ক্যালকাতায় নবকুমার – ১

এক

এই কলকাতায় টিকে থাকতে হলে ওইসব সেন্টুফেন্টু বুক থেকে হটাতে হবে। এই শহর যেমন কাউকে দয়া করে না, তেমনি যে দয়া দেখাতে চায়, তার পশ্চাদদেশে লাথি মারে। কথাটা মাথায় রেখো নবকুমার।’ গীতিময় একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে টান দিলেন। সিগারেটটার মুখে আগুন নেই। আগুন না ধরানো সিগারেটে দুবার টান দিয়ে আবার প্যাকেটে ঢুকিয়ে বললেন, ‘এই শহরে বাঁচতে হলে তোমাকে রুথলেস হতে হবে। মানে বোঝো?’

শুয়েছিল নবকুমার। তার চোখের ওপর বাঁ-হাত ভাঁজ করে রাখা। বলল, ‘নির্দয়।’

‘ইয়েস। দয়ামায়া, প্রেম-ভালোবাসা—এসব ক্যামেরার সামনে ঝোলাবে, পর্দায় পাবলিক দেখে হাততালি দেবে। কিন্তু ক্যামেরার বাইরে যে জীবন, সেখানে তুমি বলবে, ফ্যালো কড়ি মাখো তেল, আমি কি তোমার পর!’ গীতিময় বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার এই কন্ডিশন দেখে আজ আমি শুটিং বন্ধ রেখেছি। কাল ফার্স্ট আওয়ারে অন্যদের কয়েকটা শট নিয়ে নেব। কিন্তু তোমাকে বেলা একটার মধ্যে ফ্লোরে দেখতে চাই। আজ রেস্ট নাও।’

মাথা নাড়ল নবকুমার—’না, আমি পারব না, একদম পারব না।’

‘কী যা তা বলছ তুমি?’ উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়লেন গীতিময়।

‘শেফালি মা জামিন না পেলে আমি কোনও কাজ করতে পারব না।’

‘শেফালি মা? হু ইজ শি? তোমার কে হন? কেউ না! স্রেফ বাড়িওয়ালি। আমি বড়বাবুর কাছে সব শুনেছি। মোর ওভার, ভদ্রমহিলা প্রায় উন্মাদ হয়ে আছেন। ওর কাছে জেলের ভিতর আর বাইরের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।’ গীতিময় বললেন, ‘তোমাকে একটু আগে বললাম ওইসব সেন্টুফেন্টু বুক থেকে হটাতে। কানে ঢোকেনি?’

‘কিন্তু শেফালি মা আমার কাছে শুধু বাড়িওয়ালি নন। আমি বোঝাতে পারছি না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হচ্ছে, যারা ইতিকে রেপ করতে গিয়েছিল, যাদের জন্যে শেফালি মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে, তাদের খুন করি।’ দাঁতে দাঁত চাপল নবকুমার।

হো হো শব্দে হাসলেন গীতিময়—’এসব সংলাপ তখনই তোমার মুখে মানাবে, যখন ক্ষমতার ঘোড়ার পিঠে উঠে বসতে পারবে। ক্ষমতা হাতে না থাকলে এসব বকওয়াস ছাড়া কিছু নয়। নবকুমার, মাথা ঠান্ডা করে শোনো, এই কলকাতা শহরে বাঁচতে গেলে শুধু নিজের কথা ছাড়া আর কারও কথা ভাববে না। আচ্ছা, এখন চলি। যদি পারি সন্ধেবেলায় একবার ঘুরে যাব।’

‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি।’

‘নিশ্চয়ই।’

‘মুক্তো এখন কেমন আছে?’

‘সে আবার কে?’

‘ও আমাকে দেখাশোনা করত, রান্না করত…!’

‘তার কথা আমি জানি না। কী হয়েছিল?’

‘গুন্ডারা ওকে খুব মেরেছিল। হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।’

‘তোমার কাজের লোক সোনাগাছিতে কী করছিল! মিস্টিরিয়াস। ফরগেট হার।’ গীতিময়ের কথা শেষ হতেই দরজায় শব্দ হল। গীতিময় এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলেই খুশি খুশি গলায় বলে উঠলেন,—’আসুন, আসুন। নবকুমার এখন প্রায় ভালো আছে।’

মন্দাক্রান্তা এবং বড়বাবু ঘরে ঢুকলেন। খাটের পাশে পৌঁছে মন্দাক্রান্তা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রায় কেন? কাল থেকে তো অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে।’

বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অসুবিধে কী হচ্ছে?’

নবকুমার উঠে বসার চেষ্টা করলে মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘না না, উঠতে হবে না। শুয়েই কথা বলো। মুখের দাগগুলো তো অনেকটাই শুকিয়েছে। শরীরে ব্যথা আছে এখনও?’

মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল নবকুমার। তারপর হাতজোড় করল—’আমাকে আপনারা ছেড়ে দিন!’

‘মানে?’ বড়বাবু বিরক্ত হলেন—’কী বলতে চাইছ তুমি?’

‘আমার পক্ষে এখন কোনও কাজে মন দেওয়া সম্ভব নয়!’ নবকুমার বলল।

সঙ্গে সঙ্গে গীতিময় বললেন, ‘আবার বাজে কথা! তোমায় এত করে বোঝালাম…!’

মন্দাক্রান্তা জিজ্ঞাসা করলেন—’তোমার সমস্যাটা কী?’

‘আমার মন ভেঙে গিয়েছে। উঃ!’

গীতিময় বললেন, ‘আরে মন তো শক্ত কিছু নয় যে, চোট পেলে ভেঙে যাবে! মন হল জলের মতো, যে পাত্রে রাখবে, তার চেহারা নেবে। জল কি ভাঙা যায়?’

মন্দাক্রান্তা গীতিময়কে জিজ্ঞাসা করলেন—’আপনি কি এতক্ষণ এইসব বোঝাচ্ছিলেন?’

‘হ্যাঁ ম্যাডাম!’ গীতিময় হেসে বললেন।

তাঁর সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে মন্দাক্রান্তা আবার নবকুমারের দিকে তাকালেন—’কই, পরিষ্কার করে বললে না তো, তোমার সমস্যা কী?’

‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, শেফালি মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমি জানি উনি খুন করতে পারেন না। তা ছাড়া ইতিকে খুন করার কোনও কারণই নেই। শুনেছি উনি পাগল হয়ে গিয়েছেন। মুক্তো ওই সময় মার খেয়েছিল বলে হাসপাতালে আছে। ইতি, ইতিটা কোনও অন্যায় না করে মরে গেল! উঃ!’ দু-হাতে মুখ ঢাকল নবকুমার।

বড়বাবু বললেন, ‘ওই ইতির সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ছিল?’

নবকুমার হাত সরাল মুখের ওপর থেকে—’সম্পর্ক?’

‘ইয়েস। আমি খবর নিয়েছি। মেয়েটার প্রফেশন ছিল এই পাড়ার অন্য মেয়েদের যা থাকে। তার সঙ্গে তুমি এতটা ইনভলভড ছিলে যে, এখন কষ্ট পাচ্ছ?’

মন্দাক্রান্তা আপত্তি জানালেন—’এটা ওর ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ নিয়ে কথা না বলাই ভালো!’

বড়বাবু বললেন, ‘ঠিক আছে, বলব না। কিন্তু তুমি এখন কী চাইছ?’

‘শেফালি মাকে পুলিশের কাছ থেকে বের করে এনে চিকিৎসা করিয়ে আবার আগের মতো সুস্থ করে তুলতে চাই।’ নবকুমার বেশ জোর দিয়ে বলল।

বড়বাবু হাসলেন—’এর জন্যে ভালো উকিলের প্রয়োজন। যিনি ওর জামিনের ব্যবস্থা করতে পারবেন। সেটা করতে দু-তিনমাস লেগে যেতে পারে। জামিন পাওয়ার পর চিকিৎসা করতে হবে। এই দুটো কাজ করতে পাঁচ-দশ হাজার টাকা নয়, আরও অনেক বেশি টাকা লাগবে। তোমার কি সেটা খরচ করার সামর্থ্য আছে?’

কথা বলতে পারল না নবকুমার। নিজের অক্ষমতার কথা বলতে খারাপ লাগল। একটু আগে শোনা গীতিময়ের কথাটা মনে এল—ক্ষমতা না থাকলে এই শহরে কিছুই করা যায় না। তা হলে সে এই কাজটা কীভাবে করবে?

বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন—’তুমি এখন কোথায় আছ, তা জানো?’

‘এটা একটা গেস্ট হাউজ।’

‘মন্দাক্রান্তার ইচ্ছাতে তোমাকে সোনাগাছির বাড়ি থেকে তুলে এনে এখানে রাখা হয়েছে। কেন রেখেছি, তা কি তুমি জানো?’ বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আপনারা আমার ভালো চান, তাই…!’

‘দূর, দূর! মোটেই নয়। তোমার ভালো চাইতে হলে কোটি কোটি মানুষের ভালো চাইতে হয়। আমি তো অবতার নই! মানুষের ভালো চাইতে হলে অবতারদের পয়সা খরচ করতে হয় না। তোমাকে এখানে এনে রেখেছি, প্রতিদিন তোমার পিছনে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ করছি শুধু আমার প্রয়োজনে। ছবিটার পিছনে ইতিমধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। তুমি যদি খোঁড়া হয়ে যাও, তা হলে আমার টাকাটা জলে চলে যাবে। তাই…।’

বড়বাবুকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন মন্দাক্রান্তা—’আমি একটু আগে মুক্তো-র খোঁজ নিয়েছি। ওকে আজ বিকেলে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে। ওর আঘাত বেশি নয়। মুক্তো তোমার ফ্ল্যাটে চলে এলে তুমি কাল থেকে ওখানেই থাকতে পারবে।’

গীতিময় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা হলে কাল ওই ফ্ল্যাটেই গাড়ি পাঠাব।’

‘আমার একদম ইচ্ছে হচ্ছে না, বুকের ভিতরে…!’ কথা শেষ করল না নবকুমার।

‘ঠিক আছে।’ বড়বাবু বললেন, ‘এত বলার পরও ও যখন কুকুরের লেজের মতো বেঁকে থাকছে, তখন প্রোজেক্ট বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমার সামনে কোনও উপায় নেই।’

‘প্রোজেক্ট বন্ধ করে দেবেন?’ গীতিময় ককিয়ে উঠলেন।

‘এ ছাড়া কী করতে পারি? ও এটা করতে বাধ্য করছে। এই জন্যে সবাই বলে প্রফেশনাল লোক ছাড়া কাজ করা উচিত হয়। উটকো লোককে হিরো করার মাশুল তো দিতেই হবে!’ বড়বাবু খুব তেতো গলায় কথাগুলো বললেন।

গীতিময় বললেন, ‘নবকুমার যেসব দৃশ্যে আছে, সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য কোনও হিরোকে নিয়ে আবার টেক করলে প্রোজেক্টটা বেঁচে যেতে পারে।’

‘তুমি তো তোমার নিজের ধান্দা দেখছ ডিরেক্টর, আমার কথা ভাবছ না। ওর দৃশ্যগুলো তুলতে যে খরচ হয়েছিল, তা কোন গৌরী সেন দেবে আমাকে? ওর কাছ থেকে যে আদায় করব, তার কোনও চান্স নেই, ভিখিরির তো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকে না!’

গীতিময় মাথা নাড়লেন—’থাকে! অন্তত খবরের কাগজে পড়েছি। একজন ভিখারি মারা যাওয়ার পরে তার ঝোলার মধ্যে ব্যাঙ্কের পাসবুক পাওয়া গিয়েছিল। তাতে আড়াই লাখ টাকা জমা ছিল।’

‘তাই! তা হলে হিসেব করে ওকে বলো, অভিনয় যদি না করতে পারে, তা হলে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিক!’ বড়বাবু নিরাসক্ত গলায় বললেন।

‘আমি কোত্থেকে দেব!’ অসহায় চোখে তাকাল নবকুমার।

‘কেন?’ বড়বাবু বললেন, ‘কাজ করতে পারবে না বলে যখন ভেবে নিয়েছ, তখন তোমার জন্যে যে ক্ষতি হবে, তার দায়িত্ব তো তোমাকেই নিতে হবে! নিশ্চয়ই গ্রামে তোমাদের জমিজমা, পুকুর আছে। তুমি তো একেবারে কপর্দকশূন্য নও, তাই থেকে শোধ করে দিও। চলো মন্দা।’ বড়বাবু কথা শেষ করলেন।

মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘আমার যে যেতে একটু দেরি হবে!’

বড়বাবু ঘুরে দাঁড়ালেন—’কেন?’

‘আমার যে এখনও কথাই শেষ হয়নি!’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। কথা শেষ করে নাও!’ বড়বাবু বাধ্য হয়ে বললেন।

মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘গীতিময়বাবু…!’

‘হ্যাঁ ম্যাডাম!’ গীতিময় একটু সোজা হলেন।

‘আপনার ছবিতে নবকুমার যে ক’টা দিন অভিনয় করেছে এবং সেই ক’দিনের কাজে যত খরচ হয়েছে, তার হিসাব কবে পাওয়া যাবে?’ মন্দাক্রান্তা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘ম্যাডাম, প্রোডাকশন কন্ট্রোলারকে বলছি। সে হিসেব করে দিন তিনেকের মধ্যে বলে দিতে পাবে কত খরচ হয়েছে।’ গীতিময় বললেন।

‘সেই টাকা পেলে নতুন হিরো নিয়ে এই ছবির শুটিং আবার শুরু করতে পারবেন?’

‘তা তো পারবই। কিন্তু খরচ বেড়ে যাবে নতুনভাবে করলে।’

‘কেন?’

‘অন্য সব খরচ ঠিক রাখা যাবে, কিন্তু নবকুমারের বদলে কোনও প্রতিষ্ঠিত নায়ককে ওই চরিত্রে নিলে তার দক্ষিণা তো অনেক বেশি হয়ে যাবে! নবকুমারের প্রথম ছবি বলে সম্মান-দক্ষিণা সামান্য ছিল।’ গীতিময় বললেন।

‘সেটা আপনাদের সমস্যা। কিন্তু হিসেবটা তৈরি হলে আমাকে জানাবেন। আমি টাকাটা দিয়ে দেব!’ মন্দাক্রান্তা গম্ভীর গলায় বললেন।

‘সে কী!’ বড়বাবু চমকে উঠলেন—’তুমি দেবে মানে?’

‘যেহেতু এই ক্ষতি হওয়ার পিছনে আমারও একটা ভূমিকা আছে বলে মনে করি, তাই ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব আমি নিতে চাই।’ মন্দাক্রান্তা বললেন।

‘আহা, আমি কি তোমার কাছে টাকা চাইছি?’

‘না, সরাসরি চাননি। কিন্তু ফেরত দেওয়াটা আমার কর্তব্য!’

‘ওই দায়িত্বহীন গ্রাম্য ছোকরার কৃতকর্মের দায়িত্ব তুমি নেবে কেন?’

‘এই প্রশ্নের জবাব দিতে আমি বাধ্য নই।’

‘কিন্তু টাকার পরিমাণ তো কম হবে না!’

‘ওটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার টাকা ফেরত পেয়ে গেলে নিশ্চয়ই আফসোস করবেন না!’ মন্দাক্রান্তা বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন। নবকুমার বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিল।

মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘আর একটা দিন বিশ্রাম নিলে তুমি অনেকটা সুস্থ হয়ে যাবে। আগামিকাল ওই বাড়িতে গিয়ে তোমার জিনিসপত্র নিয়ে সোজা গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে। এই কলকাতায় থাকতে গেলে যে মানসিকতার দরকার হয়, সেটা তোমার নেই। আমি চাই না পরশুদিন থেকে তুমি এই শহরে থাকো। কিন্তু ভুলেও এই কলকাতার আর আমার কথা ভেবো না। ঠিক আছে?’

নবকুমারের চোয়াল যেন ঝুলে গেল—’চলে যাব?’

‘হ্যাঁ। চলে যাও।’ মন্দাক্রান্তা দৃঢ় গলায় বললেন।

‘কিন্তু…!’

‘কোনও কিন্তু নয়। তোমার সামর্থ্য নেই শেফালি মায়ের পাশে দাঁড়ানোর। ওঁর নিজের কীরকম টাকাপয়সা আছে, তা আমি জানি না। যতদিন তিনি মানসিক রোগী হয়ে থাকতে বাধ্য হন, ততদিন সেগুলো অন্ধকারে থাকবে। তাঁর ওই বাড়ি পুলিশ সিল করে দিয়েছে। যে ফ্ল্যাটে তুমি ছিলে, সেটা খালি করে দেওয়া হবে। মুক্তোকে না হয় আমার ওখানে নিয়ে যাব। তা হলে তুমি থাকবে কোথায়? নবকুমার, এই শহর হেরে যাওয়া মানুষের জন্যে নয়। ভালো থেকো।’ মন্দাক্রান্তা ঘুরে দাঁড়ালেন—’চলুন।’

বড়বাবু হাসলেন। এই মুহূর্তে তিনি বেশ স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হয়। মন্দাক্রান্তা-র পিছন পিছন এবার গীতিময় বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

অনেকক্ষণ চুপচাপ বসেছিল নবকুমার। শেষ পর্যন্ত তার মনে হল, মন্দাক্রান্তা ঠিকই বলেছেন। তার কোনও ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা না থাকলে কোনও কাজ করা যায় না। সিনেমার নায়ক হওয়ার যে সুযোগ তার সামনে এসেছিল, সেটার সদ্ব্যবহার সে করতে পারল না। গ্রাম থেকে সে কলকাতায় এসেছিল জীবিকার সন্ধানে। সোনাগাছির মতো জায়গায় শেফালি মায়ের মতো একজন বড় মনের মানুষকে পাওয়ার ভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু কপালে সইল না।

মন্দাক্রান্তাও তার জন্যে যা করেছেন, তা কোনওদিন ভুলতে পারবে না সে। ক্ষতিপূরণের টাকাটাও তিনি দিয়ে দিচ্ছেন। সেটা কত জানতে পারলে এই জীবনে যদি রোজগার করতে পারে, তা হলে সে মন্দাক্রান্তা’কে ফিরিয়ে দেবে। আজকের দিনটা তাকে এই গেস্ট হাউজে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কাল সকালে ওই ফ্ল্যাট হয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।

দুপুরে গেস্ট হাউজ থেকেই খাবার দিয়ে গিয়েছিল। ভালো ভালো খাবার। এইরকম রান্না, এইরকম পদ গ্রামের বাড়িতে হয় না। হলেও তার রান্নার ধরন এরকম নয়।

খাওয়ার পর শরীরে আলস্য হল। বিছানায় শুলেই চোখ বুঝে যায়, কিন্তু আজ কীরকম অস্বস্তিতে সেটা হল না। কিছুক্ষণ পরে দরজায় শব্দ হল। নবকুমার বিছানা থেকে না উঠে বলল, ‘কে? দরজা খোলা আছে। ভিতরে আসুন।’

দরজা খুলে ধুতি-শার্ট পরা রোগা মানুষটি ভিতরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে নবকুমার উঠে বসল—’নিবারণদা, আপনি?’

‘তোমার শরীর এখন কেমন?’

‘ভালো। বসুন। আপনি যে আসবেন, আমি ভাবতেই পারছি না। বসুন।’

‘তোমার খবর শোনার পর না এসে পারলাম না।’ নিবারণদা বললেন।

নবকুমার নিবারণ গুপ্ত-র দিকে তাকাল। নিবারণ গুপ্ত টালিগঞ্জের অন্যতম প্রবীণ মেক-আপ ম্যান। স্টুডিওতে ওঁর সঙ্গে কয়েকদিনের সম্পর্ক, তা-ও দেখতে এসেছেন। সে বলল, ‘আমি এখন অনেক ভালো আমি দাদা।’

‘তোমার শরীরের কথা বলছি না, মন এরকম হল কেন?’

প্রশ্ন শুনে কুঁকড়ে গেল নবকুমার। সে অভিনয় করবে না, এই কথা সবাই জেনে গিয়েছে। সে বলল, ‘আমি মানাতে পারছি না দাদা।’

নিবারণ বললেন, ‘মানুষের জন্মবৃত্তান্ত তোমার জানা আছে ভাই?’

‘বুঝলাম না।’

‘মায়ের পেটে শিশু বড় হয়, ধীরে ধীরে তার শরীর তৈরি হয়, সে সেখানেই থাকতে চায়। কিন্তু প্রকৃতি এবং মানুষ তাকে টেনে-হিঁচড়ে বা অপারেশন করে পৃথিবীতে নিয়ে আসে। পৃথিবীর আবহাওয়ার সঙ্গে মানাতে না পেরে সে কাঁদে। কিন্তু সেই শিশুই পৃথিবীর সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত সে পৃথিবীর মানুষ হয়ে যায়। এটা মানো তো?’

‘হ্যাঁ, দাদা!’

‘গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে হেরে গিয়ে পালিয়ে যাবে ভাই? মেনে নাও, মানিয়ে নাও। কেন নেবে জানো? মেনে নিয়ে যদি মনের মতো কাজ করার সুযোগ পাও, তা হলে সেটাই তো করা উচিত। পালিয়ে গেলে সেই সুযোগটা তো পাবে না।’ নিবারণ বললেন।

‘কিন্তু দাদা। এখানে আমি যেন…’

‘বাইরের লোক? ভিতরের লোক হওয়ার জন্যে যে অভিনয়টা করতে হয় সেটাই করো। চাল ফোটালে ভাত যেমন হয়, তেমন মাড়ও। মাড় ফেলে দিয়ে ভাত খেতে হয়। সেটা ফেলতে শেখো। নবকুমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, হেরে যেও না।’

‘তা হলে আমি কী করব?’

‘অনিলদা, অনিল চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথা মনে পড়ল। একজন শিল্পী হতে চেয়েছিল। কিন্তু হয়ে গেল ব্যবসায়ী। তাকে দূর থেকে দেখে অনিলদা চেঁচিয়ে বলেছিলেন, ”কী হে, ছিলে শিল্পী, হয়ে গেলে শিল্পপতি!’ তারপর নিবু গলায় বলেছিলেন, ‘তাই ভালো! শিল্পী হয়ে থাকলে তো খেতে পেতে না!” ‘ হাসলেন নিবারণ গুপ্ত—’তোমাকে দুটোই হতে হবে। একটা সত্যি, অন্যটা অভিনয়। আচ্ছা, আজ চলি ভাই। কাল স্টুডিওতে এসো, পালিয়ে যেও না!’

কী মনে হল নবকুমারের—বিছানা থেকে নেমে নিবারণ গুপ্ত-র পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *