ডাকনাম ভুলে গেছি – ১২

বারো

আমি যখন আমার গাছ আর ছানাগুলোকে নিয়ে আহ্লাদ করছিলাম, প্রকৃতি নিশ্চয়ই তখন মুচকি হাসছিল। আমার মমতার উপলক্ষগুলোকে দলাই-মলাই করে এক রাতে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে সে এখন অনুশোচনাহীন নিষ্পাপ শিশুর মতো আবার নিজ খেলায় মন দিলো। সূর্য উঠছে, পৃথিবীর মানুষেরা খাদ্যের সন্ধানে ঘর ছাড়ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে এমন দুর্যোগের রাত শেষে ফেরিওয়ালা রঙিন ফিতা, চুলের কাঁটা, মুখের পাউডার বিক্রি করার জন্য হেঁটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। রান্নাঘরের ভাঙা চাল থেকে উঠছে ধোঁয়ার কুণ্ডলি। শিশুরা ভেঙে পড়া বৃক্ষের কাণ্ডে চড়ে উৎসব করছে, যেন গাছটা একটা পরাজিত দানব। পাখিরা অল্পকিছু শোক প্রকাশ করে আবার ডালে ডালে পোকা খুঁজে বেড়াচ্ছে, ভেজা খড় এনে নতুন বাসা বাঁধছে, সঙ্গীকে জানাচ্ছে সুরেলা আহ্বান। শেয়ালের দল খাবার খেয়ে কুলাতে পারছে না। প্রলয়, মহামারি তাদের কাছে আশীর্বাদের মতো। যে পরাশ্রয়ী লতা খুলে যাওয়া শাড়ির মতো লুটিয়ে পড়েছিল, সেটাও তার কচি বাহু বাড়িয়ে দিয়েছে নতুন অবলম্বনের প্রতি।

সবার দুঃখ মিটে গেছে, সব ক্ষত সেরে গেছে, আমার শোকও ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু সেই রাতের ঝড় আমার মনে যে দাগ রেখে গেছে তা মুছে হয়নি। কাউকে আমি আর উজাড় করে ভালোবাসতে পারি না, আমার মন অকাতরে মমতা বিলানোর মতো বেহিসাবি আর নেই। ঝড়ের কয়েকদিন পর আমার কয়েকটা মুরগিছানা ঠিকই ঘরে ফিরে এসেছিল, অধিকাংশ ধানগাছের হয়েছিল পুনর্জন্ম। আমি অখুশি হইনি, তাদের অবহেলাও করিনি, কিন্তু আগের মতো উদ্বেলিত আর হইনি। যে পরিমাণ বেদনা সইতে পারব, সেই অনুপাতে মমতা দিয়েছি মেপে মেপে। সেবার ফসল পেয়েছি সামান্য, কিন্তু সামান্যই আমার প্রয়োজন। আমার সাহসী মুরগিগুলো সারাদিনের অভিযান শেষে খোঁয়াড়ে ফিরে আসে, সকালে আমার জন্য রেখে যায় মসৃণ ডিম। আমি তাদের সংখ্যা বাড়াই, যাতে বনের পশু আর আমার মধ্যে কেউই বঞ্চিত না হয়।

ইখলাক হোসেনের মাধ্যমে গ্রামের সাথে আমার সূক্ষ্ম একটা সম্বন্ধ গড়ে উঠেছে। আমার ঘরের ডিম, সবজি, মাছ ইখলাক হোসেন নিয়ে যায় তার ঘরে, কোনো দয়ালু গৃহবধূ হয়তো সেগুলোকে রেঁধে দেয়। গ্রাম থেকে পিঠাপুলির সাথে কৃতজ্ঞতা আর আশীর্বাদও নিয়ে আসে ইখলাক হোসেন। ঘুড়ি ওড়ানোর মৌসুমে জমিদারবাড়িতে এসে পড়া ঘুড়িগুলোকে কেউ উদ্ধার করতে আসে না। আমি সব জমিয়ে রাখি, শূন্য নাটাই নিয়ে বসে থাকা ঘুড়ি হারানো হতাশ বালককে আমার কোষাগারের একটা ঘুড়ি আমি উপহার দেই। ঘুড়ি পাওয়ার আনন্দে কোনো ভয় তাদের মনে থাকে না। নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া চালতা ওপারের কিশোরীর হাতে গিয়ে আলতো ঠোকর দেয়। একটু দ্বিধার পরে চালতাটা কিশোরীর হাতে উঠে পড়ে। এইপারের হাসি ঐপার থেকে মাঝে মাঝে ফিরেও আসে।

কিন্তু এই সম্বন্ধটা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। যারা অন্ধকারে বাস করে, জ্যোৎস্নার আলো তারা সইতে পারে, কিন্তু অমাবস্যার অন্ধকার পেলে জ্যোৎস্নার জন্য মাথা কুটে মরে না, অন্ধকারেই তাদের স্বস্তি।

সেদিন ভরদুপুরে একটা ছোট নৌকা আমার ঘাটে ভিড়ল। ইখলাক হোসেন তার উৎকণ্ঠা ভরা মুখে একটা দুঃসংবাদ ঝুলিয়ে বের হয়ে আসলো। আমি অবাক হলাম, জোহরের ওয়াক্তে সে কোথায় যায়? আমাকে দেখে ইখলাক হোসেন ভেজা কণ্ঠে বলল, “বাড়ি যাচ্ছি, ভাই। দোয়া করবেন।”

জিজ্ঞাসা করলাম, “কিছু হয়েছে?”

“বাড়ি থেকে চিঠি আসছে। অতিসত্বর যেতে বলেছে।”

এইটুকু বলতেই একটা প্রবল কান্না তার কণ্ঠ চেপে ধরল। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম, “ভালো কোনো খবরও তো হতে পারে অথবা আপনার বউ ছলনা করে আপনাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।”

সে মাথা নাড়ল, বলল, “চিঠি মরিয়ম পাঠায় নাই, বাড়ির লোক পাঠাইছে। কয়েকদিন ধইরা তার চিঠি পাই না। আমার খুব ভয় লাগতাছে, ভাই।”

এইসব মুহূর্তে যেসব অবাস্তব, মিথ্যা কথা বলে সান্ত্বনা দিতে হয়, আমি তখনো সেসব শিখিনি। ইখলাক হোসেনের দুঃখী, সান্ত্বনাপ্রত্যাশী মুখটার দিকে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সেই ঘোর লাগা নিস্তব্ধ দুপুরে ইখলাক হোসেন আবার গিয়ে ঢুকল নৌকার ছইয়ের ছায়ায়। লগ্নির ধাক্কা ঝিমিয়ে পড়া নৌকাটাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বাঁক নিয়ে একসময় নৌকাটা আড়ালে চলে গেল। শেষ গাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর যে বিষণ্ণতা ছেয়ে যায় স্টেশনে, আমিও সে বিষণ্ণতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম নদীর পারে। আমার মনে একটা আশা জন্মালো, ইখলাক হোসেনের সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আবার উদয় হবে এই বাঁকে, হয়তো হাতে থাকবে বাতাসার ঠোঙা, আলখাল্লার পকেটে থাকবে স্টুডিয়োর কৃত্রিম জঙ্গলে তোলা ইখলাক আর মরিয়মের ফটোগ্রাফ, তাদের কোলে একটা ছোট শিশু, যার কপালের কোণে একটা বড় কালো চাঁদ উঠেছে।

তারপর মহিমগঞ্জে হেমন্ত গিয়ে শীত চলে এসেছে, কিন্তু ইখলাক হোসেন আর ফিরে আসেনি। সর্দারপাড়ার মসজিদে নতুন ইমাম এসেছে, গলায় সাপের চামড়ার মতো স্কার্ফ ঝুলিয়ে রাখে সবসময়, চোখে-মুখে গাম্ভীর্য এঁটে হাটের মধ্যে ঢিমেতালে হাঁটে। তার সুরমামাখা চোখ দিয়ে এমনভাবে তাকায় যেন সে ছাড়া বাকি সবাই পাপী। তাকে কেউ সালাম না দিলে মুখ গোমড়া করে কৈফিয়ত চায়, নসিহত করে যখন তখন। শুনেছি নতুন ইমামের কঠোর অনুশাসনে মক্তবে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, হুজুরের কাঁধে চড়ে পড়া মুখস্থ করার মতো বেয়াদবি এখন আর কেউ করে না। শিশুদের হাসাহাসির শব্দ আর পাওয়া যায় না, কান্না শোনা যায় প্রায়ই। অভিভাবকেরা যখন হুজুরের সাথে শিক্ষার্থীদের হাড় আর মাংস ভাগাভাগি করেছেন, তখন হুজুর বোধহয় এই চুক্তিটাকে একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছেন। অসুখ হলে পুরোনো নিয়মে উপযুক্ত হাদিয়ার বিনিময়ে পানি পড়া আর তাবিজ মিলে।

ইখলাক হোসেন নামে কেউ একজন এই তল্লাটে হেঁটেছে, আদর করে কায়দা পড়িয়েছে, হাসিমুখে চিঠি লিখে দিয়েছে, অন্যের অসুখ সারানোর জন্য বন থেকে দুর্লভ ভেষজসামগ্রী সংগ্রহ করে এনেছে—এইসব কথা কারো মনে থাকে না। বাজারে ইখলাক হোসেনের নাম আর শোনা যায় না। তার কী হলো, কোথায় হারিয়ে গেল, সে নিয়ে কেউ আর ভাবে না। ‘নতুন হুজুরের’ পদটা এখন অন্য কারো দখলে। তবুও আমার মনে হয়, হয়তো কৃমিতে পেট ভরে যাওয়া ছেলের মা, বাতের ব্যথায় কাতর বৃদ্ধ, জ্বরে ভুগে ভুগে জীর্ণ হয়ে যাওয়া বালকের হৃদয়ে মাঝে মাঝে সেই ‘নতুন হুজুরের’ হাসিমুখটা ভেসে ওঠে, অথবা সবাই হয়তো তাকে সত্যিই ভুলে গেছে। আমিও ভুলে যাই, একটা মানুষ আমার বনে ঘুরে বেড়াত। ইখলাক হোসনের স্মৃতিগুলো মাঝে মাঝে সেই পোয়াতি ভূতের মতো অলীক মনে হয়।

আমার ক্ষেতে আবার ধানের চারা মাথা তুলেছে, আমার মাচা ফসলে ভরে উঠেছে, খোঁয়াড়ে প্রতিদিন ছানা নিয়ে ফিরে আসে মা মুরগি। বইয়ের আলমারি থেকে একটার পর একটা বই নামাই আমি, এত বই আমার আছে যে সম্রাটের হেরিমেখানার মতো এক বই দ্বিতীয়বার পড়তে হয় না। একটামাত্র লোকের অনুপস্থিতি আমার জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না, কেবল আমার সকালগুলো আরেকটু নির্জন হয়ে থাকে।

হাটে আমার পিঠে কারো কৌতূহল লেপ্টে থাকে না আর। বাংলাদেশের একপ্রান্তে এই পাড়াগাঁয়ের পথ খুঁজে কীভাবে যেন একটা টেলিভিশন এই বাজারে এসে উপস্থিত হয়েছে, সেটা নিয়েই মেতে আছে সবাই। চায়ের দোকানে টেলিভিশন ঘিরে মানুষ মাছির মতো ভনভন করছে সারাক্ষণ। এতদিন তারা বেড়ার ঘরবাড়ি, ল্যাংটা ছেলেমেয়ে, গালভাঙা বউ, বছরান্তে একবার যাত্রার রংঢং, হাটবাজারে লুঙ্গি আর গামছা দেখে এসেছে। কিন্তু এই চৌদ্দ ইঞ্চি আজব চোখে তারা জীবনের নতুন কত যে তাজ্জব রূপ দেখতে পেল! টেলিভিশন দেখে তারা প্রথমবার উপলব্ধি করে তাদের বউ অসুন্দর, তাদের সন্তানেরা অপুষ্ট, তাদের ঘরবাড়ি ভাঙা, তারা নিজেরা হতদরিদ্র। তারা জানতে পারে তারা আসলে সুখে নেই এবং তাদের সব অসুখের কারণ বিরোধী দল নামক এক দলের ষড়যন্ত্র কিংবা সরকারি দলের অক্ষমতা। আগে রাজনীতি চায়ের দোকানের দুই-একজন বেকার লোকের গালগল্পে সীমাবদ্ধ ছিল, এই টেলিভিশনটা এখন তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। বটতলার নাপিত চুল কাটতে কাটতে দেশের অর্থনীতি নিয়ে জ্ঞান দেয় গ্রাহককে, কুমড়া বেচা শেষ হলেও টেলিভিশনে খবর না দেখে ঘরে ফেরে না মোখলেস মিয়া, মুদি-দোকানি গলা নিচু করে নতুন গোপন ষড়যন্ত্র সবার কাছে ফাঁস করে দেয়।

বাজারের মানুষ এখন দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে, পরম বন্ধু নিজ নিজ নেত্রীকে ভাগ করে নিয়ে এখন শত্রুতে পরিণত হয়েছে। বাজারে তর্কাতর্কি, মারামারি এখন নিত্য ব্যাপার। কিন্তু একটা ব্যাপারে প্রত্যেকে একমত, কারো মনেই আগের মতো শান্তি নেই। টেলিভিশনের সামনে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে তারা আলোচনা করে, কিন্তু অশান্তির কোনো কারণ খুঁজে পায় না। নেত্রীদের নিয়ে যুবকদের তেমন মাথাব্যথা নেই, তারা নিজেদের মধ্যে অভিনেত্রী ভাগ করে নিয়েছে। ভিউ-কার্ডের দোকানে তাদের পছন্দের অভিনেত্রীদের লাস্যময়ী স্থিরচিত্র পাওয়া যায়। মজুর খেটে, মায়ের আঁচলের গিট খুলে, বাজারের টাকা হতে পয়সা সরিয়ে তারা এইসব ছবি সংগ্রহ করে তোশকের নিচে জমায়। টেলিভিশনের নায়কের অনুকরণে আঁটসাঁট প্যান্ট পরে পা ফাঁক করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখা যায় তাদের। গেঁয়োদের মতো লুঙ্গি পরে উরু চুলকায় না তারা, তাদের উরু চুলকালে প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকায়। একটা সাদাকালো টিভি কত রং যে সাথে করে নিয়ে এসেছে!

এখনো হাটের দিন ডাকঘরটা ঘুরে আসি, মহিমগঞ্জের বাইরে যে দুনিয়া, সেখানের কোনো এক কোণে আমার বাবা এখনো হয়তো বেঁচে আছে, মৃত্যু ছাড়া পৃথিবীতে কোনো শেষ বিদায় নেই। তাই আমি এখনো একটা চিঠির প্রতীক্ষায় থাকি। পোস্ট-অফিস থেকে সেই পরিচিত প্রত্যাখ্যান নিয়ে ঘরে ফিরে আসি। আজ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ডাকপিয়নের দেখা পেলাম না, অবশ্য এমন আগেও হয়েছে। চিঠি বিতরণ করতে গিয়ে প্রায়ই তাকে আপ্যায়নের শিকার হতে হয়। চিঠি ভরা থলে নিয়ে বের হয়, ফিরে আসে থলে ভরা কৃতজ্ঞতা নিয়ে। তার খাকি থলে থেকে প্রায়ই উঁকি দেয় সদ্য বিচ্যুত লাউয়ের ডগা, তার ব্যাগের পেট স্ফীত করে দেয় পুরুষ্ট কুমড়া। মাঝে মাঝে তার থলে থেকে বেরিয়ে আসে রসনার অবাধ্য সুবাস।

পোস্ট-অফিসের সদর দরজায় আমাকে দেখেই তার হাসিমুখটা মলিন হয়ে যায়, তাকে কিছু বলতে না দিয়ে আমি হেসে ঘাড় কাত করি, “আচ্ছা, আচ্ছা, সমস্যা নেই।” বলে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে আসি। আজ ডাকপিয়নের মুখের হাসি কেড়ে নেওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করলাম না। পোস্ট-অফিসের বাইরে যে নবীন পাকুড়গাছটা তার বয়সের অনুপাতে বেশি গাম্ভীর্য ধারণ করে আছে, তার নিচে আসতেই ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনতে পেলাম আমি। সামনে তাকিয়ে দেখি বাজার থেকে একটা অস্থির সাইকেল তড়িঘড়ি করে ছুটে আসছে আমার দিকে। দুই চাকার ওপর পিয়নের ছোট দেহটাতে চঞ্চলতা বেশি। আমার সামনে তার অবাধ্য সাইকেলটা বহুকষ্টে থামালো লোকটা। একটু দম নিয়ে হাসিমুখে উঁচু গলায় নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “হাসান শেখ, আপনার নামে চিঠি আসছে।”

মনে হচ্ছে এই ছয়টা শব্দ উচ্চারণ করার জন্য সে কত কাল ধরে অপেক্ষায় ছিল। তার ঝোলা থেকে আমার জন্য একটা চিঠি বের করতে পারার গর্বে সে ধন্য হয়ে গেছে, তার ঘর্মাক্ত মুখের স্বস্তি দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র তার প্রসব বেদনা লাঘব হলো। আমার বিহ্বল হাত তার হাত থেকে একটা হলুদ খাম নিলো। সে জানালো সকাল থেকে হাটের মধ্যে সে আমাকেই খুঁজছে, আজ আর কোথাও যায়নি চিঠি বিলি করার জন্য। লোকটাকে কিছু বখশিস দেওয়ার জন্য পকেট হাতড়াতে লাগলাম, কিন্তু সে আমাকে থামিয়ে দিয়ে ভোট চাইতে আসা নেতাদের মতো বলল, “আমার জন্য দোয়া করবেন।” তারপর আবার দুই চাকায় চড়ে সে বাজারের পাশে গ্রামের মেঠো পথে গিয়ে উঠল, এবার তার সাইকেল চলছে শান্ত নদীতে ভেসে চলা ডিঙির মতো—সুস্থির, নির্ভার।

চিঠিতে অপরিচিত অক্ষরে আমার নাম লেখা, বামপাশে প্রেরকের নিচে ইখলাক হোসেনের নামটা চুপচাপ বসে আছে। বালক যেমন বহু আরাধ্য লজেন্স মুহূর্তেই ভোগ না করে জমিয়ে রেখে লজেন্সের মালিকানা উপভোগ করে, আমিও সহসা চিঠিটা খুলে পড়তে পারলাম না। সারাদিন চিঠিটা পড়ে ছিল আমার টেবিলের ওপর, আমি একটু পর পর গিয়ে হাতে নিয়ে ঠিকানাগুলো পড়েছি। ইখলাক হোসেনের নামের নিচে ঠিকানা লেখা আছে, প্রযত্নে: মেসার্স মোজাম্মেল এন্ড সন্স, ৭৩, রায় সাহেব বাজার, ঢাকা।

‘ঢাকা’ দেখে আমার শৈশব এসে উঁকিঝুঁকি করতে লাগল। অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, আমাদের ‘নতুন হুজুর’ ইখলাক হোসেনের ঢাকার মোজাম্মেল এবং তার পুত্রদের সাথে কী সম্পর্ক? যে কৌতূহলগুলো মরে গিয়েছিল ভেবেছিলাম, তা আবার জাগ্রত হয়েছে, তাকে কেন অতিসত্বর বাড়িতে তলব করা হলো? নাকি ইখলাক হোসেনের সঙ্গ পাওয়ার জন্য ছলনা করেছে মরিয়ম? তাদের কি ছেলে হয়েছে নাকি মেয়ে? বউ-বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় বাসা বেঁধেছে ইখলাক হোসেন, নাকি আবারও বিরহ বিছিয়েছে ঢাকা আর টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত একটা গ্রামের মাঝে?

বিকাল যখন পেকে মিষ্টি হয়ে গেছে, তখন আমি পুকুরঘাটে বসে চিঠির আঠা লাগানো প্রান্তটা খুব সাবধানে ছিঁড়লাম যাতে ভেতরের চিঠিটার কোনো ক্ষতি না হয়। ভেতরে কালো অক্ষরের চাদর জড়ানো একটা চারকোনা চিঠিকে বের করে আনলাম। অক্ষরগুলো গা ঠেসাঠেসি করে দুই পৃষ্ঠায় জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইখলাক হোসেন লিখেছে—

প্রিয় হাসান ভাই,

আসসালামুয়ালাইকুম, এখন রাত দুইটা বাজে। আমি মজুমদার ট্রেডার্সের সামনের সিঁড়িতে বসে আপনাকে চিঠি লিখছি। এই দোকানের ওপর একটা একশ পাওয়ারের লাইট সারারাত জ্বলে, তাই এখানে এসে বসেছি। আমি যেই মেসে থাকি সেখানে রাত দশটা বাজেই বাতি নিভে যায়। এক রুমে আমরা চারজন থাকি, সবাই সারাদিন খেটে রাতে এসে শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু আমার সহজে ঘুম আসতে চায় না, আলো না থাকায় বইও পড়তে পারি না। অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের গভীর শ্বাসে ঘরটা ভরে যায়, আমি বিছানায় শুয়ে চোখ মেলে চেয়ে থাকি অন্ধকারের দিকে। আজ অনেকক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করার পর মনে হলো কারো সাথে কথা বলা দরকার। এই ঢাকা শহরে মানুষের অভাব নাই, কিন্তু আমার মনের কথা বলার মতো একটা মানুষও নাই এখানে। আমি শুয়ে শুয়ে যখন কথার বলার মানুষ খুঁজছি, তখন বারবার আপনার চেহারাটাই ভেসে উঠল।

ভাই, আমি আপনার কাছে আগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। হঠাৎ করে চলে আসলাম, তারপর এতদিনে কোনো খবর দেই নাই। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, কেমন অবিবেচক, অকৃতজ্ঞ মানুষ অথবা কিছুই ভাবেন নাই, আপনি তো আর অন্যসব মানুষের মতো না, আপনার মতো আজব মানুষ আমি আর দেখি নাই। এই ঢাকা শহরের লাখ লাখ মানুষের মধ্যে আপনার মতো একটা মানুষও নাই।

যেদিন বাড়ি থেকে চিঠি পেলাম তখন আমি ওযু করেছি মাত্র। পিয়ন এসে চিঠিটা দেওয়ামাত্র অপরিচিত হাতের লেখা দেখেই বুকে একটা ধাক্কা লাগল। চিঠিতে যে একটা দুঃসংবাদ ছিল তা না খুলেই বুঝতে পারলাম। আনাড়ি হাতে আঁকাবাঁকা লাইনে বাড়ি যেতে বলা হলো, যে চিঠি লিখেছে বিস্তারিত লেখার ক্ষমতা তার নেই। প্রয়োজনের কথাটাই কোনোমতে লিখে পাঠিয়েছে, নাকি ইচ্ছে করেই আর বেশি কিছু লিখেনি? সাধারণত কারো অবস্থা গুরুতর না হলে এমন চিঠি কেউ পাঠায় না। ছুটির জন্য আমি আর অপেক্ষা করলাম না। তাড়াতাড়ি পলাশপুর পৌঁছানোর জন্য নৌকায় উঠলাম, কিন্তু নৌকা যেন চলেই না। মনের ভেতরে অনেকগুলো দুর্ভাবনা উঁকি দিতে লাগল। আব্বার কিছু হলো না তো? বৃদ্ধ বয়সে অনেকগুলো রোগ সঙ্গে নিয়ে বাস করেন, তাদের মধ্যে কোনো একটাও যদি বেঁকে বসে? গতবার বাবার কাছ থেকে যখন বিদায় নেই, বাবা বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেছিল, পরের বার আর দেখা হবে কি-না কে জানে! সেই নিরীহ কথাটাই তখন বুকের মধ্যে বিলাপ করছে। আবার মনে হলো আম্মার কথা, বাতের ব্যথায় কেমন কাতর হয়ে থাকে আম্মা, দড়ি দিয়ে এমনভাবে পা বেঁধে রাখে যে পা একসময় নীল হয়ে যায়। এছাড়া আম্মার কোনো বড় অসুখ আছে কি-না আমি জানি না। থাকলেও জানার উপায় নাই, আম্মা জীবনেও ডাক্তারের কাছে যায় নাই। বড় ভাই, ভাবি, তাদের ছোট মেয়ে ময়না—সবার কথা মনে আসে, কারো একজনের অনিষ্ট ভেবে শঙ্কিত হই। আর আমার মরিয়ম? তার চিঠি তো পাই না কয়েকদিন। তার কোনো অসুখ করল না তো? পেটের মধ্যে আমাদের ছোট বাবুটা ভালো আছে তো? নদীর দুই পারে আমি তাকিয়ে থাকি, কিন্তু কিছুই দেখি না। নাকি সময়ের আগেই সন্তান প্রসব করেছে মরিয়ম, এমন কথাও মাথায় আসে, হিসাব করে দেখি সাত মাস তো হয়েছে। গিয়ে হয়তো দেখব লাজুক মুখে মরিয়ম কাঁথা মোড়ানো একটা ছোট শিশুকে বুকের কাছে নিয়ে শুয়ে আছে। এত দুর্ভাবনার ভিড়ে এই একটা ভাবনা কিছুটা স্বস্তি দেয় আমায়। কিন্তু স্বস্তিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না; দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু, অকাল মৃত্যু ইত্যাদি সব সম্ভাবনা এসে স্বস্তিটাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়।

পলাশপুরের বাস হয়তো সবসময়ের মতোই যাত্রীদের জন্য ইঞ্জিন চালু রেখে অপেক্ষা করে, কিন্তু আমার চালু ইঞ্জিনের এই প্রতারণা সেদিন অসহ্য লাগছিল। বাসের সিটের মধ্যে বসে মনে মনে পায়চারি করেছি আমি, আমার অস্থিরতায় পাশের যাত্রী বিরক্ত হয়েছে, খোশগল্প শুরু করতে গিয়ে ধমক খেয়েছে। আমার চোখ তখন পথে, যে পথ আর কোনোদিন ফুরাবে না হয়তো। একসময় পথ ফুরায়, বাসের পর ট্রেনে চড়ি, তারপর টেম্পু, তারপর ভ্যান। তারপর দুই পায়ে হেঁটে পরের দিন সকালে আমাদের টিনের চাল চোখে পড়ল। বাড়িতে ঢুকে দেখলাম আমাদের হাঁস-মুরগিগুলো খোঁয়াড় থেকে বের হয়ে প্রতিদিনের মতোই ঘুরতে বেড়িয়েছে। গোয়াল থেকে গরু-ছাগল একটু পর পর জানান দিচ্ছে তাদের ক্ষুধা পেয়েছে। রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে, ভেতরে ভাবির উপস্থিতি টের পেলাম, ঘর থেকে আব্বার কাশি শুনে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম। মা ময়নাকে ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করছে। একে একে বেশ কয়েকটা দুঃসংবাদ খারিজ হয়ে গেল।

আম্মা বেরিয়ে এসে আমাকে দেখেই থমকে গেল কিছুক্ষণের জন্য। “এতদিনে আইছস, বাপ?” বলেই আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ শুরু করল। এমন বিলাপ আমি আগে শুনেছি, আমি বুঝতে পারলাম একটা মৃত্যুসংবাদ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ময়না ততক্ষণে চোখ ডলতে ডলতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, ভাবি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এসে ময়দা মাখা হাত দিয়ে আঁচল টেনে সেই আঁচলে চোখ মুছছে। আব্বার লাঠির শব্দ শুনতে পেলাম, তিনিও উঠেছেন শয্যা ছেড়ে। কিন্তু কোণের ঘর থেকে একটা অতিকাঙ্ক্ষিত লাজুক মুখ আর বেরিয়ে এলো না। আমি আম্মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মরিয়ম কই? আমার প্রশ্নে আম্মার কান্নার বেগ বৃদ্ধি পেল। আমি সবাইকে ছেড়ে আমার কোণের ঘরে গিয়ে দেখলাম ফুলতোলা চাদর টান-টান হয়ে আছে। বিছানার মাথার কাছে চালের মধ্যে গুঁজে রাখা কয়েকটা আগরবাতি সারারাত সুবাস বিলিয়ে নিঃশেষ হয়ে আছে।

বড় ভাই আর পাশের বাড়ির সোহরাব ভাই মিলে আমাকে ধরে একটা নতুন কবরের পাশে এনে দাঁড় করিয়ে দিলো। কবরের মাটি এখনো শুকায়নি, মাথার কাছে একটা মাটির হাঁড়ি উপুড় করে রাখা, ঠিক মাঝামাঝি একটা খেজুরের ডাল পোঁতা আছে। আমার মরিয়ম নাকি এখানেই আছে। সাত মাসের পোয়াতির যখন রক্তক্ষরণ শুরু হলো, তখন সবাই বুঝে গেছে সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না। ঘরের মানুষ, প্রতিবেশীরা চেষ্টার ত্রুটি করেনি, লাল শাহর দরগা থেকে তেল পড়া এনে পেটে ডলেছে, মোক্তার কবিরাজের পানি পড়া খাইয়েছে, মশিউর হুজুরের পড়ে দেওয়া সোনা-রূপার পানি দিয়ে পুরো শরীর মুছেছে, তারপরও রক্ত বন্ধ হলো না। মরিয়ম নাকি বিছানায় শুয়ে শুধু একটা কথাই বলত, আমার স্বামীকে খবর দেন, তারে একবার দেখি। যখন অবস্থা ভীষণ খারাপ, তখন সে বলেছিল, “তারে খবর দেন, মরণের আগে একবার দেইখা যাই।” তখন আমাকে চিঠি লেখা হয়েছিল। কিন্তু অনেক দেরি করে চিঠিটা পেয়েছিলাম ভাই। মরিয়মের সেই আকুতিটা শুধু কানে বাজে এখন, একবার আমাদের দেখা হলো না।

রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না আর। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জীবনে আর কখনো চাকরি করব না। গ্রামেও থাকতে পারলাম না, মানুষ সহ্য হয় না। আপনার মতো একটা প্রাসাদ থাকলে একা থাকতে পারতাম, কিন্তু সেই সামর্থ্য আমার নাই। তাই একা থাকার জন্য ঢাকা শহরে আসলাম। জঙ্গল আর নগর ছাড়া একা থাকার আর উপায় নাই, ভাই। এইখানে আমি সারাদিন পার্কে, রাস্তায় ঘুরে ফুল বিক্রি করি, জোব্বা পরা কারো কাছ থেকে মানুষ ফুল কিনতে চায় না। পরিচিত ফেরিওয়ালারা বলে জোব্বা খুলে আসতে, তাহলে বিক্রি ভালো হবে। কিন্তু জোব্বাটা আমি খুলতে পারি না, কোনোদিন হয়তো এক বেলা কম খাই, রাতে মোজাম্মেল তরফদারের ঘুপচি মেসঘরে ঘুমাই। তার বাড়ির সামনেই বিশাল চালের গুদাম, এই ঠিকানায় চিঠি লিখলে আমি পাবো, না পাঠালেও সমস্যা নেই। আপনাকে মনের কথা কয়েকটা বলতে পারলাম তাতেই খুশি আমি।

ভাই, একটা কথা আমি আপনাকে গোপন করেছি, সেই কথাটা বলতে চাই। একদিন ভরদুপুরে প্রচণ্ড রোদ, আপনার বাড়ির পেছনে জঙ্গলে কী একটা গাছ খোঁজার জন্য ঘুরছি, আপনি তখন সম্ভবত ক্ষেতে কাজ করছেন। আমি দেখলাম শিরীষগাছটার আড়ালে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দোয়া পড়ে বুকে ফুঁ দিতেই দেখলাম গাছের নিচে কেউ নেই, শ্যাওড়াগাছের ডাল বাতাসে দুলছে। তারপর আরো কয়েকদিন দেখেছি, আমি হয়তো ভুল দেখেছি, তবুও আপনি আমাকে দুর্বল ভাববেন, তাই ঘটনাটা আপনাকে বলিনি আর। আমার অনিষ্টের সাথে এই ঘটনাটার কোনো সংযোগ আছে, তা আমি বিশ্বাস করি না। অনিষ্ট সবার জীবনেই হয়, যারা জমিদারবাড়িতে ঢোকেনি, সেই মেয়েটাকে কখনো দেখেনি, তাদের জীবনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, তা তো নয়।

জানি না জীবনে আর কখনো আপনার সাথে দেখা হবে কি-না, তবে মনে সবসময় আশা রইল আমার। আপনার সাথে দেখা হয়েছে এটা আমার জীবনের অন্যতম সৌভাগ্যের ঘটনা। একটু পরে ফজরের আজান দিবে, কাগজেও আর জায়গা নেই। ভালো থাকবেন।

ইতি

ইখলাক হোসেন।

কাগজের অভাবে ইখলাক হোসেন ঘটা করে বিদায় নিতে পারল না। আমার পুকুরঘাটে সন্ধ্যা নেমেছে, আমি সেই আবছা অন্ধকারে চুপচাপ বসে রইলাম। ঝিঝিপোকারা জেগে উঠেছে, একটা পানকৌড়ি পথ হারিয়ে একটু পর পর ডাকছে, কিন্তু তার আত্মীয়স্বজনদের সাড়া পেল না। খুব বিষণ্ণ শোনালো ডাকটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *