এক
যত রাত হলে ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষের গায়ে কাঁথা ওঠে, গলির দখল নেয় শহুরে কুকুর, যাত্রী না পেয়ে ফিরে যায় শেষ বাস, কান পাতলে শোনা যায় নগরের দীর্ঘশ্বাস, তত রাতে আমি এসে দাঁড়ালাম খিলক্ষেত থানার সামনে। যে দুটি বাল্ব থানার সাইনবোর্ডে আলো ফেলেছে, তাদের ঘিরে উন্মাদের মতো নাচছে কিছু আত্মঘাতী পতঙ্গ। লাল গেইটে ধাক্কা দিতেই মৃদু প্রতিবাদ করে সরে গেল একপাশে। সারাদিন মানুষকে চোখ রাঙিয়ে ভেতরে বসে আরাম করছে একটা নীল গাড়ি। একটা সিঁড়ি আমায় দেখিয়ে দিলো থানার প্রবেশমুখ।
খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে একটা ফাঁকা করিডোরে এসে দাঁড়ালাম, এখানে দেয়ালে একটা গোল দেয়ালঘড়ি ঝুলছে। কোনো একদিন সাতটা দশে মারা গেছে ঘড়িটা। এই পর্যন্ত কোনো উর্দির সাক্ষাৎ পেলাম না, এত রাতে বোধহয় পুলিশও জেগে থাকতে পারে না। করিডোর পার হতেই দেখলাম কয়েকটা কাচের বন্ধ দরজা ভেতরে অন্ধকার আগলে ঘুমাচ্ছে। বামে একটা খোলা দরজা দিয়ে সাদা আলো বেরিয়ে জটিল জ্যামিতি তৈরি করেছে বারান্দায়।
ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি ফাঁকা চেয়ার-টেবিল তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ঘরের একপাশের দেয়ালে ঝুলছে দুই হাজার আট সালের অক্টোবর মাস। ক্যালেন্ডারের পাশে একটা সচল ঘড়িতে তিনটা পাঁচ বাজছে। অন্যপাশের দেয়াল বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার ঝুলিয়ে জনসাধারণকে পুলিশের বন্ধুবাৎসল্য নিয়ে আশ্বস্ত করছে। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা একটা বিদঘুটে পাখা এত ধীরে ঘুরছে যে সব কয়টা পাখা গোনা যায়, ঘরের নীরবতা দূর করার দায়িত্ব পাখাটা একাই নিয়েছে, খ্যাপাটে বুড়োর মতো পাখাটা ঘ্যান-ঘ্যান করছে।
ঘরে ভালো করে চোখ বুলিয়ে আবিষ্কার করলাম এই ঘরে আমি একা নই, একটা টেবিলে মোটা রেজিস্টার খাতা আর ফাইলপত্রের পেছনে ঢিলেঢালা পোশাকের মধ্যে ঝিমাচ্ছে একজন ছোটখাটো পুলিশ। কাঁচাপাকা চুল এবং মোটামুটি স্বাস্থ্যবান গোঁফও লোকটার চেহারা থেকে বালক ভাবটা দূর করতে পারেনি। মনে হচ্ছে কোনো এক স্কুলবালক বড় চাচার ইউনিফর্ম পরে চুলে চকের গুঁড়া মেখে, নকল গোঁফ লাগিয়ে যেমন খুশি তেমন সেজেছে। তার নিচের ঠোঁটটা এত মোটা যে ওপরের ঠোঁটের সঙ্গ ত্যাগ করে থুতনি ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। ফাঁক পেয়ে মুখের পানের রস গড়িয়ে ইউনিফর্মে তাদের মুক্তির ইতিহাস লিখে যাচ্ছে।
আমার গলা খাঁকারিতে গোঁফটা জেগে উঠল প্রথমে, তারপর নিচের ঠোঁটটাকে স্বস্থানে ফিরিয়ে এনে লোকটা পানের পিক পালানোর পথ আটকালো। পুরো মুখ জেগে ওঠার পর চোখ খুলল সে। চোখ খুলে আমাকে দেখে, কয়েকবার চোখ টিপে দৃষ্টি পরিষ্কার করে নিলো। পরিষ্কার দৃষ্টিতেও যখন আমার অস্তিত্ব বহাল রইল, তখন সে তাকালো ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা তাকে জানিয়ে দিলো এটা ‘অসময়’। এবার আমার দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে হাতের আঙুলগুলো বিশেষ মুদ্রায় ঘুরিয়ে চোখ নাচালো। শরীরী ভাষায় আমি বিশেষ পারদর্শী না, তার আঙুলের ভাষা না বুঝে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর সে পানের রস মুখের ভেতরে রাখার প্রচেষ্টায় ঠোঁট উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী ব্যাপার?” লোকটার কণ্ঠেরও বালক বয়স পার হয়নি। এই লোক ধমক দিলে অপরাধীদের মুখ দিয়ে ফিক করে হাসি বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
“আমি সারেন্ডার করতে এসেছি।” গম্ভীর মুখে জানালাম।
লোকটা চোখ কুঁচকে তাকালো আমার দিকে। আমার পায়ে কোনো জুতা নেই, ঢোলা প্যান্ট আর বড় কলারের শার্টের ওপর একটা গেরুয়া চাদর জড়ানো আছে। ধুলোমাখা খালি পা দেখে তার চোখে এক ধরনের তাচ্ছিল্য লক্ষ করলাম।
“মামলা আছে?” পান চাবাতে চাবাতে জিজ্ঞাসা করল লোকটা।
“এখনো হয়নি,” জানালাম আমি।
লোকটার চোখে সন্দেহ, কপাল ভাঁজ করে দেখতে লাগল আমায়। শেষরাতে কে আসে সারেন্ডার করতে? তাও আবার মামলা ছাড়া। একটা মামলার অভাবে পুলিশের কাছে আমার মর্যাদা কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলো। তাছাড়া আমার পোশাকেও স্বাভাবিকতার লক্ষণ নেই, বিশেষ করে জুতাহীন একটা মানুষকে কেউ সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।
“পাগল-ছাগল ডিস্টার্ব করলে হাজতে বন্ধ কইরা রাখতে কইছে বড় স্যারে,” আমাকে ভয় দেখানোর জন্য বলল লোকটা। এই থানায় পাগলরা বোধহয় প্রায়ই উৎপাত করে।
“আর কেউ আছে থানায়?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
লোকটা কিছুটা তটস্থ হয়ে উঠল, বলল, “থাকবো না ক্যান, পুরা ফোর্স আছে থানায়। কেউ ঘুমায় নাই, আছে সবাই আশেপাশে।”
“আপনার বড় স্যারের সাথে কথা বলা যাবে?”
লোকটা সোজা হয়ে বসলো, কোনো পাগল এসে বোধহয় বড় স্যারদের সাথে দেখা করতে চায় না। সোজা হতেই তার পোশাকের ভাঁজ থেকে নেমপ্লেটটা বের হয়ে আসলো, তার নাম ইব্রাহিম। ইব্রাহিম পান চাবানো বন্ধ করে কৌতূহলী হয়ে উঠল, “কী করছেন আপনে?”
“বড় স্যারকেই বলব,” জানালাম আমি।
“হে হে, বড় স্যার কি আপনার জন্য বইসা রইছে?” বড় স্যারের মতো দুর্লভ জিনিস অসময়ে প্রত্যাশা করায় আমাকে তিরস্কার করল ইব্রাহিম।
“কখন আসবে আপনাদের বড় স্যার?”
“আগে আমারে বলবেন সবকিছু, পরেই না বড় স্যার।” ইব্রাহিমের দুর্বল শরীরটার ভেতর থেকে তার অহম জেগে উঠল।
“আমার অপরাধ গুরুতর, বড় স্যারকেই বলতে হবে,” দৃঢ় কণ্ঠে জানালাম তাকে।
ইব্রাহিম আহত হয়ে মুখে আরেকটা পান পুরে দিলো। তারপর খুবই অনাগ্রহের সাথে একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বলল, “তাইলে বসেন, স্যার আসবো সকালে।”
বেঞ্চে বসতেই ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ গেল। দিন-তারিখের সারিবাঁধা ছকের ওপর কাঁচা হাতে আঁকা একটা মায়ের মুখ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কয়েকটা পেন্সিলের দাগ আমাকে টেনে নিয়ে গেল শৈশবে। তারপর একে একে জীবনের সব স্মৃতি উড়ে এসে বসতে লাগল মনে। ছোটবেলায় যখন থুতনি ধরে মাথা আঁচড়িয়ে দিত মা, তখন কি বুঝতে পেরেছিল তার ছেলে বড় হয়ে মানুষ খুন করবে? আমি সব স্মৃতি উড়িয়ে মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করছি, থানার পরিবেশে মা রইল কুয়াশার আড়ালে। আমার একটু অন্ধকার প্রয়োজন এখন, চোখ বন্ধ করলাম।
