ডাকনাম ভুলে গেছি – ২

দুই

মায়ের মুখটা মনে পড়তেই শৈশব মনের দরজা দিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকতে লাগল। আরমানিটোলার একতলা বাড়িটার বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে বই পড়া বাবার অলস দেহটা দেখতে পেলাম। উঠানের একপাশে কোমর বাঁকানো কাঁঠালগাছটার এক বাহুতে ঝুলছে একটা দোলনা, অন্যপাশে বাঁধানো কুয়া। কুয়ার পাশেই রান্নাঘর, রান্নাঘরের ধোঁয়া আর মায়ের হা-হুতাশে উঠানের একপাশ ভারী হয়ে থাকত। উঠানের এক কোণে পেঁপেগাছ আর লাউয়ের মাচা সংসারে অভাবের ভার কমানোর দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যপাশে একটা মেহগনিগাছ কাউকে পরোয়া না করে বেড়েই চলেছে, অনেক জঞ্জাল আর অল্প জ্বালানি জোগান দেওয়া ছাড়া সংসারে তার কোনো অবদান নেই। নিজের সবুজ দেহটা টিনের চালের ওপর বিছিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা চালকুমড়াগাছটা ওপর থেকে নিত্য আমাদের কাজকর্ম দেখতে থাকে। সবুজ শ্যাওলা দিয়ে ঢাকা উঠানটা ফর্সা হয়ে উঠতে পারেনি কোনোদিন; দেয়ালে, প্রাচীরেও শৈবালের বিস্তার রোধ করা যায়নি। নিজের ঠান্ডা আর প্রাচীন দেহটা দিয়ে কোনোমতে আমাদের আগলে রেখেছে বাড়িটা।

এই বাড়িটা স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে বানানো হয়নি। ভূস্বামী রমিজ শেখকে মামলার কাজে প্রায়ই ঢাকায় আসতে হতো। চার-পাঁচ দিন থাকার জন্য আত্মীয়-পরিজনদের গলগ্রহ হওয়াতে তাঁর মন সায় দিত না, তাই মাঝে মাঝে থাকার জন্য বিশ শতক জায়গা কিনে এই বাড়িটা তৈরি করেছিলেন তিনি। রমিজ শেখ জমিদারের ছেলে, অল্প একটু জায়গায় বাড়ি করলে মাঝে মাঝে থাকার মতো ব্যবস্থা হয়ে যায়, কিন্তু তাতে জমিদারির গৌরব রক্ষা হয় না। জমিদারির গৌরব রক্ষা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জমিদারিটা আর রক্ষা করতে পারেননি রমিজ শেখ, সৎভাইয়ের সাথে মামলায় আত্মসম্মানবোধ আর এই বাড়িটুকু ছাড়া প্রায় সব খোয়াতে হয়েছিল তাকে।

আমার বাবা সেই রমিজ শেখের একমাত্র সন্তান, উত্তরাধিকার সূত্রে এই বাড়ি এবং জমিদারি স্বভাব ছাড়া আর কোনো সম্পদ পায়নি বাবা। চাকরি করার প্রবৃত্তি বাবার ছিল না, তবুও স্ত্রী-পুত্রের সংসার শুধু গাছের পেঁপে আর মাচার লাউয়ের ওপর ভরসা করে চলে না। তাই বংশমর্যাদার সাথে সমঝোতা করে একটা স্কুলে চাকরি নিলো বাবা। বিদ্যানুরাগী দরিদ্র পিতা-মাতা সন্তানদের যে উৎসাহে স্কুলে পাঠাত, মাস শেষে ফি দেওয়ার সময় সেই উৎসাহটুকু আর থাকত না। অতএব স্কুলের শিক্ষকদের বেতন আদায়ের জন্য সভাপতি মোতালেব মহাজনের কাছে গিয়ে হাত কচলাতে হতো। বাবা সারাদিন বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে বিদ্যা আহরণ করত, কিন্তু বেতন আহরণের জন্য হাত কচলানোর বিদ্যাটা অর্জন করতে পারেনি, সেখানে অটল পাহাড়ের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াত রক্তে মিশে থাকা তার আত্মাভিমান। যার পূর্বপুরুষ হাত উপুড় করে দান করেছে, সে হাত পেতে বেতন চাইতে পারবে না।

অন্যান্য শিক্ষকরা বড়লোকের ছেলেমেয়েদের ঘরে গিয়ে পড়িয়ে সচ্ছলতা নিয়ে ফিরত ঘরে। মা অর্থাগমনের এই সুগম পথটা বাবাকে দেখিয়ে দিলেই বাবা অবাক হয়ে বলত, “আমি রমিজ শেখের ছেলে, আমি যাব মানুষের বাড়িতে, ছেলে পড়াতে?” এত বড় অন্যায় অনুরোধ করাতে তার বিস্মিত চোখ মাকে তিরস্কার করত সারাদিন। মৃত রমিজ শেখের মর্যাদার উৎপাতে আমাদের পাতে মাছ-মাংস বিরল হয়ে উঠল, আমাদের কাপড়ে পড়ল গোপন সেলাই। আমার শুকনো মুখ, মায়ের ভেজা চোখ কোনোকিছুই শেখ বংশের মর্যাদা টলাতে পারেনি। ‘শেখ বংশের মর্যাদা’ ইজিচেয়ারে শুয়ে নির্বিকারভাবে বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে।

সচ্ছলতা না আসলেও জমিদার বংশের গৌরবের সঙ্গে দারিদ্র্যের সামঞ্জস্য করে সংসার ঠিকই চলে যাচ্ছিল। দুপুরবেলা আমরা খোলা বারান্দায় খেতে বসতাম, ঘরে বসলে বাতি জ্বালাতে হয়, সূর্য যা বিনামূল্যে দেয় তারজন্য টাকা খরচ করার কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি মা। কুয়ার ঠান্ডা পানিতে গোসল করিয়ে মাথায় তেল দিয়ে সিঁথি কেটে দিত মা, তারপর নিজে গোসল করে পাটি পেতে খাবার বেড়ে দিত। মায়ের ভেজা চুলে তখনো গামছা জড়ানো থাকত, রঙিন গামছার বাঁধন অস্বীকার করে কিছু চুল বেরিয়ে পড়ত কান আর কপালের পাশ থেকে। চুলার গনগনে আগুন মায়ের চেহারার যেটুকু স্নিগ্ধতা শুষে নিত, দুপুরের রোদের আভায় তা আবার ফুটে উঠত। বাবাও মাঝে মাঝে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকত, যেভাবে তাকিয়ে থাকত বইয়ের দিকে। বারান্দায় হালকা একটা বাতাস ঘোরাঘুরি করত সবসময়, উঠানের যে অংশটাতে ছায়া পড়ত, সে-অংশটা মায়া মায়া চোখে বারান্দায় আমাদের সংসার দেখত। খাবার পাতে আবার লাউঘণ্ট দেখলে আমার বুকটা অভিমানে ফুলে উঠত, বাবা না দেখলেও মায়ের চোখ এড়াত না সেই অভিমান। বাবার পাতে খাবারের সাথে একটা-দুটো অভিযোগ তুলে দিত মা। সেইসব অভিযোগ কানে না তুলে বাবা শুরু করে দিত অতীত ঐশ্বর্যের গল্প। তাদের কয়েকশ বিঘা জমি, দোতলা বাড়ি, কাছারি ঘর, ব্রহ্মদেশের হাতি, পাকিস্তানি ঘোড়া, হিন্দুস্তানি চাকর, স্বদেশীয় মোসাহেব ইত্যাদি জৌলুসের গল্প শুনতে শুনতে কখন যে আমার পাতের ভাত শেষ হয়ে যেত টেরই পেতাম না।

মা সংসারের বিস্তর সমস্যা সামলানোর পাশাপাশি আমাকে অক্ষর শেখানোর দায়িত্বটাও নিজে গ্রহণ করে নিয়েছিল। বাবার জ্ঞান সংগ্রহে মনোযোগ ছিল, কিন্তু বিতরণে তিনি তেমন তৎপর ছিলেন না, তাই শিক্ষক হিসেবে ঘরে-বাইরে কোথাও তার সুনাম ছিল না। ঘরে যতটুকু শিক্ষিত হওয়া যায় আমি হয়েছিলাম, কিন্তু বাকিটুকুর জন্য তো স্কুলে যেতে হবে, মায়ের পীড়াপীড়িতে একদিন বাবা আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল স্কুলে। প্রথমবার স্কুল দর্শনের অভিজ্ঞতা আমার রীতিমতো ভীতিকর ছিল। আমার অল্পবয়সি চর্মচোখে এমন বিশৃঙ্খলা আগে কখনো দেখিনি। স্কুলের একপাশে একটা হলুদ লম্বা দালান হতে সমবেত চিৎকার ভেসে আসছে, মনে হচ্ছে কোনো দানব ভেতরে বাচ্চাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমি উঁকি দিয়ে দেখলাম, দানব নেই, বালক-বালিকারা স্বউদ্যোগে এমন চিৎকার চেঁচামেচি করছে। যেসব বেঞ্চে বই রাখার কথা, সেইসব বেঞ্চে তারা দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ শুধু দাঁড়িয়ে শান্তি পাচ্ছে না, লাফাচ্ছে। দলা পাকানো কাগজ, ভাঙা পেন্সিল, আরো নানাবিধ শিক্ষা উপকরণকে অস্ত্র বানিয়ে একজন আরেকজনকে ছুড়ে মারছে।

দালানের বাইরে একটা খোলা মাঠ, পুরো মাঠ ধুলোয় ঘোলা হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখানে কোনো ঝড় বয়ে গেছে। ধূলার কুয়াশার মধ্যেই কিছু প্রাণী এমন ক্রিয়াকলাপ করছে যে চিড়িয়াখানার বানররাও লজ্জায় মুখ লুকাবে। তাদের উৎপীড়নে মাঠে একটা সবুজ ঘাস পর্যন্ত মাথা তুলবার সাহস করেনি। মাঠের এক কোণে মল্লযুদ্ধ বেঁধেছে, কিছু বাচ্চা মিলে অন্য একটা বাচ্চাকে মাটিতে চেপে ধরে আছে, নিচে শুয়ে থাকা বাচ্চাটা হাত-পা নাড়াতে না পেরে মুখ খুলে এমন সব অদ্ভুত ভাষা প্রয়োগ করছে যা তখনো আমার বোধগম্য হয়নি। নতুন শব্দ শুনে আমি বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ও কী বলছে, বাবা?” বাবা আমার হাত চেপে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল, “ছিঃ, ওসব শুনতে হয় না।”

কোনোকিছু কানে এলে কীভাবে না শুনে থাকতে হয় তখনো আমি শিখিনি। একটু পরেই একটা শীর্ণ-লম্বা এক লোক হাতে তার মতোই একটা সরু বেত নিয়ে মাঠে প্রবেশ করল। লোকটা যেদিকে যায় সেদিক থেকে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে ছুটতে লাগল, তাতে মাঠে ধূলি আর বিশৃঙ্খলা দুটোই বেড়ে গেল। মল্লযুদ্ধ এক কোণে ভঙ্গ হয়ে অন্য কোণে গিয়ে আবার জমে উঠতে লাগল, শীর্ণ লোকটা অনেকক্ষণ তাদের তাড়িয়ে বেড়ানোর পর বাবাকে দেখে থামল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ভাই, আপনি এইখানে আছেন, তাও বাচ্চারা এমন গোলমাল করছে! একটা ধমক তো দিতে পারেন, পুরা স্কুল তো মাথায় তুলছে।” বাবা বলল, “বেতে যারা ভয় পায় না, ধমকে তাদের কী হবে!” লোকটা বেতটা শক্ত করে ধরে চোয়াল শক্ত করে বলল, “ধরি একটারে আগে, পিটায়া যদি চামড়া না তুলি-” আমার দিকে লক্ষ করে লোকটা কথা শেষ না করে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, “কে? ছেলে নাকি?” আমি বাবার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলাম।

বাবা আমাকে নিয়ে অফিসঘরে ঢুকল। অফিসঘরে বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা, সেখানে গম্ভীর মুখ করে ভয়ংকর সব লোক বসে আছে। এই ঘরের আনাচে-কানাচে বেতের ছড়াছড়ি; ঘরের প্রত্যেক কোনায় একাধিক বেত দণ্ডায়মান আছে, মেঝেতে শুয়ে আছে বেশ কয়েকটা, টেবিলের ওপর কতগুলো আছে তার কোনো হিসাব নেই। এখানে এসে উপলব্ধি করলাম, স্কুল তো শেখার জায়গা নয়, এটা শাস্তির জায়গা। যিনি সবচেয়ে গম্ভীর এবং ভয়ংকর, তিনিই নাকি ‘হেডস্যার’। আমি ভর্তি হব শুনে লোকটা আমার পরীক্ষা নিলো, মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে ডান হাত দিয়ে বাম কান ছুঁয়ে দেখাতে বলল। আমি কান ছুঁয়ে স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলাম। ক্লাসে আমার সমান কিংবা আমার চেয়ে ছোট কেউ ছিল না। আমি তাদের মধ্যে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম, কিন্তু কোনোভাবেই সবার একজন হতে পারলাম না। জীবনে আমি এত মানুষ কখনো একসাথে দেখিনি। আমার নামিদামি আত্মীয়রা সবাই মৃত, বাকি স্বজনরা তাদের দুর্নাম নিয়ে দূরেই থাকে। আশেপাশে কয়েক ঘর প্রতিবেশী আর নিজের বাপ-মা ছাড়া অন্যদের সাথে এত নিবিড় নৈকট্য আর কোথাও পাইনি। মানুষের সাথে কীভাবে মিশতে হয়, কী কথা বলে বন্ধুত্ব করতে হয় তা জানা ছিল না। চোখে বিহ্বলতা আর মনে আতঙ্ক নিয়ে স্থির হয়ে বসে সব আত্মস্থ করার চেষ্টা করছিলাম। সহপাঠীরা চোখ রাঙিয়ে, মুখ ভেংচিয়ে, পিঠে খোঁচা দিয়ে আমাকে অভিবাদন জানালো। ‘স্যারের’ রাঙা চোখ আর বেতের অনুশাসনে এরচেয়ে বেশি সমাদর তারা আমাকে করতে পারল না। একটি হরিণশাবক দেখে শিকারি বাঘ যেমন চোখে লোভ নিয়ে স্থির হয়ে ধৈর্য ধরে বসে থাকে, তারাও তেমনি বসে রইল।

একটা ঘণ্টা শেষ হতেই বেত এবং বেতের মালিক যখন অন্তরালে চলে গেল, তখন তারা মহাউৎসাহে আমাকে পীড়ন করা শুরু করল। নতুন একটা খেলার বস্তু পেয়ে তাদের আমোদের সীমা রইল না। কেউ আমার চুল টানল, কেউ কান মুচড়ে দিলো, আমার নাম বিকৃত করে নতুন কী নামে ডাকা হবে তা নিয়ে বিরাট তর্ক-বিতর্ক হয়ে গেল। আমার ছলছল চোখ দেখে তাদের উৎসাহ-উচ্ছ্বাস আরো বেড়ে গেল। জগতের নিষ্ঠুরতার সাথে সেই আমার প্রথম পরিচয়। এতদিন পরে যখন আমার স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার সাক্ষাৎ হলো, আমি দেখলাম স্কুলে আর আদালতে তেমন পার্থক্য নেই। স্কুলে সারাক্ষণ অভিযোগ, নালিশ আসতে থাকে, সাক্ষী-সাবুদ, অপরাধীকে জেরা করে রায় হয়, বিচারক নিজেই শাস্তি কার্যকর করেন, তিনিই এখানে সর্বময় কর্তা। কর্তার মেজাজের তারতম্যের কারণে মাঝে মাঝে বাদী, বিবাদী উভয়েই শাস্তি পায়। লঘু অপরাধীদের তিরস্কার, চোখরাঙানি, হুমকি ইত্যাদিতে কাজ হয়ে যায়। কেউ পায় এক ঘণ্টার কানধরা দণ্ড; সশ্রম হলে কান ধরে শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না, ওঠ-বসও করতে হবে। কর্তার এক আদেশে আস্ত জ্বলজ্যান্ত বালক মোরগে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তার চেয়েও গুরুতর অপরাধীদের শায়েস্তা করার জন্য বড়কর্তা অর্থাৎ বেতের প্রয়োজন হয়। যাদের বিচার এই আদালতে করা সম্ভব হয় না, তাদের পাঠানো হয় হাইকোর্টে, অর্থাৎ অফিস-ঘরে হেডস্যারের কাছে, সেখানে জামিন পাওয়া দুষ্কর। এইসব সালিশ-নালিশ, দণ্ডবিধানের হাঙ্গামায় বিদ্যাদেবী স্কুলের কোনো এক কোনায় গিয়ে লুকিয়ে থাকতেন, কেউ তাকে খুঁজে পেত না।

আমাদের শ্যাওলাপড়া প্রাচীরের ভেতরে পুরোনো বাড়ির উঠানে নিজের বাপ-মাকে দেখে এইটুকু বড় হয়েছি। অভিমান আমি করতে জানি, কিন্তু অভিযোগ করা শিখিনি। সুতরাং আমাকে নিরাপদে উৎপীড়ন করা যায়। কয়েকদিনের মধ্যে পুরো স্কুলে আমার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল, যাকে মারলে উল্টো মারতে আসে না, গালি খেয়ে চুপ করে থাকে, জামায় কালি ছড়িয়ে দিলেও নড়ে না, সমবেত উপহাস করলেও মাটি থেকে চোখ উঠায় না, ধাক্কা দিয়ে ধুলোয় চেপে ধরলেও স্যারের কাছে নালিশ করে না, এমন অদ্ভুত প্রাণীর খ্যাতির বিস্তার হওয়াই স্বাভাবিক। এমন সুবিধা পেলে একটু অত্যাচারী হতে কার না লোভ হয়? ওপরের ক্লাস থেকে ছেলেরা দলবেঁধে আমাকে লাঞ্ছনা করতে আসত। আমার হাত দেয়ালে চেপে ধরে, পা দিয়ে পা মাড়িয়ে দিত, মুখে কিছু না বললেও চোখ চেপে একসময় অশ্রু নেমে আসত আমার। অশ্রু দেখে তারা উল্লাস করতে করতে চলে যেত।

স্কুলে যেতে আমি কখনো আপত্তি করিনি, নিজের অত্যাচারের কাহিনিও বলিনি কাউকে। ঐ বয়সেই কীভাবে যেন মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, নিজের অক্ষমতাকে অভিযোগের আবরণ পরিয়ে কাউকে দেখাতে হয় না। তবুও স্কুলে যেতে হবে শুনলেই মনে আতঙ্ক ভর করত। সেটার কিছুটা হয়তো আমার চোখেও ভেসে উঠত। মুখে-চোখে ফুটে ওঠা আতঙ্ক মায়ের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। মা হয়তো ভেবে নিয়েছিল, স্কুলে যেতে কার-ই বা আনন্দ হয়! আমার যে উচ্ছ্বাস থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাবা ঠিকই টের পেয়েছিল, সংসার সম্পর্কে আমরা তাকে যতটা উদাসীন ভাবতাম ততটা বোধহয় বাবা ছিল না। বইয়ের পাতা উল্টানোর ফাঁকে ঠিকই জগতের খোঁজখবর নিয়ে রাখত। একদিন সকালে বাবা ঘোষণা দিলো, আমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না। ঘরের মধ্যেই বিদ্যাদেবীকে তুষ্ট করা যাবে। মায়ের আপত্তি ধোপে টিকল না। সেদিন থেকে বাবা আমার শিক্ষক হয়ে গেল। স্কুলে যেসব বই ক্লাসরুমের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারে না, বাবা আমাকে সেইসব বই পড়তে দিলো। আরমানিটোলার সেই বাড়িটাতে বসেই আমার চোখ ফুটতে শুরু করল। আমি আর কখনো স্কুলে কিংবা কলেজে যাইনি। যেই তৃষ্ণা বাবা আমার মধ্যে তখন ঢুকিয়ে দিয়েছিল, তা আজও মেটেনি। তারপরে বহু শিক্ষিত মানুষের সাথে আমার দেখা হয়েছে, সার্টিফিকেটের বদৌলতে যাদের নামের আগে-পিছে অনেক উপনাম যুক্ত হয়েছে। কিন্তু তাদের দেখলে আমার কলের নীরস পুতুল মনে হয়। তাদের চিন্তার স্রোত বহু আগে পাঠ্যবই দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাসের পড়া পড়তে গিয়ে তাদের কৌতূহল সেই কবেই শুকিয়ে মরে গেছে। আমাকে দেখলে তারা আফসোস করে, আহা! এত জানে অথচ একটা সার্টিফিকেট নেই। তাদের দেখলেও আমার করুণা হয়, আহা! এত সার্টিফিকেট আছে, অথচ কিছু জানে না।

স্কুল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেকে আমাদের বাড়িটাকে একটু বেশিই নীরব মনে হতে লাগল। স্কুলে যাওয়ার কথা চিন্তা করলে আমি এখনো শিউরে উঠি, সেই নরকের অত্যাচারের মধ্যে নিজেকে কিছুতেই কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু কোলাহলকে যতই ঘৃণা করি, তার যে একটা ঝাল স্বাদ আছে তা কোনোমতেই অস্বীকার করতে পারি না। আমার যে শিশু-চোখ এত মানুষ একসাথে দেখে এসেছে, তিনজনের এই বাড়িটা তার কাছে যে বেশ ফাঁকা লাগবে সেটাই স্বাভাবিক। ঘরে বইয়ের কমতি ছিল না, তাই ঠিক নিঃসঙ্গ অনুভব করিনি, একাকিত্ব উপলব্ধি করার বয়সও আমার হয়নি। তবুও বাইরের গতিময় জীবনের যে অল্প একটু ঝলক দেখতে পেয়েছিলাম, তা যতই কদর্য আর উৎকট হোক, তার যে একটা আকর্ষণ আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। ঘরে-উঠানে স্বাচ্ছন্দ্যে বড় হচ্ছিলাম, তবুও কীসের যেন একটা অভাব মনের ভেতর খচখচ করত সবসময়।

এক বর্ষার রাতে বাবা একটা অভিনব সংবাদ জানালো আমায়। মা তখন চাল বেয়ে নেমে আসা পানির ফোঁটাগুলোকে ধরার জন্য হাঁড়িপাতিল বিছিয়ে দিচ্ছিল, বাবার হাত আমার মাথার চুলে ঘোরাফেরা করছে। বাবার হাতে যে এত আদর আছে, আগে কোনোদিন জানতে পারিনি। বাবা বলল, “তোমার খুব একা লাগে, তাই না?” স্বীকার করলাম না, অস্বীকারও করলাম না, চুপ করে রইলাম। আসলে আমি জানতামও না আমার একা লাগছে কি-না। বাবা আবার বলল, “আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো, তোমার একটা ভাই অথবা বোন আসবে। তখন দুজন মিলে খুব খেলতে পারবে।” আমার খেলার জন্য কোনোদিন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়নি। দোলনায় নিজে নিজেই দোল খেতে পারি, লেবুতলায় পিঁপড়ার বাসায় অভিযান চালাতে আমার কোনো সাহায্য লাগে না, গাছের ডালে কাক বসলে একাই তাড়াতে পারি। তবুও ঘরে আমার চেয়ে ছোট একজন থাকবে, যাকে আদর-শাসন করার পূর্ণ অধিকার আমি পাবো, যার অজ্ঞতায় হেসে তাকে অনেক কিছু শিখাতে পারব ভেবেই ব্যাপারটা ভীষণ রোমাঞ্চকর লাগল। এক সপ্তাহের মধ্যেই ছোট ভাইয়ের জন্য একটা আর ছোট বোনের জন্য একটা নাম চূড়ান্ত করলাম। এই নাম পরিবর্তনে কারো কোনো অনুরোধ গ্রাহ্য করা হবে না মর্মে ঘোষণা দিলাম। পরের সপ্তাহেই চূড়ান্ত করা অপরিবর্তনীয় নাম দুটি আমি নিজেই বাদ দিয়ে দিলাম। কোনো নামই সপ্তাহ পার করতে পারে না, পরের সপ্তাহে আবার নতুন নাম ঠিক করে ডিক্রি জারি করতাম। আমার উচ্ছ্বাস এত বেড়ে গিয়েছিল যে ফেরিওয়ালা, ফকির-ভিক্ষুক থেকে শুরু করে ঘরের চালে বসে থাকা ঘুঘু পাখিটাও জানতে বাকি রইল না যে আমার একজন কনিষ্ঠ আসছে। মা এসে আমাকে দমন করত, ছিঃ ছিঃ, এসব কথা এভাবে জনে জনে বলতে হয় না। আমি জ্যেষ্ঠ হব, এমন গর্বের খবর প্রচারে লজ্জার কী থাকতে পারে, বুঝতে পারতাম না।

মাকে প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করতাম, কবে নিয়ে আসবে তাকে। মা বিরক্ত হয়ে বলত, “যখন মেহগনির সব পাতা ঝরে যাবে তখন আসবে।” আমি তখন অঙ্ক শিখেছি। সারাদিন বসে বসে মেহগনির পাতা গুনি। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করে অবশিষ্ট পাতা কবে ঝরে যাবে সে হিসাব করতাম। একটা একটা দিন যেত, আর দেয়ালে দাগ কেটে রাখতাম। হিসাব করতে করতে অঙ্কে আরো পেকে গেলাম, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ না খেয়েই মায়ের পেট ফুলতে লাগল, দাগে দাগে দেয়াল ভরে যাচ্ছে।

অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর সেই দিনটা কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে আচমকা হাজির হলো। রান্নাঘরে নিরুত্তাপ চুলা মুখ ভার করে পড়ে রইল, মা বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। মাকে অমনভাবে কাতরাতে আগে কখনো দেখিনি। বাবা স্কুলে না গিয়ে কোথা থেকে যেন দুজন বয়স্ক মহিলাকে ডেকে আনলো। মহিলা দুজন প্রথমেই আমাকে ঘর থেকে বহিষ্কার করে দিলো, আমি দোলনায় আশ্রয় নিলাম। মায়ের কাতরধ্বনি শুনে দোলনায় বসেই কেঁপে উঠছিলাম। মহিলা দুজন পালা করে ঘর থেকে বেরিয়ে থমথমে মুখে বাবার সাথে কী যেন আলোচনা করছে আর বাবার কপালে ভাঁজ আরো গভীর হচ্ছে। বাবাকে দেখলাম ব্যতিব্যস্ত হয়ে বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দে ভটভট করতে করতে একটা বেবিট্যাক্সি আমাদের বাড়ির সামনে হাজির হলো। আমাকে পাশের বাসার রাহেলা খালার তত্ত্বাবধানে রেখে বাবা আর মহিলা দুজন মিলে মাকে বেবিট্যাক্সিতে উঠিয়ে চলে গেল। সেই মুহূর্তের অসহায়ত্ব আমি সারাজীবনে ভুলব না। আমাদের টিনশেড বাড়িটা হঠাৎ অপরিচিত হয়ে গেল। পাশের বাড়ির গনি মিয়ার বাড়ি কিংবা স্কুলের সেই হলুদ দালানের সাথে এই বাড়ির কোনো পার্থক্য রইল না। যে বাড়িতে ‘মা’ নেই সেটা ইটের স্তূপ ছাড়া আর কিছু না।

পাড়াপড়শি উৎসুক হয়ে ভিড় জমাচ্ছে, আমার দিকে সবার করুণার দৃষ্টি। মাথায় হাত বুলিয়ে কেউ কেউ সান্ত্বনা দিয়ে গেল, সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার পরামর্শ দিয়ে আমার ক্ষুদ্র মনটাকে ভয়ে পরিপূর্ণ করে দিলো তারা। বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আমার মন ভুলানোর চেষ্টা করা হলো, আমার কোনো কিছু প্রয়োজন কি-না জানতে চাইল অনেকে। তাদের সান্ত্বনা, আদর, আপ্যায়ন অসহ্য লাগছিল। চুপ করে বসে রইলাম, তাদের কাউকেই বলতে পারলাম না, তোমরা সবাই চলে যাও, ছোট ভাইবোন লাগবে না, আমার মাকে এনে দাও।

দুপুর পেরিয়ে বিকাল হয়ে গেল, উৎসাহীদের ভিড় একটু কমেছে। আমি চোখ পেতে আছি গেইটের দিকে, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে বাবা ঢুকবে মাকে নিয়ে। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেও যখন পরিচিত মুখ দুটি দেখতে পেলাম না, অভিমানে বুকটা আমার ভেঙে গেল। তারা সবাই মিলে আমার মাকে নিয়ে গেল, অথচ মায়ের ওপর যার অধিকার সবচেয়ে বেশি, তাকে একা ফেলে রেখে গেল। সারাদিন যেই কান্নাকে বাঁধ দিয়ে রেখেছিলাম, সন্ধ্যার আবছা আলোতে তাকে আর দমানো গেল না। সন্ধ্যার ভেজা চোখ রাতে শুকিয়ে গেল, ঘুম এসে আমার সব দুঃখ তার কালো ঝোলায় পুরে ফেলল। এখন ভেবে অবাক হই, অত বড় কষ্ট এত অল্প বয়সে কীভাবে হজম করে নিয়েছিলাম। পরে উপলব্ধি করেছি, পৃথিবীতে এমন কোনো দুঃখ নেই যা সহ্য করা যায় না।

বাবা আসলো পরদিন দুপুরে, চোখে ক্লান্তি আর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে। এক রাতেই বাবার বয়স বেড়ে গেছে বহু বছর, হয়তো আমারও। বাবা তার গ্লানিময় হাত দুটো দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল, আমাদের চোখে জল নেই, কিন্তু আমরা দুজনেই কাঁদছি, যে কান্না দেখা যায় না, শোনা যায় না। তারপর কয়েকটা দিন বাবার সাথে আমার মাঝে মাঝে দেখা হতো, মায়ের কথা কিছুই জিজ্ঞাসা করতাম না, মনে সংশয় ছিল, যদি কোনো দুঃসংবাদ শুনতে হয়! একদিন বাবা আমাদের বনেদি আলমারিটা খুলে কিছু কাগজপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেল, তারপর আবার কিছুদিন তাকে দেখতে পাইনি।

পাশের বাসার রাহেলা খালা তসবি হাতে নিয়ে আমার শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়ে যেত। আর কিছু পারুক না পারুক, রাহেলা খালা দুঃখ করতে জানে। কবে কার মা সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেল, কে কবে নৌকা ডুবে মরল, তার দূরসম্পর্কের কোন আত্মীয়ের দুই জোয়ান ছেলেকে কলেরা এক রাতেই খালাস করে নিয়ে গেল, এইসব গল্প বলতে বলতে আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। রাহেলা খালা আমাকে বিবিধ মৃত্যুর সংবাদ শোনাত, তার দীর্ঘশ্বাসের শীতলতায় জমে যেতাম আমি। খালা আমাকে জানিয়েছিল, আমার মা একটা মৃতসন্তান প্রসব করেছে, মা এখনো অচেতন হয়ে শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়, ডাক্তাররা কোনো আশা দেয়নি, প্রতিদিন খরচের ফর্দ ধরিয়ে দেয় কেবল। সে ঘরব্যাপী হতাশা ছড়িয়ে দিয়ে বলত, “আল্লারে ডাকো, বাবা, আল্লায় না চাইলে কোনো উপায় নাই।” তারপর আবারও দীর্ঘশ্বাসের বিষ ছড়িয়ে বাতাসে শূন্য দৃষ্টি দিয়ে বলত, “আহা রে, এই ছোডো পোলা, কে দেখবো তারে?” আরেকটা শোকের গল্প সংগ্রহের সম্ভাবনায় হয়তো সে মনে মনে রোমাঞ্চিত হতো।

এরকম মৃত্যুর আবহ আমার ভালো লাগত না, দোলনায় বসে থাকতাম আমি, রান্নাঘরের পাশে মায়ের বেগুনগাছটাতে ফুল ধরেছে, সেটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। আমার মনে হতো বেগুনগাছটিও গেইটের দিকে তাকিয়ে আছে মায়ের প্রতীক্ষায়। সেও তো মায়ের যত্নে এত বড় হয়েছে, আমার মা তো তারও মা।

একদিন দুপুরে বাবার বুঝি মায়া হলো আমার জন্য, বলল, “যাবে মাকে দেখতে?” বুকের ভেতরের উচ্ছ্বাসের ঝড়টা বাইরে তেমন প্রকাশ পেল না, শুধু ঘাড় কাত করে সায় দিলাম। হাসপাতালে ঢুকতেই অসুখের গন্ধ আমার শরীর চেপে ধরল। কোথা থেকে যেন ভেসে আসলো মিহি কান্না, কাতরধ্বনি। যত মানুষ দেখলাম, সবার চোখ বাবার মতো ক্লান্ত। পর্দা দিয়ে ঘেরা একটা বিছানার সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। আশ্চর্য! মাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি, একটা ফ্যাকাশে দেহ পড়ে আছে সাদা বিছানায়। বাবা ডাকতেই চোখের পাতা কেঁপে উঠল। আমাকে দেখেই তার ঘোলা চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল। যখন মা তার ঠোঁটে ব্যথা লুকানো হাসি ফুটিয়ে তুলল, তখন তাকে চিনতে পারলাম। মায়ের দুর্বল হাতটা আমাকে স্পর্শ করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছা করে না, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।”

মায়ের কন্ঠও বিকৃত হয়ে গেছে, কলসির পেটের ভেতর থেকে যেভাবে শব্দ বের হয়, তেমন। বাবা বলল, “দেখি ডাক্তার-” মা তাকে কথা শেষ করতে দিলো না। বলল, “ওকে তিন বেলা ছুঁতে না পারলে আমি এমনিই মরে যাব।” আমার চোখ সারা বিছানায় মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, ঠোঁটে লেগে থাকা মলিন হাসিটা ছাড়া মায়ের আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। মা বোধহয় লক্ষ করল, বাবাকে কাছে ডেকে বলল, “ওকে আর এখানে এনো না। আমাকে এভাবে দেখে কষ্ট পাবে।” কণ্ঠ উঁচু-নিচু করার সামর্থ্য মায়ের ছিল না, সবই শুনতে পেলাম। আর কখনো মাকে দেখতে হাসপাতালে যাইনি আমি।

একদিন একটা বেবিটেক্সি গর্জন করতে করতে মাকে নিয়ে গিয়েছিল, আরেকদিন আরেকটা বেবিটেক্সি তার যান্ত্রিক বাদ্য বাজিয়ে মাকে ফেরত দিয়ে গেল আমাদের বাড়িতে। মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে বাবার কাঁধে ভর দিয়ে স্থবির পদে নিজের রাজত্বে ফিরল মা। আমাকে বুকে চেপে ধরে মা জিজ্ঞাসা করল, “খুব কেঁদেছিলি না? রাতে ঘুমাতে ভয় করেছে?” মা তখনো জানে না, এই কয়েকদিনে অনেক বড় হয়ে গেছি আমি।

কয়েকদিনের মধ্যে বাবা তার ইজিচেয়ারে ফেরত গেল, মা রান্নাঘরে, আমি দোলনায়। কিন্তু তারপরও সব আর আগের মতো রইল না। বাবার কপালে যেই ভাঁজ পড়েছিল তা স্থায়ী হয়ে গেল, বাবা প্রায়ই বই হাতে নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। বইয়ের প্রতি এমন অবহেলা ইতিপূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি। মায়ের কাজে আগের সেই ছন্দ আর নেই, পেটের সন্তান যাওয়ার সময় মায়ের প্রাণের একটু অংশ নিয়ে চলে গেছে। বেগুনগাছটা অযত্নে মাথা নুইয়ে ফেলেছে। উঠানে মেহগনিগাছ জঞ্জাল ছড়িয়ে রাখে, মা সেদিকে তাকিয়েও দেখে না। সুযোগ পেলেই আমাকে বুকে পুরে রাখে মা, তবুও যেন শান্তি হয় না, অভাব তার মেটে না। তখনো টের পাইনি, কিন্তু শৈশব আমাকে বিদায় জানিয়ে চলে গিয়েছিল।

দোলনায় চুপচাপ বসেই থাকতাম, দোলতাম না। মনে যত উচ্ছ্বাস, আনন্দ কিংবা দুঃখই হোক, মুখে কখনো তার প্রকাশ হতো না। আমাকে পেল বুড়োদের ভাবনা রোগে। এমন বয়স্ক একটা মনের সাথে শৈশব কীভাবে বসবাস করতে পারত?

বাবার কপালের স্থায়ী ভাঁজ আর বইয়ের প্রতি অনীহার কারণ জানা গেল কিছুদিন পরে। এবার বর্ষায় খুব কষ্ট হয়েছে আমাদের, বৃষ্টি হলেই ঝরঝর করে পানি পড়ত বিছানায়। বিছানাকে জলমুক্ত শুকনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় রাত কাটত আমাদের। দুপুরে খেতে বসে মা বাবাকে তাগাদ দিলো, এবার তো যেমন তেমন গেল, ঘরের চাল ঠিক না করলে আগামী বর্ষায় এই ঘরে আর থাকা যাবে না। বাবা খাওয়া থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, কীসে যেন তার কণ্ঠ রোধ করে রেখেছে। তারপর বহুকষ্টে বলল, “আগামী বর্ষায় তো আমাদের এখানে থাকতে হবে না, বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি।”

অকস্মাৎ এই বজ্রপাতে মা এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল যে মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হলো না। কিছুক্ষণ পর নীরবে উঠে চলে গেল। সেদিন থেকে মা আরো চুপচাপ হয়ে গেল। রাতে প্রায়ই জ্বর আসত মায়ের, কিন্তু মুখে একটা কাতরধ্বনিও শোনা যেত না। বাবা যে স্ত্রীর প্রাণরক্ষার জন্য পৈতৃক একমাত্র সম্পত্তিটা বিক্রি করে দিয়েছে, সেটা মা বুঝতে পেরেছিল। এই ভালোবাসাটুকু মাকে আরো অপরাধী করে তুলল। স্বামীর অতীত আর পুত্রের ভবিষ্যৎ শুধু তার প্রাণটার জন্য ব্যয় করে ফেলায়, বাবার প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন অভিমান ছিল মায়ের।

একদিন রাতে ঘুম ভেঙে দেখি মা কাঁদছে, বাবা বসে আছে সামনে। মা তার ভাঙা কণ্ঠে বলছে, “বেঁচে থাকতে লজ্জা হয় আমার, তুমি কেন এত বড় শাস্তি আমায় দিলে?” বাবা কিছু বলছে না, অন্ধকারে তার মুখটা দেখতে পেলাম না, শুধু দেখলাম তার হাতটা মায়ের হাতটাকে শক্ত করে ধরে আছে।

বাসা খুঁজতে বের হয়ে প্রতিদিন মুখে অন্ধকার নিয়ে ফিরত বাবা। তার অভদ্র আয় দিয়ে একটা ভদ্র বাসা খুঁজে পাওয়া যায় না। এরমধ্যে স্কুলে শুরু হলো ছাঁটাইয়ের গুঞ্জন। পড়াশোনায় যেমনই হোক, বেত চালানোয় অদক্ষ কেউ যে শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নয়, তা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। সেক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের প্রথম খড়গটা যে বাবার ঘাড়েই পড়বে তাতে সন্দেহ নেই। একমাত্র আয়ের উৎসটিও তখন নিভু নিভু জ্বলছে। এমন হলে অভদ্রস্থ কোথাও-ও আমাদের ঠাঁই হবে না।

মোতালেব মহাজন একদিন কিছু লোক আর ফিতা নিয়ে আসলো বাড়ি মাপজোখ করার জন্য। কোন গাছ কাটা পড়বে, কী ভাঙা পড়বে ইত্যাদি পরিকল্পনা করে গেল আমাদের উঠানে দাঁড়িয়ে। মৃদুস্বরে বাড়িটা দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রচ্ছন্ন তাড়াও দিলো বাবাকে। আমাদের বাস্তুহীন হওয়া তখন সময়ের ব্যাপার। মা রাতে ঘুমাতে পারে না, বাবা আমার মুখের দিকে তাকায়নি অনেক দিন। এই বাড়ির সব স্বাভাবিক নিয়ম এলোমেলো হয়ে গেছে। আসন্ন বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে আমাকে লুকিয়ে মা প্রায়ই কাঁদত, এখন আর লুকায় না। বলে, “ছেলে জানুক, দুঃখকষ্টের সাথে পরিচয় হয়ে থাকা ভালো, নয়তো হঠাৎ করে সইতে পারবে না।”

বাবা সান্ত্বনা দেয়, “আমার বিদ্যাবুদ্ধি আছে, তাও যদি কাজে না লাগে প্রাণ তো আছে।” বাবার বিদ্যা নিয়ে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু বুদ্ধির ব্যাপারে মা ঠিক ভরসা পায় না। আজকাল বিদ্যা বিক্রি করতে হলেও বুদ্ধি লাগে। মানুষের কাছে সাহায্য না চেয়ে, ধারকর্য না করে বাবা যে বাড়িটা বিক্রি করে দিলো, সেজন্য মায়ের অভিমান ছিল। বাবা বাড়ি বিক্রি করতে পারল, কিন্তু নিজের মর্যাদা বিক্রি করতে পারল না। মা অভিমান করে বলল, “প্রাণ দিলে তো ওর কোনো উপকারে আসবে না, মান দিতে পারবে?” বাবা শান্ত কণ্ঠে বলল, “প্রাণ আমার নিজের, চাইলেই দিতে পারি, কিন্তু মান আমার একার নয়, পূর্বপুরুষের সম্পদ। আমার পক্ষে কারো কাছে হাত পাতা সম্ভব না।” “এই বাড়িটা কি পূর্বপুরুষের সম্পদ না?” মা বলল। “এই সামান্য বাড়ির চেয়ে সেই মান-মর্যাদা কত বড় তুমি জানো, কিন্তু এখন হয়তো বুঝতে চাচ্ছো না।” মা বলল, “ওসব বোঝার কাজ তোমাদের হতে পারে, মায়েরা শুধু সন্তানের ভালো বোঝে।”

বাবা কী যেন বলতে যাচ্ছিল। মা আর কিছু শোনার অপেক্ষা না করে একটা প্রকাণ্ড দীর্ঘশ্বাস বুকের মধ্যে আটকে রেখে উঠে পড়ল। আমাদের বাড়ি আর আমাদের নেই, হাঁটতে-চলতে প্রতি মুহূর্তে এই কথাটা আমার মনে হতো। চালের ওপর চালকুমড়াগাছটা কবে শুকিয়ে গেছে, আমরা কেউ খেয়ালই করিনি। কয়েকটা বোকা মৌমাছি লেবুগাছে নতুন করে বাসা বাঁধছে, ওদের দেখলে আমার করুণা হয়। লাউয়ের মাচায় সবুজ পাতা সব চুপসে ধূসর হয়ে আছে। বেগুনগাছটা মরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেছে, ফুলগুলো তার ফল হতে পারল না। মেহগনিগাছটা নিচে ছড়ানো নিজের নোংরা কৃতকর্মের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, ঝাঁটা দিয়ে কেউ শাসন করে না। কাঁঠালগাছটা হাবাগোবার মতো কোমর বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মোতালেব মহাজনের মাপজোখের হিসাবে তার জন্য যে কোনো জায়গা নেই, সে এখনো বুঝতে পারছে না। আমার দাদার তৈরি ঘরটা বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, বাড়িটা যেন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা মৃতপ্রায় অসুস্থ মা।

যখন সব পথ দরজা বন্ধ করে দিলো, অন্ধকার ঘনিয়ে এলো আমাদের জীবনে, মায়ের মুখে আরো মেঘ জমল, বাবার চোখের নিচে কালি আরো গাঢ় হলো, তখন আলোর তীব্র ঝলকানির মতো একটা চিঠি এসে প্রকট হলো আমাদের বিপন্ন সংসারের মাঝে।
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *