চৌদ্দ
মেয়েটা যখন আমার নাম জানতে চাইল তখন আমার মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করলাম। বুকের ভেতরে উঁকি মেরে দেখি সেখানে গাছপালা আছে, হাঁস-মুরগি আছে, ধানের ক্ষেতে আগাছা আছে, শেয়ালের হাঁক আছে, পাখিদের ঝাঁক আছে, দখিনা বাতাস আছে, মাঝরাতে ইঁদুরের ছোটাছুটিও আছে, কিন্তু কোথাও আমি নেই। নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য অস্তিত্বহীন মনে হলো, কারণ সেই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য আমি আমার নাম মনে করতে পারছিলাম না। অনেক দিন হয়ে গেল, কেউ আমাকে নাম ধরে ডাকে না। যাদের সাথে আমার বসবাস, তাদের ভাষা নেই; যাদের ভাষা আছে, তাদের আমি এড়িয়ে চলি। যে ডাকপিয়ন আমার নাম ধরে জানিয়ে দিত যে আমার নামে কোনো চিঠি আসেনি, সেই পিয়নটা দুবাই চলে গেছে। নতুন পিয়ন আমাকে দেখে মুখ অন্ধকার করে রাখে, আমি এখন আর পোস্ট-অফিসে যাই না। যে চোখ আমাকে দেখে বিরক্ত হয়, সে চোখের সামনে আর যেতে পারি না। আমার নামের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, ব্যবহার না হতে হতে সে নাম ধুলোতে ঢেকে গেছে। ধুলো ঝেড়ে নামটা উদ্ধার করলাম, মেয়েটাকে নাম বললাম।
মেয়েটা সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, “এটা কি আসলেই আপনার নিজের নাম?”
“জি। কিন্তু কেন মনে হলো এটা আমার নিজের নাম নয়?”
“কেউ নিজের নাম বলতে এত সময় নেয় না।”
“নামটা ভুলে গিয়েছিলাম, আমাকে কেউ নাম ধরে ডাকে না। আপনার নাম কী?”
“আমার তো অনেকগুলো নাম, একটাও আমার পছন্দের না। যেই নাম সবাই ভুলে গেছে সেই নামটাই আপনাকে বলি। আমার নানির নাম ছিল হীরামুন্নেসা, আমি তার নামের একটা অংশ পেয়েছিলাম, ছোটবেলায় মা আমাকে হীরা বলে ডাকত।”
দুই অক্ষরের এই অপ্রচলিত নামটা ছাড়া মেয়েটা সম্পর্কে আর কিছুই জানতে পারলাম না। এইটুকু পরিচয়ের বিনিময়ে মেয়েটা ওপরতলার একটা শোবার ঘরের অধিকার পেল। এই বাড়িতে এই প্রথম এমন একটা দরজা পাওয়া গেল, যেটা চাইলেই আমি খুলতে পারব না। হীরার সাথে কোনো পরিধেয় ছিল না, তাই মায়ের দুটি শাড়ি তাকে দিলাম। ভীষণ অনাড়ম্বরে একটা মেয়ে আমার নির্জনবাস ধ্বংস করে দিলো।
ঘুমের সাথে আমার তেমন কোনো বৈরিতা ছিল না। আমার বাড়ির চারপাশে ঘিরে থাকা অন্ধকার ভেদ করে কোনো দুশ্চিন্তা আমার ঘুম কেড়ে নিতে পারত না। বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালে ঘুম আমাকে জড়িয়ে ধরত। কিন্তু আজ আমি ভুলতে পারছি না, কয়েকটামাত্র দেয়াল পরে অন্য একজন মানুষ এই বাড়িতে শ্বাস নিচ্ছে। বিছানায় শুয়ে পুরো ঘটনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ হতে লাগল আমার। রাত আর সন্দেহ গাঢ় হতে থাকল। আমার একাকিত্ব কেড়ে নেওয়াতে বিছানায় শুয়ে আমি আতঙ্কিত হলাম, একাকিত্ব ছাড়া আমার আর কী-ই বা আছে! এইসব ভাবনা আমাকে ঘুমাতে দেয় না, আমার প্রাগৌতিহাসিক বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে থাকি, আমার জীবনে আসে প্রথম নির্ঘুম রাত।
পরদিন ভোরে উঠেই আমি জলের কাছে যাই, মুখে পানি ছিটিয়ে সব গ্লানি ধুয়ে ফেলি। একটা বন্ধ দরজা দেখে রাতের সন্দেহও মুছে যায় সব। হীরা সারাদিন ঘরে বসে থাকে, মাঝে মাঝে জানালায় তার উদ্বিগ্ন মুখটা দেখা যায়। বাইরের আলো-বাতাস আর সবুজের দিকে তার ব্যথিত চোখ দুটো পেতে রাখে। জানালায় তার মুখটার সাথে আমি মায়ের মুখের সাদৃশ্য খুঁজে পাই, যদিও তাদের চেহারায় আদতে কোনো মিল ছিল না। হীরা আমাকে দেখলেই কচ্ছপের মতো মাথাটা টেনে নিত অন্ধকারে। আমার কাছ থেকে একটা সচেতন দূরত্ব সে বজায় রাখত। কখন সে খেয়ে যেত আমি টের পেতাম না। হয়তো সে ভয় পেত, দেখা হলেই তাকে চলে যেতে বলব আমি। ওপরের জানালার আড়াল থেকে সে আমার চলাচল লক্ষ করত নিশ্চয়ই, আমিও তাকে সাক্ষাৎ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতাম। ক্ষেতের পাশে অকারণেই বসে থাকতাম, বাগানে প্রয়োজন ছাড়াই ঘোরাঘুরি করতাম, শক্ত মাচাটাকে বিনা কারণে পরিচর্যা করতাম, পুকুরঘাটে অনেক সময় ব্যয় হতে লাগল আমার। সারাদিন নির্বাসন শেষে যখন নিজের বাড়িতে ঢুকতাম, কেমন যেন অস্বস্তি হতো মনে, নিজের উপস্থিতিকে যথাসম্ভব নীরব রেখে চোরের মতো ঘরে ঢুকতাম আমি। যে ঘরে সে থাকে সেই ঘরের দরজা আর দেয়ালগুলোকেও এখন জীবন্ত মনে হয়, আমি চেষ্টা করি সে-দরজায় যাতে আমার চোখ না পড়ে। সন্ধ্যাবেলা হীরা পুকুরঘাটে যায়, গোসল করে। সেই সময় নিজেকে ঘরে বন্দি করে রাখি। আমাদের দেখা হয় না, তবুও আমি তার উপস্থিতি ভুলতে পারি না।
ধীরে ধীরে মেয়েটা অবিশ্বাসের দেয়াল ধসিয়ে বের হয়ে আসে, সংশয়ের কপাট ঠেলে মৃদুপায়ে সে ঘুরে বেড়ায় আমার রাজ্যে। একটা ছাদ আর বিছানা পেয়ে তার জ্বর ছেড়ে গেছে। একদিন ভোরে তার সাথে দেখা হয়ে গেল আমার। দেখি সে বকুলতলায় ফুল কুড়িয়ে আঁচল ভরে ফেলছে। হঠাৎ করে মনে হলো এমন সুন্দর দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছে ভ্যানগগের ক্যানভাস থেকে বের হয়ে এসেছে মেয়েটি। এই ক্ষুদ্র কয়েকটা ফুল হীরার মুখ থেকে জ্বরের ছাপ আর বিষাদের সব চিহ্ন শুষে নিয়েছে। আমাকে দেখামাত্র পালিয়ে গেল না হীরা, আমাকেও পালানোর সুযোগ দিলো না, এগিয়ে এলো। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “এত বকুল ফুল একসাথে আর দেখিনি আমি।”
জিজ্ঞাসা করলাম, “এত ফুল দিয়ে কী করবেন?”
“মালা গাঁথব। কী সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছে। আপনার কাছে সুঁই-সুতা আছে?”
“আছে। কিন্তু মালা গেঁথে কী হবে? এই গাছের নিচে দাঁড়ালেই সুবাস পাবেন।”
“মালা আমি চুলে বাঁধব, ফুলের গন্ধ সারাদিন আমার সাথে থাকবে। মনে হবে বকুলতলায় বসে আছি।”
এই ধরনের আলোচনায় আমি একেবারেই অভ্যস্ত নই, তাই আলাপটা বাঁচিয়ে রাখতে কী কথা বলতে হয় সেই জ্ঞান আমার ছিল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “ফুল সম্পর্কে একটা ইন্টেরেস্টিং তথ্য আমি আপনাকে দিতে পারি, আপনি হয়তো আগে থেকেই জানেন।”
“কী?” আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল হীরা।
“ফুলের সুবাস, রং-সবই কীট-পতঙ্গদের আকৃষ্ট করার জন্য। সাদা ফুলে রং নেই, তাই সুবাস থাকে বেশি। ফুল মূলত গাছের লিঙ্গ।”
“ছিহ।” হীরা নাক-মুখ কুঁচকালো। তার আঁচল থেকে ফুলগুলো ঘাসে ফেলে দিলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “মালা গাঁথবেন না?”
“না।”
হীরা চলে যাচ্ছিল মুখ গোমড়া করে, আবার ফিরে এলো। বলল, “একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারছি না।”
“করুন।”
“কোনো মেয়ের সাথে আপনার বন্ধুত্ব হয়েছিল কখনো?”
প্রশ্ন শুনে অবাক হলাম। বললাম, “আমি একা থাকি, এর আগে কোনো মেয়ের সাথে পরিচয়ও হয়নি।”
“সেজন্যই ফুল সম্পর্কে এত জঘন্য একটা কথা অবলীলায় বলে ফেলতে পারলেন। আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছি, আপনি কিছু মনে করবেন না।”
“আমি কিছু মনে করিনি, আপনি যে বিরক্ত হয়েছেন সেটাও বুঝতে পারিনি। কিন্তু কথাটা তো সত্যি।”
“সত্যি কথাও সবসময় বলতে হয় না, মাঝে মাঝে সত্য গোপন করাই ভালো।”
হীরা চলে গেল, আমি বকুলতলায় দাঁড়িয়ে রইলাম। একগুচ্ছ ব্যথিত বকুল ফুল আমার পায়ের কাছে পড়ে রইল। হীরার সাথে আমার প্রায়ই দেখা হয়ে যায় এখন। দুপুরবেলা হয়তো আমি ক্ষেত থেকে ফিরছি, দেখি সে পুকুরের ঘাটে বসে আছে। কোনোদিন দেখতাম সিঁড়িতে বসে লতাপাতা ছুঁয়ে দেখছে। আমার বাগানে গাছের ফাঁকে প্রায়ই তাকে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। মাঝে মাঝে তাকে দেখা যায় ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে স্বাধীন রোদ গায়ে মাখতে। আমার বাড়ির নোনাধরা দেয়াল, জং-ধরা হাড়, বিবর্ণ আসবাবের সাথে কীভাবে যেন মিশে যাচ্ছে সে। বাগানের মধ্যে শাড়ি দুলতে দেখলে এখন আর অস্বাভাবিক লাগে না আমার, পুকুরঘাটে একটা মেয়ে বসে আছে দেখলে চমকে উঠি না, আপদটা কবে বিদায় নিবে সে ভাবনাও ভাবি না আর।
প্রকৃতি সম্পর্কে মেয়েটা মোটামুটি মূর্খ, তবে গাছপালা আর পশুপাখিদের প্রতি তার নিখাদ আগ্রহ আছে। সে এমনভাবে চারদিকে চেয়ে থাকে যেন একটা শিশু প্রথমবার বাবার কাঁধে ঘাড় ফেলে সদর রাস্তায় এসেছে। সেদিন অবাক হয়ে চালতাগাছের কচি পাতার দিকে তাকিয়ে ছিল, আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “এটা কী গাছ?” “চালতাগাছ,” বললাম আমি। “ওয়াও, চালতার আচার কত খেয়েছি, কিন্তু কোনোদিন গাছ দেখিনি।” তারপর তাকে নাগকেশর, চাম্বল, অর্জুন, নিম, নাগলিঙ্গম, সেগুন ইত্যাদি আরো বহু বৃক্ষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়েছে।
একদিন ক্ষেতের পারে সে ছুটে এসে হাঁপাতে লাগল। বলল, “এইমাত্র দুইটা লম্বা ঠোঁটের পাখি দেখলাম, কী যে সুন্দর! কী পাখি ওগুলো?”
“ধনেশ পাখি। ডিম দেওয়ার জন্য গাছের কোটর খুঁজছে হয়তো,” আগাছা তুলতে তুলতে বললাম আমি।
“কেন, তারা বাসা বানাতে পারে না?”
“না, সব পাখি বাসা বানাতে পারে না। উপযুক্ত কোটর না পেলে ধনেশ পাখি ডিম দেয় না, সারাজীবন একা কাটিয়ে দেয়।”
“অদ্ভুত তো। অথচ মানুষ এসব চিন্তা করে না, ঢাকার বস্তিতে গেলে আপনি দেখতেন, একটা ছোট ঘরে আট-দশজন গাদাগাদি করে থাকে। তবুও ঘরের মহিলাটার পেট ফোলা।”
জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি তাহলে ঢাকা থেকে এসেছেন?” হীরার মুখের প্রদীপ দপ করে নিভে গেল। বলল, “হ্যাঁ।” “ঢাকায় কোথায় থাকেন আপনি?”
মেয়েটা শান্ত গলায় বলল, “হাসান সাহেব, আমি এত সুন্দর একটা পাখি দেখেছি, ভীষণ আনন্দ হচ্ছে আমার। ভুলে ঢাকার কথা বলে ফেলেছি, ঢাকার কথা মনে করে আনন্দটাকে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করছে না।”
আমি আর কিছু বললাম না, ইখলাক হোসেনের কথা মনে পড়ল হঠাৎ। তার আর কোনো চিঠি আমি পাইনি, একটা চিঠি তাকে লিখেছিলাম, সে চিঠি ফেরত এসেছে। এত নিরানন্দের ঢাকা শহরে ইখলাক হোসেন কীভাবে যে টিকে আছে! হীরা বোধহয় কোনোদিন একা থাকেনি। অসুস্থ শরীরের জন্য অথবা স্বেচ্ছাবন্দিত্ব পালন করার জন্য কয়টা দিন তাকে ঘরে থাকতে হয়েছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য এখন সে বাইরেই থাকে। ঘাড় ঘুরালেই তাকে দেখতে পাই। সেদিন রান্নাঘরে ঢুকে বলল, “একা একা খেতে ইচ্ছা করে না আমার। এখন থেকে আপনার সাথেই খাবো, আপনার অসুবিধা হবে না তো?”
“না।”
তারপর ঠোঁটে হাসি চাপিয়ে বলল, “আপনি কি একটা কথা জানেন? আপনার রান্না খুবই জঘন্য। আমি ভেবেছিলাম জ্বরমুখে আমার এমন লাগছে, এখন দেখছি দোষটা জ্বরের না।”
হেসে বললাম, “তাহলে তো আপনার খুব অসুবিধা হয়ে যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ, খুব। সেজন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যতদিন আছি রান্নাবান্নাটা আমিই করব।”
নিজের রান্নাঘর থেকে বহিষ্কৃত হয়ে পুকুরঘাটে বেকার হয়ে বসে রইলাম। হীরা রান্না করছে, একটু পর পর এসে জিজ্ঞাসা করছে এটা আছে নাকি, ওটা আছে নাকি। মাথা নেড়ে জানিয়ে দিয়েছি, নেই। সে বিস্মিত হয়ে বলল, “বাংলাদেশের কোন রান্নাঘরে হলুদ থাকে না, তেল থাকে না? আপনি আজই বাজারে গিয়ে মসলাপাতি কিনে আনবেন।”
তার কণ্ঠে আদেশের সুর, আমি অবাধ্য হতে পারি না। সব মেয়েরা কি এমনই হয়? একজন অজয় পুরুষের প্রতি তারা কি এমন অবলীলায় আদেশ জারি করতে পারে?
বাবার জামা গায়ে দেই আমি, গায়ের শার্টের বয়স আমার চেয়েও বেশি। বাইরের জগতের ফ্যাশনের সাথে পাল্লা দিতে পারি না আমি, ইচ্ছাও করে না। বাজারে যে অন্ধ ভিখারি আছে, গাছতলায় পলিথিনের ঝুপড়ি বানিয়ে থাকে, তার লুঙ্গির কোঁচায় যে টাকা থাকে আমার কাছে তাও নেই। ইলিশ মাছের স্মৃতি আমার মনে নেই, কিন্তু সেই ভিখারিকে আমি ইলিশ কিনতে দেখেছি। আমি যে জুতা পরি, তার তলা বিপজ্জনকভাবে পাতলা হয়ে গেছে, কিছুদিন পরে মাটির সাথে প্রভেদ রক্ষা করে চলা আর সম্ভব হবে না। এই বাড়িতে যা কিছু পাওয়া যায়, আমি তাই-ই সিদ্ধ করে খাই, তেল-মশলার রসনাবিলাস করার মতো সামর্থ্য আমার নেই। কিন্তু আমার কোনো অভাব ছিল না, এখন এক মুহূর্তে দরিদ্র হয়ে গেলাম।
হীরার কণ্ঠে এমন কর্তৃত্ব ছিল যে আমি তাকে আমার দারিদ্র্যের বিবরণ দিয়ে অপারগতা জানাতে পারলাম না। আমার কাঁঠালবেচা সঞ্চয় টলস্টয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’-এর ভাঁজে ঘুমিয়ে থাকে। বেপারিদের ঘামে ভেজা ল্যাতল্যাতে নোটগুলো কাগজের তীব্র আলিঙ্গনে সটান হয়ে যায়। মাসে একবার আমি তাদের ঘুম ভাঙাই, একটা-দুইটাকে মুক্তি দেই, হাটে যাই। জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত তাদের টিকিয়ে রাখি, শেষের কয়েকটা মাস হারিকেনের সলতেটাকে বেশি তেল খেতে দেই না। কান মুচড়ে উদ্ধত আগুনের শিখাটাকে শাসন করি, রাত বাড়ার আগেই কুপিটাতে ফুঁ দেই। আজ অসময়ে ‘ওয়ার এন্ড পিস’ খুললাম, জ্যৈষ্ঠ মাস আসতে আরো বহু দেরি, কয়েক মাসের আঁধারের বিনিময়ে আমি গঞ্জে গেলাম মশলা কেনার জন্য।
টেবিলে আয়োজন করে খেতে বসলাম আমরা। হীরার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। খুব আগ্রহের সাথে আমার প্লেটে খাবার তুলে দিলো সে। খাবারে রঙের ছড়াছড়ি, তরকারির শরীর চকচক করছে। আশা এবং আশঙ্কা নিয়ে এক লোকমা মুখে দিলাম, প্রথমেই আমার সহজ-সরল জিহ্বা মশলার চনমনে আক্রমণে বিপর্যন্ত হয়ে গেল। মশলাগুলো পেটে গিয়েও গোলমাল শুরু করে দিলো, আমার নিরীহ পাকস্থলি তাদের উচ্ছৃঙ্খলায় অস্থির হয়ে উঠল। পেটের ভেতর থেকে একটু পর পর আর্তনাদ ভেসে আসছে, আমার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছে, হে প্রভু, এই সাজগোজ করা খাবার আর পাঠিয়ো না, অসভ্য খাবার ছাড়া অন্যকিছু আমরা হজম করতে শিখিনি।
হীরা জিজ্ঞাসা করল, “কেমন হয়েছে?”
মানুষের সাথে যদিও আমার তেমন মেলামেশা হয়নি, তবুও আমি জানি এই প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যা বললে অপরাধ হয় না। মাথা কাত করে বললাম, “ভালো হয়েছে।”
হীরা নিজেও খেতে খেতে বলল, “সত্যিই তো ভালো হয়েছে। আমি তো ভয়ে ছিলাম, কত কিছু দিতে পারিনি, কেমন হয় কে জানে। আমি রান্না কম করি, যারা অনেক দিন পর এক দিন রান্না করে, তাদের রান্না ভালোই হয়। কী বলেন?”
আপত্তি করার কোনো পরিস্থিতি আমার ছিল না। খাওয়ার পর পেটের বিদ্রোহকে শান্ত করার জন্য নদীর পারে হাঁটতে গেলাম। বুকজ্বলা, অম্বল—এইসব শব্দ এতদিন কেবল বইয়ে পড়েছি, সেদিন খুব গভীর পরিচয় হয়ে গেল তাদের সাথে।
দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, হীরার চরিত্রে আমি অদ্ভুত সব বৈপরীত্য দেখতে পাই। কথা বলতে খুব ভালোবাসে মেয়েটা, কিন্তু যতটুকু বলে তারচেয়ে বেশি গোপন করে; তার চোখ চঞ্চল, কিন্তু পা ধীর। সে এমনিতে খুব হাসিখুশি মেয়ে, কিন্তু মাঝে মাঝে এমন উদাস হয়ে বসে থাকে, দেখে মনে হয় আর কোনোদিন হাসতে পারবে না সে। একদিন দেখি সে চালতাতলায় আনমনে বসে আছে, তার চোখ ভেজা, গালের ওপর অশ্রুর আঁকাবাঁকা নদী। আর্দ্র চোখে শূন্যতা, আমাকে সে লক্ষ করেনি।
নারীদের কান্না আমি দেখেছি। মহিমগঞ্জ বাজারের পাকা রাস্তার শেষ মাথায় ছেলের বিদেশফেরত লাশের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদতে দেখেছি এক মাকে। সেই দৃশ্য দেখে আঁচলে মুখ চেপে চোখের জল ফেলেছে আরো অনেক মহিলা।
কমবয়সি বউটা মাটিতে গাছের শিকরে হেলান দিয়ে বসে ছিল, তার চোখে কোনো অশ্রু নেই, কাফনে মোড়ানো স্বামীর দেহটার দিকে সে তাকিয়েও দেখছে না, বটগাছের একটা শুষ্ক পাতার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। তার অশ্রুহীন কান্নাও সেদিন আমি দেখেছিলাম। গঞ্জে যাওয়ার পথে যেসব বাড়িঘরের পাশ দিয়ে যাই, যাদের সংসার বাড়ির সীমানা উপচে পথে এসে পড়ে, সেইসব বাড়িঘর থেকে পুরুষের হুঙ্কার আর মেয়েদের চিৎকার শুনেছি আমি। মাঝে মাঝে আর্তনাদ করতে করতে আলুথালু শাড়ির আঁচলে ধুলো মাখিয়ে বেরিয়ে আসে খোলাচুলের বিপর্যস্ত নারী, যে বুকে ভয় বিরাজ করে সে-বুকে লজ্জা থাকে না, ব্লাউজের ছেঁড়া বোতাম সে আর কুড়াতে যায় না। পুরুষের গালিতে চাপা পড়ে যায় ভেসে আসা শিশুদের কান্না।
হাটের দিন গঞ্জে ভিক্ষা করতে আসে এক বৃদ্ধা, শুনেছি অন্য কোনো এক বাজারে একসময় তার ঘর ছিল। যৌবনের পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ার পর চোখের পানিই তার সম্বল এখন। ধনবান লোক পেলে যথেষ্ট অশ্রু সে ঝরাতে পারে, বাকি সময় শুধু ঘ্যানঘ্যান করে।
আমি শোকের অশ্রু চিনি, সহানুভূতির অশ্রু দেখেছি, বিরহ কেমন অশ্রুহীন হয় তাও দেখেছি। যে অশ্রুতে প্রার্থনা থাকে, বাঁচার আঁকুতি থাকে, সেইসব অশ্রুর সাথেও আমার পরিচয় আছে। কিন্তু হীরার চোখ থেকে যে অশ্রু গাল বেয়ে নামছে, সেই অশ্রু আমি আর কোনোদিন দেখিনি। এটাই কি বেদনার অশ্রু?
হীরার কান্নার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বিব্রত করতে চাই না আমি। বেদনার কারণ জিজ্ঞাসা করার মতো ঘনিষ্ঠতা এই দুই সপ্তাহে হয়নি আমাদের। আমার নীরব প্রস্থান থেমে গেল হীরার ডাকে।
“হাসান সাহেব, একটু দাঁড়ান।”
হীরা আঁচল দিয়ে গালের ওপর সাম্প্রতিক কান্নার চিহ্ন মুছে ফেলেছে, কিন্তু চোখের পাপড়ি এখনো শুকায়নি। ভেজা চোখে হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার কৌতূহল হয় না? আমি কীভাবে এখানে আসলাম, কেন আসলাম, আমি কেমন মেয়ে, জানতে ইচ্ছা করে না?”
“করে। কিন্তু না জানলেও কোনো ক্ষতি নেই।”
“কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছা করে আপনি আমার সম্বন্ধে কী ভাবেন?”
“আপনি দুঃখী মেয়ে।”
হীরা হাসল, বলল, “জগতের সব মেয়েই দুঃখী মেয়ে। আপনার কী মনে হয়, আমি এখানে কেন এসেছি?”
বললাম, “আমার ধারণা আপনি বর্ডার পার করার জন্য এসেছেন। শহর থেকে অনেকেই আসে ওপারে যাওয়ার জন্য, অধিকাংশ রাজনীতির সাথে যুক্ত, কেউ কেউ খুনের আসামি, কিন্তু আপনার কারণ ভিন্ন মনে হচ্ছে।”
“কেন?”
“যারা রাজনীতি করে তারা পত্রিকা, টেলিভিশন ছাড়া থাকতে পারে না। আপনি এক দিনও পত্রিকা চাননি, বাইরের জগতের খোঁজখবর জানার কোনো আগ্রহ আপনার নেই। আর আপনাকে দেখে মনে হয় না কাউকে খুন করে এসেছেন, খুনি আমি দেখেছি, তারা হরিণের মতো সচেতন হয়।”
“প্রথম দেখায় যাদের বুদ্ধিমান মনে হয়, তারা আসলে কেউই বুদ্ধিমান নয়। আপনাকে দেখে বোঝা যায় না, কিন্তু আপনি ভীষণ বুদ্ধিমান মানুষ। আমি ইন্ডিয়ায় যাওয়ার জন্যই এসেছি, সব উপায় আমার জানা ছিল। কিন্তু আমার একমাত্র বাধা আমি নারী এবং সুন্দরী। আচ্ছা, হাসান সাহেব, আপনার লোভ হয় না?”
“কীসের লোভ?”
“এই যে একটা নিরীহ, অসহায় মেয়ে আপনার বাড়িতে আছে, ক্ষীণ প্রতিরোধ ছাড়া আর কোনো বাধা নেই। ইচ্ছা করলেই জয় করা যায়।”
বললাম, “আপনার আর আমার শরীরের মাঝে শুধু কিছু পেশির পার্থক্য।”
হীরা বলল, “এই পেশিই কোনো কোনো পুরুষকে পশু করে তুলে।” একটু থেমে আবার বলল, “যাক সেসব কথা। আপনি আমার অনেক উপকার করেছেন, কিন্তু বেশিদিন আপনার বোঝা হয়ে থাকতে চাই না আমি। আপনি কি আমাকে ওপারে যাওয়ার ব্যাপারে হেল্প করতে পারবেন? আমার পক্ষে ঢাকায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।”
বললাম, “আমি একজনকে চিনি, কিন্তু সে তো অনেক টাকার ব্যাপার।”
হীরা বলল, “টাকা এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই, গয়না যা ছিল সব লুট হয়ে গেছে। কিন্তু হাতের এই ঘড়িটা আছে, ঐসব গয়নার চেয়ে এই ঘড়িটা অনেক দামি। যারা গয়না খুলে নিয়েছে তারা বুঝতে পারেনি।”
হীরা ঘড়িটা খুলে আমার হাতে দিলো, তার চোখের পাপড়ি শুকিয়ে গেছে।
