আট
মায়ের দুর্বল প্রাণ আর শীর্ণ দেহটাই আমাদের সংসারটাকে এতদিন বেঁধে রেখেছিল। মা চলে যাওয়ার পর আমরা আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। প্রয়োজন ছাড়া বাবার সাথে আমার কোনো কথা হতো না, দিনের পর দিন দেখা হয় না। মা শয্যা ছাড়ার পর বাবা শয্যার দায়িত্ব নিলো, সারাদিন শুয়ে থাকে আর কী যেন ভাবে। ইজিচেয়ারটা বারান্দায় এতিম হয়ে পড়ে থাকে, কী অপরাধে সে নিঃসঙ্গ হলো, বুঝতে পারে না। বইয়ের প্রতি বাবার আর রুচি নেই, বহুদিন হয়ে গেল তার হাতে কোনো বই দেখিনি। চুল-দাড়ি ইচ্ছেমতো বড় হয়ে মুখের প্রায় পুরোটা দখল করে ফেলেছে। বাবার চেহারায় একটা সাধুভাব চলে এসেছে, বৈরাগ্যের সমস্ত লক্ষণ চোখে-মুখে ভেসে উঠছে। খাওয়াদাওয়ার মতো পার্থিব কার্যক্রমেও তার আগ্রহ নেই। খাওয়ার কথা বলতেই, লজ্জিত কণ্ঠে বলত, “খাইনি? ও হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম।” তারপর কোনোসময় ভুলের সংশোধন হতো, কোনোসময় বলত, “ক্ষিদে পায়নি, আজ আর খাবো না।”
বাবার নিরুপদ্রব বইগুলোকে ইদানিং আমি উপদ্রব করতে লাগলাম। আলমারি ভরা বইয়ের একচ্ছত্র অধিপতি হলাম আমি। বইয়ের বদ্ধ মলাটে আমি আটকে রইলাম, মানুষের সাথে যোগাযোগ আমার আরো কমে গেল। বাবা এখন খুব একটা বাজারে যায় না, বৈরাগীদের জন্য বাজার অনুকূল জায়গা নয়। সুতরাং টুকটাক প্রয়োজনে আমাকেই সেই ভয়াভহ কোলাহলে যেতে হয়। ভিড়ের মধ্যে মানুষের কৌতূহলি দৃষ্টিগুলোকে কেটে কেটে সামনে চলতে হয়।
মায়ের মৃত্যুতে নিস্তরঙ্গ গ্রামে প্রফুল্লতার একটা ঢেউ উঠল। কে কে আগেই ভবিষ্যতবাণী করে রেখেছিল, তা নিয়ে কৃতিত্বের কাড়াকাড়ি হলো বিস্তর। যে ভয়ে এত এত সম্পত্তি ভোগ করতে না পেরে তারা নির্লোভ হলো, সেই ভয় এড়িয়ে কেউ এসে তাদের চোখের সামনে সব নিশ্চিন্তে ভোগ করে যাবে, এটা তারা মানতে পারছিল না। এখন ভয়টা সত্যি প্রমাণ হওয়াতে তাদের মনে স্বস্তি ফিরে এলো।
বাজারে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে হাত, মাথা নাড়িয়ে জবাব দিতাম। হাত, মাথায় না কুলালে এক অক্ষরের বেশি ব্যয় করতাম না, ‘হু’ ‘হা’-তে কাজ চালিয়ে নিতাম। কিছু কিনতে গেলে কথা বলতেই হতো, আড়ষ্ট জিহ্বা খুব বেশি শব্দ উচ্চারণ করতে পারত না। কথা যাতে বলতে না হয় সেজন্য কাগজে লিস্ট করে নিয়ে যেতাম। বাজারের রসিক লোকজন আমার নাম দিয়েছে ‘বোবা প্যাঁচা’, কারণ আমি হাসি না, কথাও বলি না। সদাই সেরে কারো সাথে চোখ না মিলিয়ে বাজারের বাইরে নির্জন জায়গায় এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম। মনে হতো এত মানুষের মধ্যে আরেকটু থাকলে হয়তো দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। ঘরে এসে আবার কাগজে ডুব দিতাম। মানুষের চেয়ে অক্ষর আমার প্রিয় হয়ে উঠল। কথা না বলতে বলতে মাঝে মাঝে আমার মনে হতো কথা বলা ভুলে গেছি।
এই বাড়ির সীমানায় যত গাছপালা, লতাপাতা, ঝোপঝাড় আছে-সব আমার পরিচিত হয়ে গেল। কে কবে ফুল দিয়েছে, কার কবে ফল পাকবে-সব আমার মুখস্থ ছিল। তাই খাদ্যাভাবে আমাদের খুব একটা পড়তে হয়নি, প্রকৃতি আমাদের দুইজনের সংসার চালানোর দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে নিলো। কিন্তু চাল-ডাল তো এখানে জন্মায় না, কাপড় আমরা বুনতে পারি না, তাই টাকার কিছু প্রয়োজন তো হয়। কয়েকদিন আম আর কাঁঠাল বিক্রি করেছি চাঁপাপুরের হাঁটে। লোকজন যখন জানতে পেরেছে এগুলো অভিশপ্ত বাড়ির ফল, তখন আর কেউ কিনতে সাহস করেনি। আমাদের টাকা ফুরিয়ে এসেছে, সাথে চালও। বাবা বলল, “ভাত ছাড়াও অন্যান্য খাবার খেয়ে পৃথিবীতে বহু মানুষ টিকে আছে, আমরাও পারব।”
সেবার বর্ষায় আকাশ একটু বেশি উদার হয়ে গেল, বৃষ্টিতে ছোট নদীর পেট এত বড় হয়ে গেল যে পার ডিঙিয়ে এসে গ্রাম, মানুষের উঠান, ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত গিলে খেতে লাগল। আমাদের বাগান, জঙ্গল সব ডুবে গেল। পুকুর, দিঘির নোংরা পানিতে মিশল নদীর ঘোলা জল। পানি চলে এলো ঘরের চৌকাঠে। ঘরের মধ্যে কত সাপ দেখলাম! প্রথমে ভীষণ ভয় পেতাম, পরে দেখলাম বেচারারা আমার চেয়েও বেশি অসহায়। শেয়ালগুলোর জন্যও ভাবনা হচ্ছিল, এই বন্যায় যেখানে মাটির অভাবে মৃত মানুষের সৎকার করা যাচ্ছে না, পানিতে ভাসিয়ে দিতে হচ্ছে, যেখানে সবকয়টা উঁচু জায়গা মানুষ দখল করে নিয়েছে, সেখানে মানুষের চক্ষুশূল এই শেয়ালের দল কোথায় আশ্রয় পাবে?
পানি আমাদের শত্রুর মতো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। ফসল সব গেল নদীর ভোগে, যাদের কাছে টাকা ছিল তারাও কেনার জন্য চাল খুঁজে পায়নি। তবে ছয় সপ্তাহের বন্যা আমাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দিয়ে গেল। সেবার আমাদের তিন বেলার খাবার ছিল মাছ আর হেলেঞ্চা শাক। টাকি, কই, ভ্যাদা খালি হাতেই ধরতে পারতাম। পুরোনো একটা শাড়িকে বাঁশের সাথে বেঁধে জাল বানিয়ে নিলাম, তাতে শিং, পাবদা, রুই পর্যন্ত জুটে গেল। সেই ভয়াবহ বন্যাতেও আমাদের খাবারের অভাব হয়নি, কিন্তু চুলা জ্বালানোর জন্য এক খণ্ড শুকনো কাঠ জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল। অবশেষে জমিদারবাড়ির ঐতিহ্য, বার্মা থেকে আমদানি করা, কারুকার্যময় আসবাবের ঐশ্বর্যের ইতিহাস ভেঙে জ্বালানি তৈরি করা হলো। বাবার কোনো আপত্তি ছিল না, বংশগৌরবের সমস্ত চিহ্ন তার চলাচল, কথাবার্তা এবং দৃষ্টি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
বন্যা চলে গেল, কিন্তু আমাদের জলাশয়ে দিয়ে গেল মাছ আর আমার মাথায় রেখে গেল মাছধরা বিদ্যা, সুতরাং আমিষের অভাব আমাদের আর হয়নি। বন্যার পানির সমাদর সইতে না পেরে কিছু উদ্ভিদ সেই দেড় মাসে মরেছে, কিছু হয়েছে মুমূর্ষু। কিন্তু পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন পলি পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে গাছ জন্মাতে লাগল। নতুন নতুন কত গাছ এখানে এসে বসতি করল। আমার চলার পথ যারা রুদ্ধ করেছে শুধু সেই কয়টা গাছকে আমি উচ্ছেদ করেছি, বাকি সবগুলোকে জমি ইজারা দিয়েছি, নিজের মতো বড় হওয়ার স্বাধীনতা তারা পেয়েছে। কোনোদিন যদি ফল দেয়, ফুল দেয় তাহলে খাজনা পরিশোধ করবে। এইসব বিবিধ গাছপালা, পশুপাখিদের নিয়ে আমার নতুন জমিদারি স্থাপন করলাম।
আমার শাসনের শিথিলতায় বর্ষা পার হতেই বাড়ির চারপাশে ঘন জঙ্গল গড়ে উঠল। শেয়ালগুলো ফিরে এসেছে, তাদের দেখে খুব স্বস্তি পেয়েছি মনে। এমন দুর্যোগে, প্রতিকূলতা পার করে তারা যে টিকে রইল সেজন্য তাদের বাধা না জানিয়ে পারলাম না। নতুন কিছু প্রাণীও দেখলাম জঙ্গলে বাস করতে এসেছে, কাঠবিড়ালি আগেও ছিল, এখন দেখলাম কিছু ভোঁদড় এসেছে, পুকুরে আমার মাছে ভাগ বসিয়েছে তারা, তাতে আমার অভাব হয়নি। কয়েকটা রঙিন সাপ দেখলাম জঙ্গলে ঘোরাফেরা করে। বিষ আছে কি-না কে জানে, থাকলেও সমস্যা নেই, দূরে দূরেই থাকে। বেজি দেখেছি জঙ্গলে, গন্ধগোকুল, বনবিড়ালও দেখা যায় মাঝে মাঝে, তারা স্থায়ী বাসিন্দা নাকি শুধু পরিদর্শন করে যায় বুঝতে পারি না।
একদিন একটা অদ্ভুত বিড়াল দেখলাম, আকারে বনবিড়ালের চেয়েও বড়। বইয়ের সাথে মিলিয়ে দেখলাম সেটা আসলে মেছোবাঘ। এমন জাঁদরেল প্রজা পেয়ে মনে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন গর্ব অনুভব করলাম। কিছু গৃহপালিত গাছ পোষা শুরু করলাম, তাদের খাবার দিলাম, যত্ন করলাম, সুরক্ষা দিলাম, বড় করলাম শুধু সবজির প্রয়োজনে, আমার কৃষিকাজের সূচনা হয়েছিল এভাবেই। বিজ্ঞান, ইতিহাস আর দর্শনের বই পড়ে বুঝেছি, কৃষিকাজ শুরু করার পরই মূলত মানুষের উন্নতি এবং সর্বনাশ হওয়া শুরু হয়েছে। মানুষ স্থায়ী হয়েছে, সম্পত্তি গড়েছে, পিতৃত্ব পেয়েছে তাই স্বার্থপর হয়েছে, ‘আমাদের’ থেকে সবকিছু ‘আমার’ হয়ে গেছে। সম্পদের ভিত্তিতে শ্রেণি তৈরি হয়েছে, সাম্রাজ্য হয়েছে, নিজ নিজ দেব-দেবী ভাগ করে নিয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে আর পৃথিবী থেকে শান্তি চিরতরে বিদায় নিয়েছে।
কৃষিকাজ শুরুর পর এই ভূমির ওপর আমার অধিকার যেন আরো বেড়ে গেল। যে চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, শিমগাছ আমার তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছে, সেটা আমার গাছ, জঙ্গলের গাছের স্বাধীনতা তাদের নেই; তাদের ওপর আমার মমতা যেমন বেশি আছে, অধিকারও বেশি। ফসল সংগ্রহ করার পর আমার মমতাও ফুরিয়ে যায়, তাদের সমূলে উৎপাটন করি। জবাই করে খাবো বলে মুরগি পোষা শুরু করলাম। কৃষকদের মমতার সাথে সাথে নিষ্ঠুরতার চর্চাও করতে হয়।
আমার বয়স তখন বয়ঃসন্ধিকালের মধ্যগগণে অবস্থান করছে। এই বয়সের শারীরিক-মানসিক সব পরিবর্তন নিয়ে বইপত্রে আমি যথেষ্ট পড়েছি, কিন্তু বই পড়ে জানা আর সরাসরি এই অদ্ভুত সময়ের মুখোমুখি হওয়া ভিন্ন ব্যাপার। প্রথমেই আমার চামড়া ফুঁড়ে পশম বের হয়ে মুখ থেকে সব কোমলতা কেড়ে নিলো। বয়সের দোষে আমি যে বড় হচ্ছি তার লক্ষণগুলো আরো গাঢ় হতে লাগল। আমার শরীরটা টেনে কেউ যেন রাতারাতি লম্বা করে দিয়েছে, নতুন উচ্চতা থেকে দেখি পৃথিবীটাই পাল্টে গেল। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে দেহ বাড়লেও হঠাৎ পরিবর্তনে মনটা আরো সংকুচিত হয়ে গেল, মানুষের চোখের সামনে নিজেকে উত্থাপন করা আরো অসম্ভব হয়ে উঠল। এই বাড়ির নির্জনতাকে আশীর্বাদ মনে হলো তখন। এই বিপুল ঝঞ্ঝার সময়টা পার করার জন্য একাকিত্ব আর কিছু তত্ত্বজ্ঞান ছাড়া আমার কাছে কিছুই ছিল না। এটা নাকি ভুল করার বয়স, কিন্তু ভুল করার কোনো সুযোগ আমার নেই, আমাকে একটা ‘বাবা’ এবং কিছু বৃক্ষ পালন করতে হয়। বিপথগামী করতে পারে এমন কোনো উপযুক্ত বন্ধুও আমার নেই।
ইদানিং দর্শন আর বিজ্ঞান বই ছাড়াও অর্থহীন কবিতার বইগুলোও আমাকে আকর্ষণ করে। অথচ কদিন আগের বর্ষায় জ্বালানির অভাবে এই বইগুলোই প্রথমে আমার চোখে পড়েছিল। এখন মনে হচ্ছে কী নৃশংস চিন্তা করেছি, কবিতার এই মোহটা সেবন করতে না পারলে এই ঘোর বয়ঃসন্ধিতে আমার কী দশা হতো। প্রেম শব্দটাকে আগে বেশ কৌতুক মনে হতো, এখন সেটা যেন একটা নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে হাজির হলো। মনে নতুন এই আবেগের আগমন হওয়ার পর কোনো নারীকে আমি কাছ থেকে দেখিনি, তবুও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চেহারা নিয়ে কল্পনায় একটা নারী এসে হাজির হয়। মাঝে মাঝে আমি নদীর ঘাটে বসে থাকি, ঐপারের গ্রামের সবুজ অবগুণ্ঠন থেকে লাল-নীল আঁচল দোলা দেয়, যুবতি মেয়েরা তাদের অস্পষ্ট চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, মাঠে ছাগল চড়ায়, গাছে ঢিল ছোড়ে, সখির সাথে গল্প করতে করতে তাদের দেহগুলো হাসতে হাসতে নুয়ে পড়ে।
আমার জানতে ইচ্ছা করে তারা কী গল্প করে। কিন্তু যখনই তাদের মধ্যে কেউ কলসিটাকে শিশুদের মতো কোমরে ফেলে নদীর দিকে আসে, যখনই তাদের চেহারা স্পষ্ট হতে থাকে, আমার বুক হঠাৎ রক্তশূন্য হয়ে যায়, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ি, নদীটাকে পেছনে ফেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাগানের গাছের ছায়ায় এসে আশ্রয় নিই। তারপর কয়েকদিন আর ঘাটে যাওয়ার সাহস আমার হয় না। আপামর মানবসমাজের সংস্পর্শ আমি এড়িয়ে চলি, মানুষের কাছে আমি লাজুক, মুখচোরা, অদ্ভুত। কিন্তু আমি যে কতটা ভীতু, সেই সংবাদ এখনো মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। নদীর ঐপারের যুবতিরা হয়তো কিছুটা জানে। আবেগের যে ঝড় আমার বুকে তোলপাড় করছিল, তা কোনো দিশা না পেয়ে বুকের মধ্যেই গুমোট হয়ে রইল।
সেই সময় আমার জীবনে একটা নতুন দুর্যোগ এসে উপস্থিত হলো। বাবার সাথে আমার খুব যে দেখা হয় তা নয়। আমার দৈনন্দিন চলাচলের পথে বাবা হঠাৎ আবির্ভূত হতো। বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে পা ছড়িয়ে রমিজ শেখের পুত্রের পক্ষে মানানসই নয়, এমন ভঙ্গিতে বসে থাকত মাঝে মাঝে। পুকুরঘাটের ভাঙা, অমসৃণ ঘাটে তাকে শুয়ে থাকতে দেখেছি কয়েকবার, কোনোদিন হয়তো নিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে গাছটার বিশালতা দেখছে। আবার কোনোদিন তাকে দেখেছি নতুন পুঁইমাচাটার পাশে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। আমাদের কথা হতো টেলিগ্রামের ভাষায়, আলাপের প্রচলন আমাদের মধ্যে ছিল না। আমাদের যোগাযোগের সেতুটা ভেঙে গেছে। তবুও বাবার অস্তিত্ব আমাকে স্বস্তি দিত। আমি জানি এই বাড়ির কোথাও আরেকটা মানুষ আছে, শুধু একটা ডাকের দূরত্ব আমাদের মধ্যে।
তারপর কয়েকদিন বাবার দেখা পাইনি, বাবা কোথাও উদয় হলো না। হাঁড়িতে খাবার পড়ে থাকতে দেখে ভেবেছিলাম, বাবাকে আবার অরুচিতে ধরেছে। কিন্তু প্রায় তিন দিন ধরে যখন খাবার অপচয় হলো, তখন একটা শঙ্কা আমার হৃৎপিণ্ড খামচে ধরল। আমি বাবার ঘরে গেলাম অনেক দিন পর। সেখানে সব আসবাব যথাস্থানে তটস্থ হয়ে আছে, বন্ধ জানালা নিষ্ঠার সাথে নিজেদের কর্তব্য পালন করছে। টেবিলের ওপর বাবার সার্বক্ষণিক দুটি সঙ্গী-ঘড়ি আর আংটি নিরাশ্রয়ের মতো পড়ে আছে। বিয়ের এই দুটো স্মৃতি বাবা সবসময় বহন করে বেড়াত। বিছানা পরিপাটি, চাদরটা টান টান হয়ে আছে, কোথাও কোনো টোল নেই। সাম্প্রতিক মানুষ বসবাসের কোনো চিহ্ন ঘরের কোথাও খুঁজে পেলাম না। বিছানার ঠিক মাঝামাঝিতে একটা ভাঁজ করা চিঠি তার শুভ্র দেহ নিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বুঝলাম চিঠিটা আমার জন্যই অপেক্ষা করছে।
ঘরের আবছা আলোতে চিঠিটাকে ভাঁজমুক্ত করলাম না। আমি জানি এই চিঠি অবশ্যই কোনো গুরুতর সংবাদ বহন করছে। বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে গোধূলির শেষ আলোয় চিঠিটা খুললাম। ভেতরে বাবার নিজস্ব ঢঙের বাঁকা বাঁকা অক্ষর।
বাবা হাসান,
অনেক ছোটবেলা থেকে আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছিল, আমরা খুবই সম্ভ্রান্ত মানুষ, অন্যদের চেয়ে আলাদা। আমাদের গায়ে যে রক্ত বইছে তার আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। অর্থসম্পদ না থাকলেও গায়ে এই রক্তের জোরে আমি অহংকারী হয়ে রইলাম। তোমার মাকে যখন বিয়ে করি, তখন আমার পরিপূর্ণ মত ছিল না। তাদের পূর্বপুরুষ ছিল দরিদ্র কৃষক, এখন পরিশ্রম করে তারা কিছু বিত্ত জুটিয়েছে। কিন্তু বিয়ের বাজারে শুধু রক্তের গুণ দেখলে হয় না, নগদ টাকার সেখানে খুব কদর। আমার আয় হিসাব করে তোমার মায়ের চেয়ে ভালো পাত্রী আর জুটল না। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সেই নিরীহ বেচারী আমার অহংকারের ঝনঝনানি সহ্য করে গেছে। এখন চিন্তা করলে দেখি, স্ত্রী হওয়ার অধিকারে আমার প্রত্যেকটা গর্বের মুখে তীর্যক উপহাস সে করতে পারত, আমার দারিদ্র্যকে উপলক্ষ করে আমাকে এক নিমিষেই উচ্চ আসন থেকে নামিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারত। সে মহান বলেই তা করেনি, তার কাছে সারাজীবন আমি হীনই থেকে গেলাম। আমাদের তীব্র অর্থসংকটের সময় তোমার মা একবার তার ভাইকে চিঠি লিখেছিল, সেই অপরাধে আমি তার সাথে তিন মাস কথা বলিনি। সে এই তিন মাস প্রতিদিন কেঁদেছে, আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে, মাঝে মাঝে যুক্তি দিয়েছে, “আমি কি নিজের ভাইয়ের কাছে কিছু চাইতে পারি না? কিন্তু আমার অটল অহংকার যথেষ্ট শান্তি না দিয়ে তাকে ক্ষমা করেনি। তার অসুস্থতার সময় তাকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা, ওষুধ ও পথ্য আমি সরবরাহ করতে পারিনি, কিন্তু আমার বংশমর্যাদার দড়ি দিয়ে আমি তার হাত-পা বেঁধে রেখেছিলাম। কারো কাছে সে সাহায্য চাইতে পারেনি। পেটের মধ্যে নীরব অপুষ্টিতে তার সন্তানটা মারা গেল, সে গেল মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত। তাকে হারানোর সম্ভাবনায় সেই প্রথম আমি উপলব্ধি করলাম সে আমার জীবনে কতটা বিস্তার করে আছে। তাকে বাঁচানোর জন্য আমি বাড়ি বিক্রি করলাম। এইবার আর সে আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি। আমি তার একটা সন্তানকে পেটে মেরেছি, আর একটা সন্তানকে উদ্বাস্তু করেছি, রাস্তায় পচে মরার ব্যবস্থা করেছি। এক ধরনের নিস্পৃহতা তাকে গ্রাস করেছে। উদাসীনতায় আচ্ছন্ন হয়ে সংসারের কাজকর্ম নীরবে সেরে গেছে। আমি তখন বিহ্বল হয়ে আছি, নিজেদের ইতিহাসে মগ্ন হয়ে আছি, তোমার মা যে নিজেকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে তা আমার চোখে পড়েনি। যখন চোখ মেলে তাকাবার অবসর পেলাম, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আমার অপরাধের সীমা নেই। আমি সারাদিন বই নিয়ে পড়ে থেকেছি, টাকার লোভের মতো জ্ঞানের লোভে পেয়ে বসেছিল আমায়। এখন বুঝতে পেরেছি জ্ঞানী হওয়ার চেয়ে জ্ঞানী হওয়ার গৌরবটাতেই আমার আগ্রহ বেশি ছিল। তোমার মা চলে যাওয়ার পর বুঝলাম আমি কতটা নিঃস্ব। আমার টাকা নেই, একটা সংসার চালানোর ক্ষমতা নেই, নিজের ছেলে আমাকে প্রতিপালন করছে। বই আমি অনেক পড়েছি, কিন্তু আমার মতো মূর্খ আর নেই। একটা আগাগোড়া ফাঁপা বেলুন আমি, ভেতরে শুধু ফাঁকা, বস্তু কিছু নেই। গতকাল রাতে আমি অনুভব করলাম, আমি মানুষ হিসেবেও দুর্বল। নিজের জ্ঞানের ওপর আমার সম্পূর্ণ ভরসা নেই। গতরাতে আমি সেই মেয়েটাকে দেখেছি, তোমার মাকে যে ডেকে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে এনেছিল। আমি তোমার মায়ের স্মৃতিতে এতটাই আচ্ছন্ন যে তার বিভ্রম আমার মধ্যে প্রবেশ করেছে। সারাজীবন বইয়ে চোখ ডুবিয়ে রেখেছি, বই ভাঁজ করে আমি চোখ তুলে তাকাতে সুলতানাকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। চারদিকে তার এত চিহ্ন আমার শোকটাকে ফ্যাকাশে হতে দিচ্ছে না। তীব্র অপরাধবোধ থেকে আমি মুক্তি পাচ্ছি না। অনেক কিছু তোমাকে বলতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু চিঠিটা শুধু শুধু বড় আর এলোমেলো হচ্ছে। আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কোথায় যাব জানি না, শুধু জানি, আমি হাঁটব। যতদূর গেলে আমার অভিশপ্ত ছায়া তোমার ওপর পড়বে না, তোমার মায়ের শূন্যতা আমাকে গ্রাস করবে না, অপরাধবোধটা আমার পিছু ছাড়বে, আমি ততদূর হাঁটব। এই বাড়ির দলিল-দস্তাবেজ সব আলমারিতে রইল, তুমি সাবালক হলেই সবকিছু তোমার অধিকারে যাবে। উকিল সাহেবকে চিঠি লিখে আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। ঘড়ি, আংটি আর যত ব্যবহার্য আছে সবই রইল, ভেতর থেকে আমি যেমন নিঃস্ব, বাইরেও তেমন নিঃস্ব হলাম। তোমাকে নিয়ে ভাবনা নেই আমার, তুমি তোমার মায়ের মতো হয়েছ। তার ধৈর্য তুমি পেয়েছ, তোমার মধ্যেও তার মতো একটা কৃষক বাস করে। যারা চাকরি করে খায় তারা স্বাবলম্বী নয়, তারা উৎপাদন করতে পারে না। তুমি পারো, জীবনধারণের জন্য তুমি কারো মুখাপেক্ষী নও। যখন কারো অন্য মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন সে হয় প্রকৃত স্বাবলম্বী। নিঃসঙ্গতা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না আর। আমি যে কথাটা কখনো মুখ ফুটে বলতে পারিনি, কিন্তু সবসময় বুকে পুষে রেখেছি, তা হলো-আমি তোমাকে ভালোবাসি। পৃথিবীতে তুমিই আমার সবচেয়ে আপনজন। যেদিন কাঁথা মোড়ানো তোমার ছোট দেহটা আমার হাতে তুলে দেওয়া হলো, সেদিন থেকে তোমার চেয়ে প্রিয় আমার আর কিছুই নেই। আজ এই প্রিয় বস্তু আমি ছেড়ে যাচ্ছি, তাতে কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত নিশ্চয়ই আমার হবে।
ইতি
তোমার মূর্খ, দরিদ্র বাবা।
একটা চিঠির আঘাতে আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলাম। ডাক দিলে এই বাড়িতে আর কেউ সাড়া দিবে না, এই ভাবনা ছাড়া আমার জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন এলো না। সকালে উঠে এখনো আমি রাঁধি, চাল একটু কম দেই। চাল ফুরালে শাক-লতাপাতা সিদ্ধ করে খাই, খাজনা হিসেবে ফলমূল পাই। আমি খাদ্যবিলাসী নই, খাবারে পুষ্টি পেলেই চলে আমার, তুষ্টি খুঁজতে যাই না। পুকুরে গোসল করি, মাছ ধরি, লাউয়ের মাচা বাঁধি, পাখি দেখি, গাছের ফুল গুনি, আর বাকি সময় বই পড়ি। সব আগের মতোই আছে, শুধু চলাচলের পথে হঠাৎ হঠাৎ বাবার উদাস চেহারাটা আর চোখে পড়ে না।
