(৪) কারণ মৃত মানুষ কথা বলে না
মার্চ ১৩১৪, জেরুসালেম শহর :
পবিত্র শহরের একদম শেষ প্রান্তে লাল প্রাচীরের লাগোয়া একটা পানশালা। মূল রাস্তা থেকে একটা ছোট গলি বেঁকে গেছে ডানদিকে। দু-ধারে সারি সারি পরিত্যক্ত কুটির। সাদা দেওয়ালে সময় সবুজ আঁচড় কেটেছে। পানশালার দরজাটা অত্যন্ত নীচু, লম্বা মানুষকে মাথা নীচু করে ঢুকতে হয়। রাত্রি নেমেছে, দরজার দু-দিকে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। হলুদ আলোর রেখা মৃদু হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে। ভিতরেও আলোর অপর্যাপ্ততা একটা আলোছায়াময় মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। শেষ দু-বছরে সুলতানের সেনাবাহিনীর লাগাতার হামলায় বিপর্যস্ত গোটা শহর। সাধারণ মানুষের হাতে পোশাক, খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পরিমাণ একেবারে কমে আসায় চুরি-ডাকাতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তাই সাধারণ মানুষ সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোয় না। অন্ধকার নামলেই শহরের বুক থেকে ঘিঞ্জি যানজট, মানুষজনের কোলাহল কতকটা কর্পূরের মতো উবে যায়। পড়ে থাকে ফাঁকা রাস্তাঘাট, স্তূপীকৃত আবর্জনা আর অখণ্ড নিস্তব্ধতা।
পানশালার এক প্রায়ান্ধকার কোণে কোনাভাঙা চৌকো টেবিলে রাখা পানীয়ের একটা বড় পাত্র। তা থেকে মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছেন আন্দ্রে। টেবিলের পাশে বন্ধ জানালার কাচ ভেদ করে পূর্ণিমার চাঁদের আভা প্রবেশ করেছে। আন্দ্রের মুখে সেই আলোছায়া কাটাকুটি খেলেছে। তাঁর ভ্রূ কুঞ্চিত, চোখ বন্ধ। মুখের অভিব্যক্তিতে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। টেবিলের অপর প্রান্তে বসে জর্জ এবং লিও। জর্জ প্রথম থেকেই নিশ্চুপ, কপালে হাত রেখে বসে আছে। দৃষ্টি নিবন্ধ মাটির দিকে। লিও তুলনায় অস্থির। একটানা পা নাচাচ্ছে, মাঝে মাঝে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে টেবিলের উপর ঠুকঠুক করে আওয়াজ করছে। জর্জ বিরক্তির দৃষ্টিতে সেদিকে তাকালে ঠোকা বন্ধ করে নীচু হয়ে উদ্বেগের সুরে বলল, “খবর পেলাম, গ্র্যান্ডমাস্টার জ্যাককে প্যারিসে সেইনি নদীর তীরে নট্রে-ডাম ক্যাথিড্রালের সামনে জনসম্মুখে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। পোপ ক্লিমেন্ট নাকি প্রকাশ্য আদালতে বিচার চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজা তাতে আমল দেননি। অবশ্য এখন পোপের ক্ষমতাও অতি সীমিত। বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে যে ফিলিপের স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতা করবে, তাকেই চক্রান্ত করে হত্যা করা হবে।”
আন্দ্রে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই হত্যাকাণ্ডটাকেও নিশ্চয়ই চার্চের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সমুচিত শিক্ষা হিসেবেই প্রচার করা হয়েছে?”
লিও এরকম গুমোট পরিবেশেও হেসে ফেলল। বলল, “ঠিকই ধরেছেন। তা-ই হয়েছে। আমরা এখন পলাতক আসামি। ধর্মদ্রোহিতার মতো ঘৃণ্য অভিযোগের খাঁড়া ঝুলছে আমাদের মাথার উপর। যে নাইট টেম্পলাররা নিজেদের জীবন উপেক্ষা করে খ্রিস্টধর্মের রক্ষা এবং লালন করে এসেছে, তাদেরই উপর কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে চার্চ-বিরোধী ষড়যন্ত্রকারী এবং শয়তানের পূজারি হিসাবে। এখন নিজের সমস্ত কুকীর্তির দায় খুব সহজেই আমাদের ওপর চাপানো যায়।”
আন্দ্রে এ কথার কোনও জবাব দিলেন না। লিও এবং জর্জও নির্বাক রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারা জানে, আন্দ্রের মনে এখন বয়ে যাচ্ছে চিন্তার ঝড় তাকে এই মুহূর্তে বিব্রত করা সমীচীন নয়। মহামান্য পোপের আদেশানুসারে সব দেশে টেম্পলারদের সমস্ত সংগঠনকে বিগঠিত করা হয়েছে এবং যে নাইটরা সৈন্যবাহিনীর হাতে ধরা পড়েননি অথবা স্বপ্রণোদিতভাবে আত্মসমর্পণ করেননি, তাঁদের পলাতক আসামি রূপে অভিহিত করা হয়েছে। শহরের প্রতিটা কোনায় বাহিনী ক্রমাগত তল্লাশি চালাচ্ছে তাদের খোঁজে। এই শহর অবিলম্বে ত্যাগ করা অবশ্যকর্তব্য। আপাতত ওদের মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে একটা পরিত্যক্ত কবরখানা সংলগ্ন ছোট্ট কুটির। অবশেষে লিও নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করে, “কী স্থির করলেন মাননীয়?”
আন্দ্রে যেন চমকে উঠলেন লিওর প্রশ্নে। সম্ভবত কোনও গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, লিওর প্রশ্নে চকিতে সেই চিন্তায় ছন্দপতন হয়ে সংবিৎ ফিরল। নীচু স্বরে বললেন, “খবর পেয়েছি ওয়ালাকিয়ার সঙ্গে হাঙ্গেরির যুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন যাবৎ। ফ্রান্সের সঙ্গে হাঙ্গেরির সখ্য সুবিদিত, সেই সুবাদে ওয়ালাকিয়ায় আমাদের নিরাপদ আশ্রয় মিললেও মিলতে পারে।”
“কিন্তু একশো পঁয়ষট্টি পাউন্ড ওজনের একটা বই কীভাবে আমরা জেরুসালেম থেকে ওয়ালাকিয়ায় নিয়ে যাব? অত বড় বাক্স নিয়ে উঠতে দেখলেই জাহাজের অন্য যাত্রীদের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হতে পারে। আর সেই অনাহূত কৌতূহল আমাদের কাছে মোটেই কাম্য নয়।”
লিও আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ চুপ করে গেল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আন্দ্রে পিছনে তাকিয়ে দেখলেন, পানশালায় দু-জন ব্যক্তি প্রবেশ করেছে। একজন বেঁটে, শ্যামবর্ণ, সামান্য স্থূলকায়। অন্যজন বেশ লম্বা, চেহারায় শারীরিক সক্ষমতার ছাপ স্পষ্ট। তারা মূল দরজা দিয়ে ঢুকে লিওদের উপেক্ষা করে সোজা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। চেয়ার টেনে বসার সময়ে পোশাকের ফাঁক দিয়ে কোমরের অস্ত্রগুলো দেখা গেল। এরা যে ডাকাত, অথবা তাদেরই অন্বেষণে নিযুক্ত ছদ্মবেশী গুপ্তচর, তাতে সন্দেহ রইল না। তারা দু-জনেই বড় বড় পাত্রে পানীয় নিয়েছে। অন্য অনেক জিনিসের মতো মদের র্যাশনে এখনও লাগাম লাগেনি, ফলে জেরুসালেমে খাদ্যদ্রব্য অপেক্ষা এখন মাদক সুলভ।
এখন পানশালায় মানুষ বলতে শুধু লিওরা এবং লোক দুটো। বেঁটে লোকটা চেয়ার টেনে বসতে গিয়েও থেমে গেল। চোখের উপরে ভ্রূ দুটো কুঁচকে গেল, কপালে ভাঁজ। পাশের লোকটার সঙ্গে নীচু স্বরে কিছু কথা বলে নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে এল ওদের টেবিলের দিকে। লিও উঠতে যাচ্ছিল, আন্দ্রে চোখের ইশারায় বাধা দিলেন। লোক দুটো সামনে এসে দাঁড়াল, কোমর থেকে তলোয়ার বের করতে গেল, কিন্তু সময় পেল না।
আন্দ্রে হাতে ধরা পাত্রের পানীয় অকস্মাৎ ছুড়ে দিলেন লোক দুটোর মুখে। তারা মুহূর্তের জন্য হতচকিত হয়ে পড়লে এক লহমায় নিজে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে একজনের ঘাড় ধরে জোরে মাথা ঠুকে দিলেন টেবিলের উপর। সে দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল মাটিতে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে টপটপ করে রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝেতে। অন্যজন ততক্ষণে কোমর থেকে তলোয়ার বের করেছে। আন্দ্রে বিরক্তির দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে নিজের কোমর থেকে তলোয়ার হাতে তুলে নিলেন। লোকটা নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে হাতের তলোয়ারটা চালাল আন্দ্রেকে লক্ষ্য করে। আন্দ্রে শান্তভাবে সামান্য সরে গিয়ে আক্রমণটা এড়িয়ে গেলেন, তারপর হাতের তলোয়ারের হাতল দিয়ে লোকটার তলপেটে জোরে আঘাত করলেন। লোকটা ‘আঁক্!” শব্দ করে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। আন্দ্রে দু-পা সামনে এগিয়ে এসে সজোরে তলোয়ার চালালেন লোকটার পা লক্ষ্য করে। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ল উলটোদিকের টেবিলের উপর। জীর্ণ দুর্বল টেবিলটা লোকটার ওজন সহ্য করতে না পেরে প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল মাটিতে। ততক্ষণে অন্য লোকটাও সংবিৎ ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে আন্দ্রের পিছনে। হাতে উদ্যত তলোয়ার। এইবার জর্জ উঠে এসে নিজের তলোয়ার লোকটার গলায় ঠেকিয়ে বলল, “উঁহুঁ খোকা! পিছন থেকে লড়ে কাপুরুষরা। সামনে যাও।”
লোক দুটোকে বসানো হয়েছে দুটো মুখোমুখি চেয়ারে, হাত-পা-মুখ বাঁধা। দু-জনেরই মুখের অভিব্যক্তিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে, চোখের মণিতে মুক্তির আকুতি। আন্দ্রে পানশালার দরজার সামনে একটা পাত্রে জল নিয়ে মুখ ধুচ্ছেন। লিও খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপ করে। জর্জ ভাঙা টেবিলটার সামনে একটা চেয়ারে বসে রয়েছে। হাতে তখনও ধরা খোলা তলোয়ার। আন্দ্রে মুখ ধুয়ে ফিরে এলে লিও এগিয়ে এল। বলল, “এরা যদি কোনওভাবে রাজার বাহিনীর কাউকে জানিয়ে দেয় আমরা এই এলাকার লুকিয়ে রয়েছি? আমাদের এত দিনের এত কষ্ট সবকিছু মিথ্যে হয়ে যাবে।”
“জানাবে না।” বলল জর্জ। ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে দাঁড়িয়েছে লোক দুটোর সামনে। তলোয়ারের আলতো খোঁচায় হাত-পায়ের দড়ি কেটে মুক্ত করে দিল তাদের। তারা মুখের বাঁধন খুলে উঠে দাঁড়াল। মুখে আনন্দের অভিব্যক্তি, চোখে মুক্তির হাসি। হঠাৎ তলোয়ারের এক আকস্মিক অভিঘাতে দু-জনের মাথা একসঙ্গে ধড় থেকে আলাদা করে দিল জর্জ। লোকদুটোর মাথা গলা থেকে আলাদা হয়ে যখন মাটি স্পর্শ করল, তখনও নিষ্প্রাণ শরীর দুটো দাঁড়িয়ে রয়েছে একইভাবে। লিও চরম বিস্মিত হয়ে পিছনে-রাখা একটি চেয়ারে বসে পড়ল।
— “কারণ মৃত মানুষ কথা বলে না।” নিজের বক্তব্য শেষ করল জর্জ।
