ছাব্বিশ
আরমানিটোলার চার্চের সামনে হাঁটছি, আকাশে গাঁথা আছে সাদা ক্রুশ, আমার হাতের মধ্যে একটা ছোট শিশুর হাত, মনে হচ্ছে মুঠোতে একটা চড়ুইপাখি নড়ছে। আমার হাঁটুর আড়ালে শিশুটি ঢাকা পড়েছে। চার্চের সামনের রাস্তাটা পার হতেই সামনে এসে হাজির হলো গভীর একটা কুয়া। আমার হাত থেকে চড়ুইপাখিটা উড়ে গেল। কুয়ার পাশে শাকের দাঁড়িয়ে আছে ধুতি পরে। তার পাশে একজন বাচ্চাটাকে ধরে রেখেছে কুয়ার ওপরে, যে-কোনো মুহূর্তে ছেড়ে দিবে, আমি দৌড়ে তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু যেতে পারছি না। অবশেষে যখন কাছে গিয়ে পৌঁছালাম তখন দেখলাম, যে লোকটা বাচ্চাটাকে কুয়ার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে সে আমি নিজে।
ঠিক তখন জেগে উঠলাম। চোখ খুলতেই ভোর এসে সামনে দাঁড়ালো। বনের সবুজ জাগতে শুরু করেছে, বটগাছটা চুল মেলে দিয়ে বসেছে, তার সন্তানেরা ক্ষুধায় কিচিরমিচির করছে তাকে ঘিরে। উঠে বসে দেখি ধূসর বিছানায় আমি একা, বৃদ্ধ লোকটা কখন যেন চলে গেছে। আমার গা জড়িয়ে আছে বাবার গেরুয়া চাদর।
পশ্চিমের শালগাছের নিচে এখনো ঘুমাচ্ছে রুবেল, ঘুমালে সব মানুষকেই অসহায় দেখায়। আমি তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে ডাকলাম। রুবেলের খোলা চোখে বিভ্রান্তির পর্দা, একবার আমার দিকে চেয়ে দেখল, তারপর তাকালো আশেপাশে, গালে তার ধুলো লেগে আছে। বিভ্রান্তির পর্দাটা সরে যেতেই গতরাতের স্মৃতি ফিরে এলো, চোখ তার সরু হলো। তাকে বললাম, “চলেন রুবেল ভাই, আমাকে একটু আরমানিটোলা নামিয়ে দিয়ে আসুন।”
রুবেল মাটি থেকে উঠে তার শার্টের ধুলো ঝেড়ে নিলো। ধুলো ঝাড়ার ফাঁকে আমাকে দেখে নিলো কয়েকবার। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। জঙ্গলের রাস্তায় আমরা পাশাপাশি হাঁটছি, আমাদের দুজনের মাঝে নীরবতার দেয়াল। জঙ্গলে হাঁটতে গিয়ে আমার ইখলাক হোসেনের কথা মনে পড়ল। আমি নীরবতা ভেঙে রুবেলকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাই, আপনার কাছে কিছু টাকা হবে?”
রুবেল থমকে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “কয় ট্যাকা?”
“বেশি না, অল্প কিছু হলেই চলবে, একটা বই কিনব।”
রুবেল কিছু বলল না আর। চুপচাপ হাঁটতে লাগল। বন আর লোকালয় পার হয়ে আমরা আবার রাস্তায় উঠে আসলাম, রাস্তার পাশে রুবেলের মোটরসাইকেলটা তখনো কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুবেল মোটরসাইকেলটার ঘাড় সোজা করে এক লাথি দিয়ে সেটাকে জাগিয়ে তুলল। ইঞ্জিনের গর্জনের মধ্যে রুবেল আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “মোটরসাইকেলে বমি করেন?”
“জানি না, কখনো চড়িনি,” বললাম আমি।
রুবেলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল, একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলল, “আইচ্ছা উডেন।”
মোটরসাইকেল ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে চলতে শুরু করতেই আমার পেটে শূন্যতা টের পেলাম। গতির সাথে তাল মিলাতে না পেরে পেছনে ছিটকে পড়ে যাচ্ছিলাম, পতন ঠেকানোর জন্য রুবেলের শার্ট খামচে ধরলাম।
আরমানিটোলা যাওয়ার পথে একটা বইয়ের দোকানের সামনে এসে মোটরসাইকেল থামালো রুবেল। পকেট থেকে পাঁচশ টাকার নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, “দেরি কইরেন না, আমি খাড়াইলাম।” যেন আমাকে টয়েলেটে পাঠিয়ে সে বাইরে অপেক্ষা করছে। বইয়ের দোকান থেকে একটা মোটা প্যাকেট হাতে বেরিয়ে আসলাম। হাতে অবশিষ্ট অনেকগুলো নোট, দোকানদার ছোট হতে বড় ক্রমে সাজিয়ে দিয়েছে। রুবেলের দিকে নোটগুলো বাড়িয়ে দিতেই সে পকেট থেকে চাবি বের করে মোটরসাইকেলে চড়তে চড়তে বলল, “উডেন।” টাকাগুলো আমার হাতেই রইল।
মোতালেব কাকার বাড়ির সামনে আমাকে নামিয়ে দিলো রুবেল। তাকে টাকাগুলো দেখিয়ে বললাম, “কী করব এই টাকা দিয়ে?”
“বই কিনবেন।”
রুবেল চেষ্টা করল তার কণ্ঠে যেন কোনো আন্তরিকতা প্রকাশ না পায়, তার চেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। “রুবেল ভাই, সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব, কোথাও যাব না। আপনিও বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিন।” আমিও আন্তরিকতা দেখালাম। রুবেল মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে চলে গেল, মনে হয় না সে বাড়ি ফিরে যাবে, গলির মুখে চায়ের দোকানে বসে চোখ পেতে রাখবে এই গলিতে।
মোতালেব কাকার ঘরের তালাটা একপাশের আঙটায় মুখ বুজে আছে। খুব বেশি কাজে লাগে না তালাটা। যারা খালি ঘরে ফিরে আসে তাদের বহন করতে হয় চাবির ভার, ইখলাক আসার পর মোতালেব কাকা সেই ভার থেকে মুক্তি পেয়েছে। ইখলাককে বসিয়ে দরজা খোলা রেখেই মসজিদে যায় মোতালেব কাকা, ফিরে এসে একটা মানুষ পান তিনি, দরজা খুললেই শূন্য ঘর হাহাকার করে ওঠে না।
আমি ঘরে ঢুকতেই মোতালেব কাকার উৎকণ্ঠা ভরা মুখ দেখতে পেলাম, “কই ছিলা, বাপ? তোমার চিন্তায় সারারাইত ঘুম আহে নাই।” মোতালেব কাকার কণ্ঠে অভিযোগের চেয়ে মায়া বেশি। হয়তো এমন মায়ার জন্য কিংবা কারো চোখের অপেক্ষার জন্যই মানুষ ঘরে ফিরে।
“আমি আজ চলে যাব, কাকা, এখানে আমার কাজ ফুরিয়েছে।”
একটা কালো ছায়া পড়ল মোতালেব কাকার মুখে। দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, “মওলানা?”
“তাকে আমার সাথে নেওয়ার উপায় নেই, কাকা।”
মোতালেব কাকার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, “কুনো সমস্যা নাইকা, মওলানা আমার লগে থাকবো, অরে আমি ডাক্তর দেখামু।” তারপর কৈফিয়তের সুরে বলল, “মওলানা মানুষ রাস্তায় ল্যাংটা হইয়া ঘুরবো, কেমন দেহা যায় কও?”
ইখলাক হোসেন জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যে জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির নালা আর রান্নাঘরের ভেন্টিলেটর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। প্যাকেট খুলে ফেলুদা রাখলাম তার পাশে। সে চেয়েও দেখল না, বাইরে নালায় তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। সারাদিন নানাভাবে চেষ্টা করলাম বইটা যাতে তার চোখে পড়ে, কিন্তু কিছুতেই তার জড় দুই চোখে প্রাণের দেখা পেলাম না। সন্ধ্যায় তাকে বসিয়ে ‘বাদশাহী আংটি’ পড়ে শোনালাম কিছুটা। এখনো অনেক পৃষ্ঠা বাকি, হায়!
আমার আর সময় নেই, যে-কোনো সময় গেটের বাইরে রুবেলের মোটরসাইকেল তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডাকবে আমায়। বইটা বন্ধ করে রাখলাম, চোখ বুজলাম, যে অন্ধকার আমি সারারাত খুঁজে বেড়িয়েছি দেখলাম চোখ বুজলেই সেই অন্ধকার পাওয়া যায়। হঠাৎ কানে এলো কাগজের খসখসে শব্দ। চোখ খুলে দেখি নগ্ন ইখলাক আঙুল দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। যেন সে কিছু একটা খুঁজছে, কালো অক্ষরগুলো তাকে কোনো গল্প শোনাতে পারছে না, শিশুর সারল্য নিয়ে সে পাতা উল্টিয়ে যাচ্ছে। তার চোখের তারার গভীরে একটা নিভু নিভু প্রদীপ দেখতে পেলাম আমি। ঠিক তখন হর্ন বেজে উঠল।
মোটরসাইকেল ছুটছে অবাধ্য ষাঁড়ের মতো। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় অন্য যানবাহনগুলো ঈর্ষা নিয়ে তাকাচ্ছে আমাদের দিকে। রাগী বাতাস আমার চোখে-মুখে ঝাপটা দিচ্ছে। আমার চুল উড়ছে ঝড়ের কবলে যেভাবে উড়ে নারকেলগাছের পাতা। জামাকাপড়ের ফাঁকফোকরে বাতাস ঢুকে পুরো শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাবার চাদর হাতের নিচ দিয়ে দুইপাশে উড়ছে, নিজেকে পাখি মনে হচ্ছে, আর ভয় লাগছে না।
বৃক্ষহীন দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামল মোটরসাইকেল। এই বাড়ির দোতলার ফুল আর বনসাই দিয়ে ঘেরা একটা ঘরে বসে আমরা সিদ্ধান্ত নিবো, ফল দেওয়ার আগেই কীভাবে একজন ফুলবতীকে হত্যা করা হবে। একটা খুন জমিদারবাড়িকে নির্বাসনে রেখেছে বহু বছর। আরেকটা খুনের ধকল কি সেই বাড়ি সইতে পারবে? আবারও পুনরাবৃত্তি হবে অভিশাপের? সব জমিদাররা কলঙ্ক মুছে ফেলতে চায়, কিন্তু কেউই হাত নোংরা করতে চায় না।
শাকের সাদা পাঞ্জাবি পরে ডেস্কে বসে আছে, আজ হয়তো কোথাও জনতাকে বোকা বানানোর জন্য এই ছদ্মবেশ নিয়েছে সে। সামনের চেয়ারে বসতে ইশারা করল আমায়।
“আপনাকে দেখতে অন্যরকম লাগছে, কী যেন একটা বদলে গেছে আপনার চেহারায়,” সংকুচিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল শাকের।
“আপনাকেও দেখতে অন্যরকম লাগছে, অনেক বেশি সৎ আর পবিত্র দেখাচ্ছে।”
আমার কন্ঠে হয়তো কিছুটা বিদ্রুপ ছিল, শাকের মুচকি হাসল। “না, না, কিছু একটা চেইঞ্জ তো আছেই।” তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে আবিষ্কারের তৃপ্তি ফুটে উঠল তার চেহারায়। “ইয়েস, আপনার চেহারায় আজ কোনো ভয় নেই।”
“সাধু এবং প্রেমিকদের কোনো ভয় থাকে না।”
“আপনি কোনটা?”
“হয়তো দুটোই।”
শাকের ভ্রূ উঁচিয়ে মাথা দোলালো, “এই গেরুয়া চাদরে আপনাকে সাধুর মতোই লাগছে।”
“এটা আমার বাবার চাদর।”
“ইউ হ্যাভ অ্যা ফাদার?” কৌতূহল ঝরে পড়ল শাকেরের কণ্ঠে।
“আই হ্যাড অ্যা ফাদার।”
“ওহ, আই অ্যাম সরি, তিনি কি সাধু ছিলেন?”
“হ্যাঁ, ছিলেন, তারচেয়েও বেশি ছিলেন প্রেমিক,” কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম আমি।
শাকেরের কাছে এগুলো সবই ভূমিকা, সে চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা ‘হোয়াটএভার’ উচ্চারণ করে সম্পূর্ণ আলাপটাকে অর্থহীন করে দিলো। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞাসা করল, “যাক, আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?”
“হ্যাঁ, নিয়েছি।” দৃঢ় কণ্ঠে জানালাম।
শাকের দুই হাত ডেস্কের ওপর রেখে আমার দিকে একটু ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করল, “হোয়াট উইল ইট বি?”
“পিস্তল।”
শাকেরের ঠোঁট প্রসারিত হয়ে গেল। বাতাসে হাতের মুঠো শক্ত করে হাসিমুখে বলল, “দ্যাট’স মাই ম্যান, দিস ইজ মাই ফেবারিট কিলিং ওয়েপন। আগেরদিনে দেখতেন না, বন্দুক হাতে রাজা-বাদশারা চ্যালাচামুন্ডা নিয়ে শিকারে যাচ্ছে। আঙুলের একটা ছোট্ট মুভমেন্টে বাঘ-ভালুক ধরাশায়ী হয়ে যাচ্ছে, নিজেকে খুবই পাওয়ারফুল মনে হয় তখন। কয়েকদিন কোমরে পিস্তল গুঁজে রাখলে শুধু গুলি করতে মন চায়। সেজন্যই আমি এই জিনিস সাথে রাখি না। তবে আপনার জন্য আমি একটা আনিয়ে রেখেছি। একেবারে নতুন মেশিন, ফুল অটোমেটিক।”
শাকের তার ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটা রূপালি রঙের ঝকঝকে পিস্তল বের করে আনলো। ডেস্কের ওপর রেখে আমার দিকে তাকিয়ে আমার চোখে প্রশংসা আর বিস্ময় খুঁজতে লাগল, যেন কোনো কৃপণ বাবা তার সন্তানকে প্রিয় খেলনা কিনে দিয়েছে। “খুবই স্মুদ মেশিন, জ্যাম হবে না, মেইনটেইন করা ইজি, অপারেট করা আরো সহজ, সেফটি খুলে শুধু ট্রিগার চাপবেন। ইট’স পারফেক্ট ফর ইউ।”
পিস্তলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটার দেহের দিকে মুগ্ধনয়নে দেখতে লাগল শাকের। “নিন, হাতে নিয়ে দেখুন।” ডেস্কের ওপর অস্ত্রটা রেখে আমার দিকে ঠেলে দিলো শাকের। কাচের মৃদু চিৎকারে পিস্তলটা আমার সামনে এসে থামল। মানব সভ্যতার অন্যতম লজ্জাজনক আবিষ্কারটা তার শরীরটা পেতে দিয়ে রেখেছে আমার হাতে ওঠার জন্য। আমার বুকের ভেতর থেকে কে যেন বলছে, ‘ছুঁয়ো না, তুমি খুনি নও’। অস্ত্রটা হাতে নিলাম, আমি জানতাম না পিস্তল এত ভারী হয়। আমার মাথায় তখনো বেজে চলেছে, ‘তুমি খুনি নও।’
পিস্তলটা হাতে তুলে নিতে দেখে শাকেরের মুখে স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল, পালকিতে তুলে দেওয়ার পর কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মুখে যেমন স্বস্তি দেখা যায়।
“সেফটি জিনিসটা কী?” জিজ্ঞাসা করলাম।
আমার কৌতূহল দেখে শাকের খুশি হলো। পিস্তলের গোড়ার দিকে একটা ছোট ধাতু দেখালো আমায়, জানালো এটাও একধরনের তালা, দিয়ে না রাখলে দরজা খোলা পেয়ে কখন গুলি বেরিয়ে যাবে ঠিক নেই। “ইট’স মাই গিফট টু ইউ, ফার্স্ট অফ মেনি। মেশিন ফুল লোড করা আছে, স্পেয়ার বিচি চাইলে বলবেন, বস্তা ভরে দিয়ে দিবো।”
“বিচি?” অবাক হলাম আমি।
“আরে, গুলি। কিন্তু আমার মনে হয় নির্ঝঞ্ঝাটভাবে কাজটা করতে চাইলে প্রথমে ড্রাগ ইউজ করাই ভালো। তাও আনিয়ে রেখেছি আপনার জন্য।”
মাথায় তখনো বেজে চলেছে ‘আমি খুনি নই’। পিস্তলের ঠান্ডা দেহটা আরো শক্ত করে ধরলাম। আমার মনে হলো পানিতে ডুব দিয়েছি আমি, শাকেরের কথা বুদবুদের মতো অস্পষ্ট শোনাচ্ছে, চারদিক ঘোলা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ‘আমি খুনি নই’ এই কথাটাই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। একটু অন্ধকার দরকার আমার, চোখ বন্ধ করলাম। যে হাতে পিস্তলটা ধরে আছি, সেখানে টের পেলাম চড়ুইয়ের ছোঁয়া। বুকটা কেঁপে উঠল, লম্বা শ্বাস নিয়ে চোখ খুললাম, শাকের কথা বন্ধ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
“কী হয়েছে, হাসান সাহেব, আর ইউ অলরাইট?” জানতে চাইল সে।
“নো, আই অ্যাম নট অলরাইট।”
শাকেরের দিকে পিস্তলের নলটা তাক করে সেফটি সরালাম। বললাম, “এখন যদি ট্রিগার চাপি, কী হবে তাহলে?” মনে হলো আমার ভেতর থেকে অন্য কেউ জিজ্ঞাসা করল।
“আপনার সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
শাকেরের চোখে কাঁটা গজিয়ে উঠল। নলের দিকে তাকাচ্ছে না সে, আমার চোখের দিকে চেয়ে আছে।
“কিন্তু হীরা বাঁচবে, তার শিশুটা জন্ম নিবে।”
“আপনি তাহলে প্রেমিক, আপনাকে জ্ঞানী ভেবেছিলাম। প্রেমিকরাই এমন বোকা হতে পারে।”
“প্রেম ছাড়া কেউ জ্ঞানী হতে পারে না।”
“কে বলেছে?”
“আমার বাবা।”
“শুনুন, হাসান সাহেব, আমার ওপর এর আগে চারবার অ্যাটাক হয়েছে, তিনবার গুলি লেগেছে আমার গায়ে, নো বুলেট ক্যান কিল মি,” আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল শাকের। তার চেহারায় ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই।
“আপনি একটা কথা ঠিক বলেছেন, শাকের সাহেব।”
“কী কথা?”
“সবার মধ্যে একটা খুনি আছে।”
শাকের কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই প্রচণ্ড শব্দে ঘরের বনসাইগুলো কেঁপে উঠল। ফুল আর পারফিউমের সুবাস চাপা পড়ে গেল বারুদের গন্ধে। পিস্তলটা গর্জন করে উঠেই আমার হাত থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। তারপর সব শান্ত, স্থির; পৃথিবী যেন থমকে গেছে। বারুদের ধোঁয়া মিলিয়ে যেতেই দেখলাম টেবিলের ঐপাশে শূন্য চেয়ারটা কাত হয়ে পড়ে আছে, একটা বিদেশি বনসাই তার সমস্ত আভিজাত্যসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, টেবিলের নিচ থেকে একটা রক্তরেখা অন্ধের মতো আমার জুতার নিচে এসে পথ খোঁজার চেষ্টা করছে।
পায়ের বুড়ো আঙুলে রক্তের উষ্ণ স্পর্শে বুকে আটকে পড়া শ্বাসটা বেরিয়ে এলো, আমি আবার জীবন্ত হলাম। যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছি, রুবেলের বিভ্রান্ত চোখটা আমাকে দেখল একবার, তারপর ছুটে গেল ওপরে। অনন্তকাল ধরে আমি হেঁটেছি তারপর। বুড়ো আঙুলের রক্ত জুতার সাথে লেগে চট-চট করছিল, পথে জুতা বিসর্জন দিলাম, খালিপায়ে ধুলো মেখে কেবল হাঁটতে লাগলাম। নাকে এখনো বারুদের গন্ধ পাচ্ছি আর হাতে লেগে আছে স্বপ্নের শিশুর কোমল স্পর্শ।
