আঠারো
যখন জঙ্গলের অশ্বত্থগাছের নিচে হীরার সাথে আমার দেখা হলো, তখন তাকে দেখে বৃক্ষের একটা শাখা মনে হচ্ছিল। সে একপলক আমাকে দেখল, যেন আমার উপস্থিতি তার কাছে বাতাসের মতোই। মাথা উঁচু করে বৃক্ষের বিশালতায় চোখ বুলাতে লাগল সে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, “সাবধানে ঘুরবেন জঙ্গলে, এখানে অনেক সাপ আছে।”
ভেবেছিলাম সাপের কথা শুনে সে হরিণের মতো চমকে উঠবে, কিন্তু তার উদাসীনতা কমলো না। গাছের দেহে হাত রাখল সে। “সাপকে আর ভয় পাই না, এখানে আসার পথে দুইটা দেখেছি। দেখে মনে হয়েছে তারা ভীষণ নিরীহ, নিজের কাজে ব্যস্ত। আমাকে কামড়ানোর অত আগ্রহ ওদের নেই। অথচ ঢাকার নিরাপদ ঘরে বসে সাপের কল্পনাতেও আমি কেঁপে উঠেছি কতবার। টিভিতে সাপ দেখে রিমোট খুঁজেছি, খাবারের রুচি নষ্ট হয়েছে, কত ঘৃণা আর ভয় ছিল এই বেচারাদের প্রতি।” উদাস গলায় বলে গেল হীরা।
মনে হচ্ছে সকালবেলা অশ্বত্থগাছের নিচে এসে বোধিপ্রাপ্ত হয়েছে হীরা। গাছের গায়ে চড়তে চাওয়া একটা লতার সবুজ ডগাটা খুব আদরের সাথে ছুঁয়ে দিলো সে। “এই বনে ঢুকলে মনে হয় আমি পৃথিবীর বাইরে চলে এসেছি। লাইট-ক্যামেরার কোনো অস্তিত্ব নেই, সম্মান আর সম্পদের প্রতিযোগিতা নেই। শব্দের অত্যাচার নেই, পাপ-পুণ্য নেই, লোভ নেই, হিংসা নেই, স্ক্যান্ডাল নেই, কানাঘুষা নেই। এই বনের বাইরে পৃথিবীটা খুব নিষ্ঠুর। আমার আর সেই পৃথিবীতে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে না।”
হীরা জানে না, সমাজ আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। কুসংস্কারের বাঁধটা ভেঙে পড়লে সমাজের নিয়ম-কানুন, বাধা-নিষেধ সব বানের জলের মতো হুড়মুড় করে ঢুকবে। আমাদের প্রশ্ন করবে, সন্দেহ করবে, শান্তি দিবে। তাছাড়া একটা শিশুর নিরাপদ জন্মের কোনো পরিবেশ এই সমাজচ্যুত জঙ্গলে ঘেরা বাড়ির মধ্যে নেই। হীরাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছেন কিছু?”
“ভবিষ্যতে তাকিয়ে দেখি শুধু ভয়। ভয় পেতে আর ভালো লাগছে না। আমি আর কিছু ভাবতে চাই না। শুধু আপনি আমাকে আর কিছুদিন এখানে আশ্রয় দিন, সাপের ভয়ের মতো আমার সব ভয় দূর হয়ে যাক, তারপর আমি চলে যাব।”
তারপর তিন মাস কেটে গেছে। হীরার শরীরে মাতৃত্বের চিহ্ন এখন স্পষ্ট। নিজের স্ফীত পেটটা নিয়ে তার মধ্যে কোনো অস্বস্তি আমি দেখিনি, সে নির্দ্বিধায় তার অসুস্থতার কথা আমাকে জানায়, মাঝে মাঝে তাকে বলতেও হয় না, আমি নিজেই বুঝতে পারি। মাথাব্যথা হলে সে মাথা চেপে ধরে নুয়ে থাকে, দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখলে আমি বলে দিতে পারি তার কোমরব্যথা করছে, তার কুঞ্চিত নাক দেখে আমি বুঝে যাই আজ তার খাওয়ার রুচি নেই, এখন কাঁচা আম কিংবা পাকা তেঁতুলের চাটনি বানাতে হবে। তেঁতুলমাখা মুখে দিয়ে আমাকে বলে, “আপনি যখন এভাবে সেবা করেন, তখন মায়ের কথা মনে পড়ে।”
মায়ের কথা সে প্রায়ই বলে, কিন্তু কখনো মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায়নি, আর একটা বিষয় লক্ষ করেছি, হীরা সেই রাতের পর আর কখনোই শাকের মাহমুদের নাম মুখে আনেনি।
এই তিন মাসে আমি কতটা সংসারী হয়ে গেছি আমি নিজেও টের পাইনি। গঞ্জে গেলে বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করি। মেয়েদের সাজগোজ কিংবা শাড়ির দোকানে নিজের অজান্তেই চোখ পড়ে যায়। ইচ্ছা করে চুরি, ফিতা কিনি, নতুন শাড়ি কিনে হীরাকে চমক দেই। কিন্তু মানুষজন সন্দেহ করবে বলে কিনতে পারি না। তাছাড়া আমার মায়ের শাড়িতেই হীরাকে বেশি মানায়। হীরাকে রান্নাঘর থেকে উৎখাত করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে, শুধুমাত্র সাহায্য করবে—এই প্রতিশ্রুতিতে সে রান্নাঘরের মোড়ায় বসার অনুমতি পেয়েছে।
আমি বই পড়লে সে এসে আবদার করে শব্দ করে পড়তে, সেও শুনতে চায় আমি কী পড়ি। আমি তাকে জানাই, শব্দ করে পড়লে শব্দ বাতাসে ভেসে যায়, মনে ঢোকে না। সে পরিহাস করে বলে, “আমার কানে ঢুকলেই হবে, আপনার মনে ঢুকতে হবে না।”
তাকে দেখলে মনে হবে না সে কোনোদিন শহরে ছিল, ম্যাগাজিনের পাতায় তার ছবি ছাপা হয়, টেলিভিশনে দিনে অসংখ্যবার ডিটারজেন্ট পাউডারের গুণগান গায় সে। গ্রামের মেয়েদের মতো কুঁচি ছাড়া শাড়ি পরে সে এখন, কেবল তার আঁচলে কোনো চাবি থাকে না, যেহেতু আমার ঘরে কোনো তালা নেই। পুকুরে গোসল করে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে ভেজা শাড়ি নেড়ে দেয় বাড়ির আঙিনায়। আমার ক্ষেতের পাশে বসে খুন্তি এগিয়ে দেয়, সন্ধ্যাবেলা ‘আয় তি তি’ বলে মুরগিদের খোঁয়াড়ে ঢোকায়, সকালবেলা লাউয়ের ডগা ছিঁড়ে আঁচল ভরে ফেলে। শেয়াল দেখে এখন আর ভয় পায় না, ‘চু-চু’ শব্দ করে কাছে ডাকে। শেয়ালগুলো অবিশ্বাস নিয়ে তাকায় তার দিকে, তারপর ঝোপের মধ্যে হাওয়া হয়ে যায়।
এখন আমার পকেটে থাকে মেয়েলি হাতে লেখা বাজারের লিস্ট। গঞ্জ থেকে বাড়িতে ঢুকতেই যখন আমি বাতাসে শাড়ি-পেটিকোট উড়তে দেখি, মনে হয় গ্রামের কোনো গৃহস্থ ঘরে ঢুকে পড়েছি, এখনই দুটো অর্ধনগ্ন শিশু দৌড়ে এসে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমরা দুজন অসম্পর্কিত নর-নারী একটা জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপে আটকা পড়েছি, যদিও আমাদের দ্বীপে সমুদ্রের নীল রং নেই, চারপাশে সবুজের উত্তাল ঢেউ। হীরার উত্তল পেটটা দেখে মনে কেমন যেন গর্ব হয় আমার, হোক পেটের ভেতর, এই শিশুটাকে আমরা দুজন মিলে এত বড় করেছি। আমার গর্ব হয়তো হীরার চোখ এড়ায়নি।
নতুন করে চা খাওয়ার অভ্যাস হয়েছে আমার, বিকালে হীরার দুই হাতে দেখা যায় দুই কাপ চা, মুখে থাকে হাসি। এক কাপ চা হাতবদল হতেই পিরিচের ওপর থামে কাপের ভীত কাঁপুনি। চায়ের সাথে একটা-দুইটা গল্প থাকে, অধিকাংশ সময় আমরা চুপ থাকি, পাখির ডাক আর নীরবতার সাথে চায়ের কাপে উষ্ণ চুমু খাই।
সেদিন হীরা চা নিয়ে চলে আসলো পুকুরের ঘাটে, কাপ দুটো মাঝখানে রেখে আমার পাশে বসলো সে। বর্ষায় আমাদের চায়ের আসর বসতো বারান্দায় অথবা দোতলার ব্যালকনিতে। তখন আমরা চেয়ার পেতে মুখোমুখি বসতাম। কার্তিক মাস আমাদের পাশাপাশি বসিয়েছে। চা স্পর্শ করার আগে মাথা দুলিয়ে নীরব কৃতজ্ঞতা জানাই আমি। পুকুরপারের গাছের কচি পাতার ফাঁকে পাখি আর সূর্যের কমলা দেহটা উঁকিঝুঁকি মারে। পুকুরের অলস ঢেউয়ে গাছের ছায়া নাচছে। চা সম্পূর্ণ তাপ হারানোর আগেই আমরা চা সেঁচে কাপের তলা বের করে আনি। আমি হয়তো মাঝে মাঝে অপরিচিত পাখি দেখাই হীরাকে, হীরা দেখায় ভেসে ওঠা মাছ। দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা উঠি না। সেদিন চা অর্ধেক শেষ হতেই হীরার আঙুল কোনো মাছ কিংবা ফুল দেখালো না। নিজের পেটে হাত রেখে সে আমাকে বলল, “জানেন, মাঝে মাঝে নড়ে সে।”
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, কে নড়ে, বুঝতে চেষ্টা করলাম। হীরার হাত আর চোখ তার পেটের ওপর।
“আমি তো সবসময় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি।”
হীরার মুখে রোদের একটা রেখা এসে পড়েছে, তার ঠোঁটে ফুটেছে উজ্জ্বল হাসির ফুল। “আমি তার নড়াচড়া টের পাই, প্রতিটা স্পর্শের অনুবাদ করলে আমি শুধু ‘মা’ ডাক শুনতে পাই, সে সারাক্ষণ ডাকে আমায়,” মুখে হাসি রেখেই বলল হীরা। “আমি চাই আপনিও স্পর্শ করুন তাকে, আপনার স্পর্শে সে আশীর্বাদ পাক,” আমার দিকে তাকিয়ে বলল হীরা।
আমার ইতস্তত হাত দ্বিধার ভারে একটু কেঁপে স্থির হলো। হীরা আমাকে ভারমুক্ত করল, সে বাম হাত দিয়ে আমার ডান হাতের কব্জিতে ধরে হাতটাকে তার পেটের ওপর রাখল। আমার আঙুলগুলো জড় পদার্থের মতো পড়ে রইল হীরার গর্ভে। কিন্তু চামড়া ভেদ করে বহু দূর থেকে একটা কম্পন আমার আঙুলগুলোকে জাগিয়ে দিলো। আমি চোখ বন্ধ করলাম, একটা শিহরণ আঙুলের মাথা থেকে প্রবাহিত হয়ে আমার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সে কি আমাকেও কিছু বলতে চায়? কিন্তু স্পর্শ অনুবাদ করার বিদ্যা আমি জানি না, নারী ছাড়া সে বিদ্যা বোধহয় আর কেউ জানে না। শুধু বুঝলাম, সেই কম্পন এখন আমার বুকে ছড়িয়ে গেছে, আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছে, আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
এত তীব্র অনুভূতি সহ্য করতে পারছিলাম না, তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলাম। আমার হাতে লেগে আছে পৃথিবীতে জন্ম না নেওয়া এক শিশুর স্পর্শ। একটা স্পর্শে সব বদলে গেল মুহূর্তে। আমার বুকটা হঠাৎ করে খালি হয়ে গেল। চলে যাওয়া সূর্য, গাছের সবুজ পাতা, পাখির রঙিন দেহ, সুরেলা ডাক, আর ব্যন্ত সতর্ক প্রাণী সকলকে দেখে বলতে ইচ্ছা করছিল, তোমরা যথেষ্ট নও, আমার বুকে বিস্তার করছে সীমাহীন বিরান ভূমি। একটা শিশুর কান্না আর একজন মায়ের তৃপ্তির হাসি ছাড়া এই শূন্যতা আর কেউ পূরণ করতে পারবে না।
কিন্তু আমাদের এই সংসার তো ক্ষণস্থায়ী, একটা বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাবে কিছুদিন পর। হীরা আর বেশিদিন এখানে থাকতে পারবে না, সে মিশে যাবে শহরের আবহাওয়ায়, সেখানে মিলবে কলঙ্ক অথবা স্বীকৃতি। আমার এই জগতে আর ভেজা শাড়ি দুলবে না, হাসি, অভিমান, আবদার থাকবে না। বৃক্ষের সাথে বাস করে ধীরে ধীরে গাছ হয়ে যাব আমি, কোনো সুখ নেই, ব্যথা নেই, বেঁচে থাকা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।
“রাগ করলেন? হীরা জিজ্ঞাসা করল আমায়।
“কেন?”
“হাত সরিয়ে নিলেন যে। আমি স্যরি, আপনাকে জোর করলাম।”
“না, রাগ করিনি। কিন্তু আমি আর মায়া বাড়াতে চাই না।”
“ও, তাইতো।” হীরার চোখে-মুখে ছায়া পড়েছে।
আমি তাকে বিদায় দিতে চাই না, কিন্তু আমি চাই তার সন্তান জন্ম নিবে শহরের অভিজাত হাসপাতালের নিরাপদ পরিবেশে, ঘরের বাইরে উৎকণ্ঠিত কয়েকজন স্বজন অপেক্ষা করবে একটা সুখবরের জন্য। কেউ উদ্বেলিত হয়ে কানে আঙুল দিয়ে আজান দিবে, কেউ ছুটবে মিষ্টির দোকানে। কেউ সাদা তোয়ালে জড়ানো নতুন শিশুর বিভিন্ন অঙ্গের সাথে নিজের অঙ্গের মিল খুঁজে বেড়াবে, আমি নিজেকে তাদের মধ্যে দেখতে পাই না।
আমরা দুজন পুকুরপারে চুপচাপ বসে রইলাম, আমাদের চা সেদিন কাপের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে রইল। সেই বিকালে হীরার হাসি হারিয়ে গিয়েছিল। হীরার মুখে ছায়াটা স্থায়ী হয়ে গেছে, আমি গঞ্জ থেকে ফিরে আসলেও তার চোখ থেকে নক্ষত্র ঝরে না, আমার চটের ব্যাগটা নিয়ে তার আর আগ্রহ নেই, জলপাইয়ের আচার পেলেও উল্লসিত হয় না। বই খুলে আমি তার জন্য অপেক্ষা করি, কিন্তু সে আর শুনতে আসে না। খোলা বইয়ের অক্ষরগুলো অচেনা লাগে আমার, নির্বোধ গর্ধবের মতো অক্ষরগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, আমাকে কিছুই বলতে পারে না।
হীরা প্রায়ই এখন বাগানে বসে থাকে, গাছের আড়াল থেকে সে নদীর ওপারের গ্রামের দিকে চেয়ে থাকে, সভ্যতার কাছে জবাবদিহি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। আমি তার নির্জীব মুখটা দেখি, নিভু নিভু চোখে সে তাকায় আমার দিকে, ঠোঁট থেকে মাঝে মাঝে বের হয় ক্লান্ত দুয়েকটি শব্দ, বাকি সময় পাথরে খোদাই করা তার ঠোঁটে থাকে কঠিন নীরবতা। কিন্তু তার চোখে আমি কোনো অভিমান দেখিনি, হীরা আসলে বাস্তবতায় আক্রান্ত হয়েছে। সেদিন এক কথায় আমি তার স্বপ্নের আবরণটা খসিয়ে দিয়েছি।
দুশ্চিন্তার মতো হীরার পেটও বড় হতে লাগল। আমার আয়ুর্বেদ এতদিন তাকে সুস্থ রেখেছে, কিন্তু এখন আমি আর ভরসা পাচ্ছি না। গাছের শিকর আর পাতা তার ক্লান্তি দূর করতে পারছে না, তার মুখের ব্যথার ভাঁজগুলোকে মেটাতে পারছে না। তাকে এই বাড়ির সবুজ প্রহরার বাইরে যেতেই হবে। হীরার পেট যত বড় হচ্ছে, আমাদের অস্থায়ী সংসারের আয়ু তত ফুরিয়ে আসছে। আমার এই বাড়ি শিশুর কান্না শোনার জন্য উপযুক্ত নয়। যাকে দুজন মিলে বড় করেছি, জন্মের পর তার ওপর আমার আর অধিকার থাকবে না। যে শিশুকে আমি একবার ছুঁয়েছি, জন্মের পর দ্বিতীয় বার আর তাকে ছুঁতে পারব না।
কার্তিক মাসে হীরার গর্ভ পরিপক্ক ফলের মতো ভারী হয়ে গেল। আমার জঙ্গলের ছোট-বড় জন্তু হীরাকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়, এমন অদ্ভুত আকৃতির প্রাণী তারা আগে দেখেনি। হীরার হাঁটার গতি আগের চেয়ে মন্থর হয়ে গেছে, বনেজঙ্গলে আর ঘুরে বেড়ায় না সে, বিছানাতেই পড়ে থাকে সারাদিন। আমি বারান্দায় বসে বাঁশের কঞ্চি চাঁছি, সকালে পেতে রাখা জাল অকারণেই বারবার তুলে দেখি, মাছ আটকা পড়লে সেটাকে উদ্ধার করে আবার পুকুরে ছেড়ে দেই। ক্ষেতে আগাছা নেই, তবুও কাঁচি দিয়ে খোঁচাই। নিজেকে যথাসম্ভব ব্যস্ত রাখার জন্য যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় কাজ করে যাই, কিন্তু বিরহ তো বাতাসে ছড়িয়ে আছে, এবং আমাকে সে বাতাসে শ্বাস নিতে হচ্ছে।
রাতে জেগে থাকি ঘুমহীন বিছানায়, ঘরের ছাদে ভেসে ওঠে বাবার মুখ, মায়ের উপুড় হয়ে থাকা নিথর দেহ। সেই শৈশবে আমার একাকিত্ব মেটানোর জন্য মায়ের পেটে জন্ম নিয়েছিল আমার সহোদর, কিন্তু সে আমার একাকিত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়ে গেছে, তাকে আমি দেখিনি কোনোদিন। তারপর আমাদের বাড়ি আর আমাদের রইল না, নতুন বাড়িতে এসে মা চলে গেল, বাবা হলো নিরুদ্দেশ। আমি একাই বাঁচতে শিখেছি। ইখলাক হোসেন আমার একাকিত্বে বিচ্ছিন্ন সঙ্গ দিতে এসেছিল, তারপর একটা চিঠি দিয়ে সে-ও হারিয়ে গেল। তারপর একদিন আমার বারান্দায় উল্কা এসে পড়ল, আমার নির্জনতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, নিজের অজান্তেই আমি নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম, মনে হয়েছিল একটা শিশু ছাড়া এই বাড়ির অভিশাপ আর কাটবে না। কিন্তু আমার স্বপ্নটা এখন খসে পড়ে যাচ্ছে।
দরজায় আঙুলের টোকা পড়ল। আমার নীরব দরজা কোনোদিন এমন শব্দ করেনি। আমি উঠে বসলাম বিছানায়। জানালার বাইরে অন্ধকার চাঁদের আলোতে কিছুটা পাতলা হয়ে গেছে, ঘরের মধ্যে অন্ধকার জমে থকথক করছে।
“মনে হচ্ছিল আপনি জেগে আছেন।” হীরার কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
“ঠিক মনে করেছ, কিন্তু তুমি ঘুমাওনি?”
“ঘুম আসছে না, আপনার সাথে একটু গল্প করা যাবে?”
“কিন্তু এখানে তো অন্ধকার, চলো ছাদে যাই।”
সিঁড়ির ধাপগুলো আঁধারে ডুবে গেছে, হীরা পা ফেলতে ভয় পাচ্ছে। আমার একহাতে গোটানো পাটি, কয়েক ধাপ চড়ে আমি হীরার জন্য অপেক্ষা করছি। তখন হীরা হাত বাড়িয়ে আমাকে বলল, “আমার হাতটা একটু ধরবেন? আমার ভয় করছে।” আমি তার হাত ধরলাম, তার আঙুলগুলো আমার হাতটাকে আড়াআড়িভাবে আঁকড়ে ধরেছে।
ছাদে পাটি বিছালাম, খুব বেশি আলো নেই ছাদে, কিন্তু আমরা একজন আরেকজনের চেহারা দেখতে পাচ্ছিলাম। হীরা আমার হাত ধরে গর্ভবতী নারীর পক্ষে যতটুকু ভদ্রতা রক্ষা করে বসা সম্ভব, সেভাবেই বসলো। বসেই চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালো, আকাশে দুই-একটা তারা জ্বলজ্বল করছে, ক্ষীণ চাঁদের আলো তাদের স্নান করতে পারেনি। হীরার চেহারায় আজ কোনো উদ্বিগ্নতা নেই, পুকুরের শান্ত জলের মতো দেখাচ্ছে তাকে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু একটু পর পর সেই বুড়ো সঙ্গীহীন প্যাঁচাটা ডেকে উঠছে।
“এখান থেকে গাছগুলোকে অত বড় মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কিশোর বালক, মাথার চুল নাড়িয়ে আদর করে দিতে ইচ্ছা করছে,” চারপাশে গাছের মাথাগুলোর তাকিয়ে বলল হীরা।
বললাম, “একটা শিশুর জন্মের সময় একজন মায়েরও জন্ম হয়, সবকিছুতে তার মাতৃত্ব জেগে ওঠে, তখন বাঘ-ভালুক সামনে এসে পড়লেও বোধহয় আদর করে দিতে ইচ্ছা হবে।”
বাঘ-ভালুকের কথাটা খুব সস্তা রসিকতা, কিন্তু হীরা খুব মজা পেল, কারণ রসিকতাটা আমি করেছি। আমার মুখ থেকে এমন কিছু শোনার প্রত্যাশা সে করেনি। হীরার হাসিটা ঢেউয়ের মতো একসময় মিলিয়ে গেল, আবার তার মুখ নিস্তরঙ্গ শান্ত হলো। বলল, “জানেন? আমি যখন কলেজের দেয়াল ডিঙ্গাচ্ছিলাম, তখন মনের একটা অংশ আমাকে বলেছে, তুমি ভুল করছো। যখন ঘর ছেড়ে বের হই, তখনো মনে হচ্ছিল আমি ভুল করছি। এখানে এসে বিপদে পড়লাম, বুঝেছি ভুল করেছি। কিন্তু এই বাড়িতে এতদিন থাকার পর যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন আর কোনো ভুল দেখতে পাই না। এখানে না আসলে জীবনটা অন্ধ হয়েই পার করে দিতে হতো, আমি নতুনভাবে দেখতে শিখেছি এখানে। আপনি-“
হীরা একটু থামল, বুক থেকে অনেক কথা ঠেলে চলে আসছিল মুখে, সে সেগুলোকে আবার ভেতরে পাঠানোর জন্যই বোধহয় একটু সময় নিলো। তারপর বলল, “আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন, আমার সন্তানের জীবন রক্ষা করেছেন, আমি সারাজীবন আপনাকে মনে রাখব।” হীরা বলতে থাকল, “আমার সন্তানের জন্য আমি এখানে এসেছিলাম, কিন্তু আমার সন্তানের জন্যই আমাকে এখন চলে যেতে হবে।”
শাড়ির আঁচলের গিট খুলে একটা কাগজ বের করল হীরা। “ভেবে দেখলাম, মাকে ছাড়া আমার উপায় নেই। যে আমাকে এত ভালোবাসে সে আমার সন্তানকেও ভালোবাসবে। এখানে মায়ের ফোন নম্বর আছে, কল করে মাকে জানিয়ে দিবেন, আমি এখানে আছি। যদি আমার দেওয়া কষ্ট সহ্য করে মা এখনো বেঁচে থাকে তাহলে অবশ্যই আসবে, আমাকে নিয়ে যাবে।”
কাগজটা হাতে নিয়ে বললাম, “আপনার শুনতে অবাক লাগতে পারে, আমি কিন্তু জীবনে কখনো টেলিফোনে কারো সাথে কথা বলিনি।”
“আপনি ভীষণ অদ্ভুত, মাঝে মাঝে মনে হয় আপনাকে ঢাকা শহরে নিয়ে যাই।” হীরার মুখে স্নেহের হাসি।
“কেন?”
“মানুষ দেখবেন, মানুষও আপনাকে দেখবে। আপনাকে নিয়ে হয়তো পত্রিকায় ফিচার ছাপা হবে, আপনি হবেন দর্শনীয় বস্তু।”
“শুনতেই বীভৎস লাগছে, কিন্তু আমার মনে একটা গোপন ইচ্ছা আছে, আমার শহরে যেতে ইচ্ছা করে অদৃশ্য হয়ে, আমি সবাইকে দেখব, কেউ আমাকে দেখবে না।”
“শহরে সবাই অদৃশ্য, কেউ কাউকে দেখে না,” গম্ভীর কণ্ঠে বলল হীরা। “সেখানে সমাজ নেই?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
“আছে, সমাজ আছে, সমাজের অত্যাচারও আছে। পরনিন্দা, কুৎসা এসব সামাজিক চর্চা এখনো বিলুপ্ত হয়নি। নগরে হয়তো আমাদের নামে এতদিনে কলঙ্ক রটে যেত।”
“কেন?”
“এই যে আমরা এক ছাদের নিচে আছি।”
আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমরা সবাই তো এক ছাদের নিচেই আছি।”
আমরা ঘাড় উঠিয়ে সারস পাখির মতো দুজনেই কিছুক্ষণ আকাশ দেখলাম। তারপর বেশ কিছুক্ষণ হীরা মাথা নামিয়ে চুপ করে বসে রইল। মনে হলো কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না।
“কিছু বলতে চাচ্ছো?” জিজ্ঞাসা করলাম।
হীরা খুব সযত্নে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “না, চলুন নিচে যাই, আমার ঘুম পাচ্ছে।”
অথচ তার চোখে-মুখে ঘুমের কোনো লক্ষণ খুঁজে পেলাম না।
