ডাকনাম ভুলে গেছি – ১৭

সতেরো

বাংলাদেশের ডিঙি ইন্ডিয়ায় রয়ে গেল, রশীদ মিয়াকে রেখে এলাম নদীর ভেজা মাটিতে। আকাশের দিকে পাতা মুখে শেষ সিগারেটে টান না দিতে পারার আক্ষেপ, ঠোঁট দুটো অল্প ফাঁক হয়ে আছে। চোখ তার স্বচ্ছ মার্বেল হয়ে গেছে, দৃষ্টি স্থির এবং ঠান্ডা। আমি ভুলে গেছি মৃত মানুষের চোখের পাতা নামিয়ে দিতে হয়, রশীদ মিয়া নদীর পাশে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে। আমি আর হীরা নিজেদের ভেজা দেহগুলো টেনে নদীর পারে তুললাম, আমাদের বিধ্বস্ত পা এবড়ো-খেবড়ো মাটির পথে বারবার টলে যাচ্ছিল। হীরা পেট চেপে ধরে বমি করেছে দুইবার, প্রতিবার মনে হয়েছে সে বোধহয় আর দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু সে মুখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছে প্রত্যেকবার, পা বাড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। শরীর তাকে দমাতে চেয়েছে, কিন্তু সে হারেনি। তার পা যতই টলোমলো হোক, কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা। এমন শক্তি বোধহয় কেবল মায়েদেরই থাকে।

রাত কত গভীর আমাদের কোনো ধারণা ছিল না, আমরা ফসলের মাঠের পাশে হেঁটেছি, ঘুমন্ত বাড়িঘর পার হওয়ার সময় মানুষের নিঃশ্বাস শুনেছি। বাঁশঝাড়, তেঁতুলতলা, বটতলার জমাট অন্ধকার পার হয়েছি। আকাশের চাঁদ ছাড়া এই অভিযাত্রার আর কোনো সাক্ষী ছিল না। আমাদের পায়ের জুতা কোন দেশে খসে পড়েছে তা জানি না, পথের ধুলো কাদা হয়ে পায়ে লেগে যাচ্ছে, ঘাসের ডগা মেখে যাচ্ছে সেই কাদায়, আমরা থামিনি, শুধু হেঁটে চলেছি। জমিদারবাড়ির ঘন গাছপালা আকাশের একপাশটা অন্ধকার করে রেখেছে। দূর থেকে বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছে একটা নির্জীব মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের নিঃশ্বাস না থাকলে বাড়িও মরে যায়।

পরদিন দুপুরে জোহরের আজানের আগে সর্দারপাড়া মসজিদের মাইকে বেজে উঠল শোকসংবাদ। শহর থেকে উচ্চ কম্পাঙ্কের মাইক কিনে এনেছিল রশীদ মিয়া নিজেই, আজ সেই মাইকে তার মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। মানুষের মৃত্যুর মধ্যেও উৎসবের উপাদান আছে, আর উৎসবের আকর্ষণ মানুষ এড়াতে পারে না। লাশের খবর পেয়েই বিকাল হতেই দেখলাম দূরে গ্রামের পথে পিঁপড়ার সারির মতো মানুষ গঞ্জের দিকে যাচ্ছে। আমি আমার মনের ভেতর ধসে পড়া দালানের মতো স্তূপ হয়ে পড়ে আছি, রশীদ মিয়ার মৃত্যুর জন্য হয়তো আমিও কিছুটা দায়ী। হীরাও হয়তো কোথাও বসে নিজেকে জোড়া লাগাচ্ছে, গতরাতের পর তাকে আর দেখিনি আমি। রশীদ মিয়ার লাশটার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কোনো অর্থ নেই, তবুও আমি নদী পার হলাম, পিঁপড়ার ভিড়ে সামিল হলাম। গঞ্জে ঢুকতেই দেখলাম ঘোমটা পরা মহিলারা শকুনের মতো বসে আছে। লাশ ঘিরে অসংখ্য মাথা জটলা করছে, মহিলারা কাছে ঘেঁষার সুযোগ পাচ্ছে না। লাশ তারা কতই দেখেছে, নিজেরা প্রত্যেকে এক-দুইটা সন্তানের লাশের ওপর আছড়ে কেঁদেছে, তবুও লাশ দেখার শখ তাদের মেটে না, বিশেষ করে মর্গ ফেরত লাশ। কাটা লাশ দেখে আজ রাতে তারা ভয়ে ঘুমাতে পারবে না, এইটুকু ভয় সংগ্রহ করতেই শাশুড়ি আর স্বামীর বারণ উপেক্ষা করে দূরের গ্রাম থেকে হেঁটে এসেছে তারা। লাশ থাকলেও এখানে কোনো বিলাপ নেই। রশীদ মিয়ার দূরসম্পর্কের আত্মীয়েরা এসে সম্পত্তির হিসাব মিলাচ্ছে। বাজারে পুলিশের নীল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, উর্দি পরা পুলিশ একটু পর পর বাঁশি বাজিয়ে লাঠি উঁচু করে মানুষ তাড়াচ্ছে। চৌকোনা ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে সাংবাদিকেরা ঘুর-ঘুর করছে, তাদেরকে একবারও ছবি তুলতে দেখিনি আমি, একটু পর পর প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালাচ্ছে। গ্রামের উঠতি বয়সি ছেলেরা সাংবাদিকদের আশেপাশে মাছির মতো ঘুরছে, ক্যামেরা দেখে তাদের ছবি তোলার শখ হয়েছে। চায়ের দোকানে লাইন ধরে চা খাচ্ছে মানুষ, ক্লান্ত কেতলিটা আগুনে পুড়তে পুড়তে কালো হয়ে গেছে। ঝালমুড়ি, চানাচুর, বাদামওয়ালারা বেচে কুলাতে পারছে না। পুলিশের বড় কর্তার সাথে নিচু গলায় কথা বলছে চেয়ারম্যান সাহেব। লোকটা কথা বললেই মনে হয় কোনো ষড়যন্ত্র করছে। রশীদ মিয়ার নিঃসঙ্গ মোটরসাইকেলটা কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুলায়মানের চায়ের দোকানের সামনে, পুরো বাজারে শুধুমাত্র এই মোটরসাইকেলটাকেই কিছুটা শোকগ্রস্ত লাগছে।

আমি যখন গঞ্জ থেকে বের হচ্ছি তখন পেছনে হ্যান্ডমাইকে কাতার সোজা করার আহ্বানের সাথে পুলিশের বাঁশি ধমকে উঠছে বারবার। বাড়ি ফিরে দেখি একটা বিধ্বস্ত জাহাজের মতো হীরা বারান্দায় বসে আছে। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো ছেঁড়া পালের মতো উড়ছে, চোখ-মুখ পুরুষ্ট ফলের মতো ফুলে আছে। চোখ দুটো যেন হা হয়ে থাকা ঠান্ডা চুলা, ছাই ছাড়া আর কিছু নেই। কোনো সংকোচের পর্দায় সে নিজেকে লুকালো না আর। আমার দিকে চেয়ে বলল, “রশীদ মিয়াকে দেখে এলেন?”

“না, দেখিনি। লাশ দেখার জন্য মানুষের উৎসাহ আমার চেয়ে বেশি।”

“লোকটা আমাকে মা ডেকেছিল, আর আমার কারণেই তাকে মরতে হলো।”

হীরা দেয়ালে মাথাটা ঠেকিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। তার বন্ধ চোখ উপচে এক ফোঁটা অশ্রু বেরিয়ে এলো। বিগলিত কণ্ঠে হীরা বলল, “এই দুঃখ আমি ভুলতে পারছি না।” বাজারে শত শত লোকের কারো চোখে আমি অশ্রু দেখিনি, কারো কথায় কোনো ব্যথা খুঁজে পাইনি। এই পৃথিবীতে রশীদ মিয়া মানুষের নিগ্রহ, গালি, মেকি সম্মান, হিংসা আর ঘৃণা নিয়েই বেঁচে ছিল। মৃত্যুর পরও কাছের মানুষের এক ফোঁটা অশ্রু সে পায়নি। তার জন্য কাঁদল শহুরে এক নারী। রশীদ মিয়া হীরাকে অপমান করতে চেয়েছিল, সে-কথা হীরা ভুলে গেছে। তার শুধু মনে আছে সেই ‘আম্মাজি’ ডাক। নারীরা খুব সহজে ক্ষমা করে দিতে পারে।

“হাসান সাহেব, আমাকে কি খুব খারাপ মেয়ে মনে হচ্ছে?” মাথা তুলে জিজ্ঞাসা করল হীরা। তার প্রশ্নে খানিকটা বিদ্রুপ আছে, এমন প্রশ্নের কী উত্তর দেওয়া যায়, আমি ঠিক করতে পারলাম না। বললাম, “আমি আপনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না, একজন নারী ছাড়া আপনাকে আর কিছুই মনে হচ্ছে না।”

রোদের আলো গুটিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে সূর্য, সারা বিকাল খেলা করে দিনের শেষে বাতাস কিছুটা থমকে গেছে। সন্ধ্যার ছায়া পড়েছে হীরার মুখে। “আপনাকে সব বলব আজ। সন্ধ্যা হয়েছে, ভালোই হলো। দিনের আলোতে বসে হয়তো নিজের কথা আমি আপনাকে বলতে পারতাম না,” বাইরের দিকে চোখ রেখে বলল হীরা। “আমার মা ছিল যাত্রাদলের মেয়ে, বাবাকে কখনো দেখিনি আমি।”

এই ছিল তার ভূমিকা, তারপর সে বলে গেল তার আত্মকথা। যাত্রাদলের যেসব মেয়েরা ঢিল দিয়ে রঙিন শাড়ি পরে, উঁচুস্বরে গান গায়, চিৎকার করে জানায় প্রেম আর দুঃখের কথা, মঞ্চে সতী-সাধ্বী হিসেবে তাদের যত সুনাম, মঞ্চের পেছনে অসতী হিসেবে তাদের ততই বদনাম। টাকার বিনিময়ে তারা সুলভ, অনেকেই প্রেমে পড়ে তাদের, ঘরে নেয় না কেউই, হীরার মা তাদেরই একজন। মঞ্চে তার নাম মঞ্জুবালা, রঙিন নামের আড়ালে বাপ-মায়ের দেওয়া সাদা-কালো নামটা হারিয়ে গেছে বহু আগে। বাবার নাম ছাড়া তেমন কিছু জানে না হীরা, শুধু জানে লোকটা ছিল যাত্রাদলের গুরুত্বহীন এক বংশীবাদক। এই বংশীবাদকই কলুষিত করেছে যাত্রাদলের রাজকুমারীকে। হীরা পেটে আসার পর যাত্রাদলের কাছে মঞ্জুবালার বাণিজ্যিক কোনো গুরুত্ব আর রইল না, দল তাকে ছেঁটে ফেলে নির্দয়ভাবে। অথচ তার রূপ বেচে দল বড় হয়েছে, সিনেমার নায়িকা হওয়ার সম্ভাবনা তার ছিল। ঢাকাই ছবির এক পরিচালক তার অভিনয় দেখে তাকে পঞ্চাশ টাকার নোটের সাথে দিয়েছিল নতুন সিনেমায় কাজ দেওয়ার আশ্বাস। বংশীবাদকের হাত ধরে মঞ্জুবালা যখন ঢাকায় আসে তখন তার পেটে সাত মাসের হীরা, হাতে অল্পকিছু সঞ্চয় আর মনে সেই আশ্বাস। পরিচালক মঞ্জুবালার স্ফীত পেট দেখে ভীষণ বিরক্ত হলো। নায়িকা হওয়ার শখ নিয়ে ঢাকায় আসায় করল বিস্তর তিরস্কার। প্রতিভার এমন অপচয়ে ক্ষুদ্ধ হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করল, “পেট বাঁধছিস ভালো কথা, খসালি না কেন?”

আলিমন বেগম কোনো কৈফিয়ত দেয়নি, চুপচাপ চলে এসেছিল। তার তরুণ স্বামীটিকে দিয়েছিল রোজগারের তাগিদ, বাঁশি বাজানো আর নারীদের মন হরণ করা ছাড়া আর কোনো কাজ স্বামীটি জানে না, টাকা রোজগারের ভার মঞ্জুবালার ওপর দিয়ে সে এতদিন নিশ্চিন্তেই ছিল। হঠাৎ এই উৎকট অনুরোধে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কয়েকদিন এভাবেই পার হয় তাদের। এক রাতে গর্ভবতী স্ত্রীকে বংশীবাদক সান্ত্বনা দেয়, আদর করে ঘুম পাড়ায়। মঞ্জুবালা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার বিছানা খালি, খাটের নিচে যে টিনের তোরঙ্গ ছিল, তা অট্টহাসির ভঙ্গিতে হা হয়ে আছে। তোরঙ্গে তার কাপড়চোপড় সবই আছে, শুধু সারাজীবনের সঞ্চয়টাই নেই। স্বামী তার গভীর রাতে উপার্জন করেছে বহু টাকা। সেদিন মঞ্জুবালা উপলব্ধি করেছে, নারীরা মহাপাপী, তাদের সবচেয়ে বড় পাপ পুরুষদের বিশ্বাস করা।

হীরার জন্ম হয়েছিল বর্ষাকালে, ঢাকার কড়াইল বস্তির এক ঝুপড়ি ঘরে। সিঁদকাটা চোরের মতো চালের ফুটো দিয়ে গলে ঘরে ঢুকে পড়েছিল বৃষ্টি, ভেজা কাদার মধ্যে প্রায় একা একা হীরাকে জন্ম দিয়েছিল তার মা। তারপর বড় করেছে একা একাই। সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেছে সে, কিন্তু চোখ থাকত সবসময় নায়িকাদের দিকে। তীব্র আগ্রহে সে নায়িকাদের চলন-বলন আর তাদের দেমাগ দেখে যায়। নায়িকারা কথা বলে শুদ্ধ ভাষায়, ইংরেজি দুই-একটা শব্দ জানা থাকলে তাদের কদর বেড়ে যায় বহুগুণ। ঘরে এসে হীরাকে সব রপ্ত করাতো সে। হীরাকে সে ছোটবেলা থেকেই একটা কথা শিখিয়ে আসছে, “তোর কারণে আমি নায়িকা হতে পারি নাই, কিন্তু আমার কারণে তুই নায়িকা হবি।”

হীরাকে ভর্তি করানো হলো সম্ভ্রান্ত স্কুলে। বস্তির ঝুপড়ি ঘর ছেড়ে তারা উঠল পাকা দালানে। এত খরচ কীভাবে সামলাত তার মা, হীরা জানত না। শুধু দেখত ঘরে প্রায়ই তার মায়ের বন্ধুরা আসছে, তখন হীরাকে বাইরে গিয়ে একা একা পুতুল খেলতে হতো। হীরা তার মায়ের পেট খামচে অনেকটুকু রূপই কেড়ে নিয়েছিল, তবুও কিছু ছিল বাকি, সেটুকুই বিক্রি করে হীরাকে যুবতি করেছে তার মা। অবসর সময়ে হীরাকে সিনেমার শ্যুটিং দেখতে নিয়ে যেত তার মা। নায়িকার চেয়ারটা দেখিয়ে তাকে বলত, ঐটা হচ্ছে তোমার গন্তব্য। হীরা চেয়ে দেখত সানগ্লাস চোখে একটা অহংকারী পুতুল বসে আছে সেই চেয়ারে। তার পাশে আয়না হাতে মেকাপম্যান ঘন ঘন তার গালের ঘাম মুছে দিচ্ছে, পাউডার দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে মুখের যাবতীয় কলঙ্ক, জুসের গ্লাস হাতে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে সন্ত্রস্ত প্রোডাকশন বয়, আরো কয়েকজন আজ্ঞাবহ হুকুমের অপেক্ষায় সটান দাঁড়িয়ে আছে। বোতাম খোলা শার্ট গায়ে দিয়ে পাশে বসে আছে এক লোমশ পুরুষ, সে হচ্ছে সিনেমার নায়ক, একটু পর পর পুতুলটার কানে সে কী যেন মন্ত্র পড়ছে, পুতুলটা হেসে গড়িয়ে পড়ছে। হাসার কারণে যেটুকু মেকাপ খসে পড়েছে তা ঢাকতে মেকাপম্যান আবার তৎপর হচ্ছে।

হীরার নায়িকা হতে ইচ্ছা করে না। তার ভালো লাগে সেইসব মেয়েদের, যাদের কোনো কিছু হওয়ার তাড়া নেই। তারা জানে না তারা কী হতে চায়, তারা মুক্ত পাখি, একটা অনিশ্চিত ডালে বসার আগে তারা ইচ্ছামতো উড়তে পারে। তারা দলবেঁধে ঝালমুড়ি খায়, চামড়ার রঙের কথা চিন্তা না করে রোদে ঘুরে বেড়ায়, বাবার মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি ফেরে, মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটের সাথে চোখাচোখি করে। হীরার কোনো বন্ধু হয়নি, তার মা শিখিয়েছে—নায়িকাদের কোনো বন্ধু হয় না, শুধু ভক্ত হয়। তার মা তাকে পরিচর্যা করে আরো রূপসী করে তুলেছে, অথচ তাকে জানিয়ে দিয়েছে—এই রূপ শুধু ভক্তদের মন ভোলানোর জন্য, কাউকে সমর্পণ করার জন্য নয়। কলেজে পড়ার সময়েই হীরা তার মায়ের সাথে প্রোডিউসারের অফিসে যাওয়া আসা শুরু করেছে। সিনেমায় কাজ না পেলেও অল্প বয়সেই সে বেশ কয়েকটা বিজ্ঞাপনের কাজ করেছে। নামের আগে যোগ হয়েছে উঠতি মডেলের তকমা। শাড়ি, মেলামাইন প্লেট, চিপসের বিজ্ঞাপনে তাকে দেখা যায় টেলিভিশনের পর্দায়। মোটামুটি বিখ্যাত ম্যাগাজিনে ইতোমধ্যে ছাপা হয়ে গেছে তার সচিত্র সাক্ষাৎকার। সব তদারকি করেছে তার মা। তার নায়িকা হওয়ার পথে একটার পর একটা ইট বিছিয়ে গেছে মঞ্জুবালা। সুন্দরী মেয়েদের দিকে পুরুষদের যে সহজাত লোভী দৃষ্টি তা একাই প্রতিহত করেছে সে। পুরুষদের অবিশ্বস্ততা নিয়ে মঞ্জুবালা প্রতিনিয়ত মেয়েকে দীক্ষা দিয়ে গেছে। প্রেমকে এত নিগ্রহ করেছে যে প্রেম নিয়ে হীরার মনে এক ধরনের নিষিদ্ধ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভুল না করলে নারীজীবন সম্পূর্ণ হয় না। একটা ভুল করার জন্য মনে মনে ছটফট করতে থাকে সে।

হীরার কলেজের সামনে কৃষ্ণচূড়াগাছটা এবং তার নিচে মঞ্জুবালা স্থিরচিত্রের মতো প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকত। কলেজে আসা-যাওয়ার পথে ছেলেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকত হুড তোলা রিকশার দিকে। হীরার মা সারা রাস্তা এইসব প্রণয়প্রার্থী যুবকদের কটাক্ষ বিতরণ করতে করতে আসত। ঘরে তাদের কোনো সিটকিনি ছিল না, এমনকি বাথরুমেও না। মেয়ের শরীরে হলুদ-চন্দন মেখে দেয় মঞ্জুবালা, তারপর নিজ হাতে সাবান মেখে গোসল করায়।

হীরা বলে, “মা, আমার লজ্জা লাগে।”

মঞ্জুবালা নির্বিকার, জানায়, মায়ের কাছে মেয়ের আবার লজ্জা কী! হীরা কী খাবে, কী পরবে, কীভাবে হাসবে—সব তার মা ঠিক করে দেয়। শ্যুটিংয়ে কিংবা প্রোডিউসারের অফিসে মাকে ছাড়া কোথাও একা দেখা যায় না তাকে। হীরার চারদিকে কাচের দুর্গ তুলে রেখেছিল তার মা। কিন্তু বেহুলার লোহার বাসরেও সাপ ঢুকেছিল। মন তো সর্বনাশী, শাসনে কবে সে বশ মেনেছে! নিষেধ-আপত্তির দুর্ভেদ্য দুর্গ তাকে আটকে রাখতে পারেনি। একটা ঢেউ এসেই সব প্রতিজ্ঞা, সব শিক্ষা মুছে দিয়ে যায়।

হীরা দেখেছে তার কলেজের রুক্ষ-কঠিন যে মেয়েটি ভালোবাসার নাম শুনলেই নাক সিটকাত, কোনোদিন কারো প্রেমে পড়বে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল, সেই মেয়েটিও ছন্নছাড়া এক যুবকের জন্য বিষ খেয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষে পড়া কোনো মেয়েকে কলেজে ক্লাসে পাঠিয়ে যখন তার মা পানির বোতল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই হাস্যরসের জন্ম দেয়। দুষ্ট মেয়েরা তাকে দেখলেই জিজ্ঞাসা করে, “এই, তুমি নাকি এখনো বুকের দুধ খাও, সত্যি?”

হীরা এড়িয়ে যায়, গাম্ভীর্যে নিজেকে ঢেকে রাখে সবসময়। কিন্তু হাসিমুখে এইসব উপহাসে যোগ দিতে তারও ইচ্ছা করে, টাক মাথার নিজাম স্যারকে নিয়ে একটা ব্যঙ্গাত্মক ছড়া সেও লিখেছে, কাউকে শোনাতে পারেনি। যারা গোল হয়ে বান্ধবীর প্রেমের চিঠি পড়ে, সেই বৃত্তের অংশ হতে চায় সে, বিবাহিত মেয়েদের কাছে শুনতে চায় তাদের শাশুড়ির বদনাম। হীরা যে বড় হয়েছে তার অসংখ্য প্রমাণ তার শরীরে আছে, তবুও তার মা সেসব চিহ্নকে অস্বীকার করে। হীরা মাঝে মাঝে অভিমান করে, একা যেতে চায় কলেজে, কিন্তু তার মার কাছে সেসব অভিমানের কোনো মর্যাদা নেই, শিশুর আবদারের মতো সেসব উপেক্ষা করে মঞ্জুবালা। হীরা এখন মাঝে মাঝে অভিমানে মার সাথে কথা বলে না, মঞ্জুবালা তবুও তার সঙ্গ ছাড়ে না।

হীরার বিধ্বংসী কোনো কাণ্ড ঘটাতে ইচ্ছা করে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো একটা ছেলেকে চোখ টিপ মেরে অবাক করে দিতে ইচ্ছা করে, কলেজের মতিন স্যারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে, ক্লাস করানোর সময় তার দিকে তাকিয়ে আসলে কী দেখে? পেছনের পাঁচিল টপকে সরু গলিতে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটা খুব কষ্টে দমন করে সে। শেষ বেঞ্চের রুবিনাকে গিয়ে বলতে ইচ্ছা করে, তার চেয়ে ঢের বেশি অশ্লীল গল্প সে জানে।

স্বাধীনতা একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে এসে ধরা দেয়। মঞ্জুবালার কড়া প্রহরায় ব্যত্যয় ঘটে। মেয়েকে কলেজে ছেড়ে দিয়ে মঞ্জুবালা গিয়েছিল পরিচালক রফিক দেওয়ানের বাসায়। রফিক দেওয়ান তার নতুন সিনেমার জন্য একটা আনকোরা নতুন মেয়ে খুঁজছে। কিন্তু হীরা যেহেতু তখন দুই-একটা বিজ্ঞাপনে কাজ করে টেলিভিশনে চেহারা দেখিয়ে ফেলেছে, তাকে ঠিক আনকোরা বলা যায় না। মঞ্জুবালা বেশ কয়েকদিন যাবত রফিক দেওয়ানের সাথে দেখা করার জন্য ঘুরছে, হীরাকে যেন অডিশনে একটা সুযোগ দেওয়া হয়। অ্যাসিস্ট্যান্ট মালেক শেখ মঞ্জুবালাকে আশ্বাস দিয়েছে দেখা করিয়ে দিবে। আজ সেই দিন, মঞ্জুবালা আর মালেক শেখ বসে আছে রফিক দেওয়ানের ড্রয়িংরুমে। রফিক দেওয়ান এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি, তাই তাদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। মঞ্জুবালা ঘন ঘন ঘড়িতে দেখছে, মেয়ের ক্লাস বোধহয় এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এত কষ্ট করে একজন পরিচালকের সাথে দেখা করার সুযোগ পাওয়া গেছে, সুযোগটাকেও হেলা করা যাচ্ছে না। ড্রয়িংরুমে বসে মঞ্জুবালা ঘড়ির দৌড় দেখতে লাগল।

রফিক দেওয়ানের দীর্ঘ ঘুমের সুবাদে হীরা এক বেলার স্বাধীনতা পেল। ক্লাস শেষ করে এসে দেখল কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচটা অস্বাভাবিকভাবে শূন্য। এই স্বাধীনতার কী কী অপব্যবহার করবে হীরা ভেবে কূল পেল না। কলেজের গেইটের বাইরে পুরো দুনিয়া তাকে ডাকছে, চাইলেই সে যা খুশি দেখতে পারে, নিজেকে যতটুকু খুশি দেখাতে পারে। কলেজের গেইটের বাইরে পা দেওয়ামাত্র শহরের তীব্র কোলাহল তাকে জেঁকে ধরল। রিকশা, গাড়ি, পথচারী সবাই দিগ্বিদিক ছুটছে। ধুলো আর ধোঁয়াতে শহরের আকাশ ঘোলা হয়ে আছে। এই চঞ্চল, নির্দয় শহরে হঠাৎ তার ভীষণ অসহায় লাগতে লাগল, মায়ের কথা মনে হলো। মায়ের কী এমন হলো যে আজ আসলো না! দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। রাস্তায় অসভ্য চোখ লোভের জিহ্বা বের করে তাকে চেটে যাচ্ছে, মা পাশে থাকলে এইসব দৃষ্টি তাকে আহত করতে পারে না, কিন্তু আজ নিজেকে ভীষণ অরক্ষিত, খোলা মনে হচ্ছে। আকাশের ঘোলা চোখে কাঁটার মতো উঁচু দালান গেঁথে আছে, এখানে কোথাও নিরাপত্তা নেই। বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো সে। শহরে তার একাকী অভিযানের উচ্ছ্বাস কলেজের গেইটেই দম বন্ধ হয়ে মারা গেল।

তবুও আজ সে একজন সাধারণ মেয়ে হতে চায়, লোকাল বাসের ভিড়ের মধ্যে সে তার সহপাঠীদের একজন হয়ে উঠতে চায়। রাস্তার পাশে যেখানে মানুষের ঘনত্ব কিছুটা বেশি, সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় হীরা। উৎসুক চোখে সবাই চোখ পেতে রেখেছে পথে, একটা বাস দেখামাত্র নেমে যাচ্ছে কালো পিচে। মানুষের ঝুলন্ত হাত-পা বের হয়ে থাকে দরজা-জানালা দিয়ে। তবুও ঠেলাঠেলি করে মানুষ কীভাবে যেন সেসব বাসে গিয়ে ঢোকে, তারপর জাদুর মতো হারিয়ে যায় ভেতরে। চাকা আবার ঘুরতে শুরু করে, এক হাতে ঝুলতে ঝুলতে বাসের হেল্পার আরেক হাতে আরো লোকজনকে নির্লজ্জ আহ্বান জানায়। বাস চলে যায় আর ভিড় কমে, আবার কিছু মানুষ এসে যোগ দেয় ভিড়ে। হীরা দাঁড়িয়ে থাকে, বাসে ওঠার কনুইযুদ্ধে নামার সাহস তার হয় না। একটা ফাঁকা বাসের অভাবে সে ‘সাধারণ মেয়ে’ হয়ে উঠতে পারছে না।

তীর্যক রোদ এসে পোড়াতে থাকে হীরার মুখ, ঘামে শরীর চটচটে হয়ে যায়। রাস্তা থেকে ঢেউয়ের মতো ধুলো আছড়ে পড়ছে তার সারা দেহে। গাড়ি, রিকশা, ফুটপাতের দোকান, ডাস্টবিনে জমায়েত হওয়া কালো কাক, এই রাস্তায় সবাই সরব। হীরার মাথার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে সব শব্দ। মাঝবয়সি একটা লোক বিড়ালের মতো স্থির তাকিয়ে আছে তার দিকে, ঢোলা জিন্স পরা দুটো রোগা ছেলে কোমরে প্যান্ট ধরে রাখার কসরত করতে করতে তার সামনে দিয়ে চতুর্থবারের মতো হেঁটে গেল। শাড়ি গুটিয়ে পায়ের বীভৎস ক্ষতটা দেখিয়ে ভিক্ষা চাইছে একটা অল্পবয়সি ভিখারিনী। মায়ের কাচের দেয়ালের মতো নিরাপদ বেষ্টনীর বাইরে শহরের এই আকস্মিক নগ্ন আলিঙ্গন হীরা আর সইতে পারছিল না।

ঠিক তখন একটা লাল চকচকে গাড়ি এসে তার সামনে থামল। উপস্থিত সবাই আগ্রহী হয়ে উঠল, এখানে এমন গাড়ি থামে না সাধারণত। ভিখারিনী ভিক্ষা ভুলে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে, হয়তো ভাবছে, শাড়িটা আর কতটুকু উঠালে গাড়ির ভেতর থেকে তার ঘাঁ-টা দেখা যাবে। গাড়ির কালো কাচ সাপের মতো হিস-হিস করতে করতে নিচে নেমে গেল। ভেতরে একটা লোক, মুখটা ফর্সা, চোখ কালো সানগ্লাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে তাই বয়স মাপা যাচ্ছে না। তবে কানের কাছে কিছু পাকা চুল উঁকি দিচ্ছে। হীরার নাম ধরে ডাকাতে হীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, একটু শঙ্কিতও হলো। লোকটা তাকে তুমি করেই বলছে।

“তোমার মা নেই সাথে? আসো তোমাকে নামিয়ে দেই।”

হীরা নড়ল না, জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“আরে, আসো আসো, আমি তোমাকে চিনি, সামসাদ ভাইয়ের অফিসে তোমাকে দেখেছিলাম, তোমার সাথে তোমার মা ছিল।”

লোকটার কণ্ঠে কোনো আড়ষ্টতা নেই।

“এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না, পেছনে জ্যাম লেগে যাচ্ছে, আমাকে ড্রাইভারদের গালি খাওয়াবে তুমি।” তাড়া দিলো লোকটা।

এত সহজভাবে লোকটা কথাগুলো বলল যেন হীরা তার বহুদিনের চেনা। হীরাও এই রাস্তা থেকে মনে মনে মুক্তি চাইছিল। উঠে গিয়ে গাড়ির নরম গদিতে বসলো। দরজাটা বন্ধ করে দিতেই নোংরা শহর থেকে মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে, ভেতরে আরামদায়ক শীতকাল, হালকা একটা সুবাস ভাসছে, সব কোলাহল যেন পানিতে ডুব দিয়েছে।

“আপনি আমাদের বাসা চেনেন?” জিজ্ঞাসা করল হীরা।

“আজ চিনব।” পথে চোখ রেখেই জবাব দিলো লোকটা। “কী কাকতাল, চিন্তা করো, এই রাস্তায় আসি না কখনো, অথচ আজ এসেই তোমাকে পেলাম।”

“গাড়ি থেকে দেখেই আমাকে চিনে ফেললেন?”

“হ্যাঁ, এই রাস্তায় তুমিই সবচেয়ে দৃশ্যমান বস্তু।”

প্রশংসা শুনে হীরা অভ্যস্ত, তবুও লজ্জা পেল আজ। “আপনাকে কিন্তু এখনো চিনতে পারিনি আমি,” বলল হীরা।

লোকটা জানালো তার নাম শাকের মাহমুদ। সামসাদ মিঞাজীর ব্যবসায় সে একজন অংশীদার, ক্যাবল টিভি আর ঠিকাদারি তার প্রধান ব্যবসা। হীরা কিছুটা স্বস্তিবোধ করে, অপরিচিত কোনো দুষ্ট লোকের পাল্লায় সে পড়েনি।

“গাড়ির ভেতর থেকে শহরটা একেবারে অন্যরকম লাগে,” জানালো হীরা।

“হ্যাঁ, বর্ষাকালে বৃষ্টির মধ্যে শুকনো থাকতেই বেশি আরাম, শীতকালে লেপের ভেতর থেকে বাইরের কুয়াশা খুব সুন্দর লাগে, আর ভালো লাগে গাড়ির আয়েশের ভেতর বসে মানুষের কষ্ট দেখা। যাবে নাকি মোহাম্মদপুরের দিকে, গাড়িতে বসে বস্তির নোংরা দেখবে।”

“না, আপনি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিন প্লিজ।”

“ইউ আর সেন্টিমেন্টাল।” হাসল শাকের। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “কোন সাবজেক্টে পড়ো তুমি?”

“রাষ্ট্রবিজ্ঞান।” এক শব্দে জানালো হীরা।

“তাই নাকি! কী অদ্ভুত, আমিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়েছি, বছর তিনেক আগে আমার মাস্টার্স শেষ হয়েছে।”

“আপনাকে দেখে তো এত কমবয়সি মনে হয় না, সামসাদ আঙ্কেলকে আপনি ভাই ডাকেন।”

“বয়স অত বেশিও না আমার, কিন্তু যারা রাজনীতি করে তাদের শিক্ষাজীবন একটু লম্বাই হয়।”

“রাজনীতি করেন আপনি?”

“মানুষের সেবা করি।”

“আমি জানি এইসব মিথ্যা কথা, বক্তৃতায় বলে মানুষ।”

“তোমাকে দেখলে মনে হয় না তুমি এত কিছু বোঝো। শোনো, অনেকে সম্পদ গড়ার জন্য রাজনীতি করে, অনেকে করে সম্পদ রক্ষার জন্য। আমি দ্বিতীয় দলের লোক।”

হীরা ঘড়ির দিকে তাকালো, মায়ের কথা মনে পড়ল আবার। স্বাধীনতা পেয়েও সে মুক্ত হতে পারছে না। শাকেরকে বলল, “দেরি হয়ে যাচ্ছে, বাসায় যেতে হবে আমার।”

“আমার যে অনেক সম্পদ সেটা জেনেও তোমার চোখে কোনো চমক দেখলাম না, অন্য কোনো মেয়ে হলে গলায় আহ্লাদ ঢেলে আমার সম্পত্তির খোঁজখবর নিত, ফাইভ স্টার হোটেলের রেস্টুরেন্টে গিয়ে আইসক্রিম খাওয়ার আবদার করত।”

একটা গলির মুখে গাড়ি থামাতে বলল হীরা, গাড়ি থেকে বের হতেই শহরের ভ্যাপসা গরম তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। তবুও স্বস্তি লাগল হীরার, গাড়িটাকে একটা আরামদায়ক নরক মনে হচ্ছিল তার। বারবার মনে হচ্ছিল লোকটা যদি গাড়ি না থামায়? তাকে যদি নামতে না দেয়? গাড়ি ছুটিয়ে দূরে, বহুদূরে কোথাও নিয়ে যায়? কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়ে চলে গেল লোকটা। ভীষণ সোজাসাপ্টা কথা বলে শাকের মাহমুদ, তার যে অন্যসব লোভী মেয়েদের সাথেও কথাবার্তা হয়, তা লুকানোর চেষ্টা করেনি। ঘরের নিরাপত্তায় ফেরার পর এক বেলার স্বাধীনতার স্বাদটা আরো উপভোগ্য লাগল হীরার কাছে।

তারপর আকাশের ওপর কোন দেবতার কূটচালে কে জানে, হীরার সাথে শাকের মাহমুদের প্রায়ই দেখা হয়ে যেতে লাগল। মঞ্জুবালা এই ঘন ঘন কাকতালগুলোকে সন্দেহ করতে লাগল। হীরার স্বভাবেও দিন দিন পরিবর্তন আসতে লাগল। এখন সে চাঁদ দেখতে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকে, মঞ্জুবালা এসে পাশে বসলে হীরা বলে, “তুমি কেন আসলে, মা? আমি একা চাঁদ দেখতে চাই।”

মঞ্জুবালা বলে, “দুইজন একসাথে দেখলে কি চাঁদের রূপ কইমা যাইবো? চাঁদ তো আমারও ভালো লাগে।”

হীরা উঠে গিয়ে বলত, “তাহলে তুমি একাই দেখো।”

ইদানিং কলেজে যাওয়ার জন্য হীরার আগ্রহ দেখেও অবাক হয় মঞ্জুবালা। হীরা তার মাকে কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে দাঁড়িয়ে রেখে পেছনে পাঁচিলের বাধা টপকে পার হয়ে যায়। একটা লাল গাড়ি তার জন্য অপেক্ষা করে গলির মাথায়। গাড়িতে চড়ে তারা ঘুরে বেড়ায় ঢাকার রাস্তায়, জ্যামে বসে গান শোনে, বাইরের ঘর্মাক্ত মানুষের অস্থিরতা দেখে। মাঝে মাঝে তাদের গাড়ি শহরের সীমানা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। হীরা অবাক হয়, এত বড় নগরের এত কাছে ধানক্ষেত, খড়ের গাদা আছে। শাকের হীরাকে নিয়ে যায় শহরের সবচেয়ে উঁচু রেস্টুরেন্টে, খোলা আকাশের নিচে ছাদের ওপর কৃত্রিম বাগান। এখান থেকে পুরো ঢাকা শহর দেখা যায়।

“কী সুন্দর!” হীরা অভিভূত হয়।

গভীর রাতে মা ঘুমিয়ে গেলে ল্যান্ডলাইনে শাকেরের নম্বর ডায়াল করে হীরা, ফিসফিস শব্দে কথা বলে। একদিন গাড়িতে বসে তারা বৃষ্টি দেখছিল, সারা দুনিয়া ভিজছে, কিন্তু বৃষ্টি তাদের ছুঁতে পারছে না। গাড়িতে রবীন্দ্রনাথ বাজছে, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা’। সেদিন প্রথম হীরাকে চুমু খেয়েছিল শাকের। হীরা থমকে গিয়েছিল, অনুভূতির এই প্রবল ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল সে। বৃষ্টি সেদিন গাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়েছিল, হীরার চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছিল অঝোরে।

শাকের হীরার চোখে পানি দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল, টিস্যুর বাক্স থেকে কয়েকটা টিস্যু ছিন্ন করে হীরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আই অ্যাম ভেরি স্যরি। আমি তোমাকে অফেন্ড করতে চাইনি।”

“আমি অফেন্ড হইনি, এমনি কাঁদি, আমার চোখে অনেক পানি।” নাক টেনে জানালো হীরা।

তারপর থেকে তাদের অভিসারের ধরন পাল্টাতে থাকে, কলেজের পাঁচিলের মতো সামাজিক সব বাধা-নিষেধ টপকে গিয়েছে তারা। হীরাকে আরো বহুবার কাঁদতে হয়েছে। মঞ্জুবালা মাঝরাতে উঠে দেখত মেয়ে তার জেগে বসে কাঁদছে। মঞ্জুবালা উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করত, “কী হইছে, মা?”

হীরা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলত, “কিছু হয়নি। কান্নার প্র্যাক্টিস করছিলাম।”

“কেন?”

“কারণ আমাকে অনেক কাঁদতে হবে।”

“কেন কানতে হইবো, মা?” মঞ্জুবালা ভয় পেয়ে জিজ্ঞাসা করে।

“আমি সিনেমার নায়িকা হব, অভিনয় করব, তাই।”

হাঁফ ছেড়ে বাঁচে মঞ্জুবালা। হীরার গায়ে হাত বুলিয়ে বলে, “দিনে কাইন্দো, মা, এখন ঘুমাও।”

তারপর দেশে আগুন জ্বলে ওঠে। মিছিলের গর্জন শোনা যায় কান পাতলেই, সকাল সকাল লাশ নিয়ে হাজির হয় দৈনিক পত্রিকা, কলেজ বন্ধ থাকে প্রায়ই। মিলিটারি নামে শহরে, রাস্তায় মানুষ কমে যায় আর জলপাই রঙের গাড়ির সংখ্যা বাড়ে। দেশে মেলামাইন প্লেটের ব্যবসায় ধস নেমেছে, শ্রমিকের হাঁড়িতে ভাত নেই, সে প্লেট দিয়ে কী করবে! তাদের বউরা অস্ত্রোপচার করে পুরোনো শাড়িটাকে বাঁচিয়ে রাখে, শাড়ির বিজ্ঞাপন এখন আর হয় না, শ্যুটিং বন্ধ। সব শান্ত হয়ে যায়, কিন্তু আতঙ্ক শেষ হয় না।

college খোলে মাঝে মাঝে, কিন্তু গলির মাথায় লাল গাড়ি আর দাঁড়িয়ে থাকে না। ল্যান্ডলাইনে শাকেরকে কল দিলে বিরক্তির বিপ-বিপ শব্দে ব্যস্ততা জানিয়ে দেয় টেলিফোন। শাকেরের কাছে মোবাইল ফোন আছে, সেখানে কল দিলে তার সেক্রেটারি রমজান রিসিভ করে জানায়, “বস ব্যস্ত।”

অভিমান হয় হীরার, কয়েকদিন আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করে না। তারপর প্রতিজ্ঞা ভুলে আবার ডায়াল টিপে, আবার ব্যস্ত টেলিফোন, আর রমজানের একঘেয়ে অজুহাত। শাকেরকে একদিন পাওয়া যায় পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়, সাথে দেড় ইঞ্চির একটা পাঞ্জাবি পরা ছবি, ছবিতে হাসি নেই, তাকে একটু বয়স্ক দেখাচ্ছে। শিরোনামে লেখা—’পুরান ঢাকার সন্ত্রাসের গডফাদার শাকের মাহমুদের নামে মামলা’। হীরা শাকেরের মোবাইল ফোনে কল দিলে রমজানের কণ্ঠ শুনতে পায়, রমজান জানায়, “বসের নামে মামলা হইছে, বস আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে।”

“আপনার বস কি আসলেই গডফাদার?” হীরা জানতে চায়।

“আরে মেডাম, আপনে এইসব বুঝবেন না, অহন সময় খারাপ, পেপারে যা খুশি ল্যাখতাছে। সময় ভালা হইলে বস আবার গরিবের বন্ধু হইয়া যাইবো, আপনে কোনো টেনশন লইবেন না।” রমজানের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস।

“আপনার বসের সাথে একটু কথা বলা যাবে?”

“জ্বে না, সময় হইলে বস ফোন দিবো আপনেরে।”

শাকেরের সময় আর হয় না। মোবাইল ফোনে কল দিলে ঐপাশ থেকে একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ হীরার বিরহ বাড়িয়ে দেয়। মঞ্জুবালা লক্ষ করে পত্রিকা পড়ার প্রতি তার মেয়ের আগ্রহ হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রাজনীতির সব খবর পড়ে সে। এরমধ্যে আরেকদিন শাকের মাহমুদের খবর পাওয়া যায়, ছয় নম্বর পৃষ্ঠায়। গোপন সূত্রের বরাতে দুই কলামের সেই খবরে জানানো হয়, শাকের মাহমুদ গ্রেফতার এড়াতে বর্ডার পার করে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে।

হীরার চোখের নিচে নির্ঘুম রাত জমতে থাকে, তার মুখ থেকে হাসি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তার শ্রাবণকাল শেষ হয় না, মুখে সবসময় মেঘ জমে থাকে, চোখে ঝরে বৃষ্টি। মঞ্জুবালা চন্দন, হলুদ, উপটান ঘষেও মেয়ের মুখের উজ্জ্বলতা ফেরাতে পারছে না। খাবারে তার প্রচণ্ড অনীহা, দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে সে। ফ্যাকাশে চোখে ছাই রঙের বিষণ্ণতা নিয়ে সারাদিন উদাস হয়ে বসে থাকে হীরা। মঞ্জুবালার আর সহ্য হয় না, জিজ্ঞাসা করে, “মাগো, তোমার কী হইছে, মার কাছে কও।”

“কিছু হয়নি, মা।” মিথ্যা বলে হীরা।

“না, তোমারে দেখলেই অসুস্থ মনে হইতাছে, ডাক্তারের কাছে যাই, চলো।”

“মা, আমি ডাক্তারের কাছে যাব না, আমাকে একা থাকতে দাও, তাহলেই আমি ভালো হয়ে যাব।”

মঞ্জুবালা মেয়ের কণ্ঠের দৃঢ়তায় শঙ্কিত হয়ে ওঠে। মেয়ের একাকিত্বের দাবিকে ছুড়ে ফেলতে পারে না। সে বুঝতে পারে না মেয়ে তার চোখ ফাঁকি দিয়ে কখন এত বড় হয়ে গেল। সিটকিনি ছাড়া একটা বাড়িতে থেকে মেয়ে তার কীভাবে এত দূরে সরে গেল!

জমিদারবাড়িতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, কিন্তু এখনো কোনো বাতি জ্বলে ওঠেনি। আকাশে একটা খোঁড়া চাঁদ উঠেছে, কিন্তু এখনো জোছনা ফোটানোর ক্ষমতা তার হয়নি। হীরার মুখটা অস্পষ্ট হয়ে আছে, সে বলে যাচ্ছে।

“হাসান সাহেব, মা ছাড়া আমার জীবনে কিছুই ছিল না। কিন্তু যখন উপলব্ধি করলাম আমার পেটে একটা প্রাণ আছে, তখন মায়ের আদর, কষ্ট, স্যাক্রিফাইস সব তুচ্ছ হয়ে গেল। আমি বোধহয় তখনই ‘মা’ হয়ে উঠেছিলাম। আমার মধ্যে একটা প্রোটেক্টিভ ইনস্টিংক্ট গ্রো করেছিল। মাকে জানালে হয়তো পেটের মধ্যেই একটা হত্যাকাণ্ড ঘটে যেত, সেজন্য মাকে জানাইনি। মায়ের স্বপ্নের চেয়ে সন্তানের প্রাণ আমার কাছে অনেক বেশি দামি হয়ে উঠল। সন্তান পেটে মায়েদের শরীর যতই দুর্বল হোক না কেন, মনে এত শক্তি আসে যে মনে হয় সারা দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারব। আমি চাইনি আমার সন্তান একটা কলঙ্ক হয়ে বড় হোক, সমাজের স্বীকৃতির জন্য আমার শাকেরকে প্রয়োজন ছিল এবং অপেক্ষা করার মতো সময় নেই। আমি তার অফিসে গিয়ে রমজানের সাথে দেখা করি, ইন্ডিয়ায় যাওয়ার জন্য তাকে এত বিরক্ত করি যে, সে আমার সাথে পাসপোর্ট অফিসের দালাল নেয়ামতের পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি জানি, একবার ওপারে গিয়ে পৌঁছালে শাকেরকে আমি খুঁজে বের করতে পারব। একদিন ভোরবেলা মায়ের বালিশের পাশে একটা চিঠি লিখে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমি জানতাম আমি যে পথে বের হয়েছি সেটা বিপদে ভরা, কিন্তু আমার আর উপায় ছিল না। মায়ের জন্য খারাপ লাগে মাঝে মাঝে, সেদিন সকালে খালি ঘরে জেগে উঠে কেমন লেগেছিল মায়ের, চিঠি পড়ে কীভাবে আর্তনাদ করেছে আমার মা, এইসব দৃশ্য শুধু চোখে ভাসে আমার। তবুও আমি ঢাকায় ফিরে যাব না, সন্তানের শত্রুর সাথে এক ছাদের নিচে ঘুমানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

কিছুক্ষণ নীরবতা জমল আমাদের মাঝে। তারপর হীরা আবার বলতে শুরু করল, “হাসান সাহেব, আপনার মনে আছে? সেদিন আপনাকে বলেছিলাম জমিদারবাড়ির গল্পের সেই মেয়েটিকে আমি দেখেছি।”

“হ্যাঁ।”

“আমিই সেই মেয়ে। আমিও আশ্রয়ের জন্য এই বাড়ির বারান্দায় এসে পৌঁছেছি, আমার পেটেও একটা প্রাণ, আমি সেই প্রাণের স্বীকৃতির জন্য যুদ্ধ করছি।” হীরার চোখে-মুখে ভীতি ফুটে উঠল হঠাৎ করে, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আনমনে বলল, “তাহলে আমাকেও কি কুয়ায় ডুবে মরতে হবে?”

আমার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো, তাতে সান্ত্বনা কিংবা আশ্বাস কিছুই ছিল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *