আটাশ
বাসের জানালা দিয়ে হু-হু করে ঢুকছে কার্তিক মাস, কাঁচা ধানের ঘ্রাণ পাচ্ছি। আমার মুঠোতে হীরার চিঠি, চোখে অশ্বত্থের ছায়ার মতো ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন। জমিদারবাড়ির বারান্দায় ফুল ফুটেছে, হীরা তার খোলা চুল মেলে ধরে আছে রোদে, তার আঁচল ধরে টানছে একটা ছোট্ট শিশু। বাঁশ কেটে তার জন্য খেলনা বানাচ্ছি আমি, হীরা তাই দেখছে মুগ্ধনয়নে, শিশুটির তর সইছে না। আমার বাগান নুয়ে পড়েছে ফলের ভারে, নদীতে জল কলকল করছে, শিশুর খিলখিল হাসিতে কাঁপছে জমিদারবাড়ির বাতাস। ইখলাকের চিঠি আসবে ঢাকা থেকে, আমার আর নতুন কোনো বই লাগবে কি-না জিজ্ঞাসা করবে চিঠিতে, জানাবে মোতালেব কাকা তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য কেমন পীড়াপীড়ি করছে। হয়তো কোনোদিন চিঠির সাথে একটা ফটোগ্রাফ আসবে, স্টুডিয়োতে ইখলাকের পাশে বসে থাকবে লাজুক একটা মেয়ে।
বাসের হর্ন আমার স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে দিচ্ছে বারবার। আমি ঘাড় উঁচিয়ে বাসের যাত্রীদের দেখলাম, অধিকাংশ চোখ বুজে ঝিমাচ্ছে, কেউ কেউ গল্প বলে পাশের যাত্রীর ঘুম হরণ করছে। সিটের পাশে মুখ বেঁধে ফেলে রাখা বস্তায় তারা কী নিয়ে যায়, আমার জানতে ইচ্ছা করল। পুরোনো ব্যাগ যারা বুকে চেপে আছে, সেখানে হয়তো আছে বউয়ের জন্য শাড়ি, বাচ্চার জন্য লাল ফ্রক অথবা প্লাস্টিকের গাড়ি। আমার গল্প করতে ইচ্ছা করছে তাদের সাথে, শুনতে ইচ্ছা করছে তাদের সংসারের গল্প, মনে হচ্ছে আত্মীয়তা পাতাই সবার সঙ্গে। সবাইকে জানাতে ইচ্ছা করছে, আমি তাদের ভালোবাসি। যে লোকটা আমার পাশে বসে আমার কাঁধে লালা ফেলে ঘুমাচ্ছে, তাকেও ভালোবাসি আমি।
মহিমগঞ্জ বাজারের ভাতঘুম তখনো কাটেনি। বাবার চাদর গলায় ঝুলিয়ে জনবিরল গলি-উপগলি পার হয়ে যাচ্ছি। এইসব গলির সব কয়টা গর্ত, গাঁথুনি থেকে ঠেলে উঠে আসা ইট, জমে থাকা কাদা—সব আমার মুখস্থ। মাথা নিচু করে এখানে হেঁটেছি আজীবন, মুখ তুলে মানুষের চেহারা দেখিনি। আজ ভীষণ তাকাতে ইচ্ছা করছে মানুষের মুখের দিকে, আমি চাইছি কেউ আমাকে ডাকুক, জিজ্ঞাসা করুক, এতদিন কোথায় ছিলে? চায়ের দোকানে বসে আমি তাকে ঢাকার গল্প শোনাবো। বাজারের শেষ প্রান্তে বটগাছের নিচে চলে আসলাম, কেউ ডাকল না আমায়।
নদীর পার ধরে হাঁটছি, মহিমগঞ্জ কি একটু বেশি সবুজ হয়ে গেছে? নদীতে পানি কমে গেছে, নিচে বালি দেখা যাচ্ছে, সূর্যের আলোতে চিকচিক করছে নদীর দেহ। শালিকের দল গরুচড়ানো মাঠে পোকা খুঁজে যাচ্ছে, দুইটা গরু ঘাস খাওয়ায় বিরতি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, এইটুকুর জন্য গরু দুটোর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম।
নদীর বাঁকানো কোমরটা পার হতেই জমিদারবাড়ির সীমানা ভেসে উঠল। দেখলাম এই সময় বাচ্চাদের জোর করে ঘুম না পাড়িয়ে, লাইন ধরে বসে মাথা থেকে উকুন আর গোপন গল্প উৎপাটন না করে নদীর পারে চারজন ঘোমটা পরা নারী শোকের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের ওপর আঁচল ধরে তারা তাকিয়ে আছে জমিদারবাড়ির দিকে। আমার বুক খামচে ধরল কেউ, এমন মৃত্যুদূতের মতো তারা এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছে? দূরে গ্রামের ভেতর থেকে কয়েকজন পুরুষ উঠানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে মহিলাদের মধ্যে চঞ্চলতা লক্ষ করলাম, আঁচলের আড়ালে তাদের কান আর মুখ সচল হলো, সব কয়টা চোখ এখন আমাকে দেখছে, বাতাসে ফিসফাস ছড়াতে থাকল।
দুঃসংবাদের আশঙ্কায় আরো ভারী হয়ে গেলাম। পা তুলে হাঁটতে পারছি না, কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করব সেই সাহস জোগাড় করতে পারলাম না। ভাঙাচোরা স্বপ্নগুলো বুকের মধ্যে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টির তিরে বিদ্ধ হয়ে ফিসফাসের কুয়াশা সরিয়ে বাগানের পথে উঠলাম। বাগান পেরিয়ে আঙিনায় এসে রুদ্ধশ্বাসে শোকের চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছি। ঝরাপাতার নিচে ঢাকা পড়েছে আঙিনা, যেই দড়িতে হীরা তার শাড়ি শুকায় সেটা শূন্য হয়ে ঝুলে আছে, অযত্নে বিমর্ষ হয়ে আছে ফুলের গাছ, ফুল সব চুপসে গেছে।
আমি হতবিহ্বল হয়ে দড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন বাড়ির ভেতর থেকে অপরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে আসলো। ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখি রান্নাঘর থেকে বের হচ্ছে একজন অপরিচিত বৃদ্ধা। এমন অভূতপূর্ব ঘটনায় আমি থমকে গেলাম, বৃদ্ধাও ভড়কে গেল কিছুটা। বৃদ্ধা অভ্যাসমতো ঘোমটা টেনে তার সাদা চুল ঢাকল কিছুটা। আমাকে হাতের ইশারায় থামতে বলে একটা অভিযোগের দৃষ্টি হেনে ওপরে চলে গেল। বৃদ্ধা ওপরে যেতেই সিঁড়িতে দেখা গেল মঞ্জুবালাকে, তার চেহারা বিধ্বস্ত, চুল বিপর্যন্ত, কপালে দুশ্চিন্তা। আমাকে দেখে মঞ্জুবালা মুখ বিকৃত করে কেঁদে উঠল, তার কান্না দেখে আমি শিউরে উঠলাম।
মঞ্জুবালা কেঁদে কেঁদে জানালো হীরা প্রতিদিন বাগানে গিয়ে বসে থাকত আমার অপেক্ষায়। সন্ধ্যায় ভেজা চোখ নিয়ে ফিরে আসত ঘরে। তার রাত কাটত ঘুমহীন, মায়ের যত্ন, খাবারের থালা—সবই প্রত্যাখ্যান করেছে অবজ্ঞায়। দিনের পর দিন যখন শূন্য পথে কারো ছায়া পড়ল না, হীরা অনুশোচনায় মুষড়ে পড়তে লাগল, শরীর ভেঙে পড়েছিল তার, খুব যত্ন করে নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রেখেছিল সে। গতকাল রাতে যখন তার পেটব্যথা শুরু হলো তখন আর ধৈর্য দিয়ে তা ঢেকে রাখতে পারেনি। সারারাত মঞ্জুবালা মেয়ের চিৎকার শুনেছে, ছটফট করেছে, কেঁদেছে, আর কিছু তার করার ছিল না।
তার মাতৃত্ব আজ তাকে ঠেলে পাঠিয়েছিল নদীর ওপারে। প্রথম বাড়িটাতে গিয়ে সে ভিখারিনীর মতো আঁচল বিছিয়েছে, “আমার মাইয়াটা মইরা যাইতাছে।” পুরুষেরা কেউ যেতে রাজি হয়নি অকল্যাণের ভয়ে। বউয়েরা নিজের কোলের সন্তান আঁকড়ে ধরে “ও মাগো।” বলে আঁতকে উঠেছিল। কিন্তু মায়ের আঁকুতি স্পর্শ করেছিল অন্য এক মাকে, ফুলমতি বেওয়ার বড় ছেলেটা সাপের কামড়ে মরেছিল কিছুদিন আগে, অত বড় জোয়ান ছেলেটাকে বাঁচাতে বিলাপ ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি সে। আরেক মায়ের আহাজারিতে মন তার টলে উঠল, পৃথিবীতে তার কেউ নেই, হারানোর ভয় তার ছিল না।
জমিদারবাড়িতে দুইজন নারী কীভাবে এলো তা নিয়ে কানাঘুষার মধ্যে ফুলমতী নিজের কোমরে আঁচল গুঁজে বলেছিল, “আয়লো বেটি, আমি যামু তোর লগে।” জমিদারবাড়ির সীমানায় এসে ফুলমতীর চোখে সহানুভূতির চেয়ে গাঢ় হলো দ্বিধা। তবুও মাতৃত্বের দাবিকে অস্বীকার করতে পারেনি সে। উঁচু উঁচু গাছের দিকে সংশয় আর ভয় নিয়ে তাকাতে তাকাতে সে পা রাখল জমিদারবাড়ির মসৃণ মার্বেলে। দোতলার ঘরে হীরার পাকা ফলের মতো স্ফীত পেট দেখে ফুলমতীর চোখ গোল হয়ে গেল, ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে বিস্ময় প্রকাশ করল সে। তারপর পেটের চারপাশে টিপে টিপে দেখল, বাজারে যেভাবে লাউ কিনে অভিজ্ঞ ক্রেতা।
“মাইয়া তো বিয়াইবো যহন তহন।” ঘোষণা করল সে। তারপর হাত, পা, পেট আরো ভালো করে লক্ষ করে বলল, “পানি কইম্যা গেছে, বিপদের কতা।”
ফুলমতী বেওয়া কাজে লেগে গেল, মন্ত্র পড়ে বাতাসে ফুঁ দিয়ে সে খারাপ বাতাসের সাথে মোকাবিলা করল প্রথমে, তারপর কুপির আগুনে গরম করে তেলপড়া ফেলল নাভির ওপর। গ্রামের প্রত্যেক প্রৌঢ়াই অভিজ্ঞ ধাত্রী, ফুলমতী নিজে ছয় সন্তান জন্ম দিয়েছে, এরমধ্যে অধিকাংশই শৈশব পার করতে পারেনি, স্বামীর মৃত্যু না হলে সে হয়তো আরো বেশি প্রসব করতে পারত। হীরার পরিচর্যা করতে করতে মঞ্জুবালাকে নিজের প্রসবের ইতিহাস শুনিয়ে যায় ফুলমতী।
হীরা চিৎকার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। “লক্ষণ ভালা না গো, বেটি, আল্লারে ডাক।” ফুলমতী অসহায় মুখে জানিয়েছে মঞ্জুবালাকে। ফুলমতী তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছে, হীরার এক গোছা চুল নিয়ে কিছু বাতাসে উড়িয়েছে, কিছু ফেলেছে পুকুরের পানিতে, কয়েকটা দিয়েছে চুলার আগুনে। এখন সে হীরার কানে ‘বিয়াইন্যা গান’ গাচ্ছে। পুরুষমানুষের কানে গেলে এই গান ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই মঞ্জুবালাকে নিচে পাঠিয়েছে যেন আমি ঘরে ঢুকে না পড়ি।
হীরার আর্তনাদ ভেসে আসলো দোতলার বন্ধ ঘর থেকে, ব্যথা তার জেগে উঠেছে আবার। মঞ্জুবালা ছুটে গেল ওপরে, প্রবেশাধিকার না পেয়ে আমি নিঃসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বারান্দায়। আমার মুরগিগুলো মাটি খুঁটছে চাঁপাগাছের তলায়, আমাকে তারা ভুলে গেছে, কাছে আসছে না। ঘাটের পথ আজ অচেনা লাগছে, হলুদ ঠোঁটের পাখিটাকে চিনতে পারছি না, নিজের নাম মনে পড়ছে না, আমি তলিয়ে যেতে থাকলাম বোধহীনতায়।
আমার হুঁশ ফিরল একটা শিশুর চিৎকারে, মুরগিগুলো খাবার খোঁজায় বিরতি দিয়ে কান পেতে শুনছে এই অভূতপূর্ব কান্না, পাখিরা ডানা ঝাপটে আবার বসেছে ডালে, তারাও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। জমিদারবাড়ির দেয়াল আগে কখনো নবজাতকের কান্না শোনেনি, বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘ ঘুম ভেঙে একজন বৃদ্ধ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। আমি নিজের দেহ নিয়ে বসে পড়েছি মেঝেতে, অবিশ্বাস্য লাগছে সবকিছু, আসলেই কি একটা শিশু জন্ম নিলো এই অভিশপ্ত বাড়িতে?
ফুলমতি বেওয়া কান্নাটাকে পুরোনো কাপড়ে মুড়িয়ে নেমে এলো নিচে। ফুলমতী কাপড়ের পুঁটলিটা আমার হাতে দিয়ে বলল, “পোলার পরথম কোলে নিবো তার বাপে, এইটাই নিয়ম।”
মনে হলো একটা পাখির বাসা কোলে তুলে নিলাম, এত হালকা। কাপড়ের ভেতরে একটা উষ্ণ, ক্ষুদ্র দেহ নড়ছে। তার মুখের পাশে বের হয়ে আছে ছোট ছোট আঙুলের লাল দুটি মুঠো। আমি একটা মুঠোতে আমার আঙুল ছোঁয়ালাম, তাকে প্রথম ছুঁয়েছিলাম যখন সে জলে ছিল, আজ দ্বিতীয়বার স্পর্শ করলাম। পৃথিবীর আর সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল এক মুহূর্তে, আমার প্রাণ আটকে গেল এই পুরোনো কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে।
এই ক্ষুদ্র দেহটাকে নিজের বুকের পাশে রাখার যে কী প্রচণ্ড সুখ, আমি সইতে পারছিলাম না। জানি না কখন আমার গাল বেয়ে নেমে এসেছে অশ্রুধারা। মনে মনে বললাম, বাপ আমার, আমার বুকের দখল তোমাকে দিলাম, আমার এই হাত পৃথিবীর ভূমি নিংড়ে তোমার জন্য ফসল বের করে আনবে, তুমি বাস করবে আমার চোখে, তোমার জন্য আমি লড়াই করব জগতের সব দানবদের সাথে। আমি শ্বাস নিবো শুধু তোমাকে বিশুদ্ধ বাতাস দেওয়ার জন্য, তোমাকে ছায়া দিবো, সব অনিষ্ট থেকে রাখব আড়াল করে, আমি তোমার ‘বাবা’ হব। নতুন পরিচয় পেয়েছি আমি, আর কোনো নামের প্রয়োজন নেই আমার।
জগতের সকল সুখ আমার কোলে এনে দেওয়ার জন্য ফুলমতী বেওয়াকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। কিন্তু ফুলমতী বেওয়ার চোখে-মুখে অস্বস্তি। বলল, “পোলার মায়ের অবস্থা ভালা না, ম্যাডিকেলে নিতে হইবো, নাইলে বাঁচতো না মাইয়াডা।” ফুলমতী আরো জানালো শরীরের সব রক্ত ঢেলে দিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে হীরা। মঞ্জুবালা মেয়ের এই অবস্থা দেখে মেঝেতে ঢলে পড়েছে, তাকে জাগানো যাচ্ছে না।
নদীর শুকনো দেহে নৌকা ভাসে না এখন, হীরাকে বাঁশের দোলনায় বহন করে নিয়ে যেতে হবে মহিমগঞ্জে। সেজন্য আরো কয়েকটা মানুষ দরকার, ফুলমতী অসহায়ের মতো জানালো। আমি বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে ছুটলাম গ্রামের দিকে, গ্রামে অন্তত একটা সাহসী কিংবা দয়ালু কাঁধ কি পাওয়া যাবে না?
শিশুটিকে বুকের সাথে ধরে জমিদারবাড়ির বাগান পার হলাম। তারপর অবাক হয়ে দেখলাম নদী পার হয়ে কিছু নারী ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পায়ের পাতায় এখনো নদীর জলজ স্পর্শ লেগে আছে, কোমরে লেগে আছে ভয়ার্ত বালক-বালিকা। একটা কান্না তাদের টেনে নিয়ে এসেছে এইপারে। মৃত্যুতে যে অভিশাপের শুরু হয়েছিল, আজ একটা জন্মে সেই অভিশাপের সমাপ্তি ঘটল। গ্রামের কয়েকজন পুরুষ বাঁশ কেটে খাটিয়া বানাচ্ছে হীরার জন্য।
মহিলারা আঁচলে নিজেদের ঢেকে কাছে এসে আমার কোলে দেখছে। বয়স্করা কাপড় সরিয়ে মুখটা ভালো করে দেখে আমার চেহারার সাথে সাদৃশ্য খুঁজে বেড়াচ্ছে, “বাপের লাহান নাক পাইছে পোলায়।” গ্রামের বালক-বালিকারা মায়ের কোমর ছেড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে জমিদারবাড়ির সীমানায়। কেউ কেউ হেমন্তকালেও গাছে উঠে আম-কাঁঠালের সন্ধান করছে, এবার জ্যৈষ্ঠে আমার কোনো ফল আর পচবে না। গ্রামের কোনো কাটা ঘুড়ি আর অনাথ হবে না।
হেমন্তের বিকাল ফুরিয়ে আসছে, নদীর পার ধরে একটা বাঁশের খাটিয়া বহন করে মহিমগঞ্জের দিকে যাচ্ছে একদল লোক, সবার পায়ে তাড়া, বুকে পণ—”মাইয়াডারে বাঁচাইতেই হইবো।” খাটিয়া কাঁধে নেওয়ার জন্য মানুষের অভাব নেই, মহিলারাও মাথায় কাপড় টেনে পেছন পেছন আসছে। মহিমগঞ্জ পর্যন্ত তুলে দিয়ে যেতে চায় তারা, ফুলমতী কারো বারণ শোনেনি, সে যাবে হাসপাতাল পর্যন্ত। জমিদারবাড়িতে কিছু মহিলা মঞ্জুবালার হাতে-পায়ে তেল ঘষছে। সর্দারপাড়ার ইমাম সাহেব চলে এসেছেন, তিনি খাটিয়ার পাশে হেঁটে হেঁটে দোয়া পড়ছেন, তাকে দেখতে এখন আর অত অহংকারী লাগছে না।
দিনের শেষ আলোয় হীরা চোখ মেলে মাঝে মাঝে আমাকে দেখছে, আমি এদিক-সেদিক তাকিয়ে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছি। হীরা আমাকে কাছে ডেকে দুর্বল গলায় বলল, “আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন, আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখছি, এখন আমি শান্তিতে মরতে পারব।”
আমি মাথা নাড়ালাম শুধু, কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। লালচে সূর্য ডুব দিচ্ছে কালো গ্রামের আড়ালে। সামনে মহিমগঞ্জ বাজারের বটগাছটা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। হীরার অচেতন দেহটা দুলছে বাঁশের খাটিয়ায়, তার ফ্যাকাশে মুখে লেগে আছে প্রশান্তির হাসি।
***
