(২৩) দ্য ভল্ট অফ দ্য ডেড
“না। তুমি ঠিক নেই। সবসময় ডোন্ট কেয়ার অ্যাটিটিউড চলে না, বিটা যত সময় যাচ্ছে, তোমার হেল্থ কন্ডিশন ডিটিরিওরেট করছে।” কথা শেষ করে আলফার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে ইন্দ্র বলল, “যদি গামা না যায়, আমিও ভিতরে যাব না। আপনার যা ছেঁড়ার ছিঁড়ে নিন। হয় আপনি আর পাই এখানে অপেক্ষা করুন, আমরা ভিতরে গিয়ে পৃষ্ঠাগুলো নিয়ে আসি, নয়তো আমি এখান থেকে এক ইঞ্চি নড়ছি না। শুট মি ইফ ইউ ওয়ান্ট!”
.
লম্বা সরু করিডর। দু-দিকে খাড়া পাথরের দেওয়াল। গুহার অন্যদিকের তুলনায় এখানে দেওয়ালগুলো বেশ মসৃণ। দেওয়ালের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে এগিয়ে যাচ্ছিল ইন্দ্র। পিচ্ছিল স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের ছোঁয়ায় আঙুলের ডগা ভিজে যাচ্ছে।
“গুহার বাকি দেওয়ালগুলো মতো এটা প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি নয়। ইট’স ম্যান মেড! ভালো করে দ্যাখো, পাথরের দেওয়ালে সরু সরু চুলের মতো দাগ দেখতে পাবে। ওটা আসলে দুটো পাথরের স্ল্যাব বা ব্লকের মধ্যেকার ফাঁক।” দেওয়ালের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন গামা।
“আচ্ছা, ডক্টর গামা…”
“রঘুবীর। রঘুবীর চৌধুরী। আই হেট দিস নেম, গামা। ডক্টর গামা শুনলে কেমন বি গ্রেড ফিল্মের ক্যারেকটর মনে হয়,” নাক কুঁচকে বললেন তিনি। গামার কথায় পিছন থেকে ফিক করে হেসে উঠল ইভানি। ইন্দ্র কড়া চোখে ইভানির দিকে তাকাতে গিয়ে চমকে উঠল। ইভানির দৃষ্টি ঘোলাটে। ঠোঁটের রং ফ্যাকাশে। নকল চুল আবার পরে নিয়েছিল ভিতরে ঢোকার পর। তা দিয়েই কাঁধের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সেই ক্ষত যে ফুলে আরও বড় আকার ধারণ করেছে তা এই আধো-অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
“বেশ, ডা. রঘুবীর, আমায় একটা কথা বলুন, এইভাবে এত ঘন জঙ্গলের মধ্যে এত বড় একটা অর্গানাইজেশন চালানো, পাহাড়ের গুহার ভিতর এত বড় একটা স্ট্রাকচার বানানো, এতগুলো গার্ড, তাদের অস্ত্র—এসব তো বিশাল খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। এসব কি ধর্মীয় অনুদান থেকে আসে?”
“এর মধ্যে ধর্ম কোত্থেকে পেলে? শোনো ভায়া, ধর্মের অরিজিনাল কনসেপ্টটা কী জানো? সমাজে যখন হিংসা, হানাহানি, রক্তপাত বেড়েছে, মানুষের মন থেকে মনুষ্যত্ব মুছে যেতে বসেছে, তখন সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রেভোলিউশন হিসেবে ধর্মের জন্ম হয়েছে। যেমন ধরো এই খ্রিস্টান ধর্মের ক্ষেত্রে জেসাস ক্রাইস্ট, ইসলামধর্মে হজরত মোহাম্মদ হিন্দুধর্মে চৈতন্যদেব বা জিউসদের মোজেস। এরপর একশ্রেণির সুবিধাবাদী ক্ষমতালোভী মানুষ সেই রেভোলিউশনারি আইডিয়া থেকে ধর্মকে সরিয়ে এনে তা দিয়ে ব্যাবসা করতে বসে গেছে। যারা প্রকৃত ধর্মকে ভালোবাসে, যারা ধর্মের মূল পন্থার অনুগামী, তারা কখনোই ধর্মকে নিয়ে ব্যাবসা করে না। তাদের কাছে তারা যে স্পিরিচুয়ালিজম বা আধ্যাত্মিকতাকে ধারণ করে বা যে আধ্যাত্মিক আদর্শের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তা-ই ধর্ম। কিছু মানুষ ধর্মকে জোর করে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন করেছে। এই যে নাইটস টেম্পলারদের দেখছ, আজ থেকে চারশো বছর আগে তৈরি হওয়া নাইটস টেম্পলারদের সঙ্গে এদের মিল কিন্তু কেবল নামেই। কিছু মানুষ নিজের ধর্মাবলম্বী মানুষদের ওপর ঘটে-চলা অত্যাচারের প্রতিবাদস্বরূপ হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করার অভিপ্রায়ে মহৎ উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া সেই নাইটস টেম্পলার এখন আর নেই। ইতিহাসের পাতায় তাদের বীরত্বের কাহিনি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাদের সেই বলিদান আমি শ্রদ্ধা করি। এরা আর যা-ই হোক, নাইটস নয়।”
হাঁটতে হাঁটতে ওরা এসে পৌঁছেছে মূল ভল্টের সামনে। দেওয়ালের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত জুড়ে-থাকা বিশাল লোহার মজবুত দরজা। দরজার গায়ে গোল গোল চারটে চাকার মতো হাতল লাগানো। কোনও চাবির ফুটো নেই। ডিজিটাল লকও নেই। পুরো নিরেট লোহার দেওয়ালের মতো দরজা। পাল্লা মাঝে চুলের মতো ফাঁক না থাকলে সেটা যে দরজা, তা বোঝারই কোনও উপায় নেই। রঘুবীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাতলগুলোর দিকে ঝুঁকে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করে কয়েক পা পিছিয়ে এসে হতাশভাবে মাথা নাড়লেন। পিছনে দাঁড়িয়ে-থাকা ইভানির দিকে তাকালে সে হতাশ সুরে বলল, “আমি ভেবেছিলাম, কোনও ডিজিটাল লক থাকবে।”
“তাহলে কি আলফাকে ডেকে আনব?” রঘুবীর প্রশ্ন করেন।
“কী লাভ হবে তাতে? এই দরজা যেভাবে বসানো, অক্সিঅ্যাসিটিলিন দিয়ে গলানো ছাড়া কোনও উপায় নেই। আলফার প্ল্যান অনুযায়ী গুহার ভিতর ডায়নামাইট দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দরজা ভাঙতে গেলে পাথরচাপা পড়ে আমরা সবাই মরব। অবশ্য তার আগেই এখানকার গার্ডরা এসে আমাদের গুলি করে দিয়ে যাবে। সব জায়গায় কি আর শক্তি খাটিয়ে কাজ হয়?” কথা বলতে বলতেই সামনের দিকে এগিয়ে এসেছে ইন্দ্র। হাঁটু মুড়ে বসে খুঁটিয়ে দেখছে গোল হাতলগুলোকে। কিছুক্ষণ পর পেছন ফিরে মুচকি হেসে বলল, “এগুলো আর কিছুই না। কম্বিনেশন লক। হাতলের গায়ে যে খাঁজকাটা দেখছেন, ওটা দেখতে সাধারণ ডিজাইন মনে হলেও এগুলো আসলে রোমান হরফে লেখা নম্বর। দেখুন নকশা-কাটা ডিজাইনের খাঁজে খাঁজে নম্বরগুলো এনগ্রেভ করা আছে।” রঘুবীর এগিয়ে এসে এনগ্রেভিং-এর গায়ে আলতো করে আঙুল বোলাতে থাকেন। হাতল ধরে আলতো চাপ দিতেই ক্যাঁচ শব্দ করে হাতলটা ঘুরে যায়। মুখ তুলে ইন্দ্রর দিকে তাকান রঘুবীর। ইন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “১১১৯ চেষ্টা করুন তো। নাইটস টেম্পলার গঠিত হয়েছিল ওই খ্রিস্টাব্দে।”
রঘুবীর হাতলে চাপ দিতেই ঘড়ঘড় শব্দ করে চাকা ঘুরতে থাকে। মূল দরজার গায়ে প্রত্যেকটা হাতলের পাশে একটা করে ক্রস চিহ্ন আঁকা। হাতলের গায়ে আঁকা নম্বরগুলো তার পাশাপাশি এলেই ঠং করে একটা ধাতব যান্ত্রিক আওয়াজ হচ্ছে। প্রথম তিনটে হাতলের নম্বর এক সংখ্যার পাশাপাশি এনে চতুর্থ নম্বরটা নয় নম্বরে এনে থামতেই একটা চাপা পাথরে পাথর ঘষার আওয়াজ উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল যেন একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হচ্ছে। ইভানি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল, ইন্দ্র ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল। তাদের দু-দিকের পাথরের দেওয়াল সশব্দে সরে আসছে তাদের দিকে। সম্পূর্ণ করিডর আরও সরু হয়ে তাদের পিষে দিতে আসছে সাক্ষাৎ বিভীষিকার মতো। কয়েক মুহূর্ত হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে তিনজনেই। তারপর উন্মাদের মতো ছুটতে থাকে বাইরের দিকে। ইভানির দৌড়োনোর মতো শক্তি নেই। সে ইন্দ্রর কাঁধে ভর রেখে মেঝেতে পা টেনে টেনে চলেছে। কয়েক পা এগিয়ে যেতেই আবার একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল দু-দিক থেকে এগিয়ে আসা পাথরের দেওয়াল। রঘুবীর উদ্ভ্রান্তের মতো চারদিকে তাকাতে থাকে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শব্দ করে। ইন্দ্র মেঝেতে বসে পড়েছে হাঁটু মুড়ে। ইভানি শুয়ে পড়ে ওর পাশে। কাশতে থাকে একনাগাড়ে। কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে উঠে আসে চাপ চাপ লাল রক্ত। ইন্দ্র ইভানির মাথাটা কোলে তুলে নেয়। ঠোঁটের কশ বেয়ে গড়িয়ে নামছে রক্তের ধারা। চোখের কোলে একবিন্দু অশ্রু। ইন্দ্ৰ মাথা ঝুঁকিয়ে ইভানির মুখের কাছে আনে। ফিশফিশিয়ে বলে, “চলো, এখান থেকে বেরিয়ে যাই এক্ষুনি। লাগবে না কোডেক্স গিগাস-এর হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা। আমি গিয়ে আলফাকে বলছি, গো টু হেল!”
মৃদু ফ্যাকাশে হাসি হাসে ইভানি। মাথার ওপরে দপদপ করে জ্বলতে-থাকা হলদে আলো প্রায়ান্ধকার করিডরের ধূসর পাথুরে দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়ে এসে পড়েছে ইভানির গালের ওপর। সেই আলোয় ইভানির মুখটা আরও সাদা, আরও প্রাণহীন দেখাচ্ছে।
“ইন্দ্ৰ, তুমি জানো আলফা কে? জানো ও কতটা ভয়ংকর মানুষ?” খুব থেমে থেমে প্রশ্নটা করে ইভানি।
“নাহ্। তবে তোমার তো জানার কথা। তুমি তো টিমের সবার ব্যাকগ্রাউন্ড জানো।”
“আলফার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে গিয়ে আমি দেখি, আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে লোকটা যেন পৃথিবীর বুকে হঠাৎ করে উদয় হয়েছে। তার আগের কোনও লিগাল ডকুমেন্ট, কোনও ডিজিটাল বা ম্যানুয়াল ফুটপ্রিন্ট কিচ্ছু নেই মানুষটার। দেন আই ডাগ ডিপার। লোকটা আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকরতম ক্রিমিনালদের মধ্যে একজন। খুব অল্প বয়সে ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দেয়। একটা কোভার্ট মিশনে প্রতিবেশী শত্রুদেশে গিয়ে সেখানকার সরকারের কাছে টাকার বিনিময়ে দেশের গোপন তথ্য বিক্রি করে দেয়। তারপর থেকে দুনিয়ার কাছে লোকটা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এরকম একজন ভয়ংকর লোককে মুখের ওপর না বলা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। সকালে যদি তোমরা মিশন অ্যাবোর্ট করতে, ওইখানেই তোমাদের গুলি করে মারতে ওর হাত কাঁপত না। আমরা এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, ইন্দ্ৰ, যেখান থেকে ফেরবার আর কোনও পথ নেই।”
ওরা আবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে দরজার কাছে। ইন্দ্র এবার নিজেই ঝুঁকে বসেছে দরজার সামনে। বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে হৃৎপিণ্ড। গলা শুকিয়ে আসছে। শুনতে পাচ্ছে, পাশে দাঁড়ানো রঘুবীরের নিশ্বাসও ঘন হয়ে এসেছে। ইন্দ্রের দু-চোখ বন্ধ। মাথার ভিতর তখন ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। হাতের আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপছে উত্তেজনায়। ইন্দ্র কেটে কেটে বলল, “তাহলে কি কোডেক্স গিগাস-এর সম্পর্কিত কিছু? কিন্তু কোডেক্স কত সালে লেখা হয়েছে, তার কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই। পুরো বইয়ের ইতিহাসে যদি সব থেকে উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টাব্দ বাছা হয় তাহলে সেটা ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দ। ওই সালে স্টকহোমের রয়্যাল লাইব্রেরিতে আগুন লাগে। প্রায় সমস্ত বই পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও আশ্চর্যভাবে এই বইটা অক্ষত থেকে যায়। তাহলে কি…”
আস্তে আস্তে আবার হাতলের চাকা ঘোরাতে শুরু করে ইন্দ্র। একটা অদ্ভুত চাপা আওয়াজ তুলে চাকাগুলো ঘুরতে থাকে। রঘুবীর দু-হাতের মুঠো শক্ত করে নিঃশ্বাস বন্ধ করে সামনে ঝুঁকে পড়েছেন। ইভানি অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে নীচের দিকে। ধীরে ধীরে চাকাগুলো এসে স্থির হল ১৬৯৭ নম্বরে। আবার আগের মতোই পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল। আবার দু-পাশের দেওয়াল সংকুচিত হতে শুরু করেছে। পাথরের মেঝের ওপর ভারী দেওয়ালের ঘর্ষণে একটা গম্ভীর ঘড়ঘড় আওয়াজ উঠেছে। এবার আর ওরা পালাতে চেষ্টা করল না। ইন্দ্র মাথা নীচু করে হাঁটু মুড়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। ইভানি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে এসে ইন্দ্রর পিঠে হাত রাখল। রঘুবীর মুখ থেকে একটা হতাশাসূচক শব্দ করে চোখ বুজল।
ধূসর পাথুরে দেওয়াল ধীরে ধীরে শব্দ করে এগিয়ে আসছে। মেঝেতে পাথরের ঘষায় ওঠা ধুলো উড়ছে ক্রমশ সরু হতে-থাকা করিডরময়। হলুদ আলোর আশকারায় সে ধুলো যেন বৈশাখী মেঘের মতো গ্রাস করছে ওদের। সবার মনে মধ্যে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেয়ে উঠছে। এই কি শেষ সুযোগ ছিল? নাকি আরেকবার সুযোগ মিলবে? মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়ালে মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সমর্পণের স্পৃহা এসে দানা বাঁধে। দু-দিকের পাথরের দেওয়াল যেন জীবন্ত। বিশাল এক রক্তলোলুপ প্রাণীর শক্ত চোয়াল। আর তার মাঝে দাঁড়িয়ে-থাকা তিনজন মানুষ যেন পাথরের মূর্তি। তাদের মৃত্যুর আতঙ্ক নেই, বাঁচার লোভ নেই।
