(২৬) দ্য লাস্ট অ্যাক্ট

(২৬) দ্য লাস্ট অ্যাক্ট

“ইন্দ্রজিৎ, পাগলের মতো কোরো না। সময়ের লাগাম যদি আমাদের হাতে থাকে আমরা সবকিছু পেতে পারি। অতীতে গিয়ে আমাদের ভুল শোধরাতে পারি। এটা যদি আমরা আলফার কাছে নিয়ে যাই, কী হবে? কোনও পেটমোটা টাকাওয়ালা বিদেশির কাছে এটা মোটা টাকায় বিক্রি করে দেবে। নিজের দেশের সেন্সিটিভ ইনফর্মেশন শত্রুদেশের কাছে বিক্রি করে দিতে যার বিবেকে বাঁধে না, সে মানুষ এই অপার শক্তির কদর কী করবে? তা ছাড়া আমরা এসেছি প্রায় ঘণ্টা চারেক হয়ে গেছে। এতক্ষণে তারা গার্ডদের হাতে ধরা পড়ে প্রাণ খুইয়েছে।” একনিশ্বাসে উন্মাদের মতো কথাগুলো বলে গেলেন রঘুবীর। তারপর হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “পাঁচ বছর তিন মাস ষোলো দিন। আমি মুন্নিকে দেখিনি, বেটুকে দেখিনি, আমার মিনুকে দেখিনি। আমার একটা ভুলের জন্য সব ছারখার হয়ে গেল, ইন্দ্ৰজিৎ। যেদিন আমি জেল থেকে ছাড়া পেলাম, আমার মুন্নির জন্য একটা পুতুল নিয়েছিলাম। আমার বেটুটা লাড্ডু বড় ভালোবাসত। ওর জন্য মোতিচুরের লাড্ডু নিলাম। মিনুর জন্য লাল ছাপার শাড়ি। কিন্তু ফিরে দেখলাম আমার ঘরে তালা মারা। জানলার পাল্লা ভেঙে পড়েছে। আমার বাড়িতে ঢোকার লাল সিমেন্টের সিঁড়িতে পুরু ধুলো। ঘরের কড়িকাঠ থেকে তখনও ঝুলছে মুন্নির ওড়না…. হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন রঘুবীর। হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন ঘাসের জমিতে। আকাশের দিকে তাকিয়ে অমানুষিক বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়লেন। ইন্দ্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রঘুবীর হঠাৎ কান্না থামিয়ে এক ঝটকায় ছুটে গেল গাছের কোটরে রাখা সেই কাচের সিলিন্ডারের দিকে। ইন্দ্র বাধা দেওয়ার সময় পেল না। কাচের সিলিন্ডারটা মাথার ওপর তুলে আছড়ে ফেললেন মাটিতে। একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে খানখান হয়ে চারদিকে ছিটকে গেল কাচের টুকরো। ইন্দ্র হাত দিয়ে মুখ আড়াল করল। গোল করে পাকিয়ে-রাখা চামড়ার পৃষ্ঠা গড়িয়ে গেল একটু দূরে। রঘুবীর উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গিয়ে সেটা তুলে নিলেন। সামান্য চোখ বুলিয়ে বললেন, “এতে কী লেখা? এ যে কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“পারার কথাও না। এটা প্রাচীন ল্যাটিন ভাষা। ইংরেজি, এমনকি বর্তমান চলিত ল্যাটিন বা স্ল্যাং ল্যাটিনের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই।”

রঘুবীর চকিতে ছুটে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে-পড়া লিওনার্দোর বুক থেকে ছুরিটা টেনে বের করে ইন্দ্রর গলায় ধরলেন। রক্তাক্ত ছুরির শানিত ফলায় ইন্দ্রর গলার চামড়া কেটে একফোঁটা রক্ত গড়িয়ে আসে গলা থেকে বুকে। ফ্যাসফেঁসে গলায় রঘুবীর বললেন, “চুপচাপ এটা জোরে জোরে পড়ো। তোমার সঙ্গে সঙ্গে আমিও উচ্চারণ করব। তোমার ইচ্ছে করে না অতীতে গিয়ে নিজের কোনও অতীত পালটে নিতে? চুপচাপ পড়ো।”

ইন্দ্র পড়তে শুরু করে। এ ভাষা তার অচেনা নয়। তার মাথার মধ্যে অবচেতনে অনেক কিছু ঘুরছে। সত্যিই যদি সে অতীতে পৌঁছে যেতে পারে, যদি সত্যি পালটে ফেলতে পারে বর্তমান, তাহলে কী বেছে নেবে সে? সে কি পৌঁছে যাবে সেই সময়ে, যখন ইভানিকে অজানা বিষাক্ত প্রাণী কামড়েছিল জলের নীচে? ইভানির কথা মনে পড়তেই তার চোখ থেকে জলের বিন্দু গড়িয়ে নামে গাল বেয়ে। সে কি সত্যিই ভালোবেসেছিল ইভানিকে? কারণ এখন এমন এক মুহূর্ত তার সামনে উপস্থিত, যখন তার কাছে সুযোগ রয়েছে তার অতীতকে বদলে ফেলার, জীবন থেকে কোনও এক অপ্রিয় ঘটনাকে মুছে ফেলার, তখন তো তার অবচেতন মন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে না উত্তরাখণ্ডের সেই নাম-না-জানা গভীর দিঘির জলের নীচে! ইন্দ্রর সজাগ সত্তা অবশ্য প্রাণপণে চাইছে ফিরে যেতে সেই মুহূর্তে। জলের তলায় ইভানি এগিয়ে যাচ্ছে, পিছনে ধেয়ে আসছে কোনও জলজ সরীসৃপ। নাহ্! তার অবচেতন মন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে তার চৈতন্যকে। ইন্দ্রর মনের কোনও অচেনা কোণে ঘাপটি মেরে-থাকা সেই দ্বৈত সত্তা তাকে টেনে নিয়ে চলেছে খাস কলকাতার একটা দু-কামরার ফ্ল্যাটে। দরজার কাছে একটা উইন্ডচাইম মৃদু মৃদু হাওয়ায় দুলছে টুং টাং। একটা মিষ্টি মেয়ে ঘরের করিডরের এপাশ থেকে ওপাশ দৌড়ে যাচ্ছে। খিলখিল হাসি। হাতে একটা লাল বেলুন। তার মায়ের চোখে কপট রাগ। চারদিকে ছোট্ট ছোট্ট মোমবাতি জ্বলছে। তার মিষ্টি গন্ধ পরিবেশকে আরও বেশি মায়াময় করে তুলেছে। ইন্দ্ৰ দাঁড়িয়ে আছে ড্রয়িং রুমের ঠিক মাঝখানে। মাথার ওপর ঘোরা ফ্যানের হাওয়ায় জানালার পর্দা উড়ছে তিরতির করে। ইন্দ্র নিজের অজান্তেই হেসে ফ্যালে।

হঠাৎ তার দিকে চোখ পড়তেই আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে লিলি। ভয়ে খামচে ধরে লাল বেলুন। সশব্দে ফেটে যায় সেটা। ইন্দ্র অবাক হয়ে দু-পা এগিয়ে আসে। বলে, “আমায় চিনতে পারছিস না মা? আমি তো তোর বাপি!” লিলি আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকারে ছুটে আসে পরমা। পরমাকে কতদিন পর দেখছে সে। মোমবাতির হলদে নরম আলো পরমার গালে এসে পড়েছে। তার খুলে রাখা চুলের একটা গোছা এসে পড়েছে গালের ওপর। ইন্দ্র হাত বাড়িয়ে চুলটা সরিয়ে দিতে যায়। পরমা চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়ে। ইন্দ্র কিছু বুঝতে পারে না। সে এগিয়ে আসে পরমা আর লিলির দিকে। পরমা লিলিকে বুকে জড়িয়ে ঘরের এক কোণে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে। ভয়ে আতঙ্কে কাঁপছে। ঠিক তখনই পিছনের দরজা খুলে যায়। খোলা দরজা দিয়ে সে নিজেই নিজেকে ঢুকতে দেখে। মুহূর্তে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায় ইন্দ্রর কাছে। সে জানে, এরপর কী হতে চলেছে। সে বাধা দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে এগিয়ে যায়।

“কী হল! চুপ করে গেলে কেন? কিপ চ্যান্টিং দোজ ওয়ার্ডস ইউ স্কাউড্রেল!” রঘুবীরের ঝাঁকুনিতে সংবিৎ ফেরে ইন্দ্রর। সে আবার দাঁড়িয়ে আছে সেই অজ্ঞাত বনভূমির মাঝে। তার গলায় ছুরি ধরে আছেন রঘুবীর। ইন্দ্র ধীরে ধীরে আবার পৃষ্ঠাগুলো পড়তে শুরু করে, রঘুবীর তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করছে। তাঁর গলা ভেঙে গিয়েছে উত্তেজনায়। গলার স্বরে অস্বাভাবিকতা। ততক্ষণে ইন্দ্রর হাতে চুপিসারে উঠে এসেছে লিওনার্দোর দেওয়া পবিত্র পেরেক। ইন্দ্র বুক ভরে নিশ্বাস টেনে এক লহমায় সেটা আমূল বিঁধিয়ে দিল রঘুবীরের বুকে। রঘুবীর প্রাণভেদী আর্তনাদ করে উঠলেন। তারপর ঘাসের মধ্যে লুটিয়ে পড়লেন। ইন্দ্র হাঁটু মুড়ে বসল তাঁর পাশে। রঘুবীর থেমে থেমে বলে চললেন, “নিজের ভালোবাসার মানুষদের ফিরে পাওয়ার জন্য যদি সারা দুনিয়া মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে তছনছ করে দিতে হয়, আমি তা করার আগে দু-বার ভাবব না। যে লোকটা এর আগে পৃষ্ঠাগুলো চুরি করে পালিয়েছিল, সে আমার সঙ্গেই জেলে বন্দি ছিল। আমি তার মুখেই পৃষ্ঠাগুলোর ক্ষমতার কথা শুনি। কিন্তু তখন আমার এসব বিষয়ে আগ্রহ ছিল না। পরে যখন বাড়ি গিয়ে দেখলাম…”

কথা বলতে বলতেই যন্ত্রণায় চোখ বুজে ফেলেন রঘুবীর। কাশতে থাকেন অনবরত। ইন্দ্র বোতল থেকে জল খাওয়ায় তাঁকে। দিনের আলো ফুরিয়ে এসে সন্ধের আধো-অন্ধকার ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে এই বিশাল বনভূমিকে। শেষবেলায় সোনালি আলোয় রঘুবীরের বিষণ্ণ মুখ শতাব্দীপ্রাচীন কোনও পাথুরে মূর্তির মতো লাগছে। কাশি থামিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে রঘুবীর বলতে থাকেন, “আমি তখনই ঠিক করে নিই, আমায় ওই পৃষ্ঠাগুলো যে করে হোক উদ্ধার করতেই হবে। মুন্নি, বেটু আর মিনুকে আবার নিজের চোখে দেখার ওই একটামাত্র রাস্তা আমার সামনে। কিন্তু ততদিনে পুলিশের কাস্টডি থেকে পৃষ্ঠাগুলো তোমার বন্ধুর হাত হয়ে নাইটস টেম্পলারদের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। একা আমার পক্ষে তা হস্তগত করা অসম্ভব। আর্মিতে থাকার সময়েই আমাদের কাছে গোপন ইনটেলিজেন্স ছিল আলফার ব্যাপারে। জানতাম, ডার্ক ওয়েবে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করে সে এখন। প্রথমে তাকেই এই কাজের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে পরে কৌশলে নিজেই টিমের অংশ হয়ে গেলাম। ইভানিকে জলের নীচে তার অন্যমনস্কতার সুযোগে আমিই ইনজেকশন দিই, যাতে শেষ অবধি আমাকে প্রয়োজন হয়। আমি যা করেছি, তার কোনও ক্ষমা হয়তো হয় না। তা ছাড়া ক্ষমা আমি চাইবও না। আমি যা করেছি, আরেকবার সুযোগ পেলে আবার তা-ই করতাম। আই ক্যান ডেস্ট্রয় দ্য ইউনিভার্স ওভার অ্যান্ড ওভার এগেন, জাস্ট টু সি মাই লাড্ড ওয়ান্স ওয়ান মোর টাইম।” হঠাৎ ইন্দ্রদের মাথার ওপরে যেন আচমকা রাত্রি ঘনিয়ে আসে। ইন্দ্ৰ চমকে উঠে মাথা তুলে ওপরে তাকায়। বিশাল দুটো ডানা ছায়া ফেলেছে গোটা পাহাড়ের চূড়া জুড়ে। শেষবেলায় নরম আলো সোনালি পালক-এ বিচ্ছুরিত হয়ে ইন্দ্রর চোখ ধাঁধিয়ে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *