ডাকনাম ভুলে গেছি – ৯

নয়

যেহেতু টাকার ওপর আমার তেমন নির্ভরতা নেই, তাই সভ্য সমাজের সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন হয়ে গেল। যেটুকু সংযোগ আছে, তা কেবল ভয় আর কৌতূহলের জোরে টিকে আছে। মানুষের আড়ালে থেকে আমার মধ্যে একধরনের বন্যতা জন্ম নিয়েছে। আমার পরিধেয়র পরিমাণ দিন দিন কমতে লাগল। এক খণ্ড কাপড় কোনোমতে কোমরে জড়িয়ে রাখি, কোনো-কোনোদিন তাও থাকে না। মানুষের নগ্নতা কেবল মানুষের চোখেই অশ্লীল। আমার চারপাশে ঘিরে থাকা বৃক্ষ এবং পশুদের আমার নগ্নতায় কোনো বিকার নেই। তারা খাবার খুঁজতে, বাতাসে ডাল দোলাতে, আর ফুল ফোটাতেই ব্যস্ত। নিজেদের কাজকর্ম বাদ দিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে আমাকে লজ্জা দেওয়ার অবসর কারো নেই। সূর্যের আলোতে মাঝে মাঝে নিজের শরীরটাকে আমি মেলে ধরি, নিজেকে দেখি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, দেখার মতো দ্বিতীয় মানুষ যেহেতু নেই। আমার শরীর-ভরতি সাবালকত্বের চিহ্ন, পশম আর পেশিতে আমি পুরুষ হয়ে উঠেছি। প্রথমে নিজেকেই লজ্জা পেতাম, ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা আমার কাছে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, এখন আমার কাছে নিজের কোনো অঙ্গই আর গোপন নয়।

যে রাতে চাঁদ ওঠে, সেই রাতে ঘরে বসে জ্যোৎস্নার অপচয় করতে পারি না আমি। জঙ্গলের সাথে নিজেকে মিশিয়ে ছিন্নভিন্ন চাঁদের আলো গায়ে মাখি। অমাবস্যা রাতকেও অবহেলা করি না, ছাদে শুয়ে তারা দেখি। রাত আলোর অভাব ছাড়া আর কোনো রহস্য নিয়ে আমার সামনে আসেনি। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কোনোদিন সেই মেয়েটাকে দেখতে পাইনি। যারা তাকে ভয় পায়, তার সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে না, সে শুধু তাদেরকেই দেখা দেয়। কৃপণের মতো বাতি জ্বালাই আমি। দিনের শেষ আলোটা একেবারে বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত হারিকেনে আগুন দেই না। জ্যোৎস্নারাতে চাঁদের ওপর নির্ভর করে কাজ চালিয়ে নিই। এখানে রাত অল্পতেই গাঢ় হয়ে যায়, ঝিঁঝিপোকা আর প্যাঁচার ডাক সন্ধ্যাটাকে অকালেই পাকিয়ে রাত করে ফেলে। ইঁচড়েপাকা রাতে হারিকেনের আলোতে খেয়ে বইয়ের পাতা উল্টাই আমি। হারিকেনটা যখন ইংরেজি বইয়ের ওপর ঝুঁকে থাকা ক্লান্ত বালকের মতো ঝিমাতে থাকে তখন আমি তার কান মুচড়ে আবার জাগিয়ে তুলি। শুয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে একসময় আমার হাত নড়বড়ে হয়ে যায়, অক্ষর ঝাপসা হয়ে নাচানাচি শুরু করে। হারিকেনটাও তার বরাদ্দ সবটুকু তেল পুড়িয়ে আর জেগে থাকতে পারে না। বইটাকে বালিশের পাশে শুইয়ে দিয়ে আমি তখন হারিকেনটার মতো ঘুমিয়ে পড়ি।

মাসে একবার আমাকে বাজারে যেতে হয় চাল, তেল, সলতে কেনার জন্য। বাবার ড্রয়ারে এখনো কিছু টাকা অবশিষ্ট আছে, তবে আগামী বর্ষা পর্যন্ত টাকাগুলো বেঁচে থাকবে না বোধহয়। বর্ষায় খাবার জোটানো খুব মুশকিল হয়ে যায়, ফসল খুব একটা পাওয়া যায় না, টাকা থাকলে সে-সময় টিকে থাকা সহজ। বাজারে যাওয়ার দিন আমি সভ্যজগতের উপযোগী পোশাক পরি, কেঁচি দিয়ে চুল-দাড়ি ছাঁটি। এই কঠিন দিনটার মুখোমুখি হওয়ার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে সাহস দেই। জামাকাপড়ে বন্যতা আর মুখোশে ভয়-উৎকণ্ঠা ঢেকে আমি বাজারে ঢুকি। আমার রাজ্যে আমি নগ্ন থাকি, কোনো লজ্জা নেই, সংকোচ নেই, গোপনীয়তা নেই; কিন্তু এই বাজারে কাপড়চোপড়ে ঢাকা আমার পুরো শরীরটাই যেন গোপনাঙ্গ। সাধারণত হাটের দিন ছাড়া বাজারে যাই না আমি, ব্যস্ত মানুষের স্রোতে নিজেকে ঢেলে দেই, তারপর ভিড়ের মধ্যে ডুবসাঁতার দিয়ে চলাফেরা করি।

বাজারে নতুন কয়েকটা চায়ের দোকান গজিয়েছে। হাটের দিন ছাড়া এইসব দোকান অলস-অকর্মা লোকদের দখলে থাকে, তারা এখানে বসে রাজনীতি, অর্থনীতি, পৌরনীতি নিয়ে অভিনব সব আলোচনা করে, রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা কে কী পরিমাণ অযোগ্য তা এখানে তৎক্ষণাৎ নির্ধারিত হয়ে যায়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, উরু চুলকিয়ে তারা রাজনীতি-চলচ্চিত্রের নেতা-অভিনেতাদের গোপন সংবাদ ফাঁস করে দেয়। স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্টও তাদের সরস গল্প থেকে রেহাই পায় না। জাতীয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্র হননের পর তারা স্থানীয় গল্পে রসের ধারা যোগায়। কার মেয়ে কোন লম্পটের সাথে ‘লাইন’ করে, কার ছেলে নেশা করে গোল্লায় গেছে, কার ভিটা কার কাছে বাঁধা, কে কী গোপন ব্যবসা করে অকস্মাৎ ‘লাল’ হয়ে গেছে, এগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ চলে সারাদিন। এই চায়ের দোকানে এক কাপ চায়ের সাথে দুনিয়ার যত সংবাদ পাওয়া যায়, পত্রিকাওয়ালারা সারা মাস চেষ্টা করেও এত খবর সরবরাহ করতে পারে না।

হাটের দিন এইসব তত্ত্ববিশারদগণ কিছুটা বিপদে পড়ে যায়, চায়ের দোকানেও থাকে অপরিসীম ব্যস্ততা। এক কাপ চা নিয়ে শান্তিতে ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা সভা বসানোর উপায় নেই। পাজি দোকানদার ভীষণ তাড়া দেয়, যেন অন্যদিন তারা তার নির্জীব দোকানটাতে নিজেদের বক্তৃতাগুণে জনসামগম ঘটায় না। অন্যদিন ব্যস্ত থাকলেও, হাটের দিনে তাদের প্রচণ্ড অবসর। তাদের সন্ধানী চোখ একজন শ্রোতা খুঁজে বেড়ায়, চায়ের তৃষ্ণা যেমন তেমন, দুটো কথা বলে মূর্খদের আলোকিত করতে না পারলে তাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তেমনি বাক্যবাগীশ একজনের কৌতূহলি চোখে ধরা পড়ে গেলাম আমি।

“ভাতিজা, হুনো।”

চোখের কোণে দেখতে পেলাম লোকটা আমাকেই ডাকছে। এই বিড়ম্বনা এড়ানোর জন্য অন্যদিকে কিছু একটা অতি মনোযোগ দিয়ে দেখছি এমন ভান করে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু এমন লোভনীয় শিকার সহজে হাতছাড়া করার লোক সে না। প্রায় দৌড়ে এসে ছোঁ মেরে আমার হাত ধরে একপাশে টেনে নিলো। লোকটার মুখে কাঁচাপাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গায়ে তার বয়সের সাথে বেমানান একটা রঙিন শার্ট, শার্টের ওপরের অর্ধেক বোতাম খোলা। সুযোগ পেয়ে তার বুকের তিন-চারটা পাকা পশম খোলা বাতাসে আরাম করে শ্বাস নিচ্ছে। তার পরনের লুঙ্গিটাও খুব বিপজ্জনকভাবে আলগা হয়ে আছে। সে হয়তো পুরো শরীরকেই শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিতে চায়। তার ঠোঁটে আর দাঁতে অসংখ্য বিড়ির কলঙ্ক লেগে আছে। আঙুলের ফাঁকে তখনো অর্ধেকটা বিড়ি জ্বলছে। শিকার হাতে রেখে নিশ্চিন্ত অবহেলায় বিড়িতে একটা টান দিলো লোকটা, তারপর বলল, “দৌড়াইয়া কই যাও?”

আমি যে শুধু লোকটাকে দেখছি তা না, লোকটার চোখে আমি নিজেকেও দেখছি, তাই আরো সংকুচিত হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও গলায় স্বর ফোটাতে পারলাম না। লোকটা যে আমাকে প্রশ্ন করেনি, বিদ্রুপ করেছে তা বুঝতে পারিনি। আমাকে নিষ্কৃতি দিয়ে সে নিজেই বলতে থাকল, “আমি তোমার রহমত কাকা, চিনসো আমারে? চিনবা কেমনে, তোমগো লগে তো আলাপ-সালাপ করার উপায় নেই, দেখাসাক্ষাৎ নাই। তোমার বাপের লগে কতা হইছিল একবার। আজব কিসিমের মানুষ তোমার বাপে, শহরে থাইক্যা মানুষ ক্যামনে এমন বোকাসোকা হয় কে জানে! কার বুদ্ধিতে এই গেরামে ভূতের লগে থাকতে আইছিল, মাঝখান দিয়া তোমার মা-ডা মরল। হেদিনও রাস্তায় আকবর পাগলারে দেইখা তোমার বাপের কতা মনে হইছে, তারে দেখি না অনেক দিন, শইল-শাইন্ডো ভালা আছেনি তার?”

ঘাড় কাত করে এক ইশারায় স্বাস্থ্যের সমস্ত খোঁজ দিলাম, অর্থাৎ সুস্থ আছে। বাবার অন্তর্ধানের খবর চেপে গেলাম। রহমত কাকার মুখে হতাশার ছায়া পড়ল, সে নিশ্চয়ই অল্প-বিস্তর দুঃসংবাদ প্রত্যাশা করেছিল। আমার শরীরেও অসুস্থতার কোনো চিহ্ন না পেয়ে তার হতাশা আরো বাড়ল। কারো সবকিছু ঠিকঠাক চলছে জানলে এই প্রকৃতির মানুষ খুব একটা আরাম পায় না। রহমত কাকা তার বুকের তিনটা পশম চুলকে সেগুলোকে বিপর্যন্ত করতে করতে বলল, “তোমাগো লাইগা পরানডা পুড়ে আমার, দুইডা ব্যাডা মানুষ, রান্দন-বাড়নের কোনো লোক নাই। মহিলা মানুষ ছাড়া ক্যামনে যে আছো, হেই চিন্তাডাই করি। তোমার বাপের বয়সও তো বেশি না, আমগো সমানই তো হইবো। এই বয়সে বউ না থাকনের জ্বালা তোমারে আর কী কমু। তুমি ভাতিজা মানুষ, কইতে শরম লাগে, তাও কই। তোমার বড় কাকি মাশাল্লাহ অহনো মরে নাই, কিন্তু অসুখ-বিসুখ লাইগা রইছে সারাবছর। কবিরাজে কয় জিনে নজর দিছে, মাইনষে কয় বউডারে দিয়া আমি বেশি কাম করাই। তা মাইয়ামানুষ ইটু কাম তো করনই লাগব। কাম আর কী, ধান হিজায়, ঘর লেপে, রান্দা-বাড়ি করে, গ্যাদা-ছুইটকা সামলায়। তা পোলাপান আর কয়ডা, চাইরটা মাইয়া আর তিনডা পোলা। রাইতে বাইত যাইতে আমার একটু লেইট হইয়া যায়, মনে করো তাশ লইয়া বইলে সময়ের ঠিক-ঠিকানা থাহে না। ঘরে ঢুইকা দেহি বউ বেহুঁশের মতো ঘুমায়, বাঁশ দিয়া পিডাইয়াও জাগান যায় না। আমি কি বইয়া থাকুম? তোমার ছোডো কাকিরে আনলাম বিয়া কইরা। ব্যাডা মাইনষের লাগে, বুজলা না? জীবনে সুখ-শান্তির দরকার আছে, কী কও?”

আমি নিরুত্তর রইলাম, প্রশ্নকর্তার উত্তরের প্রয়োজনও নেই। সে আবার বলতে শুরু করল, “তোমার বাপের বয়স আছে অহনো, আর ব্যাডা মাইনষের বয়সের কী! আমগো সুলেমান কাকা, আমার আব্বার বিয়া খাইছে, হেইলোক হেদিন চৌদ্দ বছরের এক মাইয়া বিয়া কইরা লইয়া আইয়া পড়ছে। তোমার বাপরে তো দেহি না, বাজারে আইয়ে না, দেখাসাক্ষাৎ হইলে তো ধরো একটু বুদ্ধি-পরামর্শ দিতে পারতাম।”

বুদ্ধিদাতার সামনে আমি চুপচাপ আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার নীরবতাকে সে সমীহই ভাবল বোধহয়। আমাকেও দুই-একটা পরামর্শ না দিয়ে ছাড়ল না। বলল, “তুমি জুয়ান পোলা, তোমগো বয়সে কত কিছু করছি, কী কমু অহন! তুমি তো দেহি ম্যান্দা মাইরা পইড়া থাহো। ইটু ঘুরবা ফিরবা, বন্ধুবান্ধব করবা। মজমাস্তি করার এইডাই তো বয়স। তোমার বাপের নাইলে বুঝলাম মাথাত ইটু ডিস্টাব আছে, তোমার তো সমস্যা নাই, তুমি পইড়া রইছো কীয়ের লাইগা? এই বাইত থাইক্যা নিজের জীবনডারে নষ্ট কইরো না। এই বয়সের পোলাপান কত কিছু কইরা ফালায়, আমরা তো তোমার বয়সে-“

অন্যপাশ থেকে কে যেন ডাক দেওয়ায় রহমত কাকার বাক্যস্রোতে বাঁধ পড়ল। ঐপাশে মুখরোচক আরো আলোচনার সম্ভাবনা থাকায় আমি রেহাই পেলাম।

বাজারের নিস্তরঙ্গ গুঞ্জন থেকে মাঝে মাঝে লাফিয়ে ওঠে একটা-দুইটা গালি। একজন আরেকজনকে কীভাবে এত অবলীলায় এমন বিশ্রী কটু কথা বলতে পারে! দোকানি, ক্রেতা সবাই এখানে জিততে চায়, লাভের ভাগে কম পড়লে গালি দিয়ে হিসাব মিলায়। গালাগালিতে না পোষালে হাতাহাতিতে সমাধান হয়। প্রতি হাটেই দেখি কেউ কারো শার্টের কলার চেপে ধরেছে, গলার গামছা ধরে টানছে, আঙুল উঁচিয়ে চোখ পাকিয়ে একজন আরেকজনকে শাসাচ্ছে, দুই টাকার মাছের জন্য খুনের হুমকি পর্যন্ত দিয়ে রাখছে। যাদের গায়ে জোর নেই, তাদের আছে অভিশাপ, তারা যমদূতকে আহ্বান জানায়, তাদের হয়ে প্রতিশোধটা নিয়ে যাক।

বাজারের মাঝখানে কী যেন গোলমাল লেগেছে, খুব হইচই হচ্ছে। সব মানুষ উত্তেজক কিছুর আভাস পেয়ে সেদিকেই ছুটল, এইসব সভ্য মানুষদের নির্বিঘ্নে সভ্যতাচর্চা করতে দিয়ে আমি গেলাম মহিমগঞ্জে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত পোস্ট-অফিসের দিকে। জমিদারবাড়ির দোরগোড়ায় ডাকপিয়নের পদধূলি পড়বে সে আশা আমি করি না। তাই নিজেই এসে খোঁজ নিয়ে যাই, মনে ক্ষীণ আশা, জিজ্ঞাসা করলেই হয়তো পিয়ন হেসে তার ঝুলি থেকে একটা হলুদ খাম বের করে দিবে। কিন্তু এই অলৌকিক ঘটনাটা কখনোই ঘটে না, তবুও মাসে একবার পোস্ট-অফিসে যাওয়া আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। খামের ভেতর কথা পাঠানোর এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুব রোমাঞ্চকর লাগে। পোস্ট-অফিসে গিয়ে আমি কিছু বৃদ্ধমানুষকে দেখি, হাতে খোলা চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পড়তে তারা জানে না, কিন্তু চিঠিতে হাত বুলিয়ে চোখ তাদের ছলছল করে ওঠে। পড়ালেখা জানা মানুষদের কাছে গিয়ে ইতস্তত অনুরোধ জানায়, চিঠিটা পড়ে দেওয়ার জন্য। কিংবা কাগজ-কলম নিয়ে ঘোরে, একটা চিঠি যদি কেউ লিখে দেয়। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাদের দেখি, মাঝে মাঝে অপ্রয়োজনেই তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাই, কোনো একটা চিঠি পড়ার জন্য আমি পিপাসার্ত হয়ে ঘুরি। তাদের হাতে জলের ভাণ্ড, কিন্তু তৃষ্ণার্ত আমাকে কেউ এক ফোঁটা সাধে না। স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে কারো কাছে কিছু চাইতে পারি না, এমনকি উপকার করার মহত্ত্বটুকু পর্যন্ত দেখাতে পারি না। আমাকে দেখেই ডাকপিয়নের ব্যস্তভাব বেড়ে গেল, কোথায় যেন চলে যেতে যেতে বলল, “হাসান শেখ, আপনার নামে কোনো চিঠি আসে নাই।”

প্রতিবার যখন ডাকপিয়ন আমাকে এই দুঃসংবাদটা দেয়, তখন আমি অপরাধবোধে ভুগি। আমার কারণে একটা লোককে কষ্ট করে অপ্রাপ্তির খবর দিতে হয়। মাথা নুয়ে নীরবে উচ্চারণ করি, ‘স্যরি।’ প্রতিবার আমার একখণ্ড ইংরেজি দুঃখ আমার ঠোঁট থেকে শ্রোতার কানে পৌঁছানোর আগেই বাতাসে মিলিয়ে যায়।

কিন্তু এইবার ব্যতিক্রম হলো, আমার এত দুর্বল শব্দটার কীভাবে যেন একটা শ্রোতা জুটে গেল। আমি যখন পোস্ট-অফিসের সীমানা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলাম, তখন পেছন থেকে কেউ একজন আমার নাম ধরে ডাকল। “হাসান ভাই, একটু দাঁড়ান।”

পেছন ফিরে দেখলাম একটা সাদা উজ্জ্বল আলখাল্লা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। জামার দ্যুতি এতই বেশি যে কালো দাড়িতে ঢাকা লোকটার চেহারা নিষ্প্রভ হয়ে আছে। মাথায় তার টুপি নেই, তাই অন্যান্য ‘হুজুর’দের তুলনায় তাকে একটু ভিন্ন দেখাচ্ছে। মনে মনে আঁতকে উঠলাম, আবার কিছু পরামর্শ, উপদেশ হজম করতে হবে নাকি? বাজারে একজন নরকের দরজা দেখিয়ে দিলো, আরেকজন হয়তো স্বর্গের দরজার দিকে টেনে নিতে আসছে।

লোকটা কাছে আসতেই দেখলাম জোব্বার চেয়েও বেশি দ্যুতিসম্পন্ন একটা হাসি তার ঠোঁটে লেগে আছে। লম্বা-গম্ভীর দাড়ি ভেদ করে একজন উচ্ছ্বল যুবককে দেখতে পেলাম। কাছে এসে শান্তভাবে বলল, “ভয় পাইবেন না, ভাই, আপনাকে নসিহত করার জন্য ডাকি নাই। আমি সর্দারপাড়া জামে মসজিদের নতুন ইমাম। বেশিদিন হয় নাই এইদিকে আসছি। আমার নাম ইখলাক হোসেন, লোকজন অবশ্য ‘নতুন হুজুর’ ডাকে। আপনাকে আগেও হাটে দেখছিলাম কয়েকবার, মাথা নিচু কইরা হাঁটেন, কোনোদিকে তাকান না, কারো সাথে কথা বলেন না। আমার খুব শখ হইছিল আপনার সাথে দুইটা কথা বলি। কিন্তু যে মানুষ মানুষের চোখ দেখলে নিজের চোখ লুকায়, তার সাথে আলাপ কইরা তাকে বিব্রত করতে চাই নাই। কিন্তু আজকে ডাকপিয়ন যখন বলল আপনার চিঠি নাই তখন আপনি খুব আস্তে বললেন ‘স্যরি’, আমি আর নিজের আগ্রহরে চাপা দিতে পারলাম না। এমন মানুষও হয়! আমি তো চিঠি না পাইলে হতাশ হই, পিয়নকে আবার খুঁইজা দেখতে বলি। কাউরে কোনোদিন দেখলাম না, চিঠি না পাইয়া ‘স্যরি’ বলতেছে।”

এইসব মুহূর্তে কথাবার্তা আগানোর জন্য নিশ্চয়ই কিছু বলতে হয়, কিন্তু আলাপ করার ব্যবহারিক বিদ্যা আমার অর্জন করা হয়নি। ইখলাক হোসেন খুবই সদালাপী মানুষ, আমার অভাব সে তার অতিরিক্ত বাকপ্রতিভা দিয়ে পুষিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ থেমে আবার বলা শুরু করল, “আপনি মনে হয় মনে মনে আমাকে গালি দিতাছেন, আপনাকে জ্বালাইতেছি। আরেকটু জ্বালাবো, চলেন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে যাই।”

একসাথে হাঁটতে গিয়ে বারবার তাল কেটে যাচ্ছিল, আমি যে ছন্দে হাঁটি সে ছন্দে শুধুই হাঁটা যায়, আলাপ করা যায় না। ইখলাক হোসেন বারবার পিছিয়ে পড়ছিল। সে বলল, “ভাই, পরে আরেকদিন দৌড়াবো আপনার সাথে, আজকে চলেন একটু হাঁটি।”

আমার চঞ্চল, বিব্রত পা কিছুটা স্লথ হলো। তার সরল রসিকতা আমাদের মধ্যে যে উঁচু বাঁধ ছিল তার অনেকটা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। পরিচিত আবহের বাইরে অপরিচিত একজনের সামনে আমার ঠোঁটে খুব দুর্লভ একটা হাসি ফুটে উঠল। আমার হাসি দেখে ইখলাক হোসেন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “অবাক কাণ্ড, আপনি হাঁটতেও পারেন, হাসতেও পারেন। আমি তো ভাবতাম ঐসব শুধু আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরাই পারে।”

আমি যে কথাও বলতে পারি তা দেখিয়ে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার বাড়ি কোথায়?”

মনে হলো আমার ভেতর থেকে অন্য কেউ কথা বলছে, নিজের কথা শুনে নিজেই চমকে উঠলাম। ইখলাক হোসেন তার বিস্মিত দৃষ্টিটা সহজেই লুকিয়ে ফেলল। তারপর খুব সহজ ভঙ্গিতে বলল, “বাড়ি অনেক দূরে, টাঙ্গাইল জেলায়। বিয়া করছি ছয় মাসও হয় নাই। আপনার ভাবি কাইন্দা কাইন্দা চিঠি লেখে, কালি লেপ্টাইয়া যায়, অক্ষর মুইছা যায়, তবুও সব বুঝতে পারি। তার একটাই কথা, প্রতিমাসে একবার যাইতে হবে আর প্রতিদিন একটা কইরা চিঠি দিতে হবে। এইখানে আসছি তিন মাস হইছে, এখনো ছুটি পাই নাই। কিন্তু চিঠি প্রতিদিন পাঠাই।”

একটা প্রশ্নে যুবকের মনের দরজা এমন ঝট করে খুলে যাবে বুঝতে পারিনি। সে হয়তো তার এইসব বেদনার কথা বলার জন্য একজন সংবেদনশীল মানুষ খুঁজছে, কারো সাথে মন খুলে হয়তো কথা বলতে পারেনি এতদিন। এখানে কেউ নিজের মনের নরম অংশ দেখালে তাকে নিষ্ঠুর, অশ্লীল উপহাসে পিষে ফেলে মানুষ।

আমাকে এই কয়টা কথা বলতে পেরে ইখলাক হোসেনের ভার যেন অনেকটাই কমে গেল। তার হাতের প্যাকেটটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী আছে ওতে?”

জানালো বই আছে কয়েকটা, ঢাকায় চিঠি পাঠিয়ে বই আনিয়েছে। বইয়ের কথা শুনে আমার নিস্পৃহ মনেও কৌতূহল জেগে উঠল, ধারণা করলাম—ধর্মীয় কোনো বই হবে হয়তো। শুধু ধারণা দিয়ে আমার মনকে সান্ত্বনা দিতে পারলাম না, জিজ্ঞাসা করলাম, “কী বই?”

ইখলাক হোসেন প্যাকেট খুলে দেখালো, ভেষজবিদ্যা নিয়ে দুইটা বই, অন্যটা সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা। বইগুলো দেখে ভীষণ অবাক হলাম। আমার বিস্ময় ইখলাক হোসেনের নজর এড়ালো না। কৈফিয়তের ভঙ্গিতে বলল, “গল্পের বই পড়তে ভালো লাগে, ছোটবেলার অভ্যাস। মাদ্রাসায় লুকাইয়া লুকাইয়া কত গল্প-উপন্যাস পড়ছি! ওস্তাদের বেতও আমার এই অভ্যাস ছাড়াইতে পারে নাই। আর এইখানে আসার পর দেখি মানুষ খালি অসুখ-বিসুখে পড়ে। থাকে নোংরা, খায় পচা, বিশ্বাস করে কুসংস্কার। আগের হুজুর নাকি পানি পড়া দিত, তাবিজ বেচত। আমার কাছেও চায় এইসব। ফুঁ দিয়া কি আর কাজ হয়! ভাবলাম একটু আয়ুর্বেদ নিয়া পড়ি, মানুষজন তো কষ্ট পাইয়া আসে আমার কাছে, ফুঁ না দিয়া যদি গাছগাছালি দিয়া কোনো ওষুধ দিতে পারি, কিছুটা হইলেও তাদের উপকার হইব।”

ইখলাক হোসেনের সাথে আমার আর কোনো বিভেদের প্রাচীর রইল না। তাকে বলতে ইচ্ছা হলো, ‘ইখলাক ভাই, আপনি ভালো মানুষ। আপনাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আমার কাছে বই আর গাছপালা ছাড়া কিছুই নেই, আপনাকে সব দিলাম আমি।’ কিন্তু নিজের অন্তর্মুখী প্রকৃতির কারণে আবেগ আমি প্রকাশ করতে পারি না, কথাগুলো তাকে বলা হলো না।

ঠিক তখন পেছন থেকে একটা ভাঙা গলা শোনা গেল। “অ হুজুর।”

বৃদ্ধ একটা লোক তার রংজ্বলা কুর্তা আর রোদে পোড়া মুখ নিয়ে হাজির হলো। লোকটার জামার বুকপকেট থেকে একটা হলুদ খাম উঁকি দিয়ে আছে। বৃদ্ধ লোকটা আমার দিকে একটা নীরস দৃষ্টি দিয়ে ইখলাক হোসেনের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “একটা চিঠি আইছে, একটু পইড়া জবাব লিখ্যা দিতে হইব।”

ইখলাক হোসেনের মুখটা ঝলমল করে উঠল, কারো কিছু একটা উপকার করতে পারবে, তাই তাকে বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছে। কাগজ-কলম চাইলে বৃদ্ধ লোকটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকল, ফাঁক করা ঠোঁটে একধরনের অসহায়ত্ব ফুটে উঠল। চিঠির জবাব লিখতে যে কাগজ-কলম প্রয়োজন হবে, এতদূর পর্যন্ত সে ভাবেনি।

ইখলাক হোসেন বলল, “কোনো সমস্যা নাই, আমার সাথে চলেন আপনি।”

আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পোড়ামুখ বৃদ্ধকে নিয়ে ইখলাক হোসেন মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সাদা ধবধবে আলখাল্লা দুলে উঠল সবুজ মাঠের মধ্যে, বড় কাশগাছের আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল তারা। দৃশ্যপট থেকে তারা হারিয়ে যেতেই কেন যেন মনটা আমার বিষণ্ণ হয়ে গেল। বৃদ্ধের চিঠিতে কী লেখা আছে, খুব জানতে ইচ্ছা হলো আমার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *