ডাকনাম ভুলে গেছি – ৫

পাঁচ

প্রায় এক মাস হতে চলল আমরা এই বাড়িতে আছি। কয়েকটা ঘরকে বহুকষ্টে বাসযোগ্য করা হয়েছে। নিচের বৈঠকঘরে পূর্বপুরুষেরা ধুলোর কবর থেকে উঠে এসে দেয়ালে আবার উদ্ভাসিত হয়েছেন। ঘড়িটাকে বাঁচানো গেল না কোনোমতেই, কিন্তু বনেদি ঘড়ি তার নকশা করা মৃত দেহ দিয়েই দেয়াল অলঙ্কৃত করে রেখেছে। ঘরের আসবাবগুলো অনেক মুছেও তাদের শরীর থেকে বার্ধক্য মুছে ফেলা গেল না। তেল, জল, তারপিনের ঘর্ষণেও পুরোনো জৌলুস ফুটে উঠল না, এক ধরনের বিবর্ণ দারিদ্র্য তাদের গায়ে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যা শুধু যত্ন দিয়ে তুলে ফেলা যায় না, ঐশ্বর্য লাগে। ঐশ্বর্য না পেলেও ঐশ্বর্যের ইতিহাসটুকু উদ্ধার করতে পেরেই আমরা খুশি ছিলাম। একটা রান্নাঘর পাওয়া গেল চাকরদের ঘরের পাশে, সেখানে থেকে নিয়মিত ধোঁয়া ঊর্ধ্বমুখে উঠে জানিয়ে দেয় বাড়িটা আবার বেঁচে উঠেছে। বাড়ির কোল থেকে নাছোড়বান্দা বটগাছগুলোকে এখনো নামানো যায়নি। বাবাকে বললাম, “গাছগুলো থাক, বাবা, কী সুন্দর কচি কচি পাতা হয়েছে।” বাবা বলল, “বাড়িটার আয়ু শেষ করে দিবে এইগুলো, কাটতেই হবে।” বহু চেষ্টা করেও তাদের আয়ত্তে না পেয়ে বাবারও মনে হলো, খুব একটা খারাপ লাগছে না গাছগুলোকে।

বাবার বইগুলো একটা বিশাল আলমারি পেয়ে গেল। সেখানে আগে থেকে কিছু বই ছিল, যার প্রায় সবগুলোই নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট বইগুলো চুলায় দিতে পেরে মায়ের জ্বালা যেন কিছুটা কমলো। বাবা নিজের জন্য একটা পড়ার ঘর ঠিকঠাক করছে, ঘরটা এখনো সভ্য হতে পারেনি, তাই খোলা বারান্দায় থামের পাশে বাবার ইজিচেয়ারটা পাতা হলো। চেয়ারটাকে সঙ্গ দিচ্ছে একটা সাইড-টেবিল, বাবা ইজিচেয়ারে শুয়ে বইয়ে ডুব দিলে টেবিলটা অপেক্ষারত বইয়ের স্তূপ নিয়ে ভৃত্যের মতো নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার সারাদিন কাটে পুকুরঘাটে, নানা ধরনের পাখিদের পেছনে। হাঁড়িচাঁচা, কাক, ঘুঘু আর শালিক, চড়ুইয়ের মতো শহুরে পাখি ছাড়া আর কোনো পাখির সাথে পরিচয় নেই আমার। এখানে যে কত রঙের পাখি দেখা যায়, কারো নাম জানি না। আমি ঠিক করেছি সবার একটা করে নাম দিবো। ছোট নীল পালকের একটা পাখি সেগুনগাছের কোটরে বাসা বাঁধছে, প্রতিদিন কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করে আসি। পাখিটার নাম দিয়েছি—নীলকুটুম। সাদা ধবধবে ছোট একটা পাখির বিশাল লেজ দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, পাখিটার নাম দিয়েছি—ধূমকেতু। বাকিগুলোর নাম এখনো ঠিক করতে পারিনি, এই ব্যাপারে মায়ের সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু মা আমার এই গুরুতর সমস্যাটাকে কোনো গুরুত্বই দিলো না, কেমন আনমনা হয়ে বসে রইল। মায়ের যেন কোনোকিছুতেই আগ্রহ নেই আর, রান্না করে যন্ত্রের মতো, খেতে বসে অনিচ্ছায়, বাকি সময় শুধু শুয়েই থাকে। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে, ভেজা গামছায় চুল বাঁধা, রোদের আভাতে মায়ের সেই হাসিমুখটা আরেকবার দেখি। মাকে যে সেই হাসপাতালে নিয়ে গেল, তারপর থেকে মায়ের মুখ থেকে সেই হাসিটা হারিয়ে গেছে।

বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বাড়িটাতে আমরা তিনটামাত্র মানবপ্রাণী বাস করি। এই এক মাসে অন্য কোনো মানুষকে বাড়ির আশেপাশে দেখিনি আমরা। বেড়ার ঐপাশে কিছু মানুষকে দেখেছি, কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে এই বাড়ির দিকে তাকিয়ে তারপর আবার চলে গেছে। দূর থেকে তাদের মুখের ভাবভঙ্গি বুঝতে পারিনি। গৃহপালিত পশুগুলো বেড়ার ঐপাশ থেকে বেড়ে ওঠা ঘাসের দিকে চেয়ে থাকে, দড়ি ধরে তাদের টেনে সরাতে রাখালদের বেশ বেগ পেতে হয়। এতদিনে কোনো বালক তাদের ঘুড়ির সন্ধানে কিংবা চালতা, কদবেলের লোভেও এখানে ঢোকেনি। গ্রামের কৌতূহলী গৃহবধু এসে উঁকি দেয়নি একবারও, যারা এক বিঘত জমির জন্য ভাইয়ের মাথা ফাটায়, এত অবলীলায় এত বিশাল সম্পত্তি একটা উটকো লোক এসে ভোগ করছে দেখেও অন্তরজ্বালায় কোনো কূটচাল দিতে আসলো না কেউ। গ্রামের লোকজন কেন যে এত নির্লোভ হয়ে গেল, এই ইতিহাস শুনেছিলাম মহিমগঞ্জ বাজারের একটা চায়ের দোকানের নোংরা বেঞ্চে বসে।

এখানে আসার দুই দিন পর আমাদের রসদ প্রায় ফুরিয়ে গেল। বাড়িটাকে ভদ্রস্থ করতে কিছু লোকজনের প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে বটগাছগুলোকে উৎখাত করার জন্য। আর পত্রিকা পড়ার জন্য বাবার প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। শেষোক্ত প্রয়োজনটাই বাবাকে একটা বাজারের সন্ধানে ঘর থেকে ঠেলে বের করল। গ্রামের বাজার কেমন হয় দেখার জন্য আমার ভীষণ আগ্রহ হচ্ছিল, কিন্তু মুখে কিছু বললাম না, আবদার করা আমার স্বভাব নয়। বাবা নিজেই প্রস্তাব দিলো, “যাবে নাকি, হাসান, চলো গ্রামের বাজার দেখে আসবে।” আম-কাঁঠালের বাগান পেরিয়ে আমরা নদীর পার ধরে ডানদিকে হাঁটতে লাগলাম, নদীর ওপারেই মূল গ্রাম, এইপারে কেবল ফসলের মাঠ, বসতি তেমন নেই। হাঁটতে হাঁটতে জমিদারবাড়ির মাথাটা যখন প্রায় অস্পষ্ট হয়ে গেল, চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ফসলের মাঠ ছাড়া আর কিছুই নেই। ধান লাগিয়েছে কৃষকেরা, কচি ধানের চারায় রোদ মিশে সবুজ আরো অপূর্ব হয়েছে। বাতাসে নুয়ে পড়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে চারাগুলো। অনেকক্ষণ হেঁটেও ফসলের মাঠ ছাড়া বাজারের কোনো লক্ষণ খুঁজে না পেয়ে বাবাকে বললাম, “বাজার কি আসলেই আছে এখানে? তুমি চিনো?” বাবা বলল, “চিনি না, তবে জানি। বাজারটা নদীর ওপারে। আমাদের ঘাট থেকে এক মাইলের বেশি হাঁটতে হয়।”

এক মাইলে কত কিলোমিটার হয় আমি তা পড়েছি, কিন্তু এক মাইল কত দূর হয় তা সেদিন উপলব্ধি করেছি। আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমার মনে একটা সমস্যার উদয় হলো, জিজ্ঞাসা করলাম, “নদী পার হব কীভাবে?” “সামনে একটা বাঁশের পুল আছে।” “আমি তো দেখিনি।” “তুমি তখন ঘুমিয়ে ছিলে।” কলমির ঝাড় পানিতে পা ডুবিয়ে তাদের পরিপুষ্টতা নিয়ে নদীর দুই ধার দখল করে রেখেছে। তার মধ্যে সকালের সূর্য নদীর পানিতে ঝিকিমিকি করছে। ফসলের মাঠের পাশে যেসব দূর্বা আর ভাঁটফুলের গাছ কৃষকের প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে তাতে এখনো গতরাতের শিশিরের চিহ্ন লেগে আছে। দূর্বাগুলো প্রণাম করতে করতে আমাদের পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। লাঠি হাতে নড়বড়ে শীর্ণ বৃদ্ধের মতো একটা নড়বড়ে সেতু উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, পিঠ এমনভাবে বাঁকিয়ে রেখেছে যেন নদীর জল তার পেট ছুঁতে না পারে। এই পুলের ওপর মোটেই ভরসা করতে পারছিলাম না। আমাকে সাহস দেওয়ার জন্যই বাবা এক পা রাখতেই পুলটা যেন ব্যথায় আর্তনাদ করে কেঁপে উঠল। দুই পা গিয়ে বাবাও ভরসাহীন হলো। তখন মাথায় বিশাল সবজির ঝাঁকা নিয়ে এক কৃষক ফসলের মাঠের আল ধরে নদীর পারে এসে দাঁড়ালো। সে নির্ভয়ে পুলে চড়ল, পুলটা নানাভাবে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল, কিন্তু লোকটা সব আর্তনাদ অবজ্ঞা করে নির্দ্বিধায় ওপারে চলে গেল। ওপারে গিয়ে আমাদের দিকে ঘুরে বলল, “কিচ্ছু হইবো না, শক্ত আছে।”

পুলের সামর্থ্যের এমন প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেখার পর যদি ওপারে যেতে না পারি, তবে তা নেহাত আমাদের কাপুরুষতা। আমার বাবা পুরুষ, আমিও প্রায় পুরুষ, সাহসের পরীক্ষায় পিছুটান দেওয়ার উপায় নেই। বিশেষ করে যে ইতোমধ্যে পরীক্ষায় পাস করে ফেলেছে, তার সামনে তো নয়ই। তাছাড়া বাজারে যাওয়া আমাদের বিশেষ প্রয়োজন, অন্ন ফুরিয়ে এসেছে, পত্রিকা-ম্যাগাজিনের জোগানের সম্ভাবনা এই পারে মোটেও নেই। সুতরাং আমরা নদী পার হলাম, বাঁশ আর হাঁটুর কাঁপাকাঁপির মধ্যে কীভাবে যে তেত্রিশ নম্বর পেয়ে পরীক্ষায় পাস করলাম তা বলতে পারি না। ওপারে গিয়ে আমার মাথায় যে চিন্তাটা প্রথমে এলো তা হলো, এই পুল আবার পার হতে হবে। ফেরার সময়েও হাঁটু কেঁপেছে, কিন্তু অত ভয় আর করেনি। ওপারে লোকটা তখনো দাঁড়িয়ে ছিল, তার মাথার ওপর যে ঝাঁকা আছে, তা থেকে বেগুন, ঝিঙা, পুঁইয়ের ডগা উঁকি দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাবা জিজ্ঞাসা করল, “বাজারে যাচ্ছো?” লোকটার গায়ে একটা প্রিন্টের ফুলহাতা শার্ট, শার্টের প্রথম আর চতুর্থ বোতাম অনুপস্থিত, বাকিগুলো তার রোদে পোড়া দেহটাকে কোনোমতে ঢেকে রেখেছে। নিচে চেক প্রিন্টের নীল লুঙ্গি, লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত এসে তার দায়িত্বে ইস্তফা দিয়েছে। হাঁটুর নিচে তার শক্ত-সামর্থ্য দুটো পা, পায়ের পাতায় কাদা আর ঘাসের ডগা লেপ্টে আছে। ঘাড়ের ওপর ভাঙাচোরা একটা শক্ত মুখ বাবার দিকে কঠিন দৃষ্টি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আম্লের বয়স কতো?”

বাবা এমন অনাহুত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। লোকটা আবার বলল, “সামনের মাঘ মাসে আমার বয়স হইবো আটত্রিশ। মনে হয় বয়সে আমি আম্লের বড়, আমারে যে তুমি কইরা কইলেন, এইডা কি কুনো ভদ্রতা হইলো? প্যান্ট পইরা কি আম্লে বড় হইয়া গেছেন, লুঙ্গি পইরা আমি হইছি ছোডো?” বাবার এত বিব্রত চেহারা আর কোনোদিন দেখেনি। নরম কণ্ঠে বলল, “স্যরি, আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনি আসলেই বয়সে আমার বড়, আমার বয়স সাঁইত্রিশ।” লোকটার চৌকোনা চোয়ালে কীভাবে যেন একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল, বলল, “ভুল মানছেন এইডাই হইলো ভদ্রতা। আমেরে দেইখাই ভালা মানুষ মনে হইছে। আমার নাম রশীদ, আপনে আমার এক বছরের ছুডো, আমে ডাকবেন রশীদ ভাই।” “ঠিক আছে। বাজারটা কোনদিকে বলতে পারেন, রশীদ ভাই?” বাবার কথা শুনেই লোকটা সারা গা কাঁপিয়ে এমনভাবে হেসে উঠল যে তার ঝাঁকা থেকে দুই-একটা সবজি প্রায় উপচে পড়ে যাচ্ছিল। বাবা ভীত হয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলো, লোকটাকে পাগল ভেবেছে হয়তো। জিজ্ঞাসা করল, “হাসছেন কেন? আমি কি কোনো হাসির কথা বলেছি?”

“জীবনে এই প্রথম কেউ আমারে এত সম্মান দিলো, খুব মজা পাইলাম।” হাসতে হাসতেই জানালো লোকটা। আমাদের চোখে বিস্মিত ভীত দৃষ্টি দেখে বলল, “ডরায়েন না, ঠিসারা করলাম একটু। আমারে এত সম্মান দিয়েন না, ভাই। দুইন্যার হগলে আমারে কয় ‘তুই’ কইরা, আম্নের মুখে ‘তুমি’ শুইন্যা তাজ্জব হইছি, হের লাইগা ইটু মজা করলাম। মাইনষের সামনে আমারে ভুলেও ‘রশীদ ভাই’ কইয়া ডাইকেন না, তারাও হাসবো। দুই বছরের ছুইটকাও আমারে ডাকে ‘রশীদ্যা চোরা’।” “আপনি কি আসলেই চোর?” লোকটা তার পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করতেই তার আত্মসম্মানহীন বিগলিত চেহারাটা বেরিয়ে পড়ল, বলল, “একটু চুরির অভ্যাস তো আছেই। তয় ট্যাহা-পইসা চুরি করি না, এই ধরেন কারো গাছের ফল, রইদে নাইড়া দেওয়া লুঙ্গি, গামছা, হান্ডি-পাতিল, ক্ষেতের সবজি-এইগুলানই চুরি করি। মাইনষে বিরক্ত হয়, ধরা পড়লে চড়-থাপ্পড় দেয়, দুইডা পাউলা, তিনডা কুমড়া, একটা লুঙ্গির লাইগা এর বেশি কিছু করে না। আমি একলা মানুষ, দুই বেলার খানা আর এক বেলার নেশার ট্যাহা হইয়া যায়।”

বাবা তার মাথার ঝাঁকার দিকে ইশারা করে বলল, “এগুলোও কি-?” রশীদ লাজুক মুখে বলল, “জ্বে, আইজকা ট্যাহার একটু বেশি দরকার, এক জাগাত যামু আইজকা।” আমার দিকে চোখে ইশারা করে বলল, “ভাতিজা না থাকলে কইতাম, বুঝছেন তো। আমার কুনো লুকাচুরি নাই।” “আচ্ছা, রশীদ ভাই।” বাবার কথা শেষ না হতেই লোকটা লজ্জায় আবার মাথা নাড়ালো, “ইছ, শরম লাগে। আমারে রশীদ কইয়া ডাকবেন, আমার বয়স বত্রিশ, আম্লেরে মিছা কতা কইছি।” “আচ্ছা, রশীদ, তোমার তো লুকোচুরি নেই, জমিদারবাড়ির ব্যাপারটা কী বলো তো?” “ব্যাফার তো হগলে জানে। মার পেড থিক্যা যেইডা হইছে হেইডাও জানে। গঞ্জে চলেন, চা খাইতে খাইতে কমুনে সব হিস্টোরি।”

নদীর পারে একটা বিস্তৃত জায়গা জুড়ে কিছু টিনে ছাওয়া দোকান আর কোলাহল মিলে গড়ে উঠেছে বাজার। একটা বিশাল বটগাছ বাজারের মাঝে অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রশীদ হঠাৎ অন্যপথ ধরল, জানালো তার সওদা শেষে বাজারের শেষ মাথায় চায়ের দোকানে আসবে। বাজারের শুরুতে দুধের কলসিতে কচুরিপানা গুঁজে খদ্দেরের আশায় বসে আছে গোয়ালারা। আমাদের দেখে তারা সচকিত হলো, কানে কানে কী সংবাদ রটে গেল আমরা বুঝিনি, কিন্তু টের পেলাম গোয়ালাদের চোখ আমাদের পিঠে গেঁথে রইল। তারপর বাঁশপট্টির পাকা বাঁশের গন্ধে প্রবেশ করলাম আমরা, সেখানেও দৃষ্টি হামলায় আমরা আরো সঙ্কুচিত হয়ে গেলাম। বটতলার নিচে নাপিতের কাঁচি কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল আমাদের দেখে। তারপর মাছবাজার, কাঁচাবাজার, মুদি দোকান—যেখানেই আমরা গিয়েছি, ফিসফাস, কানাকানি, গুঞ্জন আর সেই অদ্ভুত চাহনি আমাদের পিছু নিয়েছে।

তাদের প্রত্যেকের চোখে-মুখে অদম্য কৌতূহল; কিন্তু কেউ এসে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করল না, ভাঙা গলায় মাছব্যবসায়ী আমাদের সামনে এসে করল না মাছের বিজ্ঞাপন। ঢেঁড়সের মাথা ভেঙে সজীবতার প্রমাণ দিলো না কোনো চাষী, গরুর চামড়াহীন লাল সিনা দেখিয়ে প্রলুব্ধ করল না কোনো কসাই। শুধু এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন মৃত মানুষকে হেঁটে যেতে দেখছে। বাজারের মাঝামাঝিতে ঘাট আছে, সেখানে নানারকমের ছোট-বড় নৌকা দড়িবাঁধা গৃহপালিত পশুর মতো সারবেঁধে ভেসে আছে। অনেকগুলো অপরিচিত নৌকার মধ্যে একটা পরিচিত নৌকাও দেখলাম, কমবয়সি মাঝিটা গলুইয়ে বসে বিড়ি ফুঁকে সমস্ত নৌকাটাকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মাঝিকে দেখে বুঝলাম, সেই রাতের ভয়ংকর ইতিহাস সবাইকে না জানিয়ে এত নিশ্চিন্তে সে বিড়ি ফুঁকতে পারত না। মুদি-দোকানি চাল-ডাল তুলে দেওয়ার সময় বিনে পয়সায় একটা পরামর্শও দিলো, “জমিদারবাড়ি জায়গাডা ভালা না, স্যার, সময় থাকতে যানগা, গরিবের একটা কতা হুনেন।” আমার দিকে মায়া মায়া চোখে চেয়ে বলল, “আহা রে! পোলার এহনো মুছও উডে নাই।” রহস্যভরা অগ্রিম মৃত্যুশোকে বাবা খুব বিরক্ত হলো। এমন দুই-একটা সুপরামর্শ জুটে গেল প্রায় সব লেনদেনেই; বাবা সেসব কানে তুলল না।

বাজারে কামার, কুমার, চামাড়, চাষা, নাপিত—সব আছে। হাঁড়িপাতিল, শাড়ি-চুড়ি, ছুরি, কাঁচি, শখের জিনিস খুঁজলে সবই পাওয়া যায়। কিন্তু সারা বাজার ঘুরেও একটা বইয়ের দোকান পাওয়া গেল না। মণিহারি একটা দোকানে দুই দিন পুরোনো পত্রিকা পাওয়া যায়, সেটাও নিয়মিত আসে না।

এবার বাবারও মনে হলো, জায়গাটা আসলেই অত ভালো না। কিন্তু আমরা নিরুপায়, এই পৃথিবীতে বাংলাদেশের শেষ সীমানায় এই অভিশপ্ত গ্রামটা ছাড়া আমাদের আর কোনো আশ্রয় নেই।

চায়ের দোকানে যথারীতি মাছিদের উৎসব চলছে। একটা টুলে বসে রশীদ নাকের ছিদ্রে তর্জনি ঢুকিয়ে কী যেন সন্ধান করছে। আমাদের দেখে অনুসন্ধান স্থগিত রেখে সে উঁচু গলায় চায়ের দোকানে চায়ের আদেশ দিলো, সাথে লাঠি-বিস্কুট। চা মুখে দিয়েই মুখ কুঁচকে বলল, “আবার জিবলা পুইড়া লাইছি।” চা-বিস্কুট শেষ হতেই পানের ফরমায়েশ জানালো সে, সাথে স্টার সিগারেট। তার সময়ের যথাযথ মূল্য পরিশোধ করার পর সে তার ‘হিস্টোরি’ শুরু করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *