নয়
নবকুমার দেখল, গোল মাঠের মতো জায়গাটায় এখন অনেক মানুষের ভিড়। সেজেগুজে ঘুরছে। বাচ্চারা ঘোড়ার পিঠে। কিন্তু একজন মোটাসোটা মধ্যবয়সিনীও একটা ছোট ঘোড়ায় চেপে বসেছেন এমন ভঙ্গিতে যে, আশেপাশের মানুষ তাঁকে দেখে হাসাহাসি করছে।
খানিকটা দূরে বড়বাবু দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গে গীতিময় এবং বিজন রায় কথা বলছেন। ঊর্মিলাও সেখানে পৌঁছে গেল। টেকনিশিয়ানরা ক্যামেরা নিয়ে ফিরে গিয়েছে তাদের ডেরায়। এখন রোদ নেই। পৃথিবীটা ছায়া ছায়া হয়ে রয়েছে।
নবকুমার বুঝতে পারছিল না, সে কী করবে! ওঁরা তাকে ডাকছেন না। যেচে ওখানে যাওয়া ঠিক হবে কি? পরিচালক ‘প্যাক-আপ’ বলেছেন, সে হোটেলে ফিরে যেতেই পারে। তার মুখে এখনও হালকা মেক-আপ রয়েছে। সেটা তোলা দরকার। তার চেয়ে বেশি দরকার গরমজামা। জ্যাকেট-সোয়েটার হোটেলেই রয়ে গিয়েছে। এখন তার পরনে চরিত্রের পোশাক, যা ঠান্ডার তুলনায় কিছু নয়। কিন্তু তার খারাপ লাগছিল। বড়বাবু তার সঙ্গে কথা বলছেন না। উনি যা যা আদেশ করেছেন, তার সবগুলোই সে মান্য করেছে। কলকাতা থেকে বহুদূরে এই দার্জিলিং-এ এসে এমন ভাব করছেন, যেন সে একজন নীচুতলার কর্মচারী। যার সঙ্গে কথা বলার কোনও কারণ নেই। নবকুমার এগিয়ে যেতে, গীতিময় তার দিকে তাকালেন।
নবকুমার জিজ্ঞাসা করল—’আজ কি আর কাজ হবে?’
গীতিময় মাথা নাড়লেন—’না। তুমি ফিরে যাও। কিন্তু নবকুমার, আগামিকাল ভোর পাঁচটায় তৈরি হয়ে থাকবে।’
নবকুমার মাথা নাড়তেই বড়বাবুর মেয়ে চেঁচিয়ে উঠল—’ওমা! এর নাম নবকুমার?’
নবকুমার হকচকিয়ে গেল চিৎকার শুনে।
বড়বাবু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘চলুন, আমরা একটু রাজভবনের দিকটা বেড়িয়ে আসি। খুকি এসো।’ দলটা হাঁটা শুরু করলেও নবকুমার দেখল, মেয়েটা বারংবার মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখছে। সে ফেরার পথ ধরল।
‘অজিত ম্যানশন’-এর পাশ দিয়ে নীচে নামার পথে একটা ফোটোর দোকান দেখে দাঁড়িয়ে গেল সে। ‘দাস স্টুডিও’। বিখ্যাত নায়ক-নায়িকাদের ছবি সাজানো রয়েছে। বোধ হয় এঁরা যখন দার্জিলিং-এ এসেছিলেন, তখন এই স্টুডিওর ক্যামেরাম্যান ছবি তুলেছিলেন। নবকুমার অন্যমনস্ক হল। একদিন নিশ্চয়ই এখানে তার ছবি টাঙানো হবে! দার্জিলিং-এর এই রাস্তায় যারা হেঁটে যাবে, তারাই তাকে দেখতে পাবে।
‘ওমা! এখানে দাঁড়িয়ে?’
গলা কানে যেতে হুঁশ ফিরল নবকুমারের। সে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল, বিদিশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। জিনসের ওপর নীল পুলওভারে খুব স্মার্ট লাগছে।
‘এই, দেখছিলাম।’ নবকুমার হাসার চেষ্টা করল।
‘শুটিং হয়ে গিয়েছে?’
‘হ্যাঁ, আজকের মতো। কাল ভোর সাড়ে পাঁচটায় তৈরি হতে হবে।’
‘তাই? আমাকে দশটায় ডেকেছে। কফি চলবে?’
‘কফি?’ চারপাশে তাকাল নবকুমার।
ইশারায় অনুসরণ করতে বলে একটি দোকানে ঢুকল বিদিশা। সামনের শোকেসে অনেক রকমের খাবার—বিদিশা পাশের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল। ওপরে উঠে মুগ্ধ হয়ে গেল নবকুমার। এটা একটা ছাদ, ছাদের ওপর রঙিন ছাতার নীচে চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। ডানদিকে তাকাতেই সন্ধের আলো-জ্বলা দার্জিলিং দেখতে পেল। মনে হচ্ছিল, যেন ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত হীরে জ্বলছে। যদিও সে কখনও হীরে দ্যাখেনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছিল, হীরে এর চেয়ে আর কত বেশি সুন্দর হবে? দূরে পাহাড়ের গায়ে-গায়ে আলো ফুটে রয়েছে। বিদিশা ডাকল—’আসুন।’
বিদিশা একটা রঙিন ছাতার নীচে বসে আছে। এই ছাদের রেস্তোরাঁতেও একটা মোলায়েম আলো জ্বলছে। নবকুমার চেয়ারে বসার আগেই বিদিশা কফি এবং স্যান্ডউইচের অর্ডার দিয়ে দিয়েছিল। মুখোমুখি বসে বিদিশা বলল, ‘জায়গাটা খুব সুন্দর, তাই না?’
‘খুব।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘আজ শুটিং কীরকম হল?’
‘একটাই দৃশ্য তুলতে তুলতে আলো চলে গেল।’
‘আপনার নায়িকা সিনে ছিল?’ হাসল বিদিশা।
‘উনি আমার নায়িকা কেন হবেন? এই ছবির নায়িকা।’
‘বাহরে! আপনি নায়ক, উনি নায়িকা, তাই না?’ বিদিশা আবার হাসল। ‘আপনি চলে এলেন যে, আপনাকে ওঁদের ওখানে ডাকেনি?’
‘না।’
কাঁধ নাচাল বিদিশা—’ভালোই হল। ওঁরা প্রথম শ্রেণির নাগরিক, আমরা দ্বিতীয় শ্রেণির। আমরা না হয় আমাদের মতো আড্ডা মারব।’
কথা ঘোরাতে চাইল নবকুমার—’আপনি এর আগে অনেকবার দার্জিলিং-এ এসেছেন, তাই না?’
‘এই রে! আবার ”আপনি” কেন? আমরা ”তুমি” বলব। হ্যাঁ, এই নিয়ে সাতবার। সব বার-ই শুটিং করতে। জানো, আমরা এই যেখানে বসে আছি, এখানে সত্যজিৎ রায় ”কাঞ্চনজঙ্ঘা” ছবির শুটিং করেছিলেন।’
‘ওহ!’
‘দার্জিলিং শব্দের মানে জানো?’ জিজ্ঞাসা করল বিদিশা।
‘না। নেপালি শব্দ?’
‘না। লেপচা শব্দ! মূল শব্দ ছিল দোর্জলং। কিন্তু ইংরেজরা সেটাকে বানিয়ে দিয়েছিল দার্জিলিং। দোর্জলং মানে হল বজ্র। বোধ হয় এত উঁচু বলে, একসময় এখানে খুব বজ্রপাত হত।’
‘আপনি তো অনেক জানেন।’ মন থেকে কথাটা বলল নবকুমার।
‘দূর! শুনে শুনে যা জেনেছি।’
কফি এবং স্যান্ডউইচ এসে গেল। খিদে পেয়েছিল তাই চটপট খেয়ে নিল নবকুমার। বিল এলে সে পকেটে হাত দিতেই বিদিশা বলল, ‘ওমা! এত অল্পে খাওয়ানোর কৃতিত্ব তোমাকে নিতে দিচ্ছি না। দামটা আমিই দিচ্ছি। তা ছাড়া আমি তো তোমাকে ডেকে এনেছি।’ দাম মিটিয়ে দিল বিদিশা। কিন্তু মনে একটা অস্বস্তি তৈরি হল নবকুমারের। অল্প খাওয়ানোর বদলে বেশি খাওয়ানো মানে, লাঞ্চ বা ডিনার হলে তো অনেকটা টাকা খরচ করতে হবে। সেটা তো তার ক্ষেত্রে বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়।
‘কী ভাবছ?’ বিদিশা জিজ্ঞাসা করল।
‘অ্যাঁ, না না। কিছু না।’ সোজা হয়ে দাঁড়াল নবকুমার।
ডেরায় ফিরে বিদিশা নিজের ঘরে চলে গেল। নবকুমার লক্ষ করছিল, ফিরে আসার পথে বিদিশা খুব কম কথা বলছিল। গেস্ট হাউজে ঢোকার পর তো কোনও কথাই বলেনি। নিজের ঘরে গিয়ে জামাপ্যান্ট পালটে পাজামা পরল সে। গায়ে চাদর জড়াল। এই চাদরটার অনেক বয়স। গ্রাম থেকে সঙ্গে এনেছিল সে। কিন্তু দার্জিলিং-এর ঠান্ডায় খুব একটা কাজ করছে না। ঘরে থাকলে কম্বলের তলায় ঢুকে গেলেই ভালো হয়। সে মোবাইলে সময় দেখল। সন্ধে সাড়ে সাতটা। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে অনেক রাত। রাতের খাবার কখন খেতে দেবে? স্যান্ডউইচ খেয়ে তো সারা রাত কাটানো যাবে না!
কম্বলের নীচে শোয়ার পর ঘুম ঘুম ভাবটা চলে এসেছিল। হঠাৎ বন্ধ দরজার বাইরে কেউ শব্দ করল। কম্বল থেকে বেরিয়ে চাদর গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলতেই টুনিকে দেখে অবাক হয়ে গেল নবকুমার—’কী ব্যাপার?’
টুনি ঠোঁট মুচড়ে হাসল—’আপনার ডাক পড়েছে।’
‘কোথায়?’
‘দিদির ঘরে। আসুন। দাঁড়াব, না চিনে যেতে পারবেন?’
বিদিশা তাকে এমনি-এমনি ডাকবে না, নিশ্চয়ই বিশেষ প্রয়োজন হয়েছে। সে দরজায় তালা লাগিয়ে টুনিকে অনুসরণ করল।
দরজা ভেজানো ছিল। সেটা খুলে টুনি বলল, ‘দাদা এসেছেন।’
‘এসো, ভেতরে এসো নবকুমার। টুনি, একবার খোঁজ নে তো, গীতিময়দা ফিরে এসেছেন কি না। আর খাবারটা দশটার সময় দিতে বল।’ বিদিশা বলল।
টুনি মাথা নেড়ে সরে দাঁড়ালে নবকুমার ভিতরে ঢুকল—’কী ব্যাপার?’
‘দরজাটা ভেজিয়ে দাও, বড্ড ঠান্ডা।’ বিদিশা বিছানার ওপর বসেছিল। পাশে টেবিল, টেবিলের গায়ে চেয়ার।
দরজা ভেজিয়ে নবকুমার জিজ্ঞাসা করল—’কিছু হয়েছে?’
‘অ্যাঁ। কী আবার হবে! বোর হচ্ছিলাম। আউটডোরে এলে এই সমস্যা হয়। তাই তোমাকে ডেকে আনলাম। ডিনার অবধি গল্প করব। বসো না।’
নবকুমার বলল—’তাড়াতাড়ি না শুয়ে পড়লে অত ভোরে ওঠা যাবে না।’
‘দূর। রাত দুটোয় শুয়েও পাঁচটায় উঠতে হয় অভিনয়ে এলে। দেখবে, এটাও তোমার অভ্যেস হয়ে যাবে।’ বিদিশা হাসল—’বাড়িতে কে কে আছে?’
‘মা-বাবা।’
‘কলকাতায়?’
‘না। গ্রামে থাকেন। কলকাতায় আমি একা থাকি।’
এইসময় টুনি ঘরে ফিরে এল—’না, ওর এখনও ঘরের দরজা বন্ধ।’
‘তা হলে ওখানেই বসে গিয়েছে। খাবারের কথা বলেছিস?’
‘হ্যাঁ। এখানে সাড়ে ন’টার পর কিচেন বন্ধ হয়ে যায়।’
‘অ!’ বিদিশা একটু অখুশি হল—’নে, বের কর।’
নবকুমার দেখল টুনি ঝুঁকে একটা সুটকেস থেকে বোতল বের করল। তারপর গ্লাস, জল এবং কাজুবাদাম টেবিলের ওপর বোতলের পাশে সাজিয়ে দিল।
‘তুমি তো ড্রিঙ্ক করো না।’ বোতল খুলতে খুলতে বিদিশা বলল।
‘না।’
‘কখনও টেস্ট করোনি?’
‘না।’
‘এই হুইস্কির নাম শিভাস রিগাল। স্কটল্যান্ডে তৈরি হয়।’
‘ও। অনেক দাম?’ নবকুমার খুব অবাক হচ্ছিল।
‘তা দামি তো বটেই। ভালো জিনিসের দাম হবে না! আমি তো রোজ একা একা খাই। খুব বিরক্ত লাগে।’ গ্লাসে ঢালছিল বিদিশা।
‘তুমি রোজ খাও?’
‘ওই আর কী। রাত্রে কাজ না থাকলে সময় কাটতে চায় না। আজ তুমি আমাকে একটু সঙ্গ দেবে?’
‘আমি তো বসে আছি।’
‘ওরে পাগল, আমার সঙ্গে একটু না হয় খাও।’
‘না, না।’
‘কেন?’
‘সিনেমায় নামলে লোকের চরিত্র ঠিক থাকে না। মদ খায়।’
জোরে হেসে উঠল বিদিশা—’একথা তোমায় কে বলল?’
‘সবাই তো বলে!’
‘শোনো, মদ হল আগুনের মতো। তাকে ঠিকঠাক ব্যবহার করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। আর তুমি যদি আগুনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দাও, তা হলে তো পুড়ো মরবেই। আধ পেগ খাও, সারাজীবন আমাকে মনে থাকবে।’
‘না, না। আমার নেশা হয়ে যাবে।’
‘ওকে।’ হুইস্কিতে জল মিশিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ানোর আগে বিদিশা অদ্ভুত গলায় বলল, ‘আনন্দ।’
নবকুমার দেখল, তার সঙ্গে স্বাভাবিক গলায় গল্প করে যাচ্ছে বিদিশা। গ্রামে কী করত, কীভাবে সে কলকাতায় এল, সব কথা একটু একটু করে জেনে নিল বিদিশা। নবকুমার বলল, ‘আচ্ছা, তুমি আমার সব কথা জেনে নিলে, তোমার কথা বলছ না কেন?’
বিদিশা হাসল—’এখন রাত কত হয়েছে জানো? ন’টা বেজে গিয়েছে। এবার নিজের ঘরে যাও। ওরা খাবার দিতে এসে দরজা বন্ধ দেখলে তোমাকে সারারাত না খেয়ে থাকতে হবে। গুড নাইট।’
ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে নবকুমার দেখল, টুনি পাশের খাটে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়েছিল, এবার উঠে বসল।
ঘুম আসছিল না। অন্তত চারবার সে বিদিশাকে গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে দেখেছে। কিন্তু মাতাল হওয়া দূরের কথা, ওর কথা একটুও জড়ায়নি। অথচ গ্রামের ভাটিখানায় দুই গ্লাস মদ খেয়ে অনেকেই যে মাতলামি করে, তা সে নিজের চোখে দেখেছে। তা হলে কি বিদেশি দামি হুইস্কি খেলে নেশা হয় না? তা হলে খায় কেন? আখের রস, লেবুর শরবত আর দামি হুইস্কিতে কোনও পার্থক্য নেই? হতেই পারে না। হয়তো পরে নেশা হবে। তখন মাতাল হয়ে যাবে বিদিশা। সেটা যাতে সে দেখতে না পায়, তাই তাড়াতাড়ি বিদায় করে দিল।
বিদিশা তাকে খেতে অনুরোধ করেছে, কিন্তু জোর করেনি। কিন্তু ও রোজ কেন মদ খায়? ও কি বিবাহিতা নয়? হলে ছেলেমেয়ে হয়নি? বিদিশা বলেছে, শুটিং না থাকলে রাত্রে সময় কাটতে চায় না বলে ও মদ খায়। তা হলে ওর স্বামী বা সন্তান নেই। বাড়িতে একাই থাকে। কিন্তু বিদিশার একটা ব্যক্তিত্ব আছে। ওর সঙ্গে কথা বললে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
জায়গাটার নাম জলাপাহাড়। সেখানেই দুপুর অবধি শুটিং চলল। তারপর লাঞ্চ ব্রেক। আজ বড়বাবু শুটিং-এ আসেননি। মেয়েকে নিয়ে সাইট সিয়িং-এ গিয়েছেন। লাঞ্চের সময় ঊর্মিলা ইশারায় কাছে ডাকল—’মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা হচ্ছে?’
‘মানে?’
‘আহা, শুনলাম যে চুমু খাবে, সে নাকি শর্ত দিয়েছে, চারবেলা মাউথওয়াশে মুখ না ধুলে ক্যামেরার সামনে চুমু খাবে না। আমি হলে প্রতিবাদ করতাম।’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে কথাগুলো বলল ঊর্মিলা।
প্রোডাকশনের লোক এসে একটা ট্রে-তে চিকেন স্যুপ আর টোস্ট ঊর্মিলাকে দিয়ে গেল। যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করল—’দাদা, আপনার খাবার কি এখানে দিয়ে যাব?’
‘না। আমি যাচ্ছি।’
লোকটা চলে গেলে পা বাড়াচ্ছিল নবকুমার—ঊর্মিলা বলল, ‘কাল কীরকম হল?’
‘কীসের কীরকম?’
‘আরে মশাই, টালিগঞ্জের সবাই জানে, উনি রাত্রে হুইস্কি না খেয়ে ঘুমাতে পারেন না। আপনি ওঁর ঘরে যাননি?’
‘আমি মদ খাই না আর অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামাই না।’ নবকুমার আর দাঁড়াল না। ঊর্মিলা-র কথা বলার ধরন তার খুব খারাপ লাগল। মনে হচ্ছিল, ঊর্মিলা ছবির নায়িকা নয়, সে-ই খলনায়িকা।
লাঞ্চের পরে বড়বাবু এলেন। সঙ্গে মেয়েকে আনেননি। নবকুমার ছাড়া সকালের শিল্পীদের প্যাক-আপ করে দেওয়ায় ঊর্মিলাও হোটেলে ফিরে গিয়েছিল। বিদিশা এল মেক-আপ নিয়ে। খুব আকর্ষণীয়া দেখাচ্ছিল তাকে। গীতিময় দৃশ্যটি বুঝিয়ে দিল। রাস্তার পাশের বেঞ্চিতে গম্ভীর মুখে বসে থাকবে বিদিশা। সামনেই বিশাল খাদ, খাদের অনেক দূরে আবার পাহাড়। বিদিশা সেই খাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এইসময় খুব ব্যস্ত হয়ে নবকুমার সেখানে আসবে। এসে জিজ্ঞাসা করবে—’এ কী! তুমি এখানে? আমি তোমাকে…’—এটুকু বলামাত্র বিদিশা উলটোমুখ করে বসবে।
দৃশ্যটি নেওয়ার আগে নবকুমারকে আর একটা শার্ট পরিয়ে দিল ড্রেসার।
প্রথম শট নেওয়ার মধ্যেই চিৎকার করে উঠলেন গীতিময়—’কাট, কাট। নবকুমার, তুমি কি গরু খুঁজতে এখানে এসেছ? বিদিশা তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছে, এটা জেনে তুমি পাগল হয়ে খুঁজতে এসেছ। সেই এক্সপ্রেশন তোমার গলায় কোথায়? মুখেও নেই। আবার যাও।’
দূরে দাঁড়িয়ে বড়বাবু বললেন, ‘ঠিক, একদম ঠিক।’
তৃতীয়বারে গীতিময় খুশি হলেন—’ওকে। এবার তুমি বেঞ্চিতে এসে বসবে। ডায়ালগ—’ চিৎকার করলেন গীতিময়।
সহকারী পরিচালক নবকুমারকে সংলাপ মনে করিয়ে দিল।
দৃশ্যটিতে নবকুমার বিদিশা-র মান ভাঙানোর অনেক চেষ্টা করেও যখন সফল হচ্ছে না, তখন বিদিশা ঘুরে বসবে। বলবে, ‘কী করলে তুমি আমাকে মুক্তি দেবে? আমার শরীর একবার পেলে খুশি হয়ে ছেড়ে দেবে তো?’
গীতিময় মাথা নাড়লেন—’না, না, এটা চেঞ্জ করছি। বিদিশা এই সংলাপ বলবে না। তুমি ঘুরে বসবে, দু-হাতে নবকুমারের গলা জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরবে। তারপর মুখ সরিয়ে নিয়ে বলবে—”হয়েছে তো? খুশি? এবার আমাকে মুক্তি দাও, প্লিজ”, বুঝেছ?’
বিদিশা বলল, ‘এটা আগেরটার থেকে অনেক বেটার।’
গীতিময় চিৎকার করলেন—’ওকে, স্টার্ট ক্যামেরা, অ্যাকশন।’
