(১৬) উইন্ডচাইম আর চোরাবালি

(১৬) উইন্ডচাইম আর চোরাবালি

কিছুদিন আগে যেদিন পালিকা বাজার গিয়েছিল, একটা উইন্ডচাইম কিনে এনেছে ইন্দ্ৰ। খোলা জানালার ফ্রেমের ঠিক মাঝখানে সেটা সরু সুতো দিয়ে বাঁধা। সকালের দমকা হাওয়ার দাপট লম্পট যুবকের মতো সেটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার, টুং টাং সুরে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে সেটা। তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো এক টুকরো রোদ ওই স্বচ্ছ উইন্ডচাইমের খাঁজে খাঁজে ধাক্কা খেয়ে ভাঙচুর হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। সেরকমই এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে ইন্দ্রর চোখে-মুখে। ইন্দ্ৰ মুখ থেকে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে পাশ ফিরে শোয়। ইন্দ্রর পাশে ইভানি শুয়ে, চোখ বন্ধ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নিশ্বাস নেওয়ার সময় নাকের ডগাটা ফুলে ফুলে উঠছে। ফরসা মুখ ঘামে ভিজে চকচক করছে। ইন্দ্র হাত বাড়িয়ে একটা আঙুল দিয়ে ইভানির গালে হাত বোলায়। ইভানি চোখ সামান্য ফাঁক করে মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট আদুরে আওয়াজ করে ইন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে। ইন্দ্রর নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। ইভানি চোখ খোলে। ইন্দ্রর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। ইন্দ্ৰ হেসে জিজ্ঞেস করে, “কী দেখছ?”

“তোমার চোখের মণিতে আমার ছায়া পড়েছে। নিজেকে দেখছি।”

“বুঝলাম।”

“নাহ্। কিচ্ছু বোঝোনি। আচ্ছা, এটা লিলির ক্লিপ?” ইভানির হাতে লিলির সেই লাল ক্লিপটা।

“হুম। লিলি স্কুলে যাওয়ার সময় পরত। ওর স্কুলের ড্রেস ছিল সাদা শার্টের ওপর লাল ফ্রক। স্কুল ড্রেসের সঙ্গে ক্লিপটা মানাত ভালো।” একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ইন্দ্রর বুক চিরে। সে উঠে বসে বিছানায়। ইভানিও উঠে বসে। একদলা কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছে বুকে। ইভানির হাত থেকে ক্লিপটা নিয়ে অন্যমনস্কভাবে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে ইন্দ্ৰ। ইভানি এগিয়ে এসে ইন্দ্রর কাঁধে মাথা রাখে। ইন্দ্র নীচু স্বরে বলতে থাকে, “জানো, যখন লিলি হয়, আমি সেখানে ছিলাম। আসলে পরমারই ইচ্ছে ছিল, আমি থাকব ডেলিভারি রুমে। যখন পরমার গোটা শরীরটা যন্ত্রণায় বেঁকে যাচ্ছিল, তখন আমার হাতটা সবটুকু শক্তি দিয়ে চেপে ধরেছিল। আমি ওর সেই কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার রাগ হচ্ছিল তখনও জন্ম না-নেওয়া আমাদের সন্তানের ওপর। সেই মুহূর্তে পরমার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, আমি বোধহয় কোনওদিনও আমাদের সন্তানকে ভালোবাসতে পারব না। যখনই তাকে দেখব, আমার পরমার এই কষ্টটা মনে পড়বে।”

“তারপর?”

“তারপর ডক্টর আমার আগে পরমার হাতে লিলিকে তুলে দিলেন। লিলি ওর ছোট্ট ছোট্ট আঙুল দিয়ে পরমার গালের ওপর আঙুল বোলাল। পরমা হেসে উঠল। আমি দু-হাত বাড়িয়ে লিলিকে কোলে নিলাম। ছোট্ট ছোট্ট দুটো হাত, আধবোজা চোখ, মুখটা একটু হাঁ করা। সেখান থেকে মাঝে মাঝে ছোট্ট জিবটা বের করছে।” ইন্দ্র নিজের মনেই হেসে ওঠে। ইভানি দ্যাখে, ইন্দ্রর চোখের কোণে একফোঁটা অশ্রু চিকচিক করছে, গলা ভারী হয়ে এসেছে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলতে শুরু করে, “পরমা আমায় ভরসা পাচ্ছিল না। আমার হাতের নীচ থেকে হাত সরাচ্ছিল না। আমি মুখ তুলে দেখলাম ওর ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি। তারপর থেকে যখনই লিলির দিকে তাকাতাম, আমার পরমার সেই হাসিটা মনে পড়ত।”

ইন্দ্র দুই হাঁটু ভাঁজ করে তার মধ্যে থুতনি রেখে বসে থাকে। ইভানি পিঠে আলতো হাত রাখে, কোনও কথা বলে না। সে জানে, পুরোনো স্মৃতি ইন্দ্রকে তাড়া করে বেড়ায়। অনেক রাত অবধি তাকে ছাদে একা একা পায়চারি করতে দেখেছে। কাল সারারাত দুঃস্বপ্ন দেখে ছটফট করতে দেখেছে। ইন্দ্রর ওই চোখের মণিতে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। ভীষণ গভীর সে মায়া। যেন একটা আস্ত ঘূর্ণিঝড় ওই চোখের চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে পারে। ইভানি ওই চোখে চোখ রাখতে ভয় পায়। সে জানে ইন্দ্রর শরীরের কাঠামোতে চামড়ার পরতটুকু ছাড়া আর কিছুই তার নয়। কোনওদিন ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না।

ইন্দ্র মুখ ফিরিয়ে ইভানির দিকে তাকায়। বলে, “তুমি তোমার পুরোনো দিনের কথা তো কখনও বলো না।”

ইভানি হাসে। তারপর উদাস গলায় বলে, “আমার কোনও অতীত নেই, ইন্দ্র। আমার কোনও ভবিষ্যতও নেই। আই অ্যাম আ ট্রাভেলার। হেঁটে চলেছি রোজ। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছি। পাহাড়ি নদীর জলে হাত-পা ধুয়ে তেষ্টা মিটিয়ে গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ছি। আবার পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে আগের দিনের ক্লান্তি ভুলে নতুন করে পথ চলছি। ইভানির শুধু বর্তমান আছে।”

“আমি পাহাড়ি নদী না গাছের ছায়া?”

“তুমি চোরাবালি।”

*

ঘুম ভেঙে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে সম্বুদ্ধ। এখনও তার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগে। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে সে উঠে বসে আতঙ্কে। দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনিয়ে আসে তার চিন্তার আকাশে। গোটা দুনিয়ার কাছে তার আর কোনও অস্তিত্ব নেই। হয়তো পরদিনের খবরের কাগজের ভিতরের পাতার কোনও এককোণে দু-কলামের একটা খবর বেরিয়েছিল, ‘কলকাতা মিউজিয়ামের একজন কিউরেটর অপহৃত। তদন্ত চলছে।’ খবরের কাগজের আশি শতাংশ পাঠক সেই কলাম স্কিপ করে গিয়েছেন, বাকি কুড়ি শতাংশ পরদিন সকালে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দিতে ভুলে যাবেন। মাথার দু-পাশে হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে থাকে ও। তার মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। একটু পর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। চারদিকে একটা পোড়া-পোড়া গন্ধ। প্ৰথম প্ৰথম খুব অসুবিধে হলেও পরে অভ্যেস হয়ে গেছে। সম্বুদ্ধ এসে জানালার কাছে দাঁড়ায়। জানালার বাইরে এক শহরের ধ্বংসাবশেষ। উঁচু উঁচু বাড়ি ভেঙেচুরে পড়ে আছে। তাদের গা বেয়ে উঠেছে সবুজ লতাপাতা। রাস্তার পাশে পড়ে-থাকা পরিত্যক্ত গাড়িও কবজা করেছে সবুজ পরজীবী। বাইরে একঝলক তাকালে মনে হয়, বিশাল এক সবুজ দৈত্য ধীরে ধীরে গ্রাস করছে এই বিশাল শহর। তবে সব থেকে বেশি কষ্ট লাগে যখন এই অভিশপ্ত শহরের রাস্তাঘাট, শুনশান চার মাথার মোড় তার খুব চেনা লাগে। একটা কষ্ট দানা বাঁধে অজান্তে। বুকের মধ্যে মনে হয়, কেউ একটা ভারী পাথর বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। দরজা খুলে লম্বা করিডর। দু-পাশ থেকে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে একতলায়। মেহগনি কাঠের বার্নিশ করা সুদৃশ্য রেলিং। তাতে শতাব্দী প্রাচীন ধুলোর পরত। সম্বুদ্ধ সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসে। পায়া-ভাঙা ডাইনিং টেবিল, জং-ধরা ডালা খসে-যাওয়া ফ্রিজ, স্প্রিং বেরিয়ে আসা সোফা। সেই সোফায় বসে সামনে একটা ছোট টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে একটা বই পড়ছিলেন লিওনার্দো। বইয়ের মলাট ছিঁড়ে গিয়েছে। শুধু ‘জলের কোলাহল’ নামটুকু পড়া যাচ্ছে। সম্বুদ্ধর পায়ের শব্দ শুনে বই থেকে মাথা তুলে তাকান।

“গুড মর্নিং, সম্বুদ্ধবাবু। রাত্রে ঘুম ভালো হয়েছে তো?”

“আর ঘুম! এ কোথায় এনে ফেললেন আপনি। ইন দ্য মিডল অফ নোহোয়্যার!”

“নোহোয়্যার! বলেন কী মশাই! এ তো খাস কলকাতা।”

“সেই। আমাদের চেনা কলকাতা আর এটাকে বলা যায় না। কলকাতার কঙ্কাল বলতে পারেন। বাইরে তাকালেও কষ্ট হয়। যা-ই হোক, এটা কত সাল?”

“পনেরোই অক্টোবর, দু-হাজার বিরানব্বই।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সম্বুদ্ধ আবার বাইরের দিকে তাকায়। হাওয়ায় গুঁড়ো গুঁড়ো কালো ধুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, মৃতদেহ দাহ হওয়ার পর কাঠকয়লার গুঁড়ো হাওয়ায় উড়ছে। সে একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে, “পৃথিবীতে আর প্রাণ নেই?”

হা হা করে উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন লিওনার্দো। হাসতে হাসতেই বলেন, “কেন থাকবে না? প্রচুর প্রাণী আছে। আর উদ্ভিদ তো দেখতেই পাচ্ছেন। তবে হ্যাঁ, মানুষ বলতে আপাতত আমরা দু-জন। বাকি সবাই মোটামুটি বছর তিরিশেক আগেই হাওয়া হয়ে গেছে।”

সম্বুদ্ধ উত্তর দেয় না। একদৃষ্টে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। লিওনার্দো বলতে থাকেন, “আপনার পাসপোর্ট আর নতুন আইডেন্টিটির বাকি সব ডকুমেন্ট রেডি। আপাতত কিছুদিন দুবাইতে থাকবেন। তারপর দেখছি কী করা যায়।”

সম্বুদ্ধ সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ায়। বেশ বোঝা যায়, একসময় কলকাতার কোনও এক অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাড়ি ছিল এটা। দামি, সাবেকি আসবাব, শৌখিন দরজা-জানালা। জানালার ওপর একসময় রঙিন কাচের জাফরি ছিল। এখন ভেঙে পড়েছে। উলটোদিকের দেওয়ালে তিনটে বিশাল বিশাল পোর্ট্রেট ঝুলছে, অয়েল পেন্টিং। দুটো মোটা গোঁফ-দাড়িওয়ালা বিশালদেহী পুরুষ, আর একজন সদ্যবিবাহিতা রমণী। সম্বুদ্ধ একমনে সেদিকে তাকিয়ে ছিল। খেয়াল করেনি কখন লিওনার্দো পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

“এই বাড়ির সেজবউ। হঠাৎ ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মাত্র তেইশ বছর বয়সে মারা যান। শুধু চোখ দুটো দেখুন সম্বুদ্ধবাবু। সারা পৃথিবীর যে কোনও পুরুষকে মুহূর্তে ঘেঁটে দিতে পারে ওই দুটো চোখ। আমি এই শ্মশান হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে বারবার ফিরে আসি ওই দুটো চোখের টানে।”

“তাহলে ছবি কেন?”

“মানে?”

“মানে আপনি তো ইচ্ছে করলেই অতীতে গিয়ে নিজের চোখে দেখে আসতে পারেন এঁকে।”

“হুঁ। তা পারি। কিন্তু যাই না কেন জানেন? ভয়ে।”

“ভয়ে!”

“হ্যাঁ ভয়ে। ধরুন, গিয়ে দেখলাম মেয়েটির চোখে জাদু নেই। জাদু ছিল পেইন্টারের তুলিতে। হয়তো দেখলাম, যার চোখের আকর্ষণে বারবার ছুটে আসি সময়ের বেড়াজাল ভেঙে, সে শুধুই একজন আটপৌরে সাধারণ মানুষ। মনে মনে তার যে ছবি এঁকেছি মনের ক্যানভাসে কল্পনার তুলিতে, সেসবই মিথ্যে। কষ্ট পাব। তার থেকে এই বেশ।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *