(১) সিকিয়োর দ্য অ্যাসেট
ফেব্রুয়ারি ২০২০, কলকাতা:
দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একটা পা ব্যালকনির রেলিং-এ রেখে দূরে লেকের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইন্দ্র। ঠোঁটের কোণে একটা সিগারেট। তার ধূসর ধোঁয়ায় দূরে লেকের স্থির গভীর সবুজাভ জল আরও মায়াবিনী লাগছে। লেকের জলে একটা নাম-না-জানা পাখি, এক টুকরো আধডোবা খড়কুটোয় এক-পায়ে অপেক্ষারত নিজের শিকারের অপেক্ষায়। অদ্ভুত তার ধৈর্য। যেন শ্বেতপাথরে নিপুণ হাতে খোদাই-করা মূর্তি। জলের ওপর ছোট্ট ছোট্ট মাছ ভেসে উঠলেই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় একজোড়া লম্বা ঠোঁট নিখুঁত লক্ষ্যে নেমে আসছে। পরক্ষণেই আবার সব স্বাভাবিক, নিশ্চুপ। শুধু স্থির জলে বৃত্তাকার ঢেউ প্রমাণ হিসেবে রয়ে যায় সেই হত্যালীলার। পিছন ফিরে আধখোলা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতর উঁকি দেয় ইন্দ্র। ঘুমের আবেশে আচ্ছন্ন পরমা। ওদের একমাত্র মেয়ে লিলিকে দু-হাতে জড়িয়ে, মুখে এক-সমুদ্র শান্তি। একটা সুখের মিহি কুয়াশা যেন ঘিরে রয়েছে ওদের চারপাশে। অজান্তেই ইন্দ্রর মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠতে গিয়েও মিলিয়ে যায়। ইন্দ্রর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ঘরের ভিতর দুধসাদা বিছানার এক-কোণে ধিকধিক করে জ্বলছে আগুনের সোনালি লেলিহান শিখা। ধীরে ধীরে যেন হিংস্র শ্বাপদের মতো গ্রাস করছে পুরো বিছানাটাকে। বিছানার ঠিক মাঝখানে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন একগুচ্ছ লাল তাজা ফুলের মতো লিলি, আর তাকে সযত্নে জড়িয়ে ধরে পরমা। আতঙ্কে উন্মাদ হয়ে যায় ইন্দ্র। ছুটে এগিয়ে এসে দরজা খুলে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে কিন্তু দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও সেই দরজা একচুল ফাঁক করা যাচ্ছে না। অসহায়ের মতো দরজায় আঘাত করতে থাকে সে। পাগলের মতো চিৎকার করে সে ডাকছে পরমাকে, লিলিকে। কিন্তু তারা নির্বিকার। যেন ইন্দ্রর সেই চিৎকার কোনও অদৃশ্য দেওয়ালে বাধা পেয়ে ফিরে আসছে। কষ্ট, হতাশা, রাগ সবকিছু আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে ইন্দ্রকে। পরাজিত সৈন্যের মতো ব্যালকনির রেলিং ধরে বসে পড়ে সে। কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। বুকের মধ্যে যেন কেউ একটা ভারী এবড়োখেবড়ো পাথর ঘষটে নিয়ে যাচ্ছে। ইন্দ্ৰ পাগলের মতো দরজা ভাঙার নিষ্ফল চেষ্টা করে যাচ্ছে, হঠাৎ তলপেটে একটা লাথি খেয়ে তন্দ্রা ছুটে গেল ইন্দ্রর। একটা বিরক্ত গলা শুনতে পেল, “শালা, রোজ রাতে হাত-পা ছুড়বে আর আমাদের ঘুমের বারোটা বাজাবে।”
“কেন খুন করলি নিজের পরিবারকে?”, নিস্পৃহ কেঠো গলায় প্রশ্নটা করলেন অফিসার। ইন্দ্রর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে। পা দুটো জড়ো করে টেবিলের উপর তোলা। দাঁতের ফাঁকে কামড়ে ধরে রাখা সিগারেট। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে চিমনির মতো কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে গলগল করে। ইন্দ্র বসে একটা খাটো টুলে। হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। ঠোঁটের কশ বেয়ে গড়িয়েছে রক্তের ধারা। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। নীচু হতাশ গলায় জবাব দেয় সে, “আর কতবার একই প্রশ্নের উত্তর দেব জানি না। আমি ওদের খুন করিনি। আমার কাছে পরিবারই ছিল আমার দুনিয়া। পরমা আর লিলি আমার একমাত্র ভালোবাসার মানুষ। আমি তো আগেও আপনাদের বলেছি, আমি অফিস থেকে ফিরেই দেখি কেউ ওদের… তা-ও কেন আপনারা বারবার…”
কথা শেষ করার আগেই পিছন থেকে একজন ইন্দ্রর চুলের মুঠি ধরে টেনে টুলসুদ্ধ ইন্দ্রকে মেঝেতে ফেলে দিল। তারপর একটা ছোট নোংরা কাপড়ের টুকরো মুখের ভিতর গুঁজে দিল। তেলচিটে নোংরা কাপড়টা থেকে একটা পূতিগন্ধ নাকে আসছে। পেট গুলিয়ে বমির উদ্রেক হচ্ছে।
ঘরের কোণে একটা বড় গামলা রাখা। সেই লোকটা ইন্দ্রর একটা পা ধরে টেনেহিঁচড়ে সেদিকে চলল। চেয়ারে বসা অফিসার ততক্ষণে টেবিল থেকে পা নামিয়ে ঝুঁকে বসেছেন। ঠোঁটে কৌতুকের হাসি। গামলার জলে ইন্দ্রর মাথাটা ঠেসে ধরল লোকটা। দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুকের ভিতর থেকে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু সেই চাপা চিৎকার জলেই তলিয়ে যায়। পিঠের পিছনে বাঁধা হাত দুটো প্রাণপণে কিছু আঁকড়ে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। তারপর আস্তে আস্তে পরাজিত শরীর আত্মসমর্পণ করে। ইন্দ্র জ্ঞান হারাতে থাকে। ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে থাকে অবচেতনে। ঠিক তখনই আবার জল থেকে ইন্দ্রর মাথা টেনে বের করে আনে লোকটা। ইন্স উন্মাদের মতো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। কাশির দমক উঠে আসে বুকের ভিতর থেকে। নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে দু-ফোঁটা রক্ত। আবার পা ধরে টেনে এনে টুলটা সোজা করে তাতে ইন্দ্রকে বসিয়ে দেয় সে। ইন্দ্রর বিধ্বস্ত শরীর এলিয়ে পড়ে, কিন্তু পিঠে সজোরে মোটা বেল্টের আঘাত চকিতে সব ক-টা ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে দেয়।
অফিসার চেয়ার ছেড়ে উঠে আসেন। ধীরপায়ে এসে দাঁড়ান ইন্দ্রর সামনে। তারপর হাঁটু মুড়ে বসে ইন্দ্রর ঝুঁকে-পড়া মাথার দিকে এগিয়ে এসে কানের কাছে মুখ এনে সেই একই রকম নিস্পৃহ কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, “বল, কেন খুন করলি নিজের পরিবারকে?”
*
দক্ষিণ কলকাতার একটা বাস স্টপ। সন্ধ্যা নামছে। শীত প্রায় উপস্থিত এই সময় অন্ধকার নামে চকিতে। দূরে সূর্য পশ্চিমে ঢলছে আলগোছে। যেন লালচে-হলুদ বিশাল একটা থালা গড়িমসি করে মুখ লুকোচ্ছে দূরের উঁচু উঁচু অট্টালিকার আড়ালে। একজন পুরুষ বসে রয়েছেন বাস স্টপের স্টিলের চেয়ারে। মধ্যবয়স্ক, বয়স পঞ্চাশের আশপাশে। ঋজু একহারা চেহারা। পরনে ফুলহাতা নীল বুশশার্ট, কালো প্যান্ট, অক্সফোর্ড শু। চোখে বাদামি সানগ্লাস। মুদ্রাদোষে বারবার নাকের ডগায় আঙুল বুলোচ্ছেন। হাতে একটা পাতলা ইংরেজি ম্যাগাজিন। অন্যমনস্কভাবে পাতা ওলটাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর একটা কালো এসইউভি এসে দাঁড়ার বাস স্টপের ঠিক সামনে। ড্রাইভারের পাশে বসা ভদ্রলোক জানালার কাচ নামিয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করেন, “দাদা, এই ঠিকানাটা একটু বলতে পারবেন?” ডান হাতে ধরা এক টুকরো কাগজ বাড়িয়ে ধরেন সেই বসে-থাকা ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে কাগজটা হাতে নেন। সাদা ছোট্ট কাগজে কালো ছাপার হরফে লেখা, “ইট’স টাইম। সিকিয়োর দি অ্যাসেট।”
কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে গাড়িতে বসে থাকা প্রশ্নকর্তার হাতে কাগজটা ফেরত দেন লোকটা। তারপর বলেন, “সোজা গিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে কয়েকটা বাড়ির পর।” প্রশ্নকর্তা ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ির কাচ তুলে নেন। একরাশ কালো ধোঁয়া ছেড়ে গাড়িটা বেরিয়ে যায় সোজা। ভদ্রলোক ফিরে এসে চেয়ারে বসে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করেন। ফোনের ও প্রান্ত থেকে গলার আওয়াজ শোনা গেলে বললেন, “ইটস টাইম।” এরপর হাতের ম্যাগাজিনটা খুলে তাতে মনোনিবেশ করেন।
