ডাকনাম ভুলে গেছি – ৪

চার

একসময় এখানে বাঁধানো ঘাট ছিল, তার কিছু নিদর্শন এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভাঙা কংক্রিটের ওপর আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল মা। বাবা গাছপালার পাহারার মধ্যে বিপন্ন সরু রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে আছে। মা একটু আগে বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে, দরকার হলে সারারাত এখানে বসে থাকবে, তবুও ছেলে নিয়ে এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে পারবে না। বাবা হতাশ হয়ে বলল, “তুমিও ওইসব গ্রামের লোকের কুসংস্কারে ভয় পেলে?” মা বলল, “কুসংস্কারের কথা নাহয় বাদ দিলাম, এই জায়গা যে সাপ-খোপে ভরা তা তো অস্বীকার করবে না, নাকি?”

“আমরা আলো জ্বালিয়ে শব্দ করে যাব, শব্দ পেলেই সাপ সরে যাবে। প্লিজ, ট্রাস্ট মি, সুলতানা।” বাবার মুখে মায়ের নাম আর একটা ইংরেজি ‘প্লিজ’ মায়ের মনকে নরম করে দিলো। ঠিক তখন একটা অজানা পাখি অদ্ভুত ভীতিকর সুরে ডাকতেই এখানে সারারাত বসে থাকার সংকল্পটা মায়ের টলে গেল। মাঝিদের কাছ থেকে একটা কুপি নিয়ে রেখেছিলাম আমরা। কুপি জ্বালিয়ে কাঁথা-চাদর আর কিছু খাবার নিয়ে আমরা তিনজন পাশাপাশি লেগে থেকে এগোতে লাগলাম। অবশিষ্ট জিনিসপত্র সব পড়ে রইল ঘাটে। জিনিসপত্র বলতে অধিকাংশই বই। এখান থেকে বই চুরি করার মতো বীরপুরুষ অথবা বিদ্যানুরাগী এই অঞ্চলে জন্মেছে বলে মনে হয় না।

সেই রাতের এই অল্প একটু পথ আমি কখনোই ভুলব না। এই পথে মানুষের পা পড়েনি অনেক দিন, আস্কারা পেয়ে ঘাসগুলো বাবার কোমর আর আমার কাঁধ ছাড়িয়ে গেছে। বাইরের জ্যোৎস্না গাছের কড়া নজরদারিতে এখানে ঢুকতে পারেনি। কুপির আলো অল্প একটু জায়গা আলোকিত করে বাকি পুরোটা করে দিলো আরো অন্ধকার। পায়ের নিচে কী আছে দেখা যায় না, মাথার ওপর কী আছে বোঝা যায় না, চারপাশে অন্ধকার তার কালো দেহ নিয়ে আমাদের ঘিরে আছে। কোথাও সভ্যতার এতটুকু চিহ্ন নেই। বড় বড় গাছগুলো মাথা দুলিয়ে আমাদের মানা করছে, বনের মধ্য থেকে কী যেন একটা চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করছে। দুইপাশের ঝোপঝাড় আমাদের আঁকড়ে ধরতে চাইছে, যেন বলছে, যেয়ো না, যেয়ো না। আমি মার সাথে আরো সেঁটে গেলাম, বাবার পায়েও টের পেলাম কম্পন। অন্ধকারকে কে না ভয় পায়! অল্প একটু পথ, কিন্তু শেষই হচ্ছে না। এই ভয়ংকর উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।]

যখন মায়ের হাতের বাঁধন আলগা হলো, নাকে একটা পুরোনো গন্ধ পেলাম, তখন চোখ খুলে দেখি আমার সামনে বিরাট একটা বাড়ি চাঁদের আলোয় দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সামনে গাছের ভাঙা ডালপালা পড়ে আছে, হঠাৎ দেখলে মনে হয় হাড়গোড় পড়ে আছে। শিরীষগাছের পাতা জ্যোৎস্নাকে ছিন্নভিন্ন করে আঙিনায় বিছিয়ে দিয়েছে। এই বাড়িতে বহুদিন পরে মানুষের পা পড়ল, বাড়ির অধিবাসী অন্যান্য প্রাণীরা এই অভিনব ব্যাপারটা সহজে মেনে নিতে পারছে না। হঠাৎ সড়-সড় শব্দ করে খুব দ্রুত কী যেন বেরিয়ে গেল। বেশিদূর গেল না, বাড়ির পেছনে গিয়ে সমস্বরে উ-উ করে চিৎকার শুরু করে দিলো। এমন আর্তচিৎকারে আমরা তিনজনই চমকে উঠলাম। বাবা অভয় দিয়ে জানালো, ও কিছু না, শেয়ালের দল। শেয়ালের শোরগোলে অন্যান্য পশুপাখিরাও যোগ দিলো। কেউ বিরক্ত হয়ে সরে গেল, কেউ ঘুম ভেঙে উড়ে গেল, কেউ তীক্ষ্ণ ডাক ডেকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করল। শান্ত-নীরব পরিবেশে একটা অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল, সব পশুপাখি একযোগে আমাদের আগমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

বাড়ির চারপাশে যেখানেই মাটি পেয়েছে ঝোপ-জঙ্গল সেখানেই জাঁকিয়ে বসেছে, যেখানে মাটি নেই সেখানেও নিজেদের লোভী হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বারান্দায় উঠার সিঁড়িটা প্রায় ঢেকে গেছে ঝোপে। দেয়ালের অবশিষ্ট রস শুষে নিয়ে বট-পাকুড় বাড়ির কোলে বসেই বড় হচ্ছে। সিঁড়ি মাড়িয়ে, দানবের পায়ের মতো থামগুলো পার করে আমরা একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়ির সদর দরজায় একটা বিশাল তালা ঝুলছে। এরকম পরিত্যক্ত বাড়ির দরজা-জানালা কিছু অবশিষ্ট থাকে না। এখানে দরজা-জানালা অযত্নে সব জীর্ণ হয়ে আছে, কিন্তু কিছুই চুরি হয়নি। বাবার কাছে চাবি ছিল, উকিল কাগজপত্রের সাথে চাবিও বুঝিয়ে দিয়েছিল বাবাকে। তালা খোলার জন্য বাবা দরজার কাছে যেতেই দেখলাম দোতলার জানালার কার্নিশে বসে একটা বিশাল প্যাঁচা গম্ভীরভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ভয়ে বাবার হাত চেপে ধরলাম। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ভয় কী, এটা তো তারও বাড়ি।”

বাবা দরজা ধাক্কা দিতেই নড়বড়ে দরজাটা ভীষণ শব্দ করে দুইপাশে এলিয়ে পড়ল। আর সাথে সাথে ভেতর থেকে বন্দি গুমোট বাতাস বহুদিন পর ছাড়া পেয়ে সারা আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ল। ভেতরে একটা লম্বা করিডোর, কুপির আলোতে নিজেকে অল্প একটু প্রকাশ করে আর বাকি পুরোটা অন্ধকার রহস্যে আবৃত করে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। ঘরের বাইরে বিভিন্ন পশু যেমন নিজেদের আবাস গড়ে নিয়েছে, ভেতরেও তেমন অনেক প্রাণী নিজেদের সংসার পেতে বসেছে, ধূলা আর বিষ্ঠায় মেঝে ঢেকে গেছে। আমরা ঢুকতেই পলায়নের সাথে সাথে মৃদু প্রতিবাদের সুরও শোনা গেল।

করিডোরের সর্বত্র মাকড়সা শিকার ধরার জন্য জাল পেতে রেখেছে। ডানপাশে বিশাল একটা হলঘর পাওয়া গেল, এখানেও মাকড়সার রাজত্ব। এই ঘরে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো বিশাল দুটি অয়েল পেইন্টিং একটা দেয়ালের অধিকাংশ ঢেকে রেখেছে। ছবির ভেতরে যারা আছে, ধুলোতে তারা ঢাকা পড়েছে, তাদের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হলো না। একটা বড় নকশাখচিত ঘড়ি ঝুলছে, কিন্তু তার কাঁটা সব ঝরে পড়েছে। ঘরের মাঝখানে অনেকগুলো গদিওয়ালা সোফা বিকৃত লাশ হয়ে পড়ে আছে, মাঝখানে একটা অসহায় টেবিল ভূতের মতো বসে আছে, দেয়ালের সাথে লাগানো একটা শো-কেস ধুলোতে ঢেকে ভাস্কর্য হয়ে গেছে, ছাদ থেকে কিছু একটা ঝুলছে, বোধহয় একসময় ঝাড়বাতি ছিল। ছোটখাটো আরো কিছু আসবাব মাকড়সার জাল, আর ধুলোতে ঢাকা পড়েছে, তাদের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ার পথে।

পায়ের নিচ দিয়ে কিছু একটা দৌড়ে পালালো। ‘ও মাগো!’ বলে মা একটা সংক্ষিপ্ত আর্তনাদ করল। তারপর আড়ষ্ট কণ্ঠে বাবাকে বলল, “এরচেয়ে তো বাইরেই ভালো, এখানে থাকতে পারব না।” বাবা প্রতিটা দেয়াল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, খেতে বসে পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধির গল্প করার সময় বাবার চেহারা যেমন হয়, কুপির আলোতে এই মুহূর্তে বাবার সেই চেহারাটা দেখতে পেলাম আমি। পুরো ঘর জুড়ে পূর্বপুরুষের ধুলোমাখা অহংকার, শো-কেসের সামনে মাকড়সার জাল হাত দিয়ে কাটতে কাটতে বলল, “এখানেই ভালো, একটু পরিষ্কার করে নিলেই হবে, রাতও বেশি বাকি নেই। বাইরে কী না কী আছে।” যেন ভেতরে ‘কী না কী’ নেই! বাইরে তখনো থেমে থেমে শেয়াল ডাকছে, তাদের ক্ষোভ আর না বাড়িয়ে আমরা ঘরের মধ্যেই রাত পার করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

মা হাত দিয়ে সোফার ধুলো ঝাড়ার চেষ্টা করল, বহু বছর ধরে বাস করা ধুলো কি আর দুই চপেটাঘাতে দখল ছেড়ে যায়। তবুও সভ্যজগতের মানুষের এইটুকু আনুষ্ঠানিকতা না করলেই নয়। সোফার ক্ষত-বিক্ষত গদির ওপর চাদর পাতা হলো, আমরা শুয়ে পড়লাম, কুপিটা নিভানোর কথা কেউ চিন্তাও করল না। কিন্তু কারো চোখে ঘুম নেই, ভেতরে একটা সত্তা সবসময় তটস্থ হয়ে রইল। মা একটু পর পর চমকে উঠে বাবাকে ডাকে, “অ্যাই, কীসের যেন শব্দ হলো!” বাবা যথাসম্ভব নির্বিকার কণ্ঠে বলে, “কিছু না, ইঁদুর-টিদুর হবে হয়তো। ঘুমাও।” “अच्छा, তুমিও ঘুমাও।” একটু পরে মা আবার বাবাকে ডাকে, “ঘুমিয়ে গেছ?” “না, কী হয়েছে?” “পায়ের কাছে কিছু একটা নড়ে উঠল না?” “না, ও তোমার মনের ভুল।” “আচ্ছা, তাই হবে হয়তো, ঘুমাও তাহলে।” “হুম।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ সময় কেটে যায়, বাইরে ঝিঁঝিপোকার একটানা কোলাহল নীরবতাটাকে আরো গভীর করে তোলে। এমন নিস্তব্ধতায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। “ঘুম আসছে না, মা,” মার কাছে সরে বললাম আমি। “চোখ বন্ধ করে রাখো, ঘুম চলে আসবে।” “চোখ তো বন্ধ করেই রেখেছি। তবুও তো ঘুম আসছে না।” “ভয় লাগছে?” ভয় লাগলেও অস্বীকার করে বীরত্ব দেখানোর মতো বয়স আমার তখনো হয়নি, বললাম, “লাগছে।” “ভয়ের কী আছে, আসো মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।” আমরা একজন আরেকজনকে এভাবে সারারাত অভয় দিয়ে গেলাম, কিন্তু কেউই ঘুমাতে পারলাম না। রাতে যে আমরা কিছু খাইনি, সে-কথা কারো মনেই ছিল না। পেটের ক্ষুধাও ভয়ে কোথায় যেন মুখ লুকিয়েছে।

বুকের সব তেল পুড়িয়ে শেষরাত পর্যন্ত কুপিটা আমাদের আলো দিয়ে গেল। পরে মনে হয়েছিল এইটুকু আলো যতটুকু ভরসা দিয়েছিল তারচেয়ে বেশি ভয় দেখিয়েছে। অন্ধকারের কাছে তো সব জায়গায়ই সমান, মায়ের কোল ছিল, ক্লান্তি ছিল, হয়তো ঘুমাতেও পারতাম। কিন্তু কুপির আলোটা কেঁপে কেঁপে আলো-ছায়ার মায়াজাল তৈরি করে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এটা আমাদের পরিচিত আবহ নয়; প্রাচীন পরিত্যক্ত ভূতুরে বাড়ির মধ্যে কীটপতঙ্গ, সাপ, বিছা আর অজানা এক রহস্যের বিচরণ চারপাশ ঘিরে আছে আমাদের। তবুও আমরা পড়ে রইলাম ঘুমের ভান ধরে।

ভোরের প্রথম আলো জানালার কাচে এসে পড়তেই আমাদের অভিনয় সমাপ্ত হলো। রঙ্গমঞ্চের অন্যসব কুশলীরা বিদায় নিয়েছে, শুধু মাকড়সার জাল আর তাতে আটকে থাকা শিকারগুলো সরতে পারল না। জানালার রঙিন কাচ বিবর্ণ ঘরের মধ্যে কিছুটা আভিজাত্য ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বাবা পর্দা সরিয়ে সব কয়টা জানালা খুলে দিতেই বহুদিন পরে পুবের সূর্য ঘরের ভেতরটা দেখার সুযোগ পেল। রোদের ছোঁয়া পেয়ে ঘরের আসবাবগুলো কিছুটা প্রাণ ফিরে পেল। বাবার চোখে-মুখে নির্ঘুমতার অবসাদ ছাপিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা গেল। কিন্তু দিনের আলোও মায়ের মুখের আঁধার দূর করতে পারল না। তার কপালের ভাঁজে একটা অজানা আশঙ্কা গড়ে নিলো স্থায়ী আবাস। বাবা যেন তার গল্পের ভেতর ঢুকে গেছে। যা ছিল দুপুরবেলার রূপকথায়, তার কিছুটা বাস্তব ঝলক আমাকে দেখাতে পেরে, ঐশ্বর্যের চাক্ষুষ প্রমাণ আমার চোখের সামনে হাজির করতে পেরে বাবার গর্বের সীমা রইল না। বাবা বলল, “চলো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাই তোমাদের। দোতলায় কাচে ঘেরা একটা ঘর থাকার কথা, শুধুমাত্র বৃষ্টি দেখার জন্য আমার দাদা সেই ঘর বানিয়েছিল।” মা উঠল না, এই ঘরের মধ্যে তাকে আরো বেশি রুগ্ন দেখাচ্ছে। একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে মা বলল, “তোমরা দেখে আসো, আমি বসি একটু।”

করিডোরের দুইপাশে আরো বেশ কয়েকটা ঘর, এই ঘরগুলোতে চারটা দেয়াল আর কিছু আবর্জনা ছাড়া তেমন কিছুই নেই। কাঠের ভাঙা চৌকি পড়ে আছে দুই-একটা ঘরে, চৌকির এই দুরবস্থার কিছুটা কারণ অযত্ন আর বাকি পুরোটা ঘুণপোকার কৃতিত্ব। এগুলো চাকর-বাকর আর গরিব পরাশ্রয়ী আত্মীয়দের থাকার ঘর। করিডোরের শেষ মাথায় একটা ছোট আঙিনার মতো আছে, তার একপাশেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। বাইরের দিকে আরেকটা লোহার পেঁচানো সিঁড়ি আছে।

আমরা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখলাম এখানেও সারি সারি ঘর, কোনোটার দরজা বন্ধ, কোনোটা একেবারে নির্লজ্জের মতো হা হয়ে আছে। আমাদের উপস্থিতিতে দোতলার কীটপতঙ্গরা সুখের সংসার ছেড়ে ছোটাছুটি করে পালাচ্ছে। ভ্যাপসা বাতাসের মধ্যে পচা গন্ধ মিশে আছে, কোথাও কিছু একটা মরেছে। আমরা একটা ঘরের মধ্যে ঢুকলাম, ঘরের মাঝখানে বিরাট বড় একটা নকশা করা খাট। বাবা জানালো, খাট বললে নাকি এটার মর্যাদা রক্ষা হয় না, এটাকে বলতে হবে পালঙ্ক। ঘরে আরো কত কিছু আছে, অধিকাংশের নাম আমি জানি না। আমাদের যে আলমারিটা বাসের ছাদে উঠতে পারেনি বলে রাহেলা খালার ঘরে আশ্রয় পেয়েছে, এখানকার আলমারিগুলোর নকশা আর বিশালত্বের কাছে সেগুলো নিতান্ত শিশু। বাবা ঘরের সব কয়টা জানালা খুলে দিলো, বাইরের সতেজ বাতাস ঘরে ঢুকতেই ঘরটা যেন নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচল। বড় ঘরের পাশেই যে ঘরটা আছে, তার একটা দেয়ালজুড়ে বিশাল আয়না লাগানো আছে, আয়নাটার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে, সবকিছু ঘোলা ঘোলা দেখা যায়। বাবা জানালো, এটা হচ্ছে সাজঘর। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “সাজার জন্যও ঘর ছিল? বাবা তুমি কি এখানে এসেছিলে আগে?”

“না, তবে আমার বাবার মুখে মহিমগঞ্জের এই বাড়ির অনেক গল্প শুনেছি।” বাবা জানালো, বহু আগে এই অঞ্চলের কোনো এক জমিদার এই বাড়িটা বানিয়েছিল। বাড়ির সামনে একটা কাছারিঘর ছিল, একসময় খাজনা আদায়, দলিল-দস্তাবেজের সব কাজ সেখানে হতো। জমিদার ইংরেজদের খাজনা মিটাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল, ধারদেনাও ছিল প্রচুর। তার পাওনাদারদের মধ্যে একজন ছিল আমার পরদাদা আরব আলী শেখ। আরব আলী শেখ আর্মেনিয়ানদের সাথে লবণের ব্যবসা করে প্রচুর টাকার মালিক হয়ে গিয়েছিল তখন। টাকা পরিশোধ করতে না পেরে এই বাড়ি আর কিছুটা জমিদারির বিনিময়ে জমিদার ঋণমুক্ত হয়ে কলকাতায় চলে গেল। সামনের কাছারিঘরটা ভেঙেছে অনেক আগেই। খাজনা আদায় হয় না এখন আর, জমিদারিও নেই, কিন্তু নামটা এখনো রয়ে গেছে। এই বাড়ির দেয়ালে কত মানুষের স্পর্শ আছে, কত শ্রমিকের ঘাম আছে! বাড়ির প্রতিটা অংশ খুব যত্নে কারুকাজ করা হয়েছে। কত পুরুষ, রমনী সিঁড়ির এই রেলিং ধরে নিচে নেমেছে। এখানে খেলেছে কত শিশু, বড় হয়েছে, আবার মরেছে। দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমি যেন সেইসব মানুষের হাসি, কান্না, কোলাহল-সব শুনতে পাচ্ছিলাম।

বাইরের লোহার সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি নিচে নামা যায়। আঙিনায় যে মরা ডালপালাগুলোকে জ্যোৎস্নায় অসুরের হাড়ের মতো দেখাচ্ছিল, সেগুলো এখন নিরীহ শুষ্ক কাঠ হয়ে গেছে। ফ্যাকাশে বাড়িটাকে রাতের মতো অত রাগী লাগছে না এখন। মনে হচ্ছে একটা বুড়ো দালান কোলে-পিঠে তুলে কয়েকটা কচি বটগাছের আবদার মিটাচ্ছে। বাড়ির পেছনে নানা জাতের গাছ শ্রেণিবৈষম্য ছাড়াই খেয়ালখুশিমতো বড় হচ্ছে। ফল দেয় বলে কোনো গাছের অতিরিক্ত সমাদর নেই, আবার যে গাছ মৃত্যুর আগে কিছুই দেয় না, তাকেও অকালে বিতাড়িত করা হয়নি। চালতা, কদবেলের পাশে ছোটলোক কামরাঙাগাছ বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। একটা বিশাল বটগাছ তার গাম্ভীর্য বজায় রেখেই কিংশুক, অর্জুনের মধ্যে এসে জুড়ে বসেছে। বাঁশঝাড়, কলাগাছ-কোনোকিছুকেই জাতের কারণে উৎখাত করা হয়নি। আরো কত কী গাছপালা আছে, আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। পথে দুইপাশে ছোট ছোট গাছে সাদা ফুল ফুটে আছে, দেখে মনে হয় গতরাতের জ্যোৎস্না লেগে আছে ফুলে।

গাছেদের এই সমারোহ পার হতেই একটা ছোট পুকুর তার অবশিষ্ট অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের সামনে প্রকট হলো। এতগুলো গাছ মিলে এতক্ষণ যেন পুকুরটাকে লুকিয়ে রেখেছিল। পাতা পচে পুকুরটা প্রায় বুজে এসেছে। অসুস্থ পুকুরটার পানি শ্যাওলাতে সবুজ হয়ে আছে। পুকুরের বাঁধানো ঘাট শরীরে অসংখ্য ফাটল নিয়ে এখনো টিকে আছে। বাবা জানালো, এখানেই অন্দরমহলের অধিবাসীরা গোসল করত। আরেকটা কুয়া ছিল এই বাড়িতে, কী একটা অপরাধে যে চুন-সিমেন্ট দিয়ে সেটার মুখ বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাবা বলতে পারল না। অনেক খুঁজেও সেই মুখবন্ধ কুয়াটার অস্তিত্ব বের করতে পারলাম না আমরা। অন্যপাশে আরেকটা বড় দিঘি থাকার কথা, যেখানে পুরুষেরা গোসল করত, সেই দিঘি কখনো শুকিয়ে যায়নি। গ্রামের মানুষ বলত, এই দিঘির সাথে পাতালের সংযোগ আছে। গ্রীষ্মকালে আশেপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ পানি নিয়ে যেত এই দিঘি থেকে। দিঘিটার খোঁজে আমরা ঝোপঝাড় ঠেললাম, ঘাস সরালাম হাত দিয়ে, বেয়াদপ ঘাসগুলো মাথার ওপর পর্যন্ত উঠে গেছে। যা কিছু দেখছি সবই নাকি আমাদের, এক দিনে এতকিছুর অধিপতি হয়ে নেশায় পেয়ে গেল আমাদের। আবিষ্কারের নেশায় মন থেকে ভয় বিদায় নিয়েছে।

একটু পরেই দিঘির পারে এসে দাঁড়ালাম আমরা। যেই জৌলুসের গল্প একটু আগে শুনেছি, তার সাথে মিল না পেয়ে কিছুটা হতাশ হলাম। পানি এখনো আছে দিঘিতে, কিন্তু ঠিক টলটলে নয়। দিঘির পানিতে গ্রামের মানুষ গোসল করছে, নারীরা কলসিতে ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে, শিশুরা ডুবসাঁতার খেলছে, এরকম একটা দৃশ্য কল্পনা করেছিলাম আমি। এখানে দিঘিতে কিংবা আশেপাশে কোনো জনমানব নেই, বহুকাল এই দিঘি কেউ ব্যবহার করেনি। এখানেও একটা ঘাট আছে, কিন্তু ঘাস, লতাপাতা মিলে ঘাটটাকে কোথায় যে লুকিয়েছে, খুঁজে পেলাম না আমরা। দিঘির পার ধরে সামনে গিয়ে দেখলাম কিছু ফাঁকা জমি অবহেলায় পড়ে আছে, এখানেও সুযোগ পেয়ে ঘাসেরা রাজত্ব বিস্তার করেছে। এত ঘাস গরু-ছাগলের নজরেও পড়েনি? মাঝে মাঝে ভাঙা হাঁড়ি, বাঁশের বেড়া, বাঁশের এলানো খুঁটি দেখতে পেলাম আমরা। বাবা জানালো, এখানে মানুষের বসতি ছিল আগে, এই জমিদারবাড়ি ঘিরে নতুন একটা গ্রাম গড়ে উঠেছিল। তার দাদা কত মানুষকে জমি দিয়েছিল ঘর করার জন্য। “এখন নেই কেন, বাবা?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি। বাবা চুপ করে রইল, তার কাছে কোনো উত্তর নেই। বহুদূরে ফসলের মাঠের সজীব সবুজ রং দেখা গেল, তার মধ্যে কালো কালো ‘কমা’র মতো কৃষকগুলো নুয়ে নুয়ে কাজ করছে। একটা বাঁশের বেড়া এই পতিত ভূমি থেকে সেই সুফলা মাঠকে আলাদা করে রেখেছে। বাবা একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে হয়তো আমার প্রশ্নটারই উত্তর খুঁজছিল। যত ছোটই হই, বুঝতে পারলাম, এই বাঁশের বেড়া অলঙ্ঘনীয়।

ঘরে ফিরে দেখি পুরো ঘর জুড়ে ধূলা উড়ছে। এরমধ্যেই মা সোফার ওপর থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছে। ধুলোর সাথে যুদ্ধে একটু আগেই মা পরাজিত হয়েছে। এমন অবাধ্য একটা বাড়িকে পোষ মানানো এত সহজ হবে না। বাবা বলল, “এইসব পরে হবে, তোমার একার কাজ না এগুলো, বাজার থেকে লোক নিয়ে আসতে হবে। বেশ কয়েকদিন লেগে যাবে সব ঠিকঠাক করতে। আপাতত তুমি রান্নাবান্নার একটা উপায় করো।” কয়েকটা ইট দিয়ে মা একটা অস্থায়ী চুলা বানিয়ে ফেলল, জ্বালানির অভাব নেই চারপাশে। কিছু হাঁড়িপাতিল আর চাল-ডাল আমরা নিয়ে এসেছিলাম সাথে। সেগুলো নদীর পারে পড়ে আছে। বাবা আমাকে বলল, “চলো, হাসান, আমরা গিয়ে দেখি নদীর ঘাটে আমাদের জিনিসপত্রগুলো এখনো আছে নাকি। পারলে কিছু কিছু নিয়ে আসব আমরা।” বাবা একটা লাঠি নিয়ে নিলো হাতে, হেসে বলল, “পথের ঘাসগুলোকে পিটিয়ে মানুষ করব আজ, আমি মাস্টারমানুষ।” বাবার এমন স্বভাববিরুদ্ধ রসিকতায় মা যোগ দিলো না, নির্জীব চুলার সামনে গালে হাত দিয়ে বসে রইল। রসিকতাটা মাঠে মারা যাওয়াতে বাবার উচ্ছ্বাস কমলো না। মাকে এত বিমর্ষ আর বাবাকে এত উৎফুল্ল আগে কখনোই দেখিনি আমি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *