(২) দ্য হোলি সিটি

(২) দ্য হোলি সিটি

সেপ্টেম্বর, ১৩০৭। জেরুসালেম:

রাত্রি নেমেছে। চাঁদের রুপোলি আলো ধূসর পাথুরে রাস্তায় পথ হারাচ্ছে। লিও দৌড়োনো থামিয়ে মাথার উপর কালো আকাশের এককোণে বিরাজমান দ্যুতিময় চাঁদের খণ্ডটার দিকে তাকাল। প্রায় গোলাকার আকৃতিটা যেন একপাশে ঈষৎ চাপা। পূর্ণিমা অনতিদূর। লিও রাস্তার এককোণে নতজানু হয়ে বসে পড়ে দ্রুত শ্বাস নিতে থাকে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাকে খবরটা পৌঁছে দিতে হবে গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছে। নইলে ঘটে যাবে চরম অনর্থ। সে কথা মনে পড়তেই আতঙ্কের হিমেল স্পর্শ যেন স্থবির করে দেয় লিওকে। মনে হয়, একটা অশুভ কালো কুয়াশার চাদরে যেন সে বন্দি হয়ে পড়ছে ক্রমশ। এক মায়াবী ক্লান্তি এসে গ্রাস করছে ওকে ধীরে ধীরে। পা দুটো যেন কেউ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে, ঠিক যেমন বিশালকায় মহিরুহ তার শিকড় মাটির গভীরে রোপণ করে অবলীলায়, ঠিক তেমনই ওর পা দুটো যেন নিশ্চল হয়ে প্রোথিত এই মায়াবী শহরের চন্দ্রালোকিত রাস্তায়। কিন্তু আজ থামলে চলবে না। বিশ্রামের বিলাসিতা আজকের জন্য মুলতুবি থাক। সমস্ত সৃষ্টির সামনে মহাবিপদ আসন্ন। অবসন্ন শরীরের সমস্ত শক্তিটুকু একত্রিত করে ফেব উঠে দাঁড়ায় লিও। মাথা নীচু করে দুই হাত দুই হাঁটুর ওপর রেখে মুহূর্তকাল বিশ্রাম নিয়ে নেয়, তারপর আবার পূর্ণ উদ্যমে নিজের অভীষ্ট গন্তব্য অভিমুখে ছুটে চলে শুনশান রাস্তা ধরে।

.

পবিত্র শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে দৈত্যবৎ মাথা উঁচু করে দণ্ডায়মান এক বিশাল দুর্গ। চারপাশে উঁচু দুর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত সেই দুর্গ দুর্ধর্ষ নাইটস টেম্পলারদের সদর দপ্তর। দুর্গের মূল ফটক দিয়ে ঢুকে লম্বা করিডর। মেঝেতে পশুর চামড়ার পুরু কার্পেট পাতা। দু-পাশে পাথরের উঁচু দেওয়ালে নাইটস টেম্পলারদের প্রতীক পবিত্র ক্রুশ চিহ্ন খোদাই করা। সামান্য তফাতে দেওয়ালে লোহার আংটা থেকে ঝুলন্ত খাপে জ্বলন্ত মশাল রাখা রয়েছে। দুর্গের অভ্যন্তরের নিকষকালো অন্ধকার সেই আলোয় সম্পূর্ণ প্রশমিত হয়ে উঠতে পারেনি। তবে ওই টিমটিমে হলুদ আলোয় দুর্গের ভিতরের সরু অলিগলি ধরে এগিয়ে যেতে অসুবিধে হচ্ছে না জর্জের। অবশ্যই এর একটা কারণ হল জন্মাবধি জর্জ এখানেই মানুষ। সে যখন খুব ছোট, একটা জ্বলন্ত কুটির থেকে তাকে উদ্ধার করেন টেম্পলারদের পূর্বতন জেনারেল অলিভার। তাদের গ্রামের দখল নেওয়ার পর গ্রামের কুটিরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় সুলতানের সেনাবাহিনী। অতর্কিত আক্রমণের খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে সেই বর্বরদের হাত থেকে অধিকাংশ গ্রামবাসীকেই উদ্ধার করেন টেম্পলাররা। কিন্তু ছোট্ট জর্জের ভাগ্য সেইদিন সুপ্রসন্ন ছিল না। ধিকিধিকি আগুনে জ্বলতে-থাকা পর্ণকুটির থেকে পিতৃমাতৃহীন অসহায় শিশুটাকে পরম মমতায় কোলে তুলে নেন অলিভার। অতঃপর সে এখানেই মানুষ। এরাই তার পরিবার। কৈশোরের বাধা কাটিয়ে যৌবন এলে সে-ও তুলে নেবে টেম্পলারদের পবিত্র ক্রুশ অঙ্কিত তলোয়ার, বর্ম। শামিল হবে পবিত্র ক্রুশের সম্মানরক্ষার্থে তুর্কি সুলতানের বিশাল সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে তিনশো বছর ধরে চলে-আসা রক্তক্ষয়ী ক্রুসেডে।

জর্জের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে বারবার পিছিয়ে পড়ছে লিও। দু-পাশে দুর্গের মসৃণ ধূসর পাথরের দেওয়াল সোজা উঠে গিয়ে মাথার উপরে অন্ধকারে মিশেছে। নিবুনিবু মশালের ক্ষীণ আলো দুর্গের উঁচু ছাদ অবধি পৌঁছোয় না। মাথার ওপর জমাট বাঁধা কালচে অন্ধকারকে খোলা কালো আকাশ বলে ভ্রম হচ্ছে। বেশ কিছু অলিগলি পেরিয়ে এসে একটা চওড়া দালান, চারপাশে মোটা মোটা থাম, উঁচু খিলান। সবশেষে একটা বিশাল দরজা। চওড়া কাঠের পাল্লায় অপূর্ব সূক্ষ্ম কারুকার্য। তাতে খোদাই-করা ধাতব ক্রুশ চিহ্ন মশালের লালচে আলোয় চকচক করছে। জর্জ দরজার সামনে এসে ইশারায় অপেক্ষা করতে জানায়। এটা টেম্পলারদের প্রার্থনাকক্ষ। প্রার্থনা চলাকালীন কাউকে বিরক্ত করা এখানে অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু লিওর অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য নেই, সে উত্তেজনায় মাটিতে জুতো ঠুকতে থাকে অস্থিরভাবে, মুখে একরাশ উৎকণ্ঠা। নিস্তব্ধ কামরায় সেই সামান্য ঠুকঠুক আওয়াজও বড় শ্রুতিকটু। জর্জ ভৎসনার দৃষ্টিতে তাকায় লিওর দিকে। লিও অপ্রস্তুতভাবে সামান্য হাসে, জর্জ প্রত্যুত্তর না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অবশেষে প্রার্থনাকক্ষের দরজা খুলে যায়। মুহূর্তে করিডর ভরে যায় ঝিম-ধরানো অপূর্ব এক সুগন্ধে। ভিতর থেকে তিনবার ঢংঢং শব্দে সুরেলা ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। এক দুই তিন… একে একে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন নাইটরা। সব শেষে বেরিয়ে আসেন গ্র্যান্ডমাস্টার জ্যাক ডে মোলে। শীর্ণ দীর্ঘকায় চেহারা। শ্বেতশুভ্র দাড়ি, তীক্ষ্ণ নাক, প্রশস্ত কপাল। চেহারায় বার্ধক্য থাবা বসালেও চোখের মণি অসম্ভবরকম স্থির, গভীর, বুদ্ধিদীপ্ত। সমস্ত মুখমণ্ডল জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করে বেড়ায়। পরনে শ্বেতবস্ত্রে অনাড়ম্বরতা স্পষ্ট। অবশ্য নাইটস টেম্পলার পবিত্র চার্চের পরেই বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ধনী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও তার অধীনে থাকা নাইটরা অসম্ভবরকম অনাড়ম্বর এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনযাপন করেন। তাঁরা তাঁদের জীবন সমর্পণ করেছেন পবিত্র খ্রিস্টধর্মের রক্ষার্থে। শৌখিনতা, বিলাসিতা, প্রেম, প্ৰণয়—সবকিছু তাঁরা ত্যাগ করেছেন এক লহমায়। ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই পবিত্র শহরে আগত তীর্থযাত্রীদের সুরক্ষার নিমিত্তে আজ থেকে তিনশো বছর আগে তৈরি হওয়া এই সামরিক বাহিনী আজ সমস্ত বিশ্বের খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে অবলীলায়। তারা অপরাজেয়, দুর্জয়, দুর্দম। তারা কোনও সিংহাসনকে কর দিতে বাধ্য নয়, এমনকি পবিত্র চার্চ ছাড়া অন্য কাউকে তাদের কৃতকর্মের কৈফিয়ত দিতেও বাধ্য নয়।

লিওকে দেখে স্মিত হাসলেন জ্যাক। ফ্রান্সের রাজকোষাগারের প্রধান হিসাবরক্ষক রাফায়েলের সহকারী এই ছেলেটা জ্যাকের বিশেষ স্নেহধন্য। ফ্রান্সের রাজকোষের নিয়মিত বার্ষিক ব্যয়ের সিংহভাগই আসে টেম্পলারদের থেকে নেওয়া ঋণের অর্থে। সেই সূত্রে টেম্পলারদের সদর দপ্তর এই টেম্পল মাউন্টে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে লিওর। কিন্তু আজ সূর্যোদয়ের পূর্বে লিওকে বিনা পরিকল্পনায় এইভাবে ছুটে আসতে দেখে বৃদ্ধ কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন। তিনি মহাজ্ঞানী। মানুষকে একঝলক দেখে তার মন পড়ে নিতে পারেন অবলীলায়। লিওর মনের মধ্যে বয়ে চলা উদবেগ এবং উৎকণ্ঠার ঝড় তার শরীরী পরিভাষায় স্পষ্ট। মুখমণ্ডলের প্রত্যেকটা অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠছে উত্তেজনা। বৃদ্ধ চোখের ইশারায় একটু দূরে রাখা দুটো নীচু আসনের একটাতে লিওকে বসতে বললেন। অন্যটাতে নিজে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্থির অথচ দৃঢ় কণ্ঠে লিওকে প্রশ্ন করলেন, “কী ব্যাপার, লিও? এই অসময়ে তুমি! বড্ড বিধ্বস্ত লাগছে তোমায়।”

“সর্বনাশ উপস্থিত, মহামান্য। রাজকোষের সঞ্চয় তলানিতে এসে ঠেকেছে। আপনাদের থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করার সামর্থ্য রাজার আর নেই। এখন তার দৃষ্টি এসে পড়েছে আপনাদের বৈভবের ওপর। তাই কৌশলে আপনাদের মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত করে আপনাদের গৌরব কালিমালিপ্ত করে টেম্পলারের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্রূর পরিকল্পনা করছেন তিনি।” একনিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে হাঁপাতে লাগল লিও।

“বিগত তিনশো বছরে কম রাজা, কম সুলতান চেষ্টা করেননি টেম্পলারকে ভেঙে গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে। কিন্তু আমরা সেইসব আক্রমণ প্রতিহত করে এসেছি সফলতার সঙ্গে। প্রত্যেকটি আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে আমাদের ভিত্তি। আরও মজবুত হয়েছে আমাদের সংকল্প। তা ছাড়া পবিত্র ঈশ্বর আমাদের ওপর প্রসন্ন, চার্চের আশিস রয়েছে আমাদের মাথায়।”

এত দূর বলে সামান্য বিরতি নিলেন বৃদ্ধ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তুমি আজকের দিনটি এখানেই বিশ্রাম নাও। আর সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকো, অশুভ শক্তি যতই মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক, শুভশক্তির কাছে তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।”

প্রার্থনাকক্ষ বামদিকে ছেড়ে লম্বা করিডর ধরে খানিকটা এগিয়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন জ্যাক। নিতান্তই ছোট কক্ষ। অতি সামান্য কিছু আসবাব। দরজা দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে একটা খাট, তাতে জীর্ণ হয়ে আসা একখণ্ড কাপড় পাতা। খাটের লাগোয়া একটা নীচু টেবিল, আর একটা আসন। টেবিলের ওপর বেশ কিছু পুথি, দরকারি-অদরকারি কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঘরের অন্য প্রান্তে একটা লোহার তোরঙ্গ, তাতে পিতলের সূক্ষ্ম কাজ। নিজকক্ষে প্রবেশ করেই সেই নীচু আসনে উপবিষ্ট হলেন জ্যাক। টেম্পলারদের গ্র্যান্ডমাস্টারদের মধ্যে তিনিই সর্বকালের সেরা — এ কথা একবাক্যে স্বীকার করে তাবৎ বিশ্ব। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের স্নায়ু সামান্যতম শিথিল হতে দেননি। কিন্তু আজ তাঁকে ভীষণ চিন্তিত, ভীষণ উৎকণ্ঠিত দেখাচ্ছে। লিওকে আশ্বস্ত করার জন্য তিনি মুখে যা-ই বলে থাকুন-না কেন, তিনি জানেন বাইরের শতসহস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ করা অপেক্ষা অন্তর্বর্তী আঘাত প্রতিহত করা শতগুণে কঠিন।

কিছুক্ষণ পরে কক্ষে প্রবেশ করেন আন্দ্রে, নাইট টেম্পলারদের বর্তমান জেনারেল। দোর্দণ্ডপ্রতাপ যোদ্ধা, জ্যাকের অতীব বিশ্বস্ত। পিছনে পদশব্দ পেয়ে ফিরে তাকান বৃদ্ধ। আন্দ্রেকে চোখের ইশারায় দরজা বন্ধ করতে বলেন। আন্দ্রে ভিতর থেকে দরজার আগল লাগিয়ে জ্যাকের সামনে এসে বসেন। বৃদ্ধ নিশ্চুপ। আন্দ্রে বেশ কিছুক্ষণ বৃদ্ধের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর গলার স্বর খাদে নামিয়ে প্রশ্ন করেন, “কী ব্যাপার, মাননীয়? আপনাকে বড় বিব্রত দেখাচ্ছে!”

জ্যাক উত্তর দেন না। শুধু মৃদু হাসেন। সে হাসি নিষ্প্রাণ, উদবেগপূর্ণ। বেশ কিছুটা বিরতি নিয়ে কতকটা স্বগতোক্তির স্বরে বলেন, “আমাদের গৌরবের দিন বোধহয় আজ ফুরিয়ে এসেছে, আন্দ্রে। রাজা চতুর্থ ফিলিপ আমাদের বিরুদ্ধে সর্বনাশা চক্রান্তে লিপ্ত। আমি কালই রওনা হচ্ছি প্যারিসের অভিমুখে। ওখানে আমাদের কার্যালয়ের সমস্ত নাইটের সামনে সমূহ বিপদ আসন্ন। এই সময় আমার প্রধান কর্তব্য হতে চলেছে সেখানে ফিরে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো। এই বিষয়ে একবার মহামান্য পোপের সঙ্গে আলোচনা করা অত্যাবশ্যক। অবশ্য সত্যিই জানি না, আমি আবার এই পবিত্র শহরে ফিরে আসতে পারব কি না। জানি না কী ভয়ংকর পরিণাম, কী দুঃসহ পরিণতি নেমে আসতে চলেছে নাইটস টেম্পলারদের ওপর। জানি না আজ থেকে হাজার বছর পর মানুষ আদৌ জানবে কি না এতগুলো মানুষের নিঃস্বার্থ ত্যাগস্বীকারের গল্প। তাদের জীবন, তাদের ভালোবাসা, সংসার, সুখস্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু ত্যাগ করে পবিত্র ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার মহান ব্রত। হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে ছিঁড়ে ফেলা হবে সেসব তথ্য। কিংবা হয়তো মানুষের মনে রোপণ করা হবে কোনও মিথ্যে ইতিহাস। হয়তো টেম্পলারদের বিকৃত কালিমালিপ্ত কাহিনি মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। হয়তো ভবিষ্যৎ তাদের চিনবে নির্মম হৃদয়হীন শয়তানের প্রতিভূ হিসেবে। তবু লড়াই এখনও অনেক বাকি। আমি কথা দিচ্ছি, আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও নাইট টেম্পলারদের গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখতে লড়ে যাবে। তবু যদি শেষরক্ষা না হয়, তাই আজ তোমাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে যেতে চাই। আমি জানি, এই সমগ্র মহাবিশ্বে সে গুরুদায়িত্ব পালন করার মতো ক্ষমতা একমাত্র তোমারই রয়েছে।”

উৎসুক দৃষ্টিতে গ্র্যান্ডমাস্টারের দিকে তাকান আন্দ্রে। কী সেই গুরুদায়িত্ব! ইশারায় তাঁকে অনুসরণ করতে বলে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন জ্যাক। বেরিয়েই লম্বা বারান্দা। সেই বারান্দা পেরোলে ডান হাতে ঠিক তিনটে ঘরের পর টেম্পল মাউন্ট-এর সেই বিখ্যাত গ্রন্থাগার। কথিত আছে, সমগ্র ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে এত বড় এবং দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য সব পুথির সংগ্রহশালা আর দ্বিতীয়টি নেই। গ্রন্থাগারে তখন একাধিক ছাত্র অধ্যয়নে নিমগ্ন। মাননীয় গ্র্যান্ডমাস্টার এবং জেনারেলকে ঢুকতে দেখে তারা সমবেতভাবে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। জেনারেল আন্দ্রে ইশারায় তাদের গ্রন্থাগার ত্যাগ করার আদেশ দেন। গ্রন্থাগার জনশূন্য হওয়ার পর জ্যাক উঁচু উঁচু আলমারির গোলকধাঁধা পেরিয়ে উত্তর-পূর্বদিকে এগিয়ে চলেন একটা নির্দিষ্ট দেওয়াল লক্ষ করে। দেওয়াল জুড়ে বিশাল আলমারি। তাতে থরে থরে সাজানো দুষ্প্রাপ্য সব পুথি। বৃদ্ধ নীচু হয়ে বসে পড়ে ডানদিকের একদম নীচের তাকে পুথিগুলি একে একে সরিয়ে ফেলতে শুরু করেন। আস্তে আস্তে পিছনে পাথরের দেওয়াল দেখা যায়। দেওয়ালে ছোট ছোট বর্গাকার পাথরের গাঁথনির মাঝে সরু খাঁজ। সেই খাঁজের ওপর আঙুল বুলিয়ে যেন কিছু খুঁজে চলেছেন জ্যাক। অবশেষে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে আঙুল বোলানো থামিয়ে নখের সামান্য আঁচড়ে পাথরের খাঁজে জমে-থাকা আলগা মাটি সরিয়ে ফেলেন। দুটো বর্গাকার পাথরের খাঁজে একটা সরু ছিদ্র। মাথা নীচু করে গলায় পরে-থাকা রুপোর ক্রুশটা হার সমেত খুলে হাতে নিয়ে সেটা মাথায় ঠেকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে প্রার্থনা সেরে পবিত্র ক্রুশটাতে চুম্বন করেন বৃদ্ধ। তারপর ক্রুশটার সরু লম্বা দিকটা কতকটা চাবির মতো ঢুকিয়ে দেন ওই ছিদ্রে। এইবার সামান্য চাপ প্রয়োগ করতেই একটা ধাতব যান্ত্রিক আওয়াজ শোনা যায়। পরমুহূর্তে গুরুগম্ভীর শব্দ করে ওই বর্গাকার পাথরের টুকরোগুলো দেয়ালের ভেতরদিকে ক্রমশ ঢুকে গিয়ে একটা গহ্বর সৃষ্টি করে। সেই গহ্বরে হাত ঢুকিয়ে জ্যাক বের করে আনেন একটি বিশালাকৃতি পুথি এবং একটা ছোট্ট ধাতব বাক্স প্রথমেই বাক্সটা খুলতে দেখা যায় তার ভিতরে শায়িত রয়েছে বিঘতখানেক দৈর্ঘ্যের একটা পেরেক। পেরেকটা হাতে নিয়ে শ্রদ্ধাভরে মাথায় ঠেকিয়ে দু-হাত প্রসারিত করে আন্দ্রের সামনে তুলে ধরেন বৃদ্ধ। আন্দ্রে সেটাকে চিনতে পারেন এক লহমায়। এই সেই পবিত্র পেরেক, যেটা স্বয়ং জিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় তাঁর চরণে প্রোথিত হয়েছিল। পেরেকটা এর আগেও অনেকবার দেখেছেন আন্দ্রে। প্রত্যেক বছর বার্ষিক অনুষ্ঠানের সময় যখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে নতুন নাইট নিয়োগ করা হয়, গ্র্যান্ডমাস্টার এই পেরেকটা জনসমক্ষে আনেন। সেইদিন সারাদিন প্রার্থনাকক্ষে সেটা রাখা থাকে। নব্যনিযুক্ত নাইটরা ওই পবিত্র পেরেক ছুঁয়ে খ্রিস্টধর্ম এবং সেই ধর্মের অনুসারীদের রক্ষাকর্তা রূপে শপথ নেয়। অবশেষে অনুষ্ঠানের পর গ্র্যান্ডমাস্টার পেরেকটা আবার গোপন জায়গায় সযত্নে তুলে রাখেন। শুধুমাত্র গ্র্যান্ডমাস্টার ছাড়া আর কারও অধিকার নেই এই পবিত্র পেরেকের সন্ধান জানার। কিন্তু পুথিটা আন্দ্রের কাছে একেবারেই অচেনা। তাই সেদিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন আন্দ্রে। লম্বায় প্রায় তিন ফুট, প্রস্থেও ফুট দেড়েকের কম নয়। এত বড় পুথি তিনি এর আগে সচরাচর দেখেননি। পশুর চামড়ার বাঁধাই, তার উপর ছোট ছোট ধাতব টুকরোর অপূর্ব কারুকার্য। একটা একটা করে পৃষ্ঠা ওলটাতে থাকেন আন্দ্রে। রঙিন বড় হরফে লেখা, মাঝে মাঝে অপূর্ব সব অলংকরণ। পৃষ্ঠায় হাত বুলিয়েই আন্দ্রে বোঝেন, পৃষ্ঠাগুলো তৈরি হয়েছে গাধার চামড়া থেকে। কয়েকটা পৃষ্ঠা ওলটানোর পরেই এক জায়গায় এসে ভীষণ চমকে স্থবির হয়ে যান আন্দ্রে। ভয়ে, আকস্মিকতায় তাঁর দমবন্ধ হয়ে আসে। কম্পিত কণ্ঠে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে ওঠেন, “মাননীয়, আমি যা ভাবছি, এটা কি তা-ই?”

স্মিত হাসেন বৃদ্ধ। বলেন, “হ্যাঁ। এই সেই অভিশপ্ত পুথি, যা ভুল মানুষের হাতে পড়লে ঘটে যেতে পারে অনর্থ। কথিত আছে, হারমান নামক এক সন্ন্যাসী কোনও কারণে একবার রাজার বিরাগভাজন হওয়ায়, রাজা সেই সন্ন্যাসীকে দুই দেওয়ালের মাঝে জীবন্ত বন্দি করার আদেশ দেন। সে বড় ভয়ানক শাস্তি। বন্ধ দেওয়ালের ভিতর আলো, বাতাস এবং খাদ্যাভাবে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করার মতো যন্ত্রণাদায়ক পরিণতি বড় কমই আছে। নিরুপায় সন্ন্যাসী রাজার কাছে আবেদন করেন যে, তাঁর প্রাণের বিনিময়ে তিনি তাঁর সমস্ত প্রজ্ঞা একরাতের মধ্যে একটামাত্র পুথিতে লিপিবদ্ধ করে রাজার কাছে নিবেদন করবেন। কিন্তু পুথি লেখা শুরু করার সামান্যকাল পরেই হারমান উপলব্ধি করেন যে তাঁর গভীর প্রজ্ঞা একটামাত্র পুস্তকে একরাতের মধ্যে লিপিবদ্ধ করা কার্যত অসম্ভব। অবশেষে নিরুপায় হারমান সাহায্য চান স্বয়ং শয়তানের কাছে। শয়তান হারমানের প্রার্থনায় সারা দিয়ে সশরীরে নেমে আসেন পৃথিবীতে, এবং একটা মাত্র রাতেই রচিত হয় এই পুথি যা বিশ্বের দরবারে শয়তানের বাইবেল রূপে খ্যাত। কিছুকাল পূর্বে টেম্পলাররা জীবনের বাজি রেখে এই পুথিটি উদ্ধার করেন। এইবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, কেন এই মহাদায়িত্ব আমি তোমাকেই সঁপতে চাইছি। এই পুথি এবং এই পবিত্র পেরেক এখন থেকে তোমার হেপাজতে রইল।”

উত্তর দেন না আন্দ্রে। নির্বাক দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনে খোলা পুথিটার দিকে। মুখ রক্তশূন্য, অভিব্যক্তিতে আতঙ্ক আর বিস্ময়ের মিশেল। খোলা পুথির এক পৃষ্ঠায় আঁকা পবিত্র জেরুসালেম শহর, অন্য পৃষ্ঠায় আঁকা উনিশ ইঞ্চি লম্বা শয়তানের অবয়ব। মাথার দু-পাশে উদ্যত শিং, হাতে-পায়ে চারটে করে আঙুলে তীক্ষ্ণ নখর, মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে-আসা লম্বা দুটো জিহ্বা লাল রক্তে রঞ্জিত। পরনে সিংহের চামড়ার তৈরি পোশাক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *