ডাকনাম ভুলে গেছি – ২২

বাইশ

গত তিন দিন ধরে ওয়ারিতে ঘুরছি, কিন্তু গোপী কিষাণ লেনে ঢোকার সাহস জোগাড় করতে পারছি না। নিজের পা দুটোর প্রতি আমার অগাধ মায়া। এই এলাকার প্রায় প্রতিটা দেয়ালে শাকের মাহমুদ টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মতো দাঁত দেখিয়ে হাসছে। একদিন তাকে সশরীরে দেখলাম, বিরাট মিছিলের সামনে সে হাসিমুখে হাত নাড়িয়ে যাচ্ছে। তার গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পোস্টারের তুলনায় বাস্তবে তাকে একটু কম তরুণ দেখাচ্ছে, তার পেছনে দ্রুতপায়ে উচ্চ কলরবে মিছিল এগিয়ে আসছে।

সানগ্লাস পরা লোকটাকে কোথাও দেখলাম না। আমি জানতাম এটাই আমার সুযোগ, শিরার ভেতরে রক্তগুলো ছুটতে আরম্ভ করল, তারাই আমাকে ঠেলে মিছিলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলো। শাকের মাহমুদ আমার দিকে তাকালো একবার, মুখে সেই নিরবচ্ছিন্ন হাসি। আমি নড়ছি না, আসলে নড়তে পারছি না। মিছিল এসে আমাকে পিষে ফেলবে যে-কোনো মুহূর্তে, আমি তাকিয়ে আছি মিছিলের সবচেয়ে সামনের লোকটার দিকে, অর্জুন যেমন মাছের চোখের দিকে চেয়েছিল, দৃষ্টির সামনে বাকি সব ঝাপসা হয়ে গেল।

হঠাৎ টের পেলাম কেউ একজন তার শক্ত হাত দিয়ে আমাকে ঠেলে দিলো একপাশে, আমি টলতে টলতে রাস্তার পাশে গিয়ে পড়লাম। শাকের মাহমুদ তার পেছনে জনতার উত্তাল ঢেউ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় আরো একবার আমার দিকে তাকালো, তার মুখে তখনো সেই হাসিটি লেগেই ছিল।

তারপর বহুদিন আর কোনো মিছিল হয়নি।

একদিন হীরাকে দেখলাম লক্ষ্মীবাজারের রাস্তায়, বিলবোর্ডে অন্য দুটো মেয়ের সাথে শাড়ি পরে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এখানে আরো বেশি ফর্সা আর রোগা দেখাচ্ছে, এই অচেনা হাসিতে তাকে প্রায় চেনাই যাচ্ছে না। ছবিতে তার ভ্রূর পাশে কাটা দাগটা দেখা যাচ্ছে না, চিবুকের নিচে শ্যামল দাগটা মুছে গেছে, মুখে ব্রণের ফেলে যাওয়া কোনো চিহ্ন নেই, তার নিখুঁত চেহারাটা দেখতে কেমন যেন নিষ্প্রাণ লাগছে। তবুও বিকাল হলেই আমি লক্ষ্মীবাজার গিয়ে বিলবোর্ডটা দেখে আসি।

ওয়ারির রাস্তায় ঘুরে ঘুরে যেদিন বিরক্ত হয়ে যাই সেদিন বুড়িগঙ্গার পারে গিয়ে নদীর পচা লাশটা দেখে আসি। শহরের মানুষ তাদের সব বিষ ঢেলে দিয়েছে এই নদীর শিরা-উপশিরায়। বাংলাবাজারে একদিন গিয়েছিলাম ঘুরতে, তারপর আর কখনো যাইনি সেখানে। একমাত্র বাংলাবাজারে গেলেই মনে পড়ে আমি কত দরিদ্র।

এত এত বই, কেনার সামর্থ্য আমার নেই। মাঝে মাঝে সারাদিন হেঁটে বেড়াই শহরের রাস্তায়। রমনা পার্কের সামনে ফুলের দোকান দেখে আমার ইখলাক হোসেনের কথা মনে পড়ল। কোথায় সে ফুল বিক্রি করে কে জানে। রাস্তায় কাউকে ফুল হাতে দেখলেই আমার চোখ খুঁজে বেড়ায় জোব্বা পরা এক হুজুরকে।

সন্ধ্যায় মোতালেব কাকা তার বাইশ বছরের একাকিত্বের ফিরিস্তি শোনায়। আমাদের বাড়ি ভেঙে সব কয়টা গাছকে হত্যা করে ছেলেমেয়ের জন্য এই বাড়িটা তৈরি করেছিল সে। কিন্তু ছেলেমেয়েরা কেউই তার সঙ্গে থাকল না, কেউ চলে গেল নতুন শহরে, যেখানে রাস্তা আরো প্রশস্ত, প্রতিবেশীরা আরো বেশি সভ্য। নতুন শহরের ফ্ল্যাটে পুরোনো বাবার জন্য কোনো জায়গা হয়নি। কেউ চলে গেছে মহাসাগরের আরেক পারে, বছরে দুই-একবার ফোনে তাদের কণ্ঠ শোনা ছাড়া তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই তার জীবনে।

যতদিন বউ বেঁচে ছিল, দুজন মিলে এখানে থাকত, একসাথে হা-হুতাশ করত। দীর্ঘশ্বাস শুনে কেউ একজন জিজ্ঞাসা করত, কী হয়েছে? বউটা অসুস্থ হলো, হাসপাতালে নিয়ে গেল মোতালেব কাকা। সেই শেষ, বউ তার আর বাড়ি ফেরেনি। তারপর থেকে নিচতলার এই কবরে প্রতিদিন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে মোতালেব কাকা। রাতে তার ঘুম হয় না, চোখ বন্ধ করলেই বউয়ের অসুস্থ কোঁকানি শুনতে পায়। আমার সাথে গল্প করে দশটা বাজলেই হাই তোলে মোতালেব কাকা।

আমিও শুয়ে পড়ি, সব বাতি বন্ধ করলেও পুরোপুরি অন্ধকার হয় না ঘর। জানালার ফাঁক গলে রাস্তা থেকে একটা আলোর রেখা ছাদটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। সহজে ঘুম আসে না আমার, আলোর তীর্যক রেখাটার দিকে তাকিয়ে থাকি, পাশের ঘর থেকে মোতালেব কাকার নাক ডাকার শব্দ আসে কানে।

কোনো-কোনোদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যায়, দেখি বিছানা ভিজে গেছে ঘামে। কোনো একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি, কিন্তু মনে করতে পারি না। সেদিন সারাদিন মুখে একটা তিক্ত স্বাদ নিয়ে ঘুরে বেড়াই।

একদিন বিকালে লক্ষ্মীবাজার গিয়ে হীরাকে আর খুঁজে পেলাম না, নতুন ঝকঝকে একটা বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে টান-টান করে। একটা মেয়ে গোলাপি একটা সাবান নাকের কাছে ধরে রেখেছে, সাবানের ঘ্রাণে পরম সুখে তার চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। যারা হারিয়ে যায়, তাদেরকে নগর বেশিদিন মনে রাখে না। হঠাৎ মনে হলো নগর কি আমাকেও গিলে ফেলছে, আমিও কি নাগরিক হয়ে যাচ্ছি? হীরা হয়তো প্রতিদিন আমবাগানে দাঁড়িয়ে তার শহরে ফেরার পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রতিদিন হয়তো নদীটাকে শুকিয়ে যেতে দেখছে সে।

তার চোখে নিশ্চয়ই অপেক্ষা বাসা বেঁধেছে। আর আমি একটা একচক্ষু রাক্ষসের ভয়ে একটা গলিতে ঢুকতে পারছি না।

পরদিন সকালে হীরার অপেক্ষমান চোখ দুটো কল্পনা করতে করতে পৌছালাম সেই নীল গেইটের সামনে। নিচে তাকিয়ে অক্ষত পা দুটোর কাছে ক্ষমা চেয়ে গেইটে ধাক্কা দিলাম। ধাতব ভোঁতা শব্দ হলো, তারপর আবার নীরবতা, গেইট খুলল না। হাত মুঠো করে গেইটে জোরে আঘাত করতেই লোহা গর্জন করে উঠল। ভেতর থেকে একটা কাঠের টুলের পা নড়ে ওঠার শব্দ পেলাম। তারপর কিছু ধাতব শব্দের পর একটু ফাঁক হলো নীল গেইট।

ভেতর থেকে দারোয়ানের মাথা বেরিয়ে আসলো, আমাকে দেখেই চিনতে পারল সে, এমন বড় কলারের শার্ট আর ঢোলা প্যান্ট ঢাকায় আর কেউ পরে না। দারোয়ানের বিস্মিত চোখ আমার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চেহারায় ঘুরতে লাগল। নিজের পুরো দেহটা গেইটের বাইরে এনে পেছন থেকে ধাতব দরজাটা টেনে দিলো।

দারোয়ানের বয়স বেশি না, ইউনিফর্মের নিচে সে একজন বাইশ বছরের যুবক, তার চেহারায় দারোয়ানসুলভ রুক্ষতা নেই, নাকের নিচে নেই পাকানো গোঁফ। তাকে এই পোশাক কিংবা পেশা কোনোটাতেই মানাচ্ছে না, তার উচিত ছিল ফুল হাতে পার্কের বেঞ্চে কলেজপড়ুয়া প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করা।

“ভেতরে রুবেল ভাই বইসা আছে, উনি দেখার আগেই আপনি চইলা যান।” ছেলেটার কণ্ঠে মমতা টের পেলাম আমি।

“আমাকে ভেতরে যেতেই হবে।” শান্ত গলায় বললাম আমি। তবুও কি একটু কেঁপে উঠল গলাটা? মনের কোথাও এখনো ঘাপটি মেরে আছে ভয়।

“আপনি বুঝতে পারতাছেন না, রুবেল ভাই কিন্তু ডেঞ্জারাস মানুষ,” ছেলেটা অনুনয়ের সুরে বলল আমায়।

“আমার আর উপায় নেই।” হেসে জানালাম তাকে।

ছেলেটা যখন দেখল আমার মন পরিবর্তনের আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন সে আমার দিকে একটা নিরাশার দৃষ্টি দিয়ে ভেতরে ঢুকল, গেইট আবার বন্ধ হলো। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় পাঁচ মিনিট পর গেইটের ছোট দরজাটা খুলে গেল। দারোয়ান নিঃস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “আসেন, রুবেল ভাই ডাকতাছে আপনাকে।”

গ্যারেজে আজ গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কম, জায়গাটা অনেক বড় লাগছে। একপাশে প্লাস্টিকের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে আছে এক চোখের রাক্ষস। তার সানগ্লাসটা টি-শার্টের গলায় ঝুলছে। কয়েকটা ছেলে তার পেছনে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের চেহারায় চাপা উত্তেজনা। রাক্ষসটাকে আজ একটু বেশি হিংস্র দেখাচ্ছে, তার ভালো চোখটা লাল হয়ে আছে। আমাকে দেখে চাপা কণ্ঠে বলল, “আইজকা আবার নেশা করছস?”

“রুবেল ভাই, আপনারা আমাকে ভুল বুঝছেন, আমি নেশা করি না, সিগারেট খাইনি কোনোদিন,” নিজের আতঙ্ক লুকিয়ে যথাসাধ্য কোমল কণ্ঠে বললাম আমি।

আমার কথা যেন তার কান পর্যন্ত পৌছালোই না, বলল, “খাড়া, আইজকা তোর সব নেশা ছুটামো।” চোয়াল ফুলে উঠল লোকটার, দাঁতের সাথে দাঁত ঘষার শব্দ পেলাম।

“আমি শুধু শাকের সাহেবের সাথে দুই মিনিট কথা বলতে চাই।” আমার আবেদন যে কত তুচ্ছ সেটা মনে করিয়ে দিলাম তাকে।

“তোর পা ভাঙমু, হাতও ভাঙমু, বাকি জীবন চাক্কার লাহান গইড়াইবি।” এক দলা থুতু ফেলল রাক্ষসটা। তারপর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে বলল, “লোহার পাইপটা আন, মাসুদ।” আর অন্য দুইজনকে বলল, “অরে ধইরা রাখ, সকালবেলা দৌড়াদৌড়ি করবার পারুম না।”

মাসুদ খুব উৎসাহের সাথে লোহার পাইপ আনতে ছুটল। আর দুজন ছেলে আমাকে দুই দিক থেকে চেপে ধরল। একজন আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, “কী ভাবছিলা, ভাইয়ে মশকারি করে তোমার লগে?”

আমার হৃদপিণ্ড বুকের মধ্যে ছটফট করছে, সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছে। আমাকে ধরে রাখার জন্য দুজন লোকের কোনো প্রয়োজন ছিল না, আমার পা পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। মাসুদ লোহার একটা পাইপ নিয়ে এলো, পাইপের মাঝামাঝি একটা ধূসর দাগ, কেউ বলে না দিলেও আমি বুঝলাম এটা শুকনো রক্তের দাগ।

আমার ডানপাশের ছেলেটা বলল, “ভাই, অয় তো চিল্লাইবো, ঐদিনেরটার মতো।”

রাক্ষসটা লোহার পাইপ হাতে নিয়ে মাসুদকে বলল, “যা আমার হুন্ডা থেইকা ত্যানা লইয়া আয়।”

একটা নোংরা, দুর্গন্ধময় কাপড়ের টুকরা আমার মুখে গুঁজে দিচ্ছে ছেলে দুটো। কাপড়টা ঠেলে আমার শুকনো গলা পর্যন্ত ঢুকালো তারা। আমার সামনে লোহার পাইপটা নাচাচ্ছে রুবেল। ঠিক তখন গাড়ির দুইটা হর্ন শুনতে পেলাম। সাথে পেলাম গেইট খোলার শব্দ।

একটা লাল গাড়ি আমার চোখের কোনা দিয়ে গ্যারেজে ঢুকল। লাল গাড়িটা দেখে ছেলে দুটোর হাতের বাঁধন শিথিল হলো, এখনো পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি তারা আমাকে। তাদের উত্তেজনা কিছুটা বিরতি নিলো। খেলার সময় কোনো গণ্যমান্য মুরুব্বি যখন মাঠের মাঝ দিয়ে হেঁটে যায়, বালকেরা তখন যেভাবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে, আমাকে ধরে রাখা ছেলে দুটোর মধ্যেও তেমন ধৈর্য দেখলাম।

রুবেলের হাতের পাইপটা এখন আর নাচছে না। রুবেল পাইপটাকে ফ্লোরে আলতো করে রেখে দিলো, যেন কোলের বাচ্চাকে বিছানায় শোয়াচ্ছে। তার মুখের হিংস্রতা উবে গিয়ে একটা ত্যালত্যালে ভাব চলে এসেছে। নিজের জামাটা টেনে আরো বেশি এলোমেলো করে সে গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।

গাড়ির সামনের দরজা খুলে জিন্স, টি-শার্ট পরা শাকের মাহমুদ বেরিয়ে আসলো, তাকে ডাকতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কালিমাখা ময়লা কাপড়ের টুকরা আমার সব শব্দ আটকে দিচ্ছে। নিজের কানেই একটা ভোঁতা গোঁ গোঁ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শাকেরের চাপা গলার সামনে রুবেলের মাথাটা নুয়ে পড়ল। শাকের কলাপসিবল গেইটের দিকে যখন হেঁটে যাচ্ছিল, তখন আমার দিকে একপলক চেয়ে নিলো। আজ তার মুখে কোনো হাসি ছিল না।

রুবেল যখন আমার সামনে আসলো তখন তার চোখে-মুখে আক্ষেপ। ছেলে দুটো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “ভাই, শুরু করেন তাইলে।”

রুবেল লাথি দিয়ে পাইপটাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিতেই পাইপটা লাথি খাওয়া কুকুরের মতো আর্তনাদ করে উঠল। “ছাইড়া দে অরে,” নিরাশ কণ্ঠে বলল রুবেল। “বস কইছে ইলেকশনের আগে কোনো গ্যাঞ্জাম করন যাইবো না।”

“দুইটা চড়-থাপ্পড় দেই তাইলে?” ডানপাশের জন নিবেদন করল।

“না, ছাইড়া দে, ইলেকশনের আগে আজাইরা মারামারি বন্ধ।” এমনভাবে বলল রুবেল, যেন অভিভাবক পরীক্ষার আগে খেলাধুলায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

“হাত চুলকাইলে কী করুম?” বিনোদনের আর কোনো উপায় আছে কি-না জানতে চাইল একজন।

“নিজের বাল ছিঁড়বি,” দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উত্তর দিলো রুবেল। তারপর পাইপটাতে আরো একটা লাথি মেরে সেটাকে আরো একবার কাঁদিয়ে প্লাস্টিকের হাতলওয়ালা চেয়ারে গিয়ে বসলো।

আমাকে ছেলে দুটো টেনে নিয়ে যাচ্ছে গেইটের দিকে। পেছন থেকে রুবেল বলল, “অর মুখ থেইক্যা ত্যানাটা বাইর কইরা রাখিছ কিন্তু।” যেন আমার মুখে তার বহুমূল্য সাপের মণি।

আমার পা দুটো নতুন জীবন পেয়ে ভীষণ স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। অজান্তে তারা আমাকে নিয়ে এলো লক্ষ্মীবাজার মোড়ে। বিলবোর্ডে সাবান শোঁকা মেয়েটিকে দেখে কেন যেন মেজাজ বিগড়ে গেল, কিছু একটাতে লাথি দিতে মন চাইছে। আমি হয়তো শহুরে হয়ে যাচ্ছি, পা আছে বলেই লাথি দিতে ইচ্ছা করছে। টিনের কৌটা, প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা খেলনা আক্রোশ মেটানোর জন্য কিছুই পাওয়া গেল না।

যেইদিন আমার লাথি দিতে মন চাইলো সেইদিনই আবর্জনার শহর পরিষ্কার হয়ে গেল? আবর্জনার খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম রাস্তায় পড়ে আছে একটা আহত ফুল। ফুলটা পিষে দিতে গিয়ে থেমে গেল আমার পা। পারল না, হাতে তুলে নিলাম ফুলটা। তখন উপলব্ধি করলাম, যদি কনডেন্স মিল্কের খালি কৌটা লাথি খাওয়ার জন্য আমার সামনে এসে গড়াগড়ি করে তবুও হয়তো লাথি দিতে পারব না। একটা জড়বস্তুকে আঘাত করার মতো হিংস্রতাও আমার মধ্যে নেই। কিন্তু তখনো জানতাম না, প্রয়োজন হলে আমি মানুষও খুন করতে পারি।

রাস্তায় লাল গাড়ি আর সাদা জোব্বা দেখলেই সচেতন হয়ে যাই। ফুল দেখলেই আমার চোখ খুঁজে বেড়ায় ইখলাক হোসেনকে। একগুচ্ছ ফুল হাতে একজন লম্বা দাড়ির হুজুর, এই শহরে এমন ফুলবিক্রেতা দ্বিতীয়টি নেই। আমি বহু মানুষকে ইখলাক হোসেনের কথা জিজ্ঞাসা করেছি, এমন মানুষ কেউ দেখেনি। এত মানুষের ভিড়ে কোথাও হয়তো তলিয়ে গেছে ইখলাক হোসেন। তবুও সাদা কিছু দেখলেই আমার বুকে রক্ত ছলকে ওঠে।

যখন ঢাকা শহরের কাছে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছি, ঠিক তখন ইখলাক হোসেনকে খুঁজে পেলাম। দোয়েল চত্বরের দোয়েলের লেজের নিচে একটা শুকনো ফুল হাতে সে দাঁড়িয়ে আছে, তার গায়ে কোনো কাপড়চোপড় নেই, পুরোপুরি নগ্ন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *