ডাকনাম ভুলে গেছি – ১৯

উনিশ

গঞ্জের অচল মণিহারি দোকানের সামনে নতুন করে ব্যানার ঝোলানো হয়েছে, তিন টাকা প্রতি মিনিট। ছোট দোকানের মুখে কাঠের টেবিলের ওপর একটা খাতা নিয়ে বসে আছে দোকানি, পেছনে ধুলোপড়া শেলফে অবহেলায় পড়ে আছে কয়েকটি প্রসাধনী সাবান, নারকেল তেলের কৌটা, দাঁতের মাজন আর কয়েকটা চিকন দাঁতের চিরুনি। দোকানের দুইপাশে দুই যুবকের কানে মোবাইল ফোন, মুখে প্রেমিকের হাসি, কিশোরীর মতো ভঙ্গিমায় তারা দুলে দুলে কথা বলছে। ফোনগুলো সুতা দিয়ে দোকানদারের টেবিলের সাথে বাঁধা আছে, যাতে ফোন নিয়ে কেউ বেশি দূরে যেতে না পারে। প্রেমিকদ্বয় খুঁটিতে বাঁধা ছাগলের মতো দোকানের পাশে ঘুরঘুর করে প্রেম করছে, ঘাস খেতে তারা বেশিদূর যেতে পারছে না। সাদা-লাল সুতাগুলো সর্বোচ্চ আড়ালের চাহিদায় টান-টান হয়ে আছে। আমাকে টেবিলের সামনে দেখে দোকানি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, জিজ্ঞাসা করল, “কী লাগবো?”

আমারও যে ফোনে কথা বলার মতো কোনো লোক থাকতে পারে, সেটা তার বিশ্বাস হচ্ছে না। সে ভাবছে আমি অন্য কোনোকিছু কিনতে এসেছি। কাগজের ভাঁজ খুলে তাকে দেখালাম, “এই নম্বরে কথা বলবো।”

গ্রামের মানুষের শৈশব সহজে ফুরায় না, শিশুবয়সের কৌতূহল তারা আজীবন বয়ে নিয়ে বেড়ায়, মধ্যবয়স্ক লোকটার মধ্যে শিষ্টাচারের কোনো বালাই নেই, নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করল, “কেডা?”

আমি তার কৌতূহলকে অবহেলা করে নির্লিপ্তভাবে বললাম, “নম্বরটাতে কানেক্ট করে দিন।”

কৌতূহল না মেটায় সে একটু ক্ষুদ্ধ হলো, বলল, “ফোন বিজি আছে, কতা শেষ হউক।”

দোকানদার আমার প্রতি আর বিশেষ আগ্রহ না দেখিয়ে কান পাতল যুবকদের আলাপে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, আমার কানেও প্রেমবাণী বর্ষিত হতে লাগল। এক যুবক চুমুর আবেদন করছে, একটা চুমু আদায় করতে চার মিনিটে তার বারো টাকা খরচ হয়ে গেল। অবশেষে বিজয়ীর বেশে সে ফোন ফেরত দিয়ে গেল। দোকানদার আমার কাগজ মেলে মোবাইল ফোনে নম্বর টিপে নিজেই কানে ধরল।

“রিং হইতাছে, লম্বর ঠিক আছে।” ফোনটা আমার হাতে না দিয়ে হালনাগাদ তথ্য দিতে লাগল দোকানদার। আমি ভাবলাম এটাই বোধহয় রীতি।

হঠাৎ দোকানদারের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “ধরছে ধরছে।” আমাকে জানালো সে। “হ্যালো, নেন কথা বলেন।” এবার আমার দিকে ফোনটা বাড়িয়ে ধরল লোকটা, তার কণ্ঠ অস্বাভাবিক নিচু, মুখে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি।

ফোনটা কানে ধরতেই ঐপাশ থেকে রেডিয়োর মতো বেজে উঠল, কেউ বারবার জিজ্ঞাসা করছে, “হ্যালো কে, কে বলছেন?”

আমি স্তম্ভিত হয়ে শুনছি, মনে হচ্ছে মাথার ভেতর ঢুকে কেউ কথা বলছে, সহসা কোনো জবাব দিতে পারলাম না। দোকানদার আমাকে উৎসাহ দিলো, “আরে কতা কন, ম্যাডাম ফোন ধরছে।”

কীভাবে কথা শুরু করব ভেবে পেলাম না, কয়েকবার ‘হ্যালো’ বললাম।

ঐপাশ থেকে বলছে, “হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি। কে আপনি? বারবার হ্যালো হ্যালো করতাছেন কেন?”

“আমার নাম, আমার নাম-” সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আমি আমার নাম ভুলে যাই।

ঐপাশ থেকে তাড়া দিলো, “নিজের নাম জানেন না? ফাইজালামি করার জন্য ফোন করছেন? আমার নাম্বার পাইছেন কই?”

নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “নাম বললেও আপনি চিনবেন না, হীরা আপনার নম্বর দিয়েছে আমাকে।”

“কোন হীরা?” ফোনের মধ্যেও বিরক্তি টের পেলাম।

“হীরা, আপনার মেয়ে।”

ঐপ্রান্তে নীরবতা, শ্বাসের অস্ফুট শব্দ শুনতে পেলাম। “আমার মেয়ে কই আছে? ভালো আছে সে?” কাতরকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল মহিলা।

“ভালো আছে সে, আমার বাড়িতে আছে।”

“সত্যি কইরা কন, সে বাঁইচ্যা আছে? কিডন্যাপাররা প্রথমেই ভিক্টিমরে মাইরা ফালায়, তারপরে টাকা চায়।” মহিলার কণ্ঠে প্রচুর আশা এবং প্রচণ্ড অবিশ্বাস মিশে আছে।

“আমি তো আপনার কাছে টাকা চাইনি, আপনার মেয়েকে কিডন্যাপও করিনি।”

“আমি কীভাবে বুঝবো সে বাঁইচ্যা আছে? ওর কাছে ফোন দেন, আমি কথা বলি।”

“দেখুন, সে আমার বাড়িতে আছে, দোকানদারের ফোন টেবিলের সাথে বাঁধা আছে, অতদূরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আপনাকে ঠিকানা বলে দিচ্ছি, আপনি নিজেই এসে দেখে যান।”

ঠিকানাটা লিখে নেওয়ার পর মঞ্জুবালা বলল, “আমার কিন্তু পুলিশের বড় অফিসারের সাথে ভালো পরিচয় আছে, আমি লোকজন নিয়া আসবো। আইসা যদি দেখি কোনো উল্টাপাল্টা করছেন, তাইলে আপনার খবর আছে, বাকি জীবনে আর শান্তিতে ঘুমাইতে পারবেন না।”

মঞ্জুবালার হুমকিতেও একধরনের অসহায়ত্ব ছিল। আমি বিরক্ত হলাম না, বরং সন্তানবিরহী এক মায়ের জন্য মায়া হলো আমার।

পরদিন সকাল থেকেই বারান্দায় অবস্থান নিলো হীরা, চোখ পেতে রাখল বাগানের সরু পথটার ওপর। আমার সবুজ কারাগারের একমাত্র কয়েদি আজ মুক্তি পাবে। তার উদগ্রীব অপেক্ষা দেখে কেন যেন মনখারাপ হয়ে গেল আমার! কিন্তু মাত্র দুই মিনিট সাঁইত্রিশ সেকেন্ডের একটা দূরালাপ কাউকে এতদূরে টেনে আনবে তা আমার বিশ্বাস হলো না। মঞ্জুবালাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য গঞ্জের সুতা বাঁধা ফোনে আরো কয়েকবার কান পাততে হবে আমাকে। তাকে আরো অনেকগুলো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে যে তার মেয়ে সত্যিই এখানে আছে।

দুপুরের পর গঞ্জে গেলাম কেরোসিন কেনার জন্য, যাওয়ার পথে নদীর ঘাটের শূন্যতা দেখে মনে মনে স্বস্তি বোধ করলাম। বাজারে গিয়ে টেম্পুস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পলাশপুরের যাত্রী দেখলাম অনেকক্ষণ, এই উচ্চশব্দের যান্ত্রিক জানোয়ারগুলো শহর থেকে পণ্য এনেছে, কুটুম্ব এনেছে, সুস্থ রোগী এনেছে, অসুস্থ সংস্কৃতি এনেছে, কিন্তু কোনো বেবিটেক্সি শহুরে মঞ্জুবালাকে আনেনি। আজ বোধহয় আর আসবে না, মনটা প্রফুল্ল হয়ে গেল। কিন্তু হীরার বিমর্ষ মুখটা কল্পনা করে প্রফুল্লতা বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। লোকজনের মুখে শুনলাম, বর্ষার পর পলাশপুরের রাস্তা অনেকটা ভেঙে গেছে, যাদের নিজের কোমরের প্রতি মায়া আছে, তারা নৌকায় চড়েছে।

কেরোসিন কিনে আমি বাড়ির পথ ধরলাম, এক ঠোঙা বরইয়ের আচার কিনে নিলাম, এইটুকুতে হীরা মায়ের অভাব ভুলে যাবে সেই ভরসা করতে পারলাম না।

ফেরার সময় নদীর বাঁকটা পার হতেই আমার সমস্ত আশা উত্তাল নদীর নরম পারের মতো ভেঙে পড়ল। একটা রাবণের মতো নৌকা তার কালো মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে আমার ঘাটে, হীরাকে হরণ করতে এসেছে সে। নৌকার দুইপাশে দুজন মাঝি উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জমিদারবাড়ির চূড়াটার দিকে। নৌকার পেটে ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে, ক্লান্ত ইঞ্জিন ধূমপান শেষে বিশ্রাম নিচ্ছে। মাঝিদের পাশ কাটিয়ে আমি হাঁটতে লাগলাম, আমাকে দেখেও মাঝিরা কিছু বলল না।

বাগানের মুখে দেখি একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে, তার পুরো শরীরে বয়স লুকানোর প্রাণান্ত চেষ্টা জ্বলজ্বল করছে। তার শাড়ির চকমকি পাথরে আলো পিছলে যাচ্ছে, মাথার চুলে রং ছিল একসময়, বহুদিনের অবহেলায় এখন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, গোড়ায় চুলের আসল রূপালি রং বেরিয়ে গেছে। রওনা দেওয়ার আগে হয়তো অভ্যাসবশত ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়েছিল মহিলাটি, এখন তার অধিকাংশ মুছে গেছে। মুখের ব্যর্থ পাউডার সব গলার কাছে এসে জমা হয়েছে, তার চোখে কালো সানগ্লাসটা কেবল তার বয়স লুকাতে কিছুটা সফল হয়েছে।

ঘন বাগানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে আছে মহিলা। তার শরীরে দ্বিধা ফুটে উঠেছে, নিজের শাড়ির আঁচলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। আমাকে দেখে মুহূর্তেই তার মুখে আলো জ্বলে উঠল।

“এই যে শোনো, এইখানে কেউ থাকে? বাড়িতে ঢোকার পথ কোনটা?” শহর থেকে যারা গ্রামে আসে, তাদের মধ্যে এই অভ্যাসটা আছে। তারা যাকে তাকে যে-কোনো সময় ‘তুমি’ সম্বোধন করতে পারে।

“আপনি আমার সাথে আসুন,” সামনে এগিয়ে বললাম তাকে। মহিলা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আমাকে অনুসরণ করতে লাগল। “তোমার বাড়ি কই?” পিঠে প্রশ্ন এসে আঘাত করল।

আমি সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললাম, “আপনার তো অনেক লোকজন নিয়ে আসার কথা ছিল।”

মঞ্জুবালার ধাক্কা খাওয়া কণ্ঠ শুনতে পেলাম। “ও তুমিই সেই লোক, ফোনে শুইনা তো আরো বুইড়া কেউ মনে হইছিল।”

একটু থেমে আবার বলল, “লোকজন আছে, একটা ফোন দিলেই চইলা আসবো সব, এইখানে নেটওয়ার্ক আছে?”

আমরা আঙিনায় এসে দাঁড়াতেই জমিদারবাড়িটা তার বিশাল, কারুকার্যময় প্রাচীন দেহটা নিয়ে মঞ্জুবালার সামনে হাজির হলো। মঞ্জুবালা বন, বাগান পেরিয়ে হঠাৎ এমন একটা বাড়ির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চমকে গেল। তার বিস্মিত চেহারাটাকে কালো সানগ্লাসটাও পুরোপুরি ঢেকে রাখতে পারল না। বাড়ির প্রতিটা জানালায় চোখ বুলিয়ে বলল, “মিস পিয়া কোথায়? ডেকে দাও তাকে।”

মনে হলো কোনো মুঘল সম্রাজ্ঞী আদেশ দিলো। আমি ধারণা করে নিলাম, ‘মিস পিয়া’ হীরার টেলিভিশনের নাম। হীরা সারাদিন বারান্দাতেই বসে ছিল, কোনো একসময় হয়তো হতাশ হয়ে ভেতরে চলে গেছে। আমাকে কষ্ট করে আদেশ পালন করতে হয়নি। হীরা তার মায়ের কন্ঠ শুনে নিজেই বের হয়ে এসেছে, তার অগ্রবর্তী পেট দেখে মঞ্জুবালা হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সাধের ‘মিস পিয়া’র এমন ভীষণ অবস্থা দেখে মুঘল সম্রাজ্ঞী বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল। মা-মেয়ের মধুর পুনর্মিলনে একটা স্ফীত পেট বাধা হয়ে দাঁড়ালো।

কোনো কুশল বিনিময় না, আবেগের আলিঙ্গন না, সুখের কান্নাও না, মঞ্জুবালা মেয়েকে দেখে প্রথম যে কথাটা বলল সেটা হলো, “মাগো, এখনো সময় আছে, পেটের মধ্যে মাইরা ফেললে কোনো শাস্তি হয় না।” এমন বিষাক্ত অভিবাদনের পরও মা-মেয়ের মিলন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলো, আলিঙ্গনও হলো, চোখের জলও ঝরল।

এইসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর বারান্দায় পেতে রাখা মোড়ায় বসলো তারা। মঞ্জুবালা মেয়েকে দেখে নিশ্চিত হয়েছে মেয়ে তার অপহৃত হয়নি। মেয়েকে সম্পূর্ণ অবস্থায় ফিরে পাবে এমন আশা বোধহয় তার ছিল না, কিন্তু এখন সম্পূর্ণের চেয়েও অতিরিক্ত পেয়ে আরো বেশি হতাশ হয়ে গেছে। মেয়ের পেটে যে রাক্ষস বড় হচ্ছে, সেটা পেটে বসে শুধু মেয়ের রক্ত খাচ্ছে না, তার স্বপ্নটাকেও গিলে খাচ্ছে।

মেয়ের হাত ধরে বলল, “পেটের ঝামেলা পেটে শেষ কইরা দিলে কেউ টের পাইবো না, কয় মাস হইছে? আইচ্ছা, যত মাসই হউক, ব্যবস্থা আছে, আমার পরিচিত হাসপাতাল আছে।” তারপর কী যেন চিন্তা করে মাথা নাড়িয়ে বলল, “না, না, হাসপাতালে যাওন যাইবো না, বজ্জাত সাংবাদিকগুলা টের পাইলে-না, না, যা করার ঘরেই করতে হইবো।”

হীরা তার মায়ের হাত চেপে ধরে বলল, “পাগলামি কোরো না, মা। আমার পেটে যে বড় হচ্ছে, তাকে আমি বাঁচিয়ে রাখিনি, সে-ই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সে না থাকলে হয়তো কবেই এই যন্ত্রণা শেষ করে দিতাম।”

“এই বাচ্চা তোরে তিলে তিলে মারবো, মাইরা ফেল জারজটারে।”

হীরা আহত কণ্ঠে বলল, “তুমি কি পেরেছিলে আমাকে মারতে?”

মঞ্জুবালা চোখের সানগ্লাসটা খুলে ফেলেছে, হতাশ কণ্ঠে বলল, “মাইরা ফেললেই ভালো হইতো।”

“তাহলে মারোনি কেন?”

“ভুল করছি, মায়ায় পইড়া গেছিলাম।”

“আমারও মায়া আছে।”

মঞ্জুবালা সানগ্লাসটা খুলে ফেলতেই আমি তার বেদনার ভারে ঝুলে পড়া চোখ দুটো দেখলাম। ‘মায়া’র বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি সে সরবরাহ করতে পারল না।

“মায়া হইতাছে মাইয়াগো সবচেয়ে বড় পাপ, পুরুষগো মায়া কম, দুনিয়াডা তাই তারা দখল করতে পারছে, উদাস কণ্ঠে বলল মঞ্জুবালা। তারপর তার গলায় ঝাঁঝ ফিরে এলো, “কিন্তু পাপ তো তুমি একলা করো নাই, এম্নে এস্নেই তো আর পেট হয় নাই, তুমি তো বিবি মরিয়ম না, তোমার সর্বনাশটা করছে কে?”

“সব বলব, মা, কিন্তু চলো এখন রওনা দেই, ঢাকায় পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে।” তাড়া দিলো হীরা।

“পাগল নাকি! এই অবস্থায় তোমায় ঢাকায় নিয়া গেলে শুধু ম্যাগাজিনওয়ালাদের লাভ হইবো, পত্রিকায় চুগলি কইরা সাংবাদিকরা বড়লোক হইবো। তোমার বড় পেটের ছবি ছাপা হইবো ম্যাগাজিনের প্রথম পাতায়, ক্যারেক্টার আর ক্যারিয়ার ঐখানেই শেষ। আর যে বাচ্চাটা জন্ম নিবো তার হইবো জীবন শেষ, সারাজীবন কলঙ্ক নিয়া বড় হইবো।”

“ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করি না আর, কিন্তু আমার বাচ্চাকে নিয়ে মানুষ উপহাস করলে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে আমি সইতে পারব না।” অসহায়কন্ঠে জানালো হীরা।

“বাচ্চার কলঙ্ক সব মুইছা দিতে পারবো তার বাপে, কী নাম তার?”

“শাকের মাহমুদ, তুমি চেনো হয়তো।” নামটা বলার সময় একটা অস্বস্তির ছায়া পড়ল হীরার মুখে। কিন্তু তার মায়ের মুখ কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

“রাজনীতি করে, সেই শাকের মাহমুদ?”

“হ্যাঁ।”

“তুই এইখানে, এই অবস্থায় আছস, সে জানে?” “না।”

“তাইলে আর কী! তারে জানাইতে হইবো। শাকের এইখান থেইকা তোরে নিয়ে যাবে, সাংবাদিক ডাইকা বইলা দিবে গোপনে বিয়ে হয়েছিল আগে, আর কোনো সমস্যাই নাই।” মঞ্জুবালার মধ্যে উচ্ছ্বাসের সঞ্চার হলো।

“কিন্তু সে তো ইন্ডিয়ায়, পালিয়ে আছে।” হীরা জানালো।

“কে বলছে? ঢাকা শহর সে পোস্টার দিয়া ঢাইকা ফেলছে, ইলেকশন করব সামনে, সকাল-বিকাল দলবল নিয়া মিছিল করে। মামলা হওয়ার পর সে নিজেই বর্ডার পার করার গুজব রটাইছে। এখন হাওয়া বদলাইয়া গ্যাছে, পুলিশ সাথে নিয়া ঘুরে সে।”

হীরার মুখে কে যেন কালি ঢেলে দিলো। সে বজ্রাহতের মতো চুপ করে বসে রইল। তার মা শাকেরের সম্পদ, ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির বিবরণ দিচ্ছিল, কিন্তু মনে হয় না সেসব কিছু হীরার কানে ঢুকছে। হবু জামাইয়ের ক্ষমতার জ্বালানিতে নিজের স্বপ্নের দ্বীপটাকে নিভু নিভু জ্বলতে দেখল মঞ্জুবালা। শাকের মাহমুদের যে প্রভাব আছে, তাতে ‘মিস পিয়া’ আরো কয়েকটা সন্তান প্রসব করলেও তার নায়িকা হওয়া আটকে থাকবে না। দিব্যদৃষ্টিতে হয়তো মঞ্জুবালা তার মেয়েকে নায়িকার চেয়ারে বসে অহংকার করতে দেখতে লাগল, তারপর তার দৃষ্টি হঠাৎ এসে আমার ওপর পড়ল, আর মুহূর্তেই তার মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।

আমার কাছে এসে বলল, “এদিকে দাঁড়াইয়া মাইয়া মাইনষের কথা শুনতেছো কেন? যাও নৌকা বিদায় কইরা আসো, আইজকা যাওয়া হইবো না।” তার ভ্যানেটি ব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে আমার হাতে দিলো মঞ্জুবালা।

বারান্দায় হীরার দেহটা এখনো মোড়ার ওপর বসে আছে, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে বহুদূরে অন্য কোথাও বিচরণ করছে সে। টাকাটা হাতে নিয়ে আমি যখন বের হয়ে যাচ্ছিলাম তখন আবার মঞ্জুবালার ডাক শুনতে পেলাম, “এই শোনো, তোমাদের এইখানে কি বেনসন সিগ্রেট পাওয়া যায়?”

“তা তো জানি না।”

“জানো না কেন? বিড়ি খাও না?”

“জি না।”

“হ, তোমরা কেমন সাধু জানা আছে আমার। শোনো, বাকি টাকা দিয়া সিগ্রেট নিয়া আসবা, বেনসন না পাইলে গোল্লিপ।”

গঞ্জে গিয়ে দোকানদারকে অবাক করে দিয়ে সিগারেট কিনে আনলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, মঞ্জুবালা বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে আছে, হীরা একপাশে বসে হারিকেনে আগুন দিচ্ছে। আমাকে দেখেই মঞ্জুবালা উঠে আসলো, “আনছো?”

আমি প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিতেই মঞ্জুবালা একটা সিগারেট বের করে হীরাকে বলল, “আগুনটা দে তো, মা। অনেকক্ষণ ধইরা টক উঠছে।”

হীরা মনোযোগ সহকারে হারিকেনে তেল ভরছে। তেল ঢালতে ঢালতেই বলল, “মা, তুমি আমার সামনে সিগারেট খাবে না।”

“আইচ্ছা যা, খাইলাম না।” প্যাকেটে সিগারেটটা ভরে রাখল মঞ্জুবালা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এইটা কেমন বাড়ি, এই কারেন্টের যুগেও হারিকেন জ্বলে! মালিক কই থাকে? ঢাকায়, নাকি বিদেশে? গেরামে আসে না মনে হয়।”

হীরা হারিকেনে আগুন দিয়ে সলতেটাকে ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “হাসান সাহেব, আপনি কিছু মনে করবেন না, আমার মা শহর থেকে আসার সময় ভদ্রতাটুকু ফেলে এসেছেন।”

মঞ্জুবালা নির্বাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল, তার মেয়ে যে এত কঠিন কথা বলতে পারে, তার ধারণাতেও ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে আমার নামের সাথে ‘সাহেব’ উপাধি শুনে। আমি তাকে স্বাচ্ছন্দ্যে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম। আমার পিঠে আছড়ে পড়ল মঞ্জুবালার দ্বিধান্বিত উচ্চারণ “সাহেব!”

দিনের বেলা জমিদারবাড়িটাকে মনে হতো ধ্যানরত বৃদ্ধ, আর সন্ধ্যায় আফিমখোর বুড়োর মতো ঝিমাত বাড়িটা। অন্ধকারের কালো চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিস্তব্ধতার মধ্যে ঘুমাত রাতে। এই বাড়ির নোনাধরা দেয়ালকে কোলাহলের আঘাত সইতে হয়নি নিকট অতীতে। কিন্তু আজ মঞ্জুবালা বাড়িটাকে নিজের শব্দাঘাতে জাগিয়ে রেখেছে। তার কথা ফুরাচ্ছে না, এতদিন যত কথা জমা হয়েছে, আজ সব একসাথে ঢেলে দিচ্ছে। হীরার প্রত্যেকটা দিনের হিসাব আদায় করে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে হীরার মৃদুকণ্ঠ শোনা যায় দেয়াল ভেদ করে, কিন্তু বোঝা যায় না, ধ্বনি দেয়াল পার করতে পারলেও, শব্দের অর্থ ইট-সিমেন্টে হারিয়ে যায়। কিন্তু মঞ্জুবালার প্রতিটা শব্দ বাড়ির দেয়াল ভেদ করে বন-জঙ্গল পর্যন্ত বিকরিত হচ্ছে। তার হাসি, কান্না, ধমকে আফিমখোর বাড়িটা চমকে কেঁপে উঠছে। বাড়ির কার্নিশে বাস করা চড়ুই পাখিটা পালিয়ে গেল, আমিও জেগে রইলাম।

ভোরের পাখির প্রথম ডাকেই বিছানা ছেড়ে উঠলাম, পৃথিবী এখন ঠান্ডা, নীরব, শান্তিময়। জগতের সব অবিচার, অভিযোগ, বিবাদ, বিভেদ, সংগ্রাম এখন ঘুমিয়ে আছে। একটু পরে পাখিদের সাথে খাবার খুঁজতে বের হবে মানুষের দল, নীরব পৃথিবী আবার কোলাহলে ভরে যাবে, শান্ত পৃথিবীতে শুরু হবে যুদ্ধ।

পুকুরপারে গিয়ে দেখি হীরা বসে আছে, তার চোখের নিচে নির্ঘুম রাতের ইতিহাস লেখা।

“আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম,” শান্ত নদীর মতো ধীর লয়ে বলল হীরা।

“কখন এলে এখানে?”

“শেষরাতে।”

“শেষরাত থেকে আমার জন্য অপেক্ষা করছো?”

“না, নিজের সাথে বোঝাপড়া করছিলাম।” সামনে তাকিয়ে বলল, “আমি এখানে শীতকাল দেখিনি, তখন কেমন দেখায় গাছগুলোকে? অনেক কুয়াশা হয়?” পুকুরপারের গাছগুলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল হীরা, যেমন ছেলেকে স্কুলে ঢুকিয়ে গেইটের দিকে তাকিয়ে থাকে মা।

“চলে এসো কোনো এক শীতে, স্বামী-সন্তানের সাথে।” হাসল হীরা, পাশ ঘুরে আমার দিকে সরাসরি তাকালো এবার। “হাসান সাহেব, আপনি আমার জন্য এতকিছু করেছেন যে আপনার কাছে নতুন কিছু চাইতে খুব অস্বস্তি লাগছে, কিন্তু আমি নিরুপায়, একটা শেষ অনুরোধ আপনাকে করতে চাই।”

আমি এমনভাবে তাকালাম যেন আমার তীব্র আগ্রহটা চোখে ভেসে না ওঠে। “কী অনুরোধ, বলো?”

এতক্ষণ খেয়াল করিনি, হীরার বাম হাতে একটা হাতে বানানো সাদা খাম। খামের মুখটা ভাতের আঠা দিয়ে বন্ধ করা আছে। “সারারাত অনেক ভেবে এই চিঠিটা লিখেছি আমি।” সাদা খামটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল হীরা। আমি হাতে নিয়ে দেখলাম চিঠির ওপরে বড় অক্ষরে লেখা ‘শাকের মাহমুদ’, নিচে অক্ষর, নম্বর আর কমা দিয়ে লেখা একটা ঠিকানা, সবচেয়ে নিচের দুই অক্ষরের শব্দটা কেবল আমার পরিচিত, ‘ঢাকা’।

“আমি চাই এই চিঠিটা আপনি নিজ হাতে পৌঁছে দিবেন, আর এই ঘড়িটা নিয়ে যান, সে দেখলে বুঝতে পারবে চিঠিটা আমিই পাঠিয়েছি।” হীরা আমার হাতে সেই ঘড়িটা তুলে দিলো।

“কিন্তু আমি ঢাকার কিছুই চিনি না, বড় হওয়ার পর কোনোদিন মহিমগঞ্জের বাইরে যাইনি।”

“আমি জানি আপনার জন্য এটা কত কঠিন কাজ, কিন্তু আপনার যাওয়াটা খুবই ইম্পর্ট্যান্ট। আপনার সামনেই যাতে সে চিঠিটা পড়ে, শুধু এতটুকু নিশ্চিত করবেন, তারপর আপনার দায়িত্ব শেষ।”

“কিন্তু আমি চলে গেলে তোমাদের কী হবে এখানে?”

“আমার মা ঢাকা শহরের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা মানুষ, মা যেমনই হোক, সাথে থাকলে আমি আর কোনোকিছুর চিন্তা করি না, আপনি নিশ্চিন্তে যেতে পারবেন।”

ঢাকা মানেই আমার কাছে আরমানিটোলার মেহগনিগাছের নিচে একতলা একটা বাড়ি, লেবুগাছে হাঁড়িচাচার লেজ, রান্নাঘরের সামনে বাঁশের কঞ্চিতে হেলান দিয়ে থাকা বেগুনগাছ, বাবার সাদা পাঞ্জাবি, মায়ের ব্যথাকাতর মুখ, গেইটের বাইরে যমদূতের মতো বেবিটেক্সির গর্জন। আমার ‘ঢাকা’ চারপাশে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, এর বাইরে ঢাকার যে অস্তিত্ব তা শুধু বইপত্রেই পড়েছি। যেই নির্জনতার সাথে ছিল আমার শান্তিপূর্ণ বসবাস, সেই নির্জনতাকে যে খুন করেছে, যে আমাকে একাকিত্বের অসুখ দিয়েছে, যার কাছ থেকে আমি পেয়েছি স্বপ্নের ছোঁয়াচে রোগ, যে বলে এই বন্দিত্বে সে দৃষ্টি পেয়েছে, তার মুক্তির পরোয়ানা নিয়ে আমি যাব অন্ধের শহরে, যেখানে কেউ কাউকে দেখে না, সবাই অদৃশ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *