ছাব্বিশ
বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বিছানা ছেড়ে যখন নেমে এল, তখনও কলকাতায় হালকা অন্ধকার। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল নবকুমার। নীচের রাস্তার আলো এখনও নেভেনি। আকাশ নীলে মোলায়েম হয়ে রয়েছে। আচমকা শ্বাস ফেলল সে—আজ কী হবে?
হঠাৎ কীরকম ভয় ভয় ভাব মন এবং মন থেকে শরীরে ছড়িয়ে গেল। যদি সব খারাপ হয়? ডক্টর নন্দী যতই বলুন, যদি মায়ের খারাপ কিছু হয়ে যায়? সঙ্গে সঙ্গে বাবার কথা মনে এল। তা হলে বাবার কী হবে? সে মাথা নাড়াল—না, খারাপ হতেই পারে না। ডক্টর চ্যাটার্জি-র কাছে এইরকম অপারেশন কিছুই নয়। হয়তো তিনদিন পরে মাকে নার্সিংহোম থেকে ছেড়ে দেবে। ছেড়ে দিলে মাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবে সে। বাবা যদি গ্রামে নিয়ে যেতে চায়, তা হলে সে কিছুতেই রাজি হবে না। অপারেশনের পরে যদি কোনও সমস্যা হয়, তা হলে সেটার সমাধান কলকাতায় থেকে করা সম্ভব, গ্রামে থাকলে কিছুই করা যাবে না।
তার পরেই দ্বিতীয় ভয়টা প্রবল হল। আজ ‘পদ্মপাতায় জল’ মুক্তি পাচ্ছে। কাল রাত্রে প্রোডাকশন ম্যানেজার বারংবার ফোনে বলেছে, অন্তত আধ ঘণ্টা আগে সে যেন হল-এ পৌঁছে যায়। গেটের সামনে সবাই থাকবে, কোনও অসুবিধে হবে না। বিকেলে মাকে দেখে সে সটান হল-এ চলে যাবে। কিন্তু ছবিটা যদি দর্শকদের ভালো না লাগে? যদি তার অভিনয় দর্শকরা অপছন্দ করে? গীতিময়দা যতই বলুন, ‘আমি তোমাকে অভিনয় করতে দিইনি, তোমাকে নিয়ে বিহেভ করিয়েছি, তুমি যা, তা-ই ছবিতে রেখেছি বলে চরিত্রটা ফুটেছে।’—কিন্তু লোকে তো কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনও রাখে। নিজের ছবিকে গীতিময়দা তো ভালো বলবেনই।
প্রথমদিন পুরো বোঝা না গেলেও দু’তিনদিনের মধ্যে বোঝা যাবে, ছবির টিকিট বিক্রি মুখ থুবড়ে পড়ছে কি না। যদি একসপ্তাহে ছবি হল থেকে উঠে যায়, তা হলে বড়বাবুর এই ফ্ল্যাট তাকে ছাড়তেই হবে। তাকে রাস্তায় বের করে দিতে একটুও দ্বিধা করবেন না। অপারেশনের পর মাকে যদি সে এই ফ্ল্যাটে নিয়ে আসে, তা হলে তখন কী করবে? কোথায় নিয়ে রাখবে মাকে?
বড়বাবু কি সত্যিই অত নির্দয় হবেন? যার অপারেশনের জন্য তিনি অত টাকা নার্সিংহোমে কাউকে না জানিয়ে জমা দিলেন, তাকে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দিতে পারবেন? না, হতেই পারে না। ওঁর মনে যে দয়ামায়া আছে, তার প্রমাণ তো পাওয়াই গিয়েছে। কিন্তু…।
—মাথা নাড়ল নবকুমার। বড়বাবু তাকে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া দেখাননি। তিনি টাকা দিয়েছেন মন্দাক্রান্তাকে টেক্কা দিতে। তাঁর ধারণা ছিল, নবকুমার মন্দাক্রান্তার স্নেহধন্য। মন্দাক্রান্তা সুসময়ে নবকুমারের জন্য বড়বাবুর কাছে তদবির করেছেন। তাঁর আবদারে নবকুমারকে সুযোগ দিয়েছিলেন বড়বাবু। কিন্তু ওঁদের সম্পর্ক যখন খারাপ হল, তখন বড়বাবুর সন্দেহ হয়েছে, মন্দাক্রান্তা নবকুমারকে কি স্নেহ করেন, না অন্য কোনও সম্পর্ক ওদের মধ্যে আছে? আর এই সন্দেহ মাথায় আসতেই নবকুমারকে সহ্য করতে পারছিলেন না। শেষে উলটো চাল দিয়েছেন। মায়ের অপারেশনের টাকা জোগাড় করতে না পেরে নবকুমার যখন দিশেহারা, তখন টাকাটা দিয়ে ওকে কিনতে চেয়েছেন। কেন দিয়েছেন, তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি মন্দাক্রান্তার। খবরটা শুনে তাঁর ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। মন্দাক্রান্তা বড়বাবুর টাকা ফেরত দিতে বলেছিলেন।
নবকুমার জানে না ‘পদ্মপাতায় জল’ ছবিতে মন্দাক্রান্তা-র ভূমিকা কী? শুটিং-এর সময় শুনেছে মন্দাক্রান্তাও নাকি আংশিক প্রযোজনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি যখন আসেন, তখন সবাই খুব সম্মান দেখায় তাঁকে। সে সময় বড়বাবুও এমন ভাব দেখান যেন তাঁদের মধ্যে কোনও অপ্রীতিকর সম্পর্ক নেই। সামনে-পিছনে যে এমন আলাদা ব্যবহার করা যায়, তা কলকাতায় আসার আগে কাউকে করতে দ্যাখেনি নবকুমার। কিন্তু তার অভিনয় দর্শকের যদি ভালো না লাগে, তা হলে তো কথাই নেই, ছবিও যদি খারাপ লাগে, তা হলে বড়বাবু যে কতখানি নির্মম হবেন, তা সে আন্দাজ করতে পারছে।
দরজায় শব্দ হল। নবকুমার ঘরে ঢুকে দরজা খুলে অবাক হয়ে দেখল, বাবা দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এর মধ্যেই স্নান সেরে নিয়েছে বাবা।
‘তুমি এখনই স্নান করে নিলে?’ নবকুমার প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ। তুই কখন নার্সিংহোমে যাবি?’
‘আটটার মধ্যে গেলেই তো হবে।’
‘তোর মাকে কখন অপারেশন করতে নিয়ে যাবে?’
‘আমি জিজ্ঞাসা করিনি। তার আগে নিশ্চয়ই নয়।’
‘বলা যায় না।’ বাবা মাথা নাড়ল—’ঠিক আছে, আমি বেরুচ্ছি।’
‘বেরুচ্ছি মানে?’ এই ভোরে কোথায় যাচ্ছ তুমি?’ নবকুমার অবাক।
‘আলো তো ফুটে গিয়েছে। বাসের আওয়াজ পেলাম। আমি প্রথমে কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে যাচ্ছি। তারপর সেখান থেকে নার্সিংহোমে তোর অনেক আগেই পৌঁছে যাব।’ বাবা বলল।
‘তা হলে একটু দাঁড়াও, কিছু খেয়ে যাও।’
‘না, মায়ের বাড়িতে উপোস করেই যাব। অপারেশন হয়ে গেলে নার্সিংহোমের ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নিলেই হবে। আচ্ছা, চলি।’ বাইরের দরজা খুলে বাবা বেরিয়ে গেল।
ওই সময় লিফটম্যানের থাকার কথা নয়। বাবা নিজে লিফট চালাবে না। অতগুলো সিঁড়ি ভেঙে তাকে নামতে হবে। হঠাৎ নবকুমারের মনে হল, মায়ের বেঁচে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়াটা বাবার জন্য খুব জরুরি। এই যে সে এতগুলো মাস গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় রয়েছে, মাঝে মাঝে ছাড়া মায়ের অভাব কতটুকু বোধ করেছে? মা-বাবা আছে, থাকবে—এটা ভেবে আর কোনও দুশ্চিন্তা করেনি। মায়ের আজ অপারেশন হবে বলে সে অবশ্যই নার্ভাস হয়ে আছে, কিন্তু বাবা যেমন মায়ের জন্য কালীঘাটে পুজো দিতে গেল, এটা তার মাথায় আসেনি। মন্দিরে গিয়ে পুজো দিলেই কারও অসুখ ভালো হয়ে যায় কি না, সে জানে না, কিন্তু এখন মনে হল, তার চেয়ে বাবা, মায়ের অনেক কাছের মানুষ।
সকাল সওয়া সাতটায় যখন নবকুমার নার্সিংহোমে যাওয়ার জন্য তৈরি, তখনই ফোনটা এল। গীতিময়দার গলা শুনতে পেল সে—’গুড মর্নিং নবকুমার।’
‘গুড মর্নিং।’ নবকুমার শুকনো গলায় বলল।
‘শোনো, আজ সকাল ন’টায় তৈরি থেকো। গাড়ি পাঠাচ্ছি।’
‘কেন?’
‘আরে। তোমাকে কেউ বলেনি? দ্যাখো কাণ্ড। আজ সকালে আমরা দক্ষিণেশ্বর যাব পুজো দিতে। আমার প্রথম ছবির পুজো ওখানে দিয়েছিলাম, হিট হয়েছিল।’
‘কিন্তু গীতিময়দা, আমি কী করে যাব?’
‘গাড়িতে চেপে যাবে। ভ্যানতারা করছ কেন?’
‘ওহো, আপনি বোধ হয় জানেন না, আজ সকালে আমার মায়ের পেটে অপারেশন হবে। সেসময় কি আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব?’
‘এ কী! আর দিন পেলে না? ছবির রিলিজের দিনেই মায়ের অপারেশন করাচ্ছ! এ খবর বড়বাবু নিশ্চয়ই জানেন না।’
‘জানেন।’
‘ভ্যাট। জানলে উনি বলতেন না তোমাকে নিয়ে দক্ষিণেশ্বর যেতে। কী যে সব হচ্ছে। যাকগে, সকালে তোমাকে আর যেতে বলি কী করে! প্রিমিয়ারের আগে স্টেজে উঠতে হবে, অন্তত আধ ঘণ্টা আগে হল-এ চলে এসো।’ বেশ বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিলেন গীতিময়দা।
কয়েক সেকেন্ড মাথা কাজ করছিল না নবকুমারের। বড়বাবু ভালো করেই জানেন, তাকে অপারেশনের সময় নার্সিংহোমে থাকতে হবে। তা সত্ত্বেও গীতিময়দাকে বলেছেন তাকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণেশ্বর যেতে। উনি কি ভুলে গিয়েছিলেন? হতে পারে। যিনি কাউকে জব্দ করতে দু’লক্ষ টাকা খরচ করে আনন্দ পান, তিনি কিছুতেই ভুলে যেতে পারেন না। এই মানুষটির পক্ষে করা সম্ভব নয়, এমন কিছু নেই।
নীচে নামতেই ওদের দেখতে পেল নবকুমার। এই বাড়ির লিফটম্যান এবং দারোয়ান। দুজনে কথা বলছিল, তাকে দেখে দারোয়ান কপালে আঙুল ছুঁইয়ে হেসে এগিয়ে এল—’দাদা, আমাদের দুটো করে পাস দিতে হবে।’
‘কীসের পাস?’ অবাক হল নবকুমার।
‘সিনেমার পাস। আপনার বই তো আজ মুক্তি পাচ্ছে। আপনি হিরো, চাইলে ওরা একশোটা পাস দিয়ে যাবে।’ লিফটম্যান বলল।
‘তোমাদের বোধ হয় ভালো লাগবে না।’
‘কী যে বলেন! আপনাকে পর্দায় দেখতে পাব। তার ওপর শুনেছি কিসিং সিন আছে।’ দারোয়ান লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল।
গম্ভীর হল নবকুমার—’আমি বলব, যদি দেয় তো পাবে।’ রাস্তার ওপাশে দাঁড়ানো ট্যাক্সিতে উঠল সে। এর মধ্যে রটে গিয়েছে ছবিতে কিসিং সিন আছে। বাবা-মায়ের মুখ মনে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। কী যে হবে!
মায়ের অপারেশন ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পর যদি নার্সিংহোম সাতদিন রেখে দেয়, তা হলে তার মধ্যেই সে বুঝে যাবে সিনেমায় তার ভবিষ্যৎ কী হবে। যদি ছবি ফ্লপ করে, তার অভিনয় যদি পাবলিক পছন্দ না করে, তা হলে ওই দিনসাতেক সময় তো পাওয়া যাবে। বড়বাবু চলে যেতে বললে তার মধ্যে একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে মাকেও রাখা যাবে।
কিন্তু কোথায়? ট্যাক্সি ড্রাইভারকে নার্সিংহোমের রাস্তা বলে দিয়েছিল সে। এখন ছুটন্ত ট্যাক্সিতে বসে বাইরের পৃথিবীর কথা ভুলে গিয়ে একটা আস্তানার হদিশ পেতে চাইছিল সে। শেফালি মায়ের সোনাগাছির বাড়ি যদি পাওয়াও যায়, তা হলেও মাকে ওখানে রাখা যাবে না। বাবা ওই পরিবেশে এক সেকেন্ডও থাকতে চাইবে না। মন্দাক্রান্তার কাছে সাহায্য চাওয়ার কথা ভেবেও পিছিয়ে গেল নবকুমার। কালকের পরে তো মন্দাক্রান্তার কাছে কিছু চাওয়ার মুখ আর নেই। কী করা যায়? ড্রাইভার বলল, ‘নার্সিংহোম এসে গিয়েছে।’
এই সকালে নার্সিংহোমে অনেক মানুষ এলোমেলো ছড়িয়ে। এঁদের মুখ দেখলেই বোঝা যায়, বেশ টেনশনে আছেন। এত মানুষের পেশেন্টরা নিশ্চয়ই আজ অপারেশনের টেবিলে যাবেন না। ভিতরে ঢুকল নবকুমার।
লিফটের সামনে যেতেই উর্দি-পরা একটি কর্মচারী বাধা দিল—’এখন ভিজিটিং আওয়ার নয়। অপেক্ষা করতে হবে।’
‘আমার মায়ের আজ সকালে অপারেশন হবে, ও.টি.-তে নিয়ে যাওয়ার আগে দেখা করতে চাই।’ নবকুমার বলল।
‘নাম কী? নাম্বার বলুন।’
নবকুমার সব বলার পর লোকটি বলল, ‘একজনের বেশি ছাড়ার অর্ডার নেই। পেশেন্টের স্বামী ওপরে গিয়েছেন দেখা করতে। তিনি নেমে এলে আপনি যেতে পারেন। ওখানে বসুন।’
ঢোক গিলল নবকুমার। বাবা এর মধ্যেই কালীঘাটে পুজো দিয়ে মায়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু সে যে অপারেশনের আগে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চায়, তা বাবা জানে। নিশ্চয়ই নীচে নেমে আসবে।
মিনিট দশেক পরে লিফটের দরজা খুলে গেলে বাবা বেরিয়ে এল। নবকুমারকে দেখে বলল, ‘ও, তুই এসে গিয়েছিস?’
‘আমি অনেকক্ষণ এসেছি।’ নবকুমার লিফটের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘উনি চলে এসেছেন, এবার আমি যেতে পারি?’
পিছন থেকে বাবার গলা ভেসে এল—’এখন গিয়ে কোনও লাভ হবে না। তোর মাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল একটু আগে।’
‘এত তাড়াতাড়ি নিয়ে গেল?’ প্রচণ্ড হতাশ হল নবকুমার—’এখনও তো অনেক দেরি আছে অপারেশনের।’
‘আমি জিজ্ঞাসা করতে বলল, এটাই নাকি নিয়ম।’ বাবা বলল।
নবকুমার লিফটম্যানকে জিজ্ঞাসা করল—’অপারেশন থিয়েটারে যাওয়া যাবে না? একবার দেখে আসব।’
লোকটা হাসল—’আপনি কি পাগল?’
প্রচণ্ড আফসোস হচ্ছিল নবকুমারের। বাবা যদি অন্ধকার থাকতে বেরিয়ে আসতে পারে, তা হলে কেন সে একঘণ্টা আগে এল না? তার মনে হল, ডক্টর নন্দী ইচ্ছে করলে তাকে মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে পারেন। সে বাবার দিকে তাকাল। গম্ভীর মুখ। দেখে মায়া লাগল। নবুকমার কাছে গিয়ে বলল, ‘চলো, ওই রিসেপশনে গিয়ে বসবে।’
বাবা প্রতিবাদ করল না। বাবাকে বসিয়ে সে রিসেপশনে গিয়ে জানতে পারল, ডক্টর নন্দী সকালে আসেন না। বিকেল চারটে থেকে তাঁকে পাওয়া যাবে। মাকে অপারেট করবেন যে ডাক্তার, সেই ডক্টর চ্যাটার্জির কথা জিজ্ঞাসা করলে, ভদ্রমহিলা ফোন করে জেনে নিয়ে বললেন, ‘ওর প্রথম অপারেশন আছে সকাল ন’টায়। তার আধঘণ্টা আগে উনি আসবেন।’
‘সে কী! আধঘণ্টার মধ্যে সব ব্যবস্থা উনি করতে পারবেন?’
‘ব্যবস্থা মানে? ওহো, ওসব করার জন্য অন্য লোকজন আছে। কিন্তু আপনি কেন খোঁজ নিচ্ছেন?’ মহিলা বিরক্ত।
‘সকাল ন’টায় যাঁর অপারেশন হবে, তিনি আমার মা।’
‘ও। ঠিক আছে। আপনার তো অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। হয়ে গেলে ও.টি.-র সামনে গিয়ে অপেক্ষা করবেন, তখন ডাক্তার চ্যাটার্জি যা বলার, তা বলবেন।’ ভদ্রমহিলা ফোনের রিসিভার তুলে নিলেন।
বাবার কাছে ফিরে এল নবকুমার—’আমি মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না। মায়ের সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ। কালীঘাটের প্রসাদ দিলাম। বললাম, মাকে ডাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে। কাল নাকি তার রাত্রে ঘুম হয়নি।’ বাবা বলল।
‘আমার কথা জিজ্ঞাসা করল?’
‘হ্যাঁ। তোর সিনেমা আজ দেখানো শুরু হবে?’
‘হ্যাঁ। মা একথা বলল?’ উত্তেজিত হল নবকুমার।
‘হ্যাঁ। ওর সঙ্গে যে আয়া থাকে, তার কাছেই শুনেছে।’
কীরকম একটা ভালো লাগার অনুভূতি ছড়িয়ে গেল মনে। এইসময়ও মা তার কথা ভেবেছে। নিজেকে সামলে নবকুমার বলল, ‘চলো, কিছু খেয়ে নেবে।’
‘তুই যা। আমি অপারেশন হয়ে যাওয়ার পরে খাব।’ বাবা মাথা নীচু করে বলল।
রিসেপশনের বাইরে বেরিয়ে আসতেই নবকুমার ডক্টর চ্যাটার্জিকে দেখতে পেল। দ্রুত হেঁটে লিফটে ঢুকে গেলেন। ওঁকে দেখামাত্র খিদের ইচ্ছেটা চলে গেল। ওঁর সঙ্গে যদি একটু কথা বলতে পারত…
সোয়া ন’টায় রিসেপশনিস্ট মহিলা নবকুমারকে ডাকলেন—’আপনারা ক’জন এসেছেন? দুজন ওপরে ও.টি.-র সামনে চলে যান।’
এবার যাওয়ার উদ্দেশ্য জানালে লিফটম্যান বাধা দিল না। বাবাকে নিয়ে ওপরে উঠে এল নবকুমার। চারধার নির্জন, থমথমে।
