(২৪) গুড বাই সিনোরিতা
এক দুই তিন…. ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়ে গেল দেওয়াল। কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই চোখ বুজে বসে রইল ইন্দ্র। তার ভীষণ দমবন্ধ লাগছে। বুকের মধ্যে একটা তীব্র যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণায় চোখ-মুখ কুঁচকে গিয়েছে। প্রায় মিনিটখানেক পর ধীরে ধীরে চোখ খুলল ইন্দ্র। দু-পাশের দেওয়াল সরু হয়ে তার দুই কাঁধ এসে ছুঁয়েছে প্রায়। অর্থাৎ শেষ সুযোগ এখনও বাকি। মাথা তুলে রঘুবীরের দিকে তাকাতে তিনি নার্ভাসভাবে হেসে ফেললেন। বোঝা যাচ্ছে, তিনি এখনও স্বাভাবিক অবস্থায় আসেননি। ইভানি তুলনায় নিস্পৃহ। উঠে দাঁড়াল ইন্দ্র। করিডরের মধ্যে এখন পাশাপাশি দু-জন দাঁড়ানোর জায়গা নেই। কোনওমতে একজন হাঁটতে পারে। ইন্দ্র কাঁপা গলায় বলল, “আপনারা বেরিয়ে যান। আমি শেষ চেষ্টা করে দেখতে চাই।”
রঘুবীর উত্তর না দিয়ে ফ্যাকাশে হাসল। কিন্তু নিজের জায়গা থেকে একচুল নডল না। ইভানির দিকে তাকাতে ইভানির দিক থেকে সংক্ষিপ্ত উত্তর ভেসে এল, “বাল!”
আবার এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে হাতলগুলোর সামনে বসে পড়ে ইন্দ্ৰ তাহলে কি ১৩১৪? যে বছর নাইটস টেম্পলারদের শেষ গ্র্যান্ডমাস্টার জ্যাক ডে-ম্যলেকে হত্যা করা হয়? ধীরে ধীরে প্রথম হাতল ঘুরিয়ে এক নম্বরের পাশে আনে ইন্দ্ৰ। ঢং করে একটা ধাতব আওয়াজ হল। ইন্দ্রর সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় হাতল ঘুরিয়ে যথাক্রমে তিন এবং একের ঘরে আনল। এইবার চতুর্থ হাতল। হঠাৎ ইন্দ্রর কাঁধে হাত রাখে রঘুবীর। হাতলের পাশে দরজার গায়ে খোদাই-করা ছোট্ট ক্রসটার দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে। ইন্দ্র সেদিকে একটু ভালো করে তাকিয়েই চমকে ওঠে। মাথার ভিতর সবকিছু গোলমাল হয়ে যায়। বিস্মিত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে, ‘হাউ ক্যান আই বি সো ফুলিশ! এই ক্রসের ওপরদিকের অংশ বড় এবং নীচের দিকে অংশ ছোট। অর্থাৎ এটা ওলটানো ক্রস। অ্যান্টিক্রাইস্টের এমব্লেম। এর কথাই আমায় বলতে চেয়েছিল সম্বুদ্ধ। “Diabolus est numerus veniet Non enim aliud faciam a facie diaboli” শয়তানের নম্বর আসবে। নিউ টেস্টামেন্ট দ্য বুক অফ রিভেলেশনের থার্টি চ্যাপটার এইটিস্থ ভার্স, হিয়ার ইজ উইজডম। লেট হিম হু হ্যাজ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্যালকুলেট দ্য নাম্বার অফ দ্য বিস্ট, ফর দ্য নাম্বার ইজ দ্যাট অফ এ ম্যান; অ্যান্ড হিজ নাম্বার ইজ সিক্স সিক্সটি সিক্স।’
কথা শেষ করে সে মুখ তুলে ইভানির দিকে তাকায়। ইভানি কাঁধে রাখা হাতে আলতো চাপ দেয়। ইন্দ্র সামনের দিকে ফিরে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়। বলে, “চারটে হাতল রাখা হয়েছে শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য। আসল সংখ্যা হল ০৬৬৬। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল রোমান হরফে কোনও শূন্য নেই। শূন্য আবিষ্কারের কৃতিত্বও এই পোড়া দেশের।” হাতলের এক জায়গায় খোদাই-করা নম্বরের জায়গায় ফাঁকা। ইন্দ্র কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে। তারপর ধীরে ধীরে প্রথম হাতলটা ঘুরিয়ে সেই ফাঁকা জায়গার পাশে আনে। একে একে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ হাতল ঘুরিয়ে ছয়ের ঘরে আনতেই ঘটাং করে একটা যান্ত্রব আওয়াজ হল। সঙ্গে সঙ্গে আবার মাটি কেঁপে উঠে সেই ঘড়ঘড় পাথরের দেওয়াল মেঝেতে ঘষটানোর চাপা গম্ভীর শব্দ। রঘুবীর একটা অস্ফুট শব্দ করে হতাশায় চোখ বুজে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন।
কিন্তু এবার শব্দটা অন্যরকম। দু-দিকের দেওয়াল ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা ক্যাঁচ শব্দ তুলে ক্রমশ ফাঁক হয়ে যাচ্ছে সামনের দরজার দুটো পাল্লার মাঝের দূরত্ব। রঘুবীর চোখ খুলে আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন। ইভানি শেষ মুহূর্তে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল ইন্দ্রর কাঁধ। সে মুঠো আলগা হয়ে আসে। কিন্তু দরজা খুলতেই চমকে ওঠে ইন্দ্র। এ কোথায় এসে পড়ল ওরা! এই জায়গা তো তার চেনা। সেই বিশাল চ্যাপটা কালো প্রাণীর পিঠে দাঁড়িয়ে তারা। চারপাশে আকাছোঁয়া বিশাল বিশাল গাছ। তাদের সরু পাতা ছুঁয়ে টুপটাপ ঝরে পড়ছে জলের ফোঁটা। সামনে যত দূর চোখ যায় গভীর অরণ্য। সেই অরণ্যের ফাঁকে ফাঁকে অজানা-অচেনা প্রাণীদের আনাগোনা। দূরে দেখা যাচ্ছে সেই কালচে-সবুজ পাহাড়। ইন্দ্র জানে, সেই পাহাড়ের চূড়ায় সব থেকে উঁচু গাছটার ডালে আর কিছুক্ষণ পরেই এসে বসবে সেই সোনালি পালকওয়ালা অতিকায় পাখি। ইন্দ্ৰ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই বিশাল উঁচু পাহাড়ের দিকে। ইভানি এবং রঘুবীর সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থির। পায়ের তলার কালো পাথরকে জীবন্ত প্রাণীর মতো নড়ে উঠতে দেখে চমকে উঠে অস্ফুটে আর্তনাদ করে ওঠে ইভানি। ইন্দ্র এগিয়ে গিয়ে তার একটা হাত ধরে মোলায়েম কণ্ঠে বলে, “ভয় পেয়ো না। এই জায়গা আমার চেনা।” ইভানি অবাক দৃষ্টিতে মুখ তুলে তাকায়। ইন্দ্ৰ মুচকি হেসে বলে, “চলো, যেতে যেতে বলছি। যদি আমি খুব ভুল না হয়ে থাকি তাহলে ওই দূরে কালচে-সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় রাখা আছে কোডেক্স গিগাস-এর সেই হারিয়ে-যাওয়া বারোটা পৃষ্ঠা।”
অতি সন্তর্পণে বিশাল উঁচু উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে চলেছে ওরা তিনজন। ইভানি একটানা বেশিক্ষণ হাঁটতে পারছে না। কিছুক্ষণ পরপর দাঁড়িয়ে পড়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। ইন্দ্র এগিয়ে এসে তার পিঠে হাত দেয়। ইভানি মুচকি হেসে আবার চলতে শুরু করে। মাঝে মাঝেই দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বিশালদেহী অজানা সব প্রাণী। ওরা তিনজন ছুটে গিয়ে লুকিয়ে পড়ছে কোনও ঝোপঝাড়ের আড়ালে। তাদের ঘাড়ে প্রায় নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে বিশালকায় অচেনা সেই দৈত্যের মতো প্রাণীরা। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই হেঁটে যাওয়ার পরে তারা এসে দাঁড়াল সেই পাহাড়ের পাদদেশে। এখান থেকে খাড়া উঠে গিয়েছে পাহাড়ের ঢাল। মানুষের চলার মতো পথ নেই অবশ্য। শুধু একটু পর পর বিশাল বিশাল গাছের গোড়ায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা শিকড় অবলম্বন করে শরীরটাকে টেনে তুলতে হয় ওপরে। পাহাড়টা খুব বেশি উঁচু নয়। কিন্তু সেই চড়াই রাস্তা পেরোতেই ইন্দ্রদের বহুক্ষণ সময় লেগে যায়। রঘুবীর অবাক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে তাকাতে ইন্দ্রকে প্রশ্ন করেন, “এটা আমাদের পৃথিবী নয়?”
“তা আমি কখন বললাম? এটা আমাদেরই পৃথিবী। শুধু আমাদের সময় থেকে প্রায় কয়েক লক্ষ বছর এগিয়ে।”
“লিওনার্দো বলে যে ভদ্রলোক প্রথমে তোমাকে এখানে এনেছিলেন, তিনি কি ওই দরজা দিয়েই এসেছিলেন?”
“নাহ্। বিভিন্ন টাইমলাইনের মাঝে যাতায়াত করতে তার কোনও দরজা বা পোর্টাল লাগে না। কোনও এক অদৃশ্য জাদুবলে তিনি পৃথিবীর যে-কোনও জায়গায় যে-কোনও সময় নিমেষের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারেন।”
রঘুবীর এ কথা কতটা বিশ্বাস করলেন তা তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায় না। তবে এ বিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে ওরা।
হঠাৎ একটা চাপা অস্ফুট আর্তনাদ শুনে পিছন ফিরে তাকায় ইন্দ্র। ইভানি বসে পড়েছে একটা বড় পাথরের ওপর। গামা এগিয়ে এসে ইভানির পিঠের কাছের পোশাক ছুরি দিয়ে অনেকটা চিরে দেয়। কাঁধের কাছের ক্ষতের চারপাশে নীল শিকড়ের মতো বিষ সারা শরীরে আস্তে আস্তে যেন ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষতস্থান চুইয়ে কালচে-হলুদ পুঁজরক্ত গড়িয়ে আসছে। ইভানির চোখের দিকে তাকাল ইন্দ্র। তার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এসেছে। মণিগুলোর ঘন কালো রং এখন ফ্যাকাশে। গায়ের চামড়া রক্তশূন্য হয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে। ধূসর ঠোঁট দুটো শুষ্ক হয়ে ফেটে গিয়েছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে, চোখ আধবোজা। ইন্দ্র নিজের কোমরে রাখা জলের বোতলের ছিপি খুলে ইভানির মুখের কাছে ধরল। সে আপ্রাণ চেষ্টা করল চুমুক দিয়ে কিছুটা জল খেতে, কিন্তু পারল না। ঠোঁটের কশ বেয়ে জলের ধারা ঝরে পড়ল শুকনো মাটিতে। ইন্দ্রর চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু ইভানির গালে এসে পড়েছে। ইভানি খিলখিলিয়ে হেসে উঠতে যায়, কিন্তু হাসির বদলে উঠে আসে কাশির দমক। সেই সঙ্গেই উঠে আসে মুখ ভরতি তাজা রক্ত।
হঠাৎ সেই বিশাল অজানা অরণ্য জুড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। আকাশছোঁয়া উঁচু উঁচু গাছ, এবড়োখেবড়ো পাথুরে মাটি সব সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে যেতে লাগল। সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল ইন্দ্রর চোখের জল, ইভানির মুখ থেকে গলগল করে উঠতে-থাকা তাজা লাল রক্ত। কালচে-সবুজ পাথুরে মাটিতে দুই হাঁটু মুড়ে বসে রয়েছে ইন্দ্র। তার হাঁটুর ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে ইভানি। ইন্দ্রর মাথা ঝুঁকে পড়েছে ইভানির মুখের ঠিক ওপরে। নকল চুল বৃষ্টিতে খুলে এসেছে। ইন্দ্র নীচু হয়ে ইভানির কপালে একটা চুমু খায়। ঠিক তখনই আকাশের বুক ফালা ফালা করে তুমুল গর্জনে দূরে কোথাও নেমে আসে আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের রেখা। সেই বিদ্যুতের রেখার তীব্র আলোর ঝলকানিতে সমস্ত অরণ্য মুহূর্তে আলোকিত হয়ে যায়। সেই আলোয় চকচক করে ওঠে ইভানির বৃষ্টি-ভেজা মুখ। ইন্দ্র তার কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশিয়ে ধরা গলায় বলে, “প্লিজ ছেড়ে যেয়ো না। প্লিজ…”
ইভানি মুচকি হাসে। খুব কষ্টে থেমে থেমে অস্পষ্ট স্বরে বলে, “আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ভীষণ ভালো লাগত, জানো?”
ইন্দ্র আকাশের দিকে মুখ তুলে বুকফাটা আর্তনাদ করে ওঠে। সেই চিৎকার এই বিশাল অরণ্যের কোণে কোণে গুঞ্জরিত হতে থাকে। ইভানির দু-গাল দুই হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে ইন্দ্র মাথা নীচু করে ঝুঁকে পড়ে তার চোখের ওপর। হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে, “ভালোবাসো না আমায়? প্লিজ! একবার… একবার সত্যি করে বলো…
“নাহ্!” ইভানির ঠোঁটে ম্লান হাসি। সম্পূর্ণ শরীরটা একবার থরথর করে কেঁপে উঠেই স্থির হয়ে যায়। ঠোঁটের কোণ থেকে তখনও সেই একচিলতে হাসি মুছে যায়নি। অঝোর বৃষ্টিতে ইন্দ্রর চুল বেয়ে জলের ধারা এসে নামে ইভানির নাকে, ঠোঁটে, গলায়।
