তেইশ
একটা নগ্ন মানুষের চারপাশে সবাই নির্বিকার। রিকশার পেছনে রিকশার ধাক্কা, গাড়ির হর্ন, ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি, ফেরিওয়ালাদের হাঁক, ভিক্ষুকের বিরক্তিকর হাত, প্রেমিকের হাতে লেপ্টে থাকা প্রেমিকার হেঁটে যাওয়া, কোনোকিছুই থেমে নেই। কিন্তু আমার পুরো পৃথিবী যেন সেই মুহূর্তে থমকে গেল। যখন ইখলাক হোসেনের কাছে গেলাম, তখন জানি না কত জোড়া চোখ আমাকে দেখছিল, কোনো দৃষ্টির পরোয়া করিনি সেদিন।
ইখলাক আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকালো, তার দৃষ্টিতে কোনো আলো নেই। তার চোখ দুটো যেন মরে গেছে। “আমাকে চিনতে পারছেন, ইখলাক ভাই?”
ইখলাক তার মৃত চোখ দুটো আমার ওপর ফেলে রাখল, এত ঠান্ডা দৃষ্টি, মনে হচ্ছিল ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি। তার বুক ঢেকে আছে দাড়িতে, চামড়ায় ধুলোর আঠালো স্তর। তার হাত ধরে বললাম, “আমার সাথে চলেন।”
সে কোনো প্রতিরোধ করেনি, বাধ্যশিশুর মতো পুরো রাস্তা আমার হাত ধরে হেঁটেছে। পকেটের খুচরা টাকায় রিকশায় চড়া যেত, কিন্তু একজন নগ্ন মানুষকে কেউই রিকশায় ওঠাতে চায়নি। মোতালেব কাকা মসজিদে যাওয়ার জন্য যখন দরজায় তালা লাগাচ্ছিল, ইখলাক হোসেনকে নিয়ে ঢুকলাম তখন।
ইখলাক হোসেনকে দেখেই মোতালেব কাকার চোখগুলো লেন্সের আড়ালে আরো বড় হয়ে গেল। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…” আঁতকে উঠলেন তিনি। “এ কে? কারে ধইরা আনছো?” আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন মোতালেব কাকা।
“ইনি মাওলানা ইখলাক হোসেন, আমাদের গ্রামের মসজিদের ইমাম,” বললাম আমি।
“নাউজুবিল্লা… কী কও! অর এই অবস্থা ক্যান?”
“জানি না, জিজ্ঞেস করিনি। করলেও হয়তো বলতে পারবে না।”
ভেবেছিলাম মোতালেব কাকা আমার পকেটের চাবিটা চেয়ে নিবেন, কিছু সুপরামর্শ দিয়ে এক্ষুনি বিদায় দিবেন আমাকে। তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে আর কিছুক্ষণ ইখলাক হোসেনের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইলেন।
“মাওলানারে ভিত্রে নিয়া আহো, মাওলানা মানুষ, এম্নে ল্যাংটা হইয়া রাস্তায় ঘুরা ঠিক না,” ব্যস্ত হয়ে বললেন মোতালেব কাকা। তারপর ঘুরে কাঁপা কাঁপা হাতে দরজার তালা খুলতে লাগলেন।
সাবান, পানিতে ইখলাক হোসেনের চামড়ার রং কিছুটা ফিরে এলো, কিন্তু তার চোখে এখনো কোনো আলো জ্বলেনি। মোতালেব কাকার পাঞ্জাবি আর লুঙ্গিতে তাকে সভ্য দেখাচ্ছে এখন। আমাদের দুইজনের খাবার তিন ভাগ হলো আজ। ইখলাক ভালো মানুষের মতো মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেলো, যখন সে খাচ্ছিল তখন মোতালেব কাকা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কাউকে আদর করে অনেক দিন খাওয়াতে পারেননি তিনি। ইখলাক আরাম করে খাচ্ছে দেখে মোতালেব কাকার মুখ তৃপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে গেল। তার গলায় সমবেদনা ঝরে পড়ছে, “আহা রে! মাওলানা মানুষ, কী হাল হইছে!”
রাতে আমার ঘরে শুইয়ে দিলাম ইখলাক হোসেনকে। ঘরের বাতি বন্ধ, ইখলাক হোসেনের প্রান্তে কবরের নিস্তব্ধতা, সে ঘুমিয়ে পড়েছে কি-না বুঝতে পারছি না। আমার ঘুম আসছে না, ঢাকা শহরের প্রতি বিতৃষ্ণা বাড়ছে কেবল। এই নিষ্ঠুর শহর ইখলাক হোসেনের মতো মানুষকে নগ্ন করে ছেড়েছে। না জানি কী হয়েছিল তার সাথে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি।
সকালে উঠে দেখি বিছানার কোনায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে ইখলাক হোসেন। মোতালেব কাকার লুঙ্গি-পাঞ্জাবি মেঝেতে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। ইখলাক হোসেনকে ঘরে রেখে সেদিন সারাদিন দাঁড়িয়ে ছিলাম জনতা ট্রেডিংয়ের সামনে, একটা লাল গাড়ির অপেক্ষায়। কত মানুষ ভেতরে ঢুকল, কত মানুষকে আবার উগড়ে দিলো বহুতল দালানটা, সাদা গাড়ি বের হলো, নীল গাড়ি ঢুকল, কিন্তু লাল গাড়িটার দেখা সেদিন আর পেলাম না। দারোয়ান ছেলেটা দুই-একবার দেখে গেছে আমায়, একচক্ষু রাক্ষস তার মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেছে, কেউ কিছু বলল না আমাকে। যেন আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। ক্লান্ত বাতাসের মতো গোপী কিষাণ লেনে ঘুরছি।
যখন সন্ধ্যা হলো, তখন আরেকটা ব্যর্থ দিনকে কাঁধে বয়ে নিয়ে ঘরে ফিরলাম। ঘরে ফিরে দেখি মোতালেব কাকা গল্প শোনাচ্ছে ইখলাককে। ইখলাক একটা সোফায় মূর্তির মতো বসে আছে, পোশাকআশাকের সাথে এখনো তার বিচ্ছেদ চলছে। মোতালেব কাকা নগ্ন ইখলাকের সামনে বসে কোনো ‘নাউজুবিল্লাহ’ ছাড়াই অনায়াসে ছেলের বিয়ের সময় গরুর মাংস কত নরম হয়েছিল সেই স্মৃতিচারণ করছেন। এক দিনেই অসভ্যতার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে মোতালেব কাকা।
কিন্তু আমি ইখলাকের দিকে তাকাতে পারছি না, তাকে আমি সবসময় গোড়ালি পর্যন্ত পোশাকে দেখে এসেছি। একটা গামছা এনে ইখলাকের গা ঢেকে দিতেই ইখলাক মাথা তুলে তাকালো, তার চোখে এখনো অন্ধকার।
মোতালেব কাকা বলল, “অয় গায়ে কাপড় রাখতে পারে না, আমগো ইলিয়াসের বউও গরমকালে গায়ে কাপড় রাখবার পারতো না, ঘরের মইধ্যে খালি গায়ে বইসা থাকত সারাদিন, যেইদিন বৃষ্টি হইতো সেইদিন সে বাইর হইতো, একদিন কী হইছে শোনো…”
ইখলাকের মতো মূক শ্রোতা পেয়ে মোতালেব কাকা রীতিমতো বাচাল হয়ে গেছে। একটা মানুষ সারাদিন চুপচাপ বসে তার কথা শুনছে তাতেই তিনি খুশি, শ্রোতা ভালো হলে নগ্নতাতেও মোতালেব কাকার আপত্তি নেই। ইখলাক হোসেনের গা থেকে ধীরে ধীরে গামছাটা খসে পড়ল। আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে, কিন্তু কিছু খেতে ইচ্ছা করল না। ঘরে গিয়ে বাতি বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম, মনে মনে আশা করলাম, আজ যেন সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখি।
স্বপ্নে আমি হীরাকে দেখলাম। একটা নদীর পারে হাঁটু মুড়ে সে বসে আছে, পেছনে ঘন জঙ্গল, জমিদারবাড়ির সভ্য জঙ্গল না, আরো ঘন, আরো বন্য একটা জঙ্গল। নদীতে একটা নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে, নৌকায় কেউ নেই। শাড়ির পাড়ের নিচে হীরার আলতা মাখা পায়ের পাতা দুটো দেখা যাচ্ছে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আলতা দিয়েছ পায়ে? বাহ! খুব সুন্দর লাগছে।”
সে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “আলতা না তো, এগুলো রক্ত।” আমার হাতটা ধরে তার পেটের কাছে নিয়ে বলল, “ধরে দেখেন, আমার পেটে গুলি লেগেছে।”
ঘুম ভেঙে গেল, মাইকে অনেকগুলো আজান একসাথে বাজছে, সেগুলো ছাপিয়ে মোতালেব কাকার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। বিছানায় উঠে বসতেই দেখি ইখলাক হোসেন বসে আছে বিছানার কিনারায়, মনে হচ্ছে সে কোনো একটা শব্দ করছে। কান পেতে শুনলাম, বিড়বিড় করে আরবি ভাষায় সে প্রত্যেক আজানের জবাব দিচ্ছে। সেদিন বুঝেছিলাম ইখলাক হারিয়ে যায়নি, এই শরীরটার ভেতরে এখনো কোথাও তার অস্তিত্ব রয়ে গেছে।
সকালবেলা গোপী কিষাণ লেনে আতর আর ধূপের গন্ধ পেলাম, এক বাড়ির ছায়া গিয়ে ছুঁয়েছে অন্য বাড়ির দেয়াল। শহরের সব পাখি পালিয়ে যায়নি, কিছু পাখি কার্নিশে বসে রোদ পোহাচ্ছে।
কিছু বারান্দায় ফুটেছে গৃহপালিত ফুল, প্রজননবঞ্চিত ফুলগুলো সারাদিন বৃথা রং ছড়ায়, সন্ধ্যাবেলায় ঝরে যায়, কোনো প্রজাপতি আসে না। বাড়ির গেইট খুলে স্কুলড্রেস পরে বেরিয়ে আসে ছোট পাখি, গলায় ঝুলে রঙিন পানির বোতল, মায়ের কাঁধে স্কুলব্যাগ। চাকরিজীবীদের পরিপাটি জামা-প্যান্ট দেখা যায় কদাচিৎ, বুড়োরা কেডস পায়ে ফিরে আসছে কোনো পার্ক থেকে। আমি ঘুরে ঘুরে, কখনো সরাসরি, কখনো আড়চোখে মানুষের জীবন দেখি।
তারপর দেখি রাস্তার মাথায় রিকশাওয়ালাদের সন্ত্রস্ত করে একটা লাল গাড়ি মাথা ঢুকিয়েছে এই রাস্তায়। জনতা ট্রেডিংয়ের সামনে এসে দুটো হর্ন দিলো গাড়িটা। গাড়ির কালো কাচের দিকে তাকিয়ে আছি, টের পেলাম কাচের ভেতর থেকে কেউ একজন দেখছে আমায়। গেইট খুলল, কিন্তু গাড়িটা সাথে সাথেই ভেতরে ঢুকল না। গাড়ির জানালা যান্ত্রিক শব্দ করতে করতে নিচে নেমে গেল। গাড়ির ভেতর থেকে শাকের মাহমুদের মুখটা বের হয়ে আসলো। তার মুখের প্রতিটা ভাঁজে বিরক্তি, সানগ্লাস খুলে নাক কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে এক শব্দে জিজ্ঞাসা করল, “কী?”
এই ‘কী’-এর কী উত্তর দিবো ভেবে পেলাম না। শাকের মাহমুদের অনেক প্রশ্নের জবাব মনে মনে রপ্ত করেছি শতবার। কিন্তু এই সামান্য প্রশ্নটার উত্তর দিতে না পেরে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। গাড়ির কাচ আবার যান্ত্রিক শব্দ করে শাকের মাহমুদকে ঢেকে দিচ্ছে। ঠিক তখন আমার মনে পড়ল হীরার সেই ঘড়িটার কথা। আমি পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে এক প্রান্তে ধরে ঝুলিয়ে রাখলাম গাড়ির জানালার সামনে। দারোয়ান গেইট খুলে দাঁড়িয়ে আছে। শাকের মাহমুদের গাড়ি তখনো খোঁয়াড়ে ঢুকছে না। আবার খুলল জানালা। শাকের মাহমুদ বলল, “ভেতরে আসেন।”
একটা ঘড়ির কারণে একে একে সব দরজা খুলে গেল। আমি বসে আছি শাকের মাহমুদের অফিসে। বড় মসৃণ ডেস্কের ঐ প্রান্তে মাথার চেয়ে উঁচু একটা চেয়ারে বসে আছে শাকের মাহমুদ। এত বড় চেয়ারে যে-কোনো মানুষকেই ক্ষুদ্র দেখায়। তার মাথার ওপর দেয়ালে দুটো পোট্রেট ঝুলছে, ঢাকা শহরের দেয়াল ঢেকে দেওয়া পোস্টারগুলোর ওপরের কোণে এই দুজনের চেহারা আগেও দেখেছি। এই ঘরে ঢোকার পর মনে হচ্ছে শীতকাল চলে এসেছে। ছাদের নিচে টিকটিকির মতো ঝুলে থাকা একটা যন্ত্র ঠান্ডা নিঃশ্বাস ছাড়ছে। কাচের দেয়ালে সূর্য উঠেছে, কিন্তু রোদ ততটুকুই ঢুকছে যতটুকুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ডেস্কের ওপর একটা বটগাছের বনসাই ঘরের কৃত্রিমতা কমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু গাছটা এত সুন্দর আর নিখুত যে দেখে মনে হচ্ছে প্লাস্টিকের গাছ।
একপাশে কালো সোফা পাতা আছে আন্তরিক বৈঠকের জন্য। আমি বসে আছি ডেস্কের বিপরীত পাশে, তুলনামূলক ছোট চেয়ারে। ডেস্কের মাঝামাঝি লাশের মতো সটান শুয়ে আছে সুইজারল্যান্ডের লেডিস ঘড়ি।
“নাম কী আপনার?”
লক্ষ্মল করলাম শাকের মাহমুদ আমাকে প্রথম থেকেই ‘আপনি’ করে বলছে। স্মৃতি হাতড়ে নিজের নামটা বের করে আনতে একটু সময় লাগল আমার, স্বাভাবিকভাবেই শাকেরের কপাল কুঁচকে উঠল।
“এই ঘড়ি কোথায় পেলেন?” শাকেরের প্রশ্নটাকে জেরার মতোই শোনালো।
“হীরা দিয়েছে।”
“হীরা?”
“ওহ, স্যরি, পিয়া।”
“আপনার দেখি নাম নিয়ে খুব সমস্যা,” আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল শাকের মাহমুদ। আমার চোখে কী যেন খুঁজে পেল মনে হলো। বলল, “ইউ আর নট হোয়াট ইউ লুক লাইক।”
বললাম, “জি, এই শহরে আসার পর জানলাম, আগে তো জানতাম আই লুক লাইক মাইসেলফ।”
“আচ্ছা, এবার বলুন পিয়াকে কোথায় পেলেন?”
“আমার বাড়ির বারান্দায়।”
শাকের মাহমুদ ভ্রূ তুলে তাকালো। আমাকে ইশারায় পুরো ঘটনাটা বলে যেতে বলল। আমি যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত বললাম তাকে। শাকের হাত ভাঁজ করে ঘাড় বাঁকা করে পুরোটা শুনল মনোযোগ দিয়ে। শাকেরের চেহারা যেন পাথরে খোদাই করা, যেই কথায় তার মুখে দুঃখ ফুটে ওঠার কথা ছিল, সেই কথায় সে ছিল নির্বিকার, নিজের পিতৃত্বের খবরে কোনো খুশির রেখা জাগল না মুখে। যেখানে তার আশ্চর্য হওয়ার কথা ছিল, চোখ গোল করে মুখ হা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, সেখানেও তার মুখের একটা পেশিও নড়ল না। তার চেহারায় রাগ নেই, বিরক্তি নেই, ভয়ও নেই। আমার কথা শেষ হওয়ার পরও সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “একটা চিঠির কথা বলছিলেন? সেটা কোথায়?”
বললাম, “চুরি হয়ে গেছে।”
“কোথায় চুরি হয়েছে?”
“একটা কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে, তখন কিছুই চিনতাম না, সম্ভবত প্রেসক্লাবের আশেপাশে কোথাও।”
“যে চুরি করেছে তার বয়স কেমন? চেহারা মনে আছে?”
আমার যতটুকু মনে আছে বললাম, শাকের সেগুলো একটা ছোট নোটবুকে লিখে নিলো। তারপর সে আমার বাড়ির ঠিকানা এবং আমি ঢাকায় যেখানে থাকি সেই ঠিকানাও লিখে নিলো। শাকের কলমটা একটা সুন্দর কাচের কলমদানিতে রেখে দিলো। তারপর চেয়ার ঘুরিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল অনেকক্ষণ, আমি তার চেহারার ডানপাশটা দেখতে পাচ্ছি, এই অর্ধাংশেও কোনো ঢেউ নেই। ঘরের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ছড়িয়ে পড়েছে। আমি বসে বসে ঘরের সাজসজ্জা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম, ঠান্ডায় আমার শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে।
শাকের একটা লম্বা শ্বাস নিলো, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “আপনার ঠান্ডা লাগছে, বলবেন তো, দাঁড়ান এসিটা অফ করে দিচ্ছি।”
এর আগেও তাকে হাসতে দেখেছি, কিন্তু এই হাসিটা আগের মতো নয়। কোনটা তার আসল হাসি বুঝতে পারলাম না। একটা রিমোটে টিপ দিতেই ‘বিপ’ শব্দ করে যন্ত্রটা মুখ বন্ধ করে ফেলল, ঘরটা আরো নীরব হয়ে গেল।
“আমার কাজ শেষ এখন, আমি যাই।” নিষ্কৃতি চাইলাম।
শাকের মাহমুদ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো, কালো আন্তরিক সোফাটা দেখিয়ে বলল, “প্লিজ আমাকে একটু আপ্যায়ন করতে দিন, এক কাপ কফি খেয়ে যান, আমার অফিসের কফি খেয়ে আজ পর্যন্ত কেউ নিরাশ হয়নি।”
ডেস্কে রাখা কয়েকটা ফোনের একটাতে কফির কথা বলল শাকের, তারপর আমার সাথে সোফায় এসে বসলো। বলল, “হাসান সাহেব, আজকে সন্ধ্যায় আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আপনি বাসায় থাকবেন, আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিবো। আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।”
শহরের সন্ধ্যা অনেক দীর্ঘ হয়, হেঁটে হেঁটে গুলিস্তান থেকে শাহবাগ চলে যাই আবার ফিরে আসি, বুড়িগঙ্গার পারে গিয়ে আবর্জনার গন্ধ শুঁকি, মোতালেব কাকার ঘরে শুয়ে অকালেই বাতি নিভাই, রাতের জন্য প্রার্থনা করি।
রাস্তার মোড়ে মানুষের ব্যস্ততা দেখি, বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকি, তবুও আমার সন্ধ্যা কাটে না। আমার সেই সন্ধ্যাটা চাইছে শাকের মাহমুদ, যার পেছনে হাজার মানুষ স্লোগান দেয়, যার হাসি শহরের সব মানুষের পরিচিত, যার সাথে দেখা করতে গিয়ে আমি প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলাম। বললাম, “গাড়ি পাঠাতে হবে না, আপনি বলুন কোথায় যেতে হবে, আমি চলে আসব।”
“সে জায়গা আপনি চিনবেন না। আমার গাড়ি ঠিক সন্ধ্যায় আপনার বাসার সামনে থাকবে।”
আর কিছু বললাম না, কফিতে চুমুক দিলাম। এত বিচ্ছিরি জিনিস! মুখে দিয়েই বমি পেল। আজ কোনো পরাজয় ঘাড়ে চেপে বসে নেই, তবুও কেন পা দুটো এত ভারী লাগছে? ভেবেছিলাম শাকের মাহমুদকে খবরটা দেওয়ার পর আমার নির্ভার লাগবে, নিজের দায়িত্ব পালন করার আনন্দ নিয়ে আমি বাড়ি ফিরতে পারব, হীরাকে বিদায় দিয়ে আবার একাকিত্বের সাথে ঘরসংসার করব। নিজের জীবন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনায় আমার একটুও ভালো লাগছে না, বুকের পাথরটা পুরোনো শোকের মতো জমাট বেঁধে আছে, পুরো মন সেঁচে এক টুকরো সুখ খুঁজে পেলাম না। এ কী অসুখ হলো আমার!
ঘরে ফিরে ইখলাক হোসেনের চামড়া দেখে মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে গেল। সে জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, এই জানলায় কোনো আকাশ নেই, পাশের বাসার রান্নাঘরের ভেন্টিলেটর আর কালো ড্রেন ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। আমি ইখলাককে ডাক দিলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। কাছে গিয়ে তাকে বললাম, “গাছ দেখতে যাবেন, ইখলাক ভাই?”
ইখলাকের পাথুরে চোখে কোনো জবাব নেই। আমি তাকে একটা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরিয়ে হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসলাম। চলতে চলতে ইখলাক আলগোছে লুঙ্গির গিট খুলতে যায়, আমি তার হাত সরিয়ে দিয়ে তাকে নিবৃত্ত করি। আবার কিছুক্ষণ পর পাঞ্জাবিটা খুলতে শুরু করে, আমি বাধা দেই, কিছুক্ষণ আবার বাধ্য শিশুর মতো সে নীরবে হাঁটে।
শহরে একদল গাছকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে দেয়াল দিয়ে বন্দি করে রাখা হয়েছে, এটাকে তারা বলে পার্ক। পার্কের গাছ সব ভদ্র, সভ্য, তাদের মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। এক গাছের ডাল অন্য গাছকে খোঁচা দিচ্ছে না, নিজের সীমানায় হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, গাছের গোড়া দখল করেনি
উচ্ছৃঙ্খল ঝোপঝাড়; সবাই পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। অত বড় চাপালিশগাছটাকে দেখে মনে হচ্ছে লিপস্টিক, পাউডার মেখে কোনো মর্দ মানুষ দাঁড়িয়ে ঢং করছে। পার্ক দেখে মনে হলো এটা যাত্রাপালার মঞ্চ, সবগুলো গাছ এখানে বনের গল্পে বৃক্ষের অভিনয় করছে। গাছের নিচে সিমেন্টের বেঞ্চ বানানো হয়েছে, সেখানে নারী-পুরুষ করছে প্রেমের চাষ। বাদামওয়ালা, ভিক্ষুক প্রজাপতি, মৌমাছির মতো প্রত্যেক বেঞ্চে ঘোরাঘুরি করছে, টাকার বিনিময়ে নির্জনতা বিক্রি করা ছাড়া পরাগায়নে তাদের আর কোনো ভূমিকা নেই।
ইখলাক লুঙ্গিতে হাত দিয়ে গিট খুলতে চেষ্টা করছে, আমি তার হাত ধরে গর্জনগাছের এবড়ো-খেবড়ো ত্বকে রাখলাম। নিজেও স্পর্শ করলাম গাছটাকে, মনে হলো অনেক দিন পর আত্মীয়ের দেখা পেলাম। হোক সভ্য তবুও মাটি শুষে বড় হয়েছে এই গাছ, বাকলে তার বহু ইতিহাস লেখা আছে। গাছটাকে জড়িয়ে ধরলাম, চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো জমিদারবাড়ির জঙ্গলে চলে এসেছি। কতক্ষণ পার হয়েছে জানি না, চোখ খুলে অবাক হয়ে দেখলাম ইখলাক হোসেনও গাছটাকে জড়িয়ে ধরে আছে। তার আঙুলের ওপর দিয়ে এক সারি পিঁপড়া হেঁটে যাচ্ছে। ইখলাককে টান দিতেই মরা ডালের মতো গাছ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।
পার্কের রাস্তাগুলো সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, মাটি যেন কোনোমতেই শহুরে মানুষদের ছুঁতে না পারে। সিমেন্টের শক্ত দেহে আমরা হাঁটছিলাম, হঠাৎ আমার হাতের মধ্যে ইখলাকের নরম হাতটা শক্ত হয়ে গেল। তার পা যেন গেঁথে গেছে রাস্তায়, সে নড়ছে না। সামনে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেছে ইখলাক, দেখলাম দুজন উর্দি পরা পুলিশ হেঁটে আসছে বিপরীত দিক থেকে। ইখলাকের নাকের ফুটো ফুলে গেছে, নিঃশ্বাস হয়েছে ঘন। এবং এই শহরে এই প্রথম তার চোখ দুটোকে জেগে উঠতে দেখলাম, তার চোখে ফাঁদে পড়া পশুর মতো আতঙ্ক আর আঁকুতি দেখতে পেলাম। পুলিশ দুজন চলে যেতেই ইখলাক হোসেন শিথিল হলো। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী হয়েছে, ইখলাক ভাই?” কিন্তু ততক্ষণে তার চোখে আবার আঁধার নেমে এসেছে।
পার্কের গেইট পেরিয়ে ফুটপাত ধরে আমরা হাঁটছিলাম। ফুটপাতের পাশে ফুল আর ফুচকার ভ্রাম্যমান দোকান। এসব ফুলের রং আছে, কিন্তু গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না। ফুচকার দোকান থেকে মশলার গন্ধের সাথে ফুলের গন্ধ ঠিক পেরে উঠছে না। হঠাৎ পেছন থেকে একজনের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম, কেউ একজন আমাকে ডাকছে ফুচকার দোকান থেকে, “ও ভাইজান, এদিকে, এদিকে।” পেছন ফিরে দেখি, মটরের ধোঁয়া ওঠা হলুদ দুর্গের পেছনে একজন মধ্যবয়স্ক লোক হাসছে। তার নাকের বড় বড় ফুটো দুটো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কাঠের লম্বা টুলে বসলাম আমরা, আশেপাশে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ফুচকা খাচ্ছে শাড়ি পরা মেয়েরা, দুই-একটা তুলে দিচ্ছে তাদের পুরুষের মুখে।
দোকানি আমার পলাশপুরের বাসের সহযাত্রী, যার পাশে বসে বমির রেকর্ড করেছিলাম, তার নাকের ফুটো দেখে না চেনার উপায় নেই। এত মোটা আঙুল আর এত বড় নাকের ছিদ্র আর কারো নেই। “কী খাইবেন? চটপটি নাকি ফুচকা?”
আমার পকেটে টাকা নেই, থাকলেও হয়তো খেতাম না। সাধ্য থাকলে যারা খাচ্ছে তাদেরও বারণ করতাম। “না, কিছু খাবো না। একেবারেই ক্ষুধা নেই,” মিথ্যা বললাম আমি। দোকানি আর একবার সাধল ভয়ে, যদি আমরা আসলেই খেতে রাজি হয়ে যাই। সে হয়তো টাকা চাইতে পারবে না, কারণ একসাথে সাড়ে ছয় ঘণ্টা বসে আমাদের মধ্যে একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অথচ তার নামটাও জানি না।
“হুজুররে কই পাইলেন?” ইখলাককে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল দোকানি।
“আপনি চিনেন তাকে?” অবাক হলাম আমি।
“চিনুম না ক্যারে? হেয় তো এদিকেই ফুল বেচতো, ঐ যে কদমগাছটা দেখতাছেন, এইখান থেইকা তো তারে পুলিশে ধইরা নিয়া গেল।” মোটা আঙুলে একটা কদমগাছের দিকে নির্দেশ করল দোকানি।
“তারপর?”
“তারপরে কয়েকদিন পরে দেহি কদমগাছটার নিচে হুজুরে ল্যাঙডা হইয়া বইয়া রইছে, হেইদিন বেচাকিনা একবারে ডাউন গ্যাছে, কোনো মাইয়ামানুষ আইসা দোকানে বহে না, শরমায়। আমি গিয়া নিজের গামছা হুজুররে পরাইয়া দিলাম, নতুন গামছা, একটু পরে দেহি হুজুরে ফালাইয়া দিছে। পসট্টি ট্যাকা দিয়া গামছাটা কিনছিলাম, দেড় হাত বহর, গুলিস্তানের মোড়ে পাইছিলাম, কুষ্টিয়ার গামছা, ঢাকা শহরে বেবাকতেই কুষ্টিয়ার গামছা বেচে, কিন্তু অইদিন পাইছিলাম এক্কেবারে অরজিনালডা, আমি তো ধইরাই বুঝছি, খাঁটি মাল, চিননের উপায় আছে…”
দোকানির গল্প গামছার দিকে ধাবিত হচ্ছে দেখে তাকে আবার প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম, “পুলিশ ধরেছিল কেন তাকে?”
এই প্রশ্নের সরল উত্তর দিয়ে একটা বিরাট আলাপের সম্ভাবনাকে অপচয় করার মতো লোক নয় এই ফুচকা-বিক্রেতা। পুলিশের চরিত্র হনন করে সে তার আলাপের সূচনা করল, তার খালাতো ভাইয়ের মামাশ্বশুর পুলিশের কারণে কী ঝামেলায় পড়েছিল সেই কাহিনি সবিস্তারে বর্ণনা করল, তারপর তার রোষানলে পড়ল উকিল সমাজ, কীভাবে মামলা ঝুলিয়ে রেখে মক্কেলদের পকেট ফাঁকা করে সেই সংক্রান্ত দুই-তিনটা উদাহরণ দিলো। উত্তরপাড়ার কোনো এক অকালকুষ্মাণ্ডের সাথে জমি নিয়ে তার কী বিবাদ চলছে, তাকে ঠকিয়ে তার ভায়রা ভাই কীভাবে শ্বশুরের সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কে কলকাঠি নাড়ছে, সামনের ইলেকশনে কার কার জামানত থাকবে না, কোন নায়কের নতুন কোন ‘বই’ আসছে, কে মাছ চাষ করে রাতারাতি কলাগাছ হয়ে গেল, মরলে কে কে নরকে যাবে ইত্যাদি বিভিন্ন জাগতিক, মহাজাগতিক গল্পের ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু করে ইখলাকের হাজতবাসের ইতিবৃত্ত উদ্ধার করলাম তার কাছ থেকে।
ইখলাককে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, তখন তার হাতের গোলাপগুলোর সাথে ঝরে পড়েছিল তার জোব্বার সবগুলো বোতাম। ইখলাক খুব বেশি প্রতিবাদ করেনি, শুধু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল তার জামা টেনে ধরা পুলিশটার দিকে। পুলিশ যখন তাকে গাড়িতে তোলে, তখন কয়েকজন লোক জমা হয়েছে গাড়ির পেছনে, তাদের সবার চোখে জিজ্ঞাসা। পুলিশ তাদের জানিয়েছে ইখলাক হুজুররে বেশ ধরে মাদক পাচার করে। ফুচকা-বিক্রেতা জানিয়েছে, ঢাকা শহরে ভালো মানুষের পোশাক পরে অনেকেই ‘লাল ট্যাবলেট’ পাচার করে। কিন্তু ইখলাককে তারা যখন দুদিন পরেই কদমতলায় দেখল, তারা বুঝল পুলিশ ভুল করে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, অনেকের মতে ইখলাকের ভাগ্য ভালো তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে চালান করে দেয়নি। দোকানি বলেছে ইখলাকের সারা শরীরে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ দেখেছিল সে। থানার হাজত থেকে সবাই নাকি এমন বাঘ হয়ে ফেরে। ইখলাকের বোতামহীন যে জোব্বাটা পুলিশ খুলে রেখেছিল, সেটা তাকে ফিরিয়ে দিলেও ইখলাক তা আর পরেনি, অপমানটুকু শুধু গায়ে জড়িয়ে পাথরের মতো চোখ নিয়ে সে বেরিয়ে এসেছে থানা থেকে।
