পঁচিশ
অনেক পথ পেরিয়েছি, কিন্তু বিদ্যুতের আলো আমাকে মুক্তি দেয়নি। একটা আলো ছুঁয়েছে আরেকটা আলোকে, অন্ধকারের জন্য কোনো ফাঁক রাখেনি। রাস্তায় আলোর অভাবে যখন অন্ধকার কুয়াশার মতো নামতে শুরু করে, তখনই একটা চার চাকার জন্তু তীব্র আলো ফেলে ছিন্নভিন্ন করে দেয় আঁধারকে। আমার গায়ে আলো ছুড়ে মেরে সাঁই করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে বাস, ট্রাক। জন্তুগুলোকে দেখে মনে হয় শুয়ে থাকি তাদের গোল পায়ের নিচে, পিষ্ট হয়ে যাক আমার সব অক্ষমতা, থেঁতলে যাক সব দ্বিধা। আমার যে হাত প্রাণ ছুঁয়েছে তা হন্তারক হওয়ার আগেই নিস্তেজ হয়ে যাক। একটার পর একটা ট্রাক মৃত্যুর সম্ভাবনা জাগিয়ে গা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে, আমার চোখে হীরার মুখ, হাতে তার জীবন্ত পেটের স্পর্শ। আমি কোনোমতেই ট্রাকের নিচে মাথা পেতে পলাতক হতে পারলাম না।
পেছনে শাকেরের চোখটা মোটরসাইকেল থামিয়ে লক্ষ করছে আমাকে। এবার পথ ছেড়ে বিপথে গেলাম আমি। রাস্তার পাশে ঝাঁপ ফেলে ঘুমানো দোকানগুলোর পাশে সরু রাস্তা ধরে নিচে নেমে গেলাম। রাস্তার সাথে পাল্লা দিতে দোকানগুলো বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, নিচে আবর্জনার স্তূপ। আমার কোনো ঘেন্না নেই এখন, আবর্জনার অসমান কয়েকটা ঢিবি পার হতেই গ্রামের চরিত্র নিয়ে কিছু কাঁচাঘর হাজির হলো দৃশ্যপটে। টিনের ঘরগুলোতে সংসার কলরব করছে, খোলা দরজা দিয়ে আলোর সাথে সাথে গৃহিণীর শাসন, বাচ্চার কান্না, পুরুষের ধমক বেরিয়ে আসছে। বাইরে দাঁড়িয়ে খোলা দরজায় দেখতে লাগলাম তাদের জীবনের আয়তাকার খণ্ডাংশ।
কিন্তু আমি আলোর খোঁজে আসিনি, ঘরের পাশ দিয়ে সরু পথ চলে গেছে অন্ধকারের দিকে। সেদিকেই চলতে লাগলাম। আরো কয়েকটা ঘর পার হওয়ার পর দেখলাম রাস্তার পাশে দোকান আর ঘরবাড়ি মিলে কী নিপুণভাবে একটা ফসলের মাঠ লুকিয়ে রেখেছে। মাঠে কোনো সবুজ নেই, নগ্ন মাটিতে গত ফসলের চিহ্ন পড়ে আছে। আইলবাঁধা জমি একটার পর একটা পার হতে লাগলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একটা দ্বিধাগ্রস্ত অবয়ব মাঠের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঠের অপরপাশে গাছপালার কালো সারি। সেদিকে চলতে লাগলাম। আমার একটু অন্ধকার প্রয়োজন, মায়ের জঠরের মতো নিরাপদ অন্ধকার। যেখানে আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকতে পারব একা।
ফাঁকা ফাঁকা গাছের নিচে পায়ে চলা পথ পড়ে আছে। এটাই কি সেই শালবন? একই ধরনের গাছ সব সুশৃঙ্খল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে স্কুলড্রেস পরে পিটি করছে একদল বালক। গাছের পাতার আড়ালে থোকা থোকা অন্ধকার জমেছে, চারদিকে ছড়িয়ে আছে জোছনার ছেঁড়া চাদর। আরো ঘন বনের প্রত্যাশায় গভীরে ঢুকতে থাকলাম, জানি না কোথায় আছে এই বনের নাভি। এখানে গাছদের মধ্যে গা লাগালাগির স্বভাব নেই, একজন আরেকজনের ছোঁয়া বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কান পেতে শুনলাম শুকনো পাতার আর্তনাদ আমাকে অনুসরণ করছে।
গাছগুলো চল্লিশোর্ধ্ব মানুষের চুলের মতো পাতলা হতে শুরু করেছে, হঠাৎ দেখলাম বেয়াদবের মতো একটা বাল্ব তীব্রভাবে জ্বলছে, এখানেও ঘরবাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আমি আবারও দিক পরিবর্তন করলাম। আমার পায়ের ওজন বাড়ছে, আর চলতে চাইছে না। কিন্তু তবুও থামিনি, আমি চাই শরীরের সব চেতনা ফুরিয়ে যাক, যদি অন্ধকার খুঁজে না পাই, অন্ধকারই আমাকে খুঁজে নিক। চোখের সামনে হঠাৎ দেখলাম আকাশের অর্ধেক ঢেকে এক দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে, আমি টলতে টলতে আরো সামনে গেলাম, বিশাল বটগাছ নিজের কোলে জমিয়ে রেখেছে এই বনের সব অন্ধকার।
বটগাছের শিকরের ফাঁকে এক টুকরো মাটিতে আমার দেহটা পেতে দিলাম। কতক্ষণ এভাবে পড়ে ছিলাম মনে নেই। হঠাৎ কেউ একজন ডাক দিলো।
“কে আপনি, বাবা?”
একটা ঠান্ডা হাত টের পেলাম আমার কাঁধে। চোখ মেলে দেখি বটগাছের মতোই চুল-দাড়িতে ঢাকা একটা মুখ আমাকে ডাকছে। আগন্তুকের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ হওয়াতে আবার চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু কাঁধে হাতের স্পর্শটা বজায় রইল।
“আপনি কি অসুস্থ?” লোকটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
আমি আবার চোখ মেলে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। লোকটার গা একটা পাতলা চাদরে ঢাকা, অন্ধকারে চেহারা অতটা বোঝা না গেলেও গলার গভীরতা মেপে বুঝলাম লোকটা যথেষ্ট বৃদ্ধ।
উঠে বসে বললাম, “না, আমি অসুস্থ না।”
“তাহলে কি কোনো বিপদে পড়েছেন? একটা লোক দেখলাম গাছের আড়াল থেকে আপনাকে দেখছে, কিন্তু কাছে আসছে না, রাতের বেলাতেও বোঝা যায় লোকটার একটা চোখ নষ্ট, তাকে খুব একটা ভালো মানুষ মনে হয়নি আমার।”
“সে আমার কিছু করবে না, ওর কাজ শুধু আমাকে চোখে রাখা, সে সেটাই করছে।” বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করলাম আমি।
“ও আচ্ছা, বিচিত্র দুনিয়ায় কত বিচিত্র ঘটনা ঘটে। বাবা, আপনি এখানে মাটিতে শুয়ে থাকবেন না, আমি আসন পেতেছি পাশে, আসুন আমার সাথে।”
লোকটার কণ্ঠে এত শান্তি আর নির্ভরতা ছিল যে আমি আর মানা করতে পারলাম না তাকে। দেখলাম একটা চাদর বিছানো আছে পাশে, ছোট কাপড়ের ব্যাগ আর একটা বন্ধ মোমবাতি ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি আসনে গিয়ে বসলাম, বললাম, “আপনি কে?”
“আমি চিন্তক, চিন্তা করাই আমার কাজ। কিন্তু জীবনধারণের জন্য ভিক্ষা করি। সে হিসেবে আমাকে ভিক্ষুকও বলতে পারেন, কোনো পরিচয়েই আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আপনি এখানে কেন এলেন, বাবা?”
“একটু একা থাকতে এসেছিলাম।”
“একা হওয়ার জন্য একটা লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন?”
“আমি ওকে আনিনি, ওর কাছ থেকে এবং পৃথিবীর সব মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য এখানে এসেছিলাম।”
“মানুষ থেকে দূরে গিয়ে একা থাকা যায় না, বাবা, মানুষের মধ্যে গিয়েই একা থাকতে হয়। আমার গুরুর কথা। আমি তো শহরে, নগরে একা একা ঘুরে বেড়াই, যখন সঙ্গের প্রয়োজন হয় তখন এই বনে চলে আসি।”
“বনে আপনাকে কে সঙ্গ দেয়? গাছপালা?”
“গাছপালা তো শহরেও আছে, বনে আমিই আমাকে সঙ্গ দেই, শহরে আমি আমার মধ্যে থাকি না, সম্পূর্ণ একা।”
“আপনার কথা পুরোপুরি বুঝতে পারছি না।”
লোকটা পা ভাঁজ করে আসন ধরে বসলো, আমার আগ্রহে অন্ধকারেও তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, “নগরে, গ্রামে মানুষ কাপড় পরে নিজেকে ঢাকে, তারপর ঢাকে ভদ্রতা, সভ্যতা, সামাজিকতা দিয়ে। সেখানে কেউ হয় বাপ, কেউ মা, কেউ কেউ সন্তান, আত্মীয়। কেউ হয় শ্রমিক, কেউ পুলিশ, কেউ অফিসের কেরানি কিংবা অলস বেকার। এত পরিচয় আর মুখোশের ভেতরে আসল ‘আমি’টা হারিয়ে যায়। অভিনয় করতে করতে নিজেকেই ভুলে যায় মানুষ। জঙ্গলে আসি আমি নিজের সাথে দেখা করার জন্য।”
বটগাছটা নিজের ছায়া দিয়ে চাঁদের আলোতে বাঁধ দিয়ে রেখেছে। আবছা অন্ধকারে বৃদ্ধ লোকটাকে একটা ছায়ার মতো দেখাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “কিছু মনে না করলে আমি একটু আলো জ্বালাতে চাই।”
“কেন, বাবা? আমি ভূত-প্রেত কি-না নিশ্চিত হতে চান?”
“না, বহুদিন কেউ আমাকে আদর করে ‘বাবা’ ডাকেনি, আপনাকে একটু ভালো করে দেখতে চাই।”
লোকটা তার কাপড়ের ব্যাগ হাতড়ে একটা দেশলাই বের করে আনলো। তারপর নিজেই মোমবাতিতে আগুন দিলো। আলো জ্বলতেই বিবর্ণ চাদরটার মলিনত্ব প্রকাশিত হলো, মোমবাতির পাশে এক জোড়া প্রাচীন পা দেখা গেল, মনে হচ্ছে পাথর খোদাই করে বানানো। আলোটা হাতে নিয়ে তার মুখের সামনে ধরলাম, সাদা দাড়ি-গোঁফের আড়ালে যতটুকু চেহারা দেখা যায়, তাতে অসংখ্য অপরিচিত ভাঁজ, আমার পরিচিত মুখটার কোনো লক্ষণ এই চেহারায় নেই।
দাড়ি-গোঁফ তার মুখের প্রশান্তির হাসিটা চেপে রাখতে পারছে না। মাথার চুল ঘাড় ছাড়িয়েছে, চাদরের নিচে দেহ তার বার্ধক্যে ভরা। শরীরে রোদ আর ধুলো ছাড়া কোনো অলংকার নেই; গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, আঙুলে পাথরের আংটি, কব্জিতে পিতলের আংটা, চোখে ধুরন্দর চালাকি, কিছুই নেই। আমি ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা বন্ধ করে দিতেই অন্ধকার কেঁপে আসলো আমাদের ওপর।
“আপনি কি কাউকে খুঁজছেন, বাবা?” লোকটা জিজ্ঞাসা করল আমাকে।
“আপনাকে অন্য কেউ মনে করেছিলাম।”
“দুঃখিত, আপনাকে হতাশ হতে হলো।”
আমরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম, ঝিঁঝিপোকার ডাকে রাত গভীর হতে থাকল। নীরবতাটা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠার আগেই আমি লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কোথায় থাকেন?”
“পথে-ঘাটে।” এক কথায় উত্তর দিলো লোকটা।
“কিন্তু আপনার কথা শুনলে মনে হয় না আপনি পথের মানুষ।”
লোকটা হাসল আবার। বলল, “যখন পথে নেমেছি তখন আমার চুল অর্ধেক পাকা ছিল, গালে ক্ষুর লাগাতাম তখন। আমার নামের সাথে জোঁকের মতো লেগে ছিল প্রফেসর শব্দটা। আমি ঘর ছেড়েছিলাম আত্মহত্যা করার জন্য। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ঠিক করতে পারছিলাম না, কোন মৃত্যুটা সবচেয়ে বীভৎস হবে। অবশেষে রেললাইন দেখে মনে হলো ট্রেনের কথা। লোহার সাপটা মুহূর্তেই আমাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিতে পারবে। আমি স্টেশনে গিয়ে বসে রইলাম, মৃত্যুর প্রত্যাশা করে অপেক্ষা করতে থাকলাম একটা ট্রেনের জন্য।
কিন্তু ট্রেন আর আসে না, যাত্রীদের মতো আমিও অধৈর্য হয়ে উঠছিলাম। পরে শুনলাম কোথাও এক জায়গায় ট্রেন লাইন থেকে সরে গেছে, আজ আর আসবে না কোনো ট্রেন। আমি স্টেশনে বসে পড়লাম, দুঃখে চোখ বেয়ে নেমে আসলো অশ্রু, ছোট্ট বালিকার মতো কাঁদছিলাম অভিমানে।
ঠিক তখন একজন লোক আমার পাশে এসে বসলো। লোকটার গায়ে একটা গেরুয়া চাদর, চুল-দাড়ি সাধু-সন্ন্যাসীদের মতো বড়। মুখে এমন এক অদ্ভুত হাসি, যেন সে সবসময় শিশুদের খেলা উপভোগ করছে। লোকটা জানালো, সে অনেকক্ষণ ধরে আমাকে লক্ষ করেছে, ট্রেন না আসায় অনেক যাত্রী হতাশ হয়েছে, রেগে গেছে, কিন্তু কাঁদেনি কেউ। যে মেয়েটি নানাবাড়ি যাবে বলে তার লাল ফ্রকটা পরেছে, ঝালমুড়ি খেয়ে সে মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরে গেছে। যে বাবা হাতে প্লাস্টিকের টিয়াপাখি হাতে বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করেছে, সেও গজগজ করে চলে গেছে। চোখে কাজল দেওয়া মেয়েটির কাজল শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল, লিপস্টিকটুকু কেবল খেয়ে ফেলেছে চানাচুর ভাজার সাথে।
লোকটার আগ্রহ হলো, জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যেতে না পেরে আমি এত দুঃখ পেলাম। আমি তাকে জানালাম আমি বহুদূরে যাব। লোকটা মুচকি হেসে বলল, যেখানে যেতে চান সেখানে হেঁটেও যেতে পারবেন, কিন্তু এত ভার নিয়ে হাঁটা যায় না। আমার সাথে কোনো ব্যাগ ছিল না, আমি তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। লোকটা বলল, যেই দুঃখের বোঝা বইছেন, তা ঝেড়ে ফেলতে পারলেই দেখবেন হালকা হয়ে যাবেন। তখন আর ট্রেনের অপেক্ষা করতে হবে না। আমি তাকে বললাম, দুঃখ ঝেড়ে ফেলার কোনো উপায় আছে? লোকটা বলল, অবশ্যই আছে, কিন্তু উপায়টা তার জানা নেই। আমাকে আবিষ্কার করতে হবে নিজের উপায়।
লোকটার সাথে কথা বলতে বলতে কখন আমার চোখ শুকিয়ে গিয়েছিল টের পাইনি। লোকটা তখন তার নিজের ঘর ছাড়ার গল্প বলেছে আমাকে। সেদিন তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেই আমার ভার কিছুটা কমে গেল। তারপর আর কোনোদিন ঘরে ফিরে যাইনি। আমার আর ট্রেনের প্রয়োজন নেই এখন, অবশিষ্ট পথ হেঁটে হেঁটেই পার করব।”
“আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনার অনেক দুঃখ আছে, সব ঝেড়ে ফেলতে পেরেছেন?” জানতে চাইলাম।
মাথা নেড়ে লোকটা বলল, “দুঃখ তো আর মেদ না যে হাঁটতে হাঁটতেই ঝরে যাবে, তবে দুঃখের সাথে বাঁচার উপায় আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো এবং দুঃখী মেয়ে ছিল আমার বউ। অল্পবয়সে বিয়ে হয়েছিল আমার। রুখসানার বয়স তখন সতেরো, আমার তেইশ। বিয়ের কয়েকদিন পর ঘরে ফিরে দেখি হাপুসহুপুস করে কাঁদছে। আমি কাছে গিয়ে আদর করে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? বাপ-মায়ের কথা মনে পড়েছে? নাকি কেউ কিছু বলেছে? সে কেবল মাথা নাড়ায়। তারপর বহুকষ্টে কান্না থামিয়ে বলল, রাস্তায় একটা বিড়াল দেখেছে, কে যেন ঢিল ছুড়ে একটা চোখ নষ্ট করে দিয়েছে বিড়ালটার, আহত বিড়ালটা ব্যথায় চিৎকার করে কাঁদছিল। বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল রুখসানা। আমি তাকে কথা দিলাম বিড়ালটাকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব, তারপর সে শান্ত হলো। কিন্তু তাকে দেওয়া কোনো কথাই আমি রাখতে পারিনি, সেই বিড়ালটাকে আর খুঁজে পাইনি।
রুখসানার কারো কষ্টই সহ্য করতে পারত না, কারো খাওয়ার কষ্ট দেখলে ভাত তার গলা দিয়ে নামত না। আমাদের দরজায় কড়া নাড়লে যে-কোনো ভিক্ষুকের খাওয়া জুটে যেত। ভিক্ষুকমহলে তার ছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। একবার ধানমন্ডি লেকে ঘুরতে গিয়েছিলাম তাকে নিয়ে, হঠাৎ দেখি একদল ভিক্ষুক তাকে ঘিরে ধরে আনন্দে স্লোগান দিতে লাগল, ‘আম্মা আইছেরে আম্মা আইছে’। এলাকার কুকুরগুলো পর্যন্ত মারামারি ভুলে তার পেছনে দলবেঁধে হাঁটত। রাস্তাঘাটে তার সন্তানের অভাব ছিল না। কিন্তু তার নিজের কোনো সন্তান হলো না। এত মানুষের দুঃখের সাথে যোগ হলো তার নিজেরও দুঃখ। তবুও সে হাসতে পারত, পাগলের মতো হাসত সে, মাঝে মাঝে আমি ভয় পেয়ে যেতাম, হাসতে হাসতে না আবার দম আটকে যায়।
আমরা একসাথে যৌবন পার করেছি, আমি হয়েছি ‘প্রফেসন’, সে হলো আরো বহু মানুষ এবং পশুর ‘আম্মা’। একদিন রাস্তায় একটা লোককে পড়ে থাকতে দেখে সে থমকে দাঁড়ালো। যুবক ছেলে, গায়ে ভালো কাপড়চোপড়, ধুলোতে পড়ে আছে, কেউ এগিয়ে আসছে না। আমার বউয়ের মমতা জেগে উঠল তখন, আহা কার না জানি ছেলে। তাকে আফসোস করতে দিয়ে বললাম, চলো। সে জানালো এই ছেলেকে হাসপাতালে না নিয়ে সে কোথাও যাবে না। তার জেদের সাথে আমার পরিচয় আছে, আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, দুই দিনে সে কিছুটা সুস্থ হলো, রুখসানার মনে হলো হাসপাতালে তার যথেষ্ট পরিচর্যা হচ্ছে না, সে ছেলেটাকে নিয়ে আসলো বাসায়। নিজের ছেলের মতোই সেবা করল তাকে।
তারপর এলো সেই সন্ধ্যা, যেদিন বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখি দরজা খোলা, মেঝেতে একটা রক্তের রেখা এঁকেবেঁকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত চলে এসেছে, রক্তের ঐ প্রান্তে আমার রুখসানার নির্জীব দেহটা পড়ে আছে। ঢাকা শহরের অনেক মানুষ সেদিন তাদের ‘আম্মা’কে হারিয়ে এতিম হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ ছেলেটাকে ধরেছিল কয়েকটা সোনার গয়নাসহ। আমার দরজায় আর কোনো ভিখারি কড়া নাড়ে না, রাস্তার কুকুরগুলো রাত-বিরাতে ভেউ ভেউ করে কাঁদে। আমি একলা এই ঘর ঐ ঘর হাঁটি আর কান পেতে রাখি, যদি তার হাসি শুনতে পাই কোথাও। তার মতো হাসতে পারে না কেউ। পৃথিবীর কেউ জানল না আমি কতটা নিঃস্ব হয়ে গেছি, খালি ঘরে ফিরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। তাই একদিন ভাবলাম, কোথাও গিয়ে মরে আসি।”
আমার সামনে বসে থাকা বটগাছের মতো প্রাচীন লোকটার জন্য প্রচণ্ড মমতা অনুভব করলাম। যে একবার তার ‘রুখসানা’কে পায় সে তাকে ছাড়া কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে! জিজ্ঞাসা করলাম, “দুঃখের সাথে বাঁচতে শিখলেন কীভাবে?”
লোকটা বলল, “দুঃখ তো আসলে কিছু স্মৃতি। এই স্মৃতিগুলো আমাকে যত কষ্টই দিক, এগুলো ছাড়া আর কিছুই নেই আমার। আমি মরে গেলে স্মৃতির সাথে আমার রুখসানাও মরে যাবে। তাই আমি তার স্মৃতি আওড়াই, বুড়ো বয়সের আঘাতে যেন তার স্মৃতিগুলো নষ্ট না হয়ে যায়। মানুষকে তার কথা বলি যেন, তাদের স্মৃতিতে সে আরো কিছুদিন বেঁচে থাকে, আমি মরে গেলেও যেন আমার ‘রুখসানা’ বেঁচে থাকে।”
আমরা দুজন আবার নীরব হলাম, কয়েকটা জোনাকিপোকা আমাদের সাথে বটগাছের অন্ধকারে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ঝিঁঝিপোকার ডাক ছাপিয়ে পশ্চিম দিকে একটা শালগাছের পেছন থেকে নাক ডাকার শব্দ ভেসে আসছে। একটামাত্র চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেছে রুবেল। আমি লোকটাকে বললাম, “কোথাও পড়েছিলাম, প্রেমিক কখনো জ্ঞানী হতে পারে না, কিন্তু আপনাকে দেখে সন্দেহ হচ্ছে কথাটা হয়তো সত্যি না।”
লোকটা বলল, “অন্তত আমার ক্ষেত্রে হয়তো সত্যি। কিন্তু আমার গুরু বলেছিল, প্রেম ছাড়া কেউ জ্ঞানী হতে পারে না।”
“আপনার এত বয়স যে দেখে মনে হয় না আপনারও কোনো গুরু থাকতে পারে।”
লোকটা হাসল, ছোট বাচ্চাদের মুখে মজার কোনো কথা শুনলে লোকে যেভাবে হাসে। তারপর বলল, “জ্ঞানের সাথে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই, আমার চেয়ে বয়সে ছোট কেউ যদি আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী হয় তাহলে সেও আমার গুরু। আমার গুরুর বয়স কত আমি জানি না, কম হতে পারে, বেশিও হতে পারে। সেদিন রেলস্টেশনে তিনি আমাকে বাঁচার পথ দেখিয়েছিলেন, তিনিও আমার মতো ঘর ছেড়েছিলেন। তারও সংসার ছিল, তার নারী তাকে আগলে রেখেছিল, কিন্তু তিনি তার নারীকে আগলে রাখতে পারেননি। খুব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি, কথা কম বলতেন, তার মুখে হাসি ছিল বিরল বস্তু। গল্প বলতে পারতেন না একেবারেই। কিন্তু বউকে ভালোবাসতেন, সেই ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে পারতেন না। বউও তটস্থ হয়ে থাকত, বউয়ের সন্ত্রস্ত ভাব দেখে মায়া হতো তার।
তারপর তিনি এমন একটা কাজ করলেন, প্রেমে না পড়লে তার মতো মানুষের পক্ষে তা করা সম্ভব না, বউকে হাসানোর জন্য তিনি একটা কৌতুকের বই কিনলেন। নিজের স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে দাঁত চিবিয়ে একটা কৌতুক তিনি বউকে শোনালেন। বউ তার খিলখিল হেসে উঠল, তার মুখের সব গম্ভীরতাও ভেসে গেল, তিনিও হাসলেন। কৌতুকের বই ফুরিয়ে গেল, নতুন বই এলো, একজনকে হাসাতে পেরে আরেকজনের মন গভীর ভালোবাসায় ভরে গেল। সাহস পেয়ে তিনি কৌতুক শোনাতে গেলেন সহকর্মীদের। সহকর্মীরা কেউ হাসল না, গল্প শেষ হয়ে গেলেও তারা মজার কিছুর প্রত্যাশায় তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেদিন তিনি বুঝলেন তার বউ তাকে কতটা ভালোবাসে, ইচ্ছে করে কাঁদা যত সহজ, অনিচ্ছায় হাসা তত সহজ না। তারা এভাবেই নিজেদের ভালোবাসা অনুভব করে নিতেন। আমাদের মতো নিঃসন্তান ছিলেন না তারা, সংসার বড় হয়েছিল। তারপর হয়েছিল ট্র্যাজেডি, দ্বিতীয় সন্তান প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারল না, চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। তাদের নতুন ঠিকানা হলো প্রত্যন্ত এক জমিদারবাড়িতে।”
লোকটা তার গুরু সম্পর্কে আরো অনেক কিছুই বলে গেল, কণ্ঠে তার ভক্তি। সব কথা আমার কানে ঢুকল না। আমার মাথায় বাজছে ঝিঁঝিপোকার চিৎকার। অভিমানের প্রথম ঢেউ কয়েক মুহূর্তের জন্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো আমাকে। আবার যখন সংবিৎ ফিরল তখন বাবার জন্য হলো মায়া। একটা সঙ্গীহারা মানুষ একপাটি জুতার মতোই অসহায়। নিজের দুঃখের বোঝায় আমাকে পিষ্ট করতে চায়নি বাবা, কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার উপায় খোঁজার জন্য বাবা ঘুরে বেড়িয়েছে পথে পথে। বাবার ঘরে ফেরার কোনো উপায় ছিল না কারণ মা-ই ছিল বাবার ঘর। বাবা আমাকে দাড়ি কামানো শেখায়নি, বাজারে তাজা সবজি চেনায়নি, উপদেশ, পরামর্শ কিছুই পাইনি তার কাছে, জীবনের ঝড় ঝাপটা আমি একাই সামলেছি, বাবাকে ছাড়াই আমি পুরুষ হয়েছি।
কিন্তু এখন বাবাকে ভীষণ প্রয়োজন আমার, এই নগর আমাকে তার ফাঁদে আটকে ফেলেছে, কোনোমতেই মুক্তি পাচ্ছি না। বাবা হয়তো কোনো পথ দেখিয়ে দিতে পারবে, বাবারা তো তাই করে। জীবনে শেষবারের মতো তাকে একটু ‘বাবা’ হতেই হবে।
বৃদ্ধ লোকটা তখনো বলে যাচ্ছে, “বুঝলেন বাবা, নিজেকে আমি চিন্তক বলি, কিন্তু এখনো মৌলিক কিছু চিন্তা করতে পারিনি, আমার সব দার্শনিকতা গুরুর দান।”
আমি বৃদ্ধ লোকটাকে থামিয়ে বললাম, “আপনার গুরু কোথায় আছে? আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন।”
বৃদ্ধ লোকটা আমার দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, আমার চোখে-মুখে অস্থিরতা লক্ষ করে বলল, “কেন, বাবা?”
“সে অনেক কথা, প্লিজ তার কাছে নিয়ে চলুন আমাকে, আমার হাতে বেশি সময় নেই।”
আমি উত্তেজনায় ছটফট করছি, কিন্তু লোকটার দেহে কোনো চঞ্চলতা নেই। বলল, “তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল তিন দিন আগে, সিরাজগঞ্জ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একটা ময়লা চাদরে শুয়ে ছিলেন। রেলস্টেশন খুব পছন্দ করতেন তিনি। আমাকে দেখেই হাসলেন, ইশারায় কাছে বসিয়ে বললেন, সংসারের মায়া থেকে মুক্তি পাওয়া হলো না, ছেলেটার কথা মনে পড়ে শুধু। তারপর গা কাঁপিয়ে কাশতে লাগলেন। তার মাথার কাছে একদলা লাল রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আমি তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলাম, তিনি হাসলেন শুধু।”
আমার আর ধৈর্য হচ্ছিল না শোনার, বললাম, “আর দেরি করা যাবে না, তাকে আমার খুব প্রয়োজন।”
লোকটা বলতে থাকল, “বিকালে গিয়ে দেখি সেই হাসিমুখেই শুয়ে আছেন, আমি তাকে ডাক দিলাম, তিনি উঠলেন না, স্টেশনের অন্য ভিখারি, ফেরিওয়ালা-সবাই এসে ডাকল তাকে, কিন্তু কেউই তার ঘুম ভাঙাতে পারল না। স্টেশনের এক প্রান্ত তখন শোকে কাতর, নারী-পুরুষ হাউমাউ করে কাঁদছে, কঠিন চেহারার স্টেশনমাস্টার জলিল সাহেবও দেখলাম চোখ মুছছে। তাকে আর কই পাবেন, বাবা, তিনি মুক্তি নিয়ে চলে গেছেন।”
আমার ভেতরে সবকিছু হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। হাড়-পেশি আমাকে সোজা রাখতে পারল না। কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। শরীর হিম হয়ে যেতে লাগল, সবকিছু ঝাপসা লাগছে। পৃথিবীতে আরো একটু একা হয়ে গেলাম আমি। আমাকে সংকুচিত হতে দেখে, লোকটা বলল, “কী হয়েছে, বাবা, শীত লাগছে?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না, লোকটা তার কাপড়ের ব্যাগ থেকে একটা চাদর বের করে আমার শরীর ঢেকে দিলো। বলল, “এটা আমার গুরুর চাদর।”
আমি চাদরটা আরো বেশি করে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলাম, বাবার গন্ধ পাচ্ছি। লোকটা কী যেন বলল আবার, আমি শুনতে পাচ্ছি না, ভীষণ ঘুম পাচ্ছে আমার।
