তিন
আমার দাদা রমিজ শেখের সৎভাই মঞ্জু শেখ মামলাপটিয়সী লোক ছিলেন। উকিলের দল জটিল সমস্যায় পড়লে তাঁর কাছে পরামর্শ চাইতে আসত। সৎভাইয়ের সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পর মামলার নেশায় পেয়ে যায় তাঁকে। আদালতের বারান্দায় তিনি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন। ঘরে যতক্ষণ থাকতেন দলিলে মুখ ডুবিয়ে রাখতেন। তাঁর স্ত্রীর যৌবন অপচয় হতে লাগল, তিনি দলিল-দস্তাবেজ থেকে অবসর পেলেন না। আইনের সাথে সহবাস করে তিনি সম্পত্তি যে পরিমাণে বাড়ালেন, সেই পরিমাণে বংশবৃদ্ধি করতে পারলেন না। একটামাত্র পুত্রতেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। সেই পুত্র মাতৃপ্রশ্রয়ে কী পরিমাণ বিগড়ে গিয়েছিল সেই খবর তিনি রাখতে পারেননি। যখন খবর পেলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সুলভ, দুর্লভ কোনো নেশাকেই ছেলে অবহেলা করে না। একসময় কোনো লুকোচুরি ছাড়াই ঘরে বসে আফিমের ধোঁয়া নিতে শুরু করে সে। লুকোচুরি করেনি বলেই মঞ্জু শেখের নজরে পড়েছিল, আর সেদিন মঞ্জু শেখের মামলার নেশা ছুটে গিয়েছিল। ডাক্তার-কবিরাজের উপদেশ, বাপের ধমক কিংবা মায়ের মাথার দিব্যিও ছেলেকে নেশামুক্ত করতে পারল না। বাপের এত বড় সম্পত্তির কোনো সুরাহা না করে ছেলেটা অকালে মরল। ছেলের দুঃখে গিন্নীও বেশিদিন টিকলেন না।
মঞ্জু শেখ যে দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন তা আমরা জানতে পারলাম তাঁর মৃত্যুর পর। ছেলের মৃত্যুর পর তাঁর মধ্যে এক ধরনের বৈরাগ্য চলে এসেছিল। মামলা করে যত সম্পদ তিনি জমিয়েছিলেন, শেষ বয়সে অধিকাংশই হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিছু বেদখল হয়ে গেছে, কিছু গেছে তাঁর চেয়েও অধিক মামলাবাজ লোকের হাতে। মাস ছয়েক আগে তিনি তাঁর ঘরে একাকী মরে পড়ে ছিলেন। দুর্গন্ধ ছড়ানোর আগে কেউ তাঁর মৃত্যুসংবাদ পায়নি।
মঞ্জু শেখ মারা যাওয়ার সময় সম্পত্তি বলতে মহিমগঞ্জে একটা পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়িই অবশিষ্ট ছিল। বিক্রি করা যায়নি বলেই বাড়িটা টিকে ছিল। কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় সেই বাড়ির অধিকার পেয়েছিল আমার বাবা। এই যুগে এত বড় বাড়িটা এখনো কেউ কেন গিলে খেলো না তা আমরা পরে টের পেয়েছিলাম। উকিলের এক চিঠিতে আমরা বাস্তুহীন হওয়া থেকে রক্ষা পেলাম।
রাতে খেতে বসে মা বলল, “আচ্ছা, মহিমগঞ্জের সবকিছু বিক্রি করে মোতালেব মহাজন থেকে এই বাড়িটা আবার কিনে রাখা যায় না?” বাবা বলল, “আমি উকিলের সাথে কথা বলেছি, ওইসব জমি নাকি কেউ কিনতে চায় না।” মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কেন?” “কী জানি, উকিলও তো কিছু খোলাসা করে বলল না। আর তাছাড়া আমার আর এই শহরে থাকতে ভালো লাগছে না। চলো, সুলতানা, সেখানে গিয়েই আবার শুরু করি। বড় বাড়ি আছে, কিছু জমিজমা আছে। আমাদের ভালোই চলে যাবে।”
বাবার মুখে মায়ের নাম এই প্রথম শুনলাম। মায়ের রোগাক্লান্ত ফ্যাকাশে চেহারাটা একমুহূর্তে রাঙা হয়ে গেল। আমার বাপ-দাদার স্মৃতি মেশানো, মায়ের হাতে পরিপাটি হওয়া বাড়িটাকে বিনষ্ট করার পূর্ণ অধিকার দিয়ে মোতালেব মহাজনের কাছে চাবি হস্তান্তর করে আমরা মহিমগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম নেওয়ার মতো বই ছাড়া আর তেমন কোনো আসবাব আমাদের নেই। বড় আলমারিটার প্রতি মায়ার কমতি না থাকলেও বাসের ছাদে তার জন্য জায়গার অভাব ছিল, পাঁচজন কুলি মিলেও সেই গোঁয়ার ভারী আলমারিটাকে নড়াতে পারছিল না। তাই সেটা রাহেলা খালার হস্তগত হতে আর কোনো বাধা রইল না। ইজিচেয়ারটার স্থূলতার অপরাধ ছিল না, তাই তাকে অনাথ হতে হলো না, একজন কুলির কাঁধে চড়ে সে স্বচ্ছন্দে বাসের ছাদে উঠে পড়ল।
এলাকায় আমাদের খুব বেশি মেলামেশা ছিল না, তাই বিদায়ে খুব বেশি ঘনঘটা হবে না সেটাই আশা করেছিলাম আমরা। কিন্তু দেখা গেল বাসস্টেশনে লোকজনের ভিড় জমে গেল। বাবাকে একের পর এক আলিঙ্গনের শিকার হতে হচ্ছে, মায়ের আশেপাশে জড়ো হয়ে অনেক মহিলা আঁচলে চোখ মুছছে। বড় বনেদি আলমারির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে রাহেলা খালা পরিমাণের অতিরিক্ত বিলাপ করে ফেললেন, নিজের মেয়ের বিয়ের দিনও তাকে অত বিলাপ কেউ করতে দেখেনি। আমার স্কুলের সাবেক অত্যাচারী কয়েকজন সহপাঠীও অবাক হয়ে আমাদের চলে যাওয়া দেখতে এসেছে। যখন বাস ছেড়ে দিলো, তখন আমাদের পুরোনো ভাঙা বাড়িটার জন্য, এই অতিউৎসাহী আবেগী মানুষগুলোর জন্য, এই নিষ্ঠুর, নোংরা শহরের জন্য প্রথমবারের মতো আমার ভীষণ মায়া হলো।
বাসের জানালায় শহরের সব চিহ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। জানালায় গাছপালা, ফসলের মাঠ, বাড়িঘর-সব ছুটছে। দূরে গুচ্ছ গুচ্ছ সবুজ দেখে আমার কৌতূহল হলো, বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেখানে কী? বাবা জানালো সেগুলো সব গ্রাম। এত ঘন সবুজ আমি রমনা পার্কে গিয়েও দেখিনি। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বাস যে কতদূর আমাদের নিয়ে এসেছে, কিছুই মনে নেই আমার। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি চারপাশে পানি। ভয়ে বাবার দিকে তাকাতেই, বাবা বলল, “আমরা ফেরিতে আছি, নদী পার হচ্ছি।” ড্রয়িংবুকে নদী দেখেছি, এঁকেছিও, সেইসব নদী সরু আর শান্ত। ছড়া-কবিতায় যে নদীর পরিচয় পেয়েছিলাম, সেগুলো বৈশাখ মাসে হেঁটে পার হওয়া যায়। নদী যে এত বিশাল আর ভয়ংকর হতে পারে আমি ভাবতে পারিনি কখনো; যতক্ষণ ফেরি ডাঙায় না ভিড়ল, বাবার হাত চেপে ধরে বসে রইলাম।
তারপর আবার বাস চলতে শুরু করল রাস্তায়, ঝাঁকুনির ক্লান্তিতে আমার চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেল। বাস যখন থামল, আমরা তখন পলাশপুরে। বাসের হেল্পার ঘুমন্ত যাত্রীদের ঘুমের প্রতি কোনো মায়া না দেখিয়ে চিৎকার করে ঘোষণা দিলো পলাশপুর এসে গেছে। পলাশপুরে বাস থেকে নেমে আমার মনে হলো অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি আমরা। কালো পিচের রাস্তার ওপর একটামাত্র বাস, দূরে কয়েকটা শূন্য রিকশা গা-ভরতি জং নিয়ে বোকা জন্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার পাশেই একটা বাজারের মতো জায়গা এই ভর দুপুরে ঝিমাচ্ছে। বিশাল একটা গাছের নিচে অল্প কয়েকটা দোকান, তার মধ্যে অধিকাংশ চোখের পলক ফেলে ঘুমাচ্ছে। যে একটা-দুইটা খোলা আছে, সেখানে খদ্দেরের চেয়ে মাছি বেশি আছে। মাছি আর মানুষ মিলে ভাগাভাগি করে চা খাচ্ছে, কিছু মানুষ চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে অলস দৃষ্টিতে বাসের যাত্রীদের উঠানামা দেখছে। দোকানের রেডিয়োতে বিনোদনের অভাব নেই, বাস এসে থামলে সেটা উপরি পাওনা। দিনে এখানে নাকি এই একটাই বাস আসে, সেটাকেই চোখ দিয়ে গিলছে তারা। বাজারের পাশ দিয়ে একটা শীর্ণ রাস্তা ক্যান্সার রোগীর মতো সটান হয়ে শুয়ে আছে। জরাজীর্ণ রাস্তাটা কিছুদূর গিয়ে মাঠের কাদার মধ্যে মৃত্যবরণ করেছে। মানুষের দুই পায়ে সেই কাদা লঙ্ঘন করা গেলেও চাকার সাধ্য নেই। আমাদের সহযাত্রীরা চাকার ওপর ভরসা না করে মালপত্র মাথায় তুলে হাঁটা শুরু করল। আমাদের মালপত্র আপাতত গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে।
বাজারের পাশে রাস্তাটা ছাড়া আর কোনো পথ না দেখে আমি বিভ্রান্ত হলাম, বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এখন কোথায় যাব, বাবা?” বাবা চুপ করে রইল, তার চোখেও উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। চা দোকান থেকে একটা লোক অদম্য কৌতূহল আর পাঁচ-ছয়টা মাছি সঙ্গে নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসলো। তার রোদে পোড়া পিঙ্গল চুলের সাথে তেল-চিরুনির সাথে কোনোদিন পরিচয় হয়েছে বলে মনে হয় না। তামাটে চামড়ায় ধুলোর প্রলেপ খালি চোখেও দেখা যায়, তার প্রতি মাছিদের এত অনুরাগের কারণ কিছুটা অনুমান করা গেল। লোকটা তার ফ্যাঁসফ্যাঁসে কন্ঠে বলল, “কই যাইবেন আম্লেরা?” নিরীহ প্রশ্নটাকেই জেরার মতোই শোনালো। বাবা বলল, “মহিমগঞ্জ যাব। যাওয়ার কী উপায় আছে বলতে পারেন?”
“কই থেইকা আইছেন?” লোকটা প্রশ্ন করল আবার। “ঢাকা থেকে। এখানে তো কোনো গাড়ি দেখছি না, মহিমগঞ্জ যাওয়ার অন্য কোনো উপায় আছে?” বাবা কায়দা করে আবার জানতে চাইল। বাবার প্রশ্ন লোকটা কানেই তুলল না, বরং একসাথে আরো অনেকগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দিলো, “বেড়াইতে আইছেন? কার বাইত যাইবেন? এত মালপত্র ক্যা? …” আমাদের বংশবৃত্তান্ত, ঘটিবাটির হিসাব না নেওয়া পর্যন্ত লোকটার শান্তি নেই। তার পিপাসা মেটানোর কোনো উদ্যোগ বাবার মধ্যে দেখা গেল না। নিরাশ ভঙ্গিতে বাবা বলল, “কী করবেন এতকিছু জেনে?” লোকটা হেসে বলল, “আম্লেরা শহর থেইকা আইছেন, আমগো একটা ইনটারেস্ট আছে না?”
চায়ের দোকানের অবশিষ্ট দুজন গ্রাহকও রেডিয়োর সুরেলা আহ্বান উপেক্ষা করে তাদের ‘ইনটারেস্ট’ মেটানোর জন্য লোকটার পেছনে এসে দাঁড়ালো। তারা এসে লোকটার কাছে জিজ্ঞাসা করল, “কীরে, মতিন, কই যাইবো এনারা?” “ঢাহা থেইকা আছে, মইমগঞ্জো যাইবো, কাকা।” এইটুকুতে তার পিপাসা মিটল না, জিজ্ঞাসা করল, “বেড়াইতে আইছে? কার বাইত যাইবো? এত মালপত্র…” আমাদের সামনেই আমাদের নিয়েই তারা আলোচনা করছিল। বাবা তাদের থামিয়ে দিয়ে বলল, “আপনাদের মধ্যে কেউ কি মহিমগঞ্জ চিনেন?”
সবাই হেসে উঠল, এদের মধ্যে বয়স্ক লোকটা বলল, “মইমগঞ্জো চিনতাম না? কী কইলেন এইডা, আমগো আত্মীয়স্বজন ভরা মইমগঞ্জো। মইমগঞ্জোর লগের গেরামে তালতো বইনরে বিয়া দিছি। আমগো গেরামের কালু মিয়ার মামতো ভাইয়ের খালার বাড়িই তো মইমগঞ্জে। সালেহার বইনঝিডার বিয়া দিছে না কার লগে? মতিনরে, কী জানি নাম? হ, জামাল মিয়া। জামাল মিয়ার আপন মামার শ্বশুরবাড়িও মইমগঞ্জে, আর ইয়া আছে না, কী জানি নাম…” আরো অনেক উদাহরণ হাজির করে লোকটা প্রমাণ করে দিলো যে মহিমগঞ্জে তার নিকটাত্মীয়ের কোনো অভাব নেই।
বাবা এবার বিনীতভাবে বলল, “এখান থেকে কীভাবে যাওয়া যায় জানেন?” একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে লোকটা তার ভূগোলজ্ঞান সম্পর্কে সমস্ত সন্দেহ উড়িয়ে দিলো। বলল, “জানমু না ক্যান। বেশি দূরে না, এই রাস্তা ধইরা হাঁইট্যা গেলে আট-দশ মাইল হইবো।” লোকটা কাদায় ভরা রুগ্ন রাস্তাটা দেখিয়ে দিলো। কাদার মধ্যে দশ মাইল হাঁটার কথা শুনে বাবা অসহায়ের মতো মালপত্রের দিকে তাকালো, মালপত্রগুলোও বাবার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বাবা বলল, “কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে না?”
শহুরে মানুষের বোকামিতে লোকগুলো খুব আনন্দ পেল। মাছিঘেরা লোকটা বলল, “কোমর সমান প্যাঁকের রাস্তা, মানুষসহ হান্দাইয়া যায়, গাড়ি চলবো ক্যামনে। হুদিনকালে টেম্পু চলে, এক-দেড় মাস পরে আইলে গাড়ি পাইবেন।” চায়ের দোকানদার এতক্ষণ রেডিয়োর ভলিউম কমিয়ে দোকানে বসেই সব শোনার চেষ্টা করছিল, গাছের নিচের আলোচনার রস পুরোটা দোকানে বসে পাওয়া যাচ্ছিল না, অবশেষে কর্তব্যের বাঁধনপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে দোকানটাকে মাছিদের হাতে তুলে দিয়ে সে গাছতলায় এসে যোগ দিলো। ঢাকা থেকে এসেছি শুনে সে আমাদের প্রতি খুব সদয় হলো, রাজধানী এবং রাজধানীবাসীদের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা। কথায় কথায় জানালো তার নাম রওশন মিয়া, তার ছোট মেয়ের জামাই ঢাকায় রিকশা চালায়, রাজধানী সূত্রে মুহূর্তেই আমরা আত্মীয় হয়ে গেলাম। সে বলল, “এত মালপত্র লইয়া এই রাস্তা দিয়া তো যাওন যাইতো না।” যেন, মালপত্র না থাকলেই এই পথ দিয়ে দশ মাইল হেঁটে যাওয়াটাই খুব সম্ভব ছিল।
রওশন মিয়া আমাদের অভয় দিয়ে বলল, “কুনো চিন্তা কইরেন না, আম্লেরা আমাগো কুটুম মানুষ, যাওয়ার ব্যবস্থা হইবো। সামনেই ঘাট আছে, হুদিনকাল আসে নাই অখনো, নাও দিয়াই যাইতে পারবেন।” একটা উপায় পেয়ে বাবার চেহারায় স্বস্তি ফিরে আসলো। রওশন মিয়ার রিকশাচালক ছোট জামাতার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার সীমা রইল না। আমাদের দোকানে বসিয়ে চা খেতে রীতিমতো বাধ্য করল লোকটা, দাম দিতে চাইলে লজ্জায় জিভ কাটল। আমাকে একটা লজেন্স ধরিয়ে দিলো রওশন মিয়া, তারপর সে নিজে মালপত্র সব ঘাটে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। নৌকা ঠিক করে মাঝিদের বারবার করে বলে দিলো, “দেখিস কইলাম, আমগো কুটুম মানুষ, লগে বউ, নাতি আছে, ঠিকমতো পৌঁছাইয়া দিবি।” নৌকা আড়ালে যাওয়ার আগপর্যন্ত সে ঘাটে দাঁড়িয়ে থেকে হাত নাড়িয়ে বারবার আমাদের বিদায় দিলো। কত সহজে মানুষ এখানে আত্মীয় হয়ে যায়! রওশন মিয়ার ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা আমার এখনো মনে আছে। অনেক পরে তার খোঁজ করেছিলাম পলাশপুর বাজারের তার ছোট্ট চায়ের দোকানে। দোকানটা তেমনই ছিল, মাছিগুলো সানন্দে উড়ছে, কিন্তু রওশন মিয়ার পান খাওয়া স্নেহার্দ্র মুখটা সেখানে নেই, দোকানে অন্য একজন লোক বসে ছিল। জানতে পেরেছিলাম, ঢাকায় যাওয়ার পথে বাস উল্টে মরেছে রওশন মিয়া।
ঘাট ছেড়ে কিছুদূর আসতেই নদীর মাঝারি ঢেউ নৌকার তলায় তাল দিতে শুরু করল। নৌকাটা এমনভাবে দুলছে যেন নদীটা অন্যমনস্কভাবে তাকে নিয়ে খেলছে। আনমনেই এই অবস্থা! পূর্ণ মনোযোগ দিলে না জানি নৌকার কী হাল হবে। আমার ভয়টা যে অমূলক না, কিছুক্ষণ পরে একজন মাঝি তা জানিয়ে দিলো। বলল, “গাঙ তো ঠান্ডা অহন, বাতাস ছুটলে দশ-বারো হাত উঁচা ঢেউ উডে। কত নাও ডুবছে, আর কত মানুষ খাইছে এই গাঙে, হিসাব নাই।” আমি মায়ের কোলে গিয়ে ঢুকলাম ভয়ে। মাঝি হেসে বলল, “এত বড় পোলা, পানিরে ডরাও!” তারপর নিজের সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “শহরের মানু তো, বড় হইছে আরামে, পানিরে ডরায়, হে হে।”
একটু পরে বাতাসকে অনুকূলে পেয়ে পাল তুলে দিলো মাঝিরা, নৌকাটা ঢেউ কেটে পার ঘেঁষে তরতর করে এগোচ্ছে। বাবা ছইয়ের বাইরে বসেছিল, আমাকে ডাকল, “দেখে যাও, হাসান।” বাইরে গিয়ে দেখে যা দেখলাম তা জীবনে কখনো ভুলব না। পুরো পার ঢেকে আছে সাদা মেঘে। আমার বিস্মিত দৃষ্টি দেখে বাবা জানালো, ওগুলো কাশফুল। সৌন্দর্য উপভোগ করার বয়স আমার তখনো হয়নি, আমার ছোট কলসিতে এত রূপ ধরার জায়গা ছিল না, কিন্তু সেদিন যা দেখেছিলাম তা আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। ওপরে নীল কাচের আকাশ, নিচে চঞ্চল নদীর খিল-খিল হাসি, বাতাসে হেলেদুলে ঢলে পড়ছে সাদা কাশফুল, মাঝে মাঝে ঘাটে মায়ের শাসন উপেক্ষা করা, আর্দ্র বালকদের ভেজা চকচকে দেহ পানি থেকে ভেসে আবার ডুবে যাচ্ছে। জেলেদের উদোম নৌকা মাছ খুঁজে বেড়াচ্ছে। দূরে সবুজ ঘোমটা দিয়ে গ্রামের ঘরগুলো বিহ্বল হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। হা করে তাকিয়ে সব দেখছিলাম, সৌন্দর্যের তাড়া খেয়ে মন থেকে কখন যে ভয় বিদায় নিয়েছিল তা টের পাইনি।
নদীর বিশুদ্ধ রুচিকর বাতাসে পেট জেগে উঠল। সারাদিন প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। মা তার পুঁটলি খুলে চিড়া-মুড়ি বের করল, অন্তরা পিসি কিছু নারকেলের নাড়ু দিয়েছে, সেগুলোও পেতে দিলো মা। কিছুক্ষণ খাওয়ার পর বাবা ভদ্রতা করে মাঝিদের একবার সাধল, দ্বিতীয়বার আর সাধার সুযোগ না দিয়ে তারা মুড়ি, চিড়া, নাড়ু-সব মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন করে দিলো। তাদের মধ্যে আর যাই থাক, খাবারের ডাক উপেক্ষা করার মতো অভদ্রতা নেই। তারাও বোধহয় দুপুরে কিছু খায়নি। গরিব মাঝিদের জন্য মায়ের খুব মায়া হলো, তার পুঁটলি থেকে দুটো পাকা কলা বের হয়ে এলো, চোখের পলকে কলাগুলোও নাই হয়ে গেল। মায়ের দ্বিধাগ্রস্ত হাত পুঁটলির আশেপাশে ঘুরছে, এই দুইজন মাঝিকে পেটপুরে খাওয়ানোর প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য এই মুহূর্তে তার ছিল না। খাদ্যভাণ্ডারে কিছু খাবার হয়তো অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোতে স্বামী-পুত্রের রাতের ক্ষুধাটা কোনোমতে মেটানো যাবে।
সূর্য যখন যাই যাই করছে তখন বড় নদী থেকে আমরা একটা শাখানদীতে ঢুকলাম। এটাই বোধহয় সেই নদী-বৈশাখ মাসে যেটাতে হাঁটুজলের বেশি পানি থাকে না। নদীর দুই পার গাছপালা, গ্রামসমেত আরো কাছে এগিয়ে আসলো। দিনের শেষ আলোয় গ্রামের উঠানে বসে নারীরা একজন আরেকজনের চুল বাছছে। নদীর ঘাটে হাত-পা ঘষে মাঠের কাদা পরিষ্কার করছে কৃষক। হাঁস-মুরগি বাড়ির পথ ধরেছে কোনো শাসন ছাড়াই, অবাধ্য বালকদের বাড়িতে ফেরানোর জন্য লাঠি হাতে ঘুরছে মায়েরা। এত কাছ থেকে আর কখনো গ্রাম দেখিনি আমি, রূপকথার গল্প ছবি হয়ে একটার পর একটা আমার সামনে হাজির হচ্ছে। কোথা থেকে যেন আজানের শব্দ ভেসে আসলো, খালি গলার আজান, কোনো এক বৃদ্ধ ভাঙা গলায় জানালো সন্ধ্যা হয়ে গেছে, নামাজ পড়তে আসো। সন্ধ্যার ছায়া ছায়া অন্ধকারে এমন মায়াবি আহ্বান অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দিলো চারপাশে। শহরের মাইকের আজানে এই মায়াটা নেই, শুনলে মনে হয় ধমক দিচ্ছে।
কিছুদূর যেতেই সন্ধ্যাটা যখন আরো ঘনিয়ে আসলো, শাঁখের শব্দ শুনলাম, সাঁঝের বাতি জ্বলে উঠল তুলসিতলায়। ঘরে ঘরে কুপি-হারিকেনগুলো জেগে উঠছে। নদী কিছু জায়গায় এতই সংকীর্ণ যে, দুই পারের গাছপালা, বাঁশঝাড় বাতাসে নিজেদের মধ্যে ছোঁয়াছুঁয়ি করে। এখানে সন্ধ্যাটা আরো জমাট হয়ে একেবারে অন্ধকার হয়ে আছে, সেইসব গাছে বসে রাতের পাখিরা কিছুক্ষণ পর পর নিজেদের ভাষায় হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, কে যায়! সে ডাক শুনে গা ছমছম করে উঠল আমার।
রাতের আঁধার আরো একটু গাঢ় হতেই নদীর পারের গ্রামগুলো ঝিমিয়ে গেল, বাবা মাঝিদের জিজ্ঞাসা করল, “আর কতক্ষণ লাগবে?” যে মাঝিটা বৈঠা বাইছিল, সে বলল, “এইতো আইছি হবায় চাঁপাপুর, হেরপর কৈলাশডাঙ্গা, হেরপরেই হইলো গিয়া মইমগঞ্জো। আন্ধাইর দেইখা ডরাইয়েন না, একটু পরেই চান্দ উডবো, দেখবেন দিনের লাহান সব ফকফইক্যা হইয়া গেছে।” আলাপ করার পথ পেয়ে মাঝিটা আবার বলা শুরু করল, “মইমগঞ্জো তো বিরাট গেরাম, পাড়ার অভাব নাই, গোলাপাড়া, ব্যাপারিপাড়া, মাস্টারপাড়া, সর্দারপাড়া। একটা পাড়াই মনে করেন, একটা গেরামের হমান। আম্লেরা কোন পাড়াত যাইবেন?” বাবা বলল, “জমিদারবাড়ি যাব আমরা।”
মাঝির বৈঠা হঠাৎ থেমে গেল। অন্ধকারে তাদের মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও, তারা যে ভীষণ চমকে গেছে বোঝা গেল। নৌকাটা কিছুদূর সোজা গিয়ে স্বাধীনতা পেয়ে নিজের ইচ্ছামতো একটা পারের দিকে ঘুরে যেতে লাগল। তখন মাঝি একজন আবার পানিতে বৈঠা ফেলে নৌকার মুখ সোজা করল। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে বলল, “জমিদারবাড়ি যাইবেন কীয়ের লাইগা? কেউ থাহে না।” বাবা বলল, “আমরা থাকতে এসেছি।” একটা বিস্ময়সূচক ধ্বনি মাঝির মুখ দিয়ে বের হলো, তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইল সে। সামনে যে মাঝিটা বসেছিল, সে বিড়বিড় করতে থাকল, “আগে জানলে জীবনেও আইতাম না অইলে, জিগাই লওয়া ভালা।” প্রধান মাঝির ওপর তার ক্ষোভ। সে কেন বিস্তারিত না জেনে চলে এসেছে। মার চোখে-মুখে অস্বস্তি। বাবার শার্টের কোনা চেপে ধরল মা। বাবা মাঝিকে জিজ্ঞাসা করল, “কেন কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?”
“স্যার, নাও ঘুরাই। ফিরা যানগিয়া। জিরাইয়া জিরাইয়া টানলেও ফজরের সময় পলাশপুর ঘাটে নামাইতে পারুম।” বাবা বিরক্ত হয়ে বলল, “নৌকা ঘুরানো লাগবে না। সমস্যাটা কী তা তো বলবেন।” “না গেলে হয় না, স্যার?” মাঝি আঁকুতি জানালো। “না, হয় না।” প্রধান মাঝি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর জিজ্ঞাসা করল, “আম্নে কি এই জায়গা কিনছেন?” বাবা বলল, “না, আমার চাচার জায়গা।” “আম্নে কি রমিজ শেখের পোলা।” “হ্যাঁ। কী হয়েছে বলুন তো?” “না, কী আর অইবো।” বলেই মাঝি আবার বৈঠায় মন দিলো, কিন্তু নৌকার গতিতে আগের মতো আর ছন্দ রইল না। মাঝি দুজন বিরসমুখে বৈঠা বাইছে, লগি ঠেলছে, নিজেদের মধ্যে কোনো কথা বলছে না। শুধু কমবয়সি মাঝিটা মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছে।
একটু পরেই আকাশের পুব কোণে চাঁদ তার ঘুমভাঙা চোখ নিয়ে হাজির হলো। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থীর চাঁদ, তাই কিছুটা অঙ্গহানি হয়েছে। মনে হচ্ছে একপাশে কে যেন চেটে খেয়ে গেছে। ঘোলা চোখে নিজের উপস্থিতিটাই শুধু জানালো চাঁদটা, অন্ধকার তাড়ানোর মতো কোনো স্পৃহা তার মধ্যে দেখা গেল না। কিন্তু একটু পরেই সে মাঝআকাশে উঠে এই চরাচরে তার তীক্ষ্ণদৃষ্টি ফেলল, চাঁদের তীব্র কটাক্ষে অন্ধকার তার চাদর গুটিয়ে ফসলের মাঠ, গ্রাম, গ্রামের ঘরবাড়ি, ঘরের উঠান-সবকিছুকে উলঙ্গ করে দিয়ে ঘন বন আর ঝোপঝাড়ে গিয়ে লুকালো। দুধের মতো জ্যোৎস্নাতেও আমাদের নৌকার ভেতরে অস্বস্তি কমলো না। নৌকার তলায় নদীটাই একটু কল-কল করছে, আর কারো মুখে কোনো কথা নেই। মাঝে মাঝে কচুরিপানার দল বাধা দিয়ে নৌকার গতিরোধ করছে। লগি দিয়ে ঠেলে তাদের প্রতিরোধ দমন করে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকাটা। নৌকার তালে অথবা সারাদিনের ক্লান্তিতে মা ঘুমিয়ে পড়েছে, আমিও মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। বাইরের দৃশ্য দুলে দুলে উঠছে। এত ধকলের পর নদীর এই মমতার দুলুনিকে উপেক্ষা করতে পারলাম না, ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।
একটি কোমল ধাক্কায় আমার ঘুম ভেঙে গেল। নৌকা পারে ভিড়েছে, মাঝিরা মালপত্র নামানোর জন্য ব্যস্ত। বাবা আমার হাত ধরে নরম মাটিতে নামিয়ে দিলো। মা আগেই নেমে পড়েছে। সামনে তাকিয়ে দেখি গাছের ঘন সারি তাদের বিশাল দেহ নিয়ে এলোমেলো দাঁড়িয়ে আছে, গাছপালার মাথার ওপর একটা দোতলা বাড়ির চূড়া দেখা যাচ্ছে। গাছপালার মধ্য দিয়ে একটা সংকীর্ণ রাস্তা কোনোমতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এই পথে বহুদিন কোনো মানুষের পা পড়েনি বোঝা যায়। মালপত্র সব মাটিতে নামিয়ে রাখল মাঝিরা। “এইডাই জমিদারবাড়ি। আমগো ট্যাহাডা দ্যান, যাইগা,” গোমড়া মুখে বলল সর্দার মাঝি। “এতসব জিনিসপত্র আমরা কীভাবে নিয়ে যাব? বাড়ি পর্যন্ত একটু রেখে দিয়ে যান। আপনাদের কিছু টাকা বাড়িয়ে দিবো নাহয়,” বাবা অনুরোধের সুরে বলল।
বয়স্ক মাঝিটা বলল, “স্যারগো, এদ্দুর আইছি, এইডাই বেশি। ট্যাহা কয়ডা কম দ্যান, কিন্তু ভিত্রে যাইতে কইয়েন না।” কমবয়সি মাঝিটা আবার বিড়বিড় করে উঠল, “বাঁইচ্যা থাকলে, ট্যাহা-পইসা আরো কামান যাইবো।” বাবা জিজ্ঞাসা করল, “কেন ভয় পাচ্ছেন আপনারা? সাপ-খোপ আছে এই রাস্তায়? নাকি অন্য কোনো জন্তু-জানোয়ার?” বয়স্ক মাঝিটা হেসে বলল, “সাপেরে ডরাই না, স্যার। আমরা গেরামের মানুষ, দিনে দুই-তিনডা সাপ পিডাইয়া মারি। সাপ আমগো ডরে থাহে। আর কী কমু আম্নেগো?” মা এতক্ষণ সব শুনছিল, বলল, “এই নিশুতি রাতে এইখানে আমাদের ফেলে চলে যাবেন? এত নিষ্ঠুর-” ভয়ে, অসহায়ত্বে মায়ের কন্ঠ বুজে আসছিল।
বয়স্ক মাঝিটা নরম সুরে বলল, “আম্মাগো, আম্নে আমগো এক বেলা হইলেও খাওয়াইছেন। অন্য যা ইচ্ছা কন, শুনমু। কিন্তু এই বাড়ির সীমানাত ঢুকতে পারমু না গো, আম্মা। আমগোও বউ-পোলাপান আছে, নাইলে-” বাবা অস্থির কন্ঠে বলল, “আপনারা সমস্যাটা বলছেন না কেন?” কমবয়সি মাঝিটা এবার স্পষ্ট করে বলল, “স্যার, মাফ কইরেন, হেই হিস্টোরি অহন এই নিশুতি রাইতে মুখে আনতে পারুম না। আস্নেগো লাইগা আমরা দুরুদ পইড়া দোয়া করুম।” মা কাতরকণ্ঠে বলল, “আমরাও আপনাদের জন্য দোয়া করব, কিচ্ছু হবে না।” মাঝি বলল, “আম্মাগো দোয়া-দুরুদ গরিবগো কামে লাগে না। আমার মায় সারাদিন দোয়া পড়ে ভালা খাওনের লাইগা, রাইতে খালি পেটে ঘুমাইতে যায়।”
অনুরোধ, উপরোধ, লোভ-কোনোকিছুতেই মাঝিদের রাজি করানো গেল না। সেই গভীর রাতে, এমন ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল বাগানের মুখে, অজানা এক আতঙ্কের সামনে আমাদের ফেলে রেখে তারা চলে গেল। বাড়ির চূড়াটা গাছপালার ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখছে আমাদের।
