(১৮) মাই ব্লাড ব্লিডস ব্লু

(১৮) মাই ব্লাড ব্লিডস ব্লু

আলফা উঠে চলে যাবার পর অনেকক্ষণ সেখানেই বসে রইল ইন্দ্র। ঝিঁঝির ডাক ছাপিয়ে দূরে জঙ্গলের মধ্য থেকে বিভিন্ন অচেনা পশুপাখির ডাক ভেসে আসছে। দূরে কোথাও জঙ্গলের মধ্যে বোধহয় হাতির পাল বেরিয়েছে। মড়মড় শব্দে গাছপালা ভেঙে তাদের চলার শব্দ এত দূর থেকেও মৃদু হয়ে কানে আসছে। আর এসব শব্দ ছাপিয়ে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে। সমস্ত জঙ্গলকে। বহু দূরে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মিটিমিটি আলো জ্বলছে। যেন মনে হচ্ছে, মাথার ওপরের নক্ষত্রখচিত আকাশের প্রতিচ্ছবি এসে পড়েছে ওই কালচে সবুজ পাহাড়ের ওপর। ওইদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেই ইন্দ্রর কেমন যেন একটা ঘোরে লাগে। নেশাতুর গাউরের মতো সে সেখানে বসে থাকে স্থির। হঠাৎ নীচে চোখ পড়তেই চমকে ওঠে ইন্দ্র। বাড়ির পাঁচিল-ঘেরা চৌহদ্দির বাইরে যেখান থেকে জঙ্গল শুরু হয়েছে, সেই পায়ে-চলা মাটির রাস্তায় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইভানি। মাথা উঁচু করে ইন্দ্রর দিকেই তাকিয়ে আছে সে। ইন্দ্রর চোখে চোখ পড়তেই ইভানি হাতছানি দিয়ে তাকে নীচে ডাকে। এই মেয়েটা পুরো পাগল! নিজের মনেই হেসে ওঠে ইন্দ্র। তারপর কার্নিশে উঠে দাঁড়িয়ে ছাদ বেয়ে নেমে এসে সে নিজের ঘরে ঢোকে। বিছানার ওপরে রাখা জ্যাকেটটা তুলে নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ঘরের বাইরে। ইন্দ্রর ঘর দোতলায়। ঘর থেকে বেরিয়ে লম্বা কাঠের লবি। সেখান থেকে ঘোরানো সিঁড়ি নেমে গেছে ডাইনিং রুমে। বাড়ির মূল ফটক খুলে বাইরে এলেই খামার ঘর। তার পাশ দিয়ে এগিয়ে এসে কাঠের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ইন্দ্র। বাইরে ইভানি তখনও কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ইন্দ্র প্রশ্ন করে, “এত রাত্রে বাইরে বেরিয়েছ কেন?”

“এমনি। ইচ্ছে হল। চলো ঘুরে আসি।”

“এখন! কোথায় যাব? এখানকার জঙ্গলে অনেক হিংস্র বন্য জন্তু আছে। রাতবিরেতে এভাবে নিরস্ত্র হয়ে জঙ্গলে ঘোরা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”

“তোমায় কে বলল আমি নিরস্ত্র?” কোমর থেকে একটা রিভলভার বের করে ইন্দ্রর নাকের সামনে নাচাতে থাকে ইভানি। ইন্দ্র মুচকি হাসে। বলে, কোনও বড় বাইসন বা হাতির সামনাসামনি পড়লে এই রিভলভারের ৩২ বোরের পুঁচকে গুলি কোনও কাজেই আসবে না।”

ইভানি উত্তর না দিয়ে ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকায়। তারপর গুনগুন করতে করতে জঙ্গলের গভীরে হাঁটা দেয়। ইন্দ্র মুখ থেকে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে ইভানিকে অনুসরণ করে। গভীর অরণ্য। উঁচু উঁচু গাছপালা মাথার ওপরে ঘন কালচে-সবুজ মেঘের মতো ঢাল সৃষ্টি করেছে। তা ভেদ করে আকাশের একটা তারাও আর চোখে পড়ছে না। এখানে দিনের বেলাতেও হয়তো সূর্যের আলো মাটি অব্দি পৌঁছোয় না। কেমন যেন মায়াবী, স্যাঁতসেঁতে পুরো জায়গাটা। ইভানি নির্বিকারভাবে এগিয়ে চলেছে সেই পায়ে হাঁটা রাস্তা ধরে। পায়ে হাঁটা রাস্তা মানে কিন্তু মানুষের চলাচলের ফলে সৃষ্ট রাস্তা নয়। বিভিন্ন জন্তুজানোয়ারদের দীর্ঘদিনের চলাচলের ফলে প্রকৃতির খেয়ালে এইরকম রাস্তা সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজিতে এই ধরনের রাস্তাকে বলা হয় গেম-ট্র্যাক। আগেকার দিনে শিকারিরা শিকার করার সময় জঙ্গলের ভিতরে এইরকম কোনও গেম-ট্র্যাকের পাশে উঁচু গাছে মাচা বাঁধতেন। সন্ধ্যাবেলা পশুরা এই রাস্তা ধরেই কাছাকাছি কোনও নুনিতে জল খেতে আসত। আর সেই সুযোগেই তারা সেইসব প্রাণী শিকার করতেন। অবশ্য শ্বাপদ প্রাণীদের, অর্থাৎ বাঘ বা চিতার কথা আলাদা। তারা গেম-ট্র্যাকের ধার ধারে না। জঙ্গলের সর্বত্রই তাদের অবাধ বিচরণ। চলতে চলতে মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল ইভানি। একটা অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। চারপাশে আলো-আঁধারি আর আবছায়ায় ঘেরা এই জঙ্গলে যেন শুধু তারা দু-জন ছাড়া আর কেউ নেই। অবশ্য ইন্দ্ৰ জানে যে আপাতদৃষ্টিতে তাদের একা মনে হলেও আদপেই তা নয়। জঙ্গলের আলোছায়ার ফাঁকফোকর দিয়ে হয়তো অনেক জোড়া চোখ তাদের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। দূরে কোথাও খুসখুসে বৃদ্ধের হাসির মতো হায়নার ডাক শোনা যায়। ইন্দ্ৰ হঠাৎ সেই ডাক শুনে চমকে গিয়ে কেঁপে ওঠে। তা দেখে ইভানি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে বলে, “তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। ম্যাজিক দেখাব। আমি কাল রাতেও সেখানে গিয়েছিলাম।”

“কী ম্যাজিক?” এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে প্রশ্নটা করে ইন্দ্র।

“ধুর বাল! কী ম্যাজিক সেটা বলে দিয়ে কেউ ম্যাজিক দেখায় নাকি? চুপচাপ এসো তো।”

পায়ে পায়ে ওরা জঙ্গলের অনেকটা ভিতরে চলে এসেছে। হন্দ্র বুঝতে পারে যে, আস্তে আস্তে জমাট-বাঁধা অন্ধকারটা কেমন যেন ফিকে হয়ে আসছে। আরেকটু এগিয়ে এসে ইন্দ্র স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দ্যাখে জঙ্গলের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে একটাও বড় গাছ নেই। জঙ্গলের ঠিক মাঝামাঝি শুধু হাঁটু অবধি উঁচু ঘাসে ভরা বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আর সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট জলাশয়। এগুলোকেই নুনি বলে। বন্য জন্তুরা এই জলাশয়গুলোতে সন্ধে নামলে ভিড় করে জড়ো হয় জল খেতে। ইভানি ইন্দ্রর হাত ধরে তাকে একটা উঁচু পাইন গাছের পিছনে টেনে নিয়ে আসে। বলে, “এখানে চুপ করে বসে থাকো। ম্যাজিক দেখতে পাবে।”

ইন্দ্ৰ অগত্যা হাঁটু মুড়ে সেখানে বসে থাকে। কিন্তু তার সন্ত্রস্ত নজর ঘুরছে চারপাশে। জংলি বাতাস অবাধ্য হরিণীর মতো তাদের ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। সেই বাতাসের দাপটে ইন্দ্র বারবার চমকে উঠছে। তার মনে হচ্ছে কোনও অতিকায় বন্য বাইসন তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে। তারই আর্দ্র নিশ্বাস তার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে। আবার কখনও মনে হচ্ছে, পিছনের জমাট কালো অন্ধকার থেকে দুটো জ্বলজ্বলে হলুদ চোখ যেন তাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে মুহূর্তের অসাবধানতার। ইন্দ্রকে উশখুশ করতে দেখে চোখের ইশারায় শাসন করে ইভানি।

একটু পরেই দূর থেকে একটা মৃদু শব্দ ভেসে আসে। কান পেতে শব্দটা শোনার চেষ্টা করে ইন্দ্র। অদ্ভুত! এই জায়গায় এই পরিবেশে সে এই শব্দ আশা করেনি মোটেই। ঘোড়ার খুরের শব্দ। ইন্দ্র অবাক চোখে ইভানির দিকে তাকায়। ইভানির মুখে তখন দুষ্টু-দুষ্টু হাসি। একটু পরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ স্পষ্ট হয়। গভীর জঙ্গলের ভিতরের আলোছায়া থেকে আস্তে আস্তে সেই বিশাল প্রান্তরে এসে দাঁড়ায় একটা দুধসাদা পূর্ণবয়স্ক ঘোড়া। এত বড় ঘোড়া ইন্দ্র এর আগে কখনও দেখেনি। তার ঝকঝকে সাদা রং মাথার ওপরের মখমলি আকাশের গায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তারাদের মিটমিটে আলোতেও যেন আলো বিকিরণ করছে। অদ্ভুত এক মায়াবী কুয়াশা ঘিরে রয়েছে সেই অনন্যসুন্দর প্রাণীকে। মাথার লম্বা কেশর ঘাড় ঝাঁপিয়ে কাঁধে নেমেছে। বলিষ্ঠ অপূর্ব সুন্দর দেহসৌষ্ঠব। ইন্দ্র তার পারিপার্শ্বিক সবকিছু বেমালুম ভুলে গিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, যেন তার সর্বাঙ্গ দিয়ে একটা আবছা দ্যুতি ঠিকরে বেরোচ্ছে। ইন্দ্র ঘাড় ঘুরিয়ে ইভানির দিকে তাকিয়ে দ্যাখে সে-ও মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে। এই গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া কী করে এল, তা ইন্দ্রর কিছুতেই বোধগম্য হয় না। কারণ জংলি ঘোড়া এই অঞ্চলে আছে বলে ইন্দ্ৰ শোনেনি। অসম বা নর্থ-ইস্টের হাতে গোনা কিছু অভয়ারণ্য ছাড়া ভারতে জংলি ঘোড়া সাধারণত দেখা যায় না। সে ইভানির কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এত গভীর জঙ্গলে ঘোড়া কী করে এল? এটা কি জংলি না পোষা?”

ইভানি উত্তর না দিয়ে ঠোঁট ওলটায়। তারপর বলে, “সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কী লাভ?”

ইন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “হুম। তা-ও ঠিক কথা। জানো তো, যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন স্বপ্ন দেখতাম, ঠিক এইরকম একটা দুধসাদা

ঘোড়ায় চড়ে আমি কোনও দূর দেশে চলে যাব। তারপর সে দেশের রাজকন্যাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আমার ঘোড়ার পিছনে বসিয়ে টগবগিয়ে চলে যাব অনেক দূরে।”

এইবার ইভানি দু-হাতে মুখ ঢেকে হাসি চাপে। সে হাসিতে যোগ দেয় ইন্দ্ৰও। বেশ কিছুক্ষণ চাপা স্বরে হেসে ইন্দ্র পিছনের একটা বড় গাছে হেলান দিয়ে বসে উদাস গলায় বলে ওঠে, “এখন তোমার হাসি পাচ্ছে বটে, কিন্তু সে সময় পৃথিবী অন্যরকম ছিল। ইট ওয়াজ অ্যান এরা উইদাউট ফেসবুক। আমরা ভালোবাসার মানুষের জন্য টিউশন শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার মোড়ে সাইকেল দাঁড় করিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে জানতাম। আর ভালোবাসা একটা ধাঁধার নাম ছিল। সোশাল নেটওয়ার্কে মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে খুঁজে নেওয়ার অপশন ভালোবাসার মানুষের জন্য অপেক্ষা করার সেই জাদুটাকেই যেন ফ্যাকাশে করে দিয়েছে। আমরা ধৈর্য ধরার অনুভুতি ভুলে যাচ্ছি। মানুষ বড় সহজলভ্য হয়ে গিয়েছে, ইভানি। মানুষ বড় সস্তা হয়ে গিয়েছে।”

কথা শেষ করে ইন্দ্র ইভানির দিকে তাকায়। ইভানি তখন অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছে সেই নুনির দিকে। ঘোড়াটা ততক্ষণে জল খেয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গিয়েছে গভীর জঙ্গলের অন্ধকারে। ইভানি সেদিকেই তাকিয়ে থেকেই প্রশ্ন করে, “আচ্ছা ইন্দ্র, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”

ইন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেয়, “জানি না… হয়তো। তুমি?”

“নাহ্,” ইভানির সংক্ষিপ্ত উত্তর।

ইন্দ্র মুচকি হেসে প্রশ্ন করে, “তাহলে তোমার কাছে আমি কী?”

ইভানি চোখ তুলে ইন্দ্রর চোখের দিকে তাকায়। তারপর ভীষণ মিষ্টি করে হেসে বলে, “ভীষণ বৃষ্টির দিনে মাথার ওপরের টিনের শেড।”

তারপর ইন্দ্রর চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নরম স্বরে প্রশ্ন করে, “কষ্ট পেলে?”

ইন্দ্ৰ মৃদু হাসে। বলে, “নাহ্! তোমাকে আমি চিনি। এই উত্তরটাই এক্সপেক্ট করেছিলাম।”

“নাহ্! চেনো না।” ইভানি সরে আসে ইন্দ্রর গা ঘেঁষে। তারপর ইন্দ্রর কানের কাছে মুখ এনে ঘাড়ে আলতো কামড় বসায়। ফিশফিশিয়ে বলে, “শরীর চিনলেই বুঝি মানুষ চেনা যায়, মিস্টার বন্ড?”

এরপর খানিকটা সরে এসে একটা গাছে হেলান দিয়ে অন্যমনস্কভাবে দূরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকে। গাছগাছালির ফাঁক গলে এক টুকরো অবাধ্য আলো এসে পড়েছে ইভানির মুখের ডানদিক জুড়ে। আধো-অন্ধকারে চোখের মণিটা চিকচিক করছে তার। চোখের কোলে ওটা কি জল? ইভানি চাপা গলায় গুনগুনিয়ে গান ধরে….

I’ll break down
All eyes on me
I see you right
Right inside of me
Turned my back on the battle
‘Cause there’s not much to lose
I’ll beat my fists
‘til my blood bleeds blue
I’m trying not to break down
I’m holding on too tight now
Let go
Let go.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *