দশ
গ্রীষ্মকালের নদী বালির ওপর তার শীর্ণ শরীরটা পেতে শুয়ে আছে। এই মুমূর্ষু নদীটা দুই পারের জগতের সীমানায় একাই পাহারা দিচ্ছে। ওপারের হাটবাজার, লেনদেন, কলহ, উল্লাস, কলাগাছের নিচে গড়ে ওঠা ঘর, ল্যাংটা শিশুর পেছনে ছোটা ঘোমটা টানা মা, কিশোরীর আগ্রহ ভরা চঞ্চল চোখ—সবকিছু এইপারে দাঁড়িয়ে অবাস্তব মনে হয়। বাগানের পথ ধরে যখন বাড়িতে ঢুকি তখন ওপারের সব স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে। গাছ-জঙ্গলের মধ্যে ফিরতে পেরে সভ্যতার জঞ্জাল থেকে পরিত্রাণ পাই আমি।
কিন্তু আজ ইখলাক হোসেনের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা নদী পার হয়ে আমার সাথে চলে এসেছে। জমিদারবাড়ির ঠান্ডা গম্ভীর দেয়ালের মধ্যে ঢুকেও তার চেহারাটা ঝাপসা হলো না মনে। পুকুরঘাটে বই নিয়ে বসে আছি, একটার পর একটা লাইন পড়ে যাচ্ছি, কিন্তু শব্দগুলো আমার মনের সদর দরজায় গিয়ে আছড়ে পড়ছে, ভেতরে ঢুকতে পারছে না।
ভেতরে কুপির আলোয় সাদা আলখাল্লা পরা এক যুবক তার বউয়ের অশ্রুভেজা, বিকৃত অক্ষরের চিঠি পড়ছে। চোখের পাতায় তার আবেগ শিশিরবিন্দুর মতো টলোমলো করছে। একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে সুযোগ পেয়ে এক ফোঁটা চোখের জল ঝরে পড়বে চিঠিতে। তাদের মিলন না হলেও অশ্রুর মিলন হবে। গল্প-উপন্যাসে আমি ‘প্রেম’ পড়েছি, সেইসব প্রেম আমাকে ছুঁতে পারেনি, কারণ চরিত্রগুলো ছিল অস্পষ্ট। তাদের নাক, মুখ, চোখ দিয়ে আমি কোনো স্থির চেহারা দিতে পারিনি। এখন প্রেমিক ভাবলেই চোখে দাড়িতে ঢাকা একটা চেহারা ভেসে ওঠে।
পরের মাসে যখন আবার হাটে গেলাম, তখন আমার মাটিতে লেগে থাকা নির্লিপ্ত চোখ কিছুটা অনুসন্ধানী হয়ে উঠল। কারো কৌতূহল, কৌতুকের বলি না হয়ে, নির্বিঘ্নে তেল-চাল কিনে আমি গেলাম পোস্ট-অফিসে। ডাকপিয়নের দেখা নেই কোথাও, তাকে দেখার জন্য যে আমার তীব্র আগ্রহ ছিল তা বলা যাবে না।
আমি অন্য আরেকটা চেহারা খুঁজছি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ডাকপিয়ন তার দুর্বল, উদ্ভ্রান্ত সাইকেলটা নিয়ে ডাকঘরে ঢুকল। আমাকে দেখেই মুখস্থ প্রত্যাখ্যানবাণী শুনিয়ে দিলো, “হাসান শেখ, আপনার নামে কোনো চিঠি আসে নাই।” আমিও পিয়নের পিঠে ক্ষীণ স্বরে বললাম, “স্যরি।”
ডাকঘরের চারপাশে কোথাও ইখলাক হোসেনের চিহ্ন নেই। চিঠি পড়ানোর জন্য কোনো নিরক্ষর লোকও আজ দাঁড়িয়ে নেই। আমি আবার বাজারের ভয়ংকর ভিড়ে ঢুকলাম, চোখ তুলে একটা পরিচিত মুখ খুঁজতে লাগলাম। প্রায় সবক’টা মুখে রোদের চিহ্ন। কারো মুখের চামড়ায় পড়েছে বয়সের ভাঁজ, কারো ত্বকে চকচকে যৌবন। লম্বা মাটিরঙের দাড়ি, খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি, এবড়ো-খেবড়ো এলেমেলো দাড়ি, কারো গাল থেকে নাপিতের ক্ষুর দাড়ি চেটে উলঙ্গ করে দিয়েছে। কুর্তা, শার্ট, উদোম গা। পোড়া ঠোঁটে বিরক্তি, রাগ, উপহাস, উৎকণ্ঠা।
এত এত মানুষ দেখলাম, কিন্তু সে আন্তরিক হাসিটা আমি খুঁজে পেলাম না। বাজার থেকে বেরিয়ে গেলেও আমার কান তখনো বাজারে রয়ে গেছে, একটা ডাক শোনার অপেক্ষা করছে, ‘হাসান ভাই, দাঁড়ান’। কিন্তু উচ্চস্বরে ভেসে আসা কয়েকটা গালি আর উৎকট হাসি ছাড়া কোনোকিছু কানে আসলো না। নদী পার হয়ে ওপার থেকে সলতে, তেল, চাল আর বিমর্ষতা নিয়ে আমি ঘরে ফিরলাম।
একটা শুকনো ঝরাপাতার মতো বিচ্ছিন্ন মনে হলো নিজেকে। মানুষের সাথে মানুষের সংযোগের যে সেতু তা খুবই নড়বড়ে, ভঙ্গুর। দুইতলা থেকে পড়ে মাথা ভেঙে মা মরে গেল অকস্মাৎ, সাথে সাথে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেল। একটা চিঠি দিয়ে বাবা গেল হারিয়ে, তাকে খুঁজে পাওয়ার কোনো পথ অবশিষ্ট রেখে যায়নি বাবা। ইখলাক হোসেনের সঙ্গে আমার যে সংযোগ তা এতটাই বায়বীয় যে একটা দীর্ঘশ্বাসেই তা উড়ে যেতে পারত। তবুও সে একটা অসমাপ্ত উপন্যাসের মতো লেপ্টে আছে মনে, আমার জানতে ইচ্ছা হয়, সে ছুটি পেল কি-না, ভেষজবিদ্যা শিখে কী কী রোগ সারালো, ফেলুদা পড়ে তার কেমন লেগেছে, তার বিরহকাতর বউকে কী বলে সে আশ্বাস দেয় ইত্যাদি।
মানুষের সাথে বিচ্ছিন্নতার কারণে পশু, পাখি, উদ্ভিদের সাথে সম্বন্ধ আরো গাঢ় হতে লাগল আমার। ঘাটের কদমের ডাল নিশ্চিন্তে বাহু মেলে ধরে, আমার মাথা ছুঁয়ে দিয়ে যায় তার সজীব পাতা। বনবিড়ালটা আমার উপস্থিতি টের পেয়ে পায়ে বিদ্যুৎ খেলিয়ে ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় না, আমাকে সমীহ করে এখনো আড়ালে যায়, তবে সচকিত বিদ্যুৎ আর খরচ করে না। শেয়ালের দল মাঝে মাঝে লেজ নাড়ে আমাকে দেখে, যেন একটু প্রশ্রয় পেলেই কাছে এসে বন্ধুত্ব পাতাবে। আমার সাথেই পুকুরে নামে ভোঁদড়ের দল। সাপটা আমাকে দেখে আগের মতো আর পথ ঘুরে যায় না, পাশ দিয়ে নিশ্চিন্তে গন্তব্যে চলে যায়। চড়ুই, বুলবুলি, শালিক, টিয়া আমার পায়ের কাছে বসে খাবার খুঁটে খায়। রাতের বেলা প্যাঁচা এত কাছ দিয়ে উড়ে যায় যে ডানার বাতাস টের পাই। এত প্রাণ আমার চারপাশে, এত মায়া আমাকে ঘিরে, আমি একা হই কী করে!
আমার বাড়ির তিনপাশে ফসলের মাঠ। মাঠে কৃষকেরা সূর্যের দিকে তাদের সুঠাম পিঠ পেতে দিয়ে নুয়ে নুয়ে জমি উর্বর করছে। তাদের একাগ্রতা আমার ভেতরের কৃষকটাকে সচেতন করে তোলে। বাবার ড্রয়ারের অল্প কয়েকটা নোটের চেহারা ভেসে ওঠে আমার চোখে। কিছু ধান উৎপাদন করতে পারলে মন্দ হয় না। পতিত জমিগুলো অলস-বেকার ছেলের মতো বেহায়া। বুকে কয়েকটা ঘাস গজিয়ে নিশ্চিন্তে অবসর উদযাপন করছে। কৃষকদের মতো মাথায় গামছা বেঁধে আমি জমিতে নামলাম।
কৃষিকাজের উপযুক্ত যন্ত্রপাতি আমার কাছে নেই, কেনার সামর্থ্যও নেই, তাই রান্নাঘরের সরঞ্জাম দিয়ে আপাতত কাজ চালাতে হলো। একটা ছোট জমি থেকে ঘাস উচ্ছেদ করতেই আমার তিন দিন সময় লাগল। বহুদিন পর মাটি পেল রোদের ছোঁয়া। মাটিতে ছোট ছোট অসংখ্য গর্ত শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মাটির ওপরে ঘাসের রাজ্য ধ্বংস করার পর মাটির নিচে ইঁদুরের সাম্রাজ্য বেরিয়ে আসলো। আমি গর্তের তোয়াক্কা না করে মাটিকে আলগা করলাম একটা প্রাচীন কোদাল দিয়ে। আমার বনজঙ্গলের জমিদারিতে ইঁদুরের আবাসনের কোনো সমস্যা হবে না আশা করি।
আমার সহকৃষকদের থেকে আমি বারবার পিছিয়ে পড়ছিলাম। তাদের ক্ষেতকে পানি খেতে দেওয়া হয়েছে, আমার জমি কেবলমাত্র শ্বাস নেওয়া শুরু করেছে। জমিতে পানি দেওয়া শুরু করতেই টের পেলাম আমার এই ক্ষুদ্র ভূমিটুকু কত তৃষ্ণার্ত। পুকুর থেকে সারাদিন পানি টেনেও এইটুকু জমির পিপাসা মেটাতে পারলাম না। প্রতিদিন আমি নিয়ম করে জমিকে তোয়াজ করি, অবশেষে মাটি তার অভিমান ভেঙে কাদা হলো।
এখন প্রয়োজন বীজের, সামান্য কয়টা টাকা নিয়ে পরের হাটে আমি বাজারে গেলাম। বাজারে গিয়ে একটা অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হলো আমার, যে চোখগুলো আমার উপস্থিতিতে কুঞ্চিত হয়ে যেত, সে চোখে কোনো বক্র দৃষ্টি নেই। যে কপালে পড়ত বিভ্রান্তির ভাঁজ, সে কপাল আজ মসৃণ সটান। আমি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছি তাদের কাছে, কেউ আমাকে আলাদাভাবে লক্ষ করছে না। নাপিতের ঘোলা আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো আমিও তাদের একজন। আমার চামড়ায় রোদের স্বীকৃতি আছে।
জলজ আমিষ খেতে খেতে আমার অরুচি ধরে গেছে তাই কিছু মুরগির ছানাও কিনলাম। আমার জঙ্গলে শিকারির অভাব নেই, মাটিতে শেয়াল, বিড়াল, বিড়ালের আরো বিবিধ আত্মীয়-স্বজন, আর আকাশে চিল, ঈগল ইত্যাদি। নিজের খাবার তাদের সাথে ভাগ করার ইচ্ছা আমার ছিল না, তাই বাঁশ কেটে খাঁচা বানিয়ে তাতে ছানাগুলোকে পালন করতে লাগলাম। আমার সংসার বেড়ে উঠতে লাগল।
জেদিন কাদামাটি ভেদ করে কচি ধানের পাতা তার সবুজ নরম হাত বাড়িয়ে দিলো, পিতৃগর্বে আমার চোখ ছলছল করে উঠল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাতাসে তাদের ক্রীড়ানৃত্য দেখতাম। পুরো ক্ষেতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম কোনো নচ্ছার আগাছা আমার সন্তানদের খাবার চুরি করে খাচ্ছে কি-না। দূরে তাকিয়ে দেখি কিছু কালো পিঠ বসে আছে সবুজের ধারে। আইল ধরে ঘুরে ঘুরে তারা ফসলের সৌন্দর্য দেখে। এই সৌন্দর্য কেবল কৃষকরাই দেখতে পায়, কোনো কবির নজরে তা পড়ে না।
আমার বাগানের ফলবতী গাছগুলোতে সবুজ সবুজ দুঃখ ধরে আছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে মিষ্টি ফল খেয়ে আমি কুলাতে পারি না। পাখিরা আর কতটুকুই-বা খেতে পারে, মাঝে মাঝে সীমানার ঐপাশ থেকে হনুমান এসে কিছু খেয়ে যায়, বাকিসব পাকা ফল বুকের সব মিষ্টতার অপচয় করে ঝরে পড়ে। পাকা ফলের গন্ধ আমার অসহ্য লাগে তখন, প্রচণ্ড দুপুরে গ্রামের দিকে তাকিয়ে আমি শুধু অন্ধকার দেখতে পাই। পাকা ফলের সুবাস ওপারেও যায় নিশ্চয়ই, শিশুরা ভয় আর লোভ নিয়ে এদিকে তাকায়, কিন্তু ভয়ের কাছে লোভ পরাজিত হয়। চোখ নামিয়ে, টুপি পরা মাথাগুলো নিচু করে, আমপারা, কায়দা বুকে চেপে ধরে, তাদের অপুষ্ট হাড়গুলোকে বাতাসে দোলাতে দোলাতে মক্তবে যায় তারা।
ভোরে আমার মুরগি ছানাগুলো চি-চি শব্দে তাদের ক্ষুধার জানান দেয়। আমি ওদের খাবার পরিবেশন করে নিজেও খাই। একজন খাঁটি কৃষকের মতো এই সময়টায় আমার মন জুড়ে সবুজ ক্ষেত বাতাসে দোল খায়। পুকুরপারের জমি থেকে ধানগাছের অধৈর্য কিশোর দেহগুলো আমাকে একনাগাড়ে নিঃশব্দে ডাকতে থাকে। জঙ্গলের রাস্তা ধরে প্রতিদিন যাই আমি। সব পরিচিত গাছপালা, পরিচিত রং, কোনো ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু সেদিন একটা দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালাম, বনের মধ্যে সাদা রঙের কিছু একটা নড়ছে। কাছে যেতেই দেখলাম রংটা আমার অপরিচিত নয়, জঙ্গলে সাদা আলখাল্লা দুলছে।
এই প্রথম সভ্যজগতের একটা প্রাণী আমার সীমানায় প্রবেশ করল। ইখলাক হোসেন ভীষণ মনোযোগ সহকারে কিছু একটা খুঁজছে, তার হাতে একটা বই। বনের মধ্যে ইখলাক হোসেনকে খুবই বেমানান লাগছে, একটা পশুর মধ্যে যে স্বাভাবিক সচেতনতা থাকে, তা তার মধ্যে নেই, সেজন্য ঠিক তখনই আমাকে দেখতে পায়নি সে। এই ক্ষুদ্র বনের স্থলজ অধিবাসীরা আতঙ্কে আড়ালে লুকিয়েছে, আর গাছের ডালে যারা আছে, তারা এই আপদটিকে দেখে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে। পাখিদের প্রতিবাদেও ইখলাক হোসেনের একাগ্রতা অক্ষুণ্ণ রইল।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তার অন্বেষণ দেখলাম, ইখলাক হোসেন মাটি থেকে চোখ তুলে বই খুলে বইয়ে কী যেন দেখল। তারপর আবার মাটিতে চোখ ফিরানোর আগে একবার সামনে তাকালো, আমি দাঁড়িয়ে আছি। তার অন্ধকার মুখে হঠাৎ তীব্র উজ্জ্বল দুপুর নেমে এলো। আমি আজ আমার নিজস্ব পরিবেশে আছি, তাই কিছুটা সপ্রতিভ। জিজ্ঞাসা করলাম, “বেড়া ডিঙিয়ে আসলেন?”
ইখলাক হোসেন উঁচু উঁচু পদক্ষেপে বিরুৎগুল্মের বাধা ডিঙিয়ে মাটির প্রাণহীন ধূসর দেহে পা ফেলে বলল, “ঐ বেড়া তো মামুলি জিনিস, মনের বেড়াটা ডিঙ্গানোটাই হইলো কঠিন কাজ।”
“আপনার ভয় করেনি?”
“ভয় তো করছেই, আপনার অনুমতি না নিয়েই বাড়িতে ঢুকলাম, কী মনে করেন!”
“আপনাকে গল্পটা কেউ বলেনি?”
“বলে না আবার, এই একটা গল্প কত মানুষের মুখে শুনলাম। শুনেন ভাই, গ্রামে আলো কম, মানুষের বাড়িতেও, মনেও। অন্ধকারে ভূত বাসা বান্ধে। এই গ্রামে ভূত আছে কি-না জানি না, তবে গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষের মনে আট-দশটা কইরা ভূত বইসা আছে।”
“আপনার মনে অন্ধকার নেই?”
“অন্ধকার কেমন আছে বলতে পারি না, তবে কিছুটা আলো তো আছে। নিজের আল্লার ওপর বিশ্বাসও আছে। আমার ভয়ের কী আছে।”
ইখলাক হোসেনের উপস্থিতে আমার বাড়ি, বনজঙ্গলের বন্যতা কিছুটা কমে গেল। আমাকে মানুষের ভাষায় কথা বলতে দেখে গাছপালা, পশুপাখি সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমরা পুকুরঘাটে বসলাম। আমি ইখলাক হোসেনকে জানাতে পারলাম না, তাকে একদিন হাটে গিয়ে খুঁজেছি, না পেয়ে বিমর্ষ হয়েছি।
ইখলাক হোসেন নিজেই জানালো, সে ছুটি পেয়েছিল চার দিনের। কিন্তু বউয়ের চোখের ভেজা পাপড়ি তাকে চার দিনে মুক্তি দেয়নি। দশ দিন কাটানোর পর পাড়াপ্রতিবেশীরা করল উপহাস, বাড়ির লোকজন করল বিদ্রুপ। তার মা এসে যখন তিরস্কার করে জিজ্ঞাসা করল, চাকরি আছে না গেছে, তখন আর থাকতে পারেনি সে। এখানে এসে জানতে পারল চাকরি এখনো আছে, কিন্তু তার গাফেলতিতে মক্তবের আরবি শিক্ষায় ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, আজান-নামাজে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে, ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য আগামী ঈদের আগে যেন ছুটির নাম আর মুখেও না আনে। কিন্তু সেদিকে বউয়ের তো চোখের জলের অভাব নেই, চিঠিতে এত এত অশ্রু পাঠায়, মাঝে মাঝে তার মনে হয় সেই জলে ডুবে মরে।
বউয়ের ভালোবাসার অত্যাচারের কথা বলার সময় তার মুখে এক ধরনের কপট বিরক্তি দেখা গেল, অথচ তার প্রসন্ন লাজুক চোখ দেখে মনে হচ্ছিল এমন অত্যাচারে তার খুব একটা আপত্তি নেই। বউয়ের কথা বলার সময় লোকটা বয়স এবং জ্ঞানের তুলনায় সরল হয়ে যায়। আমার মনে হলো সব প্রেমিকই বোধহয় শিশু।
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনাদের মধ্যে ঝগড়া হয় না?”
সে বলল, “হয় না আবার? সেদিনই তো হইলো। আমি তারে বললাম, তোমার থুতনিতে তিল আছে, তুমি স্বামী-সোহাগী হইবা। সে কয়, মিছা কতা। আপনে তো আমারে ভালোই বাসেন না। শুইনা মাথা গেল গরম হইয়া, কয় কী! এই যে এত এত চিঠি পাঠাই, এমনি এমনি পাঠাই? তার কথা হইলো, সে চিঠি পাঠায় তাই আমি পাঠাই, এইখানে ভালোবাসার কোনো প্রমাণ নাই। মেজাজটা কেমন হয় কন দেখি। তারপরে সে কয় সে বেশি লম্বা চিঠি পাঠায়, তাই সে-ই বেশি ভালোবাসে। আমি কি আর সহজে ছাড়ি, বললাম, চলো গইনা দেখি কে কয় লাইন লেখলো।”
আমি হেসে বললাম, “গুরুতর ব্যাপার তো। তা কে জিতল পরে?”
ইখালাক সাথে সাথে বলল, “গোনা শেষ হয় নাই এখনো। মাত্র অর্ধেক বস্তা গনছি।” তার মুখের তৃপ্তভাব দেখে মনে হচ্ছে গণনায় সে এগিয়ে আছে।
পুকুরঘাট থেকে আমাদের বাড়ির চূড়াটা স্পষ্ট দেখা যায়, সেদিকে চোখ পড়ায় ইখলাক হোসেনের চোখে-মুখে মুগ্ধতা ঝরে পড়ল। বলল, “হাসান ভাই, আপনাকে দেখে বোঝা যায় না আপনি রাজপ্রাসাদে থাকেন।”
বললাম, “রাজপ্রাসাদে যারা থাকে, তারা সবাই রাজা হয় না। চলেন আমার ভাঙাচোরা রাজপ্রাসাদটা দেখবেন।”
ইখলাক হোসেন উৎসাহী হয়ে বলল, “অবশ্যই যাব।” তারপর তার কী যেন মনে পড়ে গেল, সাথে সাথে তার মুখ থেকে শিশুটা বিদায় নিলো। মাথা নাড়িয়ে নিজেকেই যেন ভর্ৎসনা করল। বলল, “ওহ-হো, আসল কাজটাই তো ভুইলা গেছি। আমি জঙ্গলে একটা গাছ খুঁজছিলাম।”
জিজ্ঞাসু হলাম, “কী গাছ?”
বই খুলে সে একটা সাদাকালো ছবি দেখালো, নাম লেখা উলটচণ্ডাল, দেখেই চিনতে পারলাম। ইখলাক হোসেনকে নিয়ে গেলাম বাগানের কাছে ঝোপের মধ্যে। লাল রঙের ঢেউ খেলানো ফুল লেগে আছে গাছের সাথে। ইখলাক হোসেন গাছ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, বলল, “জানেন, রবীন্দ্রনাথ এই ফুলের কী নাম দিয়েছেন?”
মাথা নেড়ে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। সে বলল, “অগ্নিশিখা। দেখেন ফুলটা কেমন আগুনের শিখার মতো। এটা যে কত কাজে লাগে কী বলবো আপনাকে, এটার শিকড়ের রস অনেক রোগ সারায়, কিন্তু বেশি খেলে সর্বনাশ, ভয়ানক বিষ আছে।”
ঝোপের মধ্যে লম্বা জোব্বা নিয়ে ঢুকতে গিয়ে ভালোই নাজেহাল হতে হলো ইখলাক হোসেনকে। গাছটাকে সমূলে উৎপাটন করে আমরা ফিরে এলাম পুকুরঘাটে। আলখাল্লার ভেতরে সে হয়তো আমাদের মতোই মানুষ। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই পোশাক কেন পরেন, সাধারণ পোশাক পরে কি নামাজ হয় না? নাকি ধর্মরক্ষা করা যায় না?”
সে বলল, “নবী পরেছে, তাই আমিও পরি।” বললাম, “নবীর শত্রুরাও তো এই পোশাক পরেছে।”
“তাতে কী হইছে? নবী তো পরছে। আপনি হয়তো আবহাওয়ার কথা বলবেন। কিন্তু আমি বলি ভালোবাসার কাছে কোনো যুক্তি নাই। এই যে ঢাকার রাস্তায় আন্দোলন হইতাছে, বিভিন্ন দলের মানুষ পতাকা গায়ে জড়াইয়া নামছে, নাইলে মাথায় বাঁধছে, যারে ভালোবাসে তার চিহ্ন গায়ে নিছে। আমার এই পোশাকে হয়তো আরাম নাই, কিন্তু ভালোবাসা আছে।”
ইখলাক হোসেনের কথা শুনে বুঝলাম, তার ভালোবাসায় কোনো উদ্দেশ্য কিংবা কলুষতা নেই। সাধারণের ঊর্ধ্বে ওঠার মতো ব্যক্তিত্ব সবার থাকে না, তারা তখন নানা ধরনের অসাধারণ পোশাক গায়ে চড়ায়। পোশাকের আড়ালে ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিত্বহীনতাকে লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য ধারণ করে। ইখলাক হোসেন সেই দলের লোক নয়, তার মধ্যে ধর্মের অহংকার কিংবা ধর্মগুরুর দাম্ভিকতা নেই, সে উচ্ছল এবং সরল। সাদা আলখাল্লায় তাকে আর বেমানান লাগছে না।
