ডাকনাম ভুলে গেছি – ১৫

পনেরো

মহিমগঞ্জ বাজারে সন্ধ্যা নেমেছে। বেপারিরা বাণিজ্য শেষ করে ঘরের ছোট ছেলেটার জন্য কিনে বিস্কুট-লজেন্স, মেয়ের জন্য কিনে চুলের ক্লিপ, কাগজের ঠোঙায় নিয়ে যায় গোটা পাঁচেক জিলাপি। কেউ কেউ চায়ের কাপে একটু আয়েশ খোঁজে। মাগরিবের আজান ভেসে আসে সর্দারপাড়ার মসজিদের মাইক থেকে, বুড়োরা তড়িঘড়ি করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়, তারপর টুপি মাথায় ছুটে যায় বটগাছের নিচের মেঠোপথে।

আজান শেষ হতেই সিডি-ডিভিডির দোকানের কালো বাক্সটা শুরু করল উৎকট শোরগোল। বিদ্যুৎ আসার পর এই অঞ্চলের পাখিদের শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে। মাছবাজারটা সবচেয়ে শান্ত এখন, সেখানে দুই-একটা শালিক আশ্রয় নিয়েছে। বাজার আগের চেয়ে বড় হয়েছে, সাজ-পোশাকের দোকানগুলো কাচ আর আলোতে ঝলমল করছে। রাত না হলে তাদের আসল রূপটা উদ্ভাসিত হয় না। এইসব দোকানের সামনে দিয়ে সবজির খালি ঝাঁকা বগলে চেপে ধরে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে বাড়ি যাচ্ছে লুঙ্গি পরা চাষা-জেলেদের দল। তারা চলে গেলে শহুরে সেলাইয়ে বন্দি তাদের সন্তানেরা এসে বাজারের দখল নেয়, কন্ডেন্সড মিল্কের ঘোলা চায়ের সাথে সিগারেটের ধোঁয়া গিলে তারা, ভিসিডির দোকানে ঢেলে দিয়ে আসে ফুলকপি বেচা পয়সা। মায়ের আঁচল ছিঁড়ে নতুন ফ্যাশনের শার্ট কিনে তারা। আমি দেখি কৃষকের ছেলেরা মাটিকে ঘৃণা করছে, জেলের ছেলে গালি দেয় ‘জাউল্লা’। সন্ধ্যায় প্রত্যন্ত মহিমগঞ্জ বাজার বিদ্যুতের সাজসজ্জায় শহুরে সাজতে গিয়ে আরো কুৎসিত হয়ে ওঠে।

বাজারের নিষিদ্ধ অঞ্চলের সীমানায় যে চায়ের দোকানটা একটামাত্র বাতিতে জেগে আছে, আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানের পাশে যে সরু রাস্তা অন্ধকারে গিয়ে শেষ হয়েছে, তার ঐপারে নাকি ফুর্তি আছে। টিনের পাতলা দেয়াল ভেদ করে চিকন স্বরের হাসি সেই ফুর্তির বিজ্ঞাপন করে। আমি সেই বিজ্ঞাপনে সাড়া দিতে আসিনি। আমি এসেছি রশীদ মিয়ার খোঁজে। তাকে পাওয়া গেল দোকানেই, একটা কাঠের বেঞ্চে বসে সিগারেটে দিচ্ছে লম্বা লম্বা টান। তার গায়ে লাল ছাপে হাওয়াই শার্ট, গলায় চিকন সোনালি চেইন, দুই হাতের আট আঙুলে কচ্ছপের পিঠের মতো পাথরের আংটি, চোখে কালো চশমা। আজ মাত্র কালি দিয়েছে তাই গোঁফটা একটু বেশি মোটা দেখাচ্ছে, চেহারায় একটা জল্লাদ জল্লাদ ভাব চলে এসেছে। মাথার চুলেও কলঙ্ক লেপেছে রশীদ মিয়া, বয়স তার বোঝা যায় না।

রশীদ মিয়ার আশেপাশে কয়েকজন অল্পবয়সি যুবক অযথাই হাসছে, তাদের প্রত্যেকের সামনে চায়ের কাপ, কারো কারো হাতে আছে জ্বলন্ত সিগারেট। রশীদ মিয়া কী একটা মজার গল্প বলার মাঝখানে থেমে গেল আমাকে দেখে। চোখের চশমাটার ওপর দিয়ে দেখে একবার নিশ্চিত হয়ে নিলো। যুবকেরা চাটুকারিতা থেকে রেহাই পেয়ে চুপচাপ আমাকে দেখছে। দোকানদারও চা ঢালতে ঢালতে একবার আমাকে দেখে নিলো। আমার আগমনে পরিবেশে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিলো।

রশীদ গাজী চশমাটা ঠেলে পুরো চোখ ঢেকে বাতাসে মৌজ ছড়াতে ছড়াতে বেঞ্চ থেকে উঠে আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। তার কালো দাঁতগুলো মেলে ধরে বলল, “তুমি এইখানে কী করো? ফুর্তি করার শখ হইছে? ভেতরে আমার নিজের ঘর আছে, সোন্দর মাইয়া আছে, ট্যাকার চিন্তা করবা না। তোমার লাইগা ফিরি।”

রশীদ মিয়ার কণ্ঠে কোনো গোপনীয়তা নেই, কোনো ভণিতা নেই। দোকান থেকে সবগুলো চোখ এখন বিশেষভাবে আমাকে দেখছে। মাথা নেড়ে বললাম, “আমি অন্য একটা কাজে এসেছি।”

রশীদ মিয়া হাতের সিগারেটটা টোকা দিয়ে খুব নাটকীয়ভাবে ছুড়ে ফেলল। তার চেহারাটা মুহূর্তে বদলে গেল। জড়ানো কণ্ঠে বলল, “কী কাম খালি কও তুমি, তোমার লাইগা জান দিয়া দিমু।”

রশীদ মিয়া খুব তরলাবস্থায় আছে, মুখ থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ বের হচ্ছে। আমার হাত ধরে দোকানে নিয়ে বলল, “বও। কী কাম কও।”

আমি ইতস্তত করায় রশীদ মিয়া বুঝতে পারল সবার সামনে কথাটা আমি বলতে চাচ্ছি না। দোকানের সবাইকে বলল, “অই, তোরা যাইকগা আইজকা। কাইলকা আইছ আবার, কাকায় তোগোরে পোড়া মুরগি আর তুন্দুল রুটি খাওয়ামু।”

নির্দেশ পাওয়ামাত্র দোকানের সবাই সভাভঙ্গ করে উঠে চলে গেল, তাদের মধ্যে খুব বেশি নিরাশা দেখা গেল না, বরং তাদের চলনে ছুটির আনন্দ আছে, আজকের প্রাপ্য তারা পেয়ে গেছে। রশীদ মিয়া চায়ের দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সুলায়মান, এক কাপ ফাস্ট কেলাস চা বানা। দুধ-চিনি বাড়ায়া দিবি।”

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “সিল্কারেট খাওনি তুমি? কুনোদিন তো দেহি নাই। টানবা নাকি একটা?”

বললাম, “না, আমি সিগারেট খাই না। আপনি ব্যস্ত হবেন না।”

রশীদ মিয়া প্রতিবাদ করে উঠল, উঁচু গলায় বলল, “কী কও ব্যস্ত হইতাম না। এই গেরামের মানুষ আমারে সম্মান দেয়, দেখলে খাড়াইয়া সেলাম দেয়, মসজিদে গেলে জায়গা ছাইড়া দিয়া সামনের কাতারে পাঠায়, আমার চাইরপাশে মানুষ মাছির মতো ভনভন করে। কিল্যাইগা জানো?”

আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলাম, রশীদ বুড়ো আঙুল আর তর্জনি ঘষে নিজেই জবাব দিলো, “আমার এইটা আছে। আগে তো আমারে সবাই রশীদ্যা চোরা কইয়া ডাকতো, সুযোগ পাইলেই কান মুচড়াইয়া চড়-থাপ্পড় দিতো। অহন কয় রশীদ সাহেব, হা হা হা। খুউব মজা লাগে বুঝলা! কিন্তু তোমার বাপে খুউব ভালা মানুষ আছিল, যেমনেই হউক পর্থম সম্মানটা আমি তার কাছ থেইকাই পাইছি। আমি চুরি করি, নেশা করি, মাগিবাজী করি শুইনাও কোনোদিন অসম্মান করে নাই। লোকটা যেইখানেই থাহুক, আল্লায় তারে বাঁচাইয়া রাখুক। তুমি হইলা সেই বাপের পোলা। তোমার লাইগা ব্যস্ত হমু না? কী কও!”

সুলায়মান চা রেখে গেল সামনে। তার ঠোঁটের পাশে পানের রসের লাল রেখা। চায়ের কাপ দেখে রশীদ মিয়া ক্ষেপে উঠল, সুলায়মানের দিকে তাকিয়ে বলল, “হুমুন্দির পুত, কাপ দিছত, পিরিচ কই? পিরিচ কি তোর মায়ের…”

পিরিচের অবস্থান সম্পর্কে এমন একটা অশ্লীল, অসম্ভব কথা বলল যা লেখা যায় না। সুলায়মানের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে হাত দিয়ে পানের রসের রেখাটা মুছে খুব স্বাভাবিক গতিতে একটা পিরিচ এনে চায়ের কাপের নিচে রাখল। চা খাওয়ার অভ্যাস আমার নেই, কাপে চুমুক দিতেই জিহ্বাটা পুড়ে গেল। চা-টা জঘন্যরকম মিষ্টি। আমি কাপটাকে পিরিচে বসিয়ে রেখে রশীদ মিয়াকে সরাসরি কাজের কথা বললাম, “আপনি কি বর্ডার পার করাতে পারেন?”

“তুমি যাইবা?”

“না, অন্য কেউ।”

“কেডা?” কৌতূহল নেচে উঠল রশীদ মিয়ার ভ্রূতে।

“তার সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না, শুধু নিরাপদে বর্ডার পার করে দিতে হবে। আর নগদ টাকা দিতে পারবে না, তবে একটা ঘড়ি আছে, সুইজারল্যান্ডের। শহরে ভালো দোকানে বিক্রি করলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে।”

পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে রশীদ মিয়াকে দেখালাম। রশীদ মিয়া আমার হাত থেকে ঘড়িটা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল, তারপর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “লেডিস?”

তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি পারবেন?”

রশীদ মিয়া কিছু বলল না, তার ঠোঁটে মৃদু হাসিটি লেগে রইল। হাতের মুঠোতে ঘড়িটা চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালো রশীদ মিয়া, ঘড়ির সোনালি ল্যাতল্যাতে প্রান্ত দুটি মুঠো থেকে বের হয়ে দুলছে। রশীদ মিয়া দোকান থেকে বের হয়ে পাশের সেই অন্ধকারের মুখে দাঁড়িয়ে ডাকল আমায়। আমি দাঁড়ালাম, কিন্তু নড়তে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল সেই অন্ধকারে ঢুকলে আমি আর আমি থাকব না, আমি হয়ে যাব অন্য কেউ।

রশীদ মিয়া আশ্বাস দিয়ে বলল, “ভিত্রে বাঘ-ভালুক নাই, আসো, তোমারে একটা জিনিস দেখামু।”

আমি জানি ভেতরে বাঘ-ভালুক নেই, কিন্তু আছে আরো ভয়ানক মাংসাশী প্রাণী। অন্ধকারের প্রান্তে এসে দাঁড়ালাম, ভেতর থেকে ভেসে আসা হাসি, উপহাস, গালাগালি আর গান আরো স্পষ্ট হয়েছে। রশীদ মিয়া ঢুকে গেল অন্ধকারে, তাকে আর দেখতে পাচ্ছি না। আমি এক পা বাড়ালাম, আমার নিঃশ্বাস ঘন হতে শুরু করল, বুকে বাজছে উদ্দাম মাদল, কানে আসছে উল্লাসের শব্দ।

অন্ধকারে কিছুক্ষণ হাঁটার পর একটা টিনের উঁচু দেয়ালে ছোট একটা দরজা দেখলাম, মাথা নিচু করে ঢুকতে হয় এখানে। ভেতরে সারবাঁধা কিছু ঘর দুইপাশে দাঁড়িয়ে আছে, ঘরের সামনে নানা বয়সি নারী, তারা চালচলনে প্রকাশ করছে আমরা চরিত্রহীন, পুরুষদের জানাচ্ছে নিঃসংকোচ আহ্বান। মেয়েদের কারো মুখে পান, কারো মুখে সিগারেট আর কারো মুখে কেবল হাসি।

আমি বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেই অন্ধকার পার হয়ে এসেছি সেখানেই ফিরে যাব কি-না ভাবছি। তখন রশীদ মিয়ার গলা শুনতে পেলাম, “ডরাও ক্যান, আসো আমার লগে।”

দেখি সে ডানপাশে একটা বরই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। রশীদ মিয়ার পা অনুসরণ করে হাঁটতে লাগলাম, দুইপাশে খিলখিল হাসি, আলোর চমক, হিন্দি গানের কলি আমাকে ডাকছে, একবার চোখ তুলে তাকাও, দেখো পৃথিবীতে কত রং আছে। আমার ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে, রশীদ মিয়ার চামড়ার কালো চপ্পল ছাড়া এই মুহূর্তে জগতে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই।

আমরা একটা ঘরে এসে ঢুকলাম, ঘরে একটা খাট ছাড়া তেমন কোনো আসবাব নেই। একপাশে একটা বন্ধ জানালা, তার সামনে দড়িতে একটা লুঙ্গির সাথে ঝুলছে মেয়েলি কাপড়চোপড়। টিনের ঢেউ খেলানো দেয়াল সিনেমার পোস্টার দিয়ে ঢাকা। খাটে তেল চিটচিটে বালিশে মাথা রেখে হলুদ বেডশিটের ওপর একটা মেয়ে শুয়ে আছে। মেয়েটার বয়স ষোলো-সতেরোর বেশি হবে না। আমাদের ঢুকতে দেখেও সে নড়ল না। নির্বিকার দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে, মেয়েটার চেহারার মধ্যে একটা স্থায়ী অভিমান খোদাই করা আছে।

রশীদ মিয়া মেয়েটাকে লক্ষ করে বলল, “কীরে, কাম নাই, শুইয়া রইছস!”

মেয়েটা মুখ গম্ভীর রেখে চঞ্চল চোখ ঘুরিয়ে বলল, “শুইয়া শুইয়াই তো কাম। এইটা কারে আনছেন? নতুন নাগর নাকি?”

রশীদ মিয়া মেয়েটার মাথায় আলতো করে আদুরে চাটি দিয়ে বলল, “খালি শয়তানি তোর। যা রোমেলার ঘরে গিয়া শুইয়া থাক।”

মেয়েটা বিছানায় উঠে বসলো, কিন্তু নামলো না। বলল, “রোমেলার ঘরে একটা বুইড়া আইছে।”

“তাইলে বাইরে গিয়া ঘুইরা আয়। যা অখন।”

মেয়েটা বিছানায় বসেই দুই হাত প্রসারিত করে আড়মোড়া ভাঙল। খাটের নিচে পড়ে থাকা এক জোড়া চপ্পল পায়ে দিতে দিতে আরেকবার আমার দিকে চেয়ে দেখে বলল, “নাগর কিন্তু আমার পছন্দ হইছিল।”

রশীদ মিয়া কৃত্রিম রাগ দেখায়, “লাথি খাবি কইলাম, যা ভাগ।”

মেয়েটা বের হয়ে যেতেই আমার বুক থেকে একটা ভারী নিঃশ্বাস মুক্তি পেল। পাশের ঘর থেকে নারীকণ্ঠের অস্ফুট শব্দ শুনে রশীদ মিয়া আগ্রহী হয়। এই প্রথম সে তার কালো চশমাটা খুলে পকেটে ভাঁজ করে রাখে। চশমা খুলতেই এক মুহূর্তে সে বৃদ্ধ হয়ে গেল, চশমাটা এতক্ষণ ধরে তার বয়স লুকিয়ে রেখেছিল। রশীদ মিয়া সিনেমার পোস্টারে নায়কের কুঁচকির দিকটা উঠিয়ে একটা ছিদ্র বের করে আনে, তারপর চপল কিশোরীর মতো এক চোখ বন্ধ করে অন্য চোখ রাখে সেই ছিদ্রটাতে। কিছুক্ষণ দেখে মুখে তার হাসি ছড়িয়ে পড়ে। চোখ সরিয়ে আমাকে ইশারায় ডাকে। আমাকেও দেখতে ইঙ্গিত করে।

আমি কী করব বুঝতে পারি না। রশীদ মিয়া হাতের ইশারায় আমাকে তাগাদা দেয়, যেন খসে পড়া তারা এখনই বাতাসে মিলিয়ে যাবে। আমি চোখ রাখি ফুটোতে। দেখতে পেলাম একটা কমবয়সি মেয়ের স্তন ঢেকে আছে সাদা দাড়িতে। মেয়েটার ঘাড়ের পাশে একটা বৃদ্ধ মুখ দেখতে পেলাম, এক ঝলক দেখেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার। লোকটাকে চিনতে পেরেছি আমি, বটতলায় হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধ ভিক্ষুক মমতাজ ফকির।

তার লম্বা সাদা দাড়িগুলো তার মুখটাকে আরো নিষ্পাপ এবং পবিত্র করে রাখে। মাথায় যে টুপিটা তার চেহারার অংশ হয়ে গেছে সে-টুপিটা আজ নেই, তবুও আমি তাকে চিনতে পারলাম তার নাকের ওপরে ফ্যাকাশে দুটো চোখের জন্য। বটতলার নিচে তার অসহায় কাঁপা কাঁপা যে হাতটা মানুষের করুণা প্রার্থনা করে, আজ সে-হাত মাকড়সার মতো একটা কিশোরীর নিরুপায় বুকে বিচরণ করছে।

রশীদ মিয়া চোখ নাচিয়ে বলল, “ক্যামন দেখলা?”

আমি সেই দৃশ্য থেকে সহসা বের হতে পারছি না। নিজেকে সামলে বললাম, “আপনি কি এসব দেখানোর জন্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন?”

রশীদ মিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল, “হুনো, আমার কাছে কুনো গোপনের কারবার নাই। আমার গোপন কথা সবাই জানে, সবার গোপন কথাও আমি জানি। আমার কাছে কিছু লুকাইয়া লাভ নাই।”

তারপর রশীদ মিয়া হাঁটু ভাঁজ করে খাটের তলা থেকে সশব্দে একটা ট্রাঙ্ক বের করে আনলো। পকেট থেকে রূপালি চাবি বের করে ট্রাঙ্কের সোনালি পাহারাদারটাকে বন্ধনমুক্ত করল। ঝাঁপি খুলে একটা সোনালি তরল ভরা কাচের বোতল বের করে মেঝেতে দাঁড়িয়ে করিয়ে রাখল। তারপর একটা ছোট কাপড়ের থলি বের করল। বোতলটা হাতে নিয়ে ইশারায় আমাকে একবার সাধলো। ঘরের আরেক কোণে পড়ে থাকা অ্যালুমিনিয়ামের জগ আর স্টিলের গ্লাস এনে খাটের ওপর বসলো।

বোতল খুলে গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বলল, “ইন্ডিয়ান জিনিস, বাংলা টাংলা খাই না আর। তুমি না খাইলে না খাও, তাও বও একটু। এই জিনিস একলা খাইতে ভালা লাগে না।”

আমি পা ঝুলিয়ে খাটের কিনারায় বসলাম, বিছানায় এখনো মেয়েটার উষ্ণতা লেগে আছে। রশীদ মিয়া গ্লাসের তরল গলায় ঢেলে দিলো, পাশের ঘর থেকে গোঙানি ভেসে আসছে। রশীদ মিয়া খিলখিল শব্দে হেসে উঠল, বলল, “একেকজনের একেক নেশা। তোমার নেশা কী?”

আমি কিছু বলতে পারলাম না। রশীদ মিয়া বোধহয় কোনো উত্তর প্রত্যাশাও করেনি। সে কাপড়ের ছোট পুঁটলিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “খোলো।”

শক্ত করে বাঁধা গিট খুলতে বেশ বেগ পেতে হলো। কাপড়টা মেলে ধরতেই ভেতর থেকে সোনালি রং ঝলমল করে উঠল। চারটা সোনার চুড়ি, দুইটা কানের দুল, গলার হার আর আংটির নিচে পাঁচশ টাকার নোটের বান্ডিল উঁকিঝুঁকি মারছে।

রশীদ মিয়া বলল, “বান্ডিল কিন্তু চাইরটা আছে।”

আমি কিছু না বুঝে রশীদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। রশীদ মিয়া আরো দুইবার মদ গিলেছে ততক্ষণে। তার চোখে-মুখে মৌজ ফুটে উঠেছে আবার। শার্টের পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে সোনার গয়নাগুলোর ওপরে রেখে বলল, “এই ঘড়ি যার, গয়নাও তার।”

আমার বিস্মিত দৃষ্টি দেখে সে বলল, “এত তাজ্জব হওনের কী আছে। আমি ইন্ডিয়া থেইকা মাল নামাই সবাই জানে, এইপার থেইকাও মাল ঢুকাই ওপারে। ইলিশ যায়, মেশিন যায়, পাউডার যায়। পাউডার বুঝো?”

বললাম, “কসমেটিক্স?”

হো হো করে হেসে উঠল রশীদ মিয়া, বলল, “আরে, এই পাউডার সেই পাউডার না। বহুত দামি জিনিস, বাইরে থেইকা আসে। তুমি দেখি নাদান বাচ্চা। যাকগা, বহুত জিনিসই পাঠাই। দুই নম্বর ব্যবসা, বুঝলা? পয়সার কমতি নাই। তয় সবথেইকা লাভ হয় মানুষ পাঠাইলে। ঢাকার পাসপোর্ট অফিসের দালাল নেয়ামত বহুত কাস্টমার দিছে আমারে। নেয়ামত পাঠাইছে মাইয়াডারে। মাইয়ামানুষ আগেও পাঠাইছি, গেরামের কমবয়সি বেকুব মাইয়া। কিন্তু এই মাইয়াডা শহর থেইকা আইছে, নিজেই আইছে, কেউ ধোঁকা দিয়া ওপারে বেচনের ধান্দা কইরা আনে নাই। মাইয়াডার হাত ধবধইব্যা ফরসা, কুনোদিন মাটি, গোবর ধরে নাই। কথা কয় কী সুন্দর কইরা, জামাকাপড়ের কী বাহার! শইলে পাকঘরের গন্ধ লাইগা নাই, ফুলের বাসনা আসে। তহন আমার বোরহান উদ্দিনের কথা মনে পড়ল।”

রশীদ মিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বোরহান উদ্দিনের ব্যাপারে আমার আগ্রহটাকে পাকার সুযোগ দিলো। আমার চোখ-মুখ যখন উদগ্রীব হয়ে ওঠে তখন রশীদ মিয়া আবারও মদ ঢালে স্টিলের গ্লাসে, তারপর এক চুমুকে গ্লাস খালি করে বোরহান উদ্দিনের গল্প বলে আমায়।

মহিমগঞ্জের বেপারিপাড়ায় বোরহান উদ্দিনের জন্ম। মাত্র দেড় বিঘা জমির ফসলে চার ভাই তিন বোনের সংসার কোনোমতে চলেছে। বাপ মরার পর দেড় বিঘা জমি চার ভাই ভাগ করে নিলো, কিন্তু মায়ের ভাগ কেউ নিতে চাইল না। অল্প কয়েক শতাংশ জমির মালিক বোরহান উদ্দিনের ভাগ্যে জুটল একটা শ্যামল চামড়ার মেয়ে, কিন্তু বউ তার ভীষণ উর্বর। নির্লজ্জের মতো পর পর তিন বছরে তিনটা কন্যাসন্তান জন্ম দিলো সে।

কিন্তু একটা পুরুষ প্রসব করতে না পারলে এখানে নারীরা মাতৃত্ব নিয়ে গর্ব করতে পারে না। কার দোষে পুত্র সন্তান হচ্ছে না তা নিয়ে পাড়াপ্রতিবেশীদের গবেষণা চলতে লাগল। দোষ কাটানোর জন্য, অমুক মাজার, তমুক হুজুর, চালপড়া, ডিমপড়া ইত্যাদির সন্ধান দিতে লাগল তাদের। উৎকণ্ঠা নিয়ে সবাই বোরহান উদ্দিনের বউয়ের গর্ভের অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু চতুর্থ বছর শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মেয়েটার পেট আর ফুলে ওঠে না।

বোরহান উদ্দিনের সংসারে মন নেই, গভীর রাতে যখন তাসের আসর ভেঙে যায়, তখনো সে বাড়ি ফিরতে চায় না। ক্ষেতের আইল ধরে ঘুরে বেড়ায়, খড়ের গাদায় ঘুমিয়ে পড়ে। লোকে ভাবে, একটা ছেলের জন্য বোরহান উদ্দিন কেমন ‘দেওয়ানা’ হয়ে গেছে। পঞ্চম বছরেও যখন বোরহান উদ্দিনের বউ খালি গর্ভে ধান সিদ্ধ করছিল, তখন মোমেনা বুড়ি তাকে চেপে ধরে, কী সমস্যা? এত উর্বর ভূমিতে ফসল হচ্ছে না কেন? তখন কপাল চাপড়ে রহস্য খোলাসা করে বোরহান উদ্দিনের বউ, বলে, “হেয় তো আমার লগে শোয়ই না, ক্যামনে হইবো?”

এই খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না। দাম্পত্যের অতি গোপন বিষয় নিয়ে বোরহান উদ্দিনকে এখন সকাল-বিকাল কৈফিয়ত দিতে হয়, কেন সে তার স্ত্রীর শয্যায় যায় না? রাতে তাকে কেউ বাইরে দেখলে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তাগাদা দেয়। মনের জ্বালায়, লোকের পীড়নে বোরহান উদ্দিন ডোমপাড়ায় গিয়ে মদ খায় প্রতিদিন। একদিন বেশি মাতাল হয়ে পড়লে রতন ডোমের কাঁধে ভর দিয়ে সে জানায়, “বউয়ের লগে ক্যামনে শোমু, আমি তো শ্যাষ, দাদা, মুতা ছাড়া আমার অইডার কুনো কাম নাই আর।”

এভাবে বোরহান উদ্দিনের উত্থানজনিত সমস্যা জানতে পারে সবাই। তারপর গ্রামবাসী বোরহান উদ্দীনকে নানা পরামর্শ দিয়ে অতিষ্ঠ করে তোলে। বিশেষ এক সরীসৃপের তেল, কালো মুরগির ডিম, শিমুলের শিকড়, ভারী ভারী তাবিজ—কিছুই বোরহান উদ্দীনের ঘুমন্ত যৌবনকে জাগাতে পারল না। পুরুষদের আড্ডায় সে এখন উপহাসের পাত্র, পুকুরঘাটে ভাবিরাও তার বৌকে দেখে মুচকি হাসে। বোরহান উদ্দিন লক্ষ করেছে তার সমবয়সিরা তাকে এড়িয়ে চলছে, তাসের আসরে তার আর ডাক পড়ে না, দৈহিক সামর্থ্য থাকার পরও খুব বেশি কাজ পায় না সে। আগে যারা বোরহান ভাই বলে সম্মান করত, তাদের কাছে সে এখন ‘বোরহাইন্যা’। লিঙ্গের সাথে সাথে তার সামাজিক অবস্থানেও ধস নেমেছে। গ্রামে টিকতে না পেরে নিজের অসম্পূর্ণতা নিয়ে সে রিকশা চালাতে চলে যায় ঢাকা শহরে।

ঢাকায় যে সে খুব মর্যাদা পেয়েছে তা বলা যাবে না। এখানে ছোট-বড় সবাই তাকে ‘তুই’ ‘তুমি’ বলেই ডাকে। ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা করলে চড়-থাপ্পড় খায়, তবুও তার খারাপ লাগে না। তার এই সম্মানহীনতার কারণ তার দারিদ্র্য, তার অনুত্থিত লিঙ্গ না।

ফাল্গুন মাসের এক দুপুরে বোরহান উদ্দিনের সাথে ঘটে যায় এক অদ্ভুত ঘটনা। ঢাকার যেই অঞ্চলে উঁচু দালান সবচেয়ে বেশি, সেখানে তাকে হাত দেখিয়ে থামালো দুইটা মেয়ে। বোরহান লক্ষ করেছে এই এলাকার সব মেয়েই সুন্দর, ইদানিং এখানেই ঘুরঘুর করে সে। মেয়ে দুটো রিকশায় উঠে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল ইংরেজিতে। ঠিক তখনই ব্যাখ্যাতীত ঘটনাটা ঘটে, বাঙালি মেয়েদের মুখে বিজাতীয় ভাষা বোরহান উদ্দিনের মনে কী বিকার তৈরি করেছে কে জানে, সে টের পায় তার ঘুমন্ত যৌবন হঠাৎ তীব্রভাবে জেগে উঠেছে। মাঝপথে রিকশা থামিয়ে সে কুজো হয়ে বসে পড়ে পথের ধারে। মেয়ে দুটি সহমর্মী চোখে দেখতে থাকে তাকে, তাকে পানির বোতল এগিয়ে দেয়, নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে আফসোস করতে থাকে, বোরহান উদ্দিন ক্রমশ আরো নুয়ে পড়ে।

গল্পটা এইটুকু বলে থামে রশীদ মিয়া। আমি জিজ্ঞাসা করি, “বোরহান উদ্দিনের কী হলো?”

রশীদ মিয়া জানায়, বোরহান উদ্দিনের জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করা এই গল্পের উদ্দেশ্য নয়। আমি তার উদ্দেশ্যটা জানতে চাই। সে বলে, যৌবনে তার কাছে অর্থবিত্ত কিছুই ছিল না। বিভিন্ন নেশা তাকে আকৃষ্ট করেছে, কিন্তু নেশা করে জীবন ধ্বংস করার মতো সামর্থ্যও তার ছিল না। তারপর যখন চোরা কারবার শুরু করে, বর্ডারে তার ব্যবসা যখন জমজমাট হয়ে ওঠে, তখন তার ইচ্ছা আর সামর্থ্যের সংযোগ ঘটে, বহুদিনের আক্ষেপ ঘোচাতে সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, এমন কোনো নেশা নেই যা সে করেনি। সব নেশা যখন ফিকে হয়ে এসেছে, তখন সে নারীর কাছে গিয়েছে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে ততদিনে, নিজের শরীর তাকে সঙ্গ দেয়নি।

রশীদ মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “কত তেল মাখলাম, কত হারবাল খাইলাম, কুনো লাভ হইলো না। এই পাড়ার ছাব্বিশ নটি মিল্যাও আমারে শক্ত করতে পারল না।”

বললাম, “আপনার তো বয়স হয়েছে।”

রশীদ মিয়া রেগে গেল হঠাৎ করে, গলা উঁচু করে বলল, “আমার বয়স কি ঐ কানা ফকিরটার থেইকা বেশি? ওই শালায় তিন দিন উপাস দিয়া এক দিন ফুর্তি করার ট্যাকা জমায়, আর আমি হাগলেও ট্যাকা বাইর হয়। কিন্তু লাভটা হইলো কী? সারাদিন মদ খাই, বেড়ার ফুটা দিয়া মাইনষের কাম করা দেখি, এই হইলো আমার মুরুদ।”

রশীদ মিয়া আবার মদ ঢালল। তার চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি, বলল, “মদ খাইলে এই এক গ্যাঞ্জাম, মিজাজ খারাপ হইয়া যায় হঠাৎ কইরা। আর এক পেগ খাই, মাথাডা ঠান্ডা হইবো।”

বোতল অর্ধেকের বেশি শেষ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। রশীদ মিয়া আরেক পেগ গিলে বলল, “পাসফোট অফিসের দালাল নেয়ামত যহন মাইয়াডারে পাঠাইলো, দেইখা আমার বোরহানুদ্দিনের কথা মাথাত আইলো। হইতেও পারে, গাঁও-গেরামের কালা ময়লা মাইয়ারাই আমারে ধইঞ্চা বানায়া রাখছে।”

রশীদ মিয়া জানায়, শহুরে ফর্সা চামড়া, প্রমিত শব্দ, আধুনিক পরিচ্ছদ কিংবা কৃত্রিম সুবাস, কার কীসে মন লেগে যায় বলা যায় না। নিজের যৌবনকে সে পরীক্ষা করে দেখতে চায়। তাই যখন মেয়েটা তার কাছে আসে সে টাকা নিয়ে তাকে এই ঘরে এনে রেখে যায়। রশীদ মিয়া বলে, “গেরামের মাইয়াগো যদি দুই চউক থাকে তাইলে শহরের মাইয়াগো আছে চাইরটা। ক্যামনে জানি আমার মতলব টের পাইয়া গেল ছেড়িডা। কোন ফাঁক দিয়া পলাইলো জানি না, রাইতে আইসা দেখি ঘর খালি। সখিনা আর রেহানারে ডাইকা জিগাইলাম, ছেড়ি কই? তারাও বেকুব হইয়া গেছে, তারপর তারা হাইস্যা কয়, লস হয় নাই, মিয়া সাব, সোনার জিনিস সব খুইলা রাখছি। আমি মনে মনে কইলাম, আমার কী লস হইছে তোরা কী বুঝবি?”

রশীদ মিয়া ঢুলু ঢুলু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী মনে হয় তোমার, আমি ক্যামন মানুষ?”

বললাম, “কে ভালো, কে খারাপ তা বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। সবকিছুই পরিপ্রেক্ষিতের ওপর নির্ভর করে।”

রশীদ মিয়া কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, “মাগো মা, কী কথাবার্তা, আগামাথা কিচ্ছু বুঝি না। আমি তোমারে কই, আমি খারাপ মানুষ। খারাপ মানুষের মন হয় পাথরের মতো শক্ত, কিন্তু আমার মনডা হইলো নরম। বুঝলা?”

মাথা নেড়ে জানালাম বুঝেছি। রশীদ মিয়া হেসে উঠে বলল, “ঘোড়ার আন্ডা বুঝছো। শোনো, তোমার কাম আমি কইরা দিমু, মাইয়াডার কোনো ক্ষতি হইবো না। এই রশীদ মিয়া জবান দিলো। বিষুদবাইর রাইতে ঘাটে থাইকো, আমি নাও লইয়া আসুম। অহন যাও।”

আমি উঠে দরজার কাছে যেতেই রশীদ মিয়া আবার ডাকল আমাকে। গয়নার পুঁটলিটা দেখিয়ে বলল, “নিয়া যাও এইগুলান। ছেড়িডার হাতে দিয়া কইবা, আমি তারে মা ডাকছি।”

বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি পথটা হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে। আকাশে যে চাঁদ উঠেছে তাকে আমি চিনি, কিন্তু পথটা জোছনার চাদর জড়িয়ে কী যে অদ্ভুত ছদ্মবেশ ধরেছে! দূরে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের কালো দেহ, সবুজ মাঠে ছড়িয়ে আছে ছাই রং, আলবাঁধা জমিগুলোর ঘরবাড়ি নেই, ভবঘুরে পাগলের মতো তারা খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। সরু নদীটা ঘুমায়নি এখনো, কাত হয়ে কলকল করে ঘুমপাড়ানি গান গাচ্ছে। এত রাতে আমি আর কখনো ঘরে ফিরিনি।

নদীর পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম একটা অবয়ব নড়ছে জমিদারবাড়ির ভাঙা ঘাটে, একটা অস্থির প্রজাপতির মতো সে একটু বসেই আবার উঠে পড়ছে। তার দেহভঙ্গি থেকে অপেক্ষা ঝরে পড়ছে। পেছনে বাগানের মাথার ওপর দিয়ে জমিদারবাড়ির চূড়াটা উঁকি দিয়ে আছে, নদী আর নারী ছাড়া বাকি সবকিছুই স্থির। দূর থেকে আমাকে দেখে জোছনায় জমে গেল হীরা। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চঞ্চল হলো, ছুটে এসে হাঁপাতে লাগল। জিজ্ঞাসা করল, “এত দেরি হলো কেন আপনার?”

তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মমতা মাখানো ছিল। বহুদিন পর আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মনে হলো মা কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপছে, আরেক লোকমা ভাত খাওয়ার জন্য চোখ রাঙাচ্ছে, বকতে বকতে আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছছে, থুতনিতে ধরে তেলমাখা চুলে চিরুনি চালাচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণের জন্য আমার ভীষণ সংসারী হওয়ার লোভ হলো, আমার কেউ একজন থাকুক, যার জন্য আমি প্রতিদিন দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে যাব। সন্ধ্যা হলে কারো অপেক্ষার অবসান করার জন্য ঘরে ফিরে আসব, কেউ একজন আমার জন্য ঘর ছেড়ে এসে বাইরের পথে উন্মুখ চোখ পাতবে। আমার ক্লান্ত ছায়া দেখে কারো বুকে স্বস্তি নেমে আসবে। জোছনা রাতের মরীচিকা খুব বেশিক্ষণ আমাকে প্রলুব্ধ করতে পারল না। নদী যে নারীকে আমার দুয়ারে দিয়ে গিয়েছিল, আগামী বৃহস্পতিবার নদী তাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। যে নরম মাটিতে তার পায়ের ছাপ লেগে আছে, তা মুছে যাবে এক বর্ষাতেই। জীবনে প্রথমবার একজন নারীর সামনে দাঁড়িয়ে আমি একাকিত্ব অনুভব করলাম।

জিজ্ঞাসা করলাম, “ভয় করছিল আপনার?”

বলল, “না, দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। খুব অবাস্তব আর অযৌক্তিক একটা চিন্তা মাথায় এসেছিল, মনে হচ্ছিল আপনি আর আসবেন না, আমিও এখান থেকে বের হতে পারব না। আমাকে সারাজীবন এই প্রাসাদে একাই থাকতে হবে।”

হেসে বললাম, “চিন্তা করবেন না, আপনার মুক্তির ব্যবস্থা করে এসেছি।” গয়নার এবড়ো-খেবড়ো পুঁটলিটা হীরার দিকে বাড়িয়ে দিলাম আমি। গিঁট খুলে পরিচিত গয়নাগুলোর দিকে অপরিচিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। দুই হাতের ওপর গয়নাগুলো এমনভাবে বিছিয়ে রাখল যেন তার হাতে জ্বলন্ত কয়লা, বলল, “এবার আমার ভয় লাগছে।”

বললাম, “ভয়ের কিছু নেই, যে এগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে সে আপনাকে ‘মা’ ডেকেছে। আপনাকে নিরাপদে পার করে দিবে সে, মায়ের কোনো অসম্মান সে করবে না।”

হীরা বলল, “পৃথিবীর কোনো পুরুষকে আমি আর বিশ্বাস করতে পারব না।”

“আমাকে তো বিশ্বাস করেছেন।”

“আপনার কথা ভিন্ন।”

“কেন? আমাকে আপনার পুরুষ মনে হয় না?”

হীরা লজ্জা পেল, বলল, “শুনুন, হাসান সাহেব, আমাদের মেয়েদের তৃতীয় চোখ আছে, আমরা মানুষ চিনতে পারি।”

বললাম, “মেয়েরা যদি এতই মানুষ চিনত, পৃথিবীতে প্রতিদিন এত মেয়ে প্রতারিত হতো না।”

হীরা বলল, “আসলে আমাদের চোখ যতটাই থাকুক, আবেগের পর্দা যখন সামনে থাকে তখন আমরা আর কিছুই দেখতে পাই না।”

একটা রাতের পাখি আমাদের একসাথে দেখে টিপ্পনি কেটে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। আমরা প্রসঙ্গচ্যুত হয়ে গেলাম। চাঁদটা মায়া মায়া চোখে পৃথিবীটাকে দেখছে, হয়তো আমাদেরও। আমরা নদীর পারে জোছনায় আক্রান্ত হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ পর হীরাকে বললাম, “চলুন, অনেক রাত হয়ে গেছে।”

হীরা বলল, “এতক্ষণ দুশ্চিন্তার জন্য বুঝতে পারিনি, কিন্তু এত সুন্দর জোছনা আমি আর কখনো দেখিনি। আপনার যদি সমস্যা না হয়, আপনি কিছুক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকুন। এত সুন্দর, আমি একা একা সইতে পারব না।”

একটা শহুরে তৃষ্ণার্ত মেয়ে বুক ভরে জোছনা পান করছে, আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি, তাকে দেখছি, গ্রাম, নদী, চাঁদ দেখছি। হীরার চোখ থেকে একটা হীরকখণ্ড তার গাল বেয়ে নেমে গেল। এত সুন্দর দৃশ্য আমিও আর কখনো দেখিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *