ডাকনাম ভুলে গেছি – ১৩

তেরো

পলাশপুর থেকে মহিমগঞ্জ বাজার পর্যন্ত সড়কটা সম্প্রতি পাকা হয়েছে। আকাশ অবিরাম কেঁদেও পথের কালো দেহটাকে কাদা বানাতে পারে না আর। পিচের রাস্তার ওপর বিচিত্র যানবাহনের প্রচলন শুরু হয়েছে, বাজারের এক কোণে তিন চাকার হলুদ জন্তু হামা দিয়ে বসে থাকে। ছয়জন মানুষকে একসাথে গিলে বিকট শব্দে গ্রামের নীরবতা খান-খান করতে করতে ছুটে যায়। ভ্যান, ঠেলাগাড়ি কিছুই এই যন্ত্রদানবের সাথে পেরে ওঠে না। মালবাহী নৌকাগুলোর কদর কমে গেছে, তারা খালি পেটে উদাস হয়ে ঘাটে অনিশ্চয়তার সাথে দুলতে থাকে। যেখানে নদী পৌঁছেছে, কিন্তু হৃদয়হীন শক্ত কালো পথটা পৌঁছাতে পারেনি, সেইটুকু জলপথের ওপর ভরসা করে তারা এখনো টিকে আছে। নৌকার পেট খালি হলেও ট্রাকের পিঠ ভরে উঠেছে মালপত্রে, পিঠে করে সে এক টুকরো শহর নিয়ে আসে প্রতিদিন।

বিদ্যুৎ আসার পর বাজার থেকে সন্ধ্যা বিদায় নিয়েছে। উইপোকার মতো মানুষজন সন্ধ্যার পর নিজেদের অন্ধকার গ্রাম থেকে বের হয়ে বাজারের আলোর চারপাশে জড়ো হয়। বিদ্যুতের আলোতে লোকজন বাজারটাকে জোর করে গভীর রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখে। টেলিভিশনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বাজারে, সুস্থমানুষ বাকপ্রতিবন্ধীদের মতো হা করে চোখ গেঁথে রাখে কাচের পর্দায়। রূপালি এন্টেনা নিজের হাড়গোড় মেলে অদৃশ্য তরঙ্গ ধরার ফাঁদ পেতে রেখেছে। স্থিরচিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এখন হাঁটাচলা করতে শিখেছে, ভিসিআরের দোকানে ক্যাসেটের বাক্সে এনে বন্দি করে তাদের ভাড়া দেওয়া হয়। গ্রাম থেকে চাঁদা তুলে যুবকেরা ভিসিআর, টেলিভিশন, ব্যাটারি মাথায় তুলে নিয়ে যায়। সাথে নিয়ে যায় বাচ্চাদের জন্য দুইটা ‘ফাইটিং ফিলিম’, মহিলাদের জন্য দুইটা ‘সামাজিক কান্দইন্যা ফিলিম’ আর একান্তই তাদের নিজেদের জন্য একটা ‘ইয়ে ফিলিম’।

বাজারে অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বেড়েছে, এখান থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার বেশি দূরে না, গলা উঁচু করে তাকালে ইন্ডিয়ার সবুজ পাহাড় দেখা যায়। রাস্তা পাকা হয়ে যাওয়ার পর পথ পেয়ে শহর থেকে সব চোরাকারবারিরা এসে হাজির হয়েছে। সীমানার এপার-ওপারে কতকিছু যে লেনদেন হয়! নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে অস্ত্র, মাদক, গরু, ছাগল, এমনকি মানুষ পর্যন্ত পাচার করা হয় এই বর্ডার দিয়ে। প্রায়ই বর্ডার পাহারা দেওয়া বাহিনী পিঠে সটান হয়ে থাকা বন্দুক ঝুলিয়ে দোকান হাতিয়ে যায়। তেমন কিছু পাওয়া যায় না, শুনেছি এইসব অর্থের লভ্যাংশ তাদের দৃষ্টি ক্ষীণ করে রাখে। কত লোক চাষবাষ ছেড়ে দিয়ে এপার-ওপার করে ‘লাল’ হয়ে গেছে। তাদের ঘর পাকা হয়েছে, আগের বউ পুরোনো হয়ে যাওয়ায় বউ নবায়ন করেছে, গায়ে উজ্জ্বল পোশাক চড়িয়ে চাষাবাদের ইতিহাস ঢেকেছে, বিড়ির জায়গায় আঙুলের ফাঁকে এখন ফিল্টার সিগারেট পোড়ে। বাজারে এমন বেশ কয়েকটা উদাহরণ চোখের সামনে ঘুরঘুর করতে দেখে অন্যদের উদ্দীপনা বাড়ে।

চোর রশীদ মিয়াকে সেদিন দেখলাম একটা উৎকট রঙের রোদচশমা পরে সন্ধ্যাবেলা বাজারের নিষিদ্ধ অংশের দিকে যাচ্ছে। ‘বর্ডার ব্যবসায়’ রঙিন হয়ে যাওয়াদের মধ্যে সে অন্যতম। আগে যখন সে ছোটখাটো চুরি করে অবলীলায় স্বীকার করত, মানুষ তাকে তিরস্কার করত, করুণাও দেখাত। এখন মানুষ তাকে হিংসা এবং সম্ভ্রম করে, মোটরসাইকেলের তীব্র শব্দে নিজের সমৃদ্ধি ঘোষণা করতে করতে সে যখন বাজার পার হয়, এক কুড়ি সালাম জোটে তার। কিছু সালাম সে নীরবে প্রত্যাখ্যান করে, বাকিগুলো ঘাড় নেড়ে গ্রহণ করে।

সর্দারপাড়া মসজিদের ইমাম সাহেবের গাম্ভীর্যও তার মোটরসাইকেলের শব্দে স্নান হয়ে যায়। ইমাম সাহেবের অহংকারী মাথার পাগড়িটা রশীদ মিয়ার সামনে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে। রশীদ মিয়ার বদান্যতায় মসজিদের ভীত পাকা হয়েছে, ইমাম সাহেবের খাবারে আমিষ বেড়েছে, শয্যায় পেয়েছেন নরম গদি, দোয়ার ব্যবসা করে সাদামাটা বেতনের ওপর তিনি পেয়ে যান আকর্ষণীয় উপরি। রশীদ মিয়ার যেহেতু পাপের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ, দোয়াটাও তার বেশি প্রয়োজন। এমন গ্রাহকের প্রতি আবেগটাও তার অতিরিক্ত। একদিন আনমনে অসতর্কতায় ইমাম সাহেব বলে ফেলেছিলেন, “আহা! সবাই যদি রশীদ সাহেবের মতো হতো?”

অল্প কিছুদিনের মধ্যে গ্রামের অন্ধকারেও বিদ্যুৎ হানা দিলো। কানে ধরা বালকের মতো খাম্বাগুলো একটার পর একটা দাঁড়িয়ে পড়ল গাছের পাশে, মাঠের মাঝে। রোদে তারা হাসে না, বাতাসে তারা দোলে না, কানধরা বালকের মতো অবিচল দাঁড়িয়ে থেকে শান্তি ভোগ করছে। পাখিরা এইসব খাম্বাগুলোকেও অবহেলা করে না, উড়াউড়ি থেকে ক্ষণিক অবসর নিয়ে এখানে বসে পৃথিবীটাকে দেখে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা সভা বসায়, খোশগল্প করে, অথবা দুটি পাখি গা ঘেষাঘেষি করে প্রেম করে, অভিমান ভাঙে। নির্জীব খাম্বাগুলোকে এই পাখিদের দল কিছুটা প্রাণ দিয়েছে। সন্ধ্যায় অন্ধকারের পেট ফেঁড়ে আলো ফুটে উঠে গ্রামে, রাতের পাখিরা তখন বিভ্রান্ত হয়, পানকৌড়িটা ঘন-ঘন পথ হারায়।

গ্রামের প্রায় কেউই বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হলো না, শুধু আমিই অন্ধকার পুষে বিদ্যুৎহীন রইলাম। গ্রামবাসীর কাছে আমার বাড়িটা আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় এবং আরো বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠল। ঘরে ঘরে আলো পৌঁছালেও মানুষের মনের গহীনে যে অন্ধকার ঘাপটি মেরে পড়ে আছে, একশ ওয়াটের বাল্বও সেই অন্ধকারের নাগাল পেল না।

সেবার বসন্তে প্রচুর নতুন মুখ দেখলাম বাজারে। শীত শেষ হলেও তাদের গলা থেকে মাফলার নামে না, নাক-মুখ ঢেকে রাখে। মাফলারের ওপর এক জোড়া উদ্বিগ্ন চোখ ভয়ে ভয়ে পথ চলে। নিজেদের তারা যত ঢাকতে চায়, মানুষের কাছে ততই উদ্ভাসিত হয়। শহুরে চলাচল, কথাবার্তা, পোশাক-আশাক-সব কি একটা মাফলারে ঢাকা যায়? এই লোকগুলো কিছু পাচার করতে আসেনি, নিজেরাই পাচার হতে এসেছে। ঢাকায় নাকি মিলিটারি সরকার ক্ষমতায় বসেছে, রাজনীতির সুরক্ষা ছায়া মাথা থেকে সরে গেছে তাদের। বিভিন্ন মামলার আসামিরা এখন কোনোমতে ওপারে যেতে চায়, এপারের আইনের হাত সীমানা পেরিয়ে ওপারে যেতে পারে না। এই দেশের অপরাধী অন্য দেশে গিয়ে নিষ্পাপ হয়ে যায়। রশীদ মিয়াদের ব্যবসা আরো জমে ওঠে। অনিচ্ছুক গরু টেনে এনে যে লাভ হয়, ইচ্ছুক মানুষকে পার করে দিয়ে তারচেয়ে ঢের বেশি লাভ হয়। মহিমগঞ্জে অনেকগুলো ‘রশীদ মিয়া’র উদয় হলো, মাটির রাস্তায় মোটরসাইকেলের উৎপাত বাড়তে লাগল। সর্দারপাড়া মসজিদটি আগাগোড়া পাকা হয়ে গেল।

বাজারে এক পাক হাঁটলেই বহির্জগতের সমস্ত সংবাদ জানা হয়ে যায়। পুরো জগৎ যেন একটা পাগলা ঘোড়ায় চেপে বসেছে, কোন দিকে যাচ্ছে কেউ ধারণা করতে পারছে না। কিন্তু নদীটা পার হলেই দেখি আমার বাগানের গাছগুলো একই নিয়মে পায়ের নিচে ছায়া পেতে দাঁড়িয়ে আছে। বন আমার স্নেহ পেয়ে ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে আমার ঘরের দুয়ার পর্যন্ত চলে এসেছে। আমার পুকুরঘাটের চারপাশে পলাশ, কৃষ্ণচূড়া ফুটে আছে, নিচে ঝোপঝাড় আলোকিত করেছে দাঁতরাঙা, নয়নতারা, বনকামিনী, টগর। গাছে পাখি, জঙ্গলে পশু সেই আদি নিয়মে এখনো বসবাস করছে। বাগান-বন ভেদ করে আধুনিক পৃথিবী আমার এই প্রাগৈতিহাসিক জগতে প্রবেশ করতে পারে না। এখানে টেলিভিশনের চিৎকার নেই, কোনো পত্রিকা ভয় পরিবেশন করতে এখানে ঢুকতে পারে না, ইহজগতের সব হা-হুতাশ নদীর পারে এসে থমকে দাঁড়ায়। আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে পৃথিবীর কোনো ঝড় এসে ঢেউ তুলতে পারে না। কিন্তু কয়েকটা গাছ আর একটা ভূতের গল্প খুব বেশিদিন আমাকে বাইরের উত্তাল জগৎ থেকে পৃথক রাখতে পারল না।

সেদিন ভোরবেলা দরজা খুলে আমার চিরপরিচিত জমিদারবাড়ির মধ্যে একটা অপরিচিত অভিনব পদার্থ দেখে চমকে উঠলাম। বারান্দার একপাশে ইজিচেয়ারটা রেখেছি, মাঝে মাঝে রাতের বেলা বারান্দায় দুলতে দুলতে শৈশবের স্মৃতিতে দোল দেই। স্মৃতিগুলোকে আমি এভাবেই বাঁচিয়ে রাখি, এই স্মৃতিগুলো ছাড়া আমার আর কেউ নেই, তাই নিয়মিত তাদের পরিচর্যা করি। বারান্দার অন্যপাশে মার্বেলের পাথরের ওপর মাছ ধরার জাল, ফাঁদ, কান্তে, কোদাল ইত্যাদি সরঞ্জাম পড়ে আছে। বারান্দার যতটুকু ঐশ্বর্য ছিল, তা এই কোণে এসে আত্মহত্যা করেছে। কয়েকটা লতানো গুল্ম মসৃণ মেঝেটা আলতো ছুঁয়ে পরীক্ষা করছে, আমি শাসন করি কি-না, এইটুকু অপরাধের মার্জনা পেলে তারা আরো একটু অগ্রসর হবে, একসময় আঙিনার মতো পুরো বারান্দাটাই দখল করে ফেলবে। প্রতিদিন না দেখার ভান করে তাদের প্রশ্রয় দেই।

এইসব পরিচিত জড় আর জীবের মধ্যে অপরিচিত একটা অনুষঙ্গ আমাকে বিপর্যস্ত করে দিলো। দরজার ঠিক পাশে সৌন্দর্য আর জঞ্জালের মধ্যে সাম্য রেখে কী যেন একটা গুটিসুটি হয়ে পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি একমাথা কালো চুল বারান্দার চকচকে পাথরে দোয়াতের কালির মতো ছড়িয়ে আছে। আর একটা নারীমুখ সেই কলঙ্কের মধ্যে শিউলি ফুলের মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমার হৃৎপিণ্ড কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে রইল। একজন নারী সত্যিই আমার বারান্দায় শুয়ে আছে নাকি আমার চোখ প্রতারণা করছে? এমন অবিশ্বাস্য ঘটনায় আমি অভিভূত হয়ে রইলাম, ভূতের গল্পটা কি শেষ পর্যন্ত আমাকেও গ্রাস করল?

চুপচাপ বারান্দা থেকে নেমে আসলাম, চোখ দুটোকে আর প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, ঘুমভাঙা ঘোলা চোখে এমন ভ্রম মানুষের হতেই পারে, তার মানে এই নয় যে আমি কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। পুকুরঘাটে নিজের হাত-মুখ আর ভ্রান্তি সব ভালো করে ধুয়ে ফেললাম। ততক্ষণে সূর্য উঠে পড়েছে, বারান্দার সামনে সেই মেয়েটার অলীক অস্তিত্ব কুয়াশার মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা। ছায়া, অন্ধকার ছাড়া বিভ্রান্তি টিকে থাকতে পারে না, ভ্রম বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ এখন বারান্দাতে নেই, আমার মনেও নেই। তাই মেয়েটি যে বাস্তব থেকে তার গল্পে ফিরে গেছে তা নিয়ে আমার আর সন্দেহ রইল না।

বাড়ির সামনে বাঁধানো পথে দাঁড়িয়ে লতা-গুল্মের ফাঁক দিয়ে দেখলাম লুটিয়ে পড়া দেহটা ভাস্কর্যের মতো তেমনি পড়ে আছে। আমার পায়ে দ্বিধা ভর করেছে, ভারী লাগছে প্রতিটি পদক্ষেপ। আমার ঘরের এতগুলো বই আর নিজের বিবেচনার ভরসায় আমি বারান্দায় উঠে এলাম। মেয়েটা এতটাই চাক্ষুষ যে ভূত বলে তাকে এড়িয়ে যেতে পারলাম না। হাতে-পায়ে শুকনো কাদা, বোঝা যাচ্ছে নদী পার হয়েছে অনেক আগে। নিয়মিত বিরতিতে ফুলে ওঠা শরীর, ঠোঁটের কাছে মৃদু কম্পন, তার শুভ্র গালে ভেসে ওঠা লালচে শিরা আমাকে জানান দিচ্ছে এই দেহে প্রাণ আছে। মেয়েটার কানে ফুটো আছে, তাতে কোনো গয়না নেই, এক হাত খালি, অন্য হাতে আছে একটা সোনালি ঘড়ি। পোশাক দেখে তাকে গ্রামের মেয়ে মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে ভিসিআরের দোকানের সিনেমার পোস্টার থেকে একটু আগে নেমে এসেছে সে।

ভূত ভেবে এতক্ষণ আমি কিছুটা স্বস্তিতে ছিলাম, জানতাম যা কিছু দেখছি সবই চোখের ভুল, কিন্তু মেয়েটার মধ্যে যখন প্রাণের প্রমাণ পেলাম, তখন ভয় এসে আমাকে গ্রাস করল। উল্কাপিণ্ডের মতো কী একটা আপদ আমার দরজার সামনে এসে পড়ল! স্থবির হয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড সব স্থগিত হয়ে গেল। একটা ছোট টিকটিকি এসে মেয়েটার আঙুলে আলতো করে ঠোকর দিলো, আঙুল সামান্য নড়ে উঠল মেয়েটার, টিকটিকি নিজের ভুল বুঝতে পেরে আরো ক্ষুদ্র শিকারের সন্ধানে অন্যদিকে চলে গেল। মেয়েটা আরো কয়েকবার কেঁপে উঠল, দেহ আরো সংকুচিত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার চোখের পাপড়ি উন্মুক্ত হলো, শেষ বিকালের সূর্যের মতো দুটি রক্তাভ জমজ চোখ আমার দিকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ঠোঁট ফাঁক করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল মেয়েটা, একটা অর্থহীন গোঙানি বের হলো কেবল। তারপর আবার চোখ বন্ধ হয়ে গেল তার।

আমার তিন দশকের জীবনে মা ছাড়া আর কোনো নারীর সাথে নিবিড় যোগাযোগ হয়নি। বইপত্র পড়ে জেনেছি নারীরা রহস্যময়ী, কিন্তু সে রহস্য ভেদ করার মতো উপযুক্ত বই আমার আলমারিতে ছিল না, পৃথিবীর কোনো আলমারিতে আছে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বয়ঃসন্ধিকাল পার হয়ে যাওয়ার পর নারীদের নিয়ে আগ্রহটাও কমে গিয়েছিল। এখন দরজার সামনে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো শুয়ে আছে এক অদ্ভুত নারী, কী করব বুঝতে না পেরে চুপচাপ বসে রইলাম সেখানে, এমন অসহায় আর কখনো লাগেনি আমার।

আমার দরজায় যে অপ্রত্যাশিত অতিথির অবতারণা হয়েছে, সে সুস্থ নয়। যে রোগী, তাকে সেবা করাটাই কর্তব্য, তাকে ছুঁয়ে দিলে নারী-পুরুষের শিষ্টতার যে ব্যাকরণ আছে তার কোনো ক্ষতি হয় না। অনেক সাহস করে মেয়েটার কপালে হাত দিয়ে দেখলাম কপালে উত্তাপ বাসা বেঁধেছে। বারান্দাতেই আমি তার জন্য শয্যা প্রস্তুত করলাম, শীত নিবারণের জন্য উষ্ণ কাঁথায় ঢেকে দিলাম শরীরটা। মায়ের শুশ্রূষা করার অভিজ্ঞতা মনে সঞ্চয় করে রেখেছিলাম, সেটা কাজে লাগিয়ে মাথায় জলপট্টি চড়ালাম, রোগীর হজমের জন্য উপযুক্ত অর্ধতরল খাবার তৈরি করলাম। ইখলাক হোসেনের সাথে আয়ুর্বেদ চর্চা করেছিলাম কিছুদিন, সুতরাং ওষুধের অভাব হলো না।

হাঁস-মুরগিগুলোকে খোঁয়াড় থেকে মুক্তি দিতে আজ একটু দেরি হয়ে গেছে, খোঁয়াড়ের দরজা খুলে দিতেই আমার অর্কমণ্যতার প্রতি কর্কশ অভিযোগ জানাতে জানাতে তারা পুকুরঘাটের দিকে চলে গেল। সকালে উঠে যেসব গৃহপালিত উদ্ভিদকে পানি দেই, তারা আজ পিপাসার্তই রইল। যেহেতু তাদের ভাষা নেই, তারা নীরবেই আমার অবহেলা সইলো। একটা বই পড়তে শুরু করেছিলাম, ভীষণ উত্তেজনার একটা মুহূর্তকে সামনে রেখে গতকাল বইটাকে বন্ধ করে রেখেছিলাম, আজ সময় নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে পড়ব বলে। সেই উত্তেজনা মুখ বন্ধ করে আমার বিছানার একপাশে পড়ে আছে। বনের পাখিরা আমাকে না দেখে নিশ্চয়ই বিস্ময়ে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। একজন অচেতন মানবী আমাদের সুশৃঙ্খল জগতের সব নিয়ম এলোমেলো করে দিয়েছে।

বারান্দায় মেয়েটার মাথার কাছে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছি আমি। সূর্য তার সমস্ত আয়োজন গুটিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। আমার কাছে এখনো সবকিছু অবাস্তব লাগছে, আগন্তুকের মাথার কাছে বসে সামনে গাছপালা, বাগান-সবকিছু অপরিচিত লাগছে। স্বপ্নটা কখন ভাঙবে, সে আশায় বসে আছি। মেয়েটার ঠোঁটে এখনো সজনেপাতার রস শুকায়নি, কাঁথাটাকে একটু নামিয়ে দিয়েছে, মনে হয় কাঁথার সাথে জ্বরটাও নেমে যাচ্ছে। মেয়েটাকে দেখে এখন অচেতন লাগছে না, মনে হচ্ছে দীর্ঘ যাত্রা শেষে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। যদি এই অপার্থিব মুহূর্তগুলো সত্য হয়, তবে মেয়েটার জন্য অনেকগুলো প্রশ্ন আর আমার জন্য বিস্তর বিপদ অপেক্ষা করছে।

বিকালের স্নিগ্ধ রোদ মেয়েটার ডান হাতে এসে পড়ল, শুকনো কাদা অনেকটাই মুছে গিয়ে ধুলো হয়েছে। রোদের এই নরম উষ্ণতায় মেয়েটা নড়ে উঠল। তার কপালের তাপ শুষে নেওয়া ভেজা কাপড়টা পুরুষ্ট জোঁকের মতো খসে পড়ল। ডিম ফুটে ছানা বের হওয়ার আগে ডিমের খোসাটা যেমন নড়ে ওঠে, তেমন করে চোখের চামড়া নড়ে উঠল মেয়েটার। চোখ খুলেই এত আলো সইতে না পেরে আবার বন্ধ করে ফেলল, তারপর সতর্কতার সাথে ধীরে ধীরে আবার চোখের পলক আলগা করতে থাকল। কাত হয়ে থাকা মুখটা সামনে তাকিয়ে সোনালি রোদে দুলতে থাকা বনটাকে দেখল, বন তার সারা অঙ্গে ফুলের গয়না পরে আছে। মেয়েটা ফুলের দিকে তার বিষণ্ণ আর অবসন্ন চোখ দুটো পেতে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ ঘোরাতেই আমাকে আবিষ্কার করল, মুহূর্তেই চমকে উঠে বসে পড়ল সে। আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে দুই হাত উঠিয়ে নাকের নিচ থেকে শরীরের অধিকাংশটাই ঢেকে ফেলল। হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার পর তার ভয়ার্ত খোলা চোখ দুটো আমাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। এত সুন্দর প্রকৃতির মধ্যে আমার মতো অপ্রাকৃতিক বস্তু দেখে ভয় পাবারই কথা।

দখিনা বাতাস আমার বারান্দার মঞ্চে টান-টান উত্তেজনাটা বুঝতে না পেরে আপনমনে মৃদু মৃদু বয়ে যাচ্ছে, তার কোনো হুঁশ নেই। বাইরে বসন্ত তখনো ফুরিয়ে যায়নি, শিরীষগাছের মাথায় বসে একটা কোকিল অবিরাম সঙ্গিনীকে আহ্বান জানাচ্ছে। চারদিকে জারুল, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু রং ছড়াচ্ছে। মেহগনিগাছের মতো নিরস গাছও নতুন কচি সবুজ পাতায় সেজেছে। আমাদের দুই নর-নারীর সংকটের সাথে প্রকৃতি ঠিক তাল মিলাতে পারছে না।

চারদিকে আরো একবার তাকিয়ে মেয়েটা আমার মুখের ওপর চোখ স্থির করল। তারপর বহুকষ্টে প্রথম যে অর্থবোধক প্রশ্নটা সে আমাকে করল, তা হলো, “আমি কি মারা গেছি?” আমাকে কি মৃত্যুর মতো ভয়ানক দেখাচ্ছে? মেয়েটার দৃষ্টির সামনে আরেকটু সংকুচিত হয়ে গেলাম। মাথা নেড়ে জানালাম, আমি যমদূত নই, সে জীবিত আছে। জাউ রান্না করেছিলাম সকালে, তার জেগে ওঠার অপেক্ষায় কয়েকবার গরম করেছি, এখন আবার ঠান্ডা হয়ে গেছে। সেই ঠান্ডা জাউয়ের বাটিটা এগিয়ে দিলাম তার দিকে। মেয়েটা জাউয়ের বাটিটার দিকে বিভ্রান্তি নিয়ে তাকালো একবার, কিন্তু স্পর্শ করল না। তার জীবিত থাকার ব্যাপারে সে এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না। পায়ের কাছে কাঁথাটা পরখ করল, ঠান্ডা মার্বেলের কঠিন দেহটা ছুঁয়ে দেখল, বারান্দার ইজিচেয়ারটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল অনেকক্ষণ ধরে। এটা স্বর্গ নাকি নরক তা যাচাই করছে বোধহয়। আমাকে দেখেই নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার কথা, এটা স্বর্গ কোনোমতেই হতে পারে না। নিজের গায়ে স্পর্শ করে ধুলোকাদা দেখে তার বোধহয় কিছু মনে পড়েছে। সে চমকে আরেকবার আমার দিকে তাকালো, আমাকে নিয়ে তার সংশয় এখনো দূর হয়নি। আমি জাউয়ের বাটিটা আরেকটু ঠেলে দিলাম। বললাম, “কিছু খাওয়া হয়নি আপনার।”

মেয়েটা বিস্মিত দৃষ্টিতে চারপাশে দেখতে লাগল। তারপর বলল, “আমি ভেবেছিলাম এখানে কেউ থাকে না।” মেয়েটার ভুল ভেঙেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার জড়োসড়ো ভাব দেখে মেয়েটা বোধহয় কিছুটা আশ্বস্ত হলো, অথবা তার ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে, বাটিটা সে তুলে নিলো। কেউ খাচ্ছে-এই দৃশ্য যে এত সুন্দর হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। ভদ্রতা ভুলে হা করে মেয়েটির খাওয়া দেখছি। রূপালি চামচে সাদা জাউভাত তার ঠোঁটের ফাঁকে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। অর্ধেকটা খেয়ে বাটিটা নামিয়ে রাখল মেয়েটা। খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে গেছে সে, অবসন্ন শরীরটা আবার এলিয়ে পড়ল মার্বেল পাথরে। কাঁথাটা নিজের গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল, “বোধহয় জ্বর আসছে আবার।” এইটুকু বলে আমার কোনো উপদেশ, পরামর্শ কিংবা অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। এরকম পরিস্থিতিতে কর্তব্য ঠিক করতে না পেরে আমিও চুপচাপ বসে রইলাম। এই সময় অবিবেচকের মতো সূর্যটা ডুবে গেল।

রাতে মেয়েটার জ্বর বেড়ে কাঁপুনি শুরু হলো, জলপট্টিতে কপাল ঢাকলাম, সজনেপাতার রস ঢেলে দিলাম মুখে। একটা পীড়িত নারীকে বারান্দায় রেখে ঘরে গিয়ে আরামের শয্যা গ্রহণ করার মতো কাপুরুষ আমি নই। আবার অচেতন অপরিচিত একজন নারীকে তার অজান্তে ঘরে নিয়ে যাওয়ার মতো বীরপুরুষও আমি ছিলাম না। তাই বারান্দার ইজিচেয়ারে শুয়ে রইলাম। এতদিন মশার দল আমার মশারির ভেতরে প্রবেশাধিকার না পেয়ে বাইরে ঘুরে ঘুরে অনেক বৃথা আস্ফালন করেছে, তাতে ভ্রূক্ষেপ না করে আমি মশারির সুরক্ষায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। আজ আয়ত্তে পেয়ে সব উপেক্ষার প্রতিশোধ নিচ্ছে তারা, এতদিনের যত দেনা ছিল এক দিনেই সব মিটিয়ে নিচ্ছে। যত সঙ্গীত তাদের ব্যর্থ হয়েছে, আজ আমার কানের কাছে গুনগুন করে সব সার্থক করে নিচ্ছে। জ্বরের ঘোরে মেয়েটা মশার অত্যাচার টেরও পাচ্ছে না, বসে বসে আমিই সমস্ত শান্তি ভোগ করলাম। অবশেষে ধূপ জ্বালালাম, কিন্তু জঙ্গলের অত বড় বড় মশা ধূপের ধোঁয়াকেও পরোয়া করে না। তবুও হাত-পা, নাক-মুখ ঢেকে মশার হিংস্রতা থেকে নিজেকে কিছুটা রক্ষা করলাম। মেয়েটা জ্বরের ঘোরে মাঝে মাঝে কাতরে উঠছে, কপালটা মুছে দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপশম করতে পারলাম না।

সারারাত মশা আর জ্বরের সাথে যুদ্ধ করার পর একসময় বীভৎস রাতটা শেষ হলো। ভোরের আভাস পাওয়ামাত্র মশারা সব পালিয়ে গেছে; বনের গাছপালা, পাখি সবাই জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। একসময় মেয়েটাও জেগে উঠল, নিজেকে আরো একবার আবিষ্কার করল অপরিচিত জায়গায়। তারপর বিভ্রান্তির কুয়াশা সরে গিয়ে যখন উপলব্ধি এলো, তখন জিজ্ঞাসা করল, “সন্ধ্যা হয়ে গেছে?” একটা রাত একই বারান্দায় পার করে, মেয়েটার শুশ্রূষা করার পর আমার সংকোচ কিছুটা শিথিল হয়েছে। তার দিকে না তাকিয়েই বললাম, “সন্ধ্যা হতে দেরি আছে, সবে মাত্র ভোর হয়েছে।”

মেয়েটা বিস্ময়ে লজ্জায় বিষণ্ণ হয়ে রইল। তারপর কুণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি সারারাত এখানে ছিলেন?” আমি কিছু বললাম না। মেয়েটা আবার বলল, “আপনাকে খুব সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছি, আমার ভীষণ খারাপ লাগছে।” বললাম, “আরেকবার জ্বর আসার আগেই আপনার বোধহয় ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।” মেয়েটা কিছু একটা চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এই মুহূর্তে ডাক্তারের কাছে যাওয়া সম্ভব না।” বললাম, “তাহলে অন্তত বাড়ি চলে যাওয়া উচিত আপনার। সেবাযত্ন দরকার আপনার, তাছাড়া বাড়ির লোকজন নিশ্চয়ই আপনার জন্য দুশ্চিন্তা করছে।” মেয়েটার কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল, অসহায় ভঙ্গিতে বলল, “বাড়ি ফিরে যাওয়াও সম্ভব না।”

“কেন?”

মেয়েটি চুপ করে রইল। জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার বাড়ি কোথায়?” মেয়েটি কোনো জবাব দিলো না, আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “এখানে কীভাবে এলেন?” মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে রইল। কোনো প্রশ্নেই তার নীরবতার পাথরটাকে টলাতে পারলাম না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি জেরা শেষ করলাম। তখন মেয়েটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, “বাড়িতে আর কাউকে তো দেখলাম না।”

“কারণ বাড়িতে আর কেউ নেই,” বললাম আমি।

“আপনার স্ত্রী-সন্তান নেই?”

“না।”

“বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ আছে?”

“না, এখানে আমি একাই থাকি।”

কণ্ঠে হতাশা মিশিয়ে মেয়েটি একটি ধ্বনিই উচ্চারণ করল, “ও।”

তারপর আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম, একটা অস্বস্তিকর নীরবতা আমাদের দুজনের মাঝে ঝিম মেরে বসে রইল। এদিকে আমার দিন চলে যাচ্ছে, কাজকর্ম সব আমার প্রতীক্ষায় বসে আছে। বালিশের পাশে উল্টানো বইটা অপেক্ষা করছে, মাচাটা ভঙ্গুর হয়ে গেছে, নতুন করে বাঁধতে হবে। মাছ ধরার জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছিলাম, সেটার খোঁজখবর নেওয়ার সময় পাইনি এখনো, গাছের ফোকরে টিয়া পাখি ডিমে তা দিচ্ছে, বাচ্চা ফুটে বের হলো কি-না জানা হলো না। পুকুরঘাটটা নিঃসঙ্গ হয়ে মন ভার করে রেখেছে, ঘাটে গিয়ে একটা কর্মহীন দুপুর কাটানোর অবসর আমার হচ্ছে না। অবশেষে আমিই নীরবতা ভাঙলাম, বললাম, “দেখুন, আমি এখানে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করি, কেউ আসে না এখানে। আপনি কীভাবে এলেন জানি না, আপনার শরীরটা যেহেতু একটু ভালো এখন। আপনার চলে যাওয়া উচিত।”

মেয়েটি কিছু বলল না, তার অসুস্থ চোখের কোণে জল জমে টলোমলো করছে। অনেকক্ষণ পর হাতের উল্টোপিঠে অশ্রুটাকে নামিয়ে এনে বলল, “আমি ভীষণ বিপদে পড়েছি।” আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটি মাথা নিচু করে বসে রইল। বিপদের কথা সে বলতে চাচ্ছে না। আমারও যে প্রচণ্ড আগ্রহ আছে তা নয়, মেয়েটি চলে গেলেই স্বস্তি পাই। তাকে বারান্দায় রেখে কিছু খাবার নিয়ে আসলাম, এক বাটি চাল ভাজা আর সেদ্ধ ডিম। “নিন, কিছু খেয়ে নিন, পেটে খাবার গেলে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারবেন। বিপদে খালি পেটে থাকা ঠিক না,” সামনে খাবার রেখে বললাম আমি।

“আমার ক্ষুধা নেই,” বনের দিকে তাকিয়ে বলল মেয়েটা।

“ক্ষুধা তো অবশ্যই আছে, কিন্তু রুচি নেই। একটু জাউ ছাড়া কিছুই খাননি আপনি।”

মেয়েটা নিতান্ত অনিচ্ছায় এক মুঠো চালভাজা খুব ধীরে ধীরে চাবাতে লাগল। বহুকষ্টে গিলে বাটিটা সরিয়ে দিলো। বললাম, “ডিমটা খেয়ে নিন।”

“সিদ্ধ ডিম আমি খেতে পারি না, বমি আসে।” মেয়েটা তার অনীহা জানালো।

রোদ গাঢ় হয়েছে ততক্ষণে, বারান্দাটা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মেয়েটার মুখের বিষণ্ণতা আরো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, বিষণ্ণ নারীদের দেখলে যে এত পবিত্র লাগে, সেই খবর আগে জানা ছিল না আমার। বনের মধ্য থেকে মেছোবাঘটা একবার উঁকি দিয়ে বারান্দায় কী ঘটছে বোঝার চেষ্টা করল, মেয়েটির চোখ পড়ায় ঝট করে ডুব দিলো ঝোপের মধ্যে। মেয়েটি আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করল, “ওটা কী?” সাহস দিয়ে বললাম, “ও কিছু না, বাঘ।”

“কী বলছেন এসব!” মেয়েটার কণ্ঠে আতঙ্ক।

“হ্যাঁ, কিন্তু ভয় পাবেন না, এটা মেছোবাঘ। গ্রামের লোকেরা দেখলে পিটিয়ে মেরে ফেলে, তাই এখানে আশ্রয় নিয়েছে। ওরা আপনাকে কিছু করবে না, ওদের নজর আমার হাঁস-মুরগির ওপর।” মেয়েটার ভয় তাতে কাটল না, ‘বাঘ’ শব্দটা বোধহয় তার মনে গেঁথে গেছে। আর্তনাদ করে বলল, “ও মাগো! সারারাত আমি এই খোলা বারান্দায় ছিলাম।”

তার অমূলক ভয় দূর করার চেষ্টা করে বললাম, “বারান্দায় কেন, বনের মধ্যে গিয়ে বসে থাকলেও ওরা আপনাকে কিছু করবে না। শেয়ালের পাল্লায় পড়লে অবশ্য ভিন্ন কথা, তবে শেয়ালের দল এখন পর্যন্ত বারান্দায় ওঠেনি, আমার সাথে ওদের সমঝোতা আছে।” মেয়েটার মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “শেয়ালও আছে?” “আছে এক পাল, রাতের বেলা বের হয়ে নদীর ওপারে গোরস্থানে চলে যায়, সেখানে লাশ-টাশ খায়। ভোরে আবার এখানে চলে আসে। কোনো অসুবিধা করে না আমার। এমনিতে বনের কোনো পশুই আমার ঘরে এসে ঢোকে না, তবে মাঝে মাঝে ইঁদুর ধরতে সাপ-টাপ উঠে আসে।”

চোখ গোল গোল করে মেয়েটা বলল, “সাপ!” এইটুকু উচ্চারণ করেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল মেয়েটা। এত আশ্বস্ত করার পরও মেয়েটা অকারণে কেন এত ভয় পাচ্ছে বুঝতে পারলাম না। নারীজাতি আসলেই রহস্যময়। মেয়েটাকে বারান্দায় রেখে আমি মাচা বাঁধতে গেলাম, পুকুরে পাতা ফাঁদ থেকে কয়েকটা টাকি, কই নিয়ে ফিরলাম। মেয়েটা তখনো সংকুচিত হয়ে বসে আছে। রোদের দিকে তাকিয়ে দিনের আয়ু মাপলাম, রোদের পাহারায় মেয়েটাকে বিদায় দিতে পারলে মনে কোনো খেদ থাকবে না। মেয়েটাকে বললাম, “বাজারে ফোনের দোকান আছে, আপনি চাইলে পরিচিত কাউকে ফোন দিতে পারেন।” মেয়েটার চেহারায় অসহায়ত্ব ফিরে এলো, চোখ দুটো আবার সজল হলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কাঁদছেন কেন?” মেয়েটা চোখ মুছে বলল, “আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।”

“তাহলে?”

“আমি জানি না।”

“আপনি আরেকটু ভাবুন, আমি রান্না করতে যাই।”

“প্লিজ যাবেন না, আমার ভয় করছে।”

“আমাকে ভয় করছে না?”

“না।”

“কেন?”

“জানি না। আপনাকে ভালো মানুষ মনে হচ্ছে।”

“এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক না।”

“জানি, কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করা ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই।”

আর কিছু বললাম না। রান্নাঘরে গিয়ে বহুদিন পর পাতিলে দুজনের ভাত বসালাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *