(১১) ডার্ক হর্স এবং কয়েক পশলা বৃষ্টি

(১১) ডার্ক হর্স এবং কয়েক পশলা বৃষ্টি

কলকাতা, মে-২০৩২:

খিদিরপুরে বস্তি এলাকায় একটা অদ্ভুত স্পোর্ট চলে, যার খবর আমরা তথাকথিত এলিট কলকাতাবাসী পাই না। খিদিরপুরের চোরাবাজার থেকে যে রাস্তাটা ডকের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক হেঁটে বাঁদিকে একটা সরু ইটের গলির প্রায় শেষ প্রান্তে বিশাল টিনের ছাউনি-দেওয়া হলঘর। বাইরে থেকে একঝলক দেখে মনে হয় কোনও গোডাউন। কিন্তু কাছে আসতেই ভিতর থেকে মানুষের সমবেত উল্লাস ভেসে আসে। সে উল্লাসে মিশে আছে আদিম হিংস্রতা। গোডাউনের ভিতর একটা ছোট্ট স্টেজকে ঘিরে ছোটখাটো ভিড়। ঘরের এককোণে একটা লম্বা টেবিল। সেখানে দু-জন মধ্যবয়সি লোক লম্বা খাতা, পেন, ছোট ছোট বেগুনি এবং গোলাপি টিকিট আর টাকার ব্যাগ নিয়ে বসে। সেই টেবিল, থুড়ি, কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। সবাই নিজেদের পছন্দমতো প্রতিযোগীর ওপর দাঁও লাগাতে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা আমাদের চেনা কোনও প্রতিযোগিতা নয়। মানে ইট’স নট আ জেন্টলম্যান’স গেম। এখানে দু-জন মানুষ নিজেদের শেষনিঃশ্বাস অবধি নিজেদের মধ্যে মরণপণ লড়াই করে যায়, আর সেই প্রাণঘাতী লড়াই দেখে উল্লাস উপভোগ করেন চারপাশে ঘিরে-থাকা এই মানুষজন। তাদের ওপর বাজি লাগিয়ে চলে জুয়ার মৌতাত আমাদের চেনা-জানা ঝাঁ-চকচকে শহরের মধ্যে এ যেন একটা আলাদা পৃথিবী। এর পরিবেশ আলাদা, আইনকানুন আলাদা। স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিকত্ব এখানে মিলেমিশে একাকার। এখন ঘড়িতে রাত্রি প্রায় সাড়ে বারোটা। আজকের শেষ ম্যাচ চলছে, উত্তেজনার পারদ চরমে। যে দু-জন স্টেজের ওপর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মত্ত, তাদের মধ্যে একজন আমাদের এই কাহিনির ডার্ক হর্স। তার মুখ ঢাকা রয়েছে একটা হুডিতে। উচ্চতা প্রায় ছয় ফুটের ওপর। দোহারা গড়ন, কিন্তু দেহসৌষ্ঠবে চোখ পড়লেই বোঝা যায়, কী অপরিসীম শক্তি ওই শরীরী কাঠামোতে বন্দি করে রেখেছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বীর আকার কমসে কম তার দ্বিগুণ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে যে-কেউ নিশ্চিতভাবে বলবে যে ওই বৃহদাকার দানবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে এই ছিপছিপে চেহারার যুবকের মুখোমুখি সংঘাত বাতুলতা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাদের চারপাশে ঘিরে থাকা সেই মানুষজনের বেশির ভাগই চোখ বুজে দাও লাগাচ্ছে ওই ছিপছিপে গড়নের যুবকের ওপর। তার একটা কারণ হয়তো লড়াই শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই ওই দানবাকৃতি প্রতিযোগী আমাদের ডার্ক হর্সের সামনে কোনওভাবেই সুবিধা করে উঠতে পারছে না। সামনে জড়ো হওয়া ভিড়ের মধ্যে পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে মহিলারাও রয়েছে, তারই মধ্যে একজন চিৎকার করে ‘রুহান’ অর্থাৎ আমাদের ডার্ক হর্স-এর নাম ধরে জয়ধ্বনি দেয়। রুহান সেই ভক্তের দিকে ফিরে চোখ টিপে ভ্রূ নাচায়, আর সেই মুহূর্তের ভগ্নাংশের অন্যমনস্কতার সুযোগে রুহানের দানবাকৃতি প্রতিদ্বন্দ্বী স্টেজের একপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে দুই পা জড়ো করে রুহানের পেটে সজোরে আঘাত হানে। রুহান স্টেজ থেকে ছিটকে পড়ে যায় নীচে। এহেন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বিহ্বল হয়ে জয়ধ্বনি দিতে থাকা জনগণ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। তারপরেই রুহান আবার একলাফে উঠে আসে স্টেজের ওপর। ততক্ষণে তার প্রতিযোগী তাকে আরও একবার আঘাত হানার জন্য তৈরি হয়েছে। দুরন্ত রিফ্লেক্সে নিজের মুখের দিকে ধেয়ে-আসা ঘুসিটা অদ্ভুত কায়দায় এড়িয়ে গিয়ে এক ঝটকায় বেশ খানিকটা পিছিয়ে যায় রুহান, অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় নিজের শরীরটাকে প্রায় হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে স্টেজের অপর প্রান্তে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পিছনে চলে আসে। তারপর লাফিয়ে উঠে হাতের কনুই দিয়ে প্রতিযোগীর ঘাড় আর কাঁধের সংযোগস্থলে সজোরে আঘাত হানে। লোকটা এরকম অকস্মাৎ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তৈরি ছিল না। সে কাঁধ ধরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। রুহান কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাকে আবার আক্রমণ করার বদলে বেশ কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে স্টেজের কোনায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। লোকটা এবার আস্তে আস্তে টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায়। এবার রুহান হিংস্র শ্বাপদের মতো একলাফে লোকটার সামনে এসে চোয়াল বরাবর একটা ঘুসি চালায়। অতর্কিত আক্রমণে লোকটা নিজের ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে যায়, তারপর আবার ছুটে আসে রুহানকে আক্রমণ করার জন্য। রুহান হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়ে ভাঁজ-করা হাঁটুটাকে অক্ষ বানিয়ে এক ঝটকায় নীচের সম্পূর্ণ শরীরটাকে চক্রাকারে একবার ঘুরিয়ে নেয়। ছুটন্ত লোকটার পায়ে গিয়ে আঘাত করে রুহানের সামনের দিকে বাড়িয়ে-রাখা অপর পা। টাল সামলাতে না পেরে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা। রুহান ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে মুহূর্তের মধ্যে লোকটার বাঁ হাত দুই হাঁটুর মধ্যে বন্দি করে শক্তিশালী বাহুর ফাঁসে লোকটার গলা টিপে ধরে। লোকটা অনেকক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করার পর অবশেষে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর যখন বুঝতে পারে যে লোকটি জ্ঞান হারিয়েছে, তখন হাতের ফাঁস আলগা করে পায়ে পায়ে স্টেজ থেকে নীচে নেমে আসে। জনতার হর্ষধ্বনি তখন আকাশ ছুঁয়েছে। উন্মত্ত ভিড়ের মধ্যে থেকে একদল লোক রুহানকে কাঁধে চাপিয়ে হর্ষধ্বনি দিতে দিতে দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

.

নিউ দিল্লি, মে ২০২০:

দিল্লির মূল শহরের প্রান্তিক এলাকায় একটা ছোট্ট পানশালা। রাস্তার পাশে সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোতলায় নীচু দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে হয় এই সস্তার পানশালায়। ইতস্তত কয়েকটা চেয়ার-টেবিল ছড়ানো। বেশির ভাগ টেবিলই অবশ্য ফাঁকা পড়ে আছে। ডানদিকের কোণের টেবিলে একজন ভদ্রলোক সামনে বিয়ারের মগ এবং একবাটি চানাচুর নিয়ে ঢুলুঢুলু চোখে বসে রয়েছেন। তার পাশের টেবিলে দু-তিনজন বন্ধু ফিশফিশিয়ে নিজেদের মধ্যে চটুল হাসিঠাট্টায় মেতে রয়েছে। তাদের অশ্লীল ঠাট্টার দমক উলটোদিকের টেবিলে বসা ইন্দ্রর কান অবধি এসে পৌঁছাচ্ছে। ইন্দ্রর টেবিলের সোজাসুজি কাউন্টারে একজন ওয়েটার সাদা রুমালে গ্লাসগুলো মুছে রাখছিল। কাচের গ্লাসে ঠোকাঠুকি লেগে মিষ্টি টুংটাং সুর উঠেছে। সেদিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ইন্দ্র। যদিও চোখ সেদিকে নিবদ্ধ থাকলেও ইন্দ্রর মন ভেসে গিয়েছিল অন্য কোথাও। তার অন্যমনস্কতার সুযোগে টেবিলের উলটোদিকের চেয়ারে যে একটি মেয়ে এসে বসেছে, সেটা সে খেয়ালই করেনি। মেয়েটার মৃদু গলাখাঁকারিতে চটকা ভাঙল ইন্দ্রর। সে মুখ ফিরিয়ে দেখল, তার উলটোদিকের চেয়ারে বিটা বসে। অবাক ভঙ্গিতে ইন্দ্র জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে?”

“হ্যাঁ, হরলিক্স খেতে এসেছি। খাবে? চেটে চেটে?”

ইন্দ্র উত্তর না দিয়ে হেসে ফ্যালে। বিটা কিন্তু হাসে না। ভ্রূ কুঁচকে ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে।

“সারা সন্ধে ইন্ডিয়া গেটে কার সঙ্গে বেরুবেরু গিয়েছিলে?”

“হুঁ”

বিটা উত্তর না দিয়ে ইশারায় ইন্দ্রর হাতের ট্যাটুর দিকে দেখায়। ওহ! ট্র্যাকিং চিপ। ইন্দ্ৰ ভুলেই গিয়েছিল। তবে কি ওর কিডন্যাপ হওয়ার পর কোনওভাবে চিপটা ডিসেল করে দিয়েছিল লিওনার্দো? যখন তার জ্ঞান ফেরে, সে নিজেকে পায় ইন্ডিয়া গেটের পিছনের সেই জায়গাতেই, যেখান থেকে তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। তবে সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল এই যে, তার জ্ঞান হারানো এবং জ্ঞান ফিরে আসার মধ্যে সময়ের ব্যবধান দশ মিনিটের থেকেও কম। তার মানে কি তাকে ভবিষ্যৎ বা অতীতে কোথাও একটা নিয়ে গিয়েছিল লিওনার্দো! নিজের চিন্তার স্রোত নিজেরই অবাস্তব লাগে। ইন্দ্রর মাথার মধ্যে সবকিছু গুলিয়ে গিয়েছে। হয়তো সে অনায়াসে বিশ্বাস করে নিত যে এ সবকিছুই নিছক স্বপ্ন, কিন্তু তার জ্ঞান হওয়ার পর পাশে পড়ে থাকা সোনালি পালকটা তার সেই সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। জ্ঞান ফেরার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ইন্দ্র এসে ঢুকেছে তাদেরই বেসের কিছুটা আগে গলির মুখে এই ছোট্ট পানশালায়।

“তুমি মাইরি এত ভাবুক কেন বলো তো? উই অল লুজ পিপ্‌ল উই লাভ। ইট’স জাস্ট পার্ট অফ আ গেম।”

চমকে উঠল ইন্দ্ৰ। মাথা তুলে বিটার মুখের দিকে তাকাল। বিস্ময়ের স্বরে বলল, “তুমি এসব…”

উত্তর না দিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে বিটা। হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডেকে বিপির লার্জ পেগ অর্ডার দিয়ে ইন্দ্রর চোখে চোখ রেখে ভ্রূ নাচায়। তারপর মুচকি হেসে বলে, “আমি সর্বজ্ঞানী। তোমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড থেকে শুরু করে কোন ব্র্যান্ডের বা কোন রঙের জাঙিয়া পরো, তা-ও আমি জানি।”

কথাটা বলেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে বিটা। তারপর হাসি থামিয়ে বলে, “তোমাকে রিক্রুট করার আগে… শুধু তোমাকে কেন, যে-কোনও নতুন মেম্বারকে রিক্রুট করার আগে আমি নিজে তার স্ক্রুটিনি করি। তুমি সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাত্রে শুতে যাওয়া অবধি যা যা করো, তার নাইন্টি পার্সেন্ট ট্রেল অজান্তেই ছেড়ে যাও তোমার ফোন বা ল্যাপটপে। লেফ্ট অ্যালোন ফর পিপল টু অ্যাক্সেস ইন আ ব্লিঙ্ক অফ অ্যান আই। ইনফর্মেশন ইজ লেভেরেজ, ইনফর্মেশন ইজ পাওয়ার। বুঝলে ডক্টর ইন্দ্রজিৎ?”

ইন্দ্র উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে। বিটা একটু চুপ করে থেকে বলে, “চাপ নিও না। শুধু তোমার নয়, সবার ক্ষেত্রেই এই দু-হাজার কুড়ি সালে প্রাইভেসি শব্দটা একটা মিথ। এনিওয়ে, আই অ্যাম ইভানি।”

“কিন্তু আমাদের একে অপরের নাম জানা নিয়মবিরুদ্ধ।”

“ধুস! বালের নিয়ম। ইভানি ইভানির নিয়মে চলে। কোন শুয়োরের বাচ্চা কী বলল…”

শেষ কথাগুলো বলার সময় ইভানির গলার স্বর কয়েক পর্দা উঠে যায়। এরকম উত্তরের জন্য ইন্দ্র তৈরি ছিল না, সে হকচকিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। উলটোদিকের টেবিলে বসা সেই বন্ধুগুলো চমকে উঠে মুখ ঘুরিয়ে তাকায় ইভানির দিকে। ইন্দ্র অপ্রস্তুতভাবে বিষম লেগে কাশতে থাকে। ইভানি অবশ্য কথাগুলো বেশ চটে গিয়ে বলেছিল, কিন্তু এখন ইন্দ্রকে এভাবে চমকে যেতে দেখে মজা পেয়ে হেসে ওঠে হাততালি দিয়ে। তারপর মুখটা কাঁচুমাচু করে বলে, “সরি সরি… ডোন্ট মাইন্ড।”

ইন্দ্র উত্তর না দিয়ে হাসতে থাকে। সেই হাসিতে যোগ দেয় ইভানিও। হাসতে হাসতেই ইভানির গলায় বাঁধা লাল সিল্কের রুমালটা আলগা হয়ে যায়। ইন্দ্র দ্যাখে ইভানির গলায় আড়াআড়িভাবে একটা লাল দাগ। সম্ভবত কোনও শুকিয়ে-যাওয়া ক্ষতচিহ্ন। ইন্দ্ৰ কৌতূহলী দৃষ্টিতে সেদিকে তাকাতেই ইভানি তাড়াতাড়ি রুমালের গিঁটটা টেনে নেয়। তারপর ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে হাসে। কিন্তু সে হাসি যে মেকি, তা বুঝতে ইন্দ্রর বিশেষ অসুবিধা হয় না।

বাইরে তখন রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। পানশালা বন্ধের সময় হয়ে এসেছে। ওয়েটার এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বিনয়ের সঙ্গে তাদের উঠে যেতে অনুরোধ করে। ইন্দ্র আর ইভানি বিল মিটিয়ে উঠে পড়ে।

নীচু দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে সিঁড়ি বেয়ে নেমে তারা দাড়ায় একতলায় শেডের নীচে। মুষলধারায় বৃষ্টিতে চারপাশ ঘষা কাচের মতো অস্পষ্ট হয়ে আছে। কানে আসছে বৃষ্টির একটানা একঘেয়ে আওয়াজ। তাদের মাথার ওপরের টিনের শেডে বৃষ্টি পড়ে ভয়ানক শব্দ করে চারপাশে ছিটকে যাচ্ছে। কাছাকাছি কোথাও একটা বাজ পড়ল। বিদ্যুতের নীল আলোয় ইভানির মুখ আলোকিত। ইন্দ্র দেখে ওর চোখের কম্পমান তারায় অস্বস্তি আর ভয়ের চিহ্ন। বিদ্যুতের শব্দে ভয় পেয়ে এককোণে সন্ত্রস্ত বিড়াল ছানার মতো কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ইভানির চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। ইভানি রেগে যায়, কপট রাগে ভ্রূ কুঁচকে ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে। ইন্দ্র এবার জোরে হেসে ফেলে। ইভানি রাগে এক ঝটকায় শেডের বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে খোলা আকাশের নীচে। ইন্দ্র হাত বাড়িয়ে বাধা দিতে যায়, কিন্তু তার আগেই ইভানি গিয়ে দাঁড়িয়েছে অঝোর বৃষ্টির মাঝে। বৃষ্টির ধারা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তার কোঁকড়া চুল, গোল মুখ, ছোট্ট চিবুক। মসৃণ গালে বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটা পথ হারাচ্ছে। দূরে কোথাও বিদ্যুতের ঝলকে দেখা গেল ইভানির সেই ফরসা গাল এখন রক্তবর্ণ। অভিমানে নীচের ঠোঁট ফুলে আছে। সে হয়তো অনুমান করেছিল, ইন্দ্রও বাধা দিতে ওর পিছুপিছু নেমে আসবে বৃষ্টিতে। ইন্দ্র কিন্তু তা করে না, শেডের তলায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসতে থাকে। ইভানি মিনিট দুয়েক ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর মুখ দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যসূচক শব্দ করে ফিরে যাওয়ার রাস্তার দিকে পা বাড়ায়।

ঘড়ির কাঁটা এখন প্রায় বারোটা ছুঁয়েছে। তার সঙ্গে সংগত দিয়েছে জগৎ লন্ডভন্ড করে দেওয়া তুমুল বৃষ্টি। স্বভাবতই রাস্তায় জনপ্রাণী নেই। ইভানি অন্ধকার গলির মুখে দাঁড়িয়ে থমকে যায়। আলো-আঁধারিতে গলির ভিতরটা বিন্দুমাত্র দৃশ্যমান নয়। তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টিতে গলিতে জল জমেছে গোড়ালি অবধি। গলির ভিতরে জমে থাকা অন্ধকার যেন কীসের একটা আকার নিয়েছে। ইভানির মনে হয়, ওই দূরে কালো অন্ধকারের অবয়ব একটা অজানা হিংস্র শ্বাপদের মতো সামনের দুটো ধাবা জড়ো করে অপেক্ষা করছে তার শিকারের মুহূর্তের অসাবধানতার। সে যেন এত দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সেই শ্বাপদের জ্বলন্ত দুটো চোখ, তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত আর ইস্পাতকঠিন মাটিতে গেঁথে-যাওয়া লম্বা বাঁকানো নখর। সামনে কম্পিউটারের স্ক্রিন খোলা থাকলে যে মেয়েটা পৃথিবীর সমস্ত বাধাকে উপেক্ষা করতে পারে অবলীলায়, সেই মেয়েটাই ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তব জীবনে নেমে এলে মাঝে মাঝে এভাবেই খেই হারায়। তার আপাতকঠিন দুর্ভেদ্য ঢালে ছোট ছোট ফুটিফাটা আদুড় হয়ে পড়ে। একটানা বৃষ্টিতে অন্ধকার রাত্রে একলা রাস্তায় চুপচাপ পাথরের মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে ইভানি। তার বুকের ভিতর একটা ছোটখাটো ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। মুষলধারে বৃষ্টি আর বজ্রবিদ্যুৎ, এই দুটোই সে জন্ম থেকে যমের মতো ভয় করে। যদি না আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামত, তাহলে দেখা যেত স্ট্রিটলাইটের হলুদ আলোয় তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে-আসা স্বচ্ছ জলের ফোঁটা তার চিবুক ছুঁয়ে ঝরে পড়ছে মাটিতে। হঠাৎ দূরে কোথাও ভীষণ শব্দে বিদ্যুৎ চমকায়। ইভানি মাথা নীচু করে দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেলে, ঠিক এমন সময় ওর পিছনে একটা হাতের স্পর্শে চমকে উঠে পিছনে তাকায় সে। ইন্দ্র। তার ঠোঁটে তখনও লেগে আছে দুষ্টু-দুষ্টু হাসি। সে বলে, “তাহলে আমাদের আয়রনলেডি বাজের শব্দে ভয় পান?”

“বাল।”

গাল দিয়ে আর কী হবে! বৃষ্টিকে বাল বললে কি আর বৃষ্টি পড়া থেমে যাবে?”

“বাল বাল বাল বাল বাল বাল!”

ইভানি নিজের পাতিয়ালা প্যান্ট দু-হাতে টেনে হাঁটুর ওপর তুলে দ্রুতপায়ে জমা জল ভেঙে গলির ভিতর ঢুকে পড়ে। কয়েক পা এগিয়ে আড়চোখে মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে দেখে নেয়, পিছনে তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে আসছে ইন্দ্ৰ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *