ক্যালকাতায় নবকুমার – ৮

আট

শিলিগুড়ি স্টেশনে নেমে নবকুমার ভেবেছিল পাহাড় দেখতে পাবে, কিন্তু হতাশ হল। মনে হচ্ছিল, সে আরেকটা হাওড়া স্টেশনে নেমেছে। কুলিদের হাঁকাহাঁকি, রিকশার হর্ন, গাড়ির ব্যস্ততার আওয়াজ চারপাশে, পাহাড়ের চিহ্ন প্রথমে চোখে পড়ল না।

প্রোডাকশন ম্যানেজার পুরো দলটাকে মালপত্রসমেত বাইরে বের করে এনে আবার ভিতরে ছুটল। নবকুমার দেখল, গীতিময়, ক্যামেরাম্যান বিজন রায় এবং দুজন মহিলাকে নিয়ে ম্যানেজার বেরিয়ে আসছে। দুজন মহিলার একজন বিদিশা। তাকে দেখতে পেয়ে বিদিশা হাসল।

গীতিময় গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করলেন—’সব ঠিকঠাক ছিল তো?’

‘হ্যাঁ।’ নবকুমার বলল।

‘গলায় ঠান্ডা লাগিও না। তা হলে আর স্বর বেরোবে না।’

প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে বলল, ‘দাদা, এই বোলেরো গাড়িতে আপনাদের সুটকেস তুলে দিয়েছি। আপনারা উঠে পড়ুন। সকাল দশটায় কার্শিয়াং পৌঁছে যাবেন। ওখানকার ট্যুরিস্ট সেন্টারে ব্রেকফাস্ট করে নেবেন। আমি বলে আসছি।’

‘তোমাদের বাস কোথায়?’ গীতিময় তাকালেন।

‘ওই তো দু-দুটো বাস।’ প্রোডাকশন ম্যানেজার নবকুমারের দিকে তাকাল—’চলে এসো ভাই। সবাই বাসে উঠছে!’

হঠাৎ বিদিশা বলল, ‘ওমা! হিরো বাসে যাবে কেন? তা ছাড়া বোলেরো গাড়িতে অনেক জায়গা আছে। ও তো স্বচ্ছন্দে যেতে পারে।’

‘আমাকে যা বলা হয়েছে…’—মাথা চুলকাল ম্যানেজার।

‘কে বলেছে?’ বিদিশা বেশ বিরক্ত।

গীতিময় হাত ওপরে তুললেন—’আহা, ঠিক আছে। নবকুমার আমাদের সঙ্গে যাবে। তোমরা রওনা হয়ে যাও। যদি আলো পাই আজ বিকেলেই শুট করব।’

ড্রাইভারের পাশে গীতিময়। পিছনে বাকি চারজন। গাড়ি চলতে শুরু করলেই চমকে উঠল নবকুমার। পাহাড় এত কাছে ছিল! স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে সে বুঝতেই পারেনি। জীবনে এই প্রথম পাহাড় দেখল সে। সহযাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বুঝল, ওরা কেউ উত্তেজিত নয়। অর্থাৎ ওরা অনেকবার পাহাড় দেখে ফেলেছে। সে এমন ঝুঁকে জানলার বাইরে তাকিয়েছিল যে, বিদিশা প্রশ্ন না করে পারল না—’কী দেখছেন?’

‘পাহাড়।’ বলে ফেলল নবকুমার।

‘ওমা! এর আগে পাহাড় দ্যাখেননি?’

 হঠাৎ সচেতন হল নবকুমার। সে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করল—’দেখেছি। তবে সেগুলো টিলা ছিল, পাহাড় নয়।’

চোখ ঘোরাল বিদিশা—’তাই!’

গাড়ি যত ওপরে উঠছিল, তত মুগ্ধ হচ্ছিল নবকুমার। কিন্তু যেই পাক দিয়ে দিয়ে ওপরে ওঠা শুরু হল, অমনি শরীর গুলিয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, বমি হয়ে যাবে। নিজেকে ঠিক রাখতে যখন প্রায় অক্ষম হয়ে পড়ছিল, তখন গীতিময় ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ি দাঁড়াতেই নীচে নেমে খানিকটা সরে একটু ঝুঁকে বমি করে ফেললেন। সেটা দেখে বমি করার ইচ্ছে প্রবল হলেও নিজেকে সামলাল নবকুমার। গাড়ি থেমে থাকায় গা-গুলানি ভাবটা কমল। বিদিশা জিগ্যেস করল—’এই পাহাড়ে আগে এসেছেন?’

দাঁতে দাঁত চেপে মাথা নাড়ল সে—’না।’

‘আপনার বমি পাচ্ছে না?’

‘পাচ্ছে।’

‘নেমে করে আসুন। নইলে শরীর খারাপ হবে।’ বিদিশা বলল।

নবকুমার আর দেরি করল না। দ্রুত দরজা খুলে গাড়ির পিছনে যেতেই হুড়মুড়িয়ে পেটে যা ছিল সব বেরিয়ে এল। হাঁপাতে লাগল সে। দ্বিতীয়বার বমি হওয়ার পরে দরজার দিকে এগোতেই বিদিশা একটা জলের বোতল এগিয়ে দিল—’মুখটা ধুয়ে নিয়ে একঢোক খেয়ে নিন। বেশি খাবেন না।’

গীতিময় গাড়ির কাছে এসে গিয়েছিলেন। বললেন, ‘নবকুমারকে তো তুমি চেনোই না, অথচ চণ্ডালিকা হয়ে গেলে—আমি কী দোষ করেছি?’

নবকুমারের হাত থেকে বোতল ফেরত নিয়ে বিদিশা বলল, ‘ওই যে বলে না, স্বভাব যায় না মরলেও, আপনার সেই অবস্থা। নিন।’

গাড়ি চলতে শুরু করলে নবকুমার সামনে বসা বিদিশার দিকে তাকাল। বিদিশা খলনায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করে। কিন্তু আজ তাকে যেভাবে সাহায্য করল, তাতে তো ওর স্নেহপ্রবণ মনের পরিচয় পাওয়া গেল। তার মানে, এই মহিলার মন নরম। বিদিশা-র পাশে যিনি বসে আছেন, তাঁকে স্টেশনের বাইরে দেখার পর একটাও কথা বলতে শোনেনি সে। মহিলা মাঝবয়সি, স্বাস্থ্যবতী, কিন্তু মুখ-চোখ আটপৌরে। ইনি কে? কোনও অভিনেত্রী? তা হলে নিশ্চয়ই উঁচুদরের অভিনেত্রী, নইলে এসি ফার্স্ট ক্লাসে ওঁকে আনা হত না। নবকুমারের পাশে ক্যামেরাম্যান বিজন রায় চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। একটু উসখুস করে তাঁকেই নীচু গলায় জিগ্যেস করল সে—’আচ্ছা, বিদিশা দেবীর পাশে যিনি বসে আছেন, তাঁর নাম কী?’

চোখ না খুলেই বিজন রায় বললেন, ‘টুনি। বিদিশা-র এসকর্ট।’

‘এসকর্ট মানে?’ নবকুমার শব্দটির অর্থ ঝুঝতে পারল না।

‘ওকে সব ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য এসেছে।’

‘কাজের লোক?’ খুব হতাশ হল নবকুমার।

‘বলতে পারো।’ চোখ খুললেন না বিজন রায়।

কার্শিয়াং বাজার পেরিয়ে ট্যুরিস্ট সেন্টারের সামনে গাড়ি থামল। বেশ ঠান্ডা চারপাশে। গীতিময় এবং বিজন রায় সাইড ব্যাগ থেকে সোয়েটার বের করে পরে নিয়েছেন। বিদিশা এবং তাঁর এসকর্টের শরীরে শাল উঠেছে। শীত করছিল নবকুমারের। সে নিজের সুটকেস খুঁজতে গিয়ে থেমে গেল। ওটা প্রোডাকশন ম্যানেজার ওদের বাসে তুলে দিয়েছে। সেই বাস এখানে না আসা পর্যন্ত তাকে ঠান্ডা সহ্য করতেই হবে। রেস্তোরাঁয় ঢুকে বিদিশা জিজ্ঞাসা করল—’আপনার শীত লাগছে না?’

রেস্তোরাঁতে ঢোকার পর একটু কাঁপুনি কমলেও ভিতরের উত্তাপ আরামদায়ক ছিল না। নবকুমার বলল, ‘খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। আমার স্যুটকেস বাসে চলে গিয়েছে। ওটা না আসা পর্যন্ত গরমজামা পাব না।’

বিদিশা পিছনে দাঁড়ানো মহিলার দিকে তাকাল—’টুনি, তোমার হাতব্যাগে আর একটা শাল আছে না?’

‘হ্যাঁ’—টুনি মাথা নাড়ল।

‘চটপট নিয়ে এসো।’ বিদিশা বলতেই টুনি বেরিয়ে গেল।

সেই শাল গায়ে দিয়ে টেবিলে বসল নবকুমার। সামনে গীতিময়, বিজন রায় এবং বিদিশা। টুনি পাশের টেবিলে বসেছে। এই টেবিলের পাশে চেয়ার খালি থাকা সত্ত্বেও। গীতিময় অর্ডার দেওয়ার সময় বিদিশার দিকে তাকালেন—’তুমি ডিম খাবে না?’

‘আপনার মনে আছে, দেখছি। আমি ভেজ।’ বিদিশা বলল।

অর্ডার দেওয়ার পর গীতিময় নবকুমারের দিকে তাকিয়ে হাসল—’কপাল করে এসেছ ভাই। এই কপালটা যেন শেষ পর্যন্ত থাকে।’

নবকুমার বলল, ‘আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।’

কপালে ভাঁজ পড়ল গীতিময়ের—’আচ্ছা এটা কি তোমার ইনোসেন্স, না প্রিটেনশন? যা বলি তা তুমি বুঝতে পারো না?’

কী জবাব দেবে, ভেবে পাচ্ছিল না নবকুমার। গীতিময় বললেন, ‘পাহাড়ে আসছ, তবু সঙ্গে সোয়েটার বা জ্যাকেট আনোনি। কিন্তু কপাল ভালো বলে লেডিজ শাল গায়ে জড়াতে পারলে। বুঝতে পেরেছ?’

মাথা নেড়ে নবকুমার বলল, ‘উনি দিলেন, তাই…’

‘না দিলে কী হত?’ বিদিশা হাসল।

‘নিমোনিয়া।’ বিজন রায় বললেন।

‘ঠিক! নবকুমারের যাতে নিমোনিয়া না হয়, তাই ওটা গায়ে জড়াতে বললাম। ও অসুস্থ হয়ে গেলে এবার পাহাড়ে এসেও শুটিং ক্যানসেল করতে হত।’ বিদিশা বলল, ‘কি, ঠিক করিনি?’

‘আরে দূর! আমি একটু মজা করছিলাম, তুমি সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন?’

খাবার এসে গেল। গীতিময় বললেন, ‘খাও।’

কার্শিয়াং ছাড়ার আগেই প্রোডাকশন ম্যানেজারের বাস এসে যাওয়ায় গরমজামা পেয়ে গেল নবকুমার। বিদিশাকে শাল ফেরত দিতে চাইলে বিদিশা বলল, ‘ওটা রেখে দিন। ঘরে তো জ্যাকেট পরে বসে থাকবেন না। ফেরার সময় ইচ্ছে হলে টুনিকে দিয়ে দেবেন।’

গাড়ি যত ওপরে উঠতে লাগল, তত মুগ্ধ হতে লাগল নবকুমার। পাহাড়, আকাশ কী অপরূপ রূপে রূপসি হয়ে উঠছে চারপাশে! গীতিময় বললেন, ‘ঘুম আসছে। যতবার দার্জিলিং-এ এসেছি, ততবার ভেবেছি ঘুমে কয়েকদিন থাকব, কিন্তু থাকা হয়ে উঠল না।’

কথাগুলো সবাই শুনল, কিন্তু কেউ কোনও মন্তব্য করল না।

ওরা দার্জিলিং-এ পৌঁছল দুপুরের মুখে। দলটাকে রাখা হল তিনভাগে। টেকনিশিয়ানরা বাজারের কাছে একটি হোটেলে। বোলেরোর যাত্রীরা লাডেন লা রোডের ওপরে একটি সুন্দর গেস্ট হাউজে। জানা গেল, বড়বাবু তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে থাকবেন ম্যালের ওপরে একটি বিলাসবহুল হোটেলে।

নবকুমার এবং বিজন রায়-কে একঘরে থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিজন রায় চাইলেন তাঁর সহকারী ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে থাকতে, তাতে কাজের সুবিধে হবে। প্রোডাকশন ম্যানেজার বলল, ‘তা হলে নবকুমার নীচের হোটেলে চলুক।’

গীতিময় মাথা নাড়লেন—’না। সেটা ঠিক হবে না। খোঁজ নিয়ে দ্যাখো, এখানে কোনও সিঙ্গল রুম পাওয়া যায় কি না।’

সেটা পাওয়া যেতে নবকুমারকে টেকনিশিয়ানদের হোটেলে যেতে হল না। বিদিশাদের ঘরের ওপরতলায় একটা ছোট্ট ঘর এবং সেখানে ঢুকে খুশি হল নবকুমার। ধপধপে বিছানা। লাগোয়া বাথরুম। ঘরটি বেশ ছোট, কিন্তু জানলা খুলে দিতেই হাঁ হয়ে গেল সে। সাদা পাহাড়। ওটা যে বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা, তা বুঝতে একটু সময় লাগল। বোঝার পর নবকুমারের মনে হল, তার কোনও দুঃখ নেই।

দুপুরে খাওয়ার পরে কমল এসে মেক-আপ করে দিল গেস্ট হাউজের ঘরেই। ড্রেসার এসে শার্ট-প্যান্ট এবং বুক-খোলা সোয়েটার পরে নিতে বলল। দার্জিলিং-এ যতদিন শুটিং হবে, এই পোশাক তাকে পরতে হবে। নবকুমার বলল, ‘হাফহাতা সোয়েটারে ঠান্ডা লাগবে না?’

ড্রেসার বলল, ‘তা হলে একটা মাফলার দিচ্ছি, কিন্তু ডিরেক্টর না চাইলে খুলে ফেলতে হবে। তোমার চরিত্র এর বেশি গরমজামা পাবে কী করে!’

প্রোডাকশনের লোক তাকে নিয়ে এল যে জায়গায়, সেখানে একটা ছোট সিঁড়ি এঁকেবেঁকে নীচে নেমে গিয়েছে। সিঁড়ির মুখে গীতিময় এবং বিজন রায় কথা বলছিলেন। পাশে ক্যামেরা। গীতিময় বললেন, ‘নবকুমার, তুমি এই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যাও। এখান থেকে চিৎকার করে ”স্টার্ট” বলামাত্র তুমি দ্রুত ওপরে উঠে আসবে। বুঝতে পারছ?’

মাথা নাড়ল নবকুমার।

‘তুমি গলায় মাফলার জড়িয়েছ কেন? অ্যাঁ?’ গীতিময় বিরক্ত।

বিজন রায় বললেন, ‘থাক না, গরিবরাও মাফলার জড়ায়।’

‘আচ্ছা, যাও। তুমি উঠে আসতে আসতে ওই বাড়িটার সামনে এসেই দাঁড়িয়ে যাবে। যেন এখানে এমন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, যাকে দেখে অবাক হবে। বুঝতে পেরেছ কী করতে হবে?’ গীতিময় জিজ্ঞাসা করলেন।

‘হ্যাঁ।’

‘তা হলে দেরি ক’রো না। এখানে বেশিক্ষণ আলো পাওয়া যাবে না। যাও।’

নবকুমার নীচে নেমে গেল। একটা কুকুর পাশের বাড়ির বারান্দায় বসে ডাকছে।

নবকুমারের উপস্থিতি সে পছন্দ করছিল না। লোমে মোড়া কুকুরটা বন্ধ গেটের ওপর ওঠার চেষ্টা করছিল। নবকুমার একটু সরে যেতেই ওপর থেকে চিৎকার ভেসে এল—’অ্যাকশন।’

সঙ্গে সঙ্গে নবকুমার দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল। ওঠার সময় সে বুঝতে পারল কুকুরটাও গেট পেরিয়ে তার পিছন পিছন ওপরে উঠছে। ওর চিৎকার ক্রমশ কাছে চলে আসায় নবকুমার দ্রুত পা চালাল—কুকুরটা যদি কামড়ে দেয়, তা হলে! যে বাড়িটার সামনে তাকে পরিচালক দাঁড়াতে বলেছিলেন, সেখানে দাঁড়ালে কুকুর তাকে নির্ঘাত কামড়াবে। সে একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। ঊর্মিলা সেখানে, আকাশ দেখছে।

‘কাট, কাট, কাট!’ গীতিময়ের গলা ভেসে আসতেই নবকুমার পিছনে তাকাল। কুকুরটা দু-হাত দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। ওর গলায় এখন গর্জন নেই।

গীতিময় ওপর থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কুকুরটাকে সঙ্গে আনলে কেন? আমি তোমাকে একা ওপরে উঠতে বলেছিলাম।’

‘আমি আনিনি, ও নিজে এসেছে।’ নবকুমার মিনমিনে গলায় বলল।

‘রিটেক করছি। ওকে আবার নীচে যেতে বলুন!’ বিজন রায় বললেন।

‘না, থাক।’ গীতিময় বললেন, ‘এটা একটা সিম্বলিক ব্যাপার হতে পারে। হিরোর মনের বাসনার প্রতীক যেন ওই কুকুরটা। হিরোর মতো দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসছে। সমালোচকরা নানান ব্যাখ্যা করবে। আচ্ছা, এবার আমরা নীচে যাব। নবকুমার যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে ওপরে দাঁড়ানো ঊর্মিলাকে ধরব। কুইক, বেশিক্ষণ আলো পাব না।’

নবকুমার অবাক হয়ে দেখল কুকুরটা চুপচাপ নীচে নেমে যাচ্ছে। ও কি বুঝতে পেরেছে যে, ওর ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে? কে জানে!

ততক্ষণে ক্যামেরা নিয়ে নীচে নেমে পড়েছেন বিজন রায়। গীতিময় বললেন, ‘প্রথমে ঊর্মিলাকে ধরো। ঊর্মিলা আর আকাশ।’ তারপর চেঁচিয়ে ঊর্মিলাকে নির্দেশ দিলেন একটু আগের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে। দৃশ্যটা তোলা হয়ে গেলে গীতিময় বললেন, ‘ক্যামেরা এবার ওপরের ডানদিকে। নবকুমার এবং ঊর্মিলাকে ধরবে। নবকুমার, অ্যাকশন বললে সোজা ওপরে উঠে ঊর্মিলার কাছে এসে দাঁড়াবে, কিন্তু সিঁড়ির একধাপ নীচে থাকবে। বুঝতে পেরেছ? ঊর্মিলা, তখন তুমি নবকুমারের দিকে অবাক হয়ে তাকাবে। ভাববে ছেলেটা এখানে কোথা থেকে এল! ওকে?’

ঊর্মিলা হাসল—’ওকে।’

দৃশ্যটা তোলার পর বিজন রায় খুশি হয়ে বললেন, ‘খুব ভালো হয়েছে। দুজনের এক্সপ্রেশন চমৎকার। কিন্তু খুব দ্রুত আলো পড়ে যাচ্ছে। আর কাজ করা কি ঠিক হবে?’

গীতিময় বললেন, ‘ওকে, প্যাক-আপ। আমি চেয়েছিলাম, আজকের দিনটা নষ্ট না করে কিছু কাজ করা যাক। তা হয়ে গিয়েছে।’

‘কাল কখন কল টাইম দিচ্ছ?’ বড়বাবুর গলা শোনা যেতে সবাই পিছন ফিরে দেখল, তিনি এবং একটি অল্পবয়সি তরুণী দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটির মুখের আদলের সঙ্গে বড়বাবুর মিল রয়েছে।

গীতিময় এগিয়ে গেলেন বড়বাবুর দিকে। ওঁরা যখন কথা বলছেন, তখন ঊর্মিলা জিজ্ঞাসা করল,—’কেমন লাগছে দার্জিলিং?’

‘ভালো। খুব ভালো।’ নবকুমার জবাব দিল।

‘হ্যাঁ।’

‘প্রথমবারে সবকিছু ভালো লাগে। আচ্ছা, আপনি ছবির হিরো। আপনি ফ্লাইটে এলেন না কেন?’ ঊর্মিলা জিজ্ঞাসা করল।

নবকুমার দূরে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখল। এর সঙ্গেই সে ফোনে কথা বলেছিল? হয়তো। বড়বাবু এর সঙ্গেও কথা বলতে নিষেধ করেছেন।

‘আপনি ড্রিঙ্ক করেন?’ ঊর্মিলা আচমকা জিজ্ঞাসা করল।

‘অ্যাঁ? না, না।’

‘এখন থেকে করা শুরু করবেন।’ ঠোঁট মোচড়াল ঊর্মিলা।

‘কেন?’

‘শুনলাম আপনি বিদিশার সঙ্গে আছেন, তাই!’ ঊর্মিলা বড়বাবুদের দিকে এগিয়ে গেল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *