্পূর্ণ জাহাজে এক অভিশপ্ত মায়াবী নিস্তব্ধতা।
সম্বুদ্ধ নিশ্চল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎই সেই ঘন কালো কুয়াশা কেটে যেতে শুরু করে। সম্বুদ্ধর মাথার মধ্যে যে একটা নেশাতুর অনুভূতি হচ্ছিল, সেটাও ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে আসতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেকে আবিষ্কার করে তার স্টাডিরুমে। একা। তার টেবিলে রাখা সেই বোতলটার সামনে। সম্বুদ্ধ বুঝতে পারে যে, সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। এমনিতে স্লিপ ওয়াকিং-এর অভ্যাস তার নেই, তবু হঠাৎ আজ কেন যে..
সম্বুদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে যাবে, ঠিক সেই সময় হঠাৎ মনে হল, কানের কাছে কে যেন একটা ফিশফিশিয়ে কিছু বলেই সরে গেল। সম্বুদ্ধ চকিতে পিছনে ঘুরে তাকায় টেবিলের ওপর রাখা সেই কাচের শিশিটার ভিতর থেকে একটা হালকা নীলাভ আভা বেরিয়ে সারা ঘরকে যেন আলোকিত করে তুলেছে।
হঠাৎ সম্বুদ্ধর মাথার মধ্যে একটা অদ্ভুত একটানা একঘেয়ে গুনগুন শব্দ হতে শুরু করে। তার ঘুম-ঘুম পায়, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। যন্ত্রচালিতের মতো সে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সেই কাচের শিশিটার দিকে।
.
পরদিন সকালে খবরের কাগজের চতুর্থ পাতার এককোণে একটা দ-কলাম খবর বেরোল। কলকাতা মিউজিয়ামে চাকরিরত তরুণ ইতিহাসবিদ রহস্যজনকভাবে তার নিজ বাসভবন থেকে নিখোঁজ।
