(৫) দ্য মনস্টার ইজ অন ইয়োর সাইড
ফেব্রুয়ারি, ২০২০। কলকাতা:
গাড়িতে ওঠার সময়েই ড্রাইভার একটা সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার আর একটা মোবাইল ফোন এগিয়ে দিয়েছিল। গাড়ি চলতে শুরু করলে একটা সিগারেট ধরিয়ে গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন মিস্টার পাই। তারপর প্যাকেটটা এগিয়ে দিলেন ইন্দ্রর দিকে। ইন্দ্র স্মিত হেসে প্রত্যাখ্যান করল। পাই ঠোঁট উলটে ফের বাইরের দৃশ্যে মন দিলেন। ইন্দ্ৰ খানিকটা অসহিষ্ণুভাবে বলল, “অতগুলো মানুষকে প্রায় মেরে ফেলছিলেন আপনারা। এসবের কি খুব প্রয়োজন ছিল? আর আমাকে তো জামিনেই ছাড়িয়ে আনতে পারতেন। এভাবে আমি তো ফেরার আসামি হয়ে গেলাম। আপনারা তো রীতিমতো ক্রিমিনাল। আমার আপনাদের বিশ্বাস করাই ভুল হয়েছে।”
প্রায় মিনিটখানেক উত্তর দিলেন না মিস্টার পাই। তারপর হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর স্বরে বললেন, “পৃথিবীতে আলটিমেট ভালো বা খারাপ বলে কিছু হয় না, ইন্দ্র। সবকিছুই যে বিচার করছে, তার দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। যখন দুই পক্ষে যুদ্ধ চলে তখন নিজের দলের লোকেরা ওয়ার-হিরো। অন্য পক্ষ ওয়ার-ক্রিমিনাল। তাই আপাতদৃষ্টিতে দেখেই বিচার করতে বসে যেয়ো না। অনেক বড় একটা যুদ্ধ আসছে সামনে, ভায়া। আর রইল তোমার ফেরার হওয়ার কথা, ওটা ম্যানেজ হয়ে যাবে, চিন্তা কোরো না। তা ছাড়া আমাদের কাছে যা ইনফর্মেশন আছে তাতে তোমার পরিবার বলতে শুধু স্ত্রী আর মেয়ে ছাড়া কেউ ছিল না। তোমার কলেজ একজন কনভিক্টেড আসামিকে চাকরিতে ফিরিয়ে নেবে না। সুতরাং তোমার ওই জীবনে নোঙর বলতে তেমন কিছুই নেই আর।”
ইন্দ্ৰ বুঝছিল, গাড়িটা যাচ্ছে এয়ারপোর্টের দিকে। বাইপাস ধরে সিটি সেন্টার টু, চিনার পার্ক ছাড়িয়ে গাড়িটা ঝড়ের বেগে ছুটছিল। হঠাৎ একটু আধো অন্ধকার জায়গায় সাইড করে দাঁড়িয়ে গেল। গাড়ির দরজা খুলে নামলেন মিস্টার পাই। তারপর ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “নেমে এসো। ছোট্ট কাজ আছে একটা।” কথা শেষ করে গাড়ির পিছনে গিয়ে ডিকি খুলে একটা ছোট ব্যাগ ছুড়ে দিলেন ইন্দ্রর দিকে। তারপর ঠিক সেইরকমই আরেকটা ব্যাগ নিজে নিয়ে চোখের ইশারায় দেখালেন পাশে একটা ছোট্ট ফাস্ট ফুডের রেস্টুরেন্ট। সেদিকে এগিয়ে যেতেই একটা বেঁটে, মোটা লোক এগিয়ে এসে দাঁড়াল। মিস্টার পাই তাঁর সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা ছোট্ট কাগজ বের করে তার হাতে দিলেন। লোকটা সেই কাগজে একবার চোখ বুলিয়েই কোনও কথা না বলে চুপচাপ দোকানের লাগোয়া অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেল। তাকে অনুসরণ করল ওরা দু-জন। দোকানের ঠিক পিছনদিকে একটা ছোট্ট ঘরের সামনে এসে থামল লোকটা। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলে দিয়ে চাবিটা মিস্টার পাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। পাই চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঢুকে পড়লেন ঘরে। পায়রার খোপের মতো ছোট্ট দুটো ঘর।
পাই বললেন, “পাশের ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করে নাও। অ্যাটাচ্ড বাথরুম আছে। চাইলে স্নান করে নিতে পারো। তবে হাতে সময় কম। যা করার, সতেরো মিনিটের মধ্যে করে নাও।”
কথা শেষ করে হাতের ব্যাগ নিয়েই লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে গেলেন পাই। ইন্দ্র দরজা খুলে পাশের ঘরে ঢুকল। ইট বের করা দেওয়াল। প্লাস্টার হয়নি এখনও। ঢুকেই বাঁদিকে একটা ক্যাম্বিসের খাটিয়া। ডানদিকে বাথরুম। অবশ্য ওটাকে বাথরুম বলা বাহুল্য। টিনের দরজা। ছিটকিনি নেই, দরজা টেনে ভিতরে পেরেকের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধতে হয়। কোনওরকমে একজন মানুষের দাঁড়ানোর মতো জায়গা। একটা নীচু কল, প্লাস্টিকের বালতি, একটা হাতল-ভাঙা মগ। ইন্দ্র ব্যাগটা খুলে ভিতরের জিনিস বিছানার উপর ঢালল। এক সেট নতুন জামাপ্যান্ট। একটা তোয়ালে, সাবান, শ্যাম্পু। সঙ্গে একটা শেভিং কিট। যতটা সম্ভব দ্রুততার সাথে দাড়ি কামিয়ে স্নান করে জামাপ্যান্ট পরে পাশের ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকল ইন্দ্র। জামাপ্যান্ট দুটোই চমৎকার ফিট হয়েছে, যেন ট্রায়াল দিয়ে কেনা। বেশ অবাক হল ইন্দ্র। পাশের ঘরে চৌকির উপর বসে জুতোর ফিতে বাঁধছিলেন মিস্টার পাই। ইন্দ্রর ঢোকার শব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, “ইউ আর লেট। পাক্কা তিন মিনিট।”
পাইয়ের দিকে তাকিয়ে চমকে গেল ইন্দ্র। এ কাকে দেখছে! এ তো সেই লোক নয়! ঋজু একহারা চেহারা, নাকটা আগের তুলনায় তীক্ষ্ণ, ছোট ছোট চুল, নিখুঁতভাবে ট্রিম করা দাড়ি, একটা রিমলেস চশমা। চোয়াল আগের তুলনায় সুগঠিত। পাশে একটা ছোট টেবিলের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা কতকটা স্পষ্ট হল। সেখানে একটা প্রস্থেটিক নাক আর একটা মাড়িসুদ্ধ ওপরের পাটির দাঁত। এই নকল দাঁতের পাটির জন্য গালের হাড়গুলোকে অস্বাভাবিক উঁচু লাগছিল। পরনে ঝকঝকে সাদা শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো আর নীল ডেনিম। অসম্ভবরকম স্মার্ট লাগছে। নকল দাঁতের পাটি খুলে ফেলায় গলার স্বরও অনেক স্বাভাবিক শোনাচ্ছে। এবারে ইন্দ্রর দিকে না তাকিয়েই বললেন, “ওইখানে জুতো আর মোজা কিনে রাখা আছে। ঝটপট পরে নাও। আমাদের বেরোতে হবে। উই আর অলরেডি লেট। সো প্লিজ হারি।”
ইন্দ্র বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল, “কিন্তু আমার জামা-জুতোর মাপ কোথা থেকে পেলেন আপনারা?”
যেন খুবই মূর্খের মতো প্রশ্ন করেছে এমনভাবে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে ইন্দ্রর দিকে তাকালেন মিস্টার পাই। তারপর প্রায় ধমকের সুরে বললেন, “তোমার ব্রাউজিং হিস্ট্রি। যে ই-কমার্স সাইট থেকে তুমি জামা-প্যান্ট-জুতো কিনেছ, সেখান থেকে। শান্তি? তোমার ফেভারিট রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পর্নের প্রেফারেন্স, সবই আমাদের নখদর্পণে। এবার দয়া করে আর দেরি কোরো না ফর গড’স সেক!”
ইন্দ্র ব্যাগটায় শেভিং কিট, সাবান আর তোয়ালেটা ঢুকিয়ে নিয়েছিল, সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন মিস্টার পাই। তারপর হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন, “এসব কিচ্ছু নিতে হবে না। এখানেই রেখে দাও।”
ইন্দ্ৰ চুল আঁচড়ে জুতো পায়ে গলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েই দেখল, সেই লোকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার বাইরে। হাতে দুটো ছোট ড্যাফেল ব্যাগ, প্রায় একই রকম দেখতে। সে বুঝল, তখন ওই ছোট্ট চিরকুটে এইগুলো আনার আদেশ দেওয়া ছিল। মিস্টার পাই হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন তালাচাবি কোথায় রয়েছে, লোকটা উত্তরে একটা অস্পষ্ট শব্দ করল। এতক্ষণে ইন্দ্ৰ বুঝল, লোকটা কথা বলেনি কেন প্রথম থেকে। লোকটা কথা বলতে অক্ষম, খুব সম্ভবত শ্রবণশক্তিও নেই।
লোকটা ড্যাফেল ব্যাগ দুটো হাতে নিয়ে চেনের কাছে লাগানো দুটো ছোট্ট কাগজের ট্যাগে চোখ বুলিয়ে নিয়ে একটা এগিয়ে দিল ইন্দ্রর দিকে। ইন্দ্র দেখল ট্যাগে তার নাম লেখা। ব্যাগটা কোলে নিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে গিয়ে বসল। মিস্টার পাই আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার বাইরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আর দরকারি টুকটাক জিনিসপত্র আছে। আর সামনের পকেটে একটা ওয়ালেট, তাতে কিছু টাকা আর ডকুমেন্টস রয়েছে। পরে কাজে লাগবে।”
কী ডকুমেন্টস কী কাজে লাগবে, সে বিষয়ে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করল না ইন্দ্র। বুঝতে পারছিল জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। শুধু দুটো ব্যাপার সে পরিষ্কার বুঝতে পারছিল। প্রথমত, এই মিস্টার পাই বলে যিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন, এঁর আসল নাম যা-ই হোক-না কেন, ইনি একটা বড় অর্গানাইজেশনের একটা সামান্য বোড়ে মাত্র। নিয়ম এবং প্রোটোকল মেনে খুব সিস্টেমেটিক্যালি অপারেট করে এরা। আর দ্বিতীয়ত, অনেক আগে থেকে প্ল্যানমাফিক তাকে টার্গেট করা হয়েছে। এবং সে নিজেও কতকটা এদের হাতে বন্দি। শুধু একটাই জিনিস সে বুঝছে না, তার মতো একজন সামান্য ছাপোষা ইতিহাসের প্রফেসরকে দিয়ে তাদের কী উদ্দেশ্য সাধন হতে চলেছে! বাকি রাস্তা কোনও কথা বললেন না মিস্টার পাই। একটা হাত জানালার বাইরে বের করে রাখা, সে হাতে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট। একটা একটা করে দোকান, ঘরবাড়ি, ট্রাফিক সিগন্যাল পেরিয়ে যাচ্ছে ওরা, শীত চলে গেলেও এখনও তার আবেশ রয়ে গেছে সন্ধের হাওয়ার ঝাপটায়। ইন্দ্রর ক্লান্ত শরীর ধীরে ধীরে চেতনা হারাচ্ছিল। তন্দ্রার অতলে তলিয়ে যেতে যেতে ইন্দ্ৰ শুনতে পেল, কেউ তাকে বলছে, “নেমে পড়ো, এসে গেছি। বাকি ঘুম ফ্লাইটে।”
গাড়িটা যে এয়ারপোর্টের দিকে আসছিল, সেটা আগেই বুঝেছিল ইন্দ্ৰ, কিন্তু এয়ারপোর্টেই যে আসছিল, সেটা ভাবেনি। গেট দিয়ে ঢোকার মুখে ছোট লাইন। আইডি চেক হচ্ছে। ইন্দ্র পিছন ফিরে মিস্টার পাইকে সে কথা বলতে গেলে তিনি চোখের ইশারায় ব্যাগের দিকে দেখান। ব্যাগের সামনের পকেটের চেন খুলে দেখে ভিতরে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, পাসপোর্ট, একটা ফ্লাইটের টিকিট আর একটা ছোট বাদামি ওয়ালেট। ইন্দ্র আধার কার্ডটা হাতে নিয়ে দাঁড়ায়। সিকিয়োরিটি গার্ড হাত বাড়ালে সেটা এগিয়ে দিলে তাতে চোখ বুলিয়ে লোকটা মিষ্টি স্বরে বলে, “হ্যাভ আ গুড ইভনিং, মিস্টার দত্ত।” কার্ডটা খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ হয়নি। এখন ইন্দ্র দেখল তাতে নামের জায়গায় লেখা সুব্রত দত্ত। হাত বাড়িয়ে ভোটার আইডি আর পাসপোর্টও একই নাম দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইন্দ্র। এবারে অবশ্য সে অবাক হয়নি। এইরকমই কিছু আশা করেছিল।
এয়ারপোর্টে ঢোকার পর থেকে মিস্টার পাই একবারও ইন্দ্রর দিকে ফিরেও তাকাননি। ইন্দ্র একবার কথা বলতে গেলে সম্পূর্ণ অপরিচিতের মতো সৌজন্যমূলক কেঠো হাসি হেসে উঠে গেলেন সিট ছেড়ে। ইন্দ্র ফ্লাইটের টিকিটটা হাতে নিল। ইন্ডিগোর টিকিট, কলকাতা টু দিল্লি, বোর্ডিং টাইম ন-টা পঞ্চান্ন, ডিপারচার টাইম দশটা চল্লিশ। কবজি উলটে ঘড়ি দেখল ইন্দ্র, এখনও ঘণ্টা দুয়েক দেরি। এই ঘড়িটা ছিল এই ব্যাগের মধ্যে। এ ছাড়াও একটা মোবাইল ফোন, পাওয়ার ব্যাংক, রুমাল, আরও বেশ কিছু জিনিস রয়েছে। ইন্দ্র এগিয়ে গিয়ে বোর্ডিং পাস করিয়ে আনল, সিট নম্বর টোয়েন্টি ওয়ান এফ, উইন্ডো সিট। বোর্ডিং পাস আর টিকিট ব্যাগে ভরে সে সিকিয়োরিটি চেক-ইন সেরে ওয়েটিং এরিয়ায় কেএফসি-তে ঢুকল। আগেই দেখে নিয়েছে ওই বাদামি ওয়ালেটে একতাড়া পাঁচশো টাকার নোট। অর্ডার দিয়ে চেয়ারে এসে বসেছে, উলটোদিকের চেয়ারে এসে বসলেন মিস্টার পাই।
চোখাচোখি হতেই স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে বললেন, “হাই! কোথায় যাচ্ছেন? মাইসেলফ ঋদ্ধি চ্যাটার্জি।”
ইন্দ্রও হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বলল, “আমি সুব্রত দত্ত। দিল্লিতে যাচ্ছি, অফিসের কাজে। আপনি?”
“আমিও তো সেইখানেই যাচ্ছি, মশাই।” একগাল হেসে জবাব দিলেন মিস্টার পাই। তারপর খাবারে মন দিলেন। করমর্দনের সময় এক টুকরো কাগজ তার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন পাই। হাত ধুতে ওয়াশরুম যাওয়ার অছিলায় বাথরুমে ঢুকে সেটা খুলে দেখল, তাতে লেখা আছে, “তোমার পিছনের নীল শার্টকে এড়িয়ে চলো।”
বাথরুম থেকে বেরিয়ে লোকটার দিকে একবার চোখ বোলাল ইন্দ্র। বেশ কয়েক বছর আগে একবার বন্ধুদের সঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে তন্ত্রায় গিয়েছিল। সেখানে ডিস্কো রুমের কোনায় কোনায় কয়েকজন লোক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল মূর্তির মতো। সুমন্ত্র তাদের একজনকে দেখিয়ে বলেছিল, “ওই যে লোকটাকে দেখছিস, ওদের বলে বাউন্সার। মাল খেয়ে বেচাল করলেই ঘেঁটি ধরে বাইরে ফেলে দেবে।” এখন ওদের সিটের ঠিক পিছনে বসে থাকা লোকটাকে দেখে অবিকল ওইরকমই মনে হল। চৌকো চোয়াল, পেশিবহুল দুটো হাত যেন জামার হাতার বাঁধন কাটিয়ে মুক্তি পেতে চাইছে। নীল হাফহাতা জামা আর কালো প্যান্ট। কানে হেডফোন।
ইন্দ্র এগিয়ে এসে চেয়ারে না বসে টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সোজা বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে। লবি পেরিয়ে এস্কালেটর দিয়ে নামতে লাগল ওয়েটিং এরিয়ায়। সামান্য মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিল, লোকটাও পিছু নিয়েছে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। ওয়েটিং এরিয়ায় প্রত্যেকটা গেটের কাছে সারি সারি চেয়ার সাজানো। ওর ফ্লাইট ষোলো নম্বর গেটে। সেখানে পৌঁছে একটা চেয়ারে বসল ইন্দ্র। খেয়াল করল, এই এসি-তেও ঘামের বিন্দু কপাল বেয়ে নামছে চিবুকে। লোকটা একটু দূরে বসে, হাতে একটা ভাঁজ-করা খবরের কাগজ। ইন্দ্র কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে উঠে গেল নিজের চেয়ার ছেড়ে। একটু এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে ওয়াশরুম। দরজা খুলে ঢুকে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রাখল পাশে। এসব কী হচ্ছে তার সঙ্গে? আজ থেকে দিন তিনেক আগেও এইরকম সময়ে সে রোজকার মতো ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরছিল। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে একটা ফুলের তোড়া কিনেছিল, সাদা অর্কিড। পরমা অর্কিড ভীষণ ভালোবাসে। সঙ্গে লিলির জন্য ক্যাডবেরি। সেদিন ওদের বিবাহবার্ষিকী। বিয়ের সাত বছর পর এখন আর সেভাবে পালন করা হয় না, তবু একতোড়া সাদা অর্কিড আর রাত্রে বাইরে কোথাও ডিনার। ইন্দ্র জানে, ওর জন্য একটা টাই উপহার হিসেবে রয়েছে বাড়িতে। সে কথা মনে পড়তে নিজের মনেই হেসে ফেলে সে। পরমা লুকিয়ে রেখেছে লিলির আলমারিতে, ইন্দ্র আজ সকালেই দেখে নিয়েছে বক্সটা। ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত কলিং বেল বাজিয়েও কেউ খুলল না। ওরা কি বেরোল কোথাও? বেরোলে তো একবার বলে যাবে! সামান্য বিরক্তির সঙ্গে নিজের মোবাইলে হোয়াট্সঅ্যাপ খুলে দেখল, কোনও মেসেজ আছে কি না। নাহ্! ব্যাগের পকেট হাতড়ে ডুপ্লিকেট চাবি বের করে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল ইন্দ্র। লাইট বন্ধ, ঘর অন্ধকার। আন্দাজে সুইচ বোর্ড খুঁজে দিয়ে লাইটের সুইচটা অন করতেই পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল। তারপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল জড়বস্তুর মতো।
মুহূর্তটা মনে পড়তেই ইন্দ্র নিজের দুটো হাত তুলে ধরল চোখের সামনে, আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপছে। বুকের মধ্যে যেন রণদামামা বাজছে। নিজের হৃদস্পন্দন নিজে শুনতে পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, একটা যন্ত্রণা দানা বাঁধছে বুকের মধ্যে। গলা শুকিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাবে। একটা বেসিন ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল কোনওরকমে। কী হয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে। এখন সে একজন ফেরারি আসামি। কোনও এক অজানা চক্রান্তে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। কেউ তার পিছু নিচ্ছে, তারও উদ্দেশ্য জানা নেই। চোখে-মুখে জল দিয়ে বেসিন সংলগ্ন আয়নায় নিজেকে দেখল ইন্দ্ৰ। চোখ কোটরে ঢুকে গিয়েছে, গাল তুবড়ে বসে গিয়েছে। চোখের মণিতে একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য। হঠাৎ চমকে উঠে ইন্দ্র দেখে তার ঠিক পিছনে সেই লোকটা দাঁড়িয়ে। ঘুরে দাঁড়াবার আগেই চকিতে পিছন থেকে আক্রমণ করে লোকটা। বলিষ্ঠ বাহুর নাগপাশ থেকে প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে ইন্দ্ৰ। কিন্তু নিজেকে যতই ছাড়াবার চেষ্টা করে, ততই সেই কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো বাহু তার গলায় চেপে বসতে থাকে। ইন্দ্রর মনে হচ্ছে, সে নিজের চেতনা হারাবে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের ভিতর থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু তার গলা টিপে ধরে রেখেছে সেই রোমশ বাহু। শুধু একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে, ঠোঁটের কশ বেয়ে গড়িয়ে নামছে লালা, হাত-পা ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছে। ঠিক তক্ষুনি দরজা খুলে ভিতরে এলেন মিস্টার পাই। আয়নায় তাঁকে ঢুকতে দেখে ইন্দ্রকে ছেড়ে পিছনে ঘুরল লোকটা। ততক্ষণে ইন্দ্রর চেতনা প্রায় লুপ্ত হয়েছে। সে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। তবু তার মধ্যেই সে যা দেখল তা তার প্রতিটা ইন্দ্রিয়কে মুহূর্তে সচকিত করে। তুলল। খাড়া হয়ে উঠল শরীরের প্রতিটা রোমকূপ। লোকটা ঘুরে মিস্টার পাইকে আক্রমণ করতে গেল। পাই আলোর গতিতে নিজের জায়গা থেকে পিছিয়ে এলেন। লোকটা ততক্ষণে শূন্যে ঘুসি চালিয়েছে। পাই লোকটার চোখ থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই দরজা ভিতর থেকে লক করে দিলেন। লোকটা প্রথমবারের চেষ্টায় আঘাত হানতে অকৃতকার্য হওয়ায় দ্বিতীয়বার পাইয়ের পেট লক্ষ্য করে ঘুসি চালায়। এইবার শরীরটা অদ্ভুত কায়দায় ডানদিকে সরিয়ে দিয়ে সেই আক্রমণও প্রতিহত করেন পাই। চোখের দৃষ্টি তখনও পরিষ্কার না হলেও ইন্দ্র স্পষ্ট দেখতে পায় মিস্টার পাইয়ের ঠোঁটের কোণে হাসি, সে হাসিতে তাচ্ছিল্য স্পষ্ট। লোকটা এবার ছুটে যায় পাইকে লক্ষ্য করে। পাই চকিতে বসে পড়ে নিজের বাম পা প্রসারিত করে ডান হাঁটু মুড়ে সেই পায়ের গোড়ালিকে কম্পাসের অক্ষের মতো ব্যবহার করে নিজের শরীরটাকে দ্রুতবেগে একবার আবর্তিত করেন। ফলে এগিয়ে-রাখা বাম পা তীব্র গতিতে আঘাত করে ধেয়ে আসা লোকটার পায়ে। ভারসাম্য হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা। থুতনি কেটে রক্ত ঝরতে থাকে। পাই এগিয়ে এসে ইন্দ্রকে হাত ধরে টেনে তোলেন। ইন্দ্র কোনওরকমে নিজের চেতনা ফিরে পেয়ে নিজেকে সামলাচ্ছে, হঠাৎ দেখল, লোকটা মিস্টার পাইকে পিছন থেকে আক্রমণ করতে আসছে। প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাবে, মিস্টার পাই বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে হাতের তালু দিয়ে লোকটার কাঁধ আর গলার সংযোগস্থলে আকস্মিক আঘাত করলেন। লোকটা কাটা কলাগাছের মতো শব্দ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। পাই লোকটার পা ধরে টেনে নিয়ে একটা ল্যাট্রিনের খোপে লোকটা সুদ্ধ ঢুকে গেলেন। তারপর ভিতর থেকে লক লাগিয়ে অদ্ভুত কায়দায় উপর দিয়ে ফাইবারের পার্টিশন টপকে বেরিয়ে এলেন। এসে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে ভীষণ শান্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, “চলে এসো। আমাদের বোর্ডিং টাইম প্রায় হয়ে এল।” কথা শেষ না হতেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
ইন্দ্ৰ তখনও সম্পূর্ণ ধাতস্থ হয়নি। তার পোশাকও অবিন্যস্ত। জামা গুঁজতে গুঁজতে সে-ও বেরিয়ে এল। প্রায় দৌড়ে এসে মিস্টার পাইয়ের পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “মেরে ফেললেন নাকি লোকটাকে?”
মিস্টার পাই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। ইন্দ্রর দিকে না তাকিয়েই মুচকি হেসে বললেন, “খেপেছ? চারদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা। টয়লেটের বাইরে লবিতে ডানদিকে একটা লাগানো। আমরা টয়লেটে ঢুকেছি, সেটা দেখা যাচ্ছে। আমরা বেরিয়ে আসার পরই একটা লাশ পাওয়া গেলে কি আমাদের বসিয়ে আইসক্রিম খাওয়াবে? জ্ঞান ফিরলে যাতে নিজেই চুপচাপ বেরিয়ে আসতে পারে, সেইজন্যই ল্যাট্রিনে ঢুকিয়ে ভিতর থেকে লক করে এসেছি।
জ্ঞান ফিরলে বাছাধন নিজেই সুড়সুড় করে পালাবে।”
“তার মানে সিসিটিভি না থাকলে আপনি ওখানেই মেরে ফেলতেন?” সন্ত্রস্ত গলায় প্রশ্ন করে ইন্দ্র।
“উহুঁ,” বলে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন পাই। ততক্ষণে ওরা গেটে দাঁড়িয়ে বোর্ডিং পাস দেখিয়ে করিডর ধরে নামছে। নীচে একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে ওদের ফ্লাইট অবধি নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাসে উঠে ইন্দ্রর পাশে বসে নিজের ব্যাগ কোলে নিয়ে চাপা গলায় কৌতুকের স্বরে বললেন, “আমাদের ফলো করা হচ্ছে, সেটা তুমি জানতে পারার আগেই মেরে ফেলতাম।” কথাটা শেষ করে ইন্দ্রর হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।
ইন্দ্র কিছুটা বিরক্তির সুরে বলল, “ইউ আর আ মনস্টার!”
“আই নো। বাট দ্যাট’স নট ইম্পর্ট্যান্ট। দি ইম্পর্ট্যান্ট থিং ইজ দ্য মনস্টার ইজ অন ইয়োর সাইড।”
