সাতাশ
শেষরাতে যখন একটা থানার সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন মনে হলো একটু বিশ্রাম প্রয়োজন আমার। আর ছুটতে চাই না, এবার থামার সময় হয়েছে। কিন্তু থানায় ঢুকে জানলাম এটা অসময়। থানার দুর্লভ বড় স্যারের জন্য কাঠের বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে করতে পেছন ফিরে নিজের জীবনটাকে দেখে নিলাম চোখ বন্ধ করে।
যখন চোখ খুললাম তখন বাইরে আলো ফুটেছে। খালি চেয়ার-টেবিল মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে গেল মুহূর্তেই। চায়ের কাপের আসা-যাওয়ার মধ্যে গোমড়া আর রাগী মুখ নিয়ে মানুষও আসা-যাওয়া করছে। কনস্টেবল ইব্রাহিমের ডিউটি শেষ হয়ে গেছে, ইউনিফর্মে পানের স্থায়ী দাগ মেখে চলে যাওয়ার আগে আমাকে তার সহকর্মীর হাতে তুলে দিয়ে গেল।
তার সহকর্মী আকৃতিতে ঠিক তার বিপরীত। ইউনিফর্মের ভেতর তার পেশিগুলো আঁটছে না, হাত দুটো হাঁটু সমান লম্বা, চেহারা এত কঠিন যে মায়ার একটা রেখাও খুঁজে পাওয়া যায় না, নেমপ্লেটে তার নামটাই শুধু রুগ্ন, এমন দশাসই চেহারার মানুষের নাম মুক্তা। ইব্রাহিম আমাকে দেখিয়ে মুক্তাকে কী যেন বলে গেল। মুক্তা আমার দিকে তাকিয়ে দুই-একবার ঘাড় নাড়ালো, তার ঘাড় গাছের গুঁড়ির মতো মোটা।
মুক্তা টেবিলে বসে এক কাপ চা খেলো দুই চুমুকে। তারপর রেজিস্টার খাতা উল্টে কিছু একটা লিখল, তার আঙুলের ফাঁকে বেচারা কলমটা হাঁসফাঁস করছে। মুক্তা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই চেয়ারটা দম ফেলে বাঁচল। আমার সামনে এসে দাঁড়ালো মুক্তা, আমি তার বিশাল ছায়ার নিচে ঢাকা পড়ে গেলাম।
“আসেন, বড় স্যার এসেছে।” মুক্তা জানালো।
পুরুষমানুষের এত মোলায়েম কণ্ঠ আগে কোনোদিন শুনিনি, সাধারণ কথাগুলোই কবিতার মতো শোনালো। তার দিকে তাকিয়ে এখন আর তার নামটা বেমানান লাগছে না। মুক্তা আমাকে একটা কাচের দরজার সামনে এনে দাঁড় করালো। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার আগে সে বলল, “স্যার খুবই ব্যস্ত মানুষ, যা বলার সংক্ষেপে বলবেন।”
আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম।
ভেতরে ঢুকে দেখলাম পরিষ্কার নিঃভাঁজ উইনিফর্ম পরা ফর্সা একটা লোক মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা উল্টাচ্ছে। একটা সোনালি ফ্রেমের চশমা তার নাকের ডগায় বসে আছে, বয়সের অনুপাতে ওসি সাহেবের চুল একটু বেশিই কালো। ঘরের ভেতরে শীততাপ যন্ত্র হা করে শ্বাস ছাড়ছে। মুক্তা মেঝেতে পা ঠুকে সেল্যুট দিতেই ওসি সাহেব কিছুটা চমকে উঠল। হাতের পত্রিকাটা রেখে বলল, “এত জোরে সেল্যুট দিয়ো না, মুক্তা, টাইলস ভাইঙ্গি যাইবো।”
ওসি সাহেব আমার দিকে তাকালো, আমাকে এমনভাবে দেখল যেন আমি ভুল জায়গায় রাখা একটা আসবাব। নাক থেকে চশমাটাকে নামিয়ে মুক্তাকে জিজ্ঞাসা করল, “এইটা কী?”
“স্যার, ইনি আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন, রাত থেকে বসে আছেন।”
ওসি সাহেব আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিলো আরেকবার। “এরে দেখে তো মনে হচ্ছে ১৯৮৫ সাল থেকে পালিয়ে এসেছে।” খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসির মতো দুটো শব্দ বেরিয়ে এলো ওসি সাহেবের গলা থেকে। মুক্তা হাসিতে অংশ নিলো না, তাই রসিকতাটা দুটো ‘খ্যাঁক খ্যাঁকে’ই মরে গেল।
ওসি সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে ব্যর্থ কৌতুকটা গিলে ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “বলো কী সমস্যা?”
“আমি সারেন্ডার করতে এসেছি।”
“কী মামলা? নারী নির্যাতন?”
“মামলা নেই।”
“তাহলে কীসের সারেন্ডার? কী করছো তুমি?”
“ওসি সাহেব, আমি একজনকে খুন করেছি।”
আমি ভেবেছিলাম খুনের কথা শুনে থানা কেঁপে উঠবে, হইচই পড়ে যাবে চারদিকে, পুলিশরা সব হাজির হবে আত্মস্বীকৃত খুনিকে হাতকড়া পরানোর জন্য, সাংবাদিকদের ক্যামেরা হয়তো আমার চেহারা দেখে চোখ টিপ মারার জন্য উতলা হয়ে উঠবে, তাদের আটকানোর জন্য বাইরে তিনজন কনস্টেবল নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। ওসি সাহেব সহজ গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কাকে মেরেছ, বউকে? বউ মেরেই পুরুষরা থানায় চলে আসে, অন্য কাউকে মারলে পালায়।”
“ওসি সাহেব, আমি শাকের মাহমুদকে খুন করেছি।”
“কোন শাকের মাহমুদ?” কপাল ভাঁজ করল ওসি সাহেব।
“রাস্তায় নামলেই যার পোস্টার দেখা যায়।”
কিছুটা চমক দেখা গেল ওসি সাহেবের চেহারায়। “শাকের মাহমুদকে মেরে ফেলেছ? দ্য শাকের মাহমুদ?”
ওসি সাহেবের চেহারায় বিস্ময় আর অবিশ্বাস দোল খাচ্ছে, তার টেবিলে রাখা একটা বোতাম টিপতেই বেল বেজে উঠল। একজন কন্সটেবল ঢুকতেই বলল, “বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো, নড়বে না।” ওসি সাহেব আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে, টেলিফোনের বোতাম টিপতে লাগল। রিসিভার কানে লাগিয়ে চেয়ার ঘুরিয়ে কার সাথে যেন কথা বলল, আমি শুধু দুই-একটা কথা শুনতে পেলাম, ওসি সাহেবের কণ্ঠ নরম, কথাবার্তা সৌজন্যমূলক মনে হলো।
ফোন রেখে ওসি সাহেব আমার দিকে তাকালো, তার চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন। আবার বেল টিপল ওসি সাহেব। বাইরে দাঁড়ানো কনস্টেবল ঢুকতেই আমাকে দেখিয়ে বলল, “এই এইটার পকেট চেক কর, দেখ মাল-টাল আছে নাকি, ওকে জিজ্ঞেস কর কী দিয়া নেশা করে?”
কন্সটেবল আমার সারা শরীর হাতড়াচ্ছে। আমি কিছু না বুঝে বললাম, “আমি নেশা করিনি, ওসি সাহেব।”
ওসি সাহেব গর্জে উঠল, “চুপ হারামজাদা! তুমি মজা করার জন্য থানায় আসো? থানা মজা করার জায়গা না, আমি এইমাত্র শাকের সাহেবের সাথে কথা বললাম, ঘুম থেকে উঠে চা খাচ্ছে।”
কনস্টেবল জানালো আমার পকেট শূন্য। আমি হতবিহ্বল হয়ে ওসি সাহেবের দিকে চেয়ে আছি। ওসি সাহেব বিরক্ত হয়ে বলল, “এইটারে নিয়া যা, নাম-ঠিকানা লিখতে বল। আর ছাড়ার আগে মুক্তা যেন ওর দুই গালে দুইটা থাপ্পড় মারে, মুক্তার থাপ্পড় খাইলে ওর পাগলামি সেরে যাবে।” তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাউকে উদ্দেশ্য না করেই বলতে থাকল, “আমি চোর, ডাকাত সামলাবো নাকি পাগল সামলাবো?”
থানা থেকে যখন বের হলাম তখনো সকাল ফুরিয়ে আসেনি। উজ্জ্বল রোদে থানার সামনে একটা লাল গাড়ি ঝলমল করছে। এই গাড়িটা আমার খুব পরিচিত, গোপী কিষাণ লেনে বহুদিন এই গাড়িটার জন্য অপেক্ষা করেছি।
কাছে যেতেই পেছনের কালো কাচ নেমে গেল। ভেতর থেকে সানগ্লাস পরা শাকের মাহমুদ হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে বলেছিলাম, নো বুলেট ক্যান কিল মি, গাড়িতে উঠে আসুন, আপনাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব।”
আমি কোনো কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ি ছুটতে শুরু করল। শাকের বলল, “প্রথমবার ট্রিগার টিপলে পিস্তল দুই হাতে ধরতে হয়, ধাক্কাটার সাথে পরিচয় থাকে না সবার।”
“শেখার সময় আমার ছিল না। রক্ত দেখে আমি ভেবেছিলাম গুলিটা সফল হয়েছে।”
শাকের তার জামার গলাটা টেনে কাঁধের কাছে একটা সাদা ব্যান্ডেজ দেখিয়ে বলল, “গুলি বেরিয়ে গেছে, ব্লিডিং ভালোই হয়েছে, একটু এদিক সেদিক হলে আপনি এখন হাজতে থাকতেন। ইউ উড বি টক অফ দ্য টাউন, স্যরি আপনাকে সেই সুযোগটা দেওয়া গেল না।”
“আমার কোনো উপায় ছিল না,” বললাম আমি।
“আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড।” সহানুভূতি জানালো শাকের। আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকালাম, তার কণ্ঠে কোনো বিদ্রূপ নেই।
গাড়ির জানালা থেকে ঢাকা শহর হারিয়ে গেল ধীরে। লজ্জাবতী অসতী নারীর মতো দ্বৈত চরিত্রের এক মফস্বলে চলে আসলাম আমরা। পিচের রাস্তায় হাঁস-মুরগি দৌড়ায় এখানে, আধাপাকা দালান থেকে গুলতি নিয়ে বের হয় খালি গায়ের বালক। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাশের বাসার ভাবির নামে অপবাদ রটায় ঘোমটা পরা নারীরা। তিনতলা কাঠখোট্টা দালানের পাশে ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে বৃদ্ধ বেলগাছ। বাড়ির প্রাচীরের ওপর থেকে উঁকি দেয় খড়ের গাদা, বাইরে দেয়ালে লেপ্টে থাকে গোবরের ঘুঁটে। খোলা সদর দরজা দিয়ে দেখা যায় গরুর চঞ্চল লেজ। মফস্বলের কেন্দ্র শহর ঘনীভূত হয়েছে বেশি, এখানে রাস্তায় জ্যাম আছে, বহুতল বিপণী পুঁজিবাদের পসরা সাজিয়ে বসেছে, কাচে ঘেরা রেস্টুরেন্ট ভীনদেশি খাবার আর অন্ধকার পরিবেশন করছে।
কেন্দ্র পার হয়ে আমরা চলে আসলাম মফস্বলের শেষপ্রান্তে, এখানে ইট আর সিমেন্টের পাশে কোনোমতে শ্বাস নিচ্ছে ফসলের মাঠ। প্রাচীরবিহীন একটা বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালো লাল গাড়িটা। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম, বাড়িতে একটামাত্র টিনের চালের ঘর। বাড়ির এক প্রান্তে নিজের কালচে-সবুজ বাহু মেলে আছে বিশাল গাবগাছ। আর কোনো বড় গাছপালা নেই, ঝোপঝাড় ঘাপটি মেরে আছে আশেপাশে। শাকের আমাকে নিয়ে গেল গাবগাছের নিচে। দিনের বেলায়ও কিছুটা আঁধার পুষে রেখেছে গাছটা।
এখানে দাঁড়ালে সামনে ফসলের মাঠ দেখা যায়। শাকের সেই মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, “এইসব জমিতে ফসল ফলিয়েছে আমার বাবা, আমাদের উঠান ভরা থাকত ধানে।” ভাঙাচোরা ঘরটা আঙুল দিয়ে দেখালো আমায়, বলল, “এই ঘরে আমি ‘অ আ’ শিখেছি, ঘরের পাশে একটা গোয়ালঘর ছিল, আমাদের বাড়িতে সবসময় ধান, গোবর আর ফুলের গন্ধ পাওয়া যেত।”
মনে মনে ভাবলাম, যার বাবা চাষা, যে শৈশবে শুধু মায়া আর ছায়া দেখেছে, সে কীভাবে নগরের বহুতল ভবনে উঁচু চেয়ারে বসে মানুষ হত্যা করার হুকুম দেয়?
শাকের আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “কী, মিলাতে পারছেন না? আমিও পারি না মাঝে মাঝে। আমি হতে পারতাম বাবার মতো সম্ভ্রান্ত কৃষক, গ্রামের স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক কিংবা সরকারি কেরানি। আমার বউ আমাকে দেখলেও মাথায় ঘোমটা টানত, বাড়ি ফিরলে ছেলেমেয়ে দৌড়ে এসে কোলে উঠত, ফজরের নামাজ শেষে আব্বা খেত গোয়াল থেকে দোয়ানো তাজা দুধ, আম্মার হাতের বালার শব্দে ঘুম ভাঙত সবার। আমি হতাম একজন সুখী লুজার। কিন্তু কিছুই হলো না।”
“কেন?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
“কারণ শহর থেকে শকুন এসে নামল গ্রামে, নির্বাচনের সময় তখন। তালুকদার সাহেবের ছোট ছেলে কালো চশমা চোখে দিয়ে ঘরে ঘরে গেল ভোট চাইতে। আমার মা ছিল ভীষণ সুন্দরী, বাবা বিয়ে করে মাকে নিয়ে আসার পর কয়েক মাস পর্যন্ত আশেপাশে গ্রাম থেকে মাকে দেখতে আসত মহিলারা। সবাই বলে যেত এমন সুন্দরী বউ তারা আর কখনো দেখেনি, এইসব গল্প আমি বড় হয়ে শুনেছি। ভোট চাইতে এসে ছোট তালুকদার মাকে দেখেছে, তার মনে হলো গায়ে কাদা-গোবর মাখা কারো ঘরে এমন বউ বেমানান। সব ঐশ্বর্য, সব ক্ষমতা, সব রূপসী শুধু তারই প্রাপ্য। শুনেছি মা অত বুদ্ধিমতী ছিল না, গাড়ি আর গয়নার মোহে গোয়াল আর ধানের গন্ধ তার অসহ্য লেগেছিল, হয়তো আমাকেও সহ্য করতে পারেনি। একদিন ঘুম থেকে উঠে জানলাম, আমার মা কুলটা, লোভ তাকে নিয়ে গেছে তালুকদারের বাগানবাড়িতে। তারপর কোনোদিন কোনো নারীকে সম্মান করতে পারিনি আমি।”
শাকেরের চেহারায় দুঃখের কোনো চিহ্ন নেই, গলায় নেই আবেগের কম্পন। মনে হচ্ছে সে অন্য কারো গল্প বলছে।
“সেজন্য আপনিও শকুন হতে চান?” জিজ্ঞাসা করলাম শাকেরকে।
“আমি বিজয়ী হতে চাই, যাদের কোনো ক্ষমতা নেই, পেট ভরানো ছাড়া যাদের কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, যাদের জন্ম হয়েছে শোষিত হওয়ার জন্য, যারা রূপসীদের নাগাল পায় না, পেলেও নাগালে রাখতে পারে না, আমি তাদের দলে থাকতে চাই না।”
“মায়ের সাথে আর দেখা হয়েছিল আপনার?” জানতে চাইলাম।
“না, মাকে আর কখনো দেখিনি আমি। শুনেছি তালুকদারের বাগানবাড়িতে মরে পড়ে ছিল, লোকে বলে তালুকদারের রূপের পিপাসা মিটে গিয়েছিল, তাই-“
“আর আপনার বাবা?”
এই প্রথম দেখলাম শাকেরের মুখের পেশিতে টান পড়ল, চেহারায় পড়ল গাঢ় ছায়া, গাবগাছের ছায়ার চেয়েও গাঢ়। শাকের ফসলের মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঐ ফসলের মাঠে চাষ করত আমার বাবা, আর মাঠের পাশে এই গাছের ডালেই ফাঁস নিয়েছিল। আমিই প্রথম দেখেছিলাম বাবাকে, বাতাসে হালকা দুলছিল লাশটা। আমাদের বাড়িতে আরো বড় বড় গাছ ছিল, কিন্তু বাবা হয়তো ফসলের মাঠের পাশেই মরতে চেয়েছিল। বাড়ির সব গাছ আমি কেটে ফেলেছি, বড় গাছ দেখলেই বাবার ঝুলন্ত লাশটার কথা মনে পড়ে, কিন্তু এই গাছটাকে কাটতে পারিনি। বাবা বলেছিল, ছোটবেলায় মনখারাপ হলেই বাবা এই গাছে এসে আশ্রয় নিত, শেষবারও আশ্রয়ের জন্য এই গাছটার কাছেই এসেছিল বাবা।”
“আপনার জন্য দুঃখ হচ্ছে আমার।” জানালাম শাকেরকে।
“ডোন্ট ফিল স্যরি ফর মি। এইসব ট্র্যাজেডিই আমাকে গড়েছে, অযথা আবেগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। ঢাকায় চাচার বাসায় বড় হয়েছি, কিশোর বয়সে পরের বাসায় গলগ্রহ হয়ে থাকার মতো যন্ত্রণা সহ্য করেছি, অনেক অপমান হজম করেছি। দ্য গ্রিফ অ্যান্ড ইনসাল্ট মেইড মি স্ট্রং লাইক আয়রন, সংকল্প হয়েছে আরো পাকাপোক্ত। তাইতো আমি আজকের শাকের মাহমুদ হয়েছি।”
ফসলের মাঠ থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে আমাকে মনে করিয়ে দিলো, এই লোকটাকে গতরাতে গুলি করেছিলাম আমি, একটা পিস্তল থাকলে হয়তো আবার করব, এবার দুই হাতে ধরে। আমি জানি সেই সুযোগ আর পাবো না।
যখন শাকের মাহমুদের লাল গাড়িতে চড়েছি, তখন থেকেই আমি মৃত।
শাকেরের দিকে তাকিয়ে বললাম, “মারার আগে সবাইকেই কি আপনি আপনার জীবনকাহিনি শোনান?”
শাকের হাসল একটু, তারপর বলল, “আপনার আর আমার মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল কী জানেন?”
“আমরা একা?”
“না, আমরা দুজনেই যা ভালোবাসি তার জন্য মানুষ খুন করতে পারি।” তারপর আমাকে গাছতলায় রেখে সে গাড়ির কাছে গেল।
আমি আরেকবার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিলাম। গাড়ির পেছনের ট্রাঙ্ক থেকে কিছু একটা বের করল শাকের। আমি অবাক হয়ে দেখলাম শাকেরের হাতে ঝুলছে চিমসানো পেটের ধুলোমাখা আমার সেই কাঁধব্যাগ। শাকের কাছে এসে বলল, “জলিল মিয়ার কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত আপনার।”
“জলিল মিয়া?” নামটা পরিচিত মনে হলো না আমার।
“ঐ যে নলডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আপনার ভাগ্য ভালো জলিল মিয়ার ব্যাগ জমানোর শখ আছে, গতকাল রাতেই ব্যাগটা আমার হাতে এসেছে। নয়তো আপনি এতক্ষণে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে পড়ে থাকতেন, আগামীকাল বেওয়ারিশ হিসেবে আপনার দাফন হয়ে যেত, তারপর-“
শাকের তার কথা শেষ না করলেও আমি বুঝতে পারলাম তারপর কী হতো, আমার বুকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু ব্যাগ কীভাবে আমার প্রাণ বাঁচালো বুঝতে পারলাম না।
“চিঠিটা আছে?” জানতে চাইলাম আমি।
“হ্যাঁ, টাকা ছাড়া ব্যাগে সবই ছিল।” শাকের জানালো। “চিঠিটা আগে পেলে এত ঝামেলা করতে হতো না।”
“কী লেখা আছে চিঠিতে?” জানতে চাইলাম আমি। অন্যের চিঠিতে কী লেখা আছে, জিজ্ঞাসা করে মনে মনে লজ্জা পেলাম।
শাকের বলল, “চলুন আপনাকে বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে আসি।” গাড়িতে আমাদের আর কোনো কথা হয়নি।
বাসস্টেশনে পুরোনো রংচটা, কালো ধোঁয়াছাড়া, তেল চুইয়ে পড়া, কাচভাঙা বাসের মধ্যে যখন লাল চকচকে গাড়িটা থামল, কিছুক্ষণের জন্য স্টেশনের ব্যস্ততায় ভাটা পড়ল। গাড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে নাগালে এসে পড়া কয়েকজন যাত্রী ফসকে গেল কন্ডাক্টরের হাত থেকে। যারা একগাদা বাচ্চা নিয়ে রিকশা থেকে নেমেছে, তারা সব বাচ্চা এসেছে কি-না সেই গণনা না করে ভিন্নশ্রেণির ঐশ্বর্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। রিকশাওয়ালারা প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে ধীরে, গাড়ি থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব রেখে সাবধানে পার হচ্ছে তারা।
গাড়ি থেকে নামার আগে শাকের তার পকেট থেকে একটা ছেঁড়া সাদা খাম বের করে আমার হাতে দিলো। “পড়ার পর ছিঁড়ে ফেলবেন,” বলল শাকের।
আমি হাতে নিলাম খামটা। কালো কাচের আড়ালে যাওয়ার আগে শাকের বলল, “আর কোনোদিন যেন আপনাকে ঢাকায় না দেখি, আপনি যে আমাকে গুলি করেছেন তারপরও বেঁচে আছেন, সেটা তখন এত স্বাভাবিক না-ও মনে হতে পারে।”
পলাশপুরের সেই বাসটা দাঁড়িয়ে আছে, বোতামহীন শার্ট পরা কোঁকড়া চুলের কন্ডাক্টর যাত্রীর জন্য গলা ফাটাচ্ছে। আমাকে দেখে শঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপ্নে যাইবেন?”
বললাম, “হ্যাঁ।”
ঢোক গিলল ছেলেটা। অনায়াসে একটা যাত্রী পেয়েও উচ্ছসিত হলো না সে, আমার বমির ইতিহাস ভোলেনি এখনো। বাসে আর কোনো মানুষ নেই, আমি একটা জানালা দখল করলাম। বাসের জানালা দিয়ে ধুলো, ধোঁয়া, কোলাহল আর পোস্টারে ভরা শহরটা দেখে নিলাম শেষবারের মতো। পোস্টারভরতি হাসিমুখ এবং আক্ষেপ আর আশ্বাস।
যে চিঠি হীরা আমাকে লিখেনি, সেই চিঠি হাতে মুঠো করে বসে আছি। ভাতের আঠা দিয়ে বানানো খামের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে আনলাম, বাসের খোলা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকছে, আমার হাতে কবুতরের মতো ছটফট করছে একটা জেগে থাকা রাত। ভাঁজ খুলে দেখলাম, চিঠিতে কোনো সম্বোধন নেই।
যখন এই চিঠিটা লিখছি তখন রাত ফুরিয়ে এসেছে। আজ বহুদিন পর মনের কাঁটাটা সরে গেছে আমার, বুক ভরে শ্বাস নিয়েছি আজ, শান্তি আমার চোখ ছুঁয়েছে। আমার পেটে আরেকটা প্রাণ জেগে আছে, আমি তার মা, কিন্তু আপনি তার বাবা নন। আমরা আসলে কেউ কাউকে চিনতে পারিনি, আপনি আমার আসল নাম জানেননি, আমি আপনার আসল চেহারা দেখিনি। আমার মায়ের বিধিনিষেধে এমনভাবে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে কিছু একটা ধরে ভাসতে চেয়েছিলাম। এখন মনে হয়, সেদিন গাড়ির কাচ নামিয়ে অন্য কেউ আহ্বান করলেও হয়তো আমি গাড়িতে চড়ে বসতাম। শুধু একটু মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম, দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। যেদিন জানলাম আমি গর্ভধারিনী, সেদিন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ভালোবাসা উবে গিয়েছিল। আপনার প্রতি আর কখনো ভালোবাসা অনুভব করিনি। আমি ঘর ছেড়েছি সন্তানের পরিচয়ের জন্য, আমার প্রেমের জন্য না। কিন্তু আজ জানলাম আপনি দেশেই ছিলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে প্রকাশ্যে ঘুরছেন, মিছিল করছেন, নিজের পোস্টার সাঁটাচ্ছেন, কিন্তু আমার কোনো খোঁজ নেননি, তখন নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হলো, কিন্তু শান্তি পেলাম। জানলাম আপনার পক্ষ থেকে ভালোবাসার কোনো দাবি নেই, আমার সন্তানের ওপর কোনো অধিকার রইল না আপনার। আমার সন্তান বড় হবে, তার দিকে যখন আমি তাকাবো তখন আপনার কথা আমার মনে পড়বে না, যেই মানুষটাকে মনে পড়বে তিনি এই চিঠিটা নিয়ে এসেছেন আপনার কাছে। তাঁর বাড়িতে আমি আশ্রয় নিয়েছি, তিনি আমাকে ছায়া দিয়েছেন, তাঁর চোখে আমি মায়া দেখেছি, যে মায়া কোনো পুরুষের চোখে দেখিনি। আমি আপনার কাছে শুধু এই একটা কারণে কৃতজ্ঞ থাকব, আপনি সেদিন আমাকে গাড়িতে না বসালে এই অদ্ভুত লোকটার সাথে কোনোদিন দেখা হতো না আমার। শহরের চৌরাস্তায় বিলবোর্ডে টাকার বিনিময়ে হাসতাম আমি, টেলিভিশনে সাবান, শ্যাম্পু, ডায়পার বিক্রি করতাম। হয়তো কোনোদিন সিনেমার নায়িকার চেয়ারে বসে গালে পাউডার মাখতাম। আহা! কী অপচয় হতো আমার জীবনের!
এখানে এসে আমি আমার দেবতার দেখা পেয়েছি, যে দেবতা আমাকে দৃষ্টি দিয়েছে, সুখ চিনিয়েছে। সবুজের কারাগারে বন্দি থেকে আমি মুক্তির স্বাদ উপলব্ধি করেছি। জানি না ভালোবাসা কী, কিন্তু আমার কথায় যখন তিনি হেসে ওঠেন, এরচেয়ে বেশি আনন্দ আর কিছুতেই হয় না আমার। তাকে সারাদিন, সারাজীবন চোখে ধারণ করতে পারব, এমন সৌভাগ্য আমি আশা করি না, কিন্তু যেখানেই থাকি, তাকে মনে ধারণ করে রাখব। তাকে পূজা করেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। আমি তাঁর জন্য কাঁদব, কিন্তু তিনি যেন আমার জন্য হাসেন, এটুকুই চাওয়া আমার। একজন বিশুদ্ধ মানুষকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছি, আপনারও আমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আশা করি আপনার সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে হবে না। দেখা হলেও আপনাকে চিনতে পারব না আমি, আপনিও আমাকে চিনবেন না, সেই কামনা করি।
ইতি
হীরা
