ডাকনাম ভুলে গেছি – ১৬

ষোলো

একসাথে চাঁদ দেখলে বোধহয় মানুষের মধ্যে দূরত্ব কিছুটা কমে যায়। পরদিন দুটো মগ হাতে হীরা পুকুরঘাটে চলে এলো, মগের ওপর বাষ্প নাচছে। হীরার মুখে একটা মৃদু হাসি প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। আমার হাতের সিলভিয়া পাথকে আপাতত রেহাই দিলাম। একটা মগ সিমেন্টের দেহের ওপর রেখে সে পাশে বসলো।

“নিন চা খান,” হাসিমুখে বলল হীরা।

“চা কোথায় পেলেন, আমার ঘরে তো চা নেই।”

হীরার মৃদু হাসি আরো একটু বিস্তৃত হলো। বলল, “এটা অপরাজিতা ফুলের চা, সাথে একটা করে বকুল ফুলও দিয়েছি।”

“এত সুন্দর ফুল খেয়ে ফেলব?”

“হ্যাঁ, আমার তো যে-কোনো সুন্দর জিনিস দেখলেই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে।”

মগের কানে ধরে নীল রঙের তরলে চুমুক দিতে যাচ্ছিলাম, হীরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “একটু পরে খান, চা খাওয়ার অভ্যাস নেই আপনার, জিহ্বা পুড়ে যাবে।”

গতরাতের চায়ের জ্বলুনি এখনো মিটেনি আমার, মগটা নামিয়ে রাখলাম। হীরা আমার কোলের বইটা উঠিয়ে নিজের কোলে নিলো। দুই-এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আবার রেখে দিলো মাঝখানে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি এত বই পড়েন, তাহলে কোনো চাকরি করেন না কেন?”

আমার বুক থেকে ফরফর করে উড়ে যাওয়া একঝাঁক কবুতরের মতো হাসি বেরিয়ে আসলো। হীরার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল দেখলাম। বলল, “হাসান সাহেব, আপনি কি জানেন আপনার হাসি কত সুন্দর?”

“না, কেউ বলেনি।” বিব্রত কণ্ঠে জানালাম আমি।

“হাসলে আপনার চোখ বন্ধ হয়ে যায়।” একটু থেমে বলল, “এবার বলুন, হাসলেন কেন?”

“বই পড়লেই কি চাকরি করতে হয়?” বললাম আমি।

“তাইতো দেখি। চাকরি করার জন্যই তো মানুষ পড়ে, তারা কেউ কৃষিকাজ করে না। যারা চাষবাস করে তারা কেউ পড়ে, এমনটাও শুনিনি। আপনাকে দেখলাম, পড়েন আবার কৃষিকাজও করেন। খুব অদ্ভুত মানুষ আপনি।”

“যদি সবাই পড়ত, তাহলে আমাকে আর অদ্ভুত লাগত না। আপনি পড়েন না?”

“নাহ! পরীক্ষায় পাসের জন্য যতটুকু পড়া লাগে শুধু ততটুকুই পড়েছি। আচ্ছা, আপনি এত কঠিন কঠিন বই পড়েন, অনেক ডিগ্রি আছে নিশ্চয়ই আপনার। আপনি কি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন?”

“আমার কোনো ডিগ্রি নেই, স্কুলও পাস করতে পারিনি আমি।”

“অসম্ভব।” হীরার চোখে-মুখে বিস্ময় লেগে আছে, কিছুটা করুণাও। কোলের পাশে ফেলে রাখা মগটাকে ভুলে গেছে সে। নীল অপরাজিতার নির্যাস শোকে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

“হাসান সাহেব, আমার সম্পর্কে কিছু জানতে ইচ্ছা করে না আপনার?” জিজ্ঞাসা করল হীরা।

“করে।”

“কিন্তু আমার কিছু জানাতে ইচ্ছা করে না। আপনার এই জগতে আমার আয়ু অল্প কয়দিনই থাকুক, এটা আমার ভিন্ন একটা জীবন। একদিন গভীর রাতে শুরু হয়েছিল, আরেকদিন গভীর রাতে শেষ হয়ে যাবে। সেই হিসেবে আজই আমার এই জীবনের শেষদিন।”

যে-কোনো জীবনের শেষ কল্পনা করলেই মানুষ উদাস হয়ে যায়, এমনকি সূর্য অস্ত গেলেও মানুষকে বিষণ্ণতা গ্রাস করে। হীরার চোখে হঠাৎ করে মেঘ জমেছে, পুকুরের ঐপারে কোমরবাঁকা বরইগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। পুকুরের পানিতে কোঁকড়া চুলের ঢেউ, গাছের ছায়া নাচানাচি করছে। একটা দীর্ঘশ্বাসে পুকুরের এই পারটা বিষণ্ণ হয়ে গেল।

হীরা বলল, “আমি আপনাকে চিঠি লিখব, ইন্ডিয়া থেকে এখানে চিঠি পৌঁছায় কি-না কে জানে?”

বললাম, “চিঠি আসলেও আমি হয়তো পাবো না। নদী পার হয়ে কোনো চিঠি এই বাড়িতে আসে না।”

হীরা ভ্রূ কুঁচকালো। জিজ্ঞাসা করল, “কেন?”

বললাম, “শুধু চিঠি না, এখানে ঘুড়ি ছিঁড়ে পড়লেও কেউ নিতে আসে না, গ্রামের সব সামাজিকতা, কৌতূহল, লোভ, আইন-সালিশ—কোনো কিছুই এই নদী ডিঙাতে পারে না। পাখি, ফুলের রেণু, ছেঁড়া ঘুড়ি আর বাতাস ছাড়া ওপার থেকে এখানে কেউ আসে না।”

হীরা বলল, “তাইতো, আমি এতদিন এখানে আছি, একটা মানুষ দেখিনি এই বাড়িতে। কেন বলুন তো?”

“একটা প্রচলিত গল্প আছে, গল্পটা বলতে চাচ্ছি না, শুনলে হয়তো ভয় পাবেন পরে।”

“না, বলুন আপনি, আমি শুনতে চাচ্ছি। ভয় পাওয়ার জন্য এখানে তো থাকব না আমি।” হীরা জোর করে শুনতে চাইল।

আমি তাকে চরিত্রহীন জমিদার এবং অসহায় নিচু জাতের মেয়ের গল্পটা বললাম। গল্প শেষ হতেই দেখি হীরার মুখ থমথম করছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী হয়েছে?”

উদাস কণ্ঠে বলল, “হাসান সাহেব, আমি মেয়েটিকে দেখেছি।”

বললাম, “হতেই পারে না, কোথায় দেখেছেন?”

“সে-কথা আমি আপনাকে বলব না।”

“আপনি কি ভয় পেয়েছেন?”

মাথা নেড়ে হীরা বলল, “না, দুঃখ পেয়েছি।”

আকাশে আজও চাঁদ আছে, জোছনারও কমতি নেই। আমাদের বিমোহিত করার জন্য ফসলের মাঠ, লোকালয় সাদা শাড়িতে সেজেছে, কিন্তু সেই সাজ দেখার অবসর আমাদের নেই। আমি তাকিয়ে আছি নদীর সবচেয়ে দূরের বাঁকটির দিকে, একটা ছায়ার অপেক্ষা করছি আমরা। হীরা যে জামা পরে আমার বারান্দায় এসেছিল, আজ সেই জামাটাই পরেছে। গায়ে আজও কোনো গয়না নেই, হাতের ঘড়িটাও খুলে রেখেছে। সে জানিয়েছে, এইসব গয়না আর কোনোদিন সে গায়ে চড়াবে না।

বারবার ঢোক গিলে হীরা বোধহয় তার ভয়টাকে বুকে ঠেলে দিচ্ছে কিংবা কান্না দমন করছে। হীরা আমার দিকে তাকাচ্ছে না, ভাঙা কংক্রিটের ওপর বসে নদী দেখছে সে, হয়তো তাও দেখছে না। তার একটা হাত আরেকটা হাতকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। নদীর ওপারে সবগুলো ঘর এখনো ঘুমায়নি, যেসব ঘরের ওপর টেলিভিশনের এন্টেনা আকাশের দিকে হাত পেতে আছে, সেইসব ঘরের আশেপাশে ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসিরা ঘুরে বেড়ায়, ঘরে ঢুকতে পারে না। বিদ্যুৎ আসার পর গ্রামে ঘুমের কদর কমে গেছে। যত রাত হলে বাচাল টেলিভিশনটাও আর জেগে থাকতে পারে না, সুইচ টিপে ঘরের বাতিটাকে অন্ধ করে দেওয়া হয়, এখন তত রাত। সচ্ছল ঘরের বাইরে একটা বাতি পাহারা দিচ্ছে, বাকি পুরো গ্রাম অন্ধকার হয়ে গেছে। জোছনা সুযোগ পেয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে।

আমাদের কাঙ্ক্ষিত ছায়াটা এখনো উদয় হয়নি। হীরার ধৈর্যের বাঁধন আলগা হয়ে গেছে, উঠে দাঁড়িয়ে সে পূর্ব-পশ্চিমে পায়চারি করতে লাগল। একসময় আমার কাছে এসে থেমে বলল, “হয়েছে, চলুন তো চলে যাই। ঐ লোক আসবে না। একটা মাতাল, লম্পট লোক, তাকে ভরসা করা যায় না।”

রশীদ মিয়া মাতাল সন্দেহ নেই, তার লাম্পট্যকেও অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তাকে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোনো উপায় আমাদের কাছে নেই। হীরাকে বললাম, “আরেকটু দেখি। আর আপনি ভয় পাবেন না, রশীদ মিয়া আপনাকে ‘মা’ ডেকেছে। গ্রামের মানুষজন এইসব ডাকাডাকির সম্পর্ককে খুব সিরিয়াসলি মেইন্টেইন করে। এক ছটাক জমি নিয়ে তারা আপন ভাইয়ের মাথা ফাটায়, আবার কোথাকার কোন ধর্মের ভাই-বোনকে সম্পত্তি লিখে দেয়। গ্রামের মানুষজনের মধ্যে অদ্ভুত সব কন্ট্রাডিকশন আছে। মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে জর্জ সিমেন বলেছেন—”

হীরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “হাসান সাহেব, স্যরি, কিন্তু প্লিজ আপনার সমাজবিজ্ঞান বইটা এখন বন্ধ রাখুন। আমার বোধহয় প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। এই টেনশন আমি আর নিতে পারছি না। এখন মনে হচ্ছে আমি একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। কোনোকিছু না ভেবে এখানে চলে এসেছিলাম, বিপদে পড়েছি। এখন ইন্ডিয়ায় চলে যাচ্ছি, সেখানে গিয়ে যে কী বিপদে পড়ি!”

বললাম, “আপনি শান্ত হয়ে বসুন। একেবারে না ভেবে আপনি আসেননি, টাকা নিয়ে এসেছেন, দালালের সাথে যোগাযোগ করেছেন। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েই ঘর ছেড়েছেন। এখন টেনশনে আছেন তাই নানা ধরনের দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আপনি গান জানেন? গান গাইলে মনটা শান্ত হবে।”

হীরা আবার বসে পড়ল, জিজ্ঞাসা করল, “দুশ্চিন্তা দূর করার এই পদ্ধতি আপনি কোথায় শিখলেন? বই পড়ে?”

“হ্যাঁ।”

“শুনুন, বইয়ের সব কথা সত্যি ধরে নিবেন না।”

“আপনি চেষ্টা করেই দেখুন না। গুনগুন করেই গান।”

“মনে মনে গাইলে হবে?”

“হতে পারে।”

হীরা মনে মনে গান গাইছে কি-না আমি বুঝতে পারছি না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল। হঠাৎ নদীতে বৈঠার ছপ-ছপ শব্দ শুনতে পেলাম আমরা। দেখলাম নদীর বাঁক থেকে একটা ছোট ডিঙি নৌকা জলপোকার মতো পানি কেটে এগিয়ে আসছে। একটামাত্র বৈঠা অনিচ্ছুক গোঁয়ার নৌকাটাকে ঠেলে ঠেলে আনছে। রশীদ মিয়ার ঘামে ভেজা তেলতেলে চেহারায় জোছনা পিছলে যাচ্ছে, ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে তার মন্থর ডিঙি। হীরা উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।

“প্লিজ, আমাকে এই লোকটার সাথে একা ছেড়ে দিবেন না।” অসহায় কণ্ঠে তার আকুতি জানালো সে।

রশীদ মিয়া ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে হীরাকে লক্ষ করে তার কালো দাঁতগুলো মেলে ধরল। রশীদ মিয়া হয়তো হীরার কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য অথবা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করার জন্যই মুখে হাসি লাগিয়ে বসে আছে। কিন্তু তার বিশ্বাসঘাতক হাসিটা তার পক্ষে খুব বেশি সুবিধা করতে পারছে না। হীরা আমার আরো কাছে ঘেঁষে এসেছে, বাতাসের মধ্যেও তার কাঁপুনি টের পেলাম আমি। কানের কাছে ফিসফিস করে সে তার আবেদনটা আরো একবার জানিয়ে দিলো আমাকে।

“প্লিজ, আপনিও চলুন।”

হীরার শঙ্কিত কণ্ঠটাকে আমি অবহেলা করতে পারলাম না। রশীদ মিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই নৌকায় তিনজনের জায়গা হবে?”

অতিরিক্ত দুই যাত্রী ওঠায় নৌকাটা গা ঝাড়া দিয়ে প্রতিবাদ জানালো। হীরা নৌকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের দেহের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। রশীদ মিয়া শান্ত গলায় বলল, “আম্মাজি, আপনে জুত কইরা বইসা যান, ডরায়েন না।”

আমি নৌকার মাথায় চেপে বসেছি, রশীদ মিয়া একটা বৈঠা দেখিয়ে দিলো আমায়। আমাকে পেয়ে স্রোতের সাথে তার লড়াই আরো সহজ হয়ে গেল। সামনে বসে আমি দাঁড় টানতে লাগলাম, নৌকার গতি বৃদ্ধি পেল। নৌকার তলায় নদী খিলখিল হাসছে। যত এগিয়ে যাচ্ছি, দুই পার তত উঁচু হতে লাগল। নৌকার মাঝখানে হীরা হাত-পা গুটিয়ে স্থির হয়ে বসে আছে। পেছন থেকে রশীদ মিয়া বলে উঠল, “আম্মাজি, সিকারেটের টক উটছে, কিছু মনে কইরেন না, একটা ধরাই।”

শব্দ করে দেয়াশলাই জ্বলে উঠল। এক মুহূর্তে জোছনাকে রক্তাক্ত করে আবার নিভে গেল স্বল্পায়ু আগুন। রশীদ মিয়া নিচু গলায় কৈফিয়ত দিলো, “বারো বছর বয়স থেইকা তামাক খাই, এইডাই আমার সব থেইকা পুরান নিশা। ধুয়া না খাইলে মাথামুথা গরম হইয়া যায়।”

সে আরো জানালো, আজ বহুদিন পর সন্ধ্যার পর মদ ছোঁয়নি। হীরার সামনে সে মাতাল হয়ে আসতে চায়নি। কাজটা শেষ করে ঘরে ফিরে যাবে সে, আজ সে নিজের ঘরে ঘুমাবে। অতীতের আক্ষেপগুলোও সুযোগ পেয়ে সব উগড়ে দিতে লাগল রশীদ মিয়া। জানালো, তার জীবনটা নষ্ট করেছে মোল্লাবাড়ির লায়লা। অল্প বয়সে লায়লাকে মন দিয়েছিল রশীদ মিয়া, লায়লার চেয়ে ‘পরিষ্কার’ চামড়া নাকি এই অঞ্চলের কোনো মেয়ের ছিল না। লায়লাকে বশ করতে রশীদ মিয়া তার সব পরিশ্রম ব্যয় করেছে; চুড়ি, ফিতা আর লিপস্টিক কিনে দিয়েছে। খুড়মা, জিলাপি, কদমা, বাতাসা দিয়ে লায়লার মন নরম করে এনেছিল সে। বাড়ির পেছনের বাগে লায়লা তাকে একবার হাত ধরতে দিয়েছিল, সাথে দিয়েছিল ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই লায়লাকে যখন মোসলেম উদ্দিনের বখাটে ছেলেটার হাত ধরে পাটক্ষেতে ঢুকতে দেখেছিল, রশীদ মিয়ার পুরো দুনিয়া হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল। জীবনে আর কোনো নারীকে সে বিশ্বাস করতে পারেনি। একটার পর একটা নেশার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে সে বলল, “নারী বেঈমানি করছে, কিন্তুক নিশা বেঈমানি করে নাই। একবার ধরছে আমারে, আর ছাড়ে নাই।”

জলের আঁকাবাঁকা শিরা বেয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। রশীদ মিয়া বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পারছে না, বারবার সে সাহস দিচ্ছে হীরাকে। “ডর-ভয়ের কুনো কাহিনি নাই, দুই পারেই আমার সেটিং আছে। বডার পার হইলে রতন হালদার আপনারে লইয়া যাইবো, সব ঠিক কইরা রাখছি।”

নদীর বুকে বৈঠা চালিয়ে আমরা একটা বাঁকে এসে পৌছালাম। এখানে এসে রশীদ মিয়া তার হাতের সিগারেটটা পানিতে ছুড়ে ফেলল। আমাকে ইশারায় বৈঠা উঠাতে বলল। বাঁক পার হলেই দেখলাম দূরে একটা বিডিআর ক্যাম্পে আলো জ্বলছে। রশীদ মিয়া নৌকাটা একটা পারে ঠেকালো, আমাদের নৌকাতে বসে থাকতে বলে সে নেমে গেল, তারপর ঝোপঝাড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। ক্যাম্পে আলো নদীতে বহুখণ্ড হয়ে জ্বলছে, চারপাশে অসংখ্য ঝিঁঝিপোকা অবিরাম চিৎকার করছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে শেয়ালের হাঁক। হীরা আর আমি সেই ঝোপটার দিকে তাকিয়ে আছি, যেখানে রশীদ মিয়া ডুবে গেছে। আমরা কেউ কারো সাথে কথা বলছি না, নিঃশ্বাস ফেলছি সাবধানে। আকাশের চাঁদটা প্রচণ্ড কৌতূহলে আমাদের দিকে ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়ে আছে। নৌকার নিচে পানির স্রোত ভীষণ ব্যস্ত, মানুষের এইসব কর্মকাণ্ডে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। মনে হলো অনন্তকাল পার হয়ে গেছে। সন্দেহ হলো, রশীদ মিয়া বোধহয় আর ফিরে আসবে না। একটা ছোট ডিঙিতে অনিশ্চয়তায় ভাসছি আমরা, প্রকৃতির এই নিদারুণ মূর্তিগুলোর মধ্যে নিজেদের কীটপতঙ্গের মতো অসহায় লাগছে। ভাবছি, নৌকাটাকে বাঁধনমুক্ত করে স্রোতে ছেড়ে দিলেই আমাদের ঘরে পৌঁছে দিবে।

ঠিক সেই সময় ঝোপটা নড়ে উঠল, আমার সন্দেহটাকে নাকচ করে দিয়ে রশীদ মিয়া বের হয়ে আসলো। রশীদ মিয়াকে দেখে মনে এত আনন্দ হবে ভাবিনি কোনোদিন। তার কালো দাঁতের চরিত্রহীন হাসিটাকেও মধুর লাগছে এখন। হাসিমুখে রশীদ মিয়া জানালো, “এই পারে সব ঠিক, কুনো সমইস্যা নাই।”

রশীদ মিয়ার ভারে নৌকাটা টলে উঠল আরেকবার। বিডিআর ক্যাম্পটাকে বামে রেখে আমরা ডানদিকে মোড় নিলাম, ক্যাম্পের আলো আমাদের পেছনে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। নদী এখন কিছুটা চওড়া হয়েছে। রশীদ মিয়া জানালো, ওপারেই ইন্ডিয়া। আমি চেয়ে দেখলাম, দুই পারে একই রকম জোছনা, গাছপালার একই রকম রং, নদীর নিচ দিয়ে হাত ধরাধরি করে আছে একই রকম মাটি। ওপারটাকে আমার কোনোমতেই ভীনদেশ মনে হচ্ছে না। নদীর ছোট ছোট ঢেউগুলোকে চাপা দিতে দিতে আমরা এগোলাম ইন্ডিয়ার মাটির দিকে। আমাদের নৌকা একসময় ইন্ডিয়ার বেলে মাটিতে মাথা ঠেকালো। নৌকাটাকে বেঁধে আমরা বালুচরে নামলাম। বালুচরের পাশেই লম্বা গাছের ঘন জঙ্গল, এই উজ্জ্বল জোছনার মধ্যেও জঙ্গলটা মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। রশীদ মিয়া জানালো, এই জঙ্গলের শেষ সীমানায় রতন হালদার বসে অপেক্ষা করছে। জঙ্গলে বিএসএফ ছাড়া আর কোনো ভয়ানক প্রাণী নেই। আজ এখানে যাদের ডিউটি, তাদের সাথে রশীদ মিয়ার সন্ধি আছে, সুতরাং চিন্তার কোনো কারণ নেই। এত অভয় দেওয়ার পরও আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। হীরা একেবারে চুপ হয়ে গেছে, কালো জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে একটু পর পর কেঁপে উঠছে শুধু। এই ঘন বনের অপরিচিত, রহস্যময় অন্ধকারে প্রবেশ করতে হবে শুনে আমার বুকটাও কিছুটা কেঁপে উঠল। জমিদারবাড়িতে জঙ্গলের সাথেই আমার বসবাস, কিন্তু সেই জঙ্গলের অন্ধকার পোষা এবং পরিচিত। কিন্তু এতদূর এসে পিছুটান দেওয়ার মতো স্বার্থপর আমি হতে পারিনি। সুপুরুষের সুনাম আমার নেই, কিন্তু কাপুরুষতার দুর্নাম আমি সইতে পারব না। বালুচরে নিজেদের পায়ের ছাপ রেখে আমরা চলে আসলাম বনের প্রান্তে। বনের ভেতর গুমোট বাতাস পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গাছগুলো কটমট করে তাকিয়ে আছে মোটা গোঁফওয়ালা পাহারাদারের মতো। রশীদ মিয়ার কোমরে একটা লম্বা টর্চ বাঁধা আছে, কিন্তু অন্ধকারে পা দিয়েও সেটা জ্বালাচ্ছে না সে। পকেটে তার ঘুমন্ত দেয়াশলাইয়ের পাশে শুয়ে আছে সিগারেটের প্যাকেট। ধোঁয়ার নেশাটাকে আপাতত ধামাচাপা দিয়েছে সে, সচেতন পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে, রাস্তা তার চেনা আছে।

হঠাৎ একটা তীব্র টর্চের আলো জঙ্গলের অন্ধকারকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলো। সাথে সাথে আরো বেশ কয়েকটা টর্চ জেগে উঠে ত্রস্ত হয়ে আমাদের খুঁজতে লাগল। একটা আলো আমাদের বিদ্ধ করার পর আরো কয়েকটা তাকে অনুসরণ করে আমাদের ওপর হামলে পড়ল। আলোর আক্রমণে আমরা পাথর হয়ে গেলাম, বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, নড়তে পারছি না। গাছের মতো আমাদের পায়েও যেন শিকড় গজিয়েছে। আলোর বশ থেকে প্রথম মুক্তি পেল রশীদ মিয়া, সে তার কোমর থেকে টর্চ বের করে নির্দিষ্ট ছন্দে জ্বালালো আর নেভালো। কিন্তু আমাদের ওপর থেকে আলো সরলো না, দূরে অন্ধকার থেকে পাঞ্জাবি ভাষায় কেউ একজন বলে উঠল, “উলু কা পাঠঠা, রুখ।”

আমি তাকিয়ে দেখি রশীদ মিয়ার মুখে আত্মবিশ্বাসের কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই। আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “খাইছে।” অর্থাৎ কোনো একটা সর্বনাশ ঘটে গেছে। আমি তার কাছে ‘খাইছে’-এর তাৎপর্য জানতে চাইলাম। এলোমেলোভাবে রশীদ মিয়া যা জানালো তার মানে হলো, যাদের সাথে তার সন্ধি হয়েছে এরা সেই দলের নয়। আজ হয়তো কোনো কারণে ডিউটি বদলে গেছে।

“এখন তাহলে কী হবে?”

এই প্রশ্নে রশীদ মিয়া নীরবতা পালন করল। আলোগুলো এগিয়ে আসছে, রশীদ মিয়া এতক্ষণে कर्तव्य ঠিক করতে পেরেছে, পেছনে ঘুরে দৌড়াতে শুরু করল সে। হীরার হাত ধরে আমিও ছুটতে লাগলাম। পেছনে আলোগুলোও চঞ্চল হয়ে উঠল; হিন্দি, উর্দু, আর পাঞ্জাবি ভাষায় গালাগালি ভেসে আসতে লাগল। এতক্ষণ পরে আমার মনে হলো আমি ইন্ডিয়াতে আছি। আমরা জঙ্গল থেকে বের হয়ে বালুচরে নামলাম, পেছনে জঙ্গলে বিক্ষিপ্ত আলো নাচছে আর ভিনদেশি ভাষা আমাদের থামতে বলছে। তাদের আহ্বান উপেক্ষা করে আমরা ছুটছি, কিন্তু তারপর প্রচণ্ড শব্দে আমাদের ধমকে উঠল একটা বন্দুক। বন থেকে বেশকিছু পাখি ডানা ঝাপটে ওপারের দিকে ছুটল। একমুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে আমরা আরো দ্রুতবেগে ছুটতে শুরু করলাম। বন্দুক শুধু একটা ভাষাই জানে, তার মুখোমুখি আমরা হতে চাই না। মানুষের গালি সহ্য করতে পারলেও বন্দুকের গুলি আমাদের সইবে না। নদীর কিনারায় এসে আমি নৌকার দড়ি খুলতে যাচ্ছিলাম, রশীদ মিয়া বলল, “আরে, নাওয়ের কাম নাই, পানিত নাইমা ডুব দেও।”

হীরা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে এখনো। তাকে নিয়েই পানিতে ঝাঁপ দিলাম। পানিতে নামার পরও বন্দুক আরো দুইবার গর্জে উঠল। আকাশে চাঁদ তেমনই ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়ে আছে, তার কোনো বিকার নেই। একবার ডুব দিয়ে উঠেই হীরা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে কোনোমতে জানালো সে সাঁতার জানে না। রশীদ মিয়া পাশ থেকে জানালো, এই নদীতে সাঁতার না জানলেও চলবে, মাঝনদীতেও ঠাঁই পাওয়া যাবে। নদী তার সমস্ত শরীর দিয়ে আমাদের বাধা দিচ্ছে, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে পানি ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি। চোখের সামনে নিজের দেশ, কিন্তু মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে পানির সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছি আমরা। পারের কাছাকাছি আসার পর মনে হলো আমাদের আরো একবার জন্ম হচ্ছে। পানি এখন আমাদের ক্লান্ত পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। হীরা বসে পড়েছে নদীর নিচে বিছানো পাথরের ওপর, জোরে শ্বাস টেনেও কুলাতে পারছে না সে।

ঠিক তখন রশীদ মিয়ার স্বগতোক্তি শুনলাম, “কাম সারছে।” রশীদ মিয়া নদীর ওপর এলিয়ে পড়েছে। দূর থেকে মনে হলো তার গায়ের জামাটা রং ছেড়ে দিয়েছে। তার গা থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়া পানির বিন্দুগুলো অতিরিক্ত কালো দেখাচ্ছে। কাছে যেতেই দেখলাম রশীদ মিয়া পেটের কাছটায় হাত রেখে হাঁপাচ্ছে। চাঁদের আলোতে শার্টের ছিদ্রটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রশীদ মিয়ার চোখে-মুখে ভয় আর কণ্ঠে আকুতি, “আমারে কিছু একটা করো, গুল্লি লাগছে আমার।”

গুলিটা তার কোমরের কাছ দিয়ে ঢুকে সম্ভবত পেট দিয়ে বের হয়ে গেছে। আমি তার পেট চেপে ধরতেই ব্যথায় চিৎকার করে উঠল রশীদ মিয়া। আমার হাত ভিজে গেল রক্তে। হীরা কাছে এসে রক্ত দেখে আবার পিছিয়ে গেল, পানিতে বসে পড়ে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বারবার আওরাতে লাগল, “ও আল্লাহ, ও খোদা!”

আমি রশীদ মিয়াকে টেনে পারের কাছে নিয়ে আসলাম। রশীদ মিয়া দুর্বল কণ্ঠে বারবার বাঁচার জন্য প্রার্থনা জানাচ্ছে আমার কাছে। আমি তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছি, “কিচ্ছু হবে না। আপনি শক্ত থাকুন।” ঠান্ডা মাটিতে শুয়ে রশীদ মিয়ার শরীরটা কেঁপে উঠছে। “এত শীত লাগতাছে ক্যান? একটু আগুন ধরাও, একটা সিকারেট ধরাইয়া দ্যাও আমারে।”

রশীদ মিয়ার সিগারেট প্যাকেট, দেয়াশলাইয়ের বাক্স সব পানিতে ভিজে গেছে। আমি একটার পর একটা কাঠি ঘষতে লাগলাম, কিন্তু আগুন জ্বলছে না। রশীদ মিয়ার বুক প্রচণ্ডভাবে ফুলে উঠে আবার চুপসে যাচ্ছে। আমি আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছি, ভেজা বারুদ কাঠি থেকে বারবার খসে পড়ছে। অবশেষে সবগুলো কাঠি যখন শেষ হয়ে গেল, দেখলাম রশীদ মিয়ার বুকের ওঠা-নামা বন্ধ হয়ে গেছে। রশীদ মিয়ার হাত, পা, নাক, মুখ—সব একই আছে, তবুও তাকে অন্যরকম লাগছে। আমি তার পাশে বসে পড়লাম। হীরা রশীদ মিয়ার দিকে তাকাতে পারছে না, আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে? কী হয়েছে রশীদ মিয়ার?”

আমার থমথমে মুখ দেখে সে হয়তো বুঝতে পেরেছে। আমার পাশে বসে পড়ল সে, বলল, “হাসান সাহেব, বলুন এইসব কিছুই সত্যি না। দিস ইজ নট হ্যাপেনিং।”

আমি তার হাতটা ধরে বললাম, “প্যানিক করবেন না, শান্ত থাকুন।” হীরা মাথা নেড়ে কেঁদে উঠে বলল, “আমি পারছি না। প্লিজ, হাসান সাহেব, আমাকে বাঁচতেই হবে। আপনি জানেন না, আমার পেটে সন্তান আছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *