এগারো
আমার বনে-জঙ্গলে ইখলাক হোসেনের বিচরণ বাড়তে থাকল। এইপারের ওষুধে ঐপারের শিশুদের কৃমিনাশ হচ্ছে, বুড়োদের বাতের ব্যথা কমছে, দুর্দমনীয় কাশি বশ হচ্ছে, পেটের অসুখ নিরাময় হচ্ছে। ইখলাক হোসেন মাঝে মাঝে কিছু উপঢৌকন নিয়ে আসে আমার জন্য। মুড়ির মোয়া, নারকেলের নাড়ু, বিভিন্ন ধরনের পিঠা। এসবেই তার চিকিৎসার মূল্য পরিশোধ হয়, আমিও ভাগ পাই এই উপহারের। ইখলাকের মাধ্যমে গ্রামের বধূর রান্নাঘর, গৃহিণীর যত্ন, কর্তার কৃতজ্ঞতা আমার ঘরে এসে ঢোকে।
ইখলাক হোসেন তার হাসিমুখ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন এসে হাজির হয় আমার আঙিনায়। যেদিন কোনো গাছের প্রয়োজন হয় না, সেদিন আসে বই নিতে। ঢাকা থেকে বই আনানোর খরচ তার বেঁচে গেছে। মাঝে মাঝে এমনি আসে, বউয়ের গল্প করতে। নতুন চিঠিতে তার বউ কী বলেছে, কোনদিন তার জন্য কী অদ্ভুত কাণ্ড করেছে, বউ তার কেমন আশ্চর্য মেয়ে ইত্যাদি সব গল্প বলে যায়।
নারীদের ব্যাপারে আমার জ্ঞান বইপত্রে আর নিজের মায়ের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ, তবুও ইখলাকের কাছে তার বউ যেমন আশ্চর্যময়ী, আমার তেমন লাগে না। মনে হয় বিরহে সব মেয়েই কাতর হয়, এবং বিরহ ঘোচানোর জন্য অদ্ভুত কাণ্ড করে থাকে, ভালোবাসার মানুষের জন্য সব মেয়েই প্রাণ উজাড় করে দেয়, সব মেয়েই প্রিয় মানুষকে তার গোপনতম কথাটা বলার জন্য উতলা হয়ে থাকে, আর সব মেয়েদের চোখেই থাকে সদাপ্রস্তুত অশ্রু।
ইখলাক হোসেনের স্মরণশক্তির অভাবে অথবা উচ্ছ্বাসের প্রাচুর্যে তার বউ সম্পর্কিত কিছু গল্প আমাকে একাধিকবার শুনতে হয়েছিল। আমি তার পুনঃপ্রচারের ভুল না ধরিয়ে নীরবে শুনতাম, কোনোসময় বিরক্তি প্রকাশ করিনি। আমি শ্রোতা, আমার কাজ শুনে যাওয়া, এক গল্প কতবার বলা যাবে সেটা বক্তার মর্জি। আজ ইখলাক হোসেন আবার তার বিয়ের গল্পের শুরু করল।
“বুঝলেন, হাসান ভাই, আমার বিয়া হইছে খুবই অদ্ভুত পরিবেশে।” এই হচ্ছে তার গল্পের ভূমিকা। সে তারপর একনাগাড়ে তার বিয়ের গল্প বলে যায়। বিয়ের আগের দিন এমন বৃষ্টি হলো যে পথঘাট সব কাদা হয়ে গেছে। দুই মাইল কাদাপথ মাড়িয়ে তারা যখন মেয়ের বাড়িতে পৌঁছালো তখন মসজিদে আসরের আজান হচ্ছে। তার বড় মামা খুব খাদ্যরসিক মানুষ, বিয়ের খাবার খাওয়ার জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে বাস, লঞ্চ, ট্রলারে চড়ে জামালপুর থেকে এসেছেন। এখন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারতে যে সময় লাগবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। আগে খাবার দিয়ে দেওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকলেন মামা। জামাইয়ের মামা যেহেতু, কনেপক্ষের কাছে তাঁর কথা বেদবাক্য।
প্যান্ডেলের নিচে ডেকোরেটারের চেয়ার-টেবিল পাতা, ভেতরে বহিরাগত মানুষ আর বহিরাগত বাতাস—কোনোটার ঢোকার সুযোগ নেই। মামা খেতে বসে বাটির পর বাটি গরুর মাংস খেতে লাগলেন, এই জিনিসটার জন্যই গত দুই দিন পরিশ্রম করার পর একটু আগে দুই মাইল কাদাপথ হেঁটে এসেছেন তিনি। খেতে খেতে মামা এত ঘামতে লাগলেন যেন এইমাত্র পুকুরে ডুব দিয়ে আসলেন, বউকে তালপাতার পাখা ধরিয়ে দিয়ে তিনি খেতে লাগলেন। কিন্তু যত খাচ্ছেন ততই ঘামছেন। একসময় বউকে জোরে বাতাস করার পরামর্শ দিয়ে বুক চেপে শুয়ে পড়লেন মামা।
ডাক্তার ডাকার আগেই সবাই টের পেল, মামা আর নেই। মৃত্যুর আগেও টেবিলের ওপর সেই সুখাদ্য বাটির দিকেই তাঁর চোখ ছিল। হাসি-তামাশা, হই-হুল্লোড় এক মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল। শ্যালক-শ্যালিকারা নতুন জামাইকে জব্দ করার জন্য যেসব ফন্দি এঁটেছিল—সব মাঠে মারা গেল, জুতা চুরি করার উৎসাহ পর্যন্ত কারো রইল না। বিয়েবাড়ির সমস্ত রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আনন্দময় বিয়েবাড়ি মামার রসনাবিলাসের আঘাতে বিষাদময় মরা বাড়িতে পরিণত হয়ে গেল।
হা-হুতাশ কান্নাকাটির মধ্যে কনেপক্ষের লোকজন বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারা কী করবে বুঝতে পারছে না, হবু আত্মীয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করবে নাকি আগে আত্মীয়তাটা পাকাপোক্ত করে নিবে ঠিক করতে পারছিল না। এরমধ্যে ইখলাক হোসেনের এক খালু রব উঠালেন যে এমন অপয়া বাড়িতে ছেলের বিয়ে করানো ঠিক হবে না। বিয়ের দিন যেহেতু মামা গেলেন, বিয়ের পরে অন্যান্য আত্মীয়রা যে খুব নিরাপদে থাকবে তার নিশ্চয়তা কী! বিশেষ করে মামার পরে খালুর সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ইখলাকের আত্মীয়াদের মধ্যে ‘অপয়া’ শব্দটা মুহূর্তেই সংক্রামিত হয়ে গেল। বিয়ে ভেঙে যায় যায় অবস্থা। কনেপক্ষ অপরাধীর মতো হাতজোড় করে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যন্ত।
এরমধ্যে সবাইকে স্তম্ভিত করে ইখলাক ঘোষণা দিলো, সে বিয়ে না করে যাবে না। সবাই বলল, বাইরে তোমার মামার লাশ পড়ে আছে। ইখলাক বলল, আগে বিয়ে হোক, তারপর লাশের জানাজা হবে। ইখলাকের আত্মীয়-স্বজন তাকে নিষ্ঠুর, বেহায়া, বেয়াদব ইত্যাদি বলে তিরস্কার করল, কিন্তু কোনো ফল হলো না। রুষ্ট, শোকাগ্রস্ত আত্মীয়দের উপস্থিতিতে বিলাপ আর দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে তার বিয়ে হয়ে গেল। যে রাতে তার বাসর হলো, সেই রাতে ইখলাকের নববধূ তার পায়ের কাছে পড়ে রইল, কান্নার ঢেউ তার শরীরটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল বারাবার। ইখলাক জিজ্ঞাসা করল, “কান্দো কেন?”
বউ বলল, “আপনের মতো ভালামানুষ আমি দুনিয়াতে আর দেখি নাই। আমার কপাল কী ভালা!”
গল্পের এই অংশ বলার সময় প্রতিবারই ইখলাক হোসেনের গলা বুজে আসে, চোখ ছলছল করে। এটি তার গল্পের উপসংহার। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে, “আমারও কপাল ভালা, মরিয়মের মতো বউ পাইছি।” এই প্রথম ইখলাক হোসেনের মুখে তার বউয়ের নাম শুনলাম। সে আরো বলল, “আপনার কথা বলছি মরিয়মরে, তার কাছে অনুমতি চাইছিলাম, আপনাকে তার একটা ফটো দেখাবো। সে অনুমতি দিছে।”
এই বলে সে তার পকেট থেকে একটা ছোট চারকোনা ফটোগ্রাফ বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলো। একটা নিরীহ সাদাকালো ছবি। একটা কিশোরী মেয়ে ভীত চোখে তাকিয়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি কেঁদে দিবে। ইখলাক বলল, “ক্লাস নাইনে তোলা ছবি। রেজিস্ট্রেশন করার জন্য তুলছিল, পরে অবশ্য মেট্রিক পরীক্ষা আর দেওয়া হয় নাই। এইটা ছাড়া তার আর কোনো ছবি নাই। এইবার চিন্তা করছি স্টুডিয়োতে গিয়া দুইজনে একটা ফটো তুলব। কবে যে ছুটি পাবো!”
এই বিরহকাতর প্রেমিকযুগলের জন্য আমার মন মায়ায় ভরে ওঠে। আমার ক্ষমতা থাকলে চারটা ডাল-ভাতের জন্য মরিয়ম আর ইখলাকদের কখনো আলাদা হতে দিতাম না। তাদের জন্য একটা অভয়ারণ্য তৈরি করে দিতাম, যেখানে তারা হাসবে, খুনসুটি করবে, মিষ্টি-মধুর ঝগড়া করবে, পৃথিবীর কোনো দুঃখ-অভাব তাদের স্পর্শ করবে না, প্রতিবেশীদের উপহাস এবং আত্মীয়স্বজনদের ভর্ৎসনা তাদের নাগাল পাবে না, কোনো সভাপতি ছুটি না দিয়ে তাদের বিরহ বৃদ্ধি করতে পারবে না।
ইখলাক হোসেনকে প্রায়ই আমার ছোট ধানক্ষেতের পাশে নিয়ে যাই। সাধারণ ধানক্ষেত দেখে সে বিশেষ উদ্বেলিত হয় না। কিন্তু গুচ্ছ গুচ্ছ ধানের গাছগুলোকে দেখলে আমি মনে প্রগাঢ় মমতা অনুভব করি। কৃষকদের মাঠে ধানগাছগুলো ইতোমধ্যে ফসলের ভারে নুয়ে পড়েছে, আমার নিষ্ফলা গাছগুলো এখনো হাসিখেলায় ব্যস্ত, ধান ফলানোয় তারা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। তাদের গায়ের রং যদিও একটু ফিকে, মাঠের অন্যান্য গাছগুলোর মতো তারা যথেষ্ট সবল না, তবুও আমি তাদের ভালোবাসি, ফসল দিতে দেরি করায় কখনো স্নেহ-পরিচর্যায় অবহেলা করিনি।
একদিন দুপুরবেলা অসময়ে ইখলাক হোসেন এসে উপস্থিত হলো। আমি তখন ক্ষেতে আগাছা তুলছি, ইখলাক হোসেন আমাকে ডাকতে ডাকতে প্রায় ছুটে আসলো ক্ষেতের পাশে। বলল, “হাসান ভাই, আপনার হাতে কি মাটি? হাত ধুয়ে আসেন। একটা কাজ আছে।” তার গলায় রহস্য, তার বুকে তীব্র একটা সংবাদ আটকে রেখেছে, চোখ-মুখ ফুঁড়ে সে-খবরটা বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছে, ভালো নাকি খারাপ খবর তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। তবে তার কথার ভঙ্গিতে আমি তড়িঘড়ি করে ক্ষেত থেকে উঠে আসলাম। বললাম, “কী হয়েছে, ইখলাক ভাই? কোনো সমস্যা?”
ইখলাক বলল, “আগে হাত ধুয়ে আসেন, তারপর বলবো।” পুকুরপারে গিয়ে হাত ধুয়ে ঘাটে বসলাম। ইখলাক কাগজের ঠোঙা থেকে একটা বাতাসা বের করে আমার হাতে দিলো, বলল, “খান আগে।”
বাতাসা মুখে দিয়েও আমার বিভ্রান্তি ঘুচল না। সে হাসিমুখে আমার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো। চিঠিতে কাঁচা হাতে শুধু দুইটা লাইন লেখা। প্রথমে একটা প্রশ্ন, স্টুডিয়োতে দুইজনের ছবি তুলতে যে খরচ, তিনজন তুলতেও কি একই খরচ? তারপর একেবারে নিচে লেখা, অপরাধ দুইজনে করেছি, শরম আমি একা কেন পাবো, তাড়াতাড়ি বাড়ি আসেন।
সংসারজীবনের অনেক নিয়মনীতির সাথে তখনো আমার পরিচয় ঘটেনি। একটা নিরীহ প্রশ্ন আর একটা আহ্বানে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, আমি তখনো বুঝতে পারিনি। বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। ইখলাক হোসেন বাতাসার পুরো ঠোঙা আমার হাতে দিয়ে প্রচণ্ড শব্দে হো-হো করে হেসে উঠল, হাসতে হাসতেই চিৎকার করে বলল, “আপনে বোকা, হাসান ভাই, আপনে খুব বোকা।”
একটু থেমে ইখলাক হোসেন আবার বলতে শুরু করল, “আপনি এখন এই সবগুলো বাতাসা খাবেন, এটাই আপনার শান্তি। জঙ্গলে থাইকা থাইকা আপনার বুদ্ধিসুদ্ধি জন্তু-জানোয়ারের মতো হইয়া গেছে। আপনি বুঝতে পারছেন না পারলেন না? আমি বাবা হবো, একটা ছোট্ট আবু হইবো আমার আর মরিয়মের। আজকে মসজিদে মিলাদ হইবো, হুজুর আজকে সবাইকে বাতাসা খাওয়াইবো।
জোহরের ওয়াক্ত এসে হাজির হওয়ায় ইখলাক হোসেন চলে গেল। কিন্তু তার প্রচণ্ড হাসি আমার নিরানন্দ বাড়ির বাতাসে আনন্দের যে ঢেউ তুলেছিল তা এখনো মিলিয়ে যায়নি। আমি পুকুরপারে বসে বাতাসা চুষতে থাকলাম।
তারপর থেকে ইখলাক হোসেনকে যতবার দেখেছি, তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা লক্ষ করেছি। ছুটি চাওয়াতে একবারে চলে গিয়ে মসজিদটাকে নিষ্কৃতি দেওয়ার পরামর্শ পেয়েছিল সে। এদিকে চিঠির আকুল আবেদনের বিপরীতে মিথ্যা আশ্বাস দিতে ইখলাক হোসেনের মন আর সায় দিত না। বহুদূরে শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূল পরিবেশে বাস করা বন্ধুহীন একাকী এক নারীর লজ্জার ভাগ নেওয়ার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে থাকে সবসময়, কিন্তু উপায় কোনোক্রমেই খুঁজে পায় না। সর্বক্ষণ নিজের মধ্যে ছটফট করতে থাকে।
ইখলাক হোসেনের এই বাড়িতে যাতায়াত গ্রামের মানুষ খুব সরলভাবে নিলো না। তারা হুজুরকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে মুহুর্মুহু সাবধান করতে লাগল, বিগত বিপদের সমস্ত ইতিহাস তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলল না। এই বাড়ির ভেষজে যাদের রোগের উপশম হচ্ছে, তারা অবশ্য ‘হুজুর’কে মৃদু সমর্থন জোগালো। তাদের ভাষ্যমতে ‘হুজুর’ তার সুন্নতি পোশাক এবং এলেমের গুণে সেখানে বিনা ক্লেশে যাতায়াত করতেই পারেন, এরকম ‘আল্লাওয়ালা’ মানুষের ঐ সাধারণ মেয়েভূত কতটুকু বা বিপত্তিই ঘটাতে পারবে! ইখলাক হোসেন এইসব পরামর্শ আর বিতর্কের মুখে শুধু একটা মুচকি হাসি দিয়ে পার পেয়ে যেত।
জ্যৈষ্ঠ মাস দুয়ারে এসে দাঁড়ানোর আগেই আমি পুরোপুরি অর্থশূন্য হয়ে গেলাম। চাল ফুরিয়ে গেছে তাতে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে না, কিন্তু তেলের অভাবে হারিকেনটা মুখ গোমড়া করে পড়ে আছে, সন্ধ্যার পরই অন্ধকার সমস্ত বাড়িতে কালি লেপে দিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর পাটি পেতে উঠানে শুয়ে থাকি, অন্ধকার এসে গিলে ফেলে আমায়। আকাশে তারা থাকলে সময় কোনোমতে কেটে যায়, কিন্তু মাঝে মাঝে মেঘ এসে আমার এই সুখটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেয়। এখনো এক বাক্স দিয়েশলাই আছে আমার কাছে, এটা শেষ হয়ে গেলে চুলায় আগুন জ্বালানোর কোনো উপায় থাকবে না।
ইখলাক হোসেন প্রতিদিন নিয়ম করে তার সমস্ত আক্ষেপগুলো নিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসত। পুরো দুপুর আক্ষেপগুলো ঢেলে দিয়েও মনে ভার একবিন্দু কমাতে পারত না সে। কয়েকদিন মরিয়মের চিঠি না পেলে দুশ্চিন্তায় বিমর্ষ হয়ে থাকত, আবার চিঠি পেলেও বিপর্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াত। চিঠিতে বিস্তর অভিযোগ এবং প্রার্থনা থাকত।
বাগানের আম-কাঁঠালের মিষ্টতাও ইখলাক হোসেনের অনুজ্জ্বল মুখে উজ্জ্বলতা ফিরাতে পারল না। কিন্তু এত এত ফলের অপচয় সে মেনে নিতে পারছিল না। তার অনুগত কয়েকজন ‘বেপারি’কে সে রাজি করিয়েছে এই ফল দূরের বাজারে নিয়ে বিক্রিযোগ্য করতে। দূরত্বের কারণে এইসব ফলের দোষ কাটা যাবে, এমনটাই বুঝিয়েছিল সে। কমদামে ফল পেয়ে এবং অভিশাপের একটা নির্ভরযোগ্য সমাধান পেয়ে তারা নদীর পার থেকে আম-কাঁঠাল সংগ্রহ করতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু কোনোমতেই বাড়ির সীমানায় ঢোকার সাহস তারা করল না।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষদিকে আমার পাতে সাদা ভাত ফিরে এলো, হারিকেন অভিমান ভুলে আবার উৎফুল্ল হয়ে হাসছে। অন্ধকার তার কালো দেহটা নিয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে রইল। ইখলাক হোসেনের একটা মিথ্যায় আমার সমস্ত অভাব দূর হয়ে গেল। সে বলে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মিথ্যা বললে কোনো অন্যায় হয় না।
আমার ধানগাছগুলো এখন পরিপূর্ণ যুবতি, কিন্তু পুরো ক্ষেতে ফুল-ফলের কোনো আভাস নেই। আইবুড়ো মেয়েদের মতো গাছগুলো আমার বুকে বোঝা হয়ে রইল, তাতে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার স্নেহ একবিন্দু কমলো না। রোদ এসে পৃথিবী থেকে শৈশবের কোমলতা ছিনিয়ে নেওয়ার আগেই আমি ক্ষেতে চলে যাই।
সেদিন ভোরে আমার হৃদয়কে প্রচণ্ড নাড়া দিলো একটা ক্ষুদ্র ধানের শীষ। আমি গাছটাকে আলতো আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলাম, আমার ইচ্ছা করছিল সবাইকে ধরে এনে এই শীষটুকু দেখাই, আমার মেয়েরা যে বাঁজা নয় তা জনে জনে প্রচার করতে মন চাচ্ছিল, আনন্দের এই স্রোত বের হওয়ার কোনো পথ না পেয়ে বুকের মধ্যেই আটকে রইল। বাজারে গিয়ে বাতাসা কিনে বিলাতে পারলে বোধহয় আমার শান্তি হতো। ইখলাক হোসেন কখন আসবে? তাকে এই অভূতপূর্ব দৃশ্যটা দেখাতে না পারা পর্যন্ত কোনো কাজ করতে পারব না আমি।
ইখলাক হোসেন শীষের মাথাটুকু দেখে কোনোমতে দায়সারাভাবে বলল, “মাশাল্লা।” আমার উচ্ছ্বাস তাকে ছুঁতে পারল না, সে জানালো, তাদের বাড়িতে দুই কানি জমিতে ধান চাষ হয়, সে নিজেও ক্ষেতে প্রচুর কাজ করেছে। ধানের শীষ তার জন্য আশ্চর্য কিছু না। কিন্তু আমার ফসলবতী কন্যাদের দিকে চেয়ে বারবার অভিভূত হতে থাকলাম। মনে হলো এই মুগ্ধতা আর কোনোদিন শেষ হবে না।
আমার মুরগির ছানাগুলো খাঁচার নিরাপদ প্রহরায় ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে। তাদের ফ্যাকাশে পালকে রং ধরা শুরু হয়েছে। খাঁচার মতো অপ্রাকৃতিক একটা নিয়মে বন্দি থাকাটা এখন তারা মেনে নিতে পারছে না, সারাদিন ডেকে ডেকে প্রতিবাদ জানায়। বাইরে উন্মুক্ত প্রান্তরে স্বাধীন ঘুরে বেড়ানোর জন্য তাদের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। কিন্তু তারা জানে না বাইরের অরণ্যে স্বাধীনতার সাথে কত বিপদও বসে আছে। বনবিড়ালটা প্রায়ই বনের ভেতরে হেঁটে যাওয়ার সময় মুরগির ডাক শুনে থমকে দাঁড়ায়, লোভ সচেতন হয়ে ওঠে তার, কান খাড়া করে সম্ভাব্য শিকারের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে, বনের সীমানা পেরিয়ে ঘরে ঢোকার সাহস তার এখনো হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কোনোদিন হয়তো শিকারের এমন উদাত্ত আহ্বান হয়তো সে আর উপেক্ষা করতে পারবে না। তাই মুরগিগুলোকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য একটা খোঁয়াড় তৈরি করতে লাগলাম, আর আপাতত খাঁচাটাকে আরো মজবুত করে বাঁধলাম, আত্মরক্ষার উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত তাদের মুক্তি দিলাম না।
আমার ধানের ছড়া সুস্বাস্থ্যের সমস্ত লক্ষণ বজায় রেখে ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন নিয়ম করে তাদের সাথে দেখা করি, ছুঁয়ে দেই, পিতার অপেক্ষা নিয়ে ধানক্ষেতের আলে বসে থাকি—কবে যে বড় হবে, কবে যে পাকবে। কিন্তু একবার ধান পেকে গেলে এই গাছগুলোকে গোড়া থেকে আমি নিজ হাতে কাটব, তাদের সাথে আমার আর দেখা হবে না কখনো, এই ভাবনাটা আমাকে পীড়া দেয়। জানি কৃষকদের কাছে ফসলটাই মুখ্য, কিন্তু আমার মনে একজন চাষার পাশাপাশি একজন পিতাও বাস করে। ইখলাক হোসেন বলে, নতুন কৃষকদের এমনই হয়। দ্বিতীয়বার মায়া কমবে, তৃতীয়বারে আমিও ওই কালো পিঠ মানুষগুলোর মতো দয়ামায়াহীন প্রকৃত কৃষক হয়ে উঠতে পারব।
কিন্তু প্রকৃতির সে তর সইছিল না, মমতার অপরাধে প্রথমবারেই আমার ভয়ানক শাস্তি হয়ে গেল। সেদিন আকাশ সারাদিন মেঘের বারুদ সঞ্চয় করল, বর্ষণ শুরু হবে হবে করেও সন্ধ্যা পর্যন্ত একটু ভীতি তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই করল না। সন্ধ্যা হতেই আমি নিশ্চিন্ত হলাম, যেন সন্ধ্যাতে মেঘেরাও বাড়ি ফিরে যাবে ঘুমানোর জন্য।
সন্ধ্যাকে আরো গাঢ় করে মেঘগুলো কালো হতে শুরু করল, আকাশের এ-মাথা ও-মাথা পুরোটা মেঘেরা দখল করে তীব্র দৃষ্টিতে অন্ধকার নিরীহ পৃথিবীটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করে ভয়ানক গর্জন করতে করতে দুরন্ত বাতাস ধুলো উড়িয়ে, পথের মধ্যে যত গাছপালা আছে সবগুলোকে মাড়িয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসলো আমার বাড়ির সীমানায়, তড়িৎ ঘরে ঢুকে সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলাম। আমার দরজা-জানালা ভয়ে কেঁপে উঠল, বাইরে বাতাস এই ইট-পাথরের বাড়িতে ঢুকতে না পেরে গাছপালাগুলোর ওপর আক্রোশ মেটাতে লাগল। শুনতে পেলাম মটমট শব্দে বিশাল বিশাল গাছ ডালপালা আর পাতাসমেত বাতাসের সাথে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে।
বাতাসটা বেশ কিছুক্ষণ পাগলামি করার পর একটু শান্ত হলো, কিন্তু প্রকৃতির তখনো আশ মেটেনি। আকাশ থেকে ফটফট শব্দে শিলাবর্ষণ শুরু হলো, অজস্র শিলা পৃথিবীটাকে ক্ষত-বিক্ষত করতে লাগল। পৃথিবীবাসী, উদ্ভিদ আর প্রাণীকূল অপরাধী বালকের মতো এই শাসন নীরবে সইতে লাগল। শিলাবর্ষণ শেষ হলে বৃষ্টিবর্ষণ শুরু হলো। ঝমঝম শব্দে আকাশ তার সব রাগ একসাথে ঢেলে দিলো। সারারাত ধরে বৃষ্টি হওয়ার পর প্রকৃতির মনে হলো এবারের মতো যথেষ্ট হয়েছে। সকালে আকাশের মিষ্টি হাসি দেখে মনেই হলো না গতরাতে সে এমন ক্ষেপে গিয়েছিল।
সারারাত আমার সবুজ আর অবুঝ সন্তানগুলোর চিন্তায় ঘুমাতে পারিনি। সকালে সুযোগ পেয়েই নিচে নামলাম। বাতাস রান্নাঘরের নড়বড়ে জানালাটা কোন ফাঁকে খুলে ফেলেছিল টের পাইনি। এই খোলা জানালার অল্প একটু ফাঁক দিয়ে ঝড় যতটুকু সম্ভব তাণ্ডব চালিয়ে গেছে। মেঝেতে ছোট ছোট ডালপালা, বিভিন্ন ধরনের পাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বৃষ্টির পানিতে মেঝেটা ভেসে গেছে, আহত হাঁড়িপাতিলগুলো আমার দিকে সাহায্যের আশায় তাকিয়ে আছে। মাটির কলসটা পেট ফেটে মরে গেছে, তার খণ্ডাংশ ঘরের বিশৃঙ্খলা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। রান্নাঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে মুরগির পরাজিত ভাঙা খাঁচা। মেঝেতে আমার ছানাগুলোর মোলায়েম পালক পানিতে ভিজে চুপসে আছে। ঘরময় নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন পুরো ঘটনাটা আমার চোখের সামনে তুলে ধরল। খোলা জানালা দিয়ে ঝড়বৃষ্টির সাথে হয়তো বনবিড়ালটাও ঢুকে পড়েছিল, কয়েক জায়গায় তার পায়ের ছাপ আর গায়ের লোম রেখে গেছে পশুটা। এখানে আশ্রয়ের সাথে সাথে সাশ্রয়ী খাদ্যও জুটে গেল। একা নির্জীব খাঁচাটা লোভী জন্তুটার সাথে পেরে ওঠেনি। ছানাগুলোর আর্তচিৎকার আমার মনে বাজতে থাকল।
বাইরে আমার প্রতাপশালী বনটা মার খাওয়া চোরের মতো অর্ধচেতন হয়ে এলোমেলো চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কৃষ্ণচূড়াগাছটা কাত হয়ে পড়ে গিয়ে উত্তর দিকের আকাশটাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। পুরো জঙ্গলটাকে কেমন অসহায়, অপরিচিত লাগছে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ডালপাতায় আমার চলার পথটা ঢেকে গেছে। কয়েকটা পালকহীন পাখির ছানা খড়কুটোর আশ্রয় থেকে বিচ্যুত হয়ে মাটিতে এসে পড়েছে, চোখ খুলে মাকে দেখার বয়স তার এখনো হয়নি, নরম চামড়ার ওপর পালকের আভাস দেখা যায় কেবল, এই বয়সেই পৃথিবীর কঠিন স্পর্শে প্রাণ গেছে তার। মা পাখিরা ডিম-ছানা খুইয়ে ডালে ডালে আহাজারি করছে। বুকে ভয় আর আশঙ্কা নিয়ে ছুটে গেলাম পুকুরপারের আমার ছোট সবুজ জমিতে।
ধানের ক্ষেতের আলে বসে দেখলাম কাদামাটিতে লেপ্টে আছে আমার সন্তানের শব। মনে হলো চেঙ্গিস খানের সৈন্যরা একটা পুরো জনপদকে হত্যা করে লাশগুলো এলোমেলো ফেলে রেখে গেছে। দূরে ফসলের মাঠ অধিকাংশই ফাঁকা, কৃষকেরা কয়েকদিন আগেই তাদের পাকা ধান কেটে নিয়ে গেছে। যাদের রয়ে গেছে, তারাও আমার মতো দুর্ভাগা না। গাছ মরেছে তো কী হয়েছে, ধান তো পেকেছে। তারা এখন লাশের গা থেকে গয়না খুলে নিচ্ছে।
