(৬) সদ্যস্নাতা এক যুবতী
জুন, ১৩১৪। রোমানিয়ান জলপথ:
রাত্রি গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। বিশাল জাহাজের চন্দ্রালোকিত ডেকে শুধু ওরা তিনজন। আন্দ্রে কিছুটা এগিয়ে, ডেকের একদম সামনের দিকে। বাকি দু-জন নিজেদের মধ্যে নীচু স্বরে আলোচনা করছে, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। ওদের সফরের আজ চতুর্থ দিন। সফরের শুরু থেকেই আন্দ্রে আরও বেশি গম্ভীর, আরও নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছেন। জাহাজের ডেকের কিনারে কাঠের রেলিং-এর দুই বাহুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তাঁর মন ভেসে চলেছে প্রবল অনিশ্চয়তার দোলাচলে। মহামান্য গ্র্যান্ডমাস্টার তাঁকে যে গুরুদায়িত্ব সমর্পণ করেছেন তা অন্তত এই মুহূর্তে প্রায় অসম্ভব বলেই প্রতীত হচ্ছে। লিও সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। অকস্মাৎ আক্রমণের সময়ে তার উপস্থিতি সহায়তার বদলে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে বলেই স্থির বিশ্বাস তাঁর। আর জর্জের সামরিক প্রশিক্ষণ সামান্য থাকলেও সে নাইট নয়, একজন কিশোর শিক্ষার্থী মাত্র। এমনকি ওয়ালাকিয়ায় পৌঁছোতে পারলেও তাদের সমস্ত সমস্যার নিরসন হবে বলে ভরসা পাওয়া যাচ্ছে না মোটে। একদিকে হাঙ্গেরি এবং অপরদিকে অটোমান সুলতানের বিশাল সেনাবাহিনী নিয়মিত পর্যুদস্ত করে চলেছে ওয়ালাকিয়ার সিংহাসনকে। তবু তারাই এই মুহূর্তে অগতির গতি। আন্দ্রের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকান তিনি। স্থান এবং সময়ভেদে আকাশের রং পরিবর্তিত হতে থাকে, সেসব দিকে কোনওকালেই তেমন মনোযোগ আরোপ করেননি তিনি। কিন্তু এই মাঝদরিয়ায় মধ্যরাত্রির নিকষকালো অন্ধকার আবৃত আকাশ যেন আন্দ্রেকে বশীভূত করে ফ্যালে। প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদৃষ্টে আকাশের এককোণে একফালি রুপালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। সেই রুপালি চাঁদের জোছনায় যেন এই বিশাল জাহাজ সদ্যস্নাতা এক যুবতী। হঠাৎ ডেকের উপরে জাহাজের ওয়াচটাওয়ার থেকে একটা অস্ফুট আর্তনাদ ভেসে আসে। আসন্ন বিপদের আশঙ্কা করে আন্দ্রে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকেন সেই টাওয়ারের দিকে। দড়ির মই বেয়ে তরতরিয়ে উঠে আসেন টাওয়ারের উপর। তারপর চোখে দূরবিন লাগিয়ে দূরে যে ভয়ংকর দৃশ্য তার চোখে পড়ে, তাতে আতঙ্কে তার সমস্ত শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে। বহু দূরে সমুদ্রের শেষ প্রান্তে দিক্চক্রবাল জুড়ে দেখা যাচ্ছে একটা বিশালকায় জাহাজ। যেন ক্ষুধার্ত হিংস্র জানোয়ারের মতো ধীরে ধীরে এদিকেই এগিয়ে আসছে সে। জাহাজটাতে কোনও আলো জ্বলছে না। তাই হয়তো নজরে আসতে এত সময় লেগে গেছে। জাহাজের মাস্তুলের উপর যে পতাকাটা উড়ছে, সেটা দেখেই জাহাজটাকে চিনতে এক মুহূর্ত দেরি হল না আন্দ্রের। ফরাসি জলদস্যু। নির্মম, নির্দয়, ভয়ংকর সেই জলদস্যুদের বিভিন্ন কাহিনি এই সমুদ্রের নাবিকের এবং খালাসির মুখে মুখে ফেরে। যে জাহাজ একবার তাদের নজরে আসে সেই জাহাজের পক্ষে এই ভয়ংকর জলদস্যুদের শ্যেনদৃষ্টি উপেক্ষা করে মুক্তি পাওয়া কার্যত অসম্ভব। আন্দ্রে দ্রুতপায়ে দড়ির মই বেয়ে নীচে নেমে আসেন। তারপর উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়োতে থাকেন ডেক জুড়ে। ডেকের শেষ প্রান্তে ঘোরানো সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচে। সেই সিঁড়ি বেয়ে উন্মাদের মতো নামতে থাকেন তিনি। সিঁড়ির শেষে লম্বা করিডর, সেই করিডরের বাম পাশের অন্তিম কামরাটা তার নিজের জন্য বরাদ্দ। এক ঝটকায় কামরার দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়েন আন্দ্রে। তারপর এগিয়ে এসে বিরাট একটা কাঠের সিন্দুক তার শয্যার নীচ থেকে টেনে বের করেন। সিন্দুকের ডালা খুলতেই ভিতরে দেখা গেল সেই বিশালকায় পুথি। ততক্ষণে জলদস্যুদের যুদ্ধজাহাজ এই জাহাজের একেবারে কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। জলদস্যুদের জাহাজ থেকে মোটা ভারী লোহার নোঙর ছুড়ে ছুড়ে ফেলা হতে থাকে এই জাহাজের ডেক লক্ষ্য করে। জাহাজের রেলিং-এ আটকে যেতে থাকে বাঁকানো ধারালো নখরযুক্ত নোঙরগুলো। নোঙরের অপর প্রান্তে বাঁধা দড়ি বেয়ে জাহাজের ডেকে উঠে আসতে থাকে জলদস্যুরা। জাহাজের হতভাগ্য যাত্রীদের আর্ত চিৎকার ছাপিয়ে জলদস্যুদের জয়সূচক এক অজানা ভাষার সমবেত কণ্ঠের কোরাস কানে আসতে থাকে আন্দ্রের। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারছেন অন্তিম সময় উপস্থিত। তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই, যা করার, এই মুহূর্তেই করতে হবে। তিনি সমস্ত শরীরটা স্থির করে হাঁটু মুড়ে চোখ বুজে বসলেন। ঠিক যেন একটা পাথরের মূর্তি। তাঁর ভাবলেশহীন মুখে যেন আর কোনও জাগতিক আশঙ্কার লেশমাত্র নেই। সেই বজ্রকঠিন দেহ যেন সমাধিস্থ হয়েছে। ধ্যানের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে তার চেতনা। তিনি যেন তাঁর অবচেতন মনের সমান্তরাল জগতে প্রবেশ করেছেন। একমনে খুঁজে চলেছেন কোনও কঠিন প্রশ্নের উত্তর। কোনও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বিবেকের সঙ্গে আলোচনায় ব্রতী। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা বিশাল ঝড় আসার আগের সাময়িক শান্তি তার চারপাশে বিরাজমান। আস্তে আস্তে একটা অদ্ভুত নীল ধোঁয়ার বলয় ঘিরে ধরছে আন্দ্রের ধ্যানমগ্ন শরীরকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা আবছা মৃদু আলোয় ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠতে শুরু করে।
.
জুন, ১৩১৪। হৈয়া বাচু জঙ্গল, ট্রান্সেলভেনিয়া, রোমানিয়া:
ধীরপায়ে জঙ্গলে রাস্তায় পা ফেলে এগোচ্ছে মান্ডু। তার অভ্যস্ত পায়ের পাতা অতি সাবধানে এড়িয়ে চলেছে ঝরাপাতা, শুকনো ডালপালা। বৃদ্ধাঙ্গুলি নীচের দিকে ভাঁজ করে আঙুলের ডগা আর গোড়ালির উপর ভারসাম্য রেখে এক অদ্ভুত ভঙ্গিমায় ঢিমেতালে নিঃশব্দে অনুসরণ করে চলেছে একটা আওয়াজকে, লঘুপায়ে জঙ্গলের পশুদের পায়ে চলা সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে আওয়াজটা। আওয়াজের মালিক ভীষণই সাবধানি, তবু শুকনো পাতায় মুদ্র মচমচ শব্দ কান এড়ায়নি অভিজ্ঞ মান্ডুর। সে এই পদশব্দ চেনে। সামনে কোথাও নুনি আছে। শেষ বিকেলে সেদিকেই চলেছে প্রাণীটা। মান্ডুর হাতে উদ্যত ধনুর্বাণ। তিরের ফলায় চকচক করছে তীব্র বিষ। মন বলছে, আজ শিকার আসবেই। আপুসিনি পর্বতের কোলে সূর্য ঢললে নিজে হাতে চামড়া ছাড়াবে কোনও মাদি শম্বর বা বারাশিঙ্গার। আহ্! তারপর সারারাত বুনো ফুল থেকে তৈরি মাদকে গলা ভিজিয়ে গান ধরবে প্রাণ খুলে। সিমোনা নাচবে বাকিদের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে আগুন ঘিরে। ভারী ভালো নাচে সিমোনা। যখন আগুনের সোনালি আলোয় সিমোনার ঘামে ভেজা গাল, খোলা পিঠ চিকচিক করে, মান্ডুর নেশাতুর হাত পিছলে যায় দাভুলের তেলা চামড়ায়। গ্রামের সেরা সুন্দরীর স্বামী হওয়ার অভিমানে মান্ডুর গলার রগ ফুলে ওঠে, ঝাঁকড়া চুল মাথার দু-পাশে দুলিয়ে দুলিয়ে বুনো গানের সুরে তাল মিলিয়ে দাভুল বাজায়। চুলের আড়াল থেকে ঘামের ফোঁটা কপাল বেয়ে নামে বুকে বলিষ্ঠ দুটো হাতের দশটা আঙুল মত্ত গাউরের মতো খেলে বেড়ায় দাভুলের চামড়ার খোলে।
হঠাৎ শব্দটা থেমে গেল। মুহূর্তে এক জায়গায় স্থির হয়ে গেল মান্ডু। অন্তহীন সে অপেক্ষা, এক-একটা মুহূর্ত যেন শতাব্দীসমান। শরীরটাকে সামান্য ঝুঁকিয়ে চোখ বন্ধ করেছে মান্ডু। এই গহিন অরণ্যে মানুষের সীমিত দৃষ্টিশক্তি প্রায় মূল্যহীন। মূলত নাক এবং কানের উপরেই নির্ভর করতে হয়। এখন মাত্তু যেন আর একজন সাধারণ মানুষ নয়। এখন ও যেন বিশাল অরণ্যেরই একটা নাম-না-জানা গাছ। বছরের পর বছর ঠিক এইভাবে দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ। ওর ঝাঁকড়া চুলে সহস্র পাখির বাস। উজ্জ্বল বাদামি ত্বক ঢেকেছে সবুজ শ্যাওলা-ধরা বল্কলে। নরম সোঁদা মাটিতে গেঁথে গিয়েছে ওর শেকড়। রয়েসয়ে একটা পিচ্ছিল সরীসৃপ ওর শরীর বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে, কিন্তু ও নির্বিকার।
আবার শব্দটা শোনা যাচ্ছে। অস্পষ্ট, অবিন্যস্ত। মান্ডু সন্তর্পণে সাপটাকে একটা নীচু গাছের ডালে নামিয়ে রাখে। সেটা হিসহিস শব্দ তুলে দূরে কাঁটাগাছের ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে যায়। আবার নিঃশব্দে এগিয়ে যায় মান্ডু। সামনে অনেকটা জায়গা কাঁটাঝোপ। খালি পায়ে এগোনো অসম্ভব। সে সামনে একটা ঝাঁকালো জাকারান্ডা গাছ দেখতে পেয়ে তিরধনুক পিঠে ঝুলিয়ে অক্লেশে তার একটা উঁচু ডালে চড়ে বসে। এখান থেকেই তির ছুড়বে। অদূরে নুনিটা দেখা যায়। বিকেলশেষের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, নুনির পাশে একটা মানুষ পড়ে রয়েছে, সম্ভবত অচৈতন্য। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ, ঈষৎ স্থূলকায়। একটা চিতাশাবক মানুষটার গা শুঁকছে। মান্ডু ছিলায় তির লাগাল। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে তির গিয়ে বিঁধল শাবকটার থেকে সামান্য দূরে নরম মাটিতে। আচমকা সামনে তির এসে বেঁধায় ভয় পেয়ে ছিটকে পালায় শাবকটা। মান্ডু নেমে আসে গাছ থেকে। কাঁটা এড়িয়ে সাবধানি পায়ে এগিয়ে যায় নুনির দিকে। নুনি থেকে আঁজলা ভরে জল এনে ছিটিয়ে দেয় মানুষটার চোখে-মুখে। মুখে জলের ছিটে পড়তেই সে চোখ খুলে তাকায়। উঠে বসতে চেষ্টা করে, পারে না। মান্ডু বোঝে, সংবিত হারায়নি, সম্ভবত অতিরিক্ত ক্লান্তিতে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। লোকটার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মান্ডু। একঝলক দেখেই বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, যে মানুষটা বিদেশি। সারা শরীরে টাটকা ক্ষতচিহ্ন। চোখের নীচ থেকে গালের শেষ প্রান্ত অব্দি গভীর ক্ষত। ক্ষতস্থান থেকে বদরক্ত চুঁইয়ে পড়ছে মাটিতে। শুধু হাতে তখনও শক্ত করে ধরে রাখা একটা লম্বা পেরেক এবং বেশ বড় আকারের কয়েকটি চামড়ার টুকরো। পেরেকটার শানিত ফলায় তখনও রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে রয়েছে।
