(১৩) ডোন্ট এভার ডাউট মি ডার্লিং

(১৩) ডোন্ট এভার ডাউট মি ডার্লিং

“সম্বুদ্ধ… মানে সম্বুদ্ধ চক্রবর্তী? সে তো আমার ক্লাসমেট।”

“হ্যাঁ। শুধু ক্লাসমেট নয়, আপনারা একই হস্টেলে তিন বছর থেকেছেন।” টেবিলের ওপর একটা পেপারওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন আলফা।

“হ্যাঁ হ্যাঁ। আমার ঘরের ঠিক উলটোদিকেই ছিল সম্বুদ্ধর ঘর। কিন্তু আপনারা কি শিয়োর যে, সম্বুদ্ধর কাছেই সেই পৃষ্ঠাগুলো ছিল?”

মিস্টার পাই হেসে উঠলেন। বললেন, “উই আর ড্যাম শিয়োর, ডার্লিং। ইন ফ্যাক্ট আমরা এটাও জানি যে, এই মুহূর্তে সেই পৃষ্ঠাগুলো কোথায় আছে। কিন্তু মুশকিল হল, সেখানে গিয়ে পৃষ্ঠাগুলো নিয়ে কে আসবে!”

চোখের ইশারায় পাইকে থামিয়ে আলফা আবার বলতে শুরু করলেন, “ব্যাপারটা আপনাকে গোড়া থেকে বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। আপনি নাইটস টেম্পলারদের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি। প্রথম ক্রুসেডের সময় যখন মুসলিম আর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল, তখন নাইটস টেম্পলাররা খ্রিস্টধর্মের হয়ে যুদ্ধ করেছিল। সেই সময় ইউরোপের যে-কোনও মনার্কের থেকে তাদের প্রাচুর্য এবং শৌর্য দুইই বেশি ছিল। তারপর একসময় ফ্রান্সের তৎকালীন রাজার ষড়যন্ত্রে নাইটস টেম্পলারকে ভেঙে দেওয়া হয়।”

“রাইট ইউ আর। এই অবধি ইতিহাস আমরা সকলেই কমবেশি পড়েছি। কিন্তু যেটা আমরা জানি না, সেটা হল নাইটস টেম্পলাররা খুব অল্পসংখ্যক হলেও আজও ভীষণভাবে অ্যাকটিভ। কিন্তু তারা এখন একটা সিক্রেট অর্গানাইজেশন হিসেবে কাজ করে। ইউরোপে যখন তাদের মেরে ফেলা শুরু হয়, তারা কোনওভাবে ইউরোপ থেকে পালিয়ে এসে প্রথমে দীর্ঘদিন রোমানিয়া, এবং পরবর্তীকালে রোমানিয়ার অত্যাচারী শাসক ভ্লাদ টেপোরের সঙ্গে অটোমান সুলতান এবং হাঙ্গেরির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হলে সেখান থেকে চলে আসে আমাদের ভারতবর্ষে। কারণ সেই সময় ভারতবর্ষে অখণ্ড হিন্দু রাজ চলছে। গোটা বিশ্বের নিরিখে ভারত তখন পলিটিক্যালি স্টেবল। মোগলরা তখনও ভারতবর্ষ আক্রমণ করেনি। সেই থেকে এখন অবধি নাইটস টেম্পলাররা ভারতবর্ষে বিভিন্ন জায়গায় আপনার-আমার মতো সাধারণ মানুষের বেশে আত্মগোপন করে আছে। হয়তো আপনি জানেন না, আপনার বহু বছরের পরিচিত প্রতিবেশী অথবা আপনার কলেজের টিচার এই অর্গানাইজেশনের একজন অ্যাকটিভ মেম্বার। কোডেক্স গিগাস-এর বারোটা পৃষ্ঠা এবং একটা ‘হোলি নেল’ অর্থাৎ যে পেরেক জিশু খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করার সময় তার পায়ে বিদ্ধ করা হয়েছিল, সেই দুটো জিনিস নাইটস টেম্পলাররা সযত্নে নিজেদের কাছে গচ্ছিত রেখেছিল। তাদের বিশ্বাস, সেই বারোটা পৃষ্ঠায় এমন কিছু উপাচার লেখা রয়েছে, যার দ্বারা স্বয়ং শয়তানকে পৃথিবীতে আমন্ত্রণ জানানো যায়। এবং সেই শয়তানকে আমন্ত্রণকারী নিজের দেহে জায়গা দেন। ফলত সেই ব্যক্তি হয়ে উঠবেন সর্বশক্তিধর। প্রায় অমর। তখন তাকে হত্যা করার একমাত্র অস্ত্র হল সেই ‘হোলি নেল’। যা-ই হোক, মিথলজি অ্যাপার্ট, একটা কাচের ক্যাপসুলে স্টোর করে রাখা সেই কোডেক্স গিগাস-এর বারোটা পৃষ্ঠা নাইট টেম্পলারদের মেম্বারদের মধ্যেই একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে চুরি করে নিয়ে পালায়। পরে সেটাকে গোপনে দেশের বাইরে পাচার করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায়। আর সেই ক্যাপসুলটাই ঘটনাচক্রে হাত ঘুরে এসে পড়ে আপনার বন্ধু সম্বুদ্ধ চক্রবর্তীর হাতে, যাঁকে নাইট টেম্পলাররা অপহরণ করে। কারণ তিনি ছিলেন দক্ষ ইতিহাসবিদ, একনজরেই জিনিসটাকে চিনে গিয়ে থাকবেন। আমার বিশ্বাস, নাইটস টেম্পলাররা নিজেদের এবং সেই ক্যাপসুলটার অ্যানোনিমিটি বজায় রাখার জন্য সম্বুদ্ধকে কিডন্যাপ করে। কারণ তাঁকে সেই রাতের পর থেকে জীবিত বা মৃত কোনওভাবেই পাওয়া যায়নি।”

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে ইন্দ্র। তারপর বলে, “সেদিন রাত্রিবেলায় আমাকে ফোন করেছিল সম্বুদ্ধ। সম্ভবত এই বিষয়েই কিছু বলার জন্য। আমি বলেছিলাম, বাড়ি ফিরে আমি কল করে নেব। কিন্তু…”

“আমাদের কাছে খবর আছে, উত্তরাখণ্ডের গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা ভীষণ সুরক্ষিত জায়গায় ওরা এই ক্যাপসুলটাকে রেখেছে। আমাদের মিশন হল সেই ক্যাপসুলটা সেখান থেকে এক্সট্রাক্ট করে আমাদের এমপ্লয়ারের হাতে তুলে দেওয়া।”

“তার মানে কি এয়ারপোর্টে আমার ওপরে যারা নজর রাখছিল, তারাও নাইটস টেম্পলারের মেম্বার?”

“এলিমেন্টারি ওয়াটসন!” হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন মিস্টার পাই। তারপর মুচকি হেসে আবার বললেন, “তাদের কাছে ইনফর্মেশন ছিল যে, সম্বুদ্ধর সঙ্গে শেষ কথা তোমারই হয়েছে। তাই তারা তোমাকে টার্গেট করছিল। সম্ভবত ভেবেছিল তোমার কাছে কোনও ক্রিটিক্যাল ইনফর্মেশন সম্বুদ্ধ লিক করেছে।”

“বেশ। বুঝলাম। কিন্তু এবার আমি একটা ব্যাপার জানতে চাই। মিস্টার আলফা একটু আগে বললেন যে, আমাকে রিক্রুট করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। সেটা কী?”

“আলবাত!” আলফা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হাত বাড়িয়ে ল্যাপটপটা অন করে ওদের মাথার পিছনের দেওয়ালে ঝোলানো স্লাইডে একটা ছবি দেখালেন। ছবিতে একটা ন্যাপকিনের ওপর পেন দিয়ে কয়েকটা কথা লেখা রয়েছে;

“Diabolus est numerus veniet Non enim aliud faciam a facie diaboli”

এইবার ইন্দ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে আলফা বললেন, “সম্বুদ্ধবাবুর কিডন্যাপ হওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে আমাদের লিংক বলতে শুধু এই ন্যাপকিনটা। কিডন্যাপ হওয়ার পর সম্বুদ্ধবাবুর বাড়ির ডাস্টবিন থেকে এটা উদ্ধার করা হয়। যেহেতু ওঁর সঙ্গে শেষকথা আপনারই হয়েছিল, তাই এটা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে যে এই কথাগুলো আপনাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা।”

“হুম। ক্লাসিক্যাল ল্যাটিন। এর লিটারেল ট্রানস্লেশন করলে দাঁড়ায় ‘দ্য ডেভিল’স নাম্বার উইল কাম। বাট ডোন্ট ট্রাস্ট দ্য ডেভিল’। অবশ্য টু বি – ফ্র্যাঙ্ক, এটা দিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছে সম্বুদ্ধ, তা আমি বুঝতে পারছি না।”

*

ঘড়িতে রাত প্রায় বারোটা। চারদিক নিস্তব্ধ। বেসমেন্টে ইন্দ্ৰ টার্গেট প্র্যাকটিস করছে। অবশ্য আসল বন্দুকে নয়, ওদের বেসটা লোকালয়ের মধ্যে। আসল বন্দুকে টার্গেট প্র্যাকটিস করতে গেলে আওয়াজ যাবে বাইরে। তাই ওরা বিবি গান ব্যবহার করে। দেখতে বা ব্যবহারের পদ্ধতি আসল বন্দুকের মতো হলেও, গুলির বদলে থাকে লোহার ছোট ছোট বল। আর গানপাউডারের দলে ব্যবহৃত হয় গ্রিন গ্যাসের ছোট সিলিন্ডার। দূরে একটা প্রমাণ সাইজের মানুষের আকারের কার্ডবোর্ডের কাটআউট ঝোলানো। ইন্দ্র হলঘরের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই কাটআউটটায় টার্গেট প্র্যাকটিস করছিল। সে সামান্য অন্যমনস্ক। মাথায় ঘুরছে হাজারো চিন্তা। এখনও চোখ বুজলে সম্বুদ্ধর গলাটা কানে ভেসে উঠছে। সেদিন কী যেন একটা আর্জেন্ট কথা বলতে গিয়েও বলেনি সম্বুদ্ধ। সেই সময় সে রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে পরমার জন্য অর্কিড কিনছিল। খুব সম্ভবত ততক্ষণে ফুল কেনা হয়েও গিয়েছিল। সে বাঁ হাতে ফুলের তোড়াটা ধরে ডান হাতে গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে বসতে যাবে, ঠিক সেই সময় এসেছিল ফোনটা। প্রায় বছর পাঁচেক বাদে হঠাৎ সম্বুদ্ধর ফোন পেয়ে বেশ অবাকই হয়েছিল ইন্দ্র। মনে মনে ভেবেছিল, বাড়ি, ফিরে রাত্রিবেলা ফোন করে পুরোনো বন্ধুর সাথে আড্ডার মৌতাতে অনেক কথা হবে। যদি ও কলকাতায় থাকে তাহলে একদিন বাড়িতে ইনভাইটও করবে। কিন্তু কী থেকে যে কী হয়ে গেল…

সেইদিনের কথা ভাবলে আজও ইন্দ্রর সারা গা কেঁপে ওঠে আতঙ্কে। অ্যাপার্টমেন্টের চারতলায় লিফ্ট দিয়ে উঠে একদম সোজাসুজি নাক বরাবর পড়ে ইন্দ্রর চারশো দুই নম্বর ফ্ল্যাট। দরজার কলিং বেল টিপে সাড়া না পেয়ে পরমাকে একটা ফোন করে ইন্দ্র। কোনও উত্তর নেই। এমনকি তার লাস্ট হোয়াট্সঅ্যাপ মেসেজটাও সিন করেনি পরমা। পকেট হাতড়ে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেই ইন্দ্র যা দেখে, তাতে তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। ইন্দ্র দেখে, ঘরের এককোণে অসহায়ের মতো গুটিশুটি হয়ে বসে আছে পরমা। তার দু-চোখে তীব্র আতঙ্কের ছাপ। চোখের কোলে জল টলটল করছে। ছোট্ট লিলিকে দু-হাতে আঁকড়ে ধরে আছে সে। লিলির সারা শরীরও তিরতির করে কাঁপছে। ফরসা মুখ আতঙ্কে ফ্যাকাশে। আর তাদের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা অদ্ভুতদর্শন মানুষ। অবশ্য তাকে মানুষ বলা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। কারণ মানুষের মতোই দুটো চোখ, একটা নাক আর দুটো কান থাকলেও, সেটা আদপে একটা পশু। দু-চোখের মণিতে যেন ধিকধিক করে জ্বলছে লাল আগুনের শিখা। কান দুটো অস্বাভাবিকরকম সুঁচালো। মুখের সামনের দিকটা কোনও হিংস্র শ্বাপদের মতো হিংসায় পরিপূর্ণ। তীক্ষ্ণ শলাকার মতো সরু সরু ধারালো দাঁত। কানের পাশ থেকে দুটো পাকানো শিং যেন মাথা ফুঁড়ে বেরিয়েছে। আর সেই হিংস্র মুখের ভিতর থেকে উঁকি মারছে সাপের মতো চেরা জিব। সারা ঘরে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়েছিল পরমা। সেই আলো-আঁধারিতে ওই অদ্ভুতদর্শন জীবটাকে যেন আরও বিকট, আরও ভয়ংকর লাগছে। আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে ইন্দ্র। আর সেই আওয়াজ শুনে অদ্ভুতদর্শন প্রাণীটা মাথা ফিরিয়ে ইন্দ্রর দিকে তাকায়। কী ঠান্ডা, কী নির্মম সে চাহনি। ইন্দ্রর সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে থাকে সে। হাত থেকে পড়ে যায় সাদা অর্কিড, চাবির থোকা। এইবার সেই বিকটদর্শন প্রাণীটা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে ইন্দ্রর দিকে। তার ডান হাত আস্তে আস্তে ওপরের দিকে তোলে। ইন্দ্র দেখতে পায় সেই হাতের আঙুলগুলো অস্বাভাবিকরকম লম্বা। নখগুলো তীক্ষ্ণ, বাঁকানো। ঠিক সেই সময় দূরে টেবিলের ওপর রাখা পরমার ফোনটা সশব্দে বেজে ওঠে। প্রাণীটা চকিতে মাথা ঘুরিয়ে সেই ফোনের দিকে তাকায়। এই সুযোগ! ইন্দ্র ভাবে, নিজেকে না হোক, পরমা আর লিলিকে তাকে বাঁচাতেই হবে। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আচমকা ধাক্কা মারে সেই প্রাণীটাকে। প্রাণীটা নিজের জায়গা থেকে একচুল নড়ে না। নিজের ধাক্কার প্রতিঘাতে ইন্দ্র ভারসাম্য হারিয়ে পিছনের খোলা দরজা দিয়ে ছিটকে পড়ে ফ্ল্যাটের বাইরের করিডরে। আর সেই মুহূর্তে ইন্দ্রর জুতো আটকে যায় মেঝেতে পেতে-রাখা কার্পেটে। ইন্দ্র ভারসাম্য হারিয়ে শূন্যে কিছু চেপে ধরার জন্য হাত বাড়ায়। ওর হাতে এসে যেটা ঠেকে, সেটা ওদের ফ্ল্যাটের দরজার হাতল। মুহূর্তের মধ্যে ফ্ল্যাটের দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়। ইন্দ্র দরজার বাইরে করিডরে ছিটকে পড়তে পড়তে দরজাটা বন্ধ হওয়ার আগের মুহূর্তে দেখতে পায়, তার পায়ে আটকে যাওয়া কার্পেটের হ্যাঁচকা টানে টেবিলের ওপরে রাখা জ্বলন্ত মোমবাতি পুরু কার্পেটের ওপর উলটে পড়ে লাল আগুনের লেলিহান শিখা আস্তে আস্তে ঘরের ভিতরটা অধিকার করে নিচ্ছে। ফ্ল্যাটের মূল দরজা বাইরে থেকে টেনে দিলে ভিতর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যায়। চাবি ছাড়া সে দরজা খোলার আর কোনও উপায় নেই। ইন্দ্ৰ পাগলের মতো দু-পকেট হাতড়ে চাবি খুঁজতে থাকে। কিন্তু চাবি সে ঘরের ভিতরেই ফেলে দিয়েছে। সে উন্মাদের মতো দরজা ধাক্কাতে থাকে, কিন্তু নিষ্ফল প্রচেষ্টা। ভিতর থেকে পরমা আর লিলির আর্তচিৎকার ভেসে আসে। অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি তলায় দুটো করে ফ্ল্যাট। ইন্দ্রর পাশের ফ্ল্যাট মিস্টার বানসালির। বানসালি এখানে থাকেন না। ইউএসএ-তে নিজের মেয়ের কাছেই থাকেন। অবরে-সবরে কলকাতায় এলে এই ফ্ল্যাটে এসে ওঠেন। ইন্দ্ৰ দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সেই খালি ফ্ল্যাটের দরজাতেও ধাক্কা দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সংবিৎ ফিরলে সিঁড়ি বেয়ে ছুটে যায় ওপরের তলায়। চিৎকার ও চেঁচামেচি শুনে সেখানকার বাসিন্দারা ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসছিলেন। এরপরের কাহিনি খুব সংক্ষিপ্ত। যতক্ষণে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকা হয়, ততক্ষণে পরমা আর লিলির পুড়ে কালো হয়ে-যাওয়া দেহ দুটো থেকে ধিকিধিকি ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

.

ম্যাগাজিনে গুলি অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ইন্দ্র তবুও কতকটা যন্ত্রচালিতের মতো ট্রিগারটা টিপে যাচ্ছিল বারংবার। ব্ল্যাংক বন্দুকে খটাখট আওয়াজ উঠছিল, কিন্তু ইন্দ্রর মন সেদিকে ছিল না। হঠাৎ তার সংবিৎ ফেরে কাঁধে রাখা একটা হাতের স্পর্শে। চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকায় সে। গামা। ইন্দ্র অপ্রস্তুতের মতো হাসে। গামা সে হাসির প্রত্যুত্তর না দিয়ে বললেন, “যতক্ষণ হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে, ততক্ষণ কোনওভাবে মনকে ডাইভার্ট হতে দেবেন না। এই ভয়ংকর পৃথিবীতে বন্দুকের নলের থেকে ভয়ংকর যদি কিছু থাকে, তা হল সেই বন্দুকধারীর অন্যমনস্কতা।”

পাশের টেবিলে বন্দুক রেখে ওরা দু-জন এসে বসে একটু দূরে, সিঁড়ির ধাপে। ইন্দ্র গামাকে প্রশ্ন করে, “আপনি ঘুমোননি?”

“আমি অনেক রাত অবধি জেগে থাকি। ঘুম আসে না সহজে। ওপর-নীচে একা একাই ভুতের মতো ঘুরে বেড়াই,” বলে সামান্য হাসলেন গামা। তারপর বললেন, “হঠাৎ নীচ থেকে বন্দুকের আওয়াজ শুনে নেমে এলাম। আসলে রাত্রিবেলা চারপাশ এত নিঝুম থাকে, এয়ারগানের আওয়াজও দোতলা অবধি অনায়াসে পৌঁছে যায়। যা-ই হোক, অন্যমনস্ক হয়ে কী ভাবছিলেন? অতীত?”

“হ্যাঁ। ভবিষ্যৎ এই মুহূর্তে এতটাই আনপ্রেডিক্টেবল যে সেটা নিয়ে আর বিশেষ কিছু ভাববার নেই,” কথা শেষ করে হেসে ফেলল ইন্দ্র। সে হাসিতে গামাও যোগ দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ হেসে অবশেষে হাসি থামিয়ে ইন্দ্ৰ গামাকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপনার পরিবারের কেউ নেই?”

“ছিল,” গামার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

ইন্দ্র একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে। গামা অবশ্য নিজের মনেই বলে চলেছেন, “দু-বার…. দু-বার আমি নিজে গুলি খেয়েছি। একবার পেটের সামান্য নীচের দিকে, অন্যবার থাইতে। নিজে গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও চিকিৎসা করে গেছি। দুটো ব্রেভরি অ্যাওয়ার্ড রয়েছে আমার ঘরে,” কথাটা বলেই নিজের মনে হেসে নিজেকেই শুধরে নেন গামা, “সরি, ছিল। এখন আর নেই।”

“কী? অ্যাওয়ার্ড?”

“না, ঘর। জানেন তো, আমার শেষ পোস্টিং যেখানে ছিল, সেখানে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও হসপিটাল নেই। যদি আপনার সীমিত মেডিক্যাল সাপ্লাই শেষ হয়ে যায় তাহলে চোখের সামনে আপনার নিজের প্রিয় বন্ধুকে মারা যেতে দেখবেন তিলে তিলে। চারপাশে শুধু পাহাড় আর বরফ। শালা, যারা পাহাড় আর বরফ দেখতে বেড়াতে যায়, তারা যদি মাস দুয়েক ওখানে থাকে তো সব রোমান্টিসিজম চচ্চড়ি হয়ে যাবে।” কথা বলতে বলতেই হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দ পেয়ে দু-জনেই ফিরে তাকিয়ে দেখে বিটা, মানে ইভানি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসছে। ওদের দু-জনকে দেখতে পেয়ে একগাল হেসে বলে, “আরেব্বাবা! দুই মক্কেল এখানে বসে কী করছে!” গামা ইভানির কথায় মুচকি হেসে হালকা চালে বলেন, “এই তো, তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।”

ইভানি কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়, “সে তো সবসময়ই হচ্ছে। তোমরা ভাবো আমি টের পাই না। সব শালা আমার শত্রু।”

গামা হাসতে হাসতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে চলে যান। ইভানি নেমে এসে ইন্দ্রর পাশে সিঁড়িতে বসে বলে, “মাঝরাতে কী করছিলেন শুনি?”

ইন্দ্র হেসে চোখের দৃষ্টিতে পাশের টেবিলে রাখা বন্দুকটার দিকে দেখায় ইভানি ভ্রূ তুলে অবাক হবার ভঙ্গি করে বলে, “আরে বাবা! এ তো জেমস বন্ড!”

ইন্দ্র হেসে ফেলে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, গামার পরিবারের সঙ্গে কী হয়েছিল, তুমি জানো?”

এই প্রশ্নে ইভানি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর কেটে কেটে বলে, “গামা আর্মিতে থাকার সময় একজন আহত গুলিবিদ্ধ সোলজারকে বাঁচানোর জন্য এক্সপেরিমেন্টাল ড্রাগ ইউজ করে, যা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়। মানে ওই টোটকা জড়িবুটি আর কী। সম্ভবত সেই সময় হাতের কাছে অ্যাপ্রুভড ড্রাগ না পেয়ে সেখানকার স্থানীয় লোকেদের ব্যবহার করা এক ধরনের জড়িবুটি সে তার পার্টনারের ক্ষতস্থানে ব্যবহার করে। দুর্ভাগ্যবশত জায়গাটা বিষিয়ে যায় এবং সেই সোলজার সেপটিসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এরপরে গামার মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তাকে ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে সাসপেন্ড করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে এবং নন-অ্যাপ্রুভড ড্রাগ ব্যবহারের জন্য সম্ভবত জেলও হয়। জেল খেটে গামা যখন নিজের বাড়িতে ফেরে, জানতে পারে, তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।”

ইন্দ্র মাথা নীচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর স্বগতোক্তির স্বরে বলে, “আই গেস উই অল আর ফাক্ড আপ।”

ইভানি তার কাঁধে মাথা রাখে। ফিশফিশ করে বলে, “সাম ফাক্‌ড আপ পিপ্‌ল কেম টুগেদার টু ফর্ম আ ফাক্ড আপ টিম।” ইন্দ্র উত্তর না দিয়ে নেমে আসে নীচে। হাতে বন্দুক তুলে নিয়ে ম্যাগাজিন ভরতি করে তাক করে। সামনের টার্গেটের দিকে। পায়ে পায়ে পাশে এসে দাঁড়ায় ইভানি। ইন্দ্রর প্রথম গুলিটা টার্গেটের বুকের ডানদিকে এসে লাগে। ইভানি মুচকি হেসে বলে, “নট আ ফ্যাটাল পয়েন্ট। এভাবে গুলি করলে ইউ আর আ ডেড ম্যান।” ইন্দ্ৰ মুচকি হেসে বলে, “তাহলে আপনি দয়া করে আমাকে দেখিয়ে দিন হাউ নট টু বি আ ডেড ম্যান। আমরা সবাই রেগুলার টার্গেট প্র্যাকটিস করি। কিন্তু তুমি কখনও বন্দুক হাতে তোলো না।”

“আমার আঙুল বন্দুকের ট্রিগারের তুলনায় কম্পিউটারের কিবোর্ডে বেশি সাবলীল।”

“সে না-হয় বুঝলাম। কিন্তু আমাদের মিশন কিন্তু খুব বিপজ্জনক হতে চলেছে। ডোন্ট ইউ নিড টু ডিফেন্ড ইয়োরসেল্ফ?”

“নো আই ডোন্ট। তার জন্য তুমি আছ তো। নেই?” ইভানি এগিয়ে এসে ইন্দ্রর কানের লতি কামড়ে ধরে। ইন্দ্র চোখ বুজে ফেলে আবেশে। ইভানি কামড়ের জোর বাড়ায়, ইন্দ্রর মুখ থেকে একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরিয়ে আসে। আস্তে আস্তে ইভানি কানের লতি ছেড়ে ওর ঠোঁটের দিকে নিজের ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যায়। ইন্দ্র নিজের গালে ইভানির গরম নিঃশ্বাসের স্পর্শ পায়। ইভানির নিলয়-অলিন্দে চলকে ওঠা রক্তের শব্দ পৌঁছোয় ইন্দ্রর কান অবধি। তারও নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। ক্রমশ দু-হাতে ইভানির কোমর জড়িয়ে ধরে। এক ঝটকায় নিজের কাছে টেনে নেয়। ইভানির ঠোঁটের আদরে আস্তে আস্তে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে থাকে, হঠাৎ পরপর গুলির আওয়াজে চমকে ওঠে সে। ইন্দ্রর অজান্তেই ইভানি পাশের টেবিলে রাখা বন্দুকটা তুলে নিয়ে দূরের সেই টার্গেটে গুলি করেছে পরপর চারটে। চারটে গুলিই সেই কাট-আউটটার দুই ভ্রূর মাঝবরাবর ফুটো করে বেরিয়ে গেল। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। ইভানি ইন্দ্রর চোখের দিকে মুখ তুলে তাকায়। তার চোখের চঞ্চল তারায় অবাধ্য দুষ্টুমির ঝিলিক। ইন্দ্রর কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশিয়ে বলে, “ডোন্ট এভার ডাউট মি ডার্লিং।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *