(৭) টুথ সিরাম

(৭) টুথ সিরাম

ফেব্রুয়ারি, ২০২০। নিউ দিল্লি:

ফ্লাইটে দু-জনের সিট আলাদা। ইন্দ্র নিজের সিটে বসেই ঘুমের জগতে তলিয়ে গিয়েছিল, সমস্ত জাগতিক ক্লান্তি এসে বাসা বেঁধেছে তার মুদিত দু-চোখে। তন্দ্রায় বুঁদ হয়ে মাঝে মাঝে স্থির জলাধারে ভাসা ডুবোকাঠের মতো অবচেতন ছাপিয়ে জেগে উঠছিল বারবার। তার পাশে বসা একটা বাচ্চা মেয়ে আর তার মা। মেয়েটা কিছু একটা নিয়ে জেদ করছে চাপা গলায়, মা-ও চাপা গলায় শাসন করছে। আধো ঘুমে তাদের কথোপকথন বোধগম্য হচ্ছে না। তবু মৃদু হাসল ইন্দ্র। পুরোনো টুকরো টুকরো স্মৃতির আনাগোনা অবচেতন মনের কোণে। আজ আকাশে মেঘ নেই। যেন মনে হচ্ছে, জানালার কাচে কেউ এক পোঁচ নীল রং করে দিয়েছে। ক্লান্তিকর একঘেয়ে ফ্যাকাশে আকাশ দেখতে দেখতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল ইন্দ্র। ঘুম ভাঙল একদম ল্যান্ডিং-এর খানিক আগে। একজন অপরূপা ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্ট এসে বিনীত কণ্ঠে অনুরোধ করলেন সিটবেল্ট বেঁধে নিতে। ইন্দ্র একটু অপ্রস্তুতভাবে হেসে সম্মতি জানাল। অল্প সময়ের হলেও খুব গভীর ঘুম হয়েছে। বেশ ঝরঝরে লাগছে। সে উঁকি মেরে দেখল, মিস্টার পাই একমনে একটা ম্যাগাজিন পড়ছেন। লোকটাকে যতই দেখছে, অবাক হচ্ছে ইন্দ্র। কী অদ্ভুতরকম নিরুত্তাপ একটা মানুষ! পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রতিকূলতা কিছুই যেন তার উপরে সামান্যতমও প্রভাব ফেলে না। এমনকি ভয়ানক ঝাঁকুনি দিয়ে যখন প্লেনটা মাটি স্পর্শ করল, তখনও অব্দি ম্যাগাজিন থেকে পলকের জন্যও নজর সরল না। প্লেন ল্যান্ড করে দরজা খোলার পরেও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলেন। আস্তে আস্তে ভিড় কমলে ধীরেসুস্থে উঠে একবার ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে আসতে বলে নেমে গেলেন। ইন্দ্র মাথার উপর তাঁক থেকে ব্যাগটা নামিয়ে বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ফোন করলেন মিস্টার পাই। সম্ভবত গাড়িকে আসতে বলে দিলেন। দিল্লি এয়ারপোর্টে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এল ইন্দ্র। বিয়ের আগে একবার দিল্লি হয়ে সিমলা গিয়েছিল। বেরিয়ে লবিতে ব্যাগেজ পিকআপ করার জায়গা। চামড়ার বেল্ট মোটরে লাগানো, বৃত্তাকারে ঘুরছে। বেল্টের উপর যাত্রীদের ব্যাগ রাখা। লোকে সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে নিজের লাগেজের অপেক্ষায়। ইন্দ্রদের আলাদা লাগেজ ছিল না। সাত কিলো অব্দি প্লেনের কেবিনে সঙ্গে নিয়ে ওঠা যায়। ওদের দু-জনের ব্যাগই ওদের সঙ্গে ছিল।

গাড়িতে উঠে সারা রাস্তা একটাও কথা বললেন না পাই। গাড়ি ডোমেস্টিক এয়ারপোর্ট থেকে ইনটারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের সামনে দিয়ে এসে মহিপালপুরের কাছে একটা গলিতে ঢুকল। এই জায়গা দিল্লির সম্ভ্রান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে পড়ে না। সরু সরু গলি, ঘিঞ্জি, গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি, ছোট ছোট ফাস্ট ফুডের দোকান, এখন অবশ্য সেগুলো বন্ধ। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছাড়িয়েছে। ইন্দ্ৰ চোখ বুজে ছিল। আজ বিকেলেও সে কারাগারে বন্দি ছিল। এত দ্রুত সবকিছু হয়ে গেল যে, ওর মস্তিষ্ক এখনও পুরো পরিস্থিতি আত্মস্থ করে উঠতে পারেনি। একটা সরু গলির সামনে এসে থামল গাড়ি। জায়গাটা ঠিক কোথায়, ঠাহর করতে পারল না ইন্দ্র। এতক্ষণ দোকানের সাইনবোর্ড দেখলেই জায়গার নাম খুঁজছিল। কিন্তু এখানে আশপাশে কোনও দোকানও নেই। গাড়ি থেকে নেমে ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গলিতে ঢুকে গেলেন পাই। ইন্দ্ৰ বুঝল, সরু গলি, গাড়ি ঢুকবে না। বাকি রাস্তা পায়ে হেঁটে যেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতেই পাইকে প্রশ্ন করল ইন্দ্র, “কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

“স্বর্গে,” মিস্টার পাইয়ের চোখের তারায় কৌতুকের ঝিলিক।

“যে লোকটা আমাদের আক্রমণ করেছিল, সে কে? আপনার বসই বা কে? আমি একজন সামান্য প্রফেসর। আমায় দিয়েই বা কী কাজ থাকতে পারে আপনাদের? আমি এভাবে আর অন্ধের মতো চলতে পারছি না। কী হচ্ছেটা কী এসব!”, ইন্দ্রর গলায় উষ্মা ঝরে পড়ে। অধৈর্য হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে ইন্দ্ৰ। হাত মুঠো, চোয়াল শক্ত।

“দেখো, আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে, এই মুহূর্তে তুমি যেটুকু জানো তার থেকে বেশি জানার তোমার ক্লিয়ারেন্স নেই। আর আমারও তোমার বলার অথরিটি নেই। তবে তোমায় এটুকু আশ্বস্ত করতে পারি যে, তোমার কিছু প্রশ্নের জবাব তুমি কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়ে যাবে।”, কথা শেষ করে ইন্দ্রর উত্তরের অপেক্ষা না করেই শিস দিতে দিতে হাঁটতে শুরু করলেন মিস্টার পাই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে অনুসরণ করল ইন্দ্র।

গলির একদম শেষ প্রান্তে তিনতলা বাড়ি। চাকচিক্যহীন সাদামাটা বাড়ি পুরু স্কোয়্যার বারের গ্রিল, সাদা দেওয়াল। একতলায় গ্যারেজ। সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোতলায় একটা বড় হলঘর। অনেকটা কনফারেন্স রুমের মতো। ঘরের মাঝে লম্বা টেবিল। দু-ধারে সারি সারি চেয়ার, সামনে দেওয়ালে ঝুলছে একটা হোয়াইট বোর্ড, পাশে ছোট উঁচু একটা টেবিলে মার্কার, একটা লেজার পয়েন্টার। তিনতলায় লম্বা করিডর, তার দু-ধারে সারি দিয়ে তিনটে তিনটে মোট ছ-টা ঘর। একটা ঘরের ছিটকিনি লাগিয়ে তালা ঝুলছিল। মিস্টার পাই পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলে বললেন, “আপাতত এটাই তোমার ডেরা। ঘুমিয়ে নাও। কাল সকালে বাকিদের সঙ্গে আলাপ হবে।”

কবজি উলটে ঘড়ির ডায়ালে চোখ বোলাল ইন্দ্র। রাত প্রায় দুটো। এখন আর ঘুম এলে হয়।

*

খোলা জানালার ফাঁক গলে একফালি অবাধ্য রোদ্দুর ইন্দ্রর বিছানায় এসে পড়েছে। ইন্দ্র একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে ছিল। প্রায়ান্ধকার ঘরে একফালি আলোয় অসংখ্য গুঁড়ো গুঁড়ো ধূলিকণার আনাগোনা। ঘরের একপাশে একটা খাট, খাটের সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট টেবিল, পাশে একটা চেয়ার। তাতে রাখা ইন্দ্রর ব্যাগটা। ঘরের উলটোদিকের কোণায় একটা লম্বাটে আলনা। তার ঠিক পাশেই একটা ছোট দেওয়াল আলমারি। আর খাটের অপর প্রান্তে মাথার কাছে একটা স্টাডি ল্যাম্প। ঘরে আসবাব বলতে এইটুকুই। ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া বাথরুম। তাতে তোয়ালে, সাবান, তেল। সেখান থেকে বেরিয়ে ব্যাগটা চেয়ার থেকে তুলে টেবিলে রেখে চেয়ারে বসল ইন্দ্র। তার ঘর ছাড়া বাকি ঘরগুলোয় তালা ছিল না, পাইও বলে গেলেন, বাকিদের সঙ্গে আলাপ হবে সকালে। অর্থাৎ সে এখানে একা নয়। সে গিয়ে এল জানালার কাছে। পাল্লা সামান্য ফাঁক করে দেখল নীচে একটা ছোট্ট পার্ক। একজন তার শিশুপুত্রকে সেখানে সাইকেল চালানো শেখাচ্ছেন। পার্ক পেরিয়ে ওপাশে বোধহয় সড়ক। গাড়ি চলাচলের মৃদু আওয়াজ আসছে। তার জানালার বাইরে দেওয়াল জুড়ে লাল ছোট্ট ছোট্ট পিঁপড়ের একটা লম্বা সারি। কেমন যেন অদ্ভুত মায়াজালে বন্দি সবাই। সবার সামনের পিঁপড়েটাকে সবাই অন্ধ অনুসরণ করে চলেছে বিনা বাক্যব্যয়ে। অদ্ভুত তাদের নিয়মানুবর্তিতা! কী সুসংবদ্ধভাবে নিখুঁত সমন্বয়ে কাজ করে চলেছে সকলে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। ইন্দ্র এগিয়ে এসে দরজা খুলতেই একটা বছর বারোর ছেলে ঢুকল ঘরে। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। হাতে একটা স্টিলের থালা, তাতে ব্রেড অমলেট। থালাটা টেবিলে রেখে বিজ্ঞের মতো ভ্রূ নাচিয়ে ছেলেটা বলল, “তেরেকো নীচে বুলায়া।”

সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডান হাতে সেই হলঘর। দরজা ভেজানো ছিল, খুলে ঢুকে সামান্য বিস্মিত হল ইন্দ্র। সে আশা করেছিল, ঘরে কাউকে দেখতে পাবে, কিন্তু ঘর শূন্য। ঘাড় ঘুরিয়ে ভালো করে ঘরটা পর্যবেক্ষণ করতে যাবে, হঠাৎ গলার কাছে একটা মৃদু চিনচিনে ব্যথা পেয়ে চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখল, দরজার পাল্লার আড়ালে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এখন সেই আড়াল ছেড়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। ইন্দ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মেয়েটির পরনে ফেডেড ডেনিমের ওপর হলুদ টি-শার্ট। তাতে করোটির চিহ্ন আঁকা। গলায় আকাশি সিল্কের রুমাল বাঁধা। হাতে কাঠের পুথির ব্রেসলেট, বাহুতে একটা বারকোডের ট্যাটু করানো। চুয়িং গাম চিবোতে চিবোতে সামান্য বিদ্রুপের সুরে বলল, “হাই ডার্লিং!”

হঠাৎ ইন্দ্রর চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। মনে হল, চোখের সামনে সবকিছু যেন দুলে উঠছে অজান্তে। শরীর হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে টালমাটাল হয়ে উঠছে। যেমন করে শান্ত সমুদ্রে অকস্মাৎ তুফান এলে অনভ্যস্ত জাহাজ মাতাল বাতাসের আক্রোশে উথালিপাতালি করে, ঠিক সেইরকমই একটা অজানা অস্থিরতা গ্রাস করল ইন্দ্রকে। সে দু-হাতে উদ্ভ্রান্তের মতো কূল খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল। তারপর হঠাৎই সবকিছু কেমন শান্ত নিস্তরঙ্গ হয়ে এল। ইন্দ্র বুঝল, ধীরে ধীরে সে চেতনা হারাচ্ছে। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। চোখের সামনে আস্তে আস্তে ঝাপসা আলোর আঁকিবুকি মিলিয়ে গিয়ে পড়ে থাকে শুধু নিকষ অন্ধকার।

*

কপালে টিপটিপ ঠান্ডা জলের ফোঁটায় সজাগ হয়ে ওঠে ইন্দ্র। এক ঝটকায় উঠে বসতে গিয়েও পারে না। উপলব্ধি করে, তার শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা রয়েছে একটা লম্বা বেঞ্চের সঙ্গে। হাত আর পায়ের আঙুল ছাড়া শরীরের আর কোনও অংশ নাড়াবার জো নেই। শরীরকে চিত করে শুইয়ে বেঞ্চের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। কপালের ঠিক উপরে ফুট দুয়েক উচ্চতায় একটা সরু জলের নল। সেখান থেকেই ঠান্ডা জল ফোঁটা ফোঁটা করে এসে পড়ছে কপালের উপর। ঘরটাকে ঘর না বলে গুদাম বললেই বোধহয় যথার্থ হয়। ভ্যাপসা একটা কটু গন্ধ ঘরময়, প্রায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ইন্দ্র বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে রইল স্থির। এভাবে কপালের ওপর টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে, ব্যাপারটা বেশ বিরক্তিকর। ইন্দ্র মাথা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হল। আরও কিছুক্ষণ কাটল, এইবারে বিরক্তি সীমা অতিক্রম করছে। ইন্দ্র নিজের সর্বশক্তি একত্রিত করে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করার চেষ্টা করল, বৃথা চেষ্টা। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল এই যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি থেকে মুক্তির। আস্তে আস্তে কয়েক মুহূর্ত থেকে কয়েক মিনিট হয়ে ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। উন্মাদের মতো অস্থির লাগছে নিজের মনের ভিতরটা। নিজেকে এত অসহায় বোধহয় আগে কখনও লাগেনি। পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে সে। অদ্ভুত সে অনুভূতি। না কোনও অত্যাচার, না কোনও যন্ত্রণা। অথচ একঘেয়ে নিরন্তর কপালে এই ফোঁটা ফোঁটা জলের আঘাত ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। চিৎকার করে সাহায্য চায় ইন্দ্র। কিন্তু তার নিজের গলা অনুরণিত হয়ে তার কাছেই ফিরে আসে। হা ঈশ্বর! এ কেমন অমানবিক অত্যাচার!

হঠাৎ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে আলোর রেখা ফুটে ওঠে। সেই আলোর রেখা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। যেন গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের পেন্ডুলামের মতো দুলছে ডাইনে-বাঁয়ে। ধীরে ধীরে সেই আলো কাছে এসে স্থির হয়। ইন্দ্র যতটুকু সম্ভব মাথা তুলে দেখতে চেষ্টা করে। একজন পুরুষ। উচ্চতা মাঝারি, দোহারা গড়ন। পরনে লম্বা হাঁটু পর্যন্ত কালো জ্যাকেট, চাপদাড়ি। হাতে ঝুলন্ত একটা গ্যাসলাইট। আলোটা পাশে নামিয়ে রেখে সে ইন্দ্রর মাথার কাছে এসে চাপা অথচ বিনীত স্বরে প্রায় ফিশফিশিয়ে বলে, “আমি এখন আপনার বাঁধন খুলতে যাচ্ছি। আর এই যে ইনজেকশনটা আপনাকে দিতে বাধ্য হচ্ছি, এটা খুব মাইল্ড ডোজের স্কোপলামাইন নামক একটা কম্পাউন্ড। এটা আপনার রক্তে প্রবেশ করলে আপনি ধীরে ধীরে সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন, ফলত আপনার কল্পনাশক্তি হ্রাস পাবে। মানুষের কল্পনাশক্তি হল তার সব থেকে বড় রক্ষাকবচ। কারণ কল্পনাশক্তি না থাকলে আমরা মিথ্যে বলতে অপারগ। উনিশশো বাইশ সালে আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে স্কোপলামাইনকে টুথ সিরাম হিসাবে ব্যবহারের জন্য গবেষণা শুরু হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই গবেষণা বাতিল করে এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এটার মাত্রাতিরিক্ত সাইড এফেক্ট থাকার কারণে। যেমন ধরুন, গা গোলানো, বমি, মাথা যন্ত্ৰণা, হ্যালুসিনেশন। অবশ্য দেশ-বিদেশের অনেক ইনটেলিজেন্স এজেন্সি এখনও এটাকে টুথ সিরাম হিসেবে ব্যবহার করে। যা-ই হোক, চিন্তা নেই। আপনি জেগেই থাকবেন। শুধু নিজেকে সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হতে পারে। আশা করি, আপনি কিছু মনে করবেন না।” ইন্দ্র নিরুত্তর থাকে। সে বুঝে গিয়েছে এখানে তার সম্মতি গুরুত্বহীন। লোকটা ইনজেকশন দিয়ে পাশে রাখা একটা টুল টেনে নিয়ে বসে। আস্তে আস্তে ইন্দ্রর চোখের পাতা আবার ভারী হয়ে আসতে থাকে, হাত-পায়ের আঙুলগুলো যেন অবশ হয়ে আসছে। সে টের পায়, তার হাত-পায়ের বাঁধন খোলা হচ্ছে। ইন্দ্র প্রতিরোধের চেষ্টা করে না, জানে করে লাভও নেই। ঘরে ততক্ষণে আরও দু-জন প্রবেশ করেছে। একটা স্ট্রেচার দু-দিকে ধরে নিয়ে আসছে তারা। পরনে কালো রেনকোটের মতো পোশাক, মুখ-ঢাকা মুখোশে। ইন্দ্রকে ধরাধরি করে তারা শুইয়ে দেয় স্ট্রেচারে। তারপর নিয়ে চলে কোনও অজানা গন্তব্যে।

এর পরের অনেকটা সময় ঘষা কাচের মতো ঝাপসা টুকরো টুকরো মুহূর্তের কোলাজ। মনে আছে, একজন তাকে অনেক প্রশ্ন করছে। তার ছোটবেলা, জেলে থাকার সময়ের কথা, কী যেন একটা অপারেশনের কথা… ইন্দ্রর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ঘুমে ঢুলে পড়ছে দু-চোখ। কেউ তার গালে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে তাকে জাগিয়ে রাখছে। ঘরে ঠিক ক-জন আছে, ইন্দ্র বুঝতে পারে না। মনে হয় একজন, পরমুহূর্তেই মনে হয় দু-জন, আবার হঠাৎ মনে হয় তাদের পিছনে অনেকগুলো ঝাপসা ছায়ামূর্তি। ইন্দ্ৰ কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। উন্মাদের মতো হেসে ওঠে সে। লোকটা কাঁধে হাত রেখে তাকে স্তিমিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ইন্দ্র নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। সে হাসতে হাসতেই চিৎকার করে কেঁদে ফেলে। চেপে-রাখা সমস্ত যন্ত্রণা যেন বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো আছড়ে পড়ে। টেবিলের কোণ শক্ত করে খামচে ধরে হাসি এবং কান্না মিশ্রিত এক অদ্ভুত অমানুষিক চিৎকার করতে থাকে। তারপর মনে হয়, আস্তে আস্তে যেন তলিয়ে যাচ্ছে কোনও এক অতল গহ্বরে। হাতের বাহুতে একটা চিনচিনে ব্যথা। যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে একঘেয়ে মৃদু যান্ত্রিক আওয়াজ। তারপর হঠাৎই, এক লহমায় সবকিছু অন্ধকার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *