সাত
পুকুরঘাটে আমার দপ্তর খুলে বসলাম; বইপত্র, খাতা-কলম নিয়ে সেখানেই পড়ে থাকতাম প্রায় সারাদিন। ইতিহাস, বিজ্ঞান আর অঙ্ক বইয়ের সাথে দুই-একটা গল্পের বইও চলে আসত ঘাটে। বইপড়ার জন্য আমার কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, যে-কোনো বই পড়ার অধিকার আমার ছিল। এখানে আশেপাশে কোনো স্কুল নেই। বাবা বলে, “ভালোই হলো, স্কুল থেকে যত দূরে থাকতে পারবে ততই শিখতে পারবে।” আমাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তাব বেশ কয়েকবার বাবার অবহেলায় ভেসে গেছে। মা খেতে বসে প্রসঙ্গটা তুলল আবার। বাবা খুবই তাচ্ছিল্যের সাথে তা উড়িয়ে দিলো, বাবার মতে স্কুলে-কলেজে গিয়ে মানুষের মন আরো ছোট হয়ে যায়। ডিগ্রি আর সার্টিফিকেটের চাপে অনেক সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। বাবা জানালো এইসব ডিগ্রি কেরানি আর মাস্টার ছাড়া আর কিছুই তৈরি করতে পারে না, বাবা যা শিখেছে সব ইজিচেয়ারে শুয়েই শিখেছে। মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিতর্ক থেকে ইস্তফা দিয়ে দিলো। আমি ভর্তি হয়ে গেলাম পুকুরঘাটের পাঠশালায়।
মা ইদানিং ভীষণ চুপচাপ হয়ে গেছে। সবসময় কেমন অন্যমনস্ক থাকে, যেন অন্য কোথাও রয়ে গেছে মা। কয়েকবার প্রশ্ন করলে একবার উত্তর পাওয়া যায়। আগে খাওয়ার সময় মাছ-মাংস না থাকলেও আলাপটা থাকত, মা-ই সংসারের টুকটাক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা তুলত। এখন অধিকাংশ সময় নীরবেই খাওয়া হয়ে যায় আমাদের। বিছানায় কোনো গল্পের জায়গা হয় না এখন। মায়ের আদরের হাত আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় নিঃশব্দে। সেদিন আমি চোখ বন্ধ করার পর মা ইতস্তত করে বাবাকে জানালো, একটা গর্ভবতী মেয়েকে মা দেখেছে জঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা মায়ের দুর্বল মনকে কিছুক্ষণ উপহাস করে জানালো, এইসবই মস্তিষ্কের ভ্রম। “তুমি যদি গল্পটা না জানতে কোনো প্রেগন্যান্ট মেয়েকে তুমি দেখতে পেতে না, আমি নিশ্চিত তাকে তুমি রাতেই দেখেছ,” আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল বাবা। মা কিছু বলল না আর। বাবার যুক্তির সাথে লড়াই করার মতো উদ্যম তার ছিল না।
আরমানিটোলার বাড়ি বিক্রি করে মায়ের চিকিৎসার পর যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা দিয়ে আমাদের শীত পার হয়েছে। বসন্ত আসতে আসতে আমাদের খাবারের পাতে দারিদ্র্য ফিরে এলো। আম-কাঁঠালের বাগান আছে, সেগুলো ফল দিতে এখনো অনেক দেরি। সেই ফল কিনতে কেউ আসবেও না হয়তো। বাড়ির আশেপাশে যেসব শাক-লতাপাতা পাওয়া যায় সেগুলোই আমাদের খাবার টেবিলে উঠে পড়েছে। খয়েরি চেয়ার-টেবিল শৈল্পিক নকশায় ভরপুর, এই টেবিলে বসে জাপান থেকে আমদানি করা চীনামাটির বাসনে আমরা শাক আর চালতার টক দিয়ে ভাত খাই। বাবা মাঝে মাঝে উপহাস করে বলে, আমরা থাকি রাজার ঘরে, খাই ভিখারির মতো। সেই উপহাস উপভোগ করতে পারে না মা, চোখে অভিমান পুষে চুপচাপ চেয়ে থাকে।
গাছে অজানা পাখিগুলোর মধ্যে যখন কয়েকটা পরিচিত পাখি দেখি, যখন দেখি একটা কালো কাক অনবরত কা কা করে আবর্জনার জন্য আর্তনাদ করছে, তখন আমার আরমানিটোলার সেই প্রাচীরঘেরা বাড়িটার কথা মনে পড়ে। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বিরামহীন যে শহুরে গুঞ্জন প্রাচীর ভেদ করে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ত, আমরা তাকে তখন আলাদা করতে পারতাম না। এখন নিঝুম পুকুরপারে বসে সেই ঢেউয়ের গর্জনের জন্য কান পেতে থাকি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে পথ ভুলে গ্রামে চলে আসা সেই বিভ্রান্ত কাকটার মতো আর্তনাদ করে উঠি, নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খান-খান করে ফেলি। কোলাহলের জন্য আমার মনে যে এত তৃষ্ণা আছে, নীরবতায় না ডুবলে তা কোনোদিন বুঝতে পারতাম না।
আরমানিটোলার বাড়িতে প্রাচীর দিয়েও আমরা পুরোপুরি আলাদা হতে পারিনি, যে-কোনো উপায়ে শহরের নাভির সাথে লেগে থাকতাম আমরা। এখানে কোনো প্রাচীর নেই, কিন্তু আমাদের সাথে কারো কোনো সংযোগ নেই। বড় বাড়িতে আমরা নিজেরাও কেমন আলাদা হয়ে গেছি। আগে আমি দোলনায় ছিলাম, বাবা বারান্দায়, মায়ের বিচরণ ছিল পুরো বাড়িতে। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের দৃষ্টিতে বাঁধা, সেই আবদ্ধ বাড়িতে আমরা কেউই একা হতে পারতাম না। এখানে আমি একা পুকুরঘাটে, বাবা একা বারান্দায়, মা একা অন্দরমহলে। আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। এই বাড়িতে আমার আলাদা একটা ঘর হয়েছে এখন। বাবা-মায়ের উষ্ণতায় নিশ্চিন্ত ঘুমের সুযোগ আর নেই আমার।
একদিন রাতে কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। কান্না শুনে প্রথমেই যা আমার বুকে প্রবেশ করল, সেটা হলো ভয়। আমি বিছানা হাতড়ে মায়ের আঁচল, বাবার বুক খুঁজতে লাগলাম; ব্যর্থ অনুসন্ধান শেষে আমার মনে পড়ল তারা পাশের ঘরে আছে। আবছা আলোয় ঘরের সবকিছুকে আরো রহস্যময় লাগছিল। ঘর থেকে কোনোমতে বের হয়ে মায়ের ঘরের দিকে যেতেই কান্নাটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। বাবাও এখন অন্য আরেকটা ঘরে থাকে, এতগুলো ঘর শুধু শুধু অপচয় করতে চায় না। তাছাড়া রাতে বাতি জ্বালিয়ে পড়লে মায়ের ঘুমের ক্ষতি হয়। আমি মায়ের ঘরের দিকে এগোলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম মা মেঝেতে বসে আছে, অল্প আলোতেই বুঝতে পারলাম মায়ের হাতে একটা ছোট জামা, সেটাকে বুকে জড়িয়ে নাকে-মুখে চেপে ধরেও বুক ঠেলে উঠে আসা কান্নাটাকে দমাতে পারছে না। যে সহদোরকে আমি কখনো দেখিনি, তাকে সেই প্রথম ভীষণ হিংসা হলো আমার। তার চলে যাওয়ার কাছে আমার অস্তিত্বকে ক্ষুদ্র মনে হলো। আফসোস হলো, ইশ! যদি আমি মরতাম! মা হয়তো আমার জন্যও এমন কাঁদত!
মাকে দেখি প্রায়ই শুয়ে থাকে, তার দেহটা খাটের সাথে এমনভাবে মিশে যাচ্ছে যে তাকে খাট থেকে আর আলাদা করা যায় না। মা প্রতিদিন একটু একটু করে আসবাব হয়ে যাচ্ছে। মায়ের ক্লিষ্ট হাত-পা, শুকনো মুখ, চোখের নিচে কাকের কালো পালক—সবকিছু যেন আসবাবের রাজকীয় নকশা। মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়ালে মা আর বুকে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয় না। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে।
“কিছু বলবি? লাগবে কিছু?”
বলার মতো কিছু খুঁজে পাই না। বলতে পারি না, আমি কেবল তোমাকে দেখতে এসেছি, তোমার পাশে একটু শুয়ে থাকব মা।
“যাওয়ার সময় দরজাটা টান দিয়ে যাস।”
বলেই মা পাশ ফিরে শোয়। তারপরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি, নড়তে পারি না। সৃষ্টিকর্তা হৃদয়ে আমার এত আবেগ দিয়েছে, কিন্তু প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা দেয়নি। আমার সমস্ত অব্যক্ত আবেগ নিয়ে বেরিয়ে আসি মায়ের ঘর থেকে, দরজাটা টেনে দিতেই মা আড়াল হয়ে যায়।
বাজারে গেলে শুনতে পাই জুয়াড়িরা অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সেই অভিশপ্ত বাড়ির আলো-বাতাস, ফল-ফসলে আমরা যে এখনো টিকে আছি সেটাই তাদের বিস্ময়। এমন একটা উত্তেজনাকর সম্ভাবনার এমন ম্যাড়ম্যাড়ে পরিণতি দেখে তারা হতাশ হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের ভরসা দিচ্ছে, “আরে দেখ না আর কয়ডা দিন। কত দেখলাম! এমনে এমনেই তো আর চুল, দাড়ি-“
তারপর একঘেয়ে বার্ধক্যের গুণগান করে যায় তারা। ঘাটের মেয়েদের আর তর সইছে না, একটু শোক করতে চায় তারা। সেই যে রতন দাসের ছোট মেয়েটা ফাঁস নিয়ে মরল, তারপর আর আলাপ কিংবা বিলাপ করার মতো কিছুই ঘটেনি। বাজারে গেলে কারো চোখে তাকাই না আমি, মানুষের চোখ আমাকে ধিক্কার দেয়, তাদের সব উচ্ছ্বাসে জল ঢেলে দিয়ে লজ্জা করে বেঁচে থাকতে। বাজারে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে হাঁটি।
এত বিশাল বাড়িটার একটা ক্ষুদ্র কোণে মা পড়ে থাকে সারাদিন, তাকে শুধু খাবারের টেবিলে দেখা যায়, প্রতিবার মাকে দেখলে একটু একটু অচেনা লাগে। ইদানিং খাবার টেবিলে মায়ের চেয়ারটা প্রায়ই ফাঁকা থাকে। বাবা আর আমি মিলে চুলা জ্বালাই, ডাল আর চাল সিদ্ধ করি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করি, “মায়ের কী হয়েছে?” বাবাও হয়তো বুঝতে পারে না, কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “সারাজীবন শহরে থেকে অভ্যাস, হয়তো এখানে অ্যাডজাস্ট করতে পারছে না।” তারপর চোখে স্নেহ ঢেলে বলল, “মার জন্য খারাপ লাগে?”
“হুম।”
“গিভ হার সাম টাইম, শি উইল বি অলরাইট।”
বাবা বোধহয় ইদানিং কোনো ইংরেজি বই পড়ছে। মুখ খুললেই ইংরেজি ঝরে পড়ছে। ইংরেজি সান্ত্বনায় আমার মনের আশঙ্কা দূর হলো না। বললাম, “মায়ের কী যেন হয়েছে। মাঝে মাঝে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, মনে হয় আমাকে চিনতে পারছে না।”
“অ্যাবসেন্ট মাইন্ড। মাঝে মাঝে আমরা কিছু একটার দিকে তাকিয়ে থাকি, কিন্তু দেখি না, অন্যকিছু চিন্তা করি। একটা কথা জেনে রাখো, তোমার মা তোমাকে পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে বেশি ভালোবাসে।”
“হুম।”
চুপচাপ মাথা নিচু করে হাত দিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ খুটছিলাম। মায়ের কথা চিন্তা করে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল তখন। বাবা জিজ্ঞাসা করল, “ইজ দেয়ার সামথিং এলস?” মাথা নিচু করেই বললাম, “আমার মনে হয় মা পাগল হয়ে যাচ্ছে।”
“কেন তোমার এমন মনে হচ্ছে?”
বাবার কণ্ঠে উদ্বিগ্নতার সাথে কিছুটা ক্ষোভও টের পেলাম। বললাম, “সেদিন মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি মা কার সাথে যেন কথা বলছে, অথচ ঘরে কেউ ছিল না। রাতে প্রায়ই মায়ের কান্না শুনতে পাই।”
বাবা আমতা আমতা করে নিজেকে প্রবোধ এবং আমাকে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “এমন তো হতেই পারে। কত মানুষ নিজের সাথে কথা বলে, তর্ক করে, একা হলে মন ভরে কাঁদে। অ্যাকচুয়ালি শি ইজ সাফারিং ফ্রম লোনলিনেস। তাকে আরো বেশি সময় দিতে হবে আমাদের।”
আমরা দুজন মিলেও মায়ের একাকিত্ব দূর করতে পারলাম না। কিছুদিন খুব চেষ্টা করে মাকে আরো বিরক্ত করে ফেললাম আমরা। তারপর ব্যর্থ হয়ে নিজেদের জগতে ফিরে গেলাম। সারাদিন বইয়ে মুখ ডুবিয়ে রাখার পর বউয়ের জন্য খুব বেশি সময় বাবার আর হতো না। যেটুকু সময় মায়ের জন্য বরাদ্দ থাকত, তাতেও বইয়ের কথাই বলত বাবা। আয়ুর্বেদ নিয়ে নতুন একটা বই পেয়ে বাবা তাতেই মজে গেছে এখন। আমাকে দেখে বলল, “হাকিম নসরু মোল্লাহর লেখা, গাছের ছবি লেখক নিজ হাতে এঁকেছে, ওষুধ বানানোর সব অদ্ভুত পদ্ধতি লিখে গেছেন। হাঁপানির রোগের একটা ওষুধ আছে, যেটা বানাতে হরিণের পেশাব আর ওলটকম্বল গাছের…”
আমি পুরোটা শুনলেও মা হাতের ইশারায় বাবাকে থামিয়ে দিত, গলায় তার অত জোর ছিল না। মৃদুকণ্ঠে বলত, “আমি একটু ঘুমাই, কিছু মনে করো না।”
মাঝে মাঝে মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসে থাকতাম। আমাদের কথা বলার কিছু নেই। মা মাঝে মাঝে তার দুর্বল হাত আমার মাথায় রাখত, অল্প একটুর জন্য। এইটুকু পেয়েই আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতাম। অধিকাংশ দিন মা পাশ ফিরে শুয়ে থাকত, অথবা বলত, “মাথা ধরেছে।” আমি যদি মাথা টিপে দেওয়ার প্রস্তাব দিতাম, মা এক কথায় ‘না’ বলে আমার কিশোর হৃদয়কে ভেঙে দিত। এখনো দেখি, মা কোনো অদৃশ্যের সাথে কথা বলে ফিসফিস করে। অথচ আমাদের সাথে তার কথা সব ফুরিয়েছে।
একদিন একটা সাদা চালতা ফুল নিয়ে মাকে দিলাম। মা অবাক হয়ে ফুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “ফুল কেন?” লাজুক মুখে বললাম, “আজ আমার জন্মদিন।”
মায়ের সারা মুখে বিব্রত একটা ভাব ছড়িয়ে পড়ল, বলল, “হ্যাঁ, তাই তো। আজকে কত তারিখ, কোন মাস এটা? ইশ! একটা ক্যালেন্ডার নেই ঘরে।”
অনেক দিন পর মা যেন আমার দিকে তাকালো, বলল, “তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস। কত বয়স হলো তোর? ইশ! এটা কেমন কথা? আমি কেমন মা?”
নিজের ছেলেকে বয়স জিজ্ঞাসা করার মতো লজ্জা আর নেই। মা বারবার একটা ক্যালেন্ডারের অভাবের ওপর দায় চাপাতে চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু নিজের কাছে ঠিকই অপরাধী হয়ে রইল। মায়ের মুখটা আরো বিষণ্ণ হয়ে গেল। হয়তো আমার চোখ থেকে নিজেকে কোনোমতে লুকাতে চাইল। বলল, “আচ্ছা এখন যা, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।”
যখন দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, দেখলাম ফুলটা মেঝেতে পড়ে আছে। মাকে অল্প একটু ফিরে পেয়ে আবার হারিয়ে ফেললাম। মায়ের একাকিত্বের সাথে লড়াই করে আমরা মুহুর্মুহু পরাজিত হতে লাগলাম। আবার বর্ষা আসতে আসতে মা শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেল। এতদিন পর বাবা যেন টের পাচ্ছিল, মাকে আমরা হারিয়ে ফেলছি।
এখানে মানুষ অসুস্থ হলে দোষ হয় জিন-ভূতের, খারাপ বাতাস লাগলে ভালো মানুষ পাগল হয়, অভিশাপে মাথায় বাজ পড়ে, কালোজাদুতে পেটের সন্তান নষ্ট হয়। তাই এখানে যে পরিমাণ কবিরাজ, দরবেশ আছে, সেই পরিমাণে ডাক্তার নেই। বাজারে একজন ডাক্তার আছে, ধুলোপড়া ওষুধের শিশি পেছনে সাজিয়ে পুরোনো চেয়ার-টেবিল পেতে বসে থাকে। ডাক্তারের ডান বাহুতে মাকড়সার মতো বিরাট বড় একটা মাদুলি বাঁধা, নিজের ওষুধে যে নিজে ভরসা করতে পারে না, তাকে কীভাবে ভরসা করা যায়।
হাকিম নসরু মোল্লা বাবাকে দিশা দিলো, তার বই পড়ে নিচের ঘরে বাবা রীতিমতো একটা ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলল। গাছের পাতা, শিকড়, ছালে নিচতলা ভরে উঠল। মা তখন শয্যায়, রান্নাবান্না আমিই করি, বাবা গাছের বাকল, শিকড়, পাতা ছেঁছে রস বাহির করে। ওষুধ তৈরি হলো, কিন্তু রোগী ঘোষণা দিলো তার কিছু হয়নি, ওষুধের তার প্রয়োজন নেই। মা যত অসুস্থ হচ্ছিল, তার জেদ তত বেড়ে যাচ্ছিল। বাবা ওষুধ খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করাতে মা বলল, “যদি আমাকে জোর করো, আমি উলঙ্গ হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাব।”
বাবা বলল, “তোমার ছেলে আছে এখানে, সে বড় হচ্ছে, এসব কী বলছো? ওষুধটা খেয়ে নাও প্লিজ।” মা যে কথাটা শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলেনি, তা প্রমাণ করার জন্য বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাপড় খুলতে শুরু করল। আমি বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে।
সেই শীতে আমাদের অবাক করে দিয়ে, কোনো ওষুধ না খেয়ে মা বিছানায় উঠে বসলো। মাঝে মাঝে নিজে নিজে হাঁটাচলাও করতে লাগল। দিনের বেলা খোলা বারান্দায় গিয়ে বসে থাকে মা, দিনের আলো পেয়ে মায়ের চেহারা থেকে মৃত্যুর ছাপটা ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল।
একদিন মা আমাকে ডেকে নিলো আলাপ করার জন্য, আমাকে দেখে তার চোখে সেই আদরের দৃষ্টি ফুটে উঠল। আমি পায়ের কাছে বসতেই তার আঙুল আমার মাথার চুলে স্নেহ বিলাতে লাগল। মা আমার মুখটা তুলে ভালো করে দেখে বলল, “তোর তো দেখি নাকের নিচে লোম গজাচ্ছে।”
নাকের নিচে বয়ঃসন্ধির ঘোষণাটুকু দিন-দিন বড় হচ্ছে, তা কেউ দেখছে না বলে এতদিন আমি স্বস্তিতে ছিলাম। আজ মায়ের চোখে ধরা খেয়ে আমার লজ্জার সীমা রইল না। মা জিজ্ঞাসা করল, “রান্নাবান্না কি তুই-ই করিস?” ঘাড় কাত করে জানালাম আমিই করি। “তুই আমার কত লক্ষ্মী ছেলে, অথচ কত কষ্ট করতে হচ্ছে তোকে।”
“আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না, মা। শুধু তুমি ভালো হয়ে ওঠো, তাহলেই হবে।”
মা আমার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আর কয়টা দিন, বাবা, সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে। সেই মেয়েটা বলেছে।”
“কোন মেয়েটা মা?”
“ঐ যে নিচে দাঁড়িয়ে আছে।”
নিচে তাকিয়ে দেখলাম শ্যাওলাপড়া আঙিনায় কয়েকটা শুকনো পাতা বাতাসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, আর কেউ সেখানে নেই।
সেদিন প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল, জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি কুয়াশা তার সাদা পর্দা দিয়ে সবকিছু ঢেকে দিয়েছে, মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা দুধে ডুবে আছে। বিছানায় আরাম আছে, উত্তাপ আছে, তবুও শুয়ে থাকতে মন চাইল না, মনটা আজ অকারণেই ভালো। মনে হচ্ছে পুকুরপারে গিয়ে খুঁজি কোথায় কী ফুল ফুটেছে, মায়ের জন্য ফুল কুড়িয়ে আনি। জঙ্গলে অনেক সবজি আর মাশরুম পাওয়া যায়, রেসিপির বইয়ের অবাধ্য হয়ে নতুন কিছু রাঁধতে মন চাচ্ছে।
রমিজ শেখের কাশ্মিরি শালটা এখন আমাকে উষ্ণতা দিচ্ছে, মনে হচ্ছে পূর্বপুরুষেরা মিলেমিশে জড়িয়ে ধরে আমাকে শীত থেকে রক্ষা করছে। বাড়ির পেছনে আসতেই কুয়াশা গিলে ফেলল আমায়, ঘোলা স্থবির কুয়াশার মধ্যেই হঠাৎ শেয়ালের ডাক শোনা গেল। আমি এগোতেই তাদের পালানোর শব্দ পেলাম। কুয়াশা তখন হালকা বাতাসে তার অলস দেহ নিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
দেখলাম নিচে একটা শাড়ি পড়ে আছে, এক ঝলক দেখেই চিনলাম মায়ের শাড়ি। শাড়ির পাড় কমলা, ঘিয়া রঙের জমিনের ওপর গোলাপি ছোট ছোট ফুল। শাড়ির নিচ থেকে একটা হাত বেরিয়ে আছে, যে হাত দুই দিন আগে আমার চুলে মমতা বিতরণ করেছে। রক্তের একটা শুকনো রেখা ঠিক আমার পায়ের কাছে এসে থেমে গেছে। দুই সারি পিঁপড়া এই রেখার দুইপাশে ব্যস্ত চলাচল করছে। গাছে গাছে পাখিরা অন্যদিনের মতোই ডাকছে; শিশিরমাখা পাতাগুলো তেমনই ভেজা, প্রতিদিন যেমন থাকে; দূর থেকে একটা মোরগ চিৎকার করে সবাইকে জানাচ্ছে সকাল হয়ে গেছে।
চারদিকে কোমল স্নিগ্ধতা, তার মধ্যে মায়ের উপুড় হয়ে থাকা দেহটার সামনে আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। পৃথিবীটাকে ভীষণ নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল তখন, আমার এত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল, কিন্তু কারো কোনো বিকার নেই। আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল অথচ জগতের নিয়মে এক চুল বিচ্যুতি হলো না। আমি চিৎকার করে কাঁদিনি, শোকের খবরটা বাবাকে জানানোর জন্য দৌড়ে ছুটে যাইনি, কেন কীভাবে মা এমন করল সেসব কোনো প্রশ্ন আমার মনে আসেনি, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, আমার হাঁটুর সব শক্তি মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল। পিঁপড়াদের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে সেই রক্তরেখার ওপর বসে পড়লাম। আঁচল থেকে বেরিয়ে পড়া মায়ের ঠান্ডা হাতটা আমার হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে সেখানে বসে রইলাম চুপচাপ।
বাবা আমাকে যখন আবিষ্কার করল তখন রোদ উঠেছে, কুয়াশার কোনো চিহ্ন নেই। হতবিহ্বল হয়ে সমস্ত দৃশ্যটাকে বোঝার চেষ্টা করছে বাবা। আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে, হ্যাঁ, কী হয়েছে?” আমি সেই প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারিনি।
