ক্যালকাতায় নবকুমার – ২৭ (শেষ)

সাতাশ

এখানে কোনও বসার ব্যবস্থা নেই। করিডরের প্রায় শেষাশেষি একটা বড় দরজা, যা ভিতর থেকে বন্ধ। এইসময় ওপাশ থেকে একজন সিস্টার ব্যস্ত পায়ে এসে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন দেখে নবকুমার মুখ খুলল—’সিস্টার, একমিনিট।’

সিস্টার মুখ ফেরালেন। নবকুমার কাছে গিয়ে বলল, ‘আমার মায়ের এখন অপারেশন হচ্ছে। ডক্টর চ্যাটার্জি করছেন। আমাদের আসতে বলা হয়েছে এখানে, কিন্তু কোথায় অপেক্ষা করব?’

‘অপারেশন হয়ে গেলেই খবর পাবেন।’ সিস্টার ভিতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বাবার কাছে ফিরে এল নবকুমার—’ওদিকে চলো, নিশ্চয়ই ওয়েটিং রুম আছে। এখানে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে?’

‘সামনের ওই ঘরে কি অপারেশন হচ্ছে?’ বাবা জিজ্ঞাসা করল।

দরজার ওপরে আলো জ্বলতে দেখল নবকুমার। বলল, ‘মনে হয়, তাই!’

‘তা হলে আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকি। দাঁড়াতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না আমার। তুই ইচ্ছে হলে অন্য কোথাও গিয়ে বসতে পারিস।’ বাবা বলল।

নবকুমার দু’পা সরে গেল। মাঝে মাঝে বাবাকে খুব জেদি মনে হয়। সে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করতেই দেওয়ালে টাঙানো নির্দেশের কথা মনে পড়ল। নার্সিংহোমের ভিতরে মোবাইল ফোন সুইচ অফ করে রাখতে বলা হয়েছে। নবকুমার দ্রুত কাজটা করল। এইসময় একটা লোক দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসে উলটোদিকে হাঁটতে শুরু করলেই নবকুমার তাকে আটকাল—’আমার মায়ের অপারেশন কি এখনও চলছে?’

‘আপনার মা মানে?’

‘ডক্টর চ্যাটার্জি যাঁকে অপারেট করছেন।’

‘ও, হ্যাঁ। হয়ে গেলে তো উনি বেরিয়ে এসে কথা বলবেন।’ বলে লোকটা চলে গেল নিস্পৃহ ভঙ্গিতে। নবকুমারের মনে হল, হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের মন মানুষের কষ্ট দেখে দেখে শক্ত হয়ে যায়। এখন একমিনিটকেও মনে হচ্ছিল অনেক সময়। অথচ ওই বন্ধ দরজার ওপাশের কোনও ঘরে মায়ের শরীরকে ঘিরে ডক্টর চ্যাটার্জি এবং তাঁর সহযোগীরা ব্যস্ত হয়ে আছেন, কিন্তু সে-একজনকেই ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে, তা হলে বাবাকেই যেতে দিতে হত।

মা নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে রয়েছে। একেই শরীর রোগা, বেশিক্ষণ জ্ঞান না থাকলে কোনও ক্ষতি হবে না তো? নবকুমার পায়চারি করতে লাগল। এইসময় একজন নার্স বাইরে থেকে এসে হেঁটে যেতে যেতে তাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন—’এক্সকিউজ মি, আপনি নবকুমার না?’

চকিতে বাবার দিকে তাকাল নবকুমার। বাবার মুখে বিরক্তি। সে কোনও কথা না বলে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। নার্স ঝকঝকে হাসি হাসলেন—’ক’দিন ধরে পোস্টারে, হোর্ডিং-এ আপনাকে দেখে দেখে চিনে ফেলেছি। আজই তো আপনার ছবি রিলিজ করছে। কিন্তু আপনি এখানে কেন? কারও অপারেশন হচ্ছে?’

‘হ্যাঁ। আমার মায়ের।’ নবকুমার বলল, ‘ডক্টর চ্যাটার্জি করছেন।’

‘ঠিক আছে। আমি দেখছি।’ নার্স বন্ধ দরজা ঠেলে ভিতরে চলে গেলেন।

আধঘণ্টা পরে ডক্টর চ্যাটার্জিকে দরজার এপাশে আসতে দেখল ওরা। নবকুমার এবং তার বাবা দ্রুত কাছে যেতেই তিনি নীচু গলায় বললেন, ‘অপারেশন হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমরা যা করার সব করছি। ঠিক আছে।’

বাবা বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই তো?’

ডক্টর চ্যাটার্জি কথা না বলে মাথা নেড়ে ঠিক কী বললেন, তা বোঝা গেল না। তারপর বললেন, ‘আপনারা নীচে গিয়ে অপেক্ষা করুন। দরকার হলে খবর দেব, তখন আসবেন।’ কথাগুলো বলে ডক্টর চ্যাটার্জি আবার বন্ধ দরজা ঠেলে ভিতরে চলে গেলেন।

নবকুমার বাবার দিকে তাকাল। বাবার চোখের কোণে জল চকচক করছে। সে বাবার হাত ধরল—’বাবা!’

বাবা চোখ বন্ধ করল।

‘চলো, নীচে গিয়ে বসি।’

বাবা প্রতিবাদ করল না।

নীচের হলঘরে পাশাপাশি চেয়ার খালি পাওয়া যায়নি। খানিকটা দূরে বসে নবকুমার দেখল, বাবার মুখ ঝুঁকে রয়েছে। ঠোঁট দুটো নড়ছে। বেশ বোঝা গেল, বাবা ঠাকুরের নাম জপ করে চলেছে। হঠাৎ শরীরটা কীরকম দুর্বল হয়ে গেল নবকুমারের। পেটের ভিতরটা গুলিয়ে উঠল। মনে হল, কিছু খেলে বোধ হয় ভালো লাগবে। নার্সিংহোমের ক্যান্টিনে যাওয়া যেতে পারে। সে বাবার দিকে তাকাল। বাবাকে খাওয়ার কথা বলা যাবে না। আর বাবাকে সঙ্গে না নিয়ে গিয়ে খাওয়াও সম্ভব নয়।

একঘণ্টা পরে রিসেপশনিস্ট জানাল—ডক্টর চ্যাটার্জি এখনও ও.টি.-তে আছেন, পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিকাল। বাবার প্রশ্নের উত্তরে ভদ্রমহিলা বিশদ জানাতে পারলেন না। সাড়ে এগারোটা নাগাদ নবকুমার যখন চোখ বন্ধ করে বসে আছে, তখন মনে হল, কেউ যেন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—সে চোখ খুলেই ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল—’এ কী! আপনি?’

‘আমি তোমাকে এখানে গরু-খোঁজা খুঁজছি, আর তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছ?’ গীতিময়দা জিগ্যেস করলেন—’অপারেশন হয়ে গিয়েছে?’

‘হ্যাঁ, মানে…’

নবকুমারকে থামিয়ে দিলেন গীতিময়—’এখন তো কথা বলতে পারবেন না। কখন সেন্স ফিরবে ডাক্তার কিছু বলেছেন?’

‘না।’

শোনো, সাড়ে পাঁচটায় স্টুডিওর গাড়ি তোমাকে নিতে আসবে। আসামাত্র রওনা হবে। আরে, কাল থেকে দিনরাত এখানে পড়ে থেকো, আজ শো-এর আগে তোমাকে স্টেজে উঠতেই হবে। মনে থাকে যেন। চললাম।’ গীতিময়দা দ্রুত চলে গেলেন।

দুপুর একটায় খবরটা এল। মা নেই!

সমস্ত অনুভূতি যেন একমুহূর্তে ভোঁতা হয়ে গেল। বাবা সামনে এসে দাঁড়াতেই নবকুমার তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। বাবা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কান্না গিলতে গিলতে নবকুমার বলল, ‘এখানে এনে কী লাভ হল? গ্রামে থাকলেও যা হত, এখানে এনেও তাই হল।’

বাবা ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘ঠিক বলছিস না। এখানে নিয়ে এসে তুই অনেক চেষ্টা করলি, গ্রামে থাকলে তো কোনও চেষ্টাই হত না।’

আধঘণ্টা পরে নার্সিংহোমের সামনে গিয়ে নবকুমার বড়বাবুর মোবাইল নাম্বার টিপে শুনতে পেল—সুইচ অফ করা আছে। সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের ফোন বেজে উঠতেই মন্দাক্রান্তার নাম পর্দায় দেখতে পেল। ফোন অন করতেই শুনতে পেল—’তুমি কোথায়?’

চাপা পড়ে থাকা কান্নাটা আবার ছিটকে বের হল—’মা চলে গেল।’

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘এইমাত্র খবরটা পেলাম। ডক্টর চ্যাটার্জি খুব চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তোমার মায়ের ব্লাডপ্রেশার খুব দ্রুত ফল করে গিয়েছিল। তোমার বাবা কোথায়?’

‘আছে, এখানেই।’

‘শোনো নবকুমার, যা বাস্তব তা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। তুমি কি এর আগে প্রিয়জনের মৃত্যু দেখেছ?’ মন্দাক্রান্তা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘না। গ্রামে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁরা আত্মীয় ছিলেন না।’

‘ওঃ! তুমি নিশ্চয়ই তোমার মাকে গ্রামে নিয়ে যাবে না?’

‘এখনও এ-নিয়ে কথা হয়নি।’

‘তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলো। কলকাতার শ্মশানে নিয়ে গিয়ে শেষ-কাজ করতে হলে আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি। আমার পরিচিত একজন পাগলাটে মানুষ আছেন, যিনি এইসব কাজ করতে খুব মজা পান। ওঁর নাম বিশুমামা। ওঁকে বলছি একঘণ্টার মধ্যে নার্সিংহোমে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করতে।’ মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘ঠিক আছে নবকুমার। বাই।’

ফোনে লাইন ছিন্ন হওয়ার পর নবকুমারের মনে পড়ল, আজ অবধি মন্দাক্রান্তা কখনওই তাকে ‘বাই’ বলে কথা শেষ করেননি।

মায়ের শরীর যে ঘরে এনে রাখা হয়েছিল, সেখানে বাবাকে নিয়ে গেল নবকুমার। সাদা কাপড়ে মাকে ঢেকে রাখা হয়েছে। ওপরের কাপড় সরালে মুখ দেখা গেল। কাগজের মতো সাদা, চোখ বন্ধ। বাবা মায়ের শরীরের পাশে হাতজোড় করে দাঁড়িয়েছিল। বেঁচে থাকার সময় এরকম দৃশ্য দেখলে মা খুব রেগে যেত। অবশ্য সেরকম ঘটনা কখনও ঘটেনি। নবকুমার নীচু হয়ে মায়ের কপাল স্পর্শ করল। এখনও প্রায় স্বাভাবিক। গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে থাকা একটা মানুষকে দেখতে যেমন লাগে, মাকে এখন সেইরকম দেখাচ্ছে। হঠাৎই নবকুমারের মনে হল, এখন মায়ের কোনও কষ্ট যেমন নেই, আনন্দও নেই। কারণ মরণ এসে মনকে নিয়ে চলে গিয়েছে। কাঁপুনি এল শরীরে।

বিশুমামা কাজ করেন ঝড়ের গতিতে। নার্সিংহোমে এসে নবকুমারের সঙ্গে কথা বলে এত দ্রুততার সঙ্গে সব ব্যবস্থা করে ফেললেন যে, তাল রাখতে হিমশিম খাচ্ছিল সে। নার্সিংহোমের অফিসের কাজকর্ম শেষ করে, ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে মৃতদেহ বহন করার গাড়িতে মাকে শুইয়ে দেওয়ার পরে তিনি কোথা থেকে ফুলের মালা জোগাড় করে পরিয়েও দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন—’কোন শ্মশানে যেতে চান?’

নবকুমার বাবার দিকে তাকাল। বাবা দুর্বল গলায় বলল, ‘এখানকার কোথাও…’

‘ওকে। উঠে বসুন গাড়িতে। আমরা কেওড়াতলায় যাব। আগে হলে প্রচুর লোকজন লাগত, এখন কিস্যু দরকার নেই। অনলাইনেও সৎকার করা যায়।’ বিশুমামা গম্ভীর গলায় বললেন।

কেওড়াতলা শ্মশানে পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পর যা যা করণীয়, তা বিশুমামাই করলেন। মায়ের পাশে বসেছিল ওরা। কাছে এসে বিশুমামা বললেন, ‘সকাল থেকে পেটে কিছু দিয়েছেন? উলটোদিকে একটা কচুরি-তরকারির দোকান আছে, দারুণ করে, খেয়ে আসুন।’

বাবা বলল, ‘হবে, সবই তো হবে।’

এইসময় নবকুমারের মোবাইল জানান দিল। সে পকেট থেকে যন্ত্রটা বের করে দেখল—গীতিময়দা। বোতাম টিপতেই গীতিময়দার চিৎকার কানে এল—’তুমি কোথায়?’

‘শ্মশানে।’

‘অ!’ একটু যেন থমকে গেল গলা—’যাচ্চলে।’

তারপর গীতিময়দার গলা শুনতে পেল নবকুমার। কাউকে বলছেন, ‘ওর মা মারা গিয়েছেন। ডেডবডি নিয়ে শ্মশানে গিয়েছে।’ যাকে বললেন, তিনি গম্ভীর গলায় কিছু বললেন। ভালো করে শুনতে না পেলেও নবকুমারের মনে হল, ওটা বড়বাবুর গলা।

গীতিময়দা এবার বললেন, ‘সরি নবকুমার। তবে কী জানো, বাবা-মা তো চিরকাল থাকেন না। জন্মিলেই মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে। আমার মা-ও মারা গিয়েছেন। তোমার মা কত নাম্বারে আছেন?’

‘মানে?’ বুঝতে পারল না নবকুমার।

‘মানে, ওঁর আগে ক’জন আছেন?’

‘আছেন কয়েকজন।’

‘ঠিক আছে। তোমার সঙ্গে নিশ্চয়ই লোকজন আছেন। যদি ছ’টার মধ্যে চুল্লিতে চলে যান, তা হলে সোজা প্রিয়া সিনেমায় চলে আসবে। আমি শ্মশানে গাড়ি পাঠাচ্ছি। শো-এর আগে মঞ্চে তোমার থাকা দরকার।’ গীতিময়দা বললেন, ‘এভাবে বলতে আমার একটুও ভালো লাগছে না। কিন্তু প্রোডিউসারের কথা ভেবে বলতে হচ্ছে। আমাকে ইনহিউম্যান ভেবো না। রাখছি।’

চোখের সামনে থেকে মায়ের শরীর আড়ালে চলে গেল। তার আগে বিশুমামার নির্দেশে পুরুতমশাই যা যা করানোর, তা করালেন। বাবার চোখ বন্ধ। জলের ঢল নেমেছে গালে। এখন মায়ের জন্য তো বটেই, বাবার জন্যও খুব কষ্ট হচ্ছিল নবকুমারের। সে হাত বাড়িয়ে বাবার হাত ধরল।

সময় বয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে একজন লোক এসে নবকুমারের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘দাদা, গাড়ি নিয়ে এসেছি। কখন যাবেন?’

নবকুমার খুব জোরে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল। লোকটা হকচকিয়ে সরে গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কথা বলতে লাগল।

সময় বয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মায়ের শরীর ছাই হয়ে গেল। সব দুঃখ, কষ্ট, আনন্দের অনেক ওপরে এখন মা। বিশুমামা সাহায্যের হাত বাড়ালেন। দাহের পর সন্তানকে যা যা করতে হয়, তা করালেন। তারপর বললেন, ‘ওপাশে গিয়ে জামাপ্যান্ট বদলে এইগুলো পরে ফ্যালো।’ বিশুমামার হাতের প্যাকেট থেকে নতুন কাপড় বের হল। ঠিক তখনই গলা ভেসে এল—’যদি খুব অসম্ভব না হয়, তা হলে ওগুলো ঘণ্টাখানেক পরে কি পরা যায়?’

নবকুমার চমকে পিছন ফিরে তাকাতেই গীতিময়দাকে দেখতে পেল। গীতিময় কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রাখলেন—’আর ঠিক কুড়ি মিনিট পরে প্রিমিয়ার শো শেষ হবে। যা দেখে এবং শুনে এসেছি, তাতে মনে হচ্ছে, পাবলিক তোমাকে একবার স্টেজে দেখতে চাইবেই। এটা যে কতটা জরুরি, তা তুমি ভবিষ্যতে বুঝতে পারবে। কিন্তু ওই ধড়াচুড়ো পরা অবস্থায় স্টেজে উঠলে পাবলিক খুব ধাক্কা খাবে, এটা ঠিক হবে না নবকুমার।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করল—’আপনি কে?’

নবকুমার বলল, ‘ইনি পরিচালক, গীতিময়দা।’

গীতিময় নবকুমারের হাত ধরলেন—’প্লিজ, তুমি একটিবারের জন্য চলো। যাবে আর আসবে। নইলে আমি খুব বিপদে পড়ব।’

নবকুমার বাবার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু বলার আগেই বিশুমামার গলা শুনতে পেল—’ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখানে যা করার, তা তো করা হয়ে গিয়েছে। মাত্র একটা ঘণ্টা তো, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। আমরা অপেক্ষা করছি, ঘুরে আসুন।’

বাবা বলল, ‘শ্মশান থেকে কাছা না নিয়ে বেরোবে?’

‘কোনও ফারাক নেই, এসে নেবেন। আপনি নিতে না চাইলে মূল্য ধরে দিতেও পারেন।’ পাশে দাঁড়ানো পুরুত গায়ে পড়ে মত জানাল।

গাড়ি ছুটছিল সিনেমা হল-এর দিকে। নবকুমার অবাক হয়ে দেখল, গীতিময় ড্রাইভারের পাশে বসেছেন, পিছনে সে একা। বাবার কথা মনে এল। আসার সময় বাবাকে বলে আসা হল না।

নবকুমার হল-এ ঢুকে দোতলায় উঠতেই বড়বাবুকে দেখতে পেল। তাকে দেখে এগিয়ে এসে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তখনই ছবি ভাঙল। গীতিময় নবকুমারের হাত ধরে টানতে টানতে হল-এর ভিতর ঢুকে স্টেজে উঠে এসে মাইকে ঘোষণা করলেন—’বন্ধুগণ, আপনাদের সামনে এই ছবির নায়ক নবকুমার উপস্থিত হয়েছেন।’ সঙ্গে সঙ্গে তুমুল চিৎকার, হাতের আস্ফালন, আরও কাছ থেকে দেখার জন্য দর্শকরা স্টেজের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। গীতিময় মাইকে বললেন, ‘নবকুমারের মা আজ মারা গিয়েছেন। তা সত্ত্বেও উনি আপনাদের টানে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকশো কণ্ঠ চেঁচাতে লাগল—’নবকুমার! নবকুমার!’ এবার নবকুমার হাত নাড়ল, হাসল।

এই মুহূর্তে ফিল্মস্টার নবকুমারের জন্ম হয়ে গেল।

জীবন হঠাৎ পালটে গেল।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *