একুশ
ঢাকা শহরে পাখির চেয়ে পোস্টার বেশি। দিনবদলের প্রতিশ্রুতিতে ভরা পোস্টার, ব্যানারের নিচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আবর্জনার স্তূপ। আবর্জনার ছোট পাহাড়ে কাকের চেয়ে শিশুর সংখ্যা বেশি। ঢাকায় কি এখনো ১৯৪৩ সাল চলছে? কাকের ছোট একটা দল বিদ্যুতের তারে বসে ওপর থেকে ‘কা কা’ করে শিশুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাচ্ছে। বাসের হর্নে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তাদের প্রতিবাদ।
দোকানের সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে আমি হাঁটছি, জাগতে থাকা শহরে কোলাহল বাড়ছে। টং দোকানের সামনে কয়েকটা রিকশা ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রিকশাওয়ালারা সিটের ওপর বসে ঘোলা চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখামাত্র পেটে ক্ষুধা টের পেলাম। টং দোকানে গিয়ে দাম হিসাব করে স্বস্তি পেলাম, এই নাস্তার ভার সইতে পারবে আমার বুকপকেট। রিকশাওয়ালারা আড়চোখে দেখছে আমাকে, আমি শ্রমিক নই, আমার হাতে-পায়ে শ্রমের চিহ্ন নেই, চাকরিজীবিদের মতো অস্থিরতা নেই, ছাত্রদের মতো উদ্ধত নই, আমার মধ্যে নেই ভবঘুরের উদাসীনতা, আমাকে কোনো শ্রেণিতে ফেলতে না পেরে তারা একটু পর পর ভ্রূ কুঁচকে তাকাচ্ছে। প্রত্যেক রিকশাওয়ালার শরীর মেদহীন, চামড়া পুরোনো কাঁসার বাটির মতো তামাটে। তারা মাংসপেশি ক্ষয় করে অর্থ উপার্জন করে। একজনকে দেখলাম তার ল্যাতল্যাতে লুঙ্গিটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে আরাম করে বিড়ি টানছে। ঠিকানা বলে দিতে তার আয়েশের কোনো ক্ষতি হবে না ভেবে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাই, ওয়ারি কোনদিকে বলতে পারেন?”
সে হাতের বিড়িটা ঠোঁট থেকে আলগা করে, আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিলো, “ওয়ারি যাইবেন? উডেন।” সিটে বসেই বলল রিকশাওয়ালা।
“না, ভাই। আমি হেঁটেই যাব, একটু বলে দিন কোনদিকে।”
“অ।” বলে সে এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যেন কিছু একটা সে আগেই ধারণা করেছিল, এখন মিলে গেছে।
“অই দিকে।” মুখটা একটু বাড়িয়ে সে যে কোনদিকে নির্দেশ করল বুঝতে পারলাম না। তার অনাগ্রহ দেখে আর কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে শুনলাম রিকশাওয়ালাটা কাকে যেন বলছে, “হালায় মাল খায় মনে হয়।”
রাস্তায় কেবল ঘুরতে লাগলাম, এক সাইনবোর্ড তিনবার পড়েছি এই পর্যন্ত। অবশেষে শাকের মাহমুদকে খুঁজে পেলাম, একটা ইলেকট্রিক পিলারে সাঁটানো রঙিন পোস্টারের ভেতরে দাঁত দেখিয়ে হাসছে। পোস্টারের ওপরের কোনায় তার নেতা-নেত্রীদের মুখ। তার নামের আগে, তরুণ, উদীয়মান, জনদরদি ইত্যাদি সব বিশেষণ যোগ করা আছে; নামের শেষে আছে বিভিন্ন সংগঠনের অনেকগুলো পদ, কার্যনির্বাহী সদস্য, সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক সহ-সভাপতি, যুগ্ম আহ্বায়ক ইত্যাদি। সাধারণ মানুষের দুই পা ছাড়া এত পদ থাকে না। শাকের মাহমুদ নিঃসন্দেহে অসাধারণ কেউ, পোস্টারে তাকে রূপবান এবং আন্তরিক দেখাচ্ছে, তিনি জনসাধারণের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছেন।
দুপুর পর্যন্ত হেঁটে অবশেষে ওয়ারি এসে পৌঁছালাম। এখানে প্রতি দেয়ালে, পিলারে, ব্যানারে শাকের মাহমুদ হাসছে। এই এলাকার একটা গলির মুখে দাঁড়িয়ে মনে হলো আমার পরিচিত ঢাকাকে ফিরে পেয়েছি, যাকে শৈশবে ফেলে গিয়েছিলাম। সরু গলি, রিকশার টুংটাং, পুরোনো দোতলা বাড়ি, শ্যাওলাধরা বিবর্ণ প্রাচীর। কিন্তু আগের মতো আর নীরবতা নেই এই গলিতে, বাড়িগুলোর জানালা সব বন্ধ, বারান্দায় শুধু ভেজা কাপড় ঝুলছে, মোড়া পেতে কেউ বসে থাকে না আর, ছায়া নেই আগের মতো। আর একটু পর পর গলি থেকে অহংকারী জানোয়ারের মতো প্রাইভেট কার সবাইকে সরে পড়ার আদেশ দিতে দিতে বের হয়ে আসে।
শাকের মাহমুদের অফিস গোপী কিষাণ লেনে, গলিটা খুঁজে পেতে খুব বেশি সমস্যা হলো না। এই গলিতে অধিকাংশ প্রাচীন এবং সম্ভ্রান্ত বাড়ি, কিছু নতুন বাড়িও গজিয়েছে ফাঁকে ফাঁকে। দেখে মনে হয় বনেদি জমিদারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মাছের ব্যবসা করে নব্য কোটিপতি হওয়া ব্যবসায়ী, ৩৮/এ বাড়িটাও তেমন। এই বাড়ির তিনতলায় শাকের মাহমুদের অফিস। একটা ছোট সাইনবোর্ড দেখলাম বাড়ির গেইটে, জনতা ট্রেডিং।
বন্ধ গেইট দেখে আমার উচ্ছ্বাস কিছুটা দমে গেল। নীল রঙের নিশ্ছিদ্র গেইটের সামনে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। ধাক্কা দেওয়ার সাহস অর্জন করতে পারলাম না। চিন্তা করলাম, একটা অপরিচিত লোকের মুখে নিজের প্রেমিকার গর্ভধারণের খবর শুনলে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে তার? চিঠিটা থাকলে আমার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত। মাঝে মাঝে কিছু গাড়ি আসে, হর্নের সাথে সাথে উইনিফর্ম পরা একটা লোক নীল গেইটটাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর আবার তারা মিলিত হয়। মানুষজন এসে ছোট একটা পকেট গেইট দিয়ে ঢোকে, আমি হাঁটতে থাকি গলির এমাথা-ওমাথা। প্রতিটা বাড়ির নাম মুখস্থ করে ফেলেছি, গলির কালো কুকুরটার সাথেও সখ্যতা হয়ে গেছে, বারান্দার ভেজা কাপড় শুকিয়ে গেছে, কিন্তু আমি ভেতরে ঢোকার সাহস সংগ্রহ করতে পারিনি। যখন সতেরোতম বারের মতো গেইটটি পার হয়ে চলে যাচ্ছিলাম, তখন দরজা ফাঁক করে দারোয়ান বের হয়ে আসলো। আমাকে ডেকে বলল, “এই যে, ব্রাদার, ভেতরে আসেন, আপনারে ডাকে।”
আমার বুক কেঁপে উঠল। “আমাকে?” এই মুহূর্তে গলিতে কেউ নেই, তবুও নিশ্চিত হতে চাইলাম আমি।
“জি, আসেন।”
গেইটের ভেতরে কিছুটা জায়গা খোলা, তার ভেতরে গাড়ির গ্যারেজ, গ্যারেজের পাশে প্রশস্ত কলাপসিবল গেইট, এই গেইট দিয়েই বোধহয় বাড়িটাতে ঢুকতে হয়। দারোয়ান আমাকে গ্যারেজের ভেতরে নিয়ে গেল। এখানে প্লাস্টিকের চেয়ারে কিছু লোক বসে আছে, আর কিছু লোক এলোমেলো দাঁড়িয়ে নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। যারা বসে আছে, তাদের মধ্যে একজন বাদাম ছিলে খাচ্ছে, লোকটার চোখে সানগ্লাস। গ্যারেজের ভেতরে সানগ্লাসের কী প্রয়োজন কে জানে। সানগ্লাসের নিচ থেকে একটা কাটা দাগ গালের মাঝামাঝি এসে শেষ হয়েছে, গালে চন্দ্রপৃষ্ঠের মতো অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। লোকটা একনজর আমাকে দেখে আবার বাদাম ছিলায় মন দিলো। আমাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রেখে দারোয়ান গেইট রক্ষায় চলে গেল।
দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো একনজর আমাকে দেখল, খুব বেশি কৌতূহল প্রকাশ পেল না তাদের চোখে-মুখে, গল্পে একটা সংক্ষিপ্ত বিরতি ছাড়া আমার উপস্থিতি তাদের ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারল না। সানগ্লাস পরা লোকটা হাত ঝেড়ে বাদামের খোসা পরিষ্কার করল, তারপর সানগ্লাসটা খুলে আমার দিকে তাকালো। লোকটার বাম ভ্রূর নিচ থেকে গাল পর্যন্ত লম্বা গভীর দাগ, দাগটার মাঝামাঝিতে একটা ফ্যাকাশে চোখ গাঁথা আছে। ভালো চোখটা দিয়ে আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আবার সানগ্লাস দিয়ে নিজের নষ্ট চোখ এবং নিষ্ঠুর চেহারাটা ঢেকে নিলো লোকটা।
“মতলব কী?” আরেকটা বাদাম ছিলে মুখে পুরে চাবাতে চাবাতে জিজ্ঞাসা করল লোকটা।
“শাকের সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছি।” নিজের ‘মতলব’ জানালাম।
“কোন ওয়ার্ড?”
“আমি ঢাকায় থাকি না।”
“তুমি হালায় ঢাকায় থাকো না, এলাকার ভোটার না, তোমার কী কাম বসের লগে?” স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা উঁচু গলায় বলল লোকটা, তার চেহারায় সানগ্লাস ভেদ করে বিরক্তি ফুটে উঠল। গ্যারেজের পরিবেশ হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা সবাই এখন আমার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে, গল্প বন্ধ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এত মানুষের দৃষ্টির সামনে আমি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছিলাম, তবুও বিপর্যস্ত কণ্ঠে বললাম, “শাকের সাহেবের সাথে আমার খুব জরুরি কথা আছে।”
“কী জরুরি কথা?” সানগ্লাস পরা লোকটার গলা আবার নেমে এলো।
“সেটা শুধু তাঁকেই বলা যাবে।”
আমাদের কথা আর বেশভূষায় কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছিল না তারা। তারা বুঝতে চেষ্টা করছে এই অদ্ভুত পোশাকে আমি কী উদ্দেশ্য ঢেকে রেখেছি। সানগ্লাস পরা লোকটা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে আঙুল দিয়ে একটা ইশারা করল। কমবয়সি একটা ছেলে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল, তারপর জামার ওপর দিয়ে আমার বুক, পেট, কোমর, উরুতে নিঃস্পৃহ স্পর্শে কী যেন খুঁজতে লাগল। পকেটে অল্প একটু ধাতুর স্পর্শ অনুভব করে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এইটা কী?”
বললাম, “ঘড়ি।”
তারপর পর্যায়ক্রমে আমার হাঁটু, গোড়ালি সবখানে তার দুই হাত ঘুরে বেড়ালো। “কিচ্ছু নাই, ভাই।” সানগ্লাস পরা লোকটার দিকে তাকিয়ে আমাকে নিরাপদ ঘোষণা করল কমবয়সি ছেলেটা। গ্যারেজের পরিবেশে যেই উত্তেজনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এক ঘোষণাতেই মরে গেল। দাঁড়িয়ে থাকা কেউ একজন বলল, “ঐডাও নাই? ঠিকমতো দেখছস?”
নিজের উপহাসে নিজেই হাসতে লাগল ছেলেটা। সানগ্লাস পরা লোকটা পেছন ফিরে তাকাতেই তার হাসিটা পলাশপুরের বাসের ইঞ্জিনের মতো দুইটা হেঁচকি তুলে বন্ধ হয়ে গেল।
“নাম কী তোর?” সানগ্লাসের আড়াল থেকে জিজ্ঞাসা করল লোকটা, ইতোমধ্যে আমার সম্মান আরো এক ধাপ নিচে নেমে গেছে। যথারীতি আমার কিছু সময় লাগল নিজের নাম মনে করতে। তারপরের প্রশ্ন আরো অসম্মানজনক।
“নেশা কোনটা করছ? ট্যাবলেট, সিরাপ নাকি সবজি?”
এগুলো কিছুই আমার কাছে নেশাদ্রব্য মনে হলো না, আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলাম।
“ভাই, একটু বানাইয়া দেই, নেশা ছুইট্যা যাইবো,” আমার ডানপাশ থেকে কেউ একজন বলল। সানগ্লাস পরা লোকটা হাতের ইশারায় তার ‘বানানোর’ ইচ্ছা দমন করল। বলল, “ইলেকশনের আগে কোনো ঝামেলা করন যাইবো না, বস মানা করছে।”
শুনেছি ইলেকশনের আগে নেতারা মেথরের বাসায় বসে ভাত খায়, আর ইলেকশনের পরে নাক না চেপে রাস্তায় নামতে পারে না। নির্বাচনের বদৌলতে আমি লাঞ্ছনা থেকে বাঁচলাম। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালো লোকটা, তারপর ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরে যদি আর কোনো সময় এই এলাকায় দেখি-” কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে যথাযোগ্য হুমকিটা ভেবে নিলো লোকটা, “দুই পায়ের দুইটা নল্লি খুইলা রাইখা দিমু।”
লোকটার চেহারা দেখে মনে হলো সে শুধু ভয় দেখানোর জন্য এই হুমকি দেয়নি। দুটো অক্ষত পা এবং দুর্দমনীয় ক্ষুধা নিয়ে আমি রায়সাহেব বাজারে ঘুরছি। শাকের মাহমুদের সাক্ষাতে ব্যর্থ হয়ে একটা হুমকি নিয়ে ফিরে আসলাম তখন বুঝতে পারছিলাম না কোথায় যাব, পেটে পাকস্থলি একটু পর পর এপাশ-ওপাশ করছে। পকেটে যে টাকা আছে তাতে রেস্টুরেন্টের দরজায় পা রাখার সাহস করা যায় না। বাদাম কিনে খাওয়া যায়, কিন্তু কোথাও বাদামওয়ালার দেখা পাচ্ছি না।
রাস্তায় জ্যামে পড়া ঝকঝকে গাড়ির বন্ধ জানালার সামনে ফুল উঁচিয়ে ধরে বিক্রির চেষ্টা করছে কিছু বাচ্চা। তাদের দেখে আমার ইখলাক হোসেনের কথা মনে পড়ল। সে-ও তো এই শহরে ফুল বেচছে কোথাও। ইখলাক হোসেনের ঠিকানা আমি জানি, তাকে সেই ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েছিলাম, যার কোনো জবাব আসেনি। আমাকে দেখে ইখলাক হোসেন হয়তো খুশি হবে, অথবা এই দুর্মূল্যের শহরে আমি হব তার অযাচিত অপব্যয়।
মোজাম্মেল এন্ড সন্স, রংচটা সাইনবোর্ডে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে এসেছে, নিচে ছোট করে লেখা-৭৩, রায়সাহেব বাজার। ৭-এর পাশে ৩ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। দোকানের সামনে খোলা বস্তায় চালের পিরামিড উঁচু হয়ে আছে। পেছনে নকশা করা ক্যাশবাক্সের পেছনে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে আছে সাইনবোর্ডের মতোই প্রাচীন এক বৃদ্ধ।
“কী লাগবো?” গলার শ্লেষ্মার জাল ছিন্ন করে শব্দগুলো বের হয়ে আসলো বৃদ্ধের মুখ থেকে।
“আমি ইখলাক হোসেনকে খুঁজছি, মেসে থাকে।”
বৃদ্ধ লোকটা ডান দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করল, “কেঠা?”
“ইখলাক হোসেন, ফুল বিক্রি করে রাস্তায়।”
“অ, ইখলাক হুজুর? অয় তো থাকে না এইখানে, অরে বাইর কইরা দিছি। মাথার ইস্কু ঢিলা আছে হুজুরের, রাইতে ঘুমায় না, বাজার উজারে ঘুরে, ভাড়াভি ঠিকমতো দিবার পারে না।” একনাগাড়ে বলে গেল বৃদ্ধ লোকটা।
“এখন কোথায় থাকে বলতে পারেন?”
“কইবার পারি না, দোকান ছামলাইয়া দিশা পাই না, অত খবর ক্যামতে লমু।”
অপরের সংবাদ রাখতে যার এত অপারগতা, সে আবার ডান দিকে ঝুঁকল, গলাও নামল এক পারদ। বলল, “কাহিনি কী কও তো? হুজুর তোমার কী হয়?”
“কেউ না।”
আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আমার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে, চায়ের দোকান থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নিলাম। হাঁটছি, কিন্তু আমার কোনো গন্তব্য নেই। তখনো জানি না উদ্দেশ্যহীন পা আমাকে নিয়ে চলেছে শৈশবের দিকে।
ঘাড়ের পেছনে সর্বদা রিকশা টুংটাং করে রাস্তার অধিকার দাবি করছে। আমি একপাশে সরে আরো সংকুচিত হয়ে রিকশার শীর্ণ চাকা থেকে নিজের পা বাঁচাই। রাস্তার পাশে খোলা ড্রেন তার কালো দুই বাহু বাড়িয়ে ধরে আছে, একটু পা ফসকালেই জাপটে ধরবে। এই শহরে শান্তিমতো দুটো পা ফেলার জায়গা নেই। বিকাল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সূর্য দরিদ্র মায়ের মতো চেঁচেপুঁছে পাতিলের অবশিষ্ট আলো বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এক মুঠো মাটি নেই, সবুজ ঘাস নেই, বড় বৃক্ষের কোল নেই, আমার অবসন্ন দেহটা পেতে রাখার মতো অল্প একটু জায়গা নেই এখানে। আমি একটা নদী খুঁজছি, নদী তার কাঁখে আমাকে আশ্রয় দিবে, কিন্তু বহুদূর হেঁটেও নদীর সন্ধান পেলাম না।
দেহের শক্তি যখন ফুরিয়ে আসছে, স্মৃতির পুরোনো গলি থেকে আমার শৈশব উকি দিলো। একটা অদ্ভুত আকারের দালানের ওপর ক্রুশ চিহ্নটা বাবার তরুণ চেহারাটা উঠিয়ে আনলো অতীতের অতল গহ্বর থেকে। বাবার বিশাল হাতে নিজের হাতটা নিশ্চিন্তে সঁপে দিয়ে এই রাস্তায় হেঁটেছি আমি। ঘাড় উঁচিয়ে বাবাকে দেখেছি, বাবার মাথা গিয়ে ঠেকছে আকাশে। সেই আকাশে বাবা আমাকে দেখিয়েছিল এই ক্রুশ চিহ্ন। বলেছিল, এটা আর্মেনিয়ান চার্চ। তখন কত বড় মনে হয়েছিল চার্চটাকে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে। সময়ের সাথে সাথে চার্চটা বুড়ো হয়েছে, বাবাও কি তাহলে বুড়ো হয়ে গেছে?
চার্চের আশেপাশে কোনো একটা রাস্তায় আমাদের সেই বাড়ির গলি। রমিজ শেখ যে বাড়ি বানিয়েছিল মামলা লড়ার জন্য, অবশেষে যে বাড়িটা ছাড়া সবকিছু খুইয়েছিল। আমার কল্পনায় ভেসে উঠল টিনের চালের নিচে হলুদ দেয়াল, মেহগনিগাছের ঝরাপাতা, ফসলের ভারে নুয়ে পড়া বেগুনের গাছ, হাঁড়িচাঁচার লেজ, ভেজা গামছা মাথায় বাঁধা মায়ের মুখ, ইজিচেয়ারে শোয়া বাবা, কোলে একটা রঙিন মলাটের বই। এইখানে কোথাও আমার ছোটবেলা লুকিয়ে আছে, আমি খুঁজে পাচ্ছি না। চার্চটা ঘিরে প্রতিটা রাস্তায় গিয়ে খুঁজেছি, স্মৃতির সাথে মিলাতে পারছিলাম না কিছু। কোথায় সেই বিধুবাবুর দোতলা বাড়ি, যেটা পার হলেই বিজয় লন্ড্রি, ডানদিকের গলিতে ঢুকলে ইসমত মিয়ার চায়ের দোকান, সেই গলির মাঝামাঝিতে মেরুন রঙের গেইট। বাড়ির পুরোনো প্রাচীর মেহগনিগাছটাকে ঢেকে রাখতে পারত না, চৈত্র মাসে তার কচি সবুজ পাতা বিধুবাবুর বাড়ির সামনে থেকে দেখা যেত। আমাদের সেই ব্যক্তিগত দৈত্যটাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না।
সূর্য ডুবে গেছে, কিন্তু সব আলো সাথে নিয়ে যায়নি, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বাড়িগুলোতে এখনো কেউ সুইচ টিপে দেয়নি, দিনের আলোর সবটুকু তারা ব্যবহার করবে।
আমি একটা গলির মুখে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখছিলাম এই গলিতে আমার হারানো শৈশব আছে কি-না। শৈশব পেলাম না, কিন্তু চোখের কোণে দেখলাম একজন বৃদ্ধ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আবাসিক গলিতে এমন উঁকিঝুঁকি সন্দেহজনক, আমার পরিচ্ছদও আমার ভদ্রতার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে না, এমনিতেই কেন যেন ঢাকা শহরের মানুষ আমাকে নেশাখোর সাব্যস্ত করেছে।
আমি ইতস্তত করে পথ ভুলে ঢুকে পড়েছি, এমন ভাব করে বৃদ্ধ লোকটার চোখের দিকে না তাকিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলাম। আর মনে মনে আশা করছিলাম তার বুড়ো চোখ যেন আমাকে নিস্তার দেয়।
“বাবা, আপনার পরিচয়?”
বৃদ্ধ এক-পা সরে আমার সামনে এসে পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটার চোখে ভারী চশমা, চশমার কালো ফ্রেমের ওপর থেকে তার সাদা ভ্রূ বের হয়ে আছে। মাথায় কিস্তি টুপি, মুখে লালচে দাড়ি, কালো একটা লাঠির বাঁকানো মাথা আঁকড়ে ধরে আছে চামড়া কুঁচকানো শীর্ণ ডান হাত। চশমার মোটা কাচের ভেতর থেকে তার বড় বড় চোখগুলো আমার সারা মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ভেবে পাচ্ছিলাম না নিজের কী পরিচয় দিবো।
“স্যরি, ভুল করে এখানে ঢুকে পড়েছি।” পরিচয় না দিয়ে কৈফিয়ত দিলাম আমি।
বুড়ো লোকটা আরো কাছে এগিয়ে আসলো, তার মাথার কিস্তি কেঁপে উঠল, মাথা একবার তুলে একবার নামিয়ে আমাকে আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
“কী তাজ্জব ব্যাপার, এত মিল!” বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বলল লোকটা। “আপনারে দেইখা একটা পুরান লোকের কথা মনে পড়ছে।”
আমি যেই ধরনের পোশাক পরেছি, আমাকে দেখলে সবারই কোনো না কোনো পুরাতন মানুষের কথা মনে পড়বে।
“আপনার বাবার নাম কী?” জানতে চাইলো বুড়ো লোকটা।
এত বড় মানুষকে কেউ বাবার নাম জিজ্ঞাসা করে না। পরিচয় জানতে চাইলে পেশা জিজ্ঞাসা করে, নয়তো ঠিকানা। আমি একটু বিস্মিত হলাম, তবুও এই প্রশ্নটাকে এড়ানো গেল না, বৃদ্ধের চোখ দুটো হা করে তাকিয়ে আছে আমার জবাবের জন্য।
বাবার নাম বললাম, “আমজাদ শেখ।”
এই সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের পুরোনো গলির আবছা আলোর মধ্যে বৃদ্ধের শ্যামল চেহারা ছোট বালকের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনে হলো এক মুহূর্তে অন্ধকার গলিটা আলোকিত হয়ে গেল। বৃদ্ধ লাঠিটা বাম হাতের জিম্মায় রেখে ডান হাত দিয়ে খপ করে আমার হাত ধরে ফেলল।
“আমার কথা মনে আছে তোমার? মনে থাকবার কথা না, আমি তোমার মোতালেব কাকা, তোমগো বাড়িটা আমি কিনছিলাম।”
মোতালেব কাকা যখন বাড়ির মাপজোখ করার জন্য আমাদের বাড়ি এসেছিল, তখন দেখেছিলাম তাকে। তার কথা শুনেছি বাবা-মায়ের ফিসফিস আলোচনায়, বাবার হতাশ কণ্ঠে। তার নামটা যতবার আমাদের বাড়িতে উচ্চারিত হয়েছে ততবার মায়ের চেহারায় পড়েছে শঙ্কার ছায়া। এই নামটা আমার মনে আছে সেই দুঃস্বপ্নের মতো, যা বহুদিন মনে থাকে।
“চলো।”
মোতালেব কাকার হাতের টান অনুভব করলাম কনুইতে। “কোথায়?”
“যে জায়গা তোমারে এইখানে টাইনা আনছে, সেইখানে।”
আশেপাশের বাড়িগুলোতে বাতি জ্বলে উঠছে, সেই আলো এসে পড়েছে সরু গলিতে। ড্রেন থেকে তোলা জমিয়ে রাখা ময়লা গলিটাকে আরো নোংরা আর ক্ষীণ করে রেখেছে। অপরিচিত সব দেয়াল পাশ কাটিয়ে আমরা ধীরপায়ে হেঁটে চলেছি। মোতালেব কাকার লাঠি কংক্রিটের পথে ঠক-ঠক শব্দ করছে, আমার বুকেও বাজছে সেই শব্দ। গলিটা অন্য গলির চেয়ে নীরব, পেছন থেকে কোনো রিকশার তাড়া শুনতে পাইনি এখনো। কান পাতলে এখনো শোনা যায় পাশের বাসায় মায়ের শাসন, মেয়ের আবদার, রান্নাঘরে পাতিল আর চামচের সাংসারিক গান, মশলার গন্ধ।
পাঁচতলা একটা নিষ্প্রভ দালানের সামনে এসে মোতালেব কাকার লাঠির ঠোকাঠুকি থামল। জং-ধরা নিশ্ছিদ্র গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা, মোতালেব কাকা তার কালো লাঠিটা উঁচিয়ে বাড়িটার দিকে দেখিয়ে বলল, “চিনবার পারো?”
রকম বাড়ি প্রায় প্রত্যেক গলিতেই আছে, চারকোনা, বৃক্ষহীন, কাঠখোট্টা দালান। এই বাড়িটা তবুও ভিন্ন, আমি জানি আমার শৈশব চাপা পড়ে আছে এই বাড়ির নিচে, একটা দীর্ঘশ্বাসে আমিও আমার হতাশা চাপা দিলাম।
“কোনোকিছুই আগের মতো নেই,” বললাম আমি।
“হ, সব বদলাইয়া গেছে।” মোতালেব কাকার কণ্ঠেও হতাশা টের পেলাম, কিছুটা অনুতাপও। “আহো, বাবা, ভিত্রে আহো।”
গেইট ঠেলে আমাকে আহ্বান জানালো মোতালেব কাকা। নিচতলার একটা ঘরে জং-ধরা তালা ঝুলছে, পাঞ্জাবির পকেট থেকে চাবি বের করে তালাটা খুলল মোতালেব কাকা। তার ঘরে ওষুধ আর সাবানের গন্ধ, আলো জ্বালাতেই দেখলাম প্রাচীন সব আসবাবপত্র বিদ্যুতের অধিকাংশ আলো শুষে নিয়েছে। ঘরের দেয়ালের রং খসে পড়তে শুরু করেছে, চারদিকে অনুজ্জ্বল নিরানন্দ ছড়িয়ে আছে। ঘরের দুটো দেয়াল জুড়ে মুখ গোমড়া করে বসে আছে এক সেট সোফা। আমাকে বসতে ইশারা করে নিজেও বসলো মোতালেব কাকা।
“তোমার বাপের মতো খাঁটি মানুষ আর দেখি নাই কোনোদিন,” বসতে বসতেই বলল মোতালেব কাকা। “তোমারে যখন দেখলাম বাইরে খাড়াইয়া কী জানি খুঁজতাছো, মনে হইলো আমজাদ সাব খাড়াইয়া রইছে, আমি তো মনে করলাম হাইঞ্জা বেলা কী ধন্দে পড়ছি, এতদিনেও আমজাদ সাব একটুও বুড়া হইলো না?”
তারপর মোতালেব কাকা একনাগাড়ে শুধু বলে গেল, কিছু স্মৃতিচারণ, কিছু অভিযোগ, কিছু অভিমান, কিছু অনুশোচনা। অনেক দিন সে হয়তো কথা বলার মতো কাউকে পায়নি, এখন একজন নীরব শ্রোতা পেয়ে এতদিনের ক্ষতি সে পুষিয়ে নিচ্ছে।
“তোমার বাপেও এমন চুপচাপ আছিল,” সন্তুষ্টির সাথে সোফায় হেলান দিয়ে বলল মোতালেব কাকা। “তোমার বাপে আছে কেমন? শরীর ভালা?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম, আমাকে চুপ থাকতে দেখে মোতালেব কাকা সোজা হয়ে বসলো, “আমজাদ সাব কি-?”
আমি মাথা নাড়লাম, “না, না, বাবা আমার সাথে থাকেন না আর, মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই চলে গেছেন, কোথায় আছেন বলতে পারি না।”
“তোমার মায় আরেক সাচ্চা মানুষ, আল্লায় তারে বেহেস্ত নসিব করুক, খুব মহব্বত আছিল দুইজনের। কিন্তু আজব কিসিমের মানুষ তোমার বাপ, দিলে ব্যথা পাইছে মানুষটা, আল্লায় তারে বাঁচায় রাখলেই হয়।”
মোতালেব কাকা ওপরের দিকে চেয়ে সবকিছু সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দিয়ে নির্ভার হয়ে গেল। তারপর তার কৌতূহল আমার ব্যক্তিগত জীবনের দিকে মোড় নিলো।
“তুমি ঢাকায় কই থাকো?”
“ঢাকায় থাকি না, একটা কাজে ঢাকায় এসেছি।”
“কই উঠছো? তোমার জিনিসপাতি কই?”
“কোথাও উঠিনি, আমার ব্যাগটা চুরি হয়ে গেছে।”
“কও কী?” মোতালেব কাকা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। সাদা ভ্রূ চশমার ওপর লাফিয়ে উঠল। তারপর উঠে গিয়ে পুরোনো ওয়্যারড্রোবের একটা গোঁয়ার ড্রয়ার খুলল। কী যেন হাতিয়ে একটা চকচকে চাবি বের করে আনলো মোতালেব কাকা। চাবিটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল, তার মুখে চাপা সন্তুষ্টি।
“লও, এইটা রাখো।”
“কীসের চাবি এটা?”
“যেই তালাটা আমি খুলছি, অইটার চাবি, যতদিন তোমার কাম থাকে, যতদিন তোমার মনে চায়, তুমি আমার সাথে এই বাসায় থাকবা। ঘরের অভাব নাই এই বাসায়, খালি মানুষের অভাব। রিনার মায়ে রাইন্ধা দিয়া যায়, গরুও মুখ দিবো না তার খাওনে। আমি একলা খাইয়া পারি না, তুমি খাইবা আমার লগে। কয়েকটা দিন বুড়ার কথা শুইন্যা যাও, কথা কওয়ার মানুষ নাই আমার। এত বড় দুইন্যা, এত মানুষ, কিন্তু আমি একলা। থাকো কয়টা দিন, বাবা।”
সেই রাতে এক পকেটে লেডিস ঘড়ি আর অন্য পকেটে নতুন চাবি নিয়ে মোতালেব কাকার সাথে একসাথে খেতে বসলাম আমি, রিনার মা পাবদা মাছের ঝোল রেঁধেছে, সাথে ছিল করলা ভাজি আর ডাল। এত সুস্বাদু খাবার আমি আর কোনোদিন খাইনি।
