পাঁচ
নিবারণদা বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই অবাক হয়েছ ওঁর কথা শুনে। ওঁর আত্মমর্যাদাবোধ খুব প্রবল। আমরা একসঙ্গে রয়েছি প্রায় বাইশ বছর। বিশেষ কারণে বিয়ে করা সম্ভব হয়নি। তাই আমি ওঁকে আমার রক্ষাকর্ত্রী বলি, স্ত্রী বলতে পারি না। কেউ যদি ওঁকে আমার স্ত্রী বলে ভেবে নেয়, তা হলে ওঁর অস্বস্তি হয়, ভুল সংশোধন করে দেন!’
প্রৌঢ়া বললেন, ‘এই বয়সে এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ! এখন শুধু একটাই সমস্যা—কীভাবে একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকা যায়। নিবারণদা তো সারাজীবন যা রোজগার করেছেন, তা দু-হাতে খরচ করেছেন। হাত পেতে দাঁড়িয়েছে যে, তাকে হতাশ করেননি। এখন ঠাকুরকে বলি, যেন এই ওষুধেই ওঁর উপকার হয়। হাসপাতালে গিয়ে কাটাছেঁড়ার জন্যে যে খরচ করতে হবে, তারপর তো হাত খালি হয়ে যাবে।’
নিবারণদা বললেন, ‘এসব কথা ওকে কেন বলছ? এই যে আমি এখন কথা বলছি, দু-মিনিট পরেই এই দেহ মৃতদেহ হয়ে যেতে পারে। তাই পরে কী হবে, তা এখন ভেবে কোনও লাভ নেই। সারাজীবন অনেক কাজ করেছি। বড় বড় পরিচালকরা অনেক প্রশংসা করেছেন। আমি ছাড়া নাকি কলকাতায় ভালো মেক-আপ হয় না। কিন্তু পাবলিক আমার নাম জানে না। পরিচালকের নাম জানে, নায়ক-নায়িকারও—মেক-আপ ম্যানকে কেউ চেনে না। প্রযোজকরা খাতির করতেন। বলতেন, আমার হাত নাকি কথা বলে। কিন্তু পারিশ্রমিক দেওয়ার সময় তাঁদের খুব অসুবিধে হত। আমার নামের সামনে ভদ্রলোক তকমাটা এত চেপে বসেছিল যে, টাকাপয়সা নিয়ে ঝগড়া করতে পারিনি কোনওদিন। তুমি প্রথম ফিল্মে কাজ করছ। টাকাপয়সার কথা বলার সময় এখনই হয়নি। যদি ছবি হিট করে, তা হলে তোমাকে বলতে হবে না, প্রযোজকরাই অঙ্কটা বাড়াতে থাকবেন।’
প্রৌঢ়া জিগ্যেস করলেন—’ভাবব না?’
নবকুমার বলল, ‘আমি বড়বাবুকে বলব। ওঁর ছবিতেই তো উনি কাজ করছেন। উনি নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন। তা ছাড়া…’ কীভাবে কথাটা বলবে ভেবে ঠিক করতে না পেরে নবকুমার বলে ফেলল—’আচ্ছা, আজ আমি আসি। যদি দরকার হয়, আমাকে মোবাইলে ফোন করবেন। আমার নাম্বারটা লিখে নেবেন?’
প্রৌঢ়া কাগজে নাম্বার লিখে নেওয়ার পরে নবকুমার নিবারণদাকে বলল, ‘আমি আবার আপনার কাছে আসব।’
নিবারণ নীরবে মাথা নাড়লেন।
ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে ফিরে এল নবকুমার। দরজা খুলে মুক্তো বলল, ‘ওহ, আর একটু আগে এলে তুমি তার দেখা পেতে।’
‘কার?’ নবকুমার অবাক হল।
‘তোমার সেই দিদির গো। খটমট নাম।’
‘মন্দাক্রান্তা?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। তিনিই এসেছিলেন। বলছিলেন, তোমার কোনও খোঁজখবর তিনি পাচ্ছেন না। শরীর খারাপ কি না, তাই দেখতে এসেছিলেন। তুমি ভালো আছ শুনে অবাক হলেন। বললেন, আজই যেন ওঁকে ফোন করো। বেশি রাত হলে কাল করবে।’
নিজের ঘরে ঢুকল নবকুমার। সে যোগাযোগ করছে না দেখে মন্দাক্রান্তা খবর নিতে এসেছিলেন। এটা তাঁর বড় মনের পরিচয়। কিন্তু এই আসার খবরটা নিশ্চয়ই বড়বাবু জানেন না। যদি জানতে পারেন, তা হলে খুব রেগে যাবেন। তাকে আরেকটা থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়া তো দূরের কথা, ছবির শুটিং বন্ধ করে দেবেন। সে কী করবে, ভেবে পাচ্ছিল না। এখন তার কাছে মোবাইল ফোন আছে। একমুহূর্তে সে মন্দাক্রান্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে লড়াই করল নবকুমার। তারপর সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজে থেকে যোগাযোগ করবে না। এই কলকাতায় থাকতে হলে মাথার ওপর ছাদ এবং পেটে খাবার চাই। এখন এই দুটো বড়বাবুই দিতে পারেন। জলে নেমে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করলে আখেরে নিজেরই ক্ষতি। একথা ঠিক, মান্দাক্রান্তা খুব ভালো মহিলা। আজ তাঁর জন্যেই সে পায়ের তলায় মাটি পেতে চলেছে। কোনও স্বার্থ নিয়ে ভদ্রমহিলা তার সঙ্গে মেশেননি। কিন্তু বড়বাবুর সেটা সহ্য হচ্ছে না।
বড়বাবুর সঙ্গে মন্দাক্রান্তার সম্পর্ক ঠিক কীরকম? বড়বাবুর মেয়ে আছে। তিনি কি মন্দাক্রান্তাকে ভালোবাসেন? ভালোবাসলে কি মানুষ প্রিয়জনকে অবিশ্বাস করতে পারে? বড়বাবু মন্দাক্রান্তাকে অবিশ্বাস করেন। সোনাগাছিতে যখন ছিল, সে তখন অনেকরকম মানুষের কথা শুনেছে। কোনও কোনও মহিলার বাঁধা বাবু থাকত। সেই বাবু ছাড়া অন্য কোনও খদ্দেরকে ঘরে তুলত না। বাবুরা অবশ্যই বড়লোক, সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তারা পরিবার নিয়ে বাস করলেও সপ্তাহে দু-তিনদিন সোনাগাছিতে নিজের মেয়েমানুষের কাছে সময় কাটিয়ে যেত। বড়বাবু কি মন্দাক্রান্তাকে তাই মনে করে? তফাত এই শুধু সোনাগাছির বদলে সম্ভ্রান্ত পাড়ায় তিনি মন্দাক্রান্তাকে থাকতে দিয়েছেন।
কিন্তু এসব কথা ভেবে তার কী লাভ? কে ভালো, কে খারাপ—তাতে তার কী এসে যাবে! আপাতত যদি মন্দাক্রান্তাকে সে এড়িয়ে যেতে পারে, তা হলে বড়বাবুর কৃপা থেকে বঞ্চিত হবে না। তার মনে পড়ল মাস্টারদা প্রায়ই বলত, ‘আপনি বাঁচলে তবে বাপের নাম।’ অথচ মাস্টারদা বাঁচল না। সোনাগাছির রাস্তায় মরে পড়েছিল। নিজেকে একটু স্বার্থপর, অনেকটাই ছোট মনে হচ্ছিল, কিন্তু সেটা দূর করার জন্যে নবকুমার চিৎকার করে ডাকল—’মুক্তোদি।’
মুক্তো দরজায় এসে দাঁড়াল—’কিছু খাবে?’
‘না, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।’
‘কী কথা?’
‘যতদূর জানি, এই কলকাতায় তোমার কোনও থাকার জায়গা নেই। তাই তো?’
নীরবে মাথা নাড়ল মুক্তো।
‘গ্রামে, মানে কোনও গ্রামে কি কেউ আছে।’
‘না। আমার কেউ নেই। যিনি ছিলেন, তিনি তো পাগল হয়ে গিয়েছেন।’
‘মুশকিল।’ শ্বাস ফেলল নবকুমার।
‘আমাকে নিয়ে কী মুশকিল হল?’ মুক্তো জিগ্যেস করল।
‘তোমাকে নিয়ে নয়। আগামী রবিবার থেকে আমাদের কোনও থাকার জায়গা থাকবে না। বাড়িওয়ালা দখল নিয়ে বিক্রি করে দেবে। বড়বাবুকে বলেছি, কিন্তু…’
‘ও, এই কথা! আজ ”দুর্বার”-এর দুজন মেয়ে এসেছিল। ওরা বলল, ইচ্ছে করলে আমরা শেফালি মায়ের বাসায় গিয়ে থাকতে পারি। ওখানে তো সবাই চেনা!’
‘সে কী, পুলিশ তো তালা দিয়ে গিয়েছিল!’
‘হ্যাঁ, মেয়েরা বলল, আমরা গিয়ে বললে পুলিশ সেই তালার চাবি দিয়ে দেবে।’
‘ঠিক আছে। দেখছি।’
মুক্তো চলে গেলে নবকুমার ঠিক করল, কাল-পরশু যখন শুটিং নেই, তখন সে সোনাগাছিতে গিয়ে ”দুর্বার”-এর সঙ্গে কথা বলবে। যদি পুলিশের অনুমতি পাওয়া যায়, তা হলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মুক্তোকে সেখানে রেখে আউটডোরে সে স্বচ্ছন্দে যেতে পারবে। ফিরে এসে যদি বড়বাবুর সাহায্য না পায়, তা হলেও ক্ষতি নেই, শেফালি মায়ের বাসায় সে থাকতে পারবে। মাথার ওপরে চেপে বসা চাপ হঠাৎ সরে গেলে যেরকম হালকা লাগে, নবকুমারের সেইরকম অনুভূতি হল। শার্ট-প্যান্ট পরেই সে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পরে তার মনে পড়ল, পকেটে পনেরো হাজার টাকা আছে। এই টাকাগুলোকে কোথায় রেখে সে বাইরে যাবে? তা ছাড়া মুক্তোর হাতেও কিছু টাকা দেওয়া দরকার। এতদিন শেফালি মা ওকে যা দেওয়ার, তা দিতেন। এখন মুক্তোর কথা তাকেও ভাবতে হবে।
পকেট থেকে টাকার বান্ডিল বের করল সে। তারপর গোনা শুরু করল। সব পাঁচশো টাকার নোট। গুনতে গুনতে চব্বিশে এসে সে দেখল আর নোট নেই। চব্বিশ মানে, বারো হাজার টাকা। এটা কী হল! নিজের ভুল হয়েছে ভেবে নবকুমার আবার গোনা শুরু করল। কিন্তু চব্বিশটা পঁচিশ হল না। মাথা ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল তার।
ভদ্রলোক বললেন, পনেরো হাজার টাকা দিয়েছেন। সুনীলবাবুকে তো তার ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে। যে রসিদে সে সই করেছে, সেখানেও পনেরো হাজার লেখা ছিল। তা হলে কি তিন হাজার টাকা তার পকেট থেকে কোথাও পড়ে গিয়েছে? তা-ই বা কী করে হবে! সবগুলো নোট এই গার্টারে বাঁধা ছিল যে।
হঠাৎ খেয়াল হল সুনীলবাবু তাঁর নাম্বার একটা কাগজে লিখে দিয়েছিলেন। কাগজটা পকেট থেকে বের করে মোবাইলের বোতাম টিপতে লাগল সে। কানে চাপতেই শুনল—’আপনি যে নাম্বারে ফোন করছেন, সেটি এখন ব্যস্ত আছে।’ ফোনটাকে সামনে রেখে নবকুমার ভেবে পাচ্ছিল না তার কী করা উচিত।
হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল। সে নাম্বার দেখে বুঝল সুনীলবাবুই ফোন করছেন। বোতাম টিপে ‘হ্যালো’ বলতেই সুনীলবাবুর গলা কানে এল—’কে ভাই?’
‘আমি নবকুমার।’
‘আরে, কী খবর? সব ভালো তো?’ সুনীলবাবু উচ্ছ্বসিত।
‘না। ভালো নয়। আপনি আমাকে পনেরো হাজার টাকা দিয়েছেন বলেছিলেন, কিন্তু বাড়িতে এসে গুনে দেখলাম বারো হাজার আছে।’
‘দিলাম পনেরো, আর হয়ে গেল বারো!’ গলার স্বর পালটে গেল সুনীলবাবুর।
‘কী করে হল বুঝতে পারছি না, কিন্তু হয়ে গিয়েছে।’ নবকুমার বলল।
‘তার মানে, তোমার মনে হচ্ছে আমি বারো দিয়ে পনেরো বলেছি? ভাই, তোমার তো এখনও দাঁত গজায়নি, সবে জন্মেছ, এখনই কামড়াতে চাইছ!’
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।’
‘তুমি বলছ তিন হাজার টাকা কম পেয়েছ। যখন দিলাম, তখন গুনে নাওনি কেন?’
‘আপনি নিশ্চয়ই গুনে দিয়েছিলেন।’
‘দিয়েছিলাম। এত বছর ফিল্ম লাইনে কাজ করছি, কেউ আঙুল তুলে বলেনি আমি তাকে ঠকিয়েছি। তুমি বললে! ছি ছি ছি!’
‘আমি বলিনি যে আপনি ঠকিয়েছেন।’ প্রতিবাদ করল নবকুমার।
‘আর কী বাকি রাখলে! না, না, আমি বড়বাবুকে বলব তিনি যেন অন্য লোক খুঁজে নেন। এই বদনাম নিয়ে কাজ করা যায় না।’
ফাঁপরে পড়ল নবকুমার—’দেখুন। আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি আপনাকে কেন বদনাম দিতে যাব? দোষ তো আমার, গুনে নেওয়া উচিত ছিল।’
হ্যাঁ, গুনে নেওয়া উচিত ছিল। তুমি আমার কাছে অফিসে এসে টাকা নিয়েছ। ছোটখাটো পার্ট যারা করে, যারা এক্সটা, তারা অফিসে আসতে সাহস পায় না। আমি ম্যানেজারকে টাকা দিই, সে ওদের টাকা দিয়ে ভাউচারে সই করিয়ে নেয়। পাঁচশো লেখা থাকলে তারা হাতে পায় চারশো, তিনশো। এ নিয়ে কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না, করলে আর কাজ পাবে না। এসব খবর জানো?’
‘না।’
‘জেনে রেখো। কথাগুলো ওপরতলায় পৌঁছায় না। তাতে শান্তি থাকে। পাঁচশো টাকার ভাউচারে সই করে তিনশো হাতে পাওয়া মানে, পনেরো হাজারে নয় হাজার পাওয়া। ভাই, তুমি তো তার ওপর তিন হাজার বেশি পেয়েছ। তাই না?’
নবকুমার চুপ করে থাকল।
সুনীলবাবু বললেন, ‘আর কিছু বলবে?’
‘না।’
বলামাত্র লাইন কেটে গেল। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল নবকুমার। কী কৌশল করে সুনীলবাবু মুখে না বলেও বুঝিয়ে দিলেন তিন হাজার টাকা তিনি কেটে নিয়েছেন। এটা কি সবার ক্ষেত্রেই করেন? যারা চেকে পেমেন্ট নেয়, তাদের ক্ষেত্রে কী করেন? মাস্টারদা বলত, ‘এখানে এসেছিস, সাবধানে চলবি নব। চোরচোট্টা, ঠগ আর জোচ্চোরের শহর হল ক্যালকাটা। ইংরেজরা যেদিন থেকে কলকাতাকে ক্যালকাটা বানাল, সেদিন থেকেই জোচ্চোরদের জমানা শুরু হয়ে গেল। তোকে টিকে থাকতে হলে এদের সঙ্গে সংগত করতে হবে।’
বুঝতে না পেরে নবকুমার জিগ্যেস করেছিল—’সংগত করা মানে?’
মাস্টারদা ধমকেছিল—’তুই আর কতদিন হাঁদা থাকবি বল তো? গায়ক গান গায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে, তার সঙ্গে তাল রাখে তবলচি। সেটাকে সংগত করা বলে।’
মাস্টারদার ডেডবডি পড়েছিল সোনাগাছির মাটিতে। আজ তার কথা মনে পড়ল। মাস্টারদা আরও বলত, ‘শেখা দুইরকম। দেখে আর ঠেকে। দেখে শেখ নব, ঠেকে শিখলে প্যান্ট হলদে হয়ে যাবে রে।’
মোবাইলের রিং এত জোরে বাজছিল যে, ঘুম ঘেঙে গেল নবকুমারের। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে টেবিল থেকে যন্ত্রটা তুলে সে বোতাম টিপল—’হ্যালো।’
‘ঘুমিয়ে পড়েছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি খুব সুখী মানুষ। এগারোটা বাজতে-না-বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ো।’
‘আপনি?’
‘কী আশ্চর্য! আমাকে চিনতে পারছ না!’
‘ওহো!’ লজ্জিত হল নবকুমার—’ঘুমের ঘোরে থাকায় বুঝতে পারিনি।’
‘তোমাকে যে মোবাইল ফোন দেওয়া হয়েছে, জানতাম না। তা ফোন যখন পেয়েছ, তখন আমাকে কল দিলে না কেন?’ মন্দাক্রান্তা জিগ্যেস করলেন।
‘আমি এখনও এই ফোন ব্যবহার করিনি, তাই…’
‘ও। আমি তোমার খোঁজে গিয়েছিলাম, সেই খবর পেয়েছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তারপরেও যোগাযোগ করলে না?’
কী বলবে ভেবে পেল না নবকুমার।
‘তোমার কী হয়েছে বলো তো? এখনও কি ঘুমের ঘোরে রয়েছ?’
‘না, না!’
‘স্ট্রেঞ্জ! তোমার কথাবার্তা আজ অন্যরকম লাগছে।’
‘না, না!’ নিজেকে সামলাল নবকুমার—’এই নাম্বার কে দিল?’
‘কে দিল মানে? মাই গড!’ মন্দাক্রান্তা বললেন, ‘তুমি আমাদের এখানে কাজ করছ আর আমি জানব না তোমাকে মোবাইল দেওয়া হয়েছে! গীতিময়কে ফোন করতেই জানলাম তোমাকে মোবাইল দেওয়া হয়েছে!’
‘ও।’
একটু সময় গেল, মন্দাক্রান্তা জিজ্ঞাসা করলেন—’তোমাকে বড়বাবু আমার ব্যাপারে কিছু বলেছেন?’
কী উত্তর দেবে নবকুমার! সত্যি কথা বললে বড়বাবু রেগে যাবেন। আর সেই রাগ প্রবল হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে তার। অতএব ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও নবকুমারকে বলতে হল—’না তো!’
‘এতটা সময় ভাবতে হল উত্তর দিতে! আচ্ছা, এখন ঘুমাও। রাখছি।’
মোবাইল ফোন রেখে নবকুমার একগ্লাস জল খেল। খুব খারাপ লাগছিল তার। যে ভদ্রমহিলা তার এত ভালো চান, তাঁকে মিথ্যে বলতে বাধ্য হল নিজের স্বার্থে। এ ছাড়া সে কী করতে পারত! বড়বাবু যদি ছবি বন্ধ করে দেন, তা হলে তাকে গ্রামে ফিরে যেতে হবে। সেই স্টেশনের সামনের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারা আর অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।
সকালে মুক্তোকে দু-হাজার টাকা দিল নবকুমার।
মুক্তো বলল, ‘ওমা, এত টাকা দিচ্ছ কেন?’
‘তুমি বাজারে যাও, সংসার চালাও, তার জন্যে এই টাকা!’
‘আমার কাছে টাকা আছে।’ গম্ভীর গলায় বলল মুক্তো।
‘তাই?’ হেসে ফেলল নবকুমার—’কত টাকা?’
‘গুনে দেখিনি। ও বাড়ির সংসার চালানোর টাকা আমার কাছে থাকত।’
নবকুমার অবাক হল। ক্যালকাটায় থাকার যোগ্যতা বোধ হয় মুক্তোরও নেই। সে বলল, ‘এই টাকাটাও রাখো। আজ মাংস রেঁধো।’
মুক্তো টাকাটা নিলে হালকা হল নবকুমার। ঠিক তখনই বেল বাজল। সে বসার ঘরে গিয়ে দরজা খুলতেই খুব রোগা একজন প্রৌঢ় মানুষ বলল, ‘নমস্কার। আপনি কি নবকুমার?’
মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল নবকুমার।
‘চলুন। আমাকে বড়বাবু পাঠিয়েছেন। আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন।’ লোকটা হাসল। ওর নীচের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই।
