(২২) দ্য উন্ডেড টাইগ্রেস
ওয়েস্ট পাইপের মুখটা প্রায় ফুট দুয়েক চওড়া, সেই মুখে মোটা স্টিলের জালি লাগানো। জলের তলায় দৃষ্টি বেশি দূর পৌঁছোয় না। লেকের গভীরে জল তুলনামূলকভাবে ঘোলা। নীচে ইন্দ্রদের চারপাশে ছোট্ট ছোট্ট মাছ এবং জলজ প্রাণী নিজের খেয়ালে ভেসে চলেছে। ইন্দ্র বা বিটাদের উপস্থিতি তারা মোটেই গ্রাহ্য করছে না। জল কেটে সবার আগে এগিয়ে চলেছেন আলফা, তাকে অনুসরণ করে বাকি সবাই। আলফা ওয়েস্ট পাইপের মুখের কাছে এসে কোমর থেকে একটা ছোট্ট যন্ত্র বের করে স্টিলের জালি কাটতে লাগলেন। ইন্দ্র এগিয়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করছিল, হঠাৎ পিছন থেকে একটা অস্পষ্ট চাপা আওয়াজে সকলে পিছন ফিরে তাকাল। ওয়েস্ট পাইপের মুখটা জলের পৃষ্ঠতলের ঠিক ওপরেই মাথা তুলে রয়েছে। সেখানে শরীরটাকে জলের ওপর সামান্য ভাসিয়ে রেখে যতটা সম্ভব নিজেদের আড়াল করে তারের জালিগুলো একটু একটু করে কাটছিল ওরা। বাকিরা জলের পৃষ্ঠদেশের নীচে আত্মগোপন করে রয়েছে। আওয়াজটা এসেছে তাদের পিছনে জলের নীচ থেকেই। শব্দটা শুনে আলফা এবং ইন্দ্র একসঙ্গে মাথা নামিয়ে জলের তলায় নেমে আসে। জলের তলায় সকলের মুখে অক্সিজেন মাস্ক থাকায় কথা বলার উপায় নেই, আকারে-ইঙ্গিতেই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে হয়। তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি ব্যবহার করে অল রাইট সাইন করে বোঝাতে হয়, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। ইন্দ্র, আলফা, পাই এবং গামা ওকে সিগন্যাল দিলেও ইভানি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। ঘোলা জলের মধ্যে চোখ সইতে একটু সময় লাগছিল, কিছুক্ষণ পর ইন্দ্র খেয়াল করল, ইভানি একটু দুরে জলের নীচে ভেসে আছে। সে কাঁধের কাছে হাত বুলিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। ইন্দ্র সেদিকে এগিয়ে যায়। দ্যাখে তার কাঁধের কাছে পোশাক ছেঁড়া, আর সেই ছেঁড়া জায়গা থেকে লাল রক্ত চুঁইয়ে মিশছে জলে। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত লালচে-কালো ধোঁয়ার মতো জলের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে। ইন্দ্র ইশারায় জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?”
ইভানি দু-হাতের তালু উলটে জবাব দেয়, সে জানে না। আলফা ইশারায় সকলকে জলের পৃষ্ঠতলের ওপর ভেসে ওঠার নির্দেশ দেয়। ইভানির ক্ষত পরীক্ষা করে গামা বলেন, “কিছু একটা কামড়েছে। কী কামড়েছে, সেটা বলা শক্ত। তবে ক্ষত কিন্তু বেশ গভীর। ইমিডিয়েট ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। আমি জানি না প্রাণীটা বিষাক্ত কি না। যদি বিষাক্ত না-ও হয়, তা-ও নোংরা জলে ওই সামনের ওয়েস্ট পাইপের নোংরার ভিতর দিয়ে গেলে ক্ষতস্থান বিষিয়ে গিয়ে গ্যাংগ্রিন বা সেপটিসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তার ওপর বিটার ক্যানসার আছে। ইট’স টু ডেঞ্জারাস ফর হার টু কন্টিনিউ ইন দিস কন্ডিশন। আমাদের উচিত আপাতত এই মিশনটাকে অ্যাবোর্ট করা। বিটার হেল্প ছাড়া আমরা মিশনের পরবর্তী স্টেপগুলো ক্যারি আউট করতে পারব না। কিন্তু এই অবস্থায় বিটাকে এই নোংরা পাইপের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়াটা ভীষণ রিস্কি।”
ইন্দ্র মাথা নাড়িয়ে গামার কথায় সায় দিল। বলল, “আমরা দু-একদিন রেস্ট নিয়ে আবার অ্যাটেম্পট নেব। এই অবস্থায় বিটার পক্ষে মিশনে মুভ ফরওয়ার্ড করা অসম্ভব।”
হঠাৎই আলফার মুখের অভিব্যক্তির সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেল। একটা চাপা হিংস্রতা দুই চোখের মণিতে ঝিলিক দিয়ে উঠেই মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। তিনি নীচু স্বরে বললেন, “মিশন ক্যানসেল করার প্রশ্নই ওঠে না। উই হ্যাভ টু মুভ অ্যাহেড অ্যাট এনি কস্ট। আজ দিনের শেষে আমার হাতে ওই পৃষ্ঠাগুলো থাকবে, ব্যাস।”
গামা বললেন, “অসম্ভব! এভাবে একটা আনট্রিটেড ক্ষত নিয়ে এগোলে বিটার লাইফ রিস্ক হতে পারে।”
এইবার দাঁতে দাঁত ঘষে আলফা বললেন, “তাহলে টিমে আপনার জায়গা কোথায়? আমরা যে মিশনে যাচ্ছি, সেখানে আমাদের আহত হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই আমি টিমে একজন ডাক্তারকে রিক্রুট করেছি। সে যদি কোনও কাজেই না আসে, তবে ফালতু টিমের বোঝা বাড়ানোর প্রয়োজন কী!”
“ওয়েল, আমি এই মুহূর্তে টিম ছাড়ছি। বেসে ফিরে যাচ্ছি, আপনারা মিশন কমপ্লিট করে দেখা করুন।”
গামা উলটোদিকে মুখ ফেরাতেই চোখের পলকে আলফা গামার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র ত্যাগ করলেন। নিস্তব্ধ পরিবেশ খানখান করে দিল পিস্তলের সেফটি লক খোলার খটাস শব্দ। ইন্দ্র দেখল, আলফার দু-চোখে ধিকধিক করে যেন আগুন জ্বলছে। ভীষণ চাপা অথচ দৃঢ়কণ্ঠে আলফা বললেন, “ সবাই একে একে চুপচাপ পাইপের মধ্যে ঢুকুন। আমার আইডিয়া ছিল না যে আই হ্যাভ বিন ওয়ার্কিং টুগেদার উইথ আ বাঞ্চ অফ কাওয়ার্ডস।”
মুহূর্তের মধ্যে ইন্দ্র, গামা এবং পাইয়ের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র উঠে এল। আলফা এবং পাই যথাক্রমে ইন্দ্র এবং গামার দিকে বন্দুকের নল উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক। এবার তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল বিটা। বলল, “ওয়েল, নাও বয়েজ আর ফাইটিং ওভার মি। হাউ সেক্সি!” তারপর ইন্দ্রর চোখে চোখ রেখে বলল, “তুমি জানো, অন্য কেউ আমার হয়ে ডিসিশন নেয়, সেটা আমার পছন্দ নয়। নিজেদের মধ্যে এইসব ড্রামা করার আগে একবার কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে নিলেই পারত যে আমার ডিসিশন কী!”
কথা শেষ করেই বিটা মুহূর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত কায়দায় নিজের শরীরটাকে গুটিয়ে নিয়ে পাইপের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। আগ্নেয়াস্ত্র নামিয়ে নিয়ে বিটাকে অনুসরণ করল বাকিরা। সরীসৃপের মতো বুকে ভর দিয়ে সবাই শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে সরু পাইপের মধ্যে দিয়ে নিয়ে চলেছে। আবর্জনার কটু গন্ধে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ইন্দ্ৰ যতটা ধারণা করেছিল, পাইপটা তার থেকে ঢের বেশি লম্বা। পাইপের মধ্যে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে অপর প্রান্তে পৌঁছোতেই প্রায় মিনিট পনেরো লেগে গেল। পাইপের শেষ প্রান্ত যেখানে গুহার মূল করিডরের সঙ্গে মিশেছে, সেই অবধি পৌঁছে পাইপের গোল দেওয়ালের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল ওরা। সামনে মাথার একটু ওপরেই কিছুক্ষণ পরপর মানুষের হেঁটে যাওয়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। করিডরে হেঁটে-যাওয়া গার্ডদের চলমান পায়ের ছায়া এসে পড়ছে পাইপের আধো অন্ধকারের ভিতর। ইন্দ্রর মনে হতে থাকে এই অপেক্ষা যেন অন্তহীন। বুকের মধ্যে একটানা ঢাক বেজে চলেছে, মনে হচ্ছে, হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়ে পড়বে অকস্মাৎ। নিশ্বাসের চাপা শব্দও অন্ধকার গুমোট বদ্ধ পাইপের ভিতর দামামার মতো শোনাচ্ছে। ইন্দ্রর ভয় হচ্ছে, তার নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের শব্দও যেন কেউ বাইরে থেকে শুনে ফেলবে। নিশ্বাস বন্ধ করে নিজের শরীরটাকে পাইপের অন্ধকারে আবর্জনার আড়ালে মিশিয়ে দেয় সে। উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা, ভয় সবকিছু মিলেমিশে ওর সমস্ত সত্তাকে যেন গ্রাস করছে ধীরে ধীরে। মুখ ঘুরিয়ে বাকিদের দিকে তাকিয়ে দেখে, আলফা এবং পাই ছাড়া বাকিদের মুখেও থমথমে আশা-আশঙ্কার মেঘ দানা বেঁধেছে। ভিতর থেকে বাইরের করিডরের খুবই সামান্য অংশ দৃশ্যমান। ভিতর থেকে বোঝার উপায় নেই যে, দূর থেকে কেউ আসছে কি না। অকস্মাৎ বেরোতে গেলেই ধরা পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে নিস্তব্ধে অপেক্ষা করার পর বুকে ভর দিয়ে এগিয়ে আসে বিটা। সঙ্গে রাখা ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা লম্বা সরু পাইপের মতো যন্ত্র বের করে। সেটার এক মাথায় ছোট্ট একটা ক্যামেরা লাগানো, অন্যদিকটায় একটা ইউএসবি পোর্ট। মোবাইলের মতো একটা ছোট্ট যন্ত্রের সঙ্গে সেটা কানেক্ট করে পাইপটার ক্যামেরাযুক্ত দিকটা ওপরে বেরোবার মুখে লাগানো জালির ফাঁক গলিয়ে বের করে দেয় বিটা। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। একটু পরে ফিশফিশিয়ে বলে, “দু-পাশে দুটো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে ডানদিকের ক্যামেরাটার রেঞ্জ খুব সম্ভবত এই পাইপের মুখ অবধি আসবে না। কিন্তু বাঁদিকের ক্যামেরাটা খুব বেশি দূরে নেই। আমরা এখান থেকে বেরোলেই ক্যামেরায় ধরা পড়ে যেতে পারি।”
“তাহলে কী হবে?” শুকনো মুখে প্রশ্ন করে ইন্দ্র। বিটা ইন্দ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে একটা ছোট্ট যন্ত্র তার মুখের সামনে তুলে ধরে। দেখতে কতকটা মার্কার পেনের মতো।
বিটা ফিশফিশিয়ে ইন্দ্রকে জিজ্ঞেস করে, “এটা কী বলো তো?”
ইন্দ্র ঠোঁট উলটে নিজের অপারগতা ব্যক্ত করে বলে, “হবে কোনও ঘ্যামা যন্ত্র। আমি এইসব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যাপারে একটু কম বুঝি।”
বিটা ঠোঁটের কোণের সেই দুষ্টু হাসিটা বজায় রেখেই ফিশফিশিয়ে বলে, “ধুর শালা! এ কি জেমস বন্ডের মুভি নাকি! এটা সাধারণ লেজার পয়েন্টার আইনস্টাইন মশাই। যেগুলো তোমরা প্রফেসররা কলেজে লেকচারের সময় ইউজ করো, সেই মাল। যদি সিসিটিভি ক্যামেরা লেন্সের ওপর একদম ঠিকঠাক প্রিসিশনে লেজার পয়েন্ট করা যায় তাহলে লেন্স ধাঁধিয়ে যায়। ফলে ভিডিয়োতে রঙিন আলোর বিচ্ছুরণ ছাড়া কিছু দেখা যায় না। পরে কোনওদিন নিজে ট্রাই করে দেখো। আমরা কলেজের ল্যাব থেকে এটা-ওটা ঝাঁপার সময় এই টেকনিক কাজে লাগাতাম। সব সময় সব কাজে কি আর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি লাগে? কিছু কিছু সময় মাথা খাটিয়ে কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান বের করে নিতে হয়। বুঝলেন মিস্টার বন্ড?”
তারপর লেজার পয়েন্টারটা সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে পয়েন্ট করে সামনের সেই ছোট্ট স্ক্রিনে চোখ রেখে বিটা বলে, “হারি আপ! করিডরে এই মুহূর্তে কোনও লোক নেই। ঝটপট ড্রাইভিং স্যুট খুলে করিডরে বেরিয়ে পড়ো।’
গুহার ভিতরটা ইন্দ্র যেরকম কল্পনা করেছিল, আদপে একেবারেই অন্যরকম। প্রায় কুড়ি ফুট চওড়া করিডর, ছাদও প্রায় ফুট পনেরো ওপরে। যেন একটা বিশাল লম্বা হলঘর, শুধু দু-পাশের দেওয়াল শেষ না হয়ে অন্ধকারে কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। পাথুরে দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে পরজীবী লতা পাথরকে আশ্রয় করে ধীরে ধীরে পুরো দেওয়ালটাই যেন অধিকার করে নিয়েছে। কোথাও কোথাও কালো স্যাঁতসেঁতে পাথরের খাঁজে ফুটে আছে ছোট্ট ছোট্ট সাদা অর্কিড। করিডরের ভিতর আলো জোরালো নয়। একটা টিমটিমে হলুদ আলোর আভা সম্পূর্ণ করিডরটাকে আলো-আঁধারিতে মুড়ে দিয়েছে। সেই আলোও মাঝে মাঝে একটা যান্ত্রিক চিড়চিড় আওয়াজ করে দপদপিয়ে উঠছে। আলফা এবং পাই ইশারায় বাকিদের এগিয়ে যেতে বলে পিছনের আধো-অন্ধকারে নিমেষের মধ্যে ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেলেন। তারপরেই সেদিকের নিকষ অন্ধকারের ভিতর থেকে চাপা, ভোঁতা শব্দ এবং মানুষের দেহ পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ার শব্দ ভেসে এল। গামা, বিটা এবং ইন্দ্র রইল অন্য টিমে। তাদের প্রধান কাজ হল জ্যামার খুঁজে বের করে সেটাকে বিকল করা। কারণ ওদের মেনফ্রেম হ্যাক করতে গেলে সবার আগে ইনটারনেট কানেক্টিভিটি দরকার। এই গুহার মধ্যে ইনটারনেট ওয়্যারলেস নয়। সেটা আসে টেম্পলারদের নিজস্ব ফাইবার অপটিক্স কেবলের মাধ্যমে। ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক না-হওয়াতে জ্যামার চলায় সমস্যা হয় না। কিন্তু ইন্দ্রদের ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক জ্যামার চলাকালীন সম্পূর্ণভাবে বিকল। বাইরের ইনভেশন বা নজরদারি আটকানোর জন্যই এই জ্যামারের ব্যবস্থা করা।
বিটা ফিশফিশ করে বলে, “আমাকে সিস্টেমের মেইনফ্রেম হ্যাক করে ঢুকে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করে সব ক-টা সিসিটিভি-কে অকেজো করতে হবে। তা ছাড়া ভল্টের অ্যালার্ম ডিসএল করতে হবে। যদি জ্যামার না খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে আমি রিমোটলি সেটা পারব না। আমায় ওদের কোনও নিজস্ব সিস্টেমের অ্যাকসেস পেতে হবে হ্যাক করার জন্য। সে শালা বহুত হ্যাপা।”
ইন্দ্রদের উদ্দেশ্য হল যতটা সম্ভব নিজেদের অদৃশ্য রেখে জিনিসটা বের করে আনা। ভল্টের রুমে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। বাইরের কড়া পাহারার চোখে ধুলো দিয়ে যদি তারা কোনওভাবে ভল্টরুমে ঢুকে পড়তে পারে, তাহলে বাকি কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু সিসিটিভি ক্যামেরা বিকল না করতে পারলে পরে সেই ফুটেজ দেখে তাদের খুঁজে বের করা নাইটস টেম্পলারদের মতো অর্গানাইজড সিন্ডিকেটের পক্ষে অসম্ভব নয়।
ওরা খুঁজতে খুঁজতে বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছে। মাঝে দু-একজন গার্ডের সঙ্গে মুখোমুখি হলেও তাদের পরনে গার্ডের ইউনিফর্ম এবং গুহার ভিতরে আধো-অন্ধকারে মুখ বোঝা না-যাওয়ার কারণে ধরা পড়েনি। বিটা অধৈর্য হয়ে এদিকে-সেদিকে উদ্ভ্রান্তের মতো তাকাচ্ছে। ঠিক তখনই ইন্দ্রর চোখ পড়ল বিটার কাঁধের দিকে। ক্ষতচিহ্ন থেকে নিঃসৃত রক্ত জমাট বেঁধে কালচে-বাদামি বর্ণ ধারণ করে পোশাকের উপর একটা কালো ছোপ রেখে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেখান থেকে আবার তাজা রক্ত চুইয়ে বেরোতে শুরু করেছে। গামারও চোখে পড়েছে সেটা। তিনি চোখের ইশারায় বিটাকে দেওয়ালের আধো-অন্ধকারের দিকে সরে আসতে নির্দেশ দিলেন। তারপর কোমর থেকে একটা ছুরি বের করে কাঁধের কাছে জামা কেটে ক্ষতচিহ্নটা ভালো করে পরীক্ষা করলেন। ক্ষতের চারপাশে গোল হয়ে চামড়া ফুলে উঠেছে। সেখানে কালচে-বাদামি রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আর দগদগে লাল ক্ষতচিহ্ন চুঁইয়ে লালচে-হলুদ পুঁজরক্ত গড়িয়ে নামছে কাঁধ বেয়ে। গামা ছুরির হাতল দিয়ে ক্ষতচিহ্নের পাশে ফুলে-থাকা চামড়ার ওপর আলতো চাপ দিয়ে বিটাকে প্রশ্ন করলেন, “ব্যথা লাগছে?”
বিটা সামান্য হেসে জবাব দিল, “নাহ্! তেমন কিছু না।” ইন্দ্র লক্ষ করল, বিটা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নিজের দুই হাত শক্ত করে মুঠো করে আছে।
“এখান থেকে সোজা কিছুটা এগিয়ে গেলেই ভল্টরুমের দিকে সোজা করিডর ঢুকে গেছে। এই করিডরের ভিতরে নো-এন্ট্রি জোন। কোনও গার্ড বা সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। করিডর শুরু হওয়ার ঠিক আগেই ডানদিকে সিকিয়োরিটি রুম। আমার বিশ্বাস, মেইনফ্রেম সার্ভার ওখানেই রয়েছে। জ্যামার যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তোমাকে ওই রুমে ঢুকে মেইনফ্রেম সার্ভার হ্যাক করে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করে করিডরের মুখে লাগানো মোশন সেন্সর আর অ্যালার্ম ডিসএল করতে হবে।” চাপাস্বরে একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন আলফা। ভল্টের করিডর অব্দি রেইকি করে এসে ওদের সঙ্গে দেখা করেছেন। সেই পথ যে খুব একটা মসৃণ হয়নি, সেটা তার জামার গোটানো হাতায় লেগে-থাকা রক্তের ছাপ এবং দ্রুত ঘনঘন নিশ্বাসের শব্দে অনুমান করা যায়। কথা বলতে বলতেই তারা পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছে সিকিয়োরিটি রুমের কাছে। বাইরে দরজা আগলে দু-জন সশস্ত্র গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে আরও কমপক্ষে চার-পাঁচজন। প্রত্যেকেই আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত। মিস্টার আলফা সেদিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বললেন, “কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যাও। তোমরা হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটে অতটা পারদর্শী নও। আর আমার একার পক্ষে এতজন সশস্ত্র মানুষকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। পাইয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।”
বিটা একটু চুপ করে থেকে বলল, “এই মুহূর্তে আমাদের হাতে সময় কম। জ্যামার ডিসএবল করতে পারিনি, পাইয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার কোনও উপায় নেই। এখন ওর আশায় হাঁ করে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। আমার ওপর ছেড়ে দিন। যখন আমি হ্যাক করব, তখন ওরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আমাকেই পাহারা দেবে।”
কথা শেষ করেই বিটা একটা অদ্ভুত কাজ করল। কাঁধের কাছ থেকে তখনও তাজা রক্ত গড়িয়ে আসছে। বিটা দু-হাতে সেই রক্ত মেখে নিয়ে হঠাৎ এগিয়ে গেল সার্ভার রুমের দরজার দিকে। চোখ-মুখ কুঁচকে চাপা অস্ফুট আওয়াজ করতে করতে রুমের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর ভিতরে বসে-থাকা গার্ডদের উদ্দেশে রাগত কণ্ঠে বলল, “ওয়াশরুমে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কী করতে বসে থাকে? পাক্কা আধ ঘণ্টা হল দাঁড়িয়ে আছি হাঁ করে। ইমার্জেন্সির সময় যদি মানুষ ওয়াশরুম ইউজ করতে না পারে তাহলে সেটা বানানোর কী দরকার? অসহ্য!” তারপর মুখ তুলে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রচ্ছন্ন আদেশের সুরে বলে, “আমাকে এক মিনিটের জন্য ঘরটা ছেড়ে দিন।”
একজন গার্ড একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?”
বিটা তার দিকে এমনভাবে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায় যে, কলিযুগ না হলে সে বেচারার কপালে নির্ঘাত দুঃখ ছিল। গার্ডটা দু-পা পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে জানায়, “পুরো সিকিয়োরিটি রুম ছেড়ে দেওয়া তো একটু অসুবিধা…” বিটা উত্তর দেওয়ার বদলে দাঁতের ফাঁক দিয়ে হিংস্র নেকড়ের মতো চাপা গর্জন করে। লোকটা থতোমতো খেয়ে বলে, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ নেবেন না প্লিজ। সিকিয়োরিটি ইণ্ড্য বোঝেন তো। আমরা দরজার কাছে দাঁড়াচ্ছি।”
“ডান।”, উদ্বিগ্ন মুখে প্রশ্ন করে ইন্দ্র।
“হুঁ। মোশন সেন্সর আর অ্যালার্ম ডিসএব্লড। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ডিলিট করে পুরোনো ফুটেজ লুপে চালিয়ে দিয়েছি। এখন সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটর চলবে অথচ আমরা অদৃশ্য হয়ে যাব।” মুচকি হাসে বিটা।
তার কাঁধের কাছে ওষুধ আর ব্যান্ডেজ দিয়ে ড্রেসিং করছে গামা। বিটা মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে। নরম মাটিতে আঙুল বুলিয়ে আঁকিবুকি কাটছে। আড়ালে গামার চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় ক্ষতস্থানের কন্ডিশন জিজ্ঞাসা করে ইন্দ্র। গামা হতাশ ভঙ্গিতে দু-দিকে মাথা নাড়ায়। ক্ষতস্থান ফুলে উঠছে ক্রমশ। যা-ই কামড়ে থাকুক, সেটা যে বিষাক্ত, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। বিটার যে স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে তা তার ঘনঘন নিশ্বাস ফেলা এবং এই পাহাড়ি ঠান্ডাতেও কপালে জমা ঘাম থেকে স্পষ্ট। অবশ্য সে নিজের মুখে সেটা স্বীকার করতে রাজি নয়।
ড্রেসিং সেরে নিয়ে উঠে পড়ল ওরা। ততক্ষণে পাই এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে। আরেকটু এগিয়ে গুহাটার রাস্তাটা ডানদিকে বেঁকেছে। একটা সরু করিডর, তার মুখে দু-জন সশস্ত্র প্রহরী দাঁড়িয়ে। আলফা সেদিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় পাইকে কিছু বললেন, তারপর ইন্দ্রদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে হঠাৎ তিরবেগে ধেয়ে গেলেন সেই গার্ড দুটোর দিকে। মুহূর্তের মধ্যে পাইও হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্য লোকটার ওপর। আলফা প্রথমে ডানদিকে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকটার তলপেটে সর্বশক্তি দিয়ে অতর্কিতে আঘাত হেনেছিলেন, লোকটা সেই আঘাত সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে একটু দূরে। তার হাতে ধরে-থাকা আগ্নেয়াস্ত্রও ছিটকে যায় দূরে। প্রথমে অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত না করতে পারলেও নিজেকে সামলে নিয়েই উঠে এসে আলফাকে আঘাত করতে যায়। কিন্তু আলফা এই আক্রমণের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি নিজের শরীরটাকে অদ্ভুত কায়দায় নীচু করে মাটির সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে সেই আক্রমণকে প্রতিহত করেন। ফলত তাঁর দিকে ধেয়ে আসা ঘুসি শূন্যে খেই হারায়। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে টলোমলো পায়ে সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটার কাপের কাছে অব্যর্থ আঘাত হানেন মিস্টার পাই। লোকটা জ্ঞানশূন্য হয়ে মাটিতে। লুটিয়ে পড়ে। ততক্ষণে অন্য লোকটার সংবিৎ ফিরেছে। সে ছুটে যায় কিছুটা দূরে পড়ে-থাকা তার আগ্নেয়াস্ত্রের দিকে। কিন্তু তা হস্তগত করার সুযোগ সে পায় না। তার আগেই ইন্দ্র ছুটে এসে হাঁটু দিয়ে লোকটার গলায় সজোরে আঘাত করে। লোকটার মাথা পিছনের পাথুরে দেওয়ালে সশব্দে ঠুকে যায়। আর্তনাদ করে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে আলফা লোকটার মাথাটা ধরে ডানদিকে আচমকা মুড়িয়ে দেন। লোকটা একটা চাপা শব্দ করে কাটা কলা গাছের মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। ইন্দ্র আর পাই ধরাধরি করে বডি দুটো লুকিয়ে ফেলে করিডরের কোণে পাথুরে খাঁজের অন্ধকারের আড়ালে।
“শুনুন, এখানে প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর গার্ডের শিফ্ট চেঞ্জ হয়। তা ছাড়া কিছুক্ষণ পরপরই গার্ডেরা টহল দিতে দিতে করিডরের সামনে দিয়ে নজরদারি করে যায়। সুতরাং, এই করিডরের মুখ পুরোপুরিভাবে আনঅ্যাটেন্ডেড রেখে আমরা সবাই ভিতরে ঢুকতে পারব না। একটু আগে আমরা যখন এখানে রেইকি করে গেলাম, তখনই একটা শিফট শেষ হয়েছে। অর্থাৎ এখনও দেড় ঘণ্টামতো সময় আছে শিফ্ট চেঞ্জ হওয়ার। তার মানে আমাদের মধ্যে তিনজন ভিতরে যাবে। দু-জন এখানে দাঁড়িয়ে আমাদের হাপিস করে দেওয়া গার্ডদের হয়ে প্রক্সি দেবে। অর্থাৎ আমার সঙ্গে আরও দু-জন ঢুকবে। ডেল্টাকে আমার লাগবে ভিতরে। এখানে দু-জন গার্ডই পুরুষ ছিল। সুতরাং বিটা বাইরে থাকতে পারবে না। তাহলে এখানে বাইরে থাকার জন্য বাঁচছে পাই এবং গামা।’ “সেটা সম্ভব নয়। বিটা অসুস্থ। গামাকে আমাদের সঙ্গে আসতেই হবে” দু-পা এগিয়ে এসে আলফার চোখে চোখ রেখে বলে ইন্দ্র।
“আমি ঠিক আছি। বেশিক্ষণের ব্যাপার না। ডোন্ট ওয়ারি।” বিটা ইন্দ্রর কাঁধে হাত রেখে আলতো চাপ দেয়। ইন্দ্র ঘুরে বিটার দিকে তাকায়। বিটার ঠোঁটের কোণে তখনও লেগে আছে এক টুকরো আলগা হাসি।
